পাক বাহিনীর গণহত্যা: আহমদ ছফার ১৯৭১

১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে। সেই ভয়ঙ্কর রাত্রে আহমদ ছফা ঢাকা শহরের তোপখানা রোডের এক বাড়িতে অবস্থান লইয়াছিলেন। সেই রাত্রের হত্যাযজ্ঞের কিছু দৃশ্যও তিনি নিজ চোখে দেখিয়াছিলেন। পরদিন সকালে– কারফিউ শিথিল হইবার পর — কিছু দৃশ্য তিনি পায়ে হাঁটিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিয়াছিলেন। গণহত্যাযজ্ঞের আরো দৃশ্য তিনি দেখিতে পাইয়াছিলেন তাহার পরের দিন। শুনিতে পাইয়াছিলেন আরো অনেক কথা ও কাহিনী। দেখিতে পাইয়াছিলেন আগের দুই রাতের ধ্বংসাবশেষ, লাশের উপর লাশ– স্থলে ও জলে। তখনো আগুনের শিখা জ্বলিতেছে। কোথাও দাউ দাউ, কোথাও ধিকি ধিকি।

যাঁহারা প্রাণ হাতে লইয়া ঢাকা নগর ছাড়িতে পারিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফাও তাঁহাদের মধ্যে। ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল নাগাদ তিনি পূর্ব সীমান্ত ডিঙ্গাইয়া আগরতলা শহরে পঁহুছিয়াছিলেন। তাহার পর একসময় কলিকাতা। ১৯৭১ সালের জুলাই মাস নাগাদ কলিকাতা হইতে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ নাম রাখিয়া  একটি পুস্তক প্রকাশ পাইল। সেই পুস্তকে আহমদ ছফাও আপনকার অভিজ্ঞতার একপ্রস্ত বিবরণ প্রকাশ করিলেন। নাম: ‘ঢাকায় যা দেখেছি যা শুনেছি’। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বইটি ঢাকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। সেই বিবরণের কিছু অংশ লইয়া এই নিবন্ধ। কিস্তি যোগে।

আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, মার্চ মাসের পঁচিশ তারিখ সকালবেলা থেকেই আমরা একটি জিনিস সাগ্রহে লক্ষ করেছি। ঢাকা শহরের সমুদ্রতরঙ্গের মত মিছিলগুলোতে কেমন যেন একটা শান্তভাব এসেছে। রাস্তায় লোকজন পানের দোকানের সামনে রেডিও শোনার জন্য জটলা করছেন। সকাল সাতটা থেকে দুই তিনবার রেডিওর সংবাদ হয়ে গেল। আলোচনার ফলাফল প্রসঙ্গে কিছুই বলা হল না। ধাবমান মিছিলগুলো কেমন ঝিম মেরে গেল।’

আহমদ ছফার বিবরণ অনুসারে, ‘সন্ধ্যের দিকে খবর এল সামরিক বাহিনীর লোক শাদা পোশাকে গিয়ে পাক মটর্সের কাছে [এখনকার বাংলা মটর] দুজন এবং তেজগাঁ ফার্মগেটে তিনজন নিরীহ পথচারীকে গুলি করে হত্যা করেছে।’ এই ঘটনার কয়েকদিন আগেও দেশের নানান জায়গায়– যেমন জয়দেবপুরে– পাক সেনাবাহিনী এমন সকল হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করিয়াছিল যাহার প্রতিটির সহি, আহমদ ছফার জবানিতে, ‘জালিয়ানওয়ালা বাগের তুলনা’ করা যাইতে পারে। জালিয়ানওয়ালাবাগ জায়গাটা পাঞ্জাবে।

‘তবু,’ আহমদ ছফা লিখিতেছেন, ‘ঢাকা নগরীর মানুষ পঁচিশ তারিখের বিকেলবেলাতেও বিশ্বাস করতে পারেনি যে সেনাবাহিনীর লোক সাদা পোশাকে নিরীহ পথচারীকে হত্যা করতে পারে।’

