আমার বন্ধু রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সহিত আমার প্রথম দেখা ইংরেজি ১৯৭৬ সালে। তখন মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানে পা রাখিয়াছি। আমি আসিয়াছিলাম তখনকার জেলা চট্টগ্রাম হইতে। হালফিল আমার সাকিন জেলা কক্সবাজার দাঁড়াইয়াছে। রুদ্র তাঁহার কবিতার নিচদিকের বাম কোণায় প্রায়ই লিখিতেন মিঠেখালি, কখনও মোংলা। এইগুলি যথাক্রমে তাঁহার গ্রাম ও উপজেলার নির্দেশ। কবিতার অতিরিক্ত চিংড়িচাষেও রুদ্রের আগ্রহ ছিল। খুলনা ও বাগেরহাট এলাকায় ঐ সময় হইতে কিছু চিংড়িঘের গড়িয়া উঠিতেছে উঠিতেছে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ঢাকায় পৌঁছিবার আগেই ‘কবি’ হইয়া উঠিয়াছিলেন। আর ঢাকায় আসিয়া তাঁহার কবিযশ পূর্ণিমাতিথিতে পৌঁছায়। তিনি বয়সে আমার দুই বা এক বছরের বড় হইলেও ভাগ্যের জোরে আমি তাঁহার সহপাঠী হইয়া পড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়া যাঁহাদের পরিচয় লাভ করিয়া আমি ধন্য হইয়াছিলাম তাঁহাদের মধ্যে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন বিশেষ। আমি সাধারণত নতুন কাহারও সহিত পরিচয় হইবা মাত্র তাহাকে ‘তুমি’ বলিতে পারিতাম না। রুদ্র পারিতেন। তিনি আমাকে বিনানুমতিতে প্রথম দর্শনেই ‘তুমি’ ডাকিতে শুরু করিলেন। রুদ্র আমাদিগের উপর এইভাবে তাঁহার ইচ্ছা চাপাইয়া দিতেন।
পরে জানিয়াছি, তাঁহার নামের সহিত ‘রুদ্র’ শব্দটাও যুক্ত হইয়াছিল এইভাবেই। তাঁহারই ইচ্ছায় এবং ১৯৭১ সালের পরে। ইহাতে একগাছি সুবিধা হইয়াছিল আমাদের। তাঁহার প্রতিভাটা বিশিষ্ট করিয়া দেখা দিয়াছিল ঐ ক্ষুদ্র ‘রুদ্র’ শব্দের বাধনে। চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট হইতে আসিয়াছিলেন মনীষী মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। তাঁহার বিশিষ্টতা ধরা পড়িত ‘ডক্টর’ শব্দে। আর এক্ষণে বাগেরহাট মহকুমার মুহম্মদ শহিদুল্লাহ উদিত হইলেন ‘রুদ্র’ শব্দের আড়ালে। শুনিলাম বশিরহাটের অপর মনীষী ডক্টর আনিসুজ্জামান এইমাত্র ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি পাইয়াছেন। শুনিয়াছি তাঁহার ভদ্রনামের আগেও একদা মোহাম্মদ শব্দটি শোভা পাইত। যাচাই করিয়া দেখি নাই। রুদ্র যে সরাইখানা স্থাপন করিয়া গেলেন আজি তাহা অনেক ফকির-মুসাফিরের আশ্রয়স্থান হইয়াছে। বাঙ্গালি মুসলমান কবিগোষ্ঠীর নতুন নেতারাও এখন নতুন নতুন বাঙ্গালি নামের আশ্রয় লইতেছেন।

