আহমদ ছফার জিজ্ঞাসা: আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি

আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যেসব লোক আলাওল হয় তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।—আহমদ ছফা

আমাদের দেশের আর পাঁচ সাহিত্যসেবীর মতন আহমদ ছফারও সাহিত্যসাধনায় একদিন হাতেখড়ি হইয়াছিল দুইচারি পংক্তি পদ্য লিখিয়া। ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারযোগে তিনি জানাইতেছিলেন, তদীয় প্রথম পদ্যের নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘রামের পিতৃভক্তি’। এই পদ্যের দুই লাইন তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্মরণ করিতেন।

যেইজন পিতামাতার প্রতি নাহি করে ভকতি
পরকালে হবে তার নরকে বসতি।

তাঁহার জীবনচরিতকার শামসুল আরেফীন অনুমান করিয়াছেন এই দুই চরণের রচনাকাল খুব সম্ভব ১৯৪৯ সাল নাগাদ। হইবেও বা, কেননা ততদিনে পাকিস্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর বাঁচিয়া নাই। জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুতে ব্যথা পাইয়া খানিক উপরের শ্রেণীর একটি ছাত্র—বিভূতিরঞ্জন নাথ—একটি কবিতায় লিখিয়াছিলেন: ‘বুক ভেসে যায় নেত্রনীরে, জিন্নাহর মরণে’। এই অপূর্ব কবিতারত্মের প্রেরণায়ই না সেদিন আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন ‘রামের পিতৃভক্তি’! আহমদ ছফা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র, তৃতীয় শ্রেণীতে। (ছফা ২০০৮: ৩০৭; আরেফীন ২০০৪: ১৩০)

আহমদ ছফার কবিতা-পুরাণও কিছু পরিমাণে ভারতীয় পুরাণের অনুগামী। এখানেও একটা পরোক্ষ শোকের ঘটনা আছে। একদিন পাকিস্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিগত হইলেন। তাঁহার মৃত্যুতে শোকার্ত কিশোর বিভূতিরঞ্জন একটি আস্ত পদ্য লিখিয়া ফেলিল। পদ্যটি ছাপা হইলে পর আহমদ ছফার বিদ্যোৎসাহী বাবা সেই কিশোরকে দশ টাকা পুরষ্কার দিয়াছিলেন। তারপর আব্বাজান তাঁহাকে লইয়া লাগিলেন: ‘তুমি পার না কেন? আমি তোমার দুইটা মাস্টার রাখছি, একটা ইংরেজি-বাংলা পড়াবার জন্য। আরেকটা আরবি-ফারসি পড়াবার জন্য, তুমি পার না কেন?’

তখনও ছোট মানুষ আহমদ ছফা। পারিবেন কি করিয়া! তবু তিনি বাপের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য বলিলেন, ‘আমিও লিখব।’ ছোট মানুষ তিনি। ‘পাকিস্তান,’ ‘জিন্নাহ’ প্রভৃতি অনেক বড় বড় জিনিশ—সামলাইতে পারেন না। অন্য কিছু পারেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলিতেছেন, ‘আমি তখন রামের গল্পটা শুনেছি। মনমোহন পণ্ডিতের মা, উনি ‘রামায়ণ’ পড়তেন, আমি শুনতাম। রামের গল্পটা আমার ভাল লেগেছিল। তখন একটা কবিতা লিখলাম—“রামের পিতৃভক্তি”।’ (ছফা ২০০৮ (ক): ৩০৭)

ঘটনার গোটা বছরপাঁচেক পরে—তিনি তখন অনুমান অষ্টম শ্রেণীতে—আহমদ ছফা মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম সামনে রাখিয়া একটা কবিতা লিখিলেন। বলা বাহুল্য, কবিতাটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রণীত। ইহাকেই বলে প্রভাব। যিনি প্রভাব বিস্তার করিতে পারেন তিনি ‘পিতা’ নিঃসন্দেহে। কবিতার কয় চরণ আহমদ ছফা ১৯৯৬ সালেও স্মরণ করিয়াছিলেন।

