মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব: আহমদ ছফার ১৯৭১

‘ইতিহাসে কোন কোন সময় আসে যখন এক একটা মিনিটের ব্যাপ্তি, গভীরতা এবং ঘনত্ব হাজার বছরকে ছাড়িয়ে যায়,’ এ কথা লিখিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। লিখিয়াছিলেন ঘটনার ২২ বছর পর। মোতাবেক ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে।

সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরো বিশদ করিয়াছিলেন, ‘একাত্তর সাল যারা দেখেছে, ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে যারা বড় হয়েছে, একাত্তর সালের মর্মবাণী মোহন সুন্দর বজ্রনিনাদে যাদের বুকে বেজেছে, তারা ছাড়া কেউ একাত্তরের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’

মহাত্মা আহমদ ছফা যদি আজ পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিতেন, দেখিতেন ১৯৭১ সালের ৪২ বছর পরও এই দেশের তরুণ, নাতিতরুণ ও আবালবৃদ্ধ জনসাধারণ ১৯৭১ সালের গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও জাতীয় নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণায় কিভাবে সোচ্চার হইতেছে। হয়ত তিনিও এই প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়া বলিতেন, ১৯৭১ অমর। ১৯৭১ মরে নাই। তিনি নিজেই লিখিয়াছিলেন ১৯৭১ সালকে ভোলা সম্ভব নহে। তাঁহার কথায়, ‘একাত্তর সাল পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু সে একাত্তরের কথা বলার চিন্তা যখন করি, আমার শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা প্রচল আতঙ্ক স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। একটা মহান পবিত্র ভীতি সর্বসত্তা গ্রাস করে ফেলে, আমার মনে হয় একাত্তর সম্পর্কে কোন কিছু আমি কস্মিনকালেও ভুলতে পারব না।’

১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ১৯৭১ সালের স্মৃতিকথায় আহমদ ছফা অন্যান্য প্রসঙ্গের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা লইয়াও কিছু মূল্যবান তথ্য আমাদের জানাইয়াছেন। তরুণ বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের সংগ্রামী ভূমিকার পাশাপাশি কিছু কিছু দুর্বলচিত্ত ও সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীর আপোসকামিতার কথাও তিনি লিপিবদ্ধ করিতে ভোলেন নাই। তিন যুগ পরেও তরুণদের পক্ষে আহমদ ছফার এই স্মৃতিকথাটি পড়িয়া দেখার কোন বিকল্প নাই। এমন অকপট সত্য উচ্চারণ করিবার ক্ষমতায় আর কোন দ্বিতীয় নাই। ‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না’ বলিয়াছিলেন আহমদ ছফা। কেন বলিয়াছিলেন বুঝিতে হইলে ‘একাত্তর: মহাসিন্দুর কল্লোল’ প্রবন্ধ হইতে খানিক সাহায্য পাওয়া যাইবে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা ‘একাত্তর: মহাসিন্দুর কল্লোল’। সেই মহাকল্লোলে মুষ্টিমেয় মধ্যম শ্রেণিভুক্ত বুদ্ধিজীবীর ভীতি, লোভ ও কাপুরুষতা চাপা পড়িয়া গিয়াছিল। মহাত্মা আহমদ ছফা লিখিতেছেন: ‘ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে ঢাকা উত্তাল মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। রাস্তাগুলো যেন নদী । মানুষ জলের ধারার মত ছুটে আসছে, কণ্ঠে গনগনে উত্তাপ, বুকে জ্বালা, হাতে লাঠি, মিছিলে মিছিলে নগরী সয়লাব। লক্ষ কণ্ঠের সম্মিলিত তূর্যধ্বনি আকাশের নীল খিলানে গিয়ে আঘাত করছে। [মায়ের পেটের] বাচ্চা পর্যন্ত মায়ের পেটে কান পেতে এ অমোঘ বজ্রনিনাদের আহ্বান শুনেছে। কবরের পূর্বপুরুষেরা অতীতের মোহনিদ্রা ভেঙ্গে যেন পাশ ফিরে জেগে উঠেছে।’

আহমদ ছফা স্বীকার করিয়া বলিতেছেন, ‘আমার জীবনে, আমাদের জীবনে, জেগে ওঠার, জাগিয়ে তোলার মাহেন্দ্রলগ্ন সেই একবারই এসেছিল। বাঙালি জাতিকে যদি হাজার বছরের একটা প্রবীণ মহীরুহ মনে করি, এই নিষ্ফল নিষ্পত্র মহীরুহে একাত্তর সালে হঠাৎ করে পত্রপল্লব  জন্ম নিয়েছিল। আকস্মিক আলো সমস্ত আকাশে ফুটে উঠেছিল। যে দেখেনি একাত্তর তাকে কি করে বোঝাই একাত্তর কি ছিল। কি করে একাত্তর আমাদের চরাচরপ্লাবী নিখিল জাগরণের অংশ করে নিয়েছিল।’

আহমদ ছফা স্মরণ করিয়াছেন ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বাংলা একাডেমীতে ‘ভবিষ্যতের বাংলা’ নামে একটি সেমিনারের আয়োজন করিয়াছিলেন তাঁহারা- মানে তরুণ কয়েকজন লেখক ও বুদ্ধিজীবী।

তিনি লিখিয়াছেন, সেদিনের সেমিনারে তাঁহারা দ্বিধা এবং জড়িমাহীন কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি যুদ্ধের মুখোমুখি, বারুদের স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের চিন্তাভাবনাকে সেভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে।’

আহমদ ছফা জানাইতেছে, ‘২৫ মার্চ দুপুরবেলা থেকে সংবাদ রটে গেছে- যে কোন মুহূর্তে ‘রাস্তায় আর্মি’ নেমে আসতে পারে। বিকেল পাঁচটার সময় শুনলাম হোটেল ইন্টার-কন্টিনেন্টাল এবং ফার্মগেটে সাদা পোশাকে আর্মি কিংবা পুলিশ গুলি করে চারজন মানুষ খুন করেছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই ঢাকা শহরে একটা গা ছমছম করা আতঙ্ক নেমে এল।’

‘রাত এগারোটার পর হবে, মাইকে খুব কাঁপা কাঁপা একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। কি বলছে তার মর্মোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারপর একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনলাম। বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরণ। কামান গোলাবর্ষণ করছিল। ভোম ভোম আওয়াজ হচ্ছে। মেশিনগানের গুলিতে যেন একটা ভয়ের অর্কেস্ট্রা রচিত হচ্ছিল। ছাদের উপর দাঁড়িয়ে গুলির আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ঝলসানো আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘর্ঘর ঘর্ঘর আওয়াজে ট্যাংক ও সাঁজোয়া গাড়ির বহর যখন তোপখানা রোড ধরে এগিয়ে আসছিল দেখলাম আমাদের অতি যত্নে গড়া সাধের ব্যারিকেডটি ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মতন উড়ে গেল।’

১৯৭১ সালের গণহত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে আহমদ ছফাও ছিলেন। তাঁহার সাক্ষ্য পাঠ করা আজও সমান শিক্ষাপ্রদ। যাহারা একাত্তর সন দেখে নাই, তাহারাও বুঝিবেন, একাত্তর কি ছিল! আহমদ ছফার লেখা পড়িলে তাঁহার লেখাও মিথ্যা প্রমাণিত হইবে– কি ছিল ১৯৭১!!

দোহাই:

১. আহমদ ছফা,“একাত্তর: মহাসিন্দুর কল্লোল”,সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, ২য় সংস্করণ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৯) , পৃ. ৭১-৮৯।

 

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৪

Leave a Reply