তারেক মাসুদ: বিস্মৃতি ও স্মৃতি

What you and I hear are different.
You hear the sound
Of closing doors but I of doors that open.
[তুমি যাহা শোন আমিও তাহাই আজ
দরজা বাঁধার শব্দ পাচ্ছ, আমি খোলার আওয়াজ।]
—পারস্য কবিতা

এত অকালে তারেক মাসুদ মৃত্যুবরণ করিবেন, তাহা কোনদিন ভাবি নাই। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, খোদা করেন আর। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়া তিনি দেশের তো বটেই, আমার মতন অভাজন ছাত্রেরও অনেক ক্ষতি করিয়া গিয়াছেন। তারেকের কাছে আমার অনেক ঋণ— এই ঋণ পরিশোধ করিবার কোন উপায়ও তিনি রাখিয়া যান নাই।

তারেকের অকালমৃত্যুর পর পরই আমি যে দুইটি ছোট নিবন্ধ লিখিয়াছিলাম তাহাদের একটির নাম রাখিয়াছিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’— অন্যটির অভিধা ছিল ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’। প্রকৃত প্রস্তাবে তারেক প্রথমে আমার বন্ধু ছিলেন, তবে বন্ধুমাত্র ছিলেন না— তিনি ধীরে ধীরে আমার শিক্ষক হইয়া উঠিয়াছিলেন। শুদ্ধ চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে নহে, চিরায়ত ভারতীয় সঙ্গীত ও শিল্পকলা বিষয়েও তিনি আমাকে নানাভাবে শিক্ষিত করিতে চাহিয়াছিলেন।

দুঃখের মধ্যে, আমাদের বন্ধুত্বের আয়ু সুদীর্ঘ হইতে পারে নাই। আমি শেষের দিকে বুঝিতে শুরু করিয়াছিলাম— কি করিয়া জানি— তাঁহার চিন্তার প্রগতি দ্রুততর হইয়া উঠিতেছে। তিনি নিরন্তর আমার শিক্ষক হইয়া উঠিতেছেন। আর আমি খেই হারাইয়া ফেলিতেছি। আজিকার লেখায় সেই বেদনার কাহিনী পুরাপুরি লিখিতে পারিব না। এই লেখা শুদ্ধ তাঁহার স্মৃতির প্রতি একজন পুরাতন ছাত্রের (যিনি কিছুদিন বন্ধুত্বের মর্যাদায়ও বৃত হইয়াছিলেন) ভক্তির নিদর্শনমাত্র।

১.

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়াছিলাম ইংরেজি ১৯৭৬ সালে। একই বছরে তারেক মাসুদও আমাদের দেশের এই উচ্চতম বিদ্যালয়ে আসন লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে— সেই বছর বলিব না— সেই যুগে যাঁহারা পড়িতে আসিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদকেই আমি শ্রেষ্ঠ বন্ধু জ্ঞান করিয়াছিলাম। কি বিদ্যায় কি বিনয়ে তারেকের সমকক্ষ আমার বন্ধুদের মধ্যে দ্বিতীয় আর কেহ ছিলেন না।

ঘটনাচক্রে আমাদের এই বন্ধুত্বের অনুঘটক ছিলেন আমার অপর বন্ধু কবি মোহন রায়হান। তবে কালক্রমে এই কাহিনীর প্রধান ঘটক হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন আমাদের— তারেক মাসুদ ও আমার— উভয়েরই শিক্ষক আহমদ ছফা। তারেকের সহিত দেখা হইবার কিছু আগেই আহমদ ছফার সাক্ষাত্ লাভের সৌভাগ্য আমার হয়। প্রথম সাক্ষাতের দিন তারেক মাসুদ বলিলেন, তিনিও আহমদ ছফার অনুরাগী। তখনই আমাদের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হইতে শুরু করে। সেই কুসুমের মধ্যে একটা কাঁটাও বিন্ধিয়া ছিল। আহমদ ছফা— একদা ১৯৭০ সালের শেষে কিংবা ১৯৭১ সালের গোড়ায়— ‘স্বাধীন বাংলা লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামক সংগঠন একটা দাঁড় করাইয়াছিলেন। ১৯৭২ সালে সেই সংগঠন নতুন নাম— বাংলাদেশ লেখক শিবির— লইয়া কায়েমমোকাম হয়। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়িয়া সেই সংগঠন ছাড়িতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১৯৭৬ সালের পর যাঁহারা এই সংগঠন চালাইতেন আমরা দেখিয়াছি তারেক মাসুদও সেই ডাকাতদের সহিত যুক্ত হইয়াছিলেন। তবে আমরা তখনও ছাত্রমাত্র।