হে বঙ্গকবিকুলশিরোমণি শ্রীমধুসূদন!
তোমার যাওয়ার পথে বায়ুসম বেগে
আমিও বাসনা করি যেতে, কিন্তু সদা ভয় জাগে
যদি যায় সঙ্কল্প টলিয়া পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর চাপে,
যেমতি নদী এসে বাধা পায় শিলাময় পাহাড়ের স্তরে
যদি কোনমতে তারে বারেক টলাতে নারে
হয় প্রবাহিত ভূগর্ভের নিরপেক্ষ স্তরে।…
(ছফা ২০০৮ : ৩০৮)

আজিকালি আমরা যাহাকে বলি ‘উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়পত্র’ আহমদ ছফা সেই স্তরের পরীক্ষা পাশ করিয়াছিলেন—যতদূর জানা যায়—১৯৬২ সাল নাগাদ। সেই বছরই তিনি চট্টগ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া আসেন ঢাকা শহরে। শহরের পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপাইবার সুযোগ তৈরি হয় তাঁহার। মধ্যখানে ঘটে পিতৃবিয়োগ। এই বিয়োগ ঠিক কোন বছর ঘটিয়াছিল হলপ করিয়া বলার উপায় নাই। ঘটনাটি—আহমদ ছফার সর্বশেষ স্মৃতিকথা অনুসারে—১৯৫৭ সনের। ১৯৬৪ সালের গোড়ায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১) তাঁহার একটি কবিতা ছাপা হয় মোহাম্মদ আকরম খাঁর ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায়। কবিতার নাম ‘জনকের কবরে’। আহমদ ছফা তখন একুশ-বাইশ বছরের নবীন। কবিতায় হাতযশ না থাকে তো কি হইয়াছে ততদিনে অনেকদিন ধরিয়া কবিতায় হস্তক্ষেপ করিতেছেন তিনি। এই কবিতায় পিতৃস্মৃতি বা পিতার প্রভাব যেভাবে ধরা পড়িয়াছে তাহা বিশেষ প্রণিধান করিবার জিনিশ।

‘রোগশয্যায় বিরচিত’ নামে—ঢের পরকালে রচিত—এক রচনায় আহমদ ছফা পিতা অবর্তমান হইবার প্রথম ফলাফল যেভাবে বিবৃত করিয়াছেন তাহাতে বিষয়সম্পত্তির বিষয়টিই বড় হইয়া উঠিয়াছিল: ‘আমার পিতার মৃত্যুর পর আমরা তাঁর রেখে যাওয়া ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে পড়ি।’ বছরকয়েক পরে লেখা ‘জনকের কবরে’ দেখি, পিতার কবর জিয়ারতে দাঁড়াইয়া তিনি দেখিতে পাইতেছেন অন্য—সম্পূর্ণ ভিন্ন—দৃশ্য।

অধরে কথার ঢেউ, চিন্তা আর চাঞ্চল্যের শিখা
দিগন্তে ফেরারী হল, আধবোঁজা পৃথিবীর চোখ—
অচেনা বাঁধনে তার দিব্যরূপরেখা
বেঁধেছে আমারে আহা, স্বপ্নময় যেন দুই তীর
মাঝখানে বয়ে যায় জীবনের বেগবান নদী।
(ছফা ১৩৭১)

আনুমানিক দশ বছর পরে—১৯৬৭ সাল নাগাদ— আহমদ ছফা একদিন আপনার একমাত্র বৈমাত্রেয় ভাইটিকেও হারাইলেন—যেন নতুন করিয়া পিতৃহারা হইলেন তিনি। তাঁহার সাহিত্যসাধনার পশ্চাতে এই অনপনেয় ভাইটির যারপরনাই ভূমিকা। তিনি লিখিয়াছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি অল্পস্বল্প লেখালেখি করতাম। এইজন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার এই ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত। সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি “পদ্মাবতী,” “শহীদে কারবালা,” “সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামালের” নির্বাচিত অংশ মুখস্ত গান করে পড়তেন।’ (ছফা ২০০৮ : ২১৪)

নিজের ভাই সম্পর্কে—তবুও আহমদ ছফার বিশ্লেষণ অনেকখানি নির্মোহ। ভাইয়ের গুণগরিমা বিশদ করিতে একটু লিখিয়াছেন বটে তিনি : ‘আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুণাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় [তাঁহার] অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব-নক্ষত্রের মত স্থির ছিল। কি কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তার অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রক্ষা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল, তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’

