পাক বাহিনীর গণহত্যা ॥ আরও অনেক দিনের কথা

নয়াবাজার কাটাইয়া আহমদ ছফা নওয়াবপুর রেলক্রসিং পার হইতেছেন। ক্রসিংয়ের কাছে, তাঁহার কথায়, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য’ দেখিতে হইল। আমি হুবহু উদ্ধৃতি দিতেছি: ‘তেজগাঁ থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন প্রায় আট দশ মাইল হবে। রেললাইনের দুই পাশে গত ২৩ বছর ধরে অভাবের টানে গ্রামবাংলার মানুষ এসে ডেরা পেতেছিল। কেউ রিকশা চালাত, কেউ মোট বইত, আবার কেউ বা করত ফেরিওয়ালার কাজ। গতদিন দুপুর থেকে সেনাবাহিনী এই বস্তি এলাকা জ্বালানোর কাজ শুরু করেছে। একটি ঘরও সোজা নেই। পোড়া স্তূপের মধ্যে দেখা গেল কয়টি বীভৎস করোটি। গন্ধ ছুটছে ভুরভুর করে।’
নওয়াবপুরেই খবর পাইলেন ডেমরা নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি শিল্পাঞ্চলে সেনাবাহিনী দিনেরাতে হরদম গোলাবর্ষণ করিয়াছে। বাঙ্গালি অফিসারদের টানিয়া আনিয়া বেয়নেট দিয়া গুঁতাইয়া গুঁতাইয়া হত্যা করিয়াছে। রিকশা হইতে নামিয়া একজন খবর দিলেন, গতরাতে সমস্ত শান্তিনগর বাজারটাও জ্বালাইয়া দিয়াছে।
ঢাকা শহরের রাস্তায় মিলিটারি জিপ। এখানে সেখানে গুলি। সারারাত গুলি। গুলি করিয়া তাহারা বাংলাদেশের নতুন জাতীয় পতাকা নামাইয়াছে। কিন্তু তখনো ঘরের ছাদে ছাদে বাঁশের কঞ্চি দাঁড়াইয়া আছে। আহমদ ছফা এই পর্যন্ত আসিয়া আবার লিখিতেছেন, ‘সন্ধ্যে হওয়ার একটু আগেই সৈন্যরা মাইক দিয়ে ঘোষণা করল, নামিয়ে ফেল জাতীয় পতাকা। বাইতুল মোকাররমের পাশে ইসলামিক একাডেমির একজন হৃষ্টপুষ্ট দারোয়ান পতাকা নামাইয়া নেবার জন্য যেই হাত দিয়েছে, অমনি তার বুকে গিয়ে গুলি বেঁধে। বেচারা ঘুরে ঘুরে নিচে পড়ে গেল। ঝলকে ঝলকে রক্ত বেরিয়ে কালো রাজপথ লাল হয়ে এল।’
সন্ধ্যার পর বিচ্ছিন্নভাবে এইদিক ওইদিক গুলি চলিল। গুলি থামিতেছে না। মেশিনগানের আওয়াজ মাঝে মাঝে। রাইফেলের গর্জন ক্ষণে ক্ষণে। রাত যতই গভীর হইতেছে আওয়াজ ততই ঘন হইতেছে। সম্ভবত সৈন্যরা ঘরে ঢুকিয়া হত্যা করিতেছে। আহমদ ছফা দেখিতে পাইলেন আগুন। ২৭/২৮ মার্চ রাতের কথা। ছফা লিখিতেছেন, ‘ছাদের উপর উঠে দেখলাম ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ আগুনের আভায় লাল হয়ে উঠেছে। আজ রাতেও তারা জ্বালাচ্ছে।’ তিনি দেখিলেন সকাল বেলাও নওয়াবপুরের বাঙ্গালি দোকানপাট জ্বলিতেছে।
আমাদের সাক্ষী শুনিয়াছেন, আগের দিন — মানে ২৭ তারিখ — নাকি অবাঙ্গালি বাসিন্দারা বাঙ্গালি দোকানের মালপত্তর লুটিয়া লইয়াছে। আহমদ ছফার ভাষ্য এই রকম: ‘যে দেরাজ, বাক্সগুলোতে ভরে থাকত বাঙ্গালি ব্যবসায়ীর আশা আকাক্সক্ষা এখন সেখানে গাদা গাদা ছাই এবং অঙ্গার। সকলে শাঁখারীবাজারের কথা বলাবলি করছিল। এই ছোট্ট গলিটিতেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাস করত। ঢাকা শহরের আর কোন অঞ্চলে এত হিন্দুর বাস ছিল না।’
