আহমদ ছফার নজরুল

আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।


কাজী নজরুল ইসলামএই ঢাকা শহরে কিছু লোক আছেন যাহারা আমাকে—এই নিবন্ধের অধম লেখককে—সাম্প্রদায়িক এমনকি কখনও ‘মৌলবাদী’ বলিয়াও আনন্দ লাভ করেন। তাঁহাদের এই উপহারকে আমি কখনও বা বিধাতার আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করি। কারণটা খুলিয়া বলা দরকার।

যখন দেখি এই মনীষীরা আহমদ ছফার মতন মহাত্মা ব্যক্তিকেও একই ধরনের উপাধিরত্নে বিভূষিত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছেন না তখন আমরা সামান্য মজুর লেখক মানুষ কেন মন খারাপ করিতে যাইব। আর কে না জানে এমনও দিন ছিল যখন বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কোন কোন অংশ মহাসমারোহে নজরুল ইসলামকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিতে যেমন কসুর করেন নাই, তেমনি কিছু ‘নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক’ও ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করিতেন। খোদ নজরুলের কথায়—কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভা’ওয়ালা তাঁহার নামে মিথ্যা কুৎসাও রটনা করিতেন।

ইঁহাদের কথা মনে রাখিয়াই তো নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন, ইহাদিগকে আঙ্গুল দিয়া গণনা করা যায়। ইঁহাদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এতদিনে সকলেই জানেন ইঁহাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক—মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস বা নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতি। ইবরাহিম খাঁকে লেখা এক পত্রযোগে নজরুল ইসলাম পরিষ্কার করিলেন, মাত্র এই কয়েকজনের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দু সমাজকে তিনি দোষ দিতেছেন না এবং দিবেনও না। তাহা ছাড়া নজরুল লিখিলেন, —আজকালকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে’, —আমি যে মুসলমান’—ইহাই হইয়া পড়িয়াছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধের সামিল, —আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।’

নজরুল ইসলাম এই কথা লিখিয়াছিলেন সত্য সত্যই বড় দুঃখে। প্রমাণ ইবরাহিম খাঁ সাহেবের লেখা ১৯২৫ সালের চিঠির উত্তর তিনি দিয়াছিলেন প্রায় তিন বছর পর, তাহার ভাষায় ‘১৯২৭ সালের আয়ু’ যখন ফুরাইয়া আসিয়াছে তখন। ততদিনে মানে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর কি ১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই মূঢ়তার অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। হিন্দু সমাজের অগ্রণী মনীষীরা নজরুল ইসলামের শক্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। আর মুসলমান সমাজের মধ্যেও যাঁহাদের চোখ ফুটিয়াছিল তাঁহারাও নজরুল ইসলামের মধ্যে আপনাদের ঘরের মানুষ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

এই উদাহরণটি আমি সবসময়ই মনে রাখি। যাহারা নজরুল ইসলামের মতন আত্মভোলা মানুষকেও সাম্প্রদায়িক বলিতে দ্বিধা করেন নাই, তাঁহাদের ভাবশিষ্যরা আহমদ ছফাকেই বা ছাড়িবেন কেন? এই চিঠিরই আরেক স্থলে নজরুল লিখিয়াছিলেন, মুসলমান সমাজ যে আমাকে ‘কাফের’ খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও লোকে ‘কাফের’ বলিয়াছিল। কাফের হইতে হইলে এই রকম বড় হইতে হয়। নজরুল তাই লজ্জা পাইয়াছিলেন। ‘কাফের’ আখ্যায় বিভূষিত হইবার মতন বড় তো তিনি হয়েন নাই!

আহমদ ছফা সম্বন্ধে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকরা যে শীতল ভাব দেখাইতেছেন তাহাতে আমার বারবার সেই ১৯২০ সালের যে দশক, তাহার কথাই মনে পড়িতেছে। আমার ধারণা মহাত্মা আহমদ ছফাও বিষয়টা জানিতেন।

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

যৌবনের প্রারম্ভে, ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয় কি বাংলা একাডেমীর বৃত্তি পাওয়ার আশায় আহমদ ছফা প্রথমে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ (নাম ‘লিটারারি আইডিয়েল্স্ অব বেঙ্গল’) লেখেন। লেখাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমীর ইংরেজি পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। বাংলাদেশ কায়েম হইবার পর আহমদ ছফা সেই প্রবন্ধটির স্বাধীন তর্জমা করেন ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে। ঐ প্রবন্ধে তিনি বাংলার সাহিত্যাদর্শ বলিতে চারিজন বড় লেখকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দুই নম্বরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তৃতীয় স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সবশেষে কাজী নজরুল ইসলামের নাম নিলেন তিনি।

‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ প্রবন্ধের উপসংহারে আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, আমাদের সাহিত্যের এই পর্যন্ত যত আদর্শ দাঁড়াইয়াছে তাহাদের সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা কাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। আহমদ ছফা লিখিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ‘পূর্ণ মূল্যায়ন’ তখনও হয় নাই।

সেই অপূর্ণ মূল্যায়নের পাতা পূর্ণ তিনিও সেই দিন করেন নাই। তবে কিছু দিকচিহ্ন তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেও। আহমদ ছফার লেখায় পড়ি, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে অনেক কয়টি পরিবর্তন ঘটিয়া যায়। এক নম্বরে তাহার আবির্ভাব মাত্রই বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘ভরকেন্দ্র’ তাহার পালা বদলাইয়া গেল। কবিতা ‘গজদন্ত মিনার’ ছাড়িয়া রাজপথে নামিয়া আসিল। স্বরূপ প্রকাশ করিল সমাজশক্তির শরিক হিসাবে। সমাজের নির্যাতিত সাধারণ কবিতায় স্বীকৃতি পাইলেন। কাজী নজরুলের কবিতা তাহাদের ভাগ্যলিপি আকারে লেখা হইল।

বিশেষ মুসলমান সাধারণের অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে যথাযথ যোগ্যতায় রূপ পাইল। আহমদ ছফার চোখেও স্পষ্ট হইল ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ ও রূপকথা, মুসলমান বাড়িতে ব্যবহার্য আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দসম্ভার এন্তার ব্যবহৃত হইল তাঁহার লেখায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রধান সমাজ হিন্দু ও মুসলমানের অভিজ্ঞতা ও বাসনার আশ্চর্য সমন্বয় তিনি করিতে সমর্থ হইলেন। বাংলা গদ্যেও তিনি নতুন পাতা খুলিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, বাংলা গদ্যে যাঁহারা ‘আঞ্চলিক’ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন নজরুল তাঁহাদের পথিকৃৎমণ্ডলীর সদস্য।

এককথায়, মুসলমান কবি, হিন্দু-মুসলমান কবি ও মার্কসপন্থী—কবি যুগপৎ এই তিন খেতাব তাহার প্রাপ্য। আহমদ ছফার বিচারে এই তিন পরিচয়ই তিনি একসঙ্গে কাঁধে লইবার যোগ্য হইয়া উঠিলেন। আহমদ ছফার কথাটি অপূর্ব—এমন দাবি আমি করিতেছি না। শুধু বলিতেছি আহমদ ছফা এই বক্তব্য মানিয়া লইয়াছিলেন। আহমদ ছফার আগে অনেকেই বিশেষ করে আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রস্তাবের কাছাকাছি কথা বলিয়া রাখিয়াছিলেন।

খুব অল্প কথায় আহমদ ছফা বলিতে পারিয়াছেন যে, জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর মতন পাশ্চাত্য ব্যবসায়ী কবিকেও একদিন রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব হইতে বাহির হইয়া আসিবার তাগিদে ধরিয়াছিল। তখন নজরুল ইসলামই তাহাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন।

অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কবি যাহারা ‘মার্কসবাদী’ বলিয়া খ্যাত হইয়াছেন তাহারাও নজরুল ইসলাম ছাড়া কল্পনীয় নহেন। আহমদ ছফার মতে এই বিপ্লবের কবিকুলও নজরুল ইসলামের ভাব ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

নজরুল ইসলাম মুসলমান কবি কিন্তু মাত্র মুসলমানের বা শুদ্ধ এসলামী পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন না। এখানেই তাঁহার সহিত ফররুখ আহমদ আর তালিম হোসেনের মতো কবিকুলের ব্যবধান। তাঁহারা যেখানে বন্দী, নজরুল ইসলাম সে জগতের মুক্তবিহঙ্গ।

জীবনের উপান্তে আসিয়া—প্রায় কুড়ি বছর পর আহমদ ছফা নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আর একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নাম ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’। এই প্রবন্ধটিতে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করিলেন। এইবার তিনি নজরুলের ভাষা হইতে যাত্রা করিলেন। বিশ বছর আগেও ছফা খেয়াল করিয়াছিলেন নজরুলের ভাষায়—গদ্য ও পদ্য উভয় আকারেই নতুন হাওয়ার দোলা। নতুন প্রবন্ধেও তিনি নজরুল ইসলামের কবিতার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিরূপণের চেষ্টা করিলেন না। শুদ্ধ ভাষার প্রশ্নেই কথা বলিলেন।