আহমদ ছফা জানাইতেছেন, বড় ভাইয়ের বিশ্বাস ছিল তাহার ছোট ভাই সত্যিকারের এক বড় মানুষ। কথাটা এখন ছোট ভাইয়ের জবানিতেই শুনি: ‘আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত “আলাওল” শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছাওয়াল আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যেসব লোক আলাওল হয় তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।’ (ছফা ২০০৮: ২১৪)

এই পর্যন্ত দেখা যাইতেছে, পিতা আর জ্যেষ্ঠ সৎভ্রাতা দুইজনের ঋণ আহমদ ছফা স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার আলাওল বনার পেছনে—তাঁহার ভাষাসাধনায়—দুইজনেরই দান অসামান্য। তিনি যখন ‘জনকের কবরে’ লিখিতেছেন ভাইটি তখনও বর্তমান। কবিতায় দেখি, পিতার স্মৃতি তাঁহার কাছে ধরা পড়িয়াছে সম্পূর্ণ অন্যরূপে—তিনি পিতা আবিষ্কার করিয়াছেন ভাষার মধ্যে। পিতার ছবি ছাপাইয়া উঠিয়াছে তাঁহার ডাক—তাঁহার ভাষা। এখানে আহমদ ছফা নিজের ভাষায় দেখি জীবনানন্দ দাশের একটি পদ ধার করিয়াছেন। না করিয়া উপায় নাই। ভাষা কাহারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নহে। ‘বেতস লতার বনে’ নামক পদকল্পে জীবনানন্দ দাশের স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সত্য, কিন্তু ভাষায় কাহারও স্বত্ত্বে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হয় নাই।

কথাটা হয়তো একটু অন্যভাবেও বলা যায়। মানুষের ইতিহাসে পিতার নিকটতম তুলনা ভাষা বটে। ভাষা কোথা হইতে ভাসিয়া আসে মানুষ তাহার কতটুকু জানে! একমাত্র এই ভাষার কারণেই না মানুষ তাহার পিতার পরিচয় জানিয়াছে। পিতা তো একদা অদৃষ্টই ছিলেন। এই দৃষ্ট হওয়ার, এই পরিচয়েরই অপর নাম ‘সভ্যতা’ নয় কি! এই সত্যই আহমদ ছফার দ্বিতীয় স্তবকে মূর্তিলাভ করিয়াছে।

যখন পেছনে চাই জনকের ডাক কানে বাজে
ভেসে আসে সঙ্গীতের সুরেলা ঝঙ্কার,
শিরায় রোমাঞ্চ জাগে, বেতস লতার বনে
ফিরে যাই, শিশু হই—মনে মনে বলি বারবার
অসম্ভব যতো কথা—পিতৃছবি আঁখিকোণে আঁকি।
(ছফা ১৩৭১)

মনে হয়, পিতার সহিত সন্তানের না লেখা চুক্তির একটা পরিচ্ছেদই আহমদ ছফা এখানে নতুন করিয়া লিখিতেছেন। পিতা মানে ভাষা। আর কে না জানে ভাষাই মানুষকে মানুষ করিয়াছে! এই ভাষাই মানুষের অমর কাহিনীর গোড়ার কথা। প্রাণীজগতে আর কোন প্রাণী আছে যাহার ভাষা মানুষের ভাষার মতন! কোন প্রাণীর ভাষা এহেন বাক্য ভর করিয়া চলে! এই অমর বাক্যের বলেই না মানুষ এক পর্যায় বা পুরুষ হইতে অন্য পর্যায় বা পুরুষে পার হইতে থাকে। তাহা হইলে স্বীকার না করিয়া উপায় কোথায়—মানুষের ভাষারই অপর নাম পিতা অথবা পুরুষ! আহমদ ছফা যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে শিশুর ভাষা আর তাহার পিতার মধ্যে একটা অভেদের প্রতিষ্ঠা আছে নিঃসন্দেহে।

চলে যাই আরো আগে যখন ফুটেছে ঠোঁটে
আধো আধো বোল, জনকের চোখে চোখ রেখে
যখন কয়েছি কথা, প্রাণ খুলে কত অকপটে।
হাজারো জান্নাত আমি গড়িয়ে দিয়েছি কত
জীবনের যৌবনের স্রোতে—তারপর আমি গেছি
বন্ধুহীন বিয়াবানে প্রাণের পরশ পেতে
মেকীর বাজারে, আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি?

