ভাষার নির্বন্ধ: পরাধীনতার ঐতিহ্য

অন্ত্যমিল আর গদ্যের মতন ভয়াল কলায়
মধ্যম আর অধমে তফাত থাকে না বজায়।
—ফরাশি প্রবাদ

আমাদের দেশে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা (কিংবা অব্যবস্থা) লইয়া অনেক বিতর্ক আছে কিন্তু ছেলেমেয়েদের কোন ভাষায় কি শিক্ষাটা দেওয়া হইতেছে তাহা লইয়া দৃশ্যত কোন বিচার নাই। এ দেশের উচ্চশ্রেণির ছেলেমেয়েরা একপ্রকার ব্যতিক্রমবিহীন অবস্থায় বিরাজ করে। তাঁহারা সকলেই ইংরেজি ভাষার মধ্যস্থতায় পড়াশুনা করিতেছে। দেখা যাইতেছে, তিরিশ কিংবা ততোধিক লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করা যাইতে পারে, কিন্তু ইংরেজি ভাষার জায়গায় বাংলাকে (অর্থাৎ দেশের ভাষাকে) শিক্ষার বাহন করা যায় না। ইহার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।

পরাধীনতার যুগের গোড়া হইতেই আমরা দুইটা যুক্তি শুনিয়া আসিতেছি। এক যুক্তি অনুসারে পরাধীন দেশের ভাষা মোটেও উন্নত, বিকশিত নহে—অন্তত যে সকল দেশ আমাদের দেশটি দখল করিয়াছে সে সকল দেশের ভাষার তুলনায় এ দেশের ভাষা অনুন্নত, অবিকশিত। ইহাতে উচ্চশিক্ষা দেওয়া যায় না। এয়ুরোপ মহাদেশ হইতে আগত প্রত্যেকটি বিজয়ী জাতির প্রতিনিধিরা একই যুক্তি দেখাইয়াছেন। শুদ্ধ ইংরেজি বা ফরাশি নহে—ইন্দোনেশিয়ায় কি মালয়েশিয়ায় ওলন্দাজ জাতি আর অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক কি গিনি-বিসাউ দেশে পর্তুগিজ জাতি—সকলেই বলিয়াছেন, এয়ুরোপিয়া ভাষায় যুক্তি দিয়া কথা বলা যায়। এই ভাষাগুলিতে মানুষ বিমূর্ত বা আকার-ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় লেখাপড়া চালাইতে পারে—উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার পরাজিত জাতিগুলির ভাষার সেই ক্ষমতা নাই।

কথাগুলি সত্য হইলেও হইতে পারে। কিন্তু তাহাতেই বিজয়ী জাতি কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ করেন নাই। তাঁহারা আরও একটা যুক্তি দেখাইয়াছেন। এই দোসরা যুক্তি অনুসারে, বাংলার মত বড় বড় জাতীয় ভাষাগুলি নাগা কিংবা চাকমা জাতির ভাষার নাহান ছোট ছোট আঞ্চলিক ভাষা কিংবা ছোট ছোট জাতির মাতৃভাষার বড় ক্ষতি করিয়া থাকে। সুতরাং এই সকল আঞ্চলিক ভাষায় যাঁহারা কথাবার্তা বলিয়া থাকেন তাঁহাদের একমাত্র রক্ষাকবচ এয়ুরোপিয়া বিজয়ী জাতির কোন ভাষা গ্রহণ করা। যেমন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হিন্দির কর্তৃত্ব হইতে বাঁচিবার জন্য নাগাজাতির রাজ্যে ইংরেজিকেই রাজ্যভাষার মর্যাদা দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে একটা সমস্যার সমাধান হইলেও আরেকটি সমস্যার স্বাস্থ্য কিন্তু মোটাতাজা হইতেছে। ইংরেজি হিন্দি সারাইবে বুঝিলাম, কিন্তু ইংরেজি সারাইবে কে!