পঁচিশে মার্চ রাত এগারোটার কিছু পরে ঢাকা নগরীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বীর সেনাবাহিনী। আহমদ ছফার জবানি অনুসারে, ‘সৈন্যরা এল ঝাঁকে ঝাঁকে দলে দলে। ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলল। রাস্তার উপর দিয়ে মিলিটারি জিপগুলো ছুটে বেড়াতে লাগল। ট্যাঙ্কের প্রচণ্ড শব্দ কানে তালা লাগাবার উপক্রম করিল। কামানগুলো গুড়–ম গুড়–ম গর্জন করছে, মর্টার থেকে গুলি ছুঁড়ছে। দ্রুম দ্রুম আগুনবোমা ফুটছে আর ঠিকরে ঠিকরে লাল আগুনের লকলকে শিখা বেরিয়ে আসছে। কান পাতলে আওয়াজ– রাইফেলের, মেশিনগানের, মর্টারের, ট্যাঙ্কের। চোখ মেলে তাকান যায় না। ঢাকার আকাশ অজস্র নিক্ষিপ্ত গুলির আগুনে লাল হয়ে উঠছে। খৈ ফোটার মত ফুটছে গুলি।’

এই অবস্থায়ও আপন অক্ষরেখার চারিদিকে পৃথিবীর ঘুর্ণন থামিয়া নাই। এক সময় রাত কাবার হইয়া দিন ফুটিল। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘ফুটন্ত প্রভাতের আলোতে আমরা নগরীর চেহারা দেখলাম। চেনাই যায় না। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, দেয়ালগুলো ক্ষত-বিক্ষত। কালো কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেছে। গত রাতে যে সব বাড়িতে আগুনবোমা ছুঁড়ে মারা হয়েছে, সে সকল বাড়ি এখনো জ্বলছে।’

বেলা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে, আহমদ ছফার ভাষায় বলিতে ‘পিপীলিকার মতো পিলপিল’ মানুষ রাস্তায় বাহির হইয়া আসিল। ছফাও আসিলেন। দেখিলেন।’ শহরের অবস্থা দেখিয়া তাঁহার দুইচোখ পানিতে ভাসিয়া গেল। আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন এইভাবে: ‘হাজারে হাজারে পশু যেন গোটা শহরকে খামচে কামড়ে থাবা দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে। শহরের ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর চিকন সবুজ পাতাগুলো গুলির আগুনের আঁচে তামাটে হয়ে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে মেশিনগানের সংখ্যাহীনের গুলির চিহ্ন। তোপখানা রোডে বাসা। বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত যেতে দুই দুইটি লাশ দেখলাম।’

শুরু হইল প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।

‘একটু এগিয়ে গুলিস্তান সিনেমার সামনে,’ পঁহুছাইলেন আহমদ ছফা। অবস্থা দেখিয়া তাঁহার মুখের কথা আটকাইয়া গিয়াছে। তারপরও তিনি বলিতেছেন, ‘চিরনিদ্রায় নিদ্রিত রয়েছে অনেকগুলো মানব সন্তান। রক্ত ফুটপাথের উপর জমাট বেঁধেছে। রাতের বেলা যে সকল ফেরিওয়ালা, কুলি, শ্রমিক, ভিখারি এবং ভিখারিণী শ্রেণীর মানুষ রোজকার অভ্যাসমত ফুটপাতে ঘুমিয়েছিল, তাঁদের কেউই রেহাই পায়নি।

আহমদ ছফা একটু পরে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। দেখিতে দেখিতে গেলেন। দেখিতে হইল অনেক মরা। ‘কারো পিঠে লেগেছে গুলি, কারো বুকে। কোন মাথার খুলিতে খুব ছোট একটা ছিদ্র করে ঢুকেছে আর মগজ সমেত খুলির একটা বিরাট অংশ উড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।’

রেলওয়ের হাসপাতালের পাশে একটি অতি করুণ দৃশ্য দেখিতে হইল। দৃশ্যটি এইরকম: ‘একটি মা, তাহার বামস্তনের পাশে গুলি লাগিয়াছে। অথচ তাহার কোলের শিশুটি তখনও জীবিত। আহমদ ছফার মন্তব্যটি অবিস্মরণীয়: ‘আমরা যেন জাতির গোরস্তানের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।’