তারেক মাসুদ, তাঁহার সেকালের নিত্যদিনের বন্ধু পিয়াস করিম এবং আরও কয়েকজন মিলিয়া তখন ‘সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ওয়াচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা সংক্ষেপে ‘ক্যাটোয়া’ নামে একটি সংগঠন গঠিয়াছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌলতে ঐ সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে নাম ছাপা হইত জনৈক অধ্যাপকের। কিন্তু সকল কাজের কাজি ছিলেন তারেক মাসুদ। বলা নিষ্প্রয়োজন নহে, আহমদ ছফা ঐ স্বনামধন্য অধ্যাপকের নাম শুনিলেই দুর্গাপূজার উপযুক্ত খড়গ হাতে লইতেন। আমরা এই অসুখের কিছুটা বুঝিতাম, কিছুটা অবুঝ থাকিতাম।

ইহার পর আসিল শেখ মোহাম্মদ (ওরফে এস.এম.) সুলতানের জমানা। আহমদ ছফা ততদিনে সুলতান অধ্যায়ে হাত দিয়াছেন, তখন তারেক মাসুদও এই মহান শিল্পীর কদর করিতে শিখিয়াছেন। এই মহান শিল্পীর জীবন ও শিল্প লইয়া তারেক মাসুদ ‘আদমসুরত’ ছবিটি যখন সৃষ্টি করিয়াছিলেন তখনও আমরা ভাল বন্ধু ছিলাম। এই ছবি দেখিয়া আমার চোখ খুলিয়া গিয়াছিল। এই ছবির নামের মধ্যেই তারেক মাসুদের প্রতিভা জ্বলজ্বল করিতেছিল। শুদ্ধ প্রতিভা কেন, সাহসও কম নহে। একশ্রেণির মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তখন প্রচার করিতেন, ‘আদমসুরত’ নামের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! অনেকদিন— মানে তারেকের এন্তেকালের— পরে জানিলাম, ঐ ছবির নির্মাণকাহিনী লইয়া তারেক আরেকটা ছবি বানাইয়াছিলেন। তাহাতে দেখিলাম আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের নাম পর্যন্ত আছে, অথচ আহমদ ছফার কথা তারেক মাসুদ একদম ভুলিয়া গিয়াছেন।

ইহার পর নিয়তি আমাদিগকে যার যার পথে লইয়া গেল। তারেক গেলেন সিনেমার পথে, আমি চলিলাম আর একটু সুদূরে— মার্কিন মুলুকে। ততদিনে আমাদের পরিচয়ের এক দশক পার হইয়া গিয়াছে। একদিন খোদ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলেই তারেক মাসুদের ভাবীকালের সহধর্মিণী শ্রীমতী ক্যাথারিন শাপিরের দেখা পাইলাম। জানিতে পারিলাম, তারেক মাসুদও মার্কিন মুলুকে হিজরত করিবেন। জানিতে আরও পারিলাম, ক্যাথরিনের বাবা একজন স্বনামধন্য দার্শনিক— জোনাথন শাপির— যাঁহার গদ্য আমিও পড়িয়াছি। চিদাত্মা কার্ল পপার কিংবা তাঁহার কড়া বিচারক পল ফেয়ারাবেন্দের নাম যাহারা একদা মুখে লইয়াছেন তাহারা এই নামটিও শুনিয়া থাকিবেন।