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায়, সেখানে একদা বিজয়ী ওলন্দাজদের বংশধরগণ ‘আফ্রিকানস’ নামে যে ভাষাটির সৃষ্টি সম্ভব করিয়াছিলেন সেই ভাষাটি এক্ষণে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির সাক্ষাৎ পিছু হটিয়া যাইতেছে। শুদ্ধ আফ্রিকানস নহে, আফ্রিকার শত শত ছোট  জাতির ভাষাও একই পরিস্থিতির মুখে পড়িয়াছে। ইহার কোন প্রতিকার নাই। বাংলাদেশের বড়লোকেরাও—কেতাবি ভাষায় বলিতে উচ্চশ্রেণির লোকেরা—এখন বিনাবাক্যে ইংরেজির মধ্যস্থতায় তাঁহাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখাইতেছেন। বাংলা এখন তাঁহাদের চোখে ছোটলোকের—রিকশাওয়ালা বা পোশাক শ্রমিকের—ভাষা বিশেষ। ইহার কি কোন প্রতিকার আছে!

কখনও কখনও আরেকটি—খানিক দুর্বলতর—যুক্তির আওয়াজও আমাদের কানে আসে। এই যুক্তির নাম বাইলিঙ্গুয়ালিজম বা ‘দ্বিভাষা ব্যবসায়’। এই যুক্তির বাদীগণ বলেন, ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে দুই ভাষায় শিক্ষালাভ করিলে ক্ষতি কি! আট-দশটি ভাষা শিখিলেও কোন ক্ষতি নাই, বরং লাভই আছে তাহাতে। সমস্যা হইতেছে, কোন ভাষাটি শিক্ষার বাহন বা প্রচলিত কথায় ‘শিক্ষার মাধ্যম’ হইবে তাহাই। প্রশ্নটা যেখানে অগ্রাধিকারের সেখানে দোভাষী কিংবা ত্রিভাষী শিক্ষার কথাই উঠিতেছে না। আমাদের দেশে উচ্চশ্রেণির শিক্ষা ইংরেজিকেই অগ্রাধিকার দিয়াছে। কারণ তাঁহারা পেছনে অনেকদূর পর্যন্ত দেখিতে পাইতেছেন। পেছনেরটা আবার তাঁহাদের সামনেও দাঁড়ান। যেখানে সারা পৃথিবীতে ইংরেজিই একমাত্র কিংবা একনম্বর ভাষা সেখানে জাতীয় বা দেশীয় ভাষায় শিক্ষা দিয়া সময় নষ্ট করা কেন? ইঁহারা নিজেদের যুক্তিতে এতই স্থিরকাম যে আপনার সহিত কথাবার্তা বলিয়া সময় নষ্ট করিতেও নারাজ।

অল্প কিছুদিন হইল মনোবিশ্লেষণ নামক শাস্ত্র লইয়া একটু আধটু নাড়াচাড়া করিতেছি। দেখিলাম সেই শাস্ত্রের একজন মনীষী—ফরাশিদেশের লোক ইনি—নাম জাক লাকাঁ—কহিতেছেন, এই জাতীয় প্রশ্নে যাঁহাদের কোন প্রশ্ন থাকে না তাঁহারা বিকৃতকামী বিশেষ—ইংরেজিতে ইঁহাদের বলে পার্বার্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়র অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য বলিয়াছেন, ইঁহারা ‘কাগজে-কলমে’ স্বীকার করেন বটে বাংলা প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু ‘কাজে-কর্মে’ ইংরেজিকেই রাষ্ট্রভাষার উপরে স্থান দেন—অর্থাৎ ইঁহাদের মুখে একটা ভাব, মনে একটা ভাব। জাক লাকাঁর প্রস্তাব অনুসারে, এই ভাবটাই ‘বিকৃতকাম’ নামক গঠনের লক্ষণ।

