চতুষ্কের কবি

মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯২৮-১৯৯৭) বগুড়া জেলার মেঘগাছা গ্রামে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটেনের নুফিল্ড ফাউন্ডেশন (১৯৭২-১৯৭৪), আমেরিকার ডারহামস্থ ডিউক ইউনিভার্সিটি (১৯৯৬) এবং ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমি (১৯৯৭) ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (১৯৯৭) ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সাহিত্য পদক প্রদান করে। হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা (১৯৬৫), বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (১৯৭১) ও Trade, Technology and Society in Medieval Bengal (১৯৯৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সাহিত্য, ধর্ম ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ছাড়াও সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার সমস্যা নিয়ে একাধিক রচনা লিখেছেন তরফদার। কবিতাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। নিজে কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলা রোমান্টিক কাব্যের ঠিকুজিও অনুসন্ধান করেছেন তিনি।

আজ এই লেখকের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্তমান লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
– ফিচার সম্পাদক, এনটিভি

নার্সিসাস নই আমি; আত্মরতি শিখিনি জীবনে;
তবুও আমারই ছায়া ভেসে ওঠে আশ্চর্য দর্পণে।
—মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯৭৬ : ১৪৩)

অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার দেহত্যাগ করিয়াছিলেন ১৯৯৭ সালের ৩১ জুলাই। সেই দুঃখের দিনে কোন শোক প্রকাশ করিতে না পারিয়া আরো দুঃখ হইয়াছিল। তখন আমি উচ্চশিক্ষার ঘাস কাটিতে বিদেশে বসবাস করিতেছি। এই মৃত্যুর দেড় বছরের মাথায় অধ্যাপক আহমদ শরীফ আর আড়াই বছরের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও ইহলোক ত্যাগ করেন। এই তিন অধ্যাপকের গুণ আমি যতদূর পারি গ্রহণ করিতে তৎপর ছিলাম। তিনের মধ্যে মাত্র আব্দুর রাজ্জাকের মর্সিয়াই আমি তখন তখন লিখিতে পারিয়াছিলাম। পাক্কা কুড়ি বছর পর আজ মমতাজুর রহমান তরফদারের কথা দুই কলম লিখিতে বসিয়াছি।

তরফদার সাহেব ভূ-বাংলাদেশে ইতিহাস লেখক পরিচয়ে বিশিষ্ট। বস্তুত তাঁহার সহিত তুলনা দিবার মতন ইতিহাস লেখক এদেশে বড় বেশি নাই। তাঁহার লেখা ‘হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা’ (১৯৬৫) আর ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ (১৯৭১) বাংলাদেশের ইতিহাস সাহিত্যের দুইটি অমূল্য সম্পদ। একদা এক জায়গায় তিনি নিজেকে ‘কবিতা-লেখক’ উপাধিও দিয়াছিলেন। এই সত্যের সহিত সাক্ষাৎ-পরিচয় না থাকিলে অন্য অনেকের মত হয়ত আমিও বিশেষ অবগত থাকিতাম না।

১৯৭৬ সালে তরফদার সাহেব ‘চতুষ্ক’ নামক একটি কবিতা সংগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন নিজ খরচায়। সংগ্রহের মুখবন্ধ উপলক্ষে তিনি খবর দিয়াছিলেন কৈশোরে—মায় যৌবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত—তিনি কবিতা ব্যবসায়ে শরিক ছিলেন। ১৯৭৬ সালের তথ্য অনুসারে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তাঁহার কিছু কবিতা সেকালের পত্রপত্রিকায় মুদ্রিতও হইয়াছিল। ‘তারপর’—তাঁহার ভাষায়—‘কবিতা-রচনায় বিরতি ঘটে বিশেষ কারণে।’ বিশেষ কি তিনি আর বিশদ করেন নাই।

অনেকদিন—মানে কুড়ি বছর—পর আবার কবিতাক্ষেত্রে ফিরিয়া আসিলেন তিনি। অনধিক দুই বছরে গোটা চারি কেতাব ভরাইবার মতন কবিতা লিখিয়াও ফেলিলেন। এ সত্যের নিশ্চয় কোন তাৎপর্য আছে। একটা তাৎপর্য কবির একান্ত বা দৈনন্দিন জীবনের সহিত জড়িত বিষয়—সেই তাৎপর্যানুসারে চরিতামৃত লেখকেরা নিশ্চয়ই পদাবলি লিখিবেন। আরেকটা তাৎপর্য অনেকান্ত—ইহার সত্য ইতিহাসের অন্তর্গত। আমি আজ সেদিকেই মন যোগ করিতে চাই।

আমাদের পরম সৌভাগ্য যে মমতাজুর রহমান তরফদার প্রতিটি কবিতার পাদদেশেই একটি করিয়া রচনার তারিখ উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। চোখের পলকেই দেখা যায় ‘চতুষ্কে’র সকল কবিতা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে রচিত। ততদিনে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হইয়া গিয়াছে। এ সত্যে সন্দেহ ছিল না বলিয়াই তরফদার সাহেব লিখিতে পারিয়াছিলেন, ‘কবিতা-লেখক হিসেবে আমি উদীয়মান নই, উদিতও নই, বরং অস্তগামী।’

