পাক বাহিনীর গণহত্যা: দ্বিতীয় দিনের কাহিনী

২৬ মার্চ সকাল সাতটার পরে মানুষকে রাস্তায় বাহির হইবার সুযোগ দেওয়া হইলে পর আহমদ ছফাও এক সময় বাহিরে গেলেন। ‘শহরের অবস্থা দেখে,’ তিনি লিখিতেছেন, ‘দুই চোখ জলে ভরে গেল।’
বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান হইয়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার দিকে যাত্রা করিলেন। এক পর্যায়ে জগন্নাথ হলের দরজায় পঁহুছিলেন। সেখানে একজন চেনাজানা ছাত্রের দেখা পাইলেন। আহমদ ছফার সাক্ষ্য এই রকম: ‘সে আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। হাত ধরে টেনে নিয়ে মাঠে সারি সারি লাশ দেখাল। অনেক মৃতদেহ নাকি মাঠে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছে। আর কক্ষে কক্ষে ঢুকে যাদের মারা হয়েছে সকলের লাশ নাকি তেমনি পড়ে রয়েছে।’
তারপর তিনি গেলেন সলিমুল্লাহ হলের দিকে। সেখানে রাস্তায় সৈন্যদল, সম্মুখে সামরিক গাড়ি। বুটের আওয়াজ বিশ্রী। তিনি লিখিলেন, ‘ভেতরে গিয়ে দেখার সুযোগ হল না, চেনাজানাদের মধ্যে কে কে বাঁচতে পেরেছে। দক্ষিণের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। প্রতিটি কক্ষে আগুন ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে জ্বলছে। দেয়ালের এখানে সেখানে এবড়ো-থেবড়োভাবে গুলির আঘাত লেগেছে। এই হলটিতে কতজন মরেছে তার সংখ্যা জানা যায়নি। অনেকদিন পর্যন্ত লাশগুলো কক্ষ থেকে বের করা হয়নি।’
এই শ্মশান দৃশ্যের পর তিনি গেলেন ইকবাল হলের দিকে। দেশপ্রেমিক ছাত্ররা ততদিনে এই হলের নাম পাল্টাইয়া রাখিয়াছেন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। আহমদ ছফা লিখিতেছেন, ‘দেখি অস্ত্রসজ্জিত সেনাবাহিনী হলটিকে তিন দিক থেকে বেড়া দিয়ে রেখেছে। সুতরাং সামনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কল্পনা করতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়, গত রাতে এই হলটিতে কি প্রলয়কাণ্ড ঘটে গেছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হইতে বাহিরে আসিয়া ইডেন মহিলা কলেজ ছাড়াইয়া আজিমপুর কলোনির ভিতর দিয়া তিনি আগাইতেছেন। সামনে পিলখানা। লিখিলেন: ‘ইডেন কলেজের হোস্টেলে যে ছাত্রীরা থাকতেন তাঁদের কথা জেজ্ঞেস করলাম না, পাছে একটা বিশ্রী কথা শুনতে পাই। দুই দিন না যেতেই সেই বিশ্রী কথা শুনতে হয়েছে।’
পিলখানা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ওরফে ইপিআরের সদরদপ্তর। ছফা লিখিয়াছেন, ‘অন্যান্য দিন এখানে উর্দিপরা ইপিআর বাহিনীর লোকজনে ভর্তি থাকত। আজ কেউ নেই। ছাড়াছাড়াভাবে মেশিনগান হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকেরা শ্যেনদৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছে। এই ক্যাম্পে প্রায় আড়াই হাজার ইপিআর সদস্য থাকত। তাদের ভাগ্যে কি ঘটল জানার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। মুখ ফুটে কারো কাছে জিজ্ঞেস করার উপায় নেই।’
আড়াই হাজারের মধ্যে মাত্র একজন বাঁচিয়াছে। কথাটা কানের কাছে মুখ আনিয়া ফিসফিস করিয়া বলিলেন একজন। তিনি পানের দোকান করেন। ছফা লিখিতেছেন, ‘কথাটা সত্য কিনা পরখ করে দেখিনি।’ তিনি শুনিয়াছেন, ‘রাতে যখন ইপিআর সদস্যরা সকলে মিলে ব্যারাকে ঘুমাচ্ছিল, তখনই প্রহরী কয়জনকে হত্যা করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী দরজা আটকে কামান দেগে সমস্ত ঘুমন্ত মানুষগুলোকে একই সঙ্গে মেরে ফেলে।’


আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন, ‘শহর থেকে মানুষ পালানোর হিড়িক লেগে গেছে। সে এক অভাবনীয় করুণ দৃশ্য। চোখে না দেখলে এ দৃশ্য কি হৃদয়বিদারক তা অনুমান করার উপায় নেই।’
আহমদ ছফা শুনিলেন, গতরাত্রের সংঘাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের হাজার খানেক পুলিশের মধ্যে শতখানেক কোনমতে প্রাণ বাঁচাইতে পারিয়াছেন। ‘বাকি সবাই বর্বর সেনাবাহিনীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছে।’ সেখানে গিয়াও দেখিলেন। একই দৃশ্য। বীভৎস। ‘শাদা শাদা অট্টালিকাগুলোর দেয়াল গোলার আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। জলের ট্যাঙ্কটা [ফেটে] গেছে। পুবদিকের ঢেউটিনের ছাউনি ব্যারাকখানা জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছে। রাস্তার দুই পাশের নারকেল এবং দেবদারু গাছের সবুজ পাতা আগুনে অর্ধেক পুড়ে গেছে।’
এই বিরাট ধ্বংসস্তুপের মধ্যে কোন মৃতদেহ দেখিতে না পাইয়া অবাক হইলেন আহমদ ছফা। স্থানীয় লোকজন বলিলেন, ‘শেষরাতে অনেকগুলো গাড়িতে লাশ বোঝাই করে নিয়ে গেছে সৈন্যরা।’
২৫/২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ‘দি পিপল’ এবং বাংলা দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ দপ্তর পোড়াইয়া দিয়াছে। আহমদ ছফা একজন চেনা হকারের মৃত্যুসংবাদ পাইলেন।
তিনি আরো অনেকের মৃত্যুসংবাদ পাইতেছেন। ইঁহাদের মধ্যে এলিফ্যান্ট রোডের লেফটেন্যান্ট [কমান্ডার] মোয়াজ্জেমও আছেন। সারাদিন শহর ঘুরিয়া ঘরে ফিরিতে সমর্থ হইলেন আমাদের সাক্ষী আহমদ ছফা।
প্রকৃতির ডাকে আবার সন্ধ্যা ঘন হইল। মোড়ে মোড়ে কেবল সৈন্য। কেবল মিলিটারি লরি। রাস্তাঘাটে একজনও লোক নাই। আছে সৈন্যদের বুটের আওয়াজ। আহমদ ছফার বৃত্তান্ত এইমতো: ‘কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম ঢাকা শহরের চারদিক দিয়ে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। ধূসর ধোঁয়াতে সমস্ত শহর ছেয়ে গেছে। চোখ মেলার উপায় নেই। যে দিকেই তাকাই, দেখি আগুনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে।’
অবশেষে সন্ধ্যাও গড়াইল। রাত্রি হইল। আকাশে জাগিয়া উঠিল অসংখ্য তারা। আবারও গুলিগোলার আওয়াজ আসিতে লাগিল। আহমদ ছফা দেখিলেন, ‘আজকের আকাশও গতদিনের মত গুলির আগুনে লাল হয়ে উঠেছে। মেশিনগান ছোঁড়ার শব্দ শুনছি, রাইফেলের গুলি ছুটছে শোঁ শোঁ। মাঝে মাঝে বুম বুম আওয়াজ শুনতে পাই। ওটা ট্যাঙ্ক থেকে গোলা বিস্ফোরণের ধ্বনি।’
আহমদ ছফা আরো লিখিতেছেন: ‘এখানে সেখানে আগুনবোমা ছুঁড়ে দিচ্ছে, শিখা বেরিয়ে আসছে আর বাড়িগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। গতরাতের চাইতেও ওরা বেশি হারে গুলি করছে।’
আরো এক রাত্রি পার হইল। ২৭ মার্চ সকাল সাতটার পর আহমদ ছফা প্রথমে বাংলা একাডেমী গেলেন। দেখিলেন, ‘১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তে গড়া বাঙালির এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি কামান দেগে চুরমার করে দিয়েছে। সংস্কৃতি বিভাগের কাগজপত্র জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। তিন তলার দেয়ালের প্রায় আট গজ পরিমাণ দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে।’
বাংলা একাডেমীর সামনেই রমনার কালীবাড়ি। ছফা লিখিতেছেন, ‘নিঃসঙ্গ মন্দির আকাশে চূড়া তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের গায়ে গোলার আঘাতের চিহ্ন। প্রতিমা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।’
আহমদ ছফা অনুমান করিতেছেন, রমনার কালীবাড়ির মধ্যে—দুইটি কালীমন্দিরের কম্পাউন্ড প্রতিটিতে হাজার করিয়া ধরিলে—প্রায় দুই হাজার নরনারী থাকিতেন। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন আসিল, ‘এতসব মানুষ, এরা গেল কোথায়?’
একজন মানুষের মুখে আহমদ ছফা শুনিলেন সৈন্যরা প্রথমে পেট্রোল দিয়া ঘরবাড়িতে আগুন ধরাইয়া দিয়াছিল। প্রাণের ভয়ে শিশু বৃদ্ধ যুবক যুবতী নারী পুরুষ যখনই বাহিরে আসিবার চেষ্টা করিয়াছে, গুলি করিয়া মারিয়াছে। দুইটি মন্দিরের সমস্ত মানুষের ভাগ্যে এই পরিণতি জুটিয়াছে। ছফা লিখিতেছেন, ‘কাছে যাবার উপায় নেই। একটু দূর থেকেই দেখলাম পায়রার খোপের মত ছোট্ট ছোট্ট ঘরগুলো জ্বালিয়ে ছাই করে ফেলেছে।’ আরো কিছু দূর গিয়া লিখিলেন, ‘গোটা রমনা এলাকাতে পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে নিঃশ্বাস টানা দায়। বমি হয়ে পেটের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসতে চায়।’
আহমদ ছফার ভাষায় বলিতে, তিনি শুদ্ধ ‘নেশাগ্রস্তের মত’ দেখিয়া যাইতেছেন। আবার পঁহুছিলেন শহিদ মিনারের পায়ের দেশে। এই দোসরা রাত্রে তাহারা গোটা মিনারটা কামানের গোলা মারিয়া ধরাশায়ী করিয়াছে। গুঁড়াইয়া দিয়াছে ‘বাঙালি জাতির মহামিলন ক্ষেত্র’ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার।
২৭ মার্চ সকালের কথা। আহমদ ছফা পথ চলিতেছেন। দেখিতেছেন, ‘বাসাভাঙ্গা পাখির মত লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নেমে এসেছে। সকলেরই চোখেমুখে অনিশ্চয়তা। কে কোথায় যাবে তার ঠিক নেই। কেউ কারো মুখের পানে তাকিয়ে দুটো সহানুভূতির বাণী প্রকাশ করবে তেমন অবকাশ নেই।’
ভিড়ের মধ্যে পা চালাইয়া দিলেন তিনি। প্রায় মাইলখানেক হাঁটিয়া নয়াবাজার এলাকায় পঁহুছিলেন। দেখিলেন, ‘গোটা বাজারটি একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। বিদ্যুতের তার সব ছিঁড়ে গেছে। বড় বড় আড়ত এবং গুদামঘরের পোড়া আধপোড়া রাশি রাশি টিন ছড়িয়ে রয়েছে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে। সারারাত আগুন জ্বেলেছে আর গুলিগোলা ছুঁড়েছে। মানুষ কত মরেছে তার হিসেব করেছে কে?’

 

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৬

Leave a Reply