‘বিকৃতকাম’ কাহাকে বলে? উদাহরণস্বরূপ সমকামের কথা বলা যাইতে পারে। মনোবিশ্লেষণ শাস্ত্রের প্রবর্তক মহাত্মা সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলিতেন সমকাম জিনিশটা বিকৃতকাম বিশেষ। ফ্রয়েডের অনুসারী জাক লাকাঁ পুনশ্চ কহিতেছেন, সমকাম জিনিশটা বিকৃতকাম অন্য কারণে। সমকাম ‘প্রকৃতির শাসন’ বিরোধী বলিয়াই বিকৃতকাম নহে। এমনকি সমাজের অনুশাসন পরিপন্থী বলিয়াও নহে। এই কামকে তিনি বিকৃতকাম বলিতেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। লাকাঁর মতে, প্রকৃতি হইতে সংস্কৃতিতে পৌঁছিবার যে পথ—যাহার ফ্রয়েডপ্রদত্ত নাম ‘ইদিপাসের বাসনা’—সে পথের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বলিয়াই সমকাম বিকৃতকাম উপাধি পাইতেছে। দৃষ্টান্তের স্থলে তিনি দেখাইয়াছেন, প্রাচীন এয়ুনানে বা গ্রিসদেশে সমকাম সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল—তারপরও তাহার ‘বিকৃতকাম’ অভিধা অসার্থক হয় নাই। সমকাম ‘ইদিপাসের বাসনা’কে অতিক্রম করিতে চাহে বলিয়াই বিকৃতকাম।

এই বিকৃতকামের আরও বিশ্লেষণ চলিতে পারে, কিন্তু এক্ষণে বলা যাইতে পারে ইহার কোন চিকিৎসা বা উপশম নাই। কেন নাই? প্রথম কারণ, বিকৃতকামী কখনও স্বীকার করেন না তাঁহার কামনা বিকৃত। নিজের যুক্তিতে তিনি এতই অটল এতই অবিচল যে তিনি কোন বিশ্লেষণের প্রয়োজনই অনুভব করেন না। তো তাহার হাত হইতে পরিত্রাণ খুঁজিতে হইবে অন্য প্রস্তাব অনুসারে। এই অন্য পথ বা অন্য প্রস্তাব কি তাহা আমি একটা উদাহরণের সহিত বুঝাইতে চাহিব।

পশ্চিম এশিয়া মহাদেশে এই মুহূর্তে যাহা ঘটিতেছে তাহার এক আদি ঘটনার নাম ইসরায়েল অথবা ফিলিস্তিন সমস্যা। ১৯৯০ সালের পর কোন এক সময়ে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের মধ্যস্থতায় সেখানে ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ শুরু হইয়াছিল। অনেক বিষয়ে দুই পক্ষ একমতও (কিংবা প্রায় একমত) হইয়াছিলেন। কয়েক দফা ঐকমত্যের পূর্বে ‘যুগান্তকারী’ প্রভৃতি বিশেষণও যুক্ত করা হইয়াছিল। যেমন ইসরায়েল কর্তৃক পিএলও বা ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার অস্তিত্ব স্বীকার করা আর ফিলিস্তিন কর্তৃক ইসরায়েল রাষ্ট্রকে কবুল করা। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর আর গাজা উপকূলে যে সকল জায়গা দখল করিয়াছিল সেখানকার কিছু কিছু এলাকায় ‘ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ’ নামে সংস্থা প্রতিষ্ঠার এজাজত পর্যন্ত শান্তি প্রক্রিয়ার অংশস্বরূপ দেওয়া হইয়াছিল। ইজ্জাক রবিন আর এয়াসের আরাফাতের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয় ছিল এই শান্তি প্রক্রিয়ারই বহুলালোচিত বহুজাতিক স্বীকৃতি।

কিন্তু আজ কত বৎসর হইল? একশত বছরের চারিভাগের একভাগ তো বটেই। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ঘরে ফেরার (কিংবা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার) কোন ব্যবস্থা তো হয় নাই। বরং তাঁহারা যে তিমিরে ছিলেন অবস্থা সেই তিমিরেই ডুবিয়া রহিয়াছে। উদ্বাস্তুদের বাড়িঘর গুঁড়াইয়া দিয়া, তাঁহাদের জলপাই বাগান উচ্ছেদ করিয়া, তাঁহাদের জায়গাজমি কাড়িয়া লইয়া সেখানে ফি বছর ইসরায়েলিদের জন্য নতুন নতুন বসতির পত্তন করা হইতেছে। এয়াহুদি-নাসারা-মুসলমান তিন ধর্মজাতিরই পবিত্র তীর্থ জেরুজালেম শহর এখনও ইসরায়েলের হাতে। কোন বড় সমস্যার—একটারও—সমাধান হয় নাই। কেন হয় নাই? কারণ একটাই—গোটা দেশটা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দখলে আছে। একটা জাতির জনসাধারণ আরেকটা জাতির বন্দুকের নলের ডগায় বসিয়া আছে। এই মূল সত্যটার দিকে চোখ না দিয়া যত বিশ্লেষণই করা হউক না কেন কোন ফল হইবে না।