স্বভাবের বশেই প্রশ্ন উঠিবে—কবিতা কবির কীর্তি, পড়িলেই বুঝিতে পারি কিন্তু যিনি এই কবিতাগুলি রাখিয়া গিয়াছেন তিনি কোন কারণে এইগুলি লিখিবার জন্য ১৯৭৫-৭৬ সাল বাছিয়া লইয়াছিলেন? প্রশ্নের একটা অপ্রত্যক্ষ জওয়াবও তরফদার সাহেব দিয়াছিলেন এইভাবে : ‘ইতিহাসকে বারবার ব্যবহার করেছি অতীতের কঙ্কাল হিসেবে নয়, বর্তমান সমাজ-জীবনের প্রতীক এবং অনুষঙ্গ রূপে, কখনো বা বৃহত্তর জীবনের পটভূমি রূপে।’ এই সত্যের আভাস কবিতার মধ্যেও ঢের পাওয়া যায়। উদাহরণ দিতেছি একটা। ‘ব্লাড ব্যাংক’ নামা একটি কবিতার নিচের তারিখ ৩০ জুন ১৯৭৬। তাহার একাংশে পড়িতেছি এমন এক বৈপরীত্যের গল্প যাহা রূপকথার অঙ্গ নহে। ইহাকে বরং ‘ইতিকথার পরের কথা’ বলা যাইতে পারে।

এখানে মানুষ ইস্পাত বা অন্য কোনো কঠিন ধাতুতে গড়া।
তারা রুপোর টেবিলে ঝুঁকে পড়ে সোনার অক্ষরে নাম সই করে।
আসবাব-পত্র, ঘরদুয়ার, পথঘাট, গাছপালা মুক্তায় তৈরী।
মেয়েদের শাটিন আর বুতিক কঠিন পাথরের
আর তাতে রক্তময় মণির আলো ঠিকরে পড়ে।
হীরকের কাছ থেকে অমৃতের ফল ঝরে।
পানীয় এখানে তরল সোনা; এখানে রক্ত নেই।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯)

একদিকে তিনি দেখিয়াছেন হাসপাতালে রক্ত নাই, ব্লাড ব্যাংকে রক্ত পাওয়া ভার, রক্তের অভাবে রোগী মারা গিয়াছে অথচ চারিদিকে রক্তের সমুদ্র। এই বৈপরীত্যে তিনি হতবাক।

হাজার হাজার গ্রাম মানচিত্রে শুয়ে আছে
সবুজে, নীলে, আরো বিচিত্র রঙের সম্ভারে।
ভরে ওঠে লাখ লাখ সিরিন্জ্ তরমুজের রসের মত রক্তে—
গোলাপী, লাল লাল রক্তে।

এখন শহরের ব্লাড ব্যাংক রক্তের সমুদ্র,
তাতে অণু-পরমাণুর তরঙ্গ ওঠে।
গ্রামে গ্রামে নেমে আসে সন্ধ্যা—নরম নরম সন্ধ্যা।
আকাশে তারাগুলো কাঁপছে।
খেতে, খামারে, আঙিনায়, বারান্দায়
পড়ে আছে লাখ লাখ লাশ।
নিসর্গ ডুবে গেছে স্তব্ধতার সমুদ্রে।

সাত নম্বর ক্যাবিন ফাঁকা।
সে মর্গে—বোধ হয় রক্তের সন্ধানে।

ফিকে চাঁদ দিগন্তে;
আকাশ তারায় তারায় ঝাঁঝরা—
ওটা ক্যান্সার রোগীর হৃৎপিণ্ড।

গ্রামের আকাশের তারাগুলো
লাশের উপর মৃদু মৃদু আলো ছড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯-৬০)

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের তুলনা খুব কম আছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর ক্রান্তিকাল এদেশের ইতিবৃত্তে বহুদিন অনতিক্রান্ত থাকিবে বলিয়াই মনে হয়। মমতাজুর রহমান তরফদার দেখিতেছি কবিতায় ফিরিয়া আসিতেছেন এই কালসংক্রান্তির—এই ১৯৭৫ সালের—গোড়ার দিকেই। তাঁহার ‘চতুষ্ক’ গ্রন্থের পহিলা কবিতার নিচে তারিখ ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। এই দিনই তিনি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙ্গিলেন। তরফদারের প্রথম কবিতার নাম ‘অরণ্য’। এই সমাপতন একান্ত আকস্মিক মনে করার কোন হেতু দেখিতেছি না। চতুষ্কের শেষ কবিতা ‘বুকের আগুনে’। ইহার একটি পংক্তি : ‘আর কত বার আমরা নতুন ব্যাখ্যা দেব স্বাধীনতার’।

