শাহবাগের ভবিষ্যৎ কি?

সর্বসাধারণের মনে সওয়াল দেখা দিয়াছে। তৃতীয় ও চতুর্থক্রমে অন্যান্য রায়ের শাস্তিও কি এই পরিমাপে কমিতে থাকিবে? আন্দোলনের শরিক জনসাধারণ প্রশ্ন করিতেছেন আদালতের এই রায়ের সহিত ক্ষমতাসীন সরকার একমত কিনা। সরকারের শীর্ষ হইতে এই মর্মে কোন বিবৃতি আজ পর্যন্ত পাওয়া না গেলেও দেখা যাইতেছে সরকারি দলের অনেকেই মঞ্চে আসিয়া বলিতেছেন এই দ্বিতীয় রায়ে তাহারাও ক্ষুব্ধ। শুদ্ধ সরকারের মন্ত্রীরাই নহেন, বেসরকারি সংগঠন ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ বা টিআইবি পর্যন্ত বলিয়াছেন বিচারটা যথার্থ হয় নাই।

এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন চলিতেছে। আন্দোলনের সহিত বহু মানুষ একাত্ম হইয়াছেন। অনেকে বলিতেছেন ন্যায়ের খাতিরে অপরাধীর যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে হইবে। এখন প্রশ্ন হইতেছে তাহা কি করিয়া সম্ভব। আইন বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন সর্বসাধারণের দাবি মানিতে হইলে সর্বোচ্চ আদালতের দিকে তাকাইতে হইবে। ধরা যাউক, সর্বোচ্চ আদালত একটা বিহিত করিলেন। ঘরের ছেলেমেয়েরা তখন ঘরে ফিরিয়া যাইবেন।

আর সর্বোচ্চ আদালতের হাতেও যদি তাহার ন্যায়বিচার না পান, তাহারা কি করিবেন? এই প্রশ্নটা এখনই করিবার আবশ্যক নাই। কিন্তু একটা সময় তো আসিবে যখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া লইতে হইবে।

তাই জানিতে ইচ্ছা হয় সরকারের ইচ্ছা কি আর জনসাধারণেরই বা ইচ্ছা কি। শাহবাগ মোড় হইতে জনসাধারণের ইচ্ছা কিছু পরিমাণে প্রকট হইয়াছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ একটি মীমাংসিত বিষয় বলিয়া এখনো বলা যাইতেছে না। যদি মীমাংসিতই হইত তাহা হইলে এই নতুন আন্দোলনের প্রয়োজন হইত না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সশস্ত্র গণযুদ্ধের মধ্যস্থতায়। এই যুদ্ধ বাংলাদেশে নতুন জাতীয় চেতনার উদ্বোধন করিয়াছিল। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের অমীমাংসিত জাতীয় সমস্যা সমাধানের একটা পথ বাতলাইয়া দিয়াছিল। সে পথ ছিল জাতীয় ঐক্যের পথ, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনার পথ। আজ তাহার কি দশা দাঁড়াইতেছে?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সহিত যাহারা একমত হয়েন নাই তাহারা জাতীয় ঐক্যের এই ধর্মনিরপেক্ষ পথকেই বর্জন করিয়াছিলেন। শুদ্ধ তাহাই নহে তাহারা দখলদার বিদেশি বাহিনীর সহিত একজোট হইয়াছিলেন। শরিক হইয়াছিলেন সকল যুদ্ধাপরাধের।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পরও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম তাহার লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারিল না কেন? যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আদালত গঠন সেই লক্ষ্যে পৌঁছাইবার পথে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলিয়া জনসাধারণ ধরিয়া লইয়াছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিশাবে গত ৪০ বছর বিরাজ করিতেছে। এই যুদ্ধাপরাধের বিচার করিতে না পারায় মনে হইতেছে দেশ এখনো স্থির করিতে পারে নাই কোন পথে সে আগাইবে। মীমাংসা বিলম্বে হইলেও করিতে হইবে। শাহবাগ হইতে যে বার্তা পাওয়া যাইতেছে তাহা আশার সূচনা করিয়াছে। একমাত্র গণআন্দোলনের মধ্যেই নিহিত আছে যুদ্ধাপরাধের পূর্ণ ও ন্যায্য বিচারের সম্ভাবনা।

কোন এক মনীষী বলিয়াছিলেন ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনা যেন দুইবার করিয়া ঘটে। প্রশ্ন হইতেছে দ্বিতীয় বারে কখনো প্রথম বারের হুবহু আবৃত্তি হয় কিনা।

একটি পত্রিকা শিরোনাম করিয়াছে, ‘শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’। তাহারা ভুল করিয়াছেন। শাহবাগে যাহা দেখা দিয়াছে তাহাকে সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশ বলিয়া গ্রহণ করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। এই প্রকাশ নিছক ফাঁসির দাবি লইয়া ক্ষান্ত হইবে না।

এক্ষণে সর্বসাধারণের ইচ্ছা যদি হয় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের অবসান, তবে আদালতকে সেই ইচ্ছার সহিত পরিচিত হইতে হইবে।

শাহবাগ মোড়ের তরুণ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কি হইবে তাহা আদালতের রায়ের উপর নির্ভর করিতেছে না। বরং মনে হইতেছে এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কি দাঁড়াইবে তাহা নির্ভর করিতেছে এই আন্দোলনের ব্যাপকতার উপর।

৯ ফেরুয়ারি, ২০১৩

 

৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১

Leave a Reply