জো সাক্কো নামক একজন জাপানি শিল্পী ১৯৯১-৯২ সালে কিছুদিন ইসরায়েল কর্তৃক দখল করা পশ্চিম তীরে এবং গাজায় পরিভ্রমণ করিতেছিলেন। পরিভ্রমণ মানে মাস দুই সেখানে তিনি বসবাস করিয়াছিলেন। দেখিয়া শুনিয়া একদিন তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে এই কথাগুলিও ছিল: ‘যতদিন না এই মূল ঘটনাকে—ইসরায়েলি দখলদারিকে—আন্তর্জাতিক আইনের এবং মূল মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলিয়া বিচার করা হইতেছে ততদিন ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি জাতির সদস্যরা একে অপরকে হত্যা করিতেই থাকিবে—হোক তাহা সীমিত পরিসরের খুনাখুনি কি দুনিয়া কাঁপান রক্তারক্তি—হোক তাহা আদমবোমার বেশে কি হেলিকপ্টারযোগে গোলাবর্ষণ কিংবা বোমারু জেটবিমানের মধ্যস্থতায় করা হত্যাকাণ্ড।’

আমার আজিকার এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধের উপসংহারও এই উদাহরণের অনুগামী। যতদিন পর্যন্ত না আমাদের দেশেও পরাধীনতার ঐতিহ্য অটুট থাকিবে ততদিন দেশে সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার ঘটিবে না। বিদেশি ভাষা শিক্ষা আমাদের জীবন সংগ্রামের হাতিয়ার—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু বিদেশি ভাষার মধ্যস্থতায় শিক্ষা দিয়া আমাদের দেশে কোনদিনই সর্বজনীন কিংবা ‘উত্তম’ শিক্ষা প্রবর্তিত হইবে না। যাহা হইতেছে তাহা ‘মধ্যম’ শিক্ষা। ‘মধ্যম শিক্ষা’ বলিয়া কিছু নাই। ‘মধ্যম’ শিক্ষা মানেই শেষ বিচারে ‘অধম’ শিক্ষা।

শিক্ষার ‘মাধ্যম’ কথাটা যখনই আমার কানে আসে আমি তখনই শুনি শিক্ষার ‘মধ্যম’। মানে করি মধ্যম মানের শিক্ষা। তখনই আমার কানে আসে ‘উত্তম-মধ্যম’ কথাটাও। স্বাধীন দেশের শিক্ষার লক্ষ্য হইবে ‘উচ্চশিক্ষা’—মাত্র ‘উত্তম-মধ্যম’ শিক্ষা নহে। বর্তমানে এদেশে যাহা চলিতেছে তাহাকে উত্তম-মধ্যম অর্থাৎ মারধর শিক্ষার অধিক বলা যায় না। পরীক্ষা আর পরীক্ষা, শেষ পরীক্ষা আর ভর্তি পরীক্ষা! উত্তম-মধ্যম আর কাহাকে বলে!

‘মধ্যম’ শিক্ষা কখনও স্বাধীন দেশের শিক্ষার লক্ষ্য হইতে পারে না। কারণ কি জানেন? শিক্ষায় এবং সাহিত্যে মধ্যম বলিয়া কিছু থাকিতে চাহে না। শেষ পর্যন্ত তাহা অধম শিক্ষা বা অধম সাহিত্যে পরিণত হয়। এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত শেষ পর্যন্ত মধ্যমে আর অধমে কোন তফাত থাকে না।

১২ মার্চ ২০১৮

এনটিভি অনলাইন, ১৩ মার্চ ২০১৮
বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ মার্চ, ২০১৮

Leave a Reply