রুদ্র আমাকে প্রথম আলাপেই সলিমুল্লাহ বলিয়া ডাকিতে শুরু করিলেন। আমি তাহাকে শহিদুল্লাহ ডাকিতাম। তিনি তাহাতে অবশ্য সাড়া দিতেন না। ‘রুদ্র’ নামটার প্রতি তাঁহার অতিরিক্ত টান ছিল। বাংলা ভাষায় আমার জ্ঞানগম্যি খানিক কাচা থাকায় আমি তখনও তাঁহার এই টানটার মর্ম ধরিতে পারি নাই। রুদ্রের কাছে ‘রুদ্র’ শব্দটা ছিল তাঁহার নতুন উপার্জিত বাঙ্গালিধর্মের অংশ। তিনি মনে করিতেন এই রকম একটা শব্দ তাঁহাকে অধিক বাঙ্গালি হইতে সাহায্য করিবে। সেই সময় আমি নিজেও অশোক রুদ্র নামক একজন পশ্চিমা বাঙ্গালির জ্ঞানী লেখা পড়িয়া মজা পাইতাম। তবে শুদ্ধ রুদ্র শব্দটা ব্রাহ্মণ কি শুদ্র টের পাইতাম না।


১৯৭০ সাল দিয়া যে দশকের শুরু সেই দশকেই আমরা কবিতা লিখিতে শুরু করিয়াছিলাম। তাই লোকে আমাদিগের নাম দিয়াছিল সত্তর দশকের কবি। ‘সত্তর দশকের’ শব্দটির অর্থ এখন দাঁড়াইয়াছে খানিকটা গণোরিয়া বা সিফিলিসের কবি জাতীয় কিছু। এখন পিছনে তাকাইলে দেখি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহই ছিলেন আমাদের দলনেতা। আমি অবশ্য তাঁহার জেবেপোরা ছোট দলে ছিলাম না। ছিলাম কোন্দলে। প্রয়োজনে বলিতে পারেন ছিলাম বিরোধী দলে। আর ইহা লইয়া খানিক আত্মপ্রসাদেও আমি ভুগিতাম। অনেক দিন পরে বুঝিয়াছিলাম রুদ্রই ছিলেন ভালয়মন্দয় মিশাইয়া আমাদের প্রকৃত নেতা। দুঃখের মধ্যে, আমি তাঁহার শিষ্য হইতে–কিংবা বলা যায় হইয়া উঠিতে–পারি নাই। তিনি এত ত্বরা করিয়া মরিয়া যাইবেন তাহা ভাবিতে পারি নাই।

আমাদের মধ্যে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার বই সকলের আগে প্রকাশিত হয়। তাঁহার সেই বইয়ের নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘উপদ্রুত উপকূল’। একই সময় বাহির হইয়াছিল মোহন রায়হানের ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’। ইহা ইংরেজি ১৯৭৯ সনের কথা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও মোহন রায়হান ছিলেন আমাদের দরিদ্র সত্তর দশকের–বরং বলা ভালো সত্তর দশকের শেষ ভাগের–দুই সেরা কবি।

আজিকালি আমাদিগের দশককে লোকে বন্ধ্যা-দশক বলিয়া দোষ দেয়। বিশেষ করিয়া আমাদের পরে যাঁহারা আসিয়াছেন তাঁহারা। তাঁহারা বলেন আমরা রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কেরানিগিরি করিয়াছি। সেনাপতি জিয়া ও সেনাপতি এরশাদ সাহেবদ্বয়ের অঙ্কে বসিয়া যাঁহারা কবিতা ব্যবসায় করিতেন তাঁহাদের চোখে ত আমরা কলাশিল্পের বিরুদ্ধে কিছু অপরাধ করিয়া থাকিবই। আমাদের এই অনুগামীরা এখনও বহুগামী আছেন। তাঁহারা রাজনীতিরটাও খাইবেন আবার শিল্পকলারটাও কুড়াইবেন। তাঁহারা দেশের ভাষাও রাখিবেন বিদেশের রচনাও ছাড়িবেন না। তাঁহারাই ত বলেন রুদ্র প্রভৃতি সত্তর দশকের কবিতা ব্যবসায়ী যাহা যাহা ভাষায় প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহা ষোল আনা কবিতা নহে। রাজনীতি মাত্র। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ একটা বাক্য রচনা করিয়াছিলেন যাহা বহুদিন তাঁহার সাগরিদরা আওড়াইয়া লিখিতেন: ‘কবিতা ও রাজনীতি একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ’।