যেখানে পিতা নাই—মানে ভাষা নাই—সেখানে কি আছে? সেখানে আর কিছু নাই। আছে মরীচিকা—আছে ‘মেকীর বাজার’। মেকির জগত মানে এখনও ছবির জগত—যে জগত এখনও শব্দের কিংবা বাক্যের ভাষা হয় নাই। কবরে শায়িত পিতাকে হাজির-নাজির জানিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘মেকীর বাজারে, আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি?’ আমরা আগেই দেখিয়াছি, আহমদ ছফা যখন এই কবিতায় পৌঁছিতেছেন ততদিনে জীবনানন্দ দাশও তাঁহার নাগালে। কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন নাই। আরো আগে—আরো পিছে—তাকাইয়াছেন। এই পর্যন্ত আসিয়া দেখিতেছি কাজী নজরুল ইসলামেও কিছু অধিকার পাইয়াছেন আহমদ ছফা।

উদাহরণস্বরূপ নবীন আহমদ ছফার কবিতা হইতে একটি শব্দ লইয়া পরীক্ষা করি। নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষে অসহযোগ আর খেলাফত আন্দোলনের যুগে—সেই ১৯২১ সালেই—‘আনোয়ার’ নামে বিয়াবানে শোরগোল তুলিতেছিলেন।

আনোয়ার! আনোয়ার!
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্তানো আর!
আজো যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার!
(নজরুল ২০০৬: ৩৫)

এই কবিতাটির ঠাঁই—সকলেই জানেন—১৯২২ সালের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে, খেলাফত আন্দোলন বিগত আজ কতদিন! অথচ সেই যুগের এই কবিতাটিও—নজরুল ইসলামের আর আর কবিতার মতনই—আজও আপাদমস্তক অমলিন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নহে, ‘বিয়াবান’ শব্দে মরুভূমি বুঝায়। ‘আনোয়ার’ কবিতায় নজরুল ইসলামের প্রয়োগটা দেখি—‘জনহীন এ বিয়াবানে’। আর আহমদ ছফার ‘জনকের কবরে’ কবিতায় তাহা হইয়াছে ‘বন্ধুহীন বিয়াবানে’। মধ্যখানে অবশ্য ফররুখ আহমদ শব্দটি লইয়া ঢের লাগিয়াছেন। ‘নৌফেল ও হাতেম’ নাট্যের এক জায়গায় বাদশাহ নৌফেলের বেগম তাঁহাকে আহ্বান জানাইতেছেন:

আমার মিনতি শোন, ফিরে এস, ফিরে এস তুমি
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ,—এ ভুলের বিয়াবান থেকে।
(ফররুখ ১৯৯৫: ১৫৫)

আর ‘সিরাজাম মুনীরা’র ‘আলী হায়দর’ কবিতায়ও ফররুখ আহমদ ‘বিয়াবান’ ‘বিয়াবান’ চিৎকারে আকাশ-পৃথিবী তোলাপাড়া করিতেছেন:

তার তকবিরে বিয়াবান চিরে বাহিরিয়া আসে স্বর
তার তকবিরে কাঁপে অম্বর, ফাটে মরুপ্রান্তর
গর্জে খোদার সিংহ: আল্লা, আল্লাহু আকবর
নবীজীর পাশে এল আল্লার সেনা এল আলী হায়দর।

সে কী তূরন্ত দূরন্ত-গতি মরুতে ঝড়ের বেগে!
জড়পিণ্ড এ বিয়াবানে বুঝি আগুন উঠেছে জেগে
হাজার ঘোড়ার খুরের আঘাতে লক্ষ উল্কা জ্বলে
দিগ্‌কাওসের বাঁকা রেখা উড়ে চলে,
তীরের মতন বেগে স’রে যায় পদতলে মরুভূমি,
শহীদের খুনে মরণ তুফান জীবনের মৌসুমী
(ফররুখ ১৯৯৫: ৮৭-৮৮)

এক্ষণে ‘মুহূর্তের কবিতা’ হইতেও দুইটি দৃষ্টান্ত লইতে পারি :