গলিতে ঢুকিবার আগেই আহমদ ছফা নমুনা দেখিলেন। তাঁহার সাক্ষ্য — বড় জীবন্ত: ‘জগন্নাথ কলেজের পাশের একটা ঘরে চারজন মানুষ পাশাপাশি পড়ে আছে। গলি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার উপায় নেই। পোড়া আধপোড়া মানুষ আগুনের আঁচে বেঁকে গেছে।’
প্রতিটি ঘরই সেনাবাহিনী আগুন দিয়া জ্বালাইয়াছে। ঘরে ঘরে ঢুকিয়া হত্যা করিয়াছে। কেহ রেহাই পায় নাই । শিশু বৃদ্ধ নারী কেহই না। সকলেই মৃত্যু বরণ করিয়াছে। আহমদ ছফা শুনিলেন চন্দন শূরের বাড়িতে একত্রিশটি লাশ পড়িয়াছে। আহমদ ছফা বলিতেছেন, ‘তিনি ছিলেন প্রভাবশালী এবং ধনবান মানুষ। গত নির্বাচনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মুসলিম লীগ সমর্থক নবাব বাড়ির খাজা খয়েরউদ্দিন তাঁকে দলে টানতে চেষ্টা করলে তিনি কড়া কথা শুনিয়েছিলেন।’ ছফার জবানি অনুসারে ‘খাজা নিজেই নাকি সৈন্যদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।’
এই প্রথম আমরা ইঙ্গিত পাইলাম। শুদ্ধ অবাঙ্গালি বাসিন্দারা নহে, বাঙ্গালিদের মধ্যেও কেহ কেহ পাক সেনাবাহিনীর দোসর বা যুদ্ধাপরাধীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছে।
আহমদ ছফা শাঁখারীবাজারে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং নারীধর্ষণ কিভাবে চলিয়াছিল তাহার সামান্য বিবরণ দিয়াছেন। সঙ্গে যোগ করিয়াছেন, ‘চোখে না দেখলে তার বর্ণনা দেওয়া যাবে না।’ লিখিয়াছেন, ‘দেখছি শয়ে শয়ে বিকৃত পোড়া আধপোড়া মৃতদেহ। এর একটি দেখলেও অন্য সময় পেটের খিদে এবং চোখের ঘুম চলে যেত।’
দুপুরে তিনি বাসায় আসিলেন। দেখিলেন লোকজন সামরিক কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশে উর্দুতে লেখা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ জাতীয় শ্লোগান বাড়িতে দোকানে সাঁটিয়া রাখিতেছে। তাঁহার মনে হইল, ‘এতকাল মানুষ সম্পর্কে জীবন সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সব যেন মিথ্যা হয়ে গেল।’
হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ আর ধর্ষণই এই কতদিনে স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তিনি সদরঘাটের দিকে গেলেন। আজ ২৯ তারিখ হইয়াছে। ছফা দেখিতেছেন, ‘ফুটপাতে ইতস্তত ছড়ানো লাশ পড়ে রয়েছে। বড় বড় মাছি ভন ভন করছে। বাংলাদেশে মানুষের লাশ শকুনেও খায় না। শেয়াল-কুকুরেও ছোঁয় না।’