আর সামান্য সামনে ঢাকা হল। এখন যার নাম শহীদুল্লাহ্ হল। ছফা লিখিয়াছেন, ‘ঢাকা হলের সামনে একটি বুড়ো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে উপুড় হয়ে। লম্বা দীর্ঘ দাড়ির দুই এক গোছা বাতাসে একটু একটু নড়ছে। চোখ একটু একটু নড়ছে। তার ওপাশে দুইজন গলাগলি করে মরে রয়েছে। চোখে মরা মাছের মত নিথর দৃষ্টি।’

এমন দুঃখের দিনেও আহমদ ছফা না জিজ্ঞাসা করিয়া পারেন নাই, ‘আচ্ছা, এরা দুইজনক কি সহোদর ভাই ছিল?’ অন্য কোন কবি হইলে তিনি হয়ত আরো আগাইতেন। জিজ্ঞাসা করিতেন, ‘এই লাশ দুইটির নাম কি পাকিস্তান?’

জিজ্ঞাসার অবকাশ হয় নাই তাঁহার। তিনি পুরানা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনে দিয়া মেডিকেল কলেজ ছাড়াইলেন। আসিলেন শহীদ মিনার নাগাদ। দেখিলেন তখনো পাকিস্তানি সৈন্যরা মিনারটি একেবারে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলে নাই, তবে তাহার মাথাটা কামান দাগাইয়া উড়াইয়া দিয়াছে। কলাপাতার মতন শতচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছে মিনারের সাক্ষাৎ বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার প্রাচীরের উপর বাংলাদেশি শিল্পীদের আঁকা প্রাণবন্ত চিত্রমালা। ছবিগুলি মোটা তেরপালের উপর আঁকা ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা হইতে অবিশ্রাম কান্নার শব্দ কানে আসিতেছে। একজন চীৎকার করিয়া বলিতেছেন, এই ব্লকে একজন পুরুষও বাঁচিয়া নাই। অধ্যাপকদের মধ্যে যাঁহারা নিহত ও আহত হইয়াছেন তাঁহাদের তালিকা দীর্ঘ। ইংরেজি বিভাগের ডাক্তার জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কাঁধে গুলি লাগিয়াছিল। তাঁহাকে হাসপাতালেও নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু সেখানে বিনা চিকিৎসায় তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল দুইদিন পর।

আরও করুণভাবে নিহত হইয়াছিলেন দর্শন বিভাগের ডাক্তার গোবিন্দচন্দ্র দেব। আহমদ ছফার বিবরণ নিচে লিখিলাম: ‘আগের রাতে বর্বর নেকড়ে বাহিনী জগন্নাথ হলের নিরীহ ছাত্রদের বেপরোয়াভাবে মেশিনগানের গুলির আঘাতে হত্যা করেছিল। ইে সংবাদ ড. দেবের কানে আসা মাত্রই তিনি বেরিয়ে একদম হলে চলে এলেন।’ ছফা জানাইতেছেন, ‘তিনি সৈন্যদের নাকি মিনতি করে বলেছিলেন: ‘বাবা, তোমরা আমার নিরপরাধ ছাত্রদের মের না, একান্তই যদি মারতে হয়, আমাকেই মার।’ সৈন্যরা তাঁকে মেরেছে। তাঁর বাড়িতে গিয়ে লোকজন সবাইকে মেরেছে। এমনকি ড. দেবের লাশটাও গোপন করে ফেলেছে।’

আহমদ ছফা এক্ষণে লিখিতেছেন, তেতো হাসি হাসলাম, ইয়াহিয়া খাঁর সৈন্যরা লাশ গোপন করে অপরাধ গোপন করতে চায়। এই মহান জীবন, এই মহান মৃত্যুর সন্নিধানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। আবার খবর এল– মৃত্যু ছাড়া খবর নেই কোন– ঢাকা হলের ব্যাচেলার্স মেসে যে সাতজন অধ্যাপক থাকতেন তাঁদের একজনও বেঁচে নেই।’

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৬

Leave a Reply