আহমদ ছফার প্রস্তাবানুসারে, কলিকাতার উইলিয়াম দুর্গ হইতে যে বাংলা ভাষাটি গিরিগাত্রের সংকীর্ণ স্রোতস্বিনীর মতো বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পরিণতি মানিয়াছিল, ছফার রূপক মোতাবেক ‘ভরাযৌবনা প্রমত্তা পদ্মার আকার’ ধারণ করিয়াছিল, নজরুল ইসলাম সেই ভাষারই সাধক—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাষাকে যেমনটি পাইয়াছিলেন তেমনটি ছাড়িয়া দেন নাই। তিনি বাংলা ভাষার গতিপথে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করিয়া দিলেন।

সকলেই জানেন, নজরুল ইসলাম বাংলাভাষায় বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ এস্তেমাল করিয়াছিলেন। সেই অপরাধে কেহ কেহ তাহাকে অপরাধীও করিয়াছিলেন। তাহার স্মৃতি ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আছে :

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামই প্রথম করেন নাই। তিনি জানিতেন, তাঁহার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি একই কাজ দেদার করিয়া গিয়াছেন।

তাহা হইলে, নজরুল ইসলামের নতুন নিশানটা কোথায় সে জওয়াব ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে পাওয়া যায়। কবি লিখিতেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুদ্ধ অনেক সাহিত্য সাধক ভুলিয়া গিয়াছেন যে, ‘বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান।’ তাহারা এই সকল সাহিত্যিকের নিকট শুদ্ধ টুপি আর আচকানই দাবি করিতেছেন না। চাহিতেছেন মাঝেমধ্যে বেহালার সঙ্গে সারেঙ্গীর সুরও শুনিতে। শুনিতে চাহিতেছেন ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

আহমদ ছফা এই বেদনার মর্ম সঠিক ধরিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার ছিল নিছক নিরীক্ষার ধারা। অথচ ‘কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ক্রিয়াশীল একটা ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ।’ আহমদ ছফার বয়ান অনুসারে, নজরুল ইসলাম আপনকার কাব্যভাষা তৈয়ার করিবার জন্য দেশে তৎকালীন প্রচলিত ভাষারীতির ‘পাশাপাশি’ গৌণভাবে হইলেও, মুসলমান লিখিত পুঁথিসাহিত্যের ভাষাশৈলীটির দ্বারস্থ হইয়াছিলেন। তাহার সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে পুঁথিসাহিত্যের ভাষার মধ্যে নতুন একটা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হইয়াছে।

অনেকে এই প্রশ্নে আহমদ ছফার সহিত একমত পোষণ করিবেন না। হুমায়ুন কবির পুঁথিসাহিত্যের কথা তুলিয়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন উভয়কেই সামন্ত যুগের কবি বলিতে পিছপা হন নাই। হয়তো সেই বেদনা মনে রাখিয়াই একদিন জসীমউদ্দীন বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের কোন আছর ঘটে নাই। তিনি পুঁথিসাহিত্যের ‘মানসপুত্র’ নহেন। প্রকৃত সত্যের জন্য আমরা শুধু নজরুল ইসলামের জীবনীনির্ভর যুক্তির উপর দাঁড়াইব না। পুঁথির সহিত নজরুল ইসলামের পরিচয় তো ছিলই। কিন্তু তিনি নিছক পুঁথির লেখক হইতে চাহেন নাই। কিন্তু তাহার লেখা বাংলা আলাদা হইতেছে যে গুণে, তাহার মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের একটা হিস্যা আছে। এই বক্তব্য আহমদ ছফার।

পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে বাংলাভাষা যতদূর বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাতেই আরবি-ফারসি বা যাবনী শব্দ বেশ মিশাল হইয়া যায়। যুদ্ধের পরও সেই ধারা বেশ কিছুদিন বহিয়া যাইতেছিল। ইংরেজ প্রশাসন ভাষার উপর হাত দিতেই—আঠার শতকের শেষ নাগাদ—বাংলাভাষার আরেকটা বাঁক তৈরী হইল। সরকারি মনীষীরা বাংলা হইতে যাবনী শব্দ তাড়াইবার কর্মসূচী সেলাই করিলেন। তাঁহাদের চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই, কিন্তু তাহার ছাপ এখনও বাংলায় থাকিয়া গিয়াছে।

দুঃখের মধ্যে, ইংরেজ আমলে বাংলায় শিক্ষাদীক্ষার প্রসার সীমিত থাকায় এই ভাষা-সংস্কার কর্মসূচীও সর্বত্রগামী হয় নাই। কিন্তু বিচিত্রপথে গিয়াছে একথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। মুসলমান সমাজের একাংশ যখন বাংলাভাষায় লিখিতে শুরু করিল তখন তাহাদের আশ্রয় হইল এই নতুন ভাষাই। ওদিকে মুসলমান কৃষক সমাজে এখনও পুরানা ভাষার—পুরানা রীতির জোয়ার।