তিনি সদরঘাট পঁহুছাইলেন। যে সদরঘাটে ‘অসংখ্য মানুষের মধুচক্রের মত অবিরাম গুঞ্জরণ’ রাত বারোটার পরও থামিত না সেই সদরঘাট — তিনি দেখিলেন — খালি। একদম খালি। ছফা লিখিতেছেন, ‘আইডব্লিউটিএর জেটিগুলোর দিকে তাকাইলেই বুক ছম ছম করে। এত সব মানুষ, এত নৌকা লঞ্চ হৈ-হল্লা চিৎকার এসব কোথায় গেল? এই যে রাস্তার দুইপাশে বসত রাশি রাশি ফেরিওয়ালা, বেচাকেনা সেরে রাস্তার উপর শুয়ে থাকত — তাদের কি হল? কানের কাছে কে একজন বলল, সকলেই গেছে। বিরাট গুদামঘরটি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঢাকা শহরে বসন খুলে একেবারে উলঙ্গ করে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।’
সদরঘাট এবং ইসলামপুরের রাস্তার মোড়ে একটি জুতার দোকান ছিল। সৈন্যরা এই দোকানে লুটপাট করাইল। দুই দফায়। পহিলা দফায় অবাঙ্গালি বাসিন্দাদের দিয়া। দ্বিতীয় দফায় কিছু বাঙ্গালিকে দিয়া। যাহারা লুট করিতে চাহে নাই তাহাদের বেয়নেটের গুঁতা দিয়া ঠাণ্ডা করিয়া দিয়াছে। অনেকেই বাধ্য হইয়া লুটের জিনিশ লইয়াছে। পাকিস্তানি ক্যামেরাম্যান এই লুটের দৃশ্যের ছবি তুলিয়াছে। তারপর মেশিনগানের গুলি। ছফার বিবরণ মোতাবেক, ‘বিআইএস দোকানের সামনেই বিশ পঁচিশটি মৃতদেহ চার পাঁচদিন ধরে পড়েছিল।’ এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ইসলামপুরেও ঘটিয়াছিল।
পরদিন — মানে ৩০ তারিখ দাঁড়াইতেছে — আহমদ ছফা শুনিতে পাইলেন বীভৎসতম হত্যাকাণ্ডের সংবাদ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী একরাতে ঢাকার অদূরের জিঞ্জিরাবাজারে ‘কমসে কম পাঁচ হাজার’ মানুষ হত্যা করে। জিঞ্জিরায় জড় হইয়াছিলেন অগণিত মানুষ। ‘রাতের অন্ধকারে শত্র“র ঘুমন্তপুরী আক্রমণ করার মত যখন বর্বর সেনাবাহিনী শহরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার পরের দিন থেকেই নিরাপত্তার আশায় হাজার হাজার মানুষ স্রোতের মত এসে জিঞ্জিরাবাজারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে।’
আহমদ ছফা খবর পাইলেন, ‘সন্ধ্যের সময় থেকে মেশিনগানে সজ্জিত মিলিটারি জিপগুলো সদরঘাটে জড়ো করে রাখে একদিকে। আবার অন্যদিকে বাজারের তিনদিকে তারের ঘেরা দেয় এবং তাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ চালিয়ে দেয়। রাত হলে নৌকা করে নদী পার হয় সৈন্যরা এবং তাদের জিপগাড়িগুলোও পার করানো হয়। এরোপ্লেন থেকে আলো দেখিয়ে জিপগুলোকে বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বেপরোয়া গুলিবর্ষণ।’
ছফা অধিক লিখিলেন, ‘ঢাকা শহরের উপকণ্ঠের সুবৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্রটিতে রাতের অন্ধকারে রাইফেলের নল থেকে অবিরাম ঝলসাতে থাকে মৃত্যু। যারা আশ্রয় নিয়েছিল কেউ বাঁচতে পারেনি। যারা গুলি থেকে বাঁচবার জন্য পেছন দিকে পালাতে চেয়েছে তারা শক খেয়ে মরেছে।’

 

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৭

Leave a Reply