তারেক মাসুদ বয়সে আমার বছর দুইয়েকের বড় ছিলেন। বলাবাহুল্য, প্রজ্ঞায় আরো। তিনি বাল্যবয়সে পড়িয়াছিলেন আমাদের দেশে যাহাকে বলে ‘কওমি মাদ্রাসা’ সেই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফলে তিনি মাঝে মাঝে দুইচারি পঙিক্ত ফারসি কবিতা আমাদের শোনাইতেন। এই বিদ্যা তিনি পরেও কাজে লাগাইয়াছিলেন। আরো ভালো কথা, একালের ইরানি সিনেমায় যাঁহারা নবযুগ আনিয়াছিলেন তাঁহাদের পুরোভাগে আছেন সম্প্রতি পরলোকগত আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁহার সহিত তারেক নিশ্চয়ই ফারসিতে বাতচিত করিয়াছিলেন। কিয়ারোস্তামির জীবনকাহিনী লইয়া— ফারসি নহে— ফরাশি ভাষায় লেখা একটা বই তারেক একবার আমাকে পড়িতে দিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু নিয়তির টানে সেই বই আমার আর হাতে আসে নাই। আমার ধারণা, আব্বাস কিয়ারোস্তামির গল্প বলার ধরনটাই তারেক মাসুদ ভালোবাসিয়াছিলেন। কিন্তু সত্যজিত রায়ের ছায়া হইতে ছাড়া পাওয়ার জন্য ঐ ভালোবাসা হয়তো পর্যাপ্ত ছিল না। অন্তত ‘মাটির ময়না’ পর্যন্ত আমলে লইলে আমার ধারণার গোড়ায় হাত দেওয়া যাইবে।

আমাদের মার্কিন প্রবাসের প্রথম দিকে তারেক মাসুদ ‘স্ট্রান্ড বুকস’ নামক একটা বড় বইয়ের দোকানে কাজ করিতেন। ঐ দোকানটা ছিল সম্ভবত নতুন ইয়র্ক শহরের সবচেয়ে বড় পুরানা বইয়ের আড়ত। সেখানে নতুন পুরাতন সকল বই টাকায় আধুলিমাত্র দিয়া কিনা যাইত। আর কর্মচারী হইলে আধুলির আধুলি অর্থাত্ টাকায় সিকি খরচ করিয়া কিনিবার সুবন্দোবস্তও ছিল। তারেক মাসুদ আমাকে সেই দোকান হইতে ফিলিস্তিনি মহাত্মা এডোয়ার্ড সায়িদের প্রসিদ্ধ পুস্তক ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (বা প্রাচ্যব্যবসায়) কিনিয়া দিয়াছিলেন। একদিন জগতের সকল ঘটনারই হয়তো শেষ হয়। একসময় আমার মার্কিন প্রবাসও শেষ হইল। তারেক মাসুদ মার্কিন দেশকে পরমাত্মীয়ের— শ্বশুরের— দেশে পরিণত করিয়াছিলেন বলিয়া ওখান হইতে বইপত্রও আনিতে কি আনাইতে পারিতেন। তথাগত যে বইটি তিনি সর্বশেষ আমাকে পড়িতে দিয়াছিলেন তাঁহার নাম তর্জমা করিলে দাঁড়ায়— ‘আদি হিন্দুধর্মের উত্পত্তি ও বিকাশ’। আহা, তাঁহার সেই বই আমার অপরিশোধিত ঋণের বোঝাটি আজও ভারী করিতেছে!

সকলেই জানেন, তারেক মাসুদ আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অক্ষয় অবদান রাখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু আমরা (যাঁহারা সামান্য হইলেও তাঁহার অল্পবিস্তর সঙ্গলাভের গৌরব অর্জন করিয়াছিলাম তাঁহারা) জানি তাঁহার দৃষ্টি ছিল উপরের দিকে। তিনি পড়াশোনা করিতেন সেই উপরের দিকে চাহিয়া। পূর্বগামীদের মধ্যে এই আকাশদৃষ্টির ক্ষেত্রে হয়তো একমাত্র আলমগীর কবিরের সহিতই তারেক মাসুদের তুলনা চলিবে— আর কাঁহারও বিশেষ নহে।

