শাহবাগ ও ফ্যাসিবাদ

এখন সকলের মনে একটিই প্রশ্ন– ইহার পর কি? দিনের পর যেমন রাত্রি, রাত্রির পর তেমন দিন? পর বলিতে কি মাত্র এই রকম কিছু? আমরা তাহা বলিব না। আমরা বলিব পর কথাটার আরও অর্থ আছে। যেমন প্রশ্নের পর উত্তর। উত্তরের পর আবার প্রশ্ন। দিনের পর রাত রাতের পর দিনকে যদি বলি আবর্তন, তবে প্রশ্নের পর উত্তরকে কি বলিব? পরিবর্তন না বিবর্তন?

কোন এক এয়ুরোপিয়া মনস্বী কহিয়াছেন মনুষ্যের মনে যদি কোন প্রশ্নের আনাগোনা হইতে থাকে তখন ধরিয়া লইতে হইবে সেই প্রশ্নের উত্তরও তৈরি হইয়াছে। হইতে পারে নিছক খসড়া উত্তর। এই উত্তর শব্দের একটা অর্থও ‘পর’। শাহবাগ একটা প্রশ্ন তুলিয়াছে। ইহার উত্তর কোথায়? এই প্রশ্ন অর্থহীন হইবে না। এই প্রশ্ন অনর্থক মাত্র। শাহবাগের পর কি? মানে, শাহবাগের উত্তর কখন পাওয়া যাইবে? শাহবাগ একপ্রস্ত পূর্বাভাস বৈ নহে। ইতিহাসের এই সংকেত আগেও আমরা দেখিয়াছি। ইহার অর্থ ধরিতে না পারিলে আমরা ভুল করিব।

১৯৬৯ সালেও বাংলাদেশ জাগিয়াছিল। যাহারা এই জাগরণের অর্থ ধরিতে পারেন নাই, তাহারাই ব্রিটিশ জবরদখলদার ওয়ারিশস্বরূপ স্থাপিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অকালপ্রয়াণের আলামত চিনিতে পারেন নাই। তাহারাই সর্বসাধারণের দুশমন অথবা রাজাকার হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। বাংলাদেশের সর্বশ্রেণির জনসাধারণ রাজাকারদের প্রত্যাখ্যান করিয়া প্রমাণ করিয়াছেন সকল প্রশ্নেরই উত্তর থাকে। আমরা বলিব, যে প্রশ্নের উত্তর থাকে তাহাকেই বলে ইতিহাস। আর যে প্রশ্নের কোন উত্তর নাই তাহাকে আমরা সাহিত্য বলিতে পারি। সকাল বেলার সূর্য, বিকালবেলার এক ফালি মেঘ কিংবা তৃণভক্ষণরত গর্দবের ছাও।

বাংলাদেশ কাঁপানো গত ছয়দিন একটি বাণী উৎকীর্ণ করিয়াছে। ইতিহাস যে উত্তর তৈরি করে নাই সে প্রশ্নও সে উত্থাপন করিবে না। বাংলাদেশ কোন পথে হাটিবে ? প্রশ্ন একটাই। যাঁহারা এয়ুরোপিয়া এয়ুনিয়নের মতন বিজ্ঞতার পরিচয় দিতেছেন– বলিতেছেন বাংলাদেশের রাজনীতি চেতনার রূপ একটিই– ক বা খয়ের ফাঁসি। তাহারা সাহিত্যিক বটে! শাহবাগ হইতে বাংলাদেশের সার্বভৌম ইচ্ছা বা ইতিহাসের রায় জাহির হইতেছে। শাহবাগ দাবি করিতেছে– ক বা খয়ের ফাঁসি নহে, দাবি করিতেছে ফ্যাসিবাদের ফাঁসি। এই দাবি ইতিহাসের রূপান্তর বিশেষ।

বাংলাদেশে যাহারা ১৯৬৯ সালে এসলামের নাম ধরিয়া সার্বভৌম জনগণের ইচ্ছার ফাঁসি দিতে চাহিয়াছিল ১৯৭১ সাল তাহাদের ফাঁসি দিয়াছে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, তাহাদের লাশ এখনো হাঁটিয়া বেড়াইতেছে। অবাক লাগে, এই লাশগুলি আবারও ধর্মের পবিত্র নাম, সাহিত্যের রূপরসগন্ধস্পর্শ ব্যবহার করিয়া ইতিহাসের ন্যায় বিলম্বিত করিবার প্রয়াস পাইতেছে।

শাহবাগ হইতে প্রাপ্ত বার্তার সারকথা কি? দেশের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ কখনো কখনো পরীক্ষার মুখামুখি হইয়া থাকে। এখন এই পরীক্ষার ফলাফলের দিকে আমাদের তাকাইয়া থাকিতে হইবে। শাহবাগ হইতেই ফ্যাসিবাদের ফাঁসির দাবি উঠিয়াছে। নতুন দিনের আলোর মতন পরিচ্ছন্ন সেই দাবি।

মনে রাখিতে হইবে, শাহবাগের সমবেত জনগণ ফ্যাসিবাদের ফাঁসি করিতেছে। নিছক ব্যক্তিবিশেষের নহে। ফ্যাসিবাদের সমর্থক যে এদেশে এখনো কেহ কেহ আছেন– একদিকে এসলামের নামে, আরেকদিকে সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ভড়ং দেখাইয়া– তাহাই বিস্ময়ের! শাহবাগ এই দুশমনদেরও– জাতীয় ঐক্যের পথে কাঁটা বিছানো এই দুশমনদেরও– ইতি দাবি করিতেছে।

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

 

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২

Leave a Reply