মুসলমান লেখকরা—যেমন কায়কোবাদ বা মীর মশাররফ হোসেন—ইংরেজি যুগের বাংলা ভাষায় লিখিতে গিয়া কিছু সমস্যায় পড়িলেন। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে, তাহাদের উপহাসের পাত্র না হইতে চাহিলে, কিছু কিছু সীমানা মানিয়া চলিতে বাধ্য বোধ করিলেন। নহিলে আপন সমাজে, পরিবারে, সংসারে সচরাচর ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ তাহাদের রচনায় যতটা সম্ভব পরিহারের চেষ্টা কেন?

ঠিক এই জায়গাতেই নজরুলের ভাষায় একটা বিপ্লব পদবাচ্য ঘটনা দেখা দিল। আহমদ ছফা আপন স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে যাহা লিখিলেন তাহার বয়ান অনেকটা এই রকম: নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজের ঘরে-সংসারে ব্যবহৃত শব্দ-বাক্য ব্যবহার করিতে করিতে এমন একটা কাণ্ড বাধাইলেন যাহাতে বাংলাভাষার অভিধান সংকলকদের কাজ বাড়িয়া গেল। অভিধানের প্রতিটি নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোজনার প্রয়োজন দেখা দিল। নজরুল ইসলামের এইটাই একমাত্র কৃতিত্ব নহে।

তিনি শুধু আরবি-ফারসি মিশাল বাংলা লেখেন নাই। তিনি বাংলাই লিখিয়াছেন যাহাতে আরবি-ফারসি শব্দ আর দশ শব্দের মতন বসিয়াছে। ইচ্ছা করিলে কোন ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহার না করিয়া ‘বিশুদ্ধ’ সংস্কৃত প্রধান বাংলায়ও তিনি লিখিতে পারিতেন, তাহারও বিস্তর প্রমাণ তাহার গানে-কবিতায় পদ্যে-গদ্যে ছড়াইয়া।

নজরুল পুঁথিসাহিত্য লেখেন নাই। কিন্তু তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে পুঁথিসাহিত্য বাদ যায় নাই। আহমদ ছফার কথায়, তিনি পুঁথির প্রাণের আগুন লইয়াছেন, জীর্ণ কংকাল বহিয়া বেড়ান নাই। তিনি পুঁথির শব্দ লইয়াছেন। কিন্তু তাহার বাক্য বমন করেন নাই। তাহার ভাষা-কাঠামো তিনি বদলাইয়া লইলেন।

পরিশেষে, আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত, নজরুল ইসলাম নতুন যুগের প্রবর্তন করিলেন। এই প্রবর্তনার সারকথা কি? আমি ছফার প্রস্তাব পুনরায় তুলিতেছি: পুঁথি লেখকেরা যে ভাষারীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার উদ্দেশ্য বা ফলাফল দাঁড়াইয়াছিল বাঙালি মুসলমান স্বতন্ত্র—একথা প্রমাণ করা। আর নজরুল ইসলামের ভাষা ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশে ঘটিয়াছে। তিনি চাহিলেন বাঙালি মুসলমান বাঙালি সমাজের অংশ—একথা প্রমাণ করিতে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি জুলাই মাসে দুরারোগ্য রোগের আঘাতে বাকশক্তি হারাইয়াছিলেন। তাহার এক বছরের মাথায় ১৯৪৩ সালের জুন মাসের শেষ তারিখে আহমদ ছফা এই ধরাপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হইলেন। পরাধীন বাংলাদেশের মানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন এক উচ্চপর্যায়ে উঠিয়াছে। আহমদ ছফা প্রায়ই কহিতেন, যেদিন তাহার জন্ম হয় সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু জাপান রেডিও হইতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন করিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন।

নজরুল ইসলামের জন্মের ৪৪ বছর পর আহমদ ছফার জন্ম নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনা নাও হইতে পারে। আহমদ ছফার এন্তেকালের দশ বছরের মাথায় আমরাও হয়তো বলিতে পারিব—আমাদের সাহিত্যের সর্বশেষ আদর্শ আর সর্বশেষ বিচারক আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের মর্ম আমরা এখনও ধরিতে পারি নাই।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শুক্রবারের সাময়িকীতে ১ জুলাই ২০১১

Copyright 2011 Salimullah Khan

Leave a Reply

  1. আহমদ ছফা রচিত প্রবন্ধ “নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ”, কি উপায়ে পাইতে পারি, কারো জানা থাকলে বা সম্ভব হলে আমার পেজে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।