উপরের দিকে বেশিক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে নশ্বর মানবদেহে (মানে মাটির ভাণ্ডে) যাহা ঘটে— অর্থাত্ ঘাড়ের ব্যথা— তারেক মাসুদের তাহা অবশ্য বিশেষ হয় নাই। তিনি আশেপাশেও তাকাইতেন। এই অভ্যাসের কারণেই তিনি নতুন ইয়র্কে বসবাস করিবার সময় দৈবক্রমে ১৯৭১ সালের কিছু দলিলচিত্রের সন্ধান পাইয়াছিলেন। সেই দলিলাদির সদ্ব্যবহার করিয়াই তিনি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি বানাইয়াছিলেন— এই কথাটি সর্বজনবিদিত।

এই ছবি বানাইতে গিয়াও তাঁহাকে অনেক যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের গৌরবময় সংগ্রামের কাহিনী একদা বাংলাদেশ ভুলিতে বসিয়াছিল। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন যাপন করিতেছি তখন দেখিতাম মধ্যবিত্তশ্রেণির ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত ১৯৭১ সালকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ বলিয়া উল্লেখ করিতেছেন। আবারও বলিতে হইবে, খুব সম্ভব একমাত্র আহমদ ছফা আর আলমগীর কবির ছিলেন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র ব্যবসায় আর সাহিত্য ব্যবসায় দুই মহলেই ‘মধ্যবিত্ত’ বলিয়া পরিচিত বলিয়া শাসকশ্রেণিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিস্মৃত হইতে চলিয়াছিল।

সাহিত্যের কথা যখন উঠিলই বলি, একমাত্র আহমদ ছফা ১৯৮৭-৮৮ সালে ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ নাম জারি করিয়া মুক্তিযুদ্ধের সহিত আমরা যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছি তাহা চোখে আঙ্গুল ঢুকাইয়া দেখাইয়া দিলেন। বইটির নাম আহমদ ছফা পরে ছাঁটিয়া ছোট করিয়াছিলেন— ‘আলী কেনান’। তাঁহার কিছু আগে— ১৯৮৫ নাগাদ— আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক একটি যুদ্ধপুরাণ লিখিয়াছিলেন। ঘটনাচক্রে দেখা গেল তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আর আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ একই পুরাণের এইপিঠ আর ওইপিঠ। কিমাশ্চর্যম! আহমদ ছফার উপন্যাসের কুশীলব কিছু পরিমাণে ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে উপস্থিত। অথচ উভয়ের মধ্যে কি যোজন যোজন দূরত্ব! আশা করি, দূর ভবিষ্যতে কেহ এই সত্য আরও বিশদ করিয়া উদঘাটন করিবেন। আমি এখানে শুদ্ধ যাহা কর্তব্য বিবেচনা করিয়াছি, তাহাই বলিলাম।

২.

আমি এসলাম ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়াছি— এই সত্য তারেক মাসুদের বেলায়ও অনস্বীকার্য। ইহা লুকাইবার প্রয়োজন নাই। কথিত আছে, আমাদের পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ ফরমাইয়াছেন, পরলোকগত মনুষ্যের সুনামই শুদ্ধ করিতে হয়। আমিও এই সত্য শিরোধার্য করি। পার্থক্যের মধ্যে আছে শুধু সত্যের দাবি। আমরা যদি নিজেদের সত্য নিজেরাও না বলি, তাহা হইলে অন্যে বলিবে কেন? অন্যলোকে শুদ্ধ গুজব রটাইবে। আমাদের আত্মচিকিত্সারও দরকার আছে।

মানুষ তারেক মাসুদ, তাঁহার প্রজ্ঞা, তাঁহার সাধনা, তাঁহার সংগ্রাম চিরকালই আমার শ্রদ্ধার লক্ষ্য থাকিবে। কিন্তু তাঁহার রাজনৈতিক গতির সহিত আমি— একসময় দেখিলাম— আর তাল মিলাইতে পারিতেছি না। সেই কক্ষপথ হইতে কখন কিভাবে যে ঠিকরাইয়া পড়িলাম আজ আমারও তাহা মনে নাই। যখন সংজ্ঞা ফিরিল দেখিলাম, তারেক মাসুদ আর নাই। তাঁহার কীর্তি পড়িয়া আছে। মাঝখানে আহমদ ছফাও চলিয়া গেলেন। আহমদ ছফার স্মৃতির সহিত আমি তারেক মাসুদের স্মৃতি আর মিলাইতে পারি না। আহমদ ছফা যে শ্রেণিকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহিত বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করিলেন, তাঁহার এককালীন ছাত্র তারেক মাসুদ সেই শ্রেণিকেই মুক্তিযুদ্ধের ত্রাতার আসনে বৈঠক দিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে বেহাত বিপ্লবের করুণ পরিণতি বরণ করিল তাহা এখানেই পরিষ্কার। তারেক মাসুদের সহিত আমার বিরহের শুরু এখানেই হইয়াছিল।