‘কালের সুরাহি থেকে’ ঝরে যাওয়া কণিকা এসব
বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত গড়ে কত শতাব্দীর খেলাঘর,
নৈঃশব্দ্যের বিয়াবানে করে কোটি কণ্ঠকে সরব,
ক্ষণিকের অবকাশে রেখে যায় রক্তিম স্বাক্ষর!
তারপর মিশে যায় কীটাণুর ক্ষীণ অবয়ব
কোনদিন, কোনখানে আর যার মেলে না খবর।
(ফররুখ ১৯৯৫: ১৭৭-৭৮)

এখানে কুতুব তারা জেগে আছে দৃষ্টি মেলে তার
আকাশের এক প্রান্তে। অরণ্যে, সমুদ্রে, বিয়াবানে
যারা চলে দিশা ভুলে মঞ্জিলের বিভ্রান্ত সন্ধানে
একাগ্র অন্তরে শুধু রোশ্নি চায় কুতুব তারার।
(ফররুখ ১৯৯৫: ২১৫)

প্রত্যয়ের সূর্যালোকে অবকাশ নাই সংশয়ের
শবে-বরাতের রাতে জ্বলে সে নিষ্কম্প শামাদানে,
কিম্বা চলে বিয়াবানে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সন্ধানে,
মুসা কালীমের মত সহযাত্রী; বন্ধু খিজিরের
চলে অবিশ্রান্ত গতি জীবনের পূর্ণতার টানে;
স্পর্শে যার সুসম্পূর্ণ রূপ পায় গান মুহূর্তের॥
(ফররুখ ১৯৯৫: ২২৭)

‘হাতেম তা’য়ী’তেও দেখি এই অধিকার অপ্রতিহত গতিতে চলিয়াছে। নির্জন মহলে গতি যখন মন্থরতম, মুহূর্তকে যেখানে শতাব্দী মনে হয় সেখানে এক ভিনদেশী ভাবিতেছে—‘কেন বিয়াবানে এই আমীরানা ঠাট!’

‘হয়তো পানির গভীর অতলে সে আজদাহার বাসা,
হয়তো সেখানে সাপের রাজ্যপাট,
তবে কেন এই শানশওকত, অপরূপ বালাখানা;
কেন বিয়াবানে এই আমীরানা ঠাট!’
(ফররুখ ১৯৯৫ : ৪০৫)

একই নিয়মে মনে হয় ‘জান্নাত’ শব্দটিও আহমদ ছফা উত্তরাধিকারজ্ঞানেই ঐতিহ্য হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। ‘মুহূর্তের কবিতা’র ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ কবিতায় ফররুখ আহমদ লিখিয়াছিলেন:

কখনো জান্নাত ছেড়ে আসি নেমে কঠিন মাটিতে,
কখনো বা মনে হয় জিন্দেগানি নির্দয়, নির্মম,
অগ্নিকুণ্ডে জাগি আমি কখনো বা পুষ্পল হাসিতে,
কখনো বা পার হই অতলান্ত প্লাবন বিষম!
মানুষের উর্ধ্বগতি আঁকি মনে কল্পনা তুলিতে
(যে উচ্চতা জিব্রাইল করিতে পারেনি অতিক্রম।)
(ফররুখ ১৯৯৫: ২০৭)

কিংবা ‘হাতেম তা’য়ী’র ‘দুস্রা সওয়াল’ অধ্যায়ে ‘গোরস্তানের অভিজ্ঞতা’র অংশবিশেষে পড়িতে পাই ‘জান্নাতের নেয়ামত সুরভিত খাঞ্চায় সাজানো।’

… ঘন হলে রাত্রির আঁধার
দেখিল শহীদী রুহ্ এল সেই গোরস্তান ফুঁড়ে
এল সে বৃদ্ধের আত্মা রওশন, শাহানা লেবাসে
(চীরধারী নয় আর)! মধ্য রাত্রে এল মেওয়াজাত
জান্নাতের নেয়ামত সুরভিত খাঞ্চায় সাজানো
(’য়েমনী হাতেম তা’য়ী অংশ পেল যার), পেল বৃদ্ধ
শহীদী জামা’তে সেই আনন্দিত;—খাদ্যের সামানা।
(ফররুখ ১৯৯৫: ২৮৭)