বাংলাদেশে একখণ্ড জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। যাঁহারা দীর্ঘ সাধনার বলে এই ভিত্তিটি পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করিতেছিলেন ইতিহাস ব্যবসায়ী মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহাদের প্রথম সারিতে। দিল্লিতে সুলতানি শাসন প্রবর্তনের পরপরই বাংলাদেশেও স্বাধীন রাষ্ট্রের নতুন করিয়া গোড়াপত্তন হইয়াছিল। সেই গোড়াই পত্রেপুষ্পে ফলবান হইয়াছিল ইংরেজি পনের শতকের শেষ ও ষোল শতকের শুরুতে। এই সত্যে তরফদারের সন্দেহ ছিল না।

জনসাধারণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি—এই সত্যের উপর দাঁড়াইয়াই বাংলাদেশের নতুন প্রজাতন্ত্র আপনার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা অর্জন করিয়াছিল। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম প্রকৃত প্রস্তাবে সেই ন্যায্যতার মূলেই জয়ী হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জনগণের সেই ইচ্ছার সাময়িক বিয়োগ ঘটায়। তরফদারের ‘অরণ্য’ কবিতায় দেখিতেছি সেই আবহের রূপকই পুরাদস্তুর উপস্থিত।

আদিম অরণ্য এই স্বর্গ, মর্ত্য অথবা পাতালে;
ছিল না সূর্যের আলো এ অরণ্যে আমাদের কালে।
স্যাঁৎস্যাঁতে এই মাটি, কর্দমাক্ত পথ ও প্রান্তর
নিঃশব্দ আরণ্য নদী, শব্দহীন বনবনান্তর।
এখন বাতাস ভারি এবং রক্তের গন্ধ সহজাত যেন;
প্রকৃতি আর্দ্রতা ঝেড়ে কঙ্কালের শুভ্রতা বাড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৩)

এই জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে মহান লেখক আহমদ ছফার কথাও উল্লেখ করিতে হয়। তিনি কবিতা লেখা শুরু করিয়াছিলেন ১৯৫০ সালের পরের কোন এক পর্যায়ে। ১৯৬৪ সালের পর তাঁহার কোন কোন কবিতা ঢাকা শহরের পত্রপত্রিকায় ছাপা হইতে শুরু করে। ১৯৬৬ সালের পর হইতে তিনি উপন্যাস-শুদ্ধ নানা প্রকার লেখা প্রকাশ করিতেছিলেন। কিন্তু যতদূর জানি ১৯৭৫ সালের আগে তিনিও নিজের লেখা কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন নাই। অথচ ১৯৭৫ সনের প্রথম ভাগে আহমদ ছফা যেন বা বড় কোন তাড়ায় পড়িয়া পরপর দুইটি ছোট ছোট কবিতার বই—যথাক্রমে ‘জল্লাদ সময়’ ও ‘দুঃখের দিনের দোহা’—প্রকাশ করেন। ‘জল্লাদ সময়’ কবিতা সংকলনের নামকবিতায় আহমদ ছফা অন্যান্যের মধ্যে এই কথা-গুলিও লিখিয়াছিলেন :

সূর্যালোকে পিঠ দেয় আততায়ী লজ্জিত সময়
যা কিছু প্রকাশ্য তুমি বামহস্তে করছ গোপন
সমূহ ধ্বংসের বীজ গর্ভাশয়ে করেছ রোপণ
কিন্তু কিছু সত্য আছে কোনদিন লুকোবার নয়।
(ছফা ২০১০ : ২৪)

আহমদ ছফার আরেকটি কবিতার নাম ‘দুঃসময়’। এই কবিতাটি ‘দুঃখের দিনের দোহা’ নামক সংকলনের অংশ। এখানেও কবি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা দুর্দিনের বার্তা বৈ নয়।

নদীতে বইছে বেগে খরতর খরস্রোত
দুকূলে নামছে ধ্বস, অবিরত চলছে ভাঙন
ভাঙন ভাঙন শুধু চারদিকে ভাঙনের ক্ষণ।

বইছে কুটিল জল তটরেখা করে না শাসন
এই জলে পলি নেই, নেই কোন গর্ভের সঞ্চার
জাগবে না স্রোতোপথে চরের আদল।
(ছফা ২০১০ : ৫২)

আমার মনে হইয়াছে মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতা পড়িবার পূর্বাহ্নে ভূমিকাস্বরূপ এই কয়টি কথা না বলিলেই নয়। আমি আমার একান্ত অভিজ্ঞতা হইতেই জানি, আহমদ ছফার সহিত তরফদারের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তিনি যে আহমদ ছফার কবিতার সহিত পরিচয় রাখিবেন—তাহা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় না।

বাংলাদেশে যাহাকে বলে অনগ্রসর—তদুপরি মুসলমান—কৃষক-সমাজ তাহার অনেক সদস্যের মত আমিও কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্দুকে জীবনপাত্র বন্ধক রাখিবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার সুবাদে হাতে গোনা কয়েকজন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম। এই গুণীদের মধ্যে অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার। তাঁহার কাছে আমার অনেক ঋণ আজও অপরিশোধিত। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি