গুন্টার গ্রাসের কবিতা: যে কথা না বললেই নয়

গুন্টার গ্রাসের এই কবিতা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে জার্মানি ও ইসরায়েলে। কবিতাটি ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র ও তার জনগণের প্রতি বিদ্বেষের আগুন উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিককে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। স্বদেশ জার্মানিতেও তুমুল সমালোচিত হয়েছেন গ্রাস। পরমাণু শক্তি অর্জন নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ কবিতা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল-জার্মানি-ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দুনিয়াতেই। জার্মানির স্যুডডয়চে সাইটুং পত্রিকা গত পাঁচই এপ্রিল গ্রাসের কবিতাটি প্রকাশ করে। ‘ Was gesagt werden muss’ শিরোনামে জার্মান ভাষায় লেখা কবিতাটি ইতোমধ্যেই ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

grass-p.jpg
সলিমুল্লাহ খান কবিতাটি মূল ভাষা থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন।

 

 

যে কথা না বললেই নয়

এতদিন কেন চুপ মেরে আছি, কেন মুখ খুলিনি এত দীর্ঘ দিন
একটা খেলা চলছে–যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মহড়া চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে–
এ খেলার শেষে আমরা বেঁচে যাই তো হবো পাদটীকা।

খেলার নাম অতর্কিতে হামলার অধিকার
হামলাকারী– এখন জনৈক বাচালের ডাকে সমবেত–
ইরানের জনজাতি ধুলায় মিশিয়ে দেবে
কারণ তার সন্দেহ
তার ক্ষমতার বলয়সীমায় পরমাণু বোমা তাতাচ্ছে ইরান।

অথচ অনেক দিন হলো আর একটা দেশের হাতে পরমাণু শক্তি মজুত আছে
আর সে ক্ষমতা বাড়ছেও দিনে দিনে
তার উপর কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, কেননা তা পরিদর্শনের
আওতার বাইরে
সে দেশের নামটা মুখে আনতে কেন রাজি নই আমি?
সারা দুনিয়া খেলছে এই লুকোচুরি খেলা
আমিও মেরেছি চুপ এই লুকোচুরির তলায়
আমার তো মনে হয় এই নিশ্চুপ থাকার চেয়ে
বড় মিথ্যাচার বড় কেলেঙ্কারি আর কিছু নাই
এই মিথ্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করো দেখি তুমি
দেখবে অভিশাপ ভয়াবহ খড়গ আসছে নেমে তোমার মাথায়
তুমি ‘এয়াহুদি বিদ্বেষী’।

আমার দেশ অপরাধী– কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে সে
বহু বহুবার– অপরাধ তার তুলনাবিহীন।
আর আজ ভাগ্যের ফেরে– হয়তো নিছক ব্যবসাজ্ঞানে
অথচ মুখে বলছে ক্ষতিপূরণ হিসাবে– ঘোষণা করেছে
ইসরায়েলকে আরো এক ডুবোজাহাজ বেচবে সে
দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়
জাহাজ থেকে, ছোড়া যাবে সে দেশপানে
যে দেশে প্রমাণ নাই পরমাণু বোমা আছে
শুদ্ধ আছে ভয় আর ভয়ই তো অকাট্য প্রমাণ।
তাই আমাকে বলতে হবে যে কথা না বললেই নয়।

তো এদ্দিন, আজতক, কেন চুপ মেরে আছি আমি?
আছি ভয়ে, ভয় জন্মদাগের
এ দাগ কোনদিন মুছবার নয়
এ দাগের ভয়ে এদ্দিন ইসরায়েলের মুখের উপরে
করতে পারিনি আমি সত্য উচ্চারণ
কারণ তার সনে বাঁধা আছি আমি চিরদিন
থাকতেও চাই বাঁধা হয়ে।

যে কথা বলতে পারিনি তো সে কথা বলছি কেন এখন?
এখন বয়স হয়েছে আমার, ফুরিয়ে এসেছে কলমের কালি
এমনিতেই ভাঙাচোরা বিশ্বশান্তি
আর সে বিশ্বশান্তির পথের কাঁটা
হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েল
এ কথা না বললেই নয়, বড্ড দেরি হয়ে গেছে
বলবার সুযোগ আর নাও থাকতে পারে আর।

আরও এক কারণে বলছি আজ
আমরা জার্মান জাতি, অপরাধভারে নত হয়ে আছি
সামনে আরো এক অপরাধ ঘটতে চলেছে
আর আমরাও হতে চলেছি তার ভাগদার সমান অপরাধী
যে অজুহাতে এতদিন পার পেয়ে গেছি
তাতে দালালি আর হবে না হালাল।

মাপ করবেন, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না আজ
কেননা পশ্চিমা দুনিয়ার ভণ্ডামি দেখতে দেখতে আমি হয়রান
আশা করছি আপনারাও–আরো অনেকেই
মুখে আঁটা কুলুপ খুলে নিরবতা অভিশাপ মুক্ত হবেন
দেখতে পাচ্ছেন এগিয়ে আসছে বিপদ
যে দেশের কারণে হাত জোড় করে সে দেশকে বলুন
বলপ্রয়োগ করবেন না
আর দাবি তুলুন
দুই দেশের সরকারকেই বলা হোক
ইসরায়েলি পরমাণু শক্তি
আর ইরানি পরমাণু ক্ষেত্র
দুইটাই থাক মহাজাতিক সংঘের অবাধ ও স্থায়ী নজরে।

কি ইসরায়েলি কি ফিলিস্তিনি সকলের–
আমাদের সকলের– মায় এই উন্মত্ত ভূখণ্ডের ঘরে ঘরে
যারা করি শত্রুর সঙ্গে করি গলাগলি বসবাস
তাদের সকলের বাঁচবার এ ছাড়া আর পথ নাই।
নাই শুদ্ধ তাদেরই নয়, আমাদের সকলের।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১১ এপ্রিল ২০১২

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.