ভাষা মানেই আকার। এই ভাষার মধ্যেই মনুষ্য আপনকার সত্য—তাহার যুক্তির পাঁচকাহন—রাষ্ট্র (বা সমাজ) আকারে লাভ করিয়াছে। মানুষের দেহ মর অর্থাৎ নশ্বর—এ সত্যে সন্দেহ নাই কিন্তু ভাষার মধ্যেই সে অমর হইয়াছে। আর কে না জানে অমরতারই অপর নাম ঈশ্বর! অধিক কি! ঈশ্বরের গুণকেই না ‘ঐশ্বর্য’ বলে—এ কথা কে না জানে। যে পিতার দেহ আছে সে পিতা নশ্বর—তাহাকে একদিন কবরে যাইতে হইবে। কিন্তু যে পিতা ঈশ্বর তিনি বাক্যের আকার ধারণ করিতে পারেন। তাঁহার মৃত্যু নাই। তাহার পুত্রস্বরূপ মনুষ্যের দুই আঁখিকোণ হইতে দুইফোঁটা পানি—‘দুইটি তরল মুক্তা’—কখনো বা টলিয়াও পড়িতে পারে। পিতার উদ্দেশে আহমদ ছফার এই ছিল শেষ নিবেদন।

তোমার কবরে আজ ধীরে ধীরে সন্তর্পণে এসে
সবুজ দুর্বার সাথে কিছুক্ষণ কথা কয়ে
সজল নিশ্বাসে পুনঃ ফিরে চলে যাই
দুইটি তরল মুক্তা এই দুই আঁখিকোণে লয়ে।
(আহমদ ছফা ১৩৭১)

অনেক অনেক দিন পরের কথা। রুশদেশের দ্বিতীয় বিপ্লব পরাজিত হইয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে এতদিনে এই বিপ্লবের পিতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকেও নতুন করিয়া মাটির নিচে গোর দিতে হইবে। নতুন গোরখনকদের দাবি ১৯৯১ সনের পর তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়া উঠিল। আহমদ ছফা ১৯৯৯ সালে সম্পূর্ণ নিজের যুক্তিতে লেনিনের জারি লিখিলেন একটা। ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’। লিখিলেন, ‘লেনিন মানুষের ইতিহাসে মানুষের শিশু হতে চায়’। লেনিনের জীবন হইতে আহমদ ছফা বোধ করি মাত্র এই দুইটি তরল মুক্তাই পাইয়াছেন : ‘সর্বাঙ্গীন বিপ্লবের বোধিসত্ত্ব হয়ে লেনিন জন্মাতে চায় আরো একবার।’

লেনিন সঠিক জানে মানবিক সম্ভাবনার
অনন্যসম্ভবা বীজ শক্তির ভাণ্ডার তিনি,
মাটিই গন্তব্য তার। মাটির সে উর্বরতা আছে
নবজন্মে ঝলসে তোলা শুভ্রবুদ্ধ নবীন মানুষ।
(আহমদ ছফা ২০০০: ১০)

এই না হইলে আহমদ ছফা!

২১ জুন ২০১৭

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘রোগশয্যায় বিরচিত,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৪র্থ খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ২১০-২১৪।
২. আহমদ ছফা, ‘এক সন্ধ্যার সংলাপ,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ৩৫১-৩৮১।
৩. আহমদ ছফা, ‘লেনিন ঘুমাবে এবার,’ আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা: শ্রীপ্রকাশ, ২০০০), পৃ. ৯-১১।
৪. আহমদ ছফা, ‘জনকের কবরে,’ মাসিক মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১; সলিমুল্লাহ খান, ‘ইতিহাস কেন ইতিহাস নয়: দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গ অথবা নতুন মহাভারত প্রসঙ্গে,’ যুগান্তর, ঈদসংখ্যা, জুন ২০১৭ [সম্পূর্ণ উদ্ধৃত]।
৫. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আনোয়ার,’ নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, রফিকুল ইসলাম গয়রহ সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৬), পৃ. ৩৩-৩৬।
৬. ফররুখ আহমদ, ফররুখ আহমদ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫)।
৭. শামসুল আরেফীন, আহমদ ছফার অন্দরমহল (চট্টগ্রাম: বলাকা প্রকাশন, ২০০৪)।

প্রথম প্রকাশ: এনটিভি অনলাইন, ২৯ জুন ২০১৭।

Leave a Reply