এই জায়গায় আমি রুদ্রকে বুঝিতাম। কিন্তু তাঁহার রাজনীতিটা যে কি তাহা বহুদিন প্রয়াস করিয়াও বুঝিতে পারি নাই। তিনি একই পদ্যে শেখ মুজিব, সিরাজ সিকদার ও কর্নেল তাহেরের প্রশংসাসূচক পংক্তি লিখিয়াছেন। আমার অতখানি দিব্যজ্ঞান ছিল না। ফলে আমি একসময় কবিতা হইতে বিদায় লইলাম। রাজনীতি হইতে বিদায় আমাকে লইতে হয় নাই। কারণ আমি কখনও কোন রাজকীয় দলের সভ্যই হই নাই।


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৭১ সালের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে শরিক হইতে পারেন নাই। কারণ এই নহে যে তখন তিনি মাত্র নয় শ্রেণিতে পড়িতেন। তাঁহার জীবনীকার লিখিয়াছেন:

মুক্তিযুদ্ধ শুরু। শহিদুল্লাহ নবম শ্রেণীর ছাত্র। যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর বাবাকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে গেলে তাঁর মা প্রথম সন্তান শহিদুল্লাহকে কিছুতেই যুদ্ধে যেতে দেন নি। যুদ্ধে যেতে না-পারার বেদনা, সেই সঙ্গে চারপাশের নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ, দেশব্যাপী পৈশাচিক হত্যা-নির্যাতন তাঁর ভাবনা-জগৎকে তুমুলভাবে আন্দোলিত করে। পিতার আকাক্সক্ষা ছিল শহিদুল্লাহ ডাক্তার হবে। যুদ্ধের আগ পর্যন্ত শহিদুল্লাহর স্বপ্ন ছিল তাই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁর স্বপ্নের পটভূমি বদলে দেয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের বার বছরে সেই স্বপ্ন কি সুন্দর দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়! প্রমাণ আংশিক এই কবিতায় পাওয়া যাইতেছে। এই পদ্যের বানানরীতিটি রুদ্রর নিজস্ব। ডক্টর মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মতো বাতিক তাঁহারও ছিল বৈ কি! যেমন তিনি বাংলা ভাষায় মূর্ধণ্য ‘ণ’ বলিতে রাখিবেনই না! একবার, বিশেষ তাঁহার পয়লা কি দোসরা কেতাবে, তিনি বর্গীয় ‘জ’ অক্ষরের নিচে ফোটা কাটিয়া আর একটি অক্ষরও বানাইতে চাহিয়াছিলেন। আমি তাহাতে যোগেশচন্দ্র রায় আর বুদ্ধদেব বসুর পায়া দেখিয়াছিলাম। এই কবিতার নিচে তারিখ দেওয়া ছিল ১২ অক্টোবর ১৯৮৩।

সামরিক ডিনার টেবিলে সুধীবৃন্দ উপস্থিত,
মজাদার পানাহার, অতিথিরা সবাই সজ্জন।
কেউ মন্ত্রী, ব্যবসায়ী কেউ কেউ ঘোড়েল আমলা,
প্রাক্তন গেরিলা কেউ, কেউ বাম, দলত্যাগী নেতা।
সবার মসৃন ত্বক, তেলামাথা, মজবুত খুঁটি,
দিনে প্রতিপক্ষ আর রাতে ফিরে একই প্রাসাদ।

টেবিলের পূর্নিমা-শাদার ‘পরে সাজানো খাবার–
চাষার চামড়া দিয়ে তৈরি করা মোঘল-পরোটা,
রক্তের হালুয়া আর শ্রমিকের যক্ষা, সিফিলিস।
ধর্ষিতা নারীর সুপ, কাটামাথা অজ্ঞাতনামার।
নিহত ছাত্রের লাশ, গুলিবিদ্ধ, রক্ত মাটি মাখা,
বুলেটের কোর্মা আর বুটে পেশা শিশুর কাবাব।