১৯৭১ সাল আমাদের ইতিহাসে একটি রজতরেখার ন্যায় পুরাতন ও নতুন যুগের সীমানির্দেশ করিতেছে। ১৯৭১ একদিকে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ ও অন্যদিকে জাগরণের ইতিহাস। তারেক মাসুদও সেই ইতিহাসের সন্তান। আহমদ ছফাও। আমরা সকলেই। অথচ ১৯৭১ সালের লক্ষ্য কি ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা একদিন একজনের কাছ হইতে আরজন আলাদা হইয়া গিয়াছিলাম। এই দেশে ১৯৭১ যে বিপ্লব আনিতে পারিত সেই বিপ্লব যে কারণেই হউক আসিতে পারে নাই। কেন পারে নাই? এই বিপ্লবের অন্যতর স্বপ্নদ্রষ্টা আহমদ ছফা অপরিণত বয়সে, প্রায় অজ্ঞাতবাসে, মৃত্যুবরণ করিলেন। অধিক প্রমাণের আর কি প্রয়োজন আছে! তারেক মাসুদ আহমদ ছফার পরিণতি এড়াইতে চাহিয়াছিলেন। পারিয়াছেন কিনা, আমি নিশ্চিত নই। আহমদ ছফা অনূদিত ‘ফাউস্ট’ তারেক না পড়িয়াছেন এমন নহে। এই সত্য উচ্চারণ করা আজ আমার পক্ষে যেমন পরম কর্তব্য, অন্যদিকে তেমনি চরম বেদনার।

আমার জ্ঞান নাই, কিন্তু বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা করিতেছে তারেক মাসুদ আহমদ ছফাকে ভোলেন নাই। শুদ্ধমাত্র ছাইচাপা দিয়া রাখিয়াছিলেন। পায়ের তলায় নহে, বুকের তলায়। হয়তো সেই চাপাকান্নার আওয়াজই শোনা যাইতেছিল তাহার অনারব্ধ শেষ ছবি ‘কাগজের ফুল’ কাহিনীর অশ্রুত বয়ানে। আজ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের দুই বয়ান বিরাজ করে। এক বয়ান মোতাবেক ১৯৭১ সাল ১৯৪৭ সালের ভুল সংশোধন করিয়াছে মাত্র। নতুন কিছুই করে নাই। আরেক বয়ানানুসারে, ১৯৭১ সালের বুকের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের বাসনা লুকাইয়া আছে। কি ছিল সেই বাসনা?

আহমদ ছফা, শেখ মোহাম্মদ সুলতান— কিংবা তাঁহাদের দুইয়েরই গুরু আবদুর রাজ্জাক— এই শেষ বয়ানের মধ্যে নিজেদের ভাষা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। তারেক মাসুদ এই দুই নৌকায় পদযুগল ভাগ করিয়া রাখিয়াছিলেন। আজ যখনই তারেকের কথা ভাবি সেই পরাবাস্তব ছবি আমার চোখ ঝাপসা করিয়া দেয়। তারেক মাসুদের স্মৃতি যেখানে আমাকে একটা কোমল ব্যথার আঁচড় দিয়াছে তাহা ঠিক এইখানেই। দুঃখের মধ্যে, সেই স্মৃতি আজও অমর রহিয়াছে। তারেক মাসুদকে ভোলা অসম্ভব।

১৫ নবেম্বর ২০১৭

প্রকাশ: বণিক বার্তা২৪  নবেম্বর ২০১৭

Leave a Reply