ডিশ জোড়া চমৎকার নিহত জয়নালের রোস্ট,
আধা সিদ্ধ গনতন্ত্র আর তাজা মানুষের জিভ,
ভয়ানক চেয়ে থাকা পুলিশের উপড়ানো চোখ–

ডিনার টেবিল জুড়ে মনোরম খাদ্য আয়োজন ।।


রুদ্রের সহিত আমার শেষ দেখা ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি। মাঝখানের গোটা চারি পাঁচ বছর আমি বিদেশে ছিলাম। সদ্য ঢাকা ফিরিয়াছি। আসিয়াই গিয়াছি গুরুগৃহে। মানে মহাত্মা আহমদ ছফা যেখানে বসবাস করিতেন সেই বাসায়। হাতিরপুলে। দেখি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহও সেখানে। ইহা জুন মাসের গোড়ার কথা। অনেকদিন পরের দেখা বটে! ততদিনে রুদ্র একটু রোগা হইয়াছেন। তাঁহার কবিতার বইয়ের সংখ্যাও গণায় বাড়িয়াছে। অনেকগুলিই আমার তখনও পড়া অর্থাৎ পাঠ করা হয় নাই। জানিলাম তিনি পশ্চিম রাজাবাজার থাকেন। কিন্তু বুঝিতে পারি নাই তাঁহার ‘হাড়ের ঘরখানি’ ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে।

আমি কিছুদিনের জন্য আমার নিজের গাঁয় গিয়াছি। আমার গাঁ কক্সবাজার জেলার উপজেলা মহেশখালীতে। বলা প্রয়োজন আমার নিজের দেহটাও তখন রোগজর্জর। দেশে একটা প্রলয়ংকর ঝড় বহিয়া গিয়াছে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে। এক মাস আগে এক দৈবে আমার আপন বড়ভাই এন্তেকাল ফরমাইয়াছেন। আমি গ্রামেই থাকিয়া গেলাম একটু বেশি দিন। আমাদের দক্ষিণ দেশে তখন একটা দুর্ভিক্ষাবস্থা। আমরা সরকারের কাছে তখন কৃপাভিক্ষা করিতেছি। এমন সময় একদিন পত্রিকায় দেখিলাম কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আর নাই। ২১ জুন, শুক্রবার, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তাঁহার হৃদযন্ত্র অচল হইয়া পড়ে।

আমি ঢাকা ফিরিলাম কিছুদিন পরে। রুদ্রের সহিত আর কোন দিন দেখা হইবে না। ভাবিতে ভাবিতে একদিন দেশ ছাড়িলাম। আবার ফিরিয়াও আসিলাম। দেখিলাম কি যেন নাই! ঢাকায় অনেক নতুন জিনিশ জমিয়াছে। কবিতা জিনিশটি আর জমিতেছে না। তাহার জায়গায় আসিয়াছে আওড়াবৃত্তি। রুদ্র কবিতা লিখিয়া আওড়াইতেনও বেশ। এখন আওড়াকার দেখি কিন্তু আর রুদ্র দেখি না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহই কি আমাদের শেষ কবি! ভাবিতে অবাক লাগে তাঁহার অন্তর্ধানের পরে যাঁহারা ফি বছর ‘রুদ্রমেলা’ আয়োজন করিবার ঘোষণা দিয়াছিলেন একে একে তাঁহারাও অন্তর্ধান করিতেছেন।

দোহাই
১. রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ‘নৈশভোজ ’৮৩’, রাজনৈতিক কবিতা (ঢাকা: বিভাস, ২০১২), পৃ. ৭৩-৭৪।
২. —–‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: জীবনপঞ্জি’, রাজনৈতিক কবিতা, ঐ, পৃ. ১৪৬-১৪৯।

প্রথম প্রকাশ: বিডিনিউজ২৪.কম

2 thoughts on “আমার বন্ধু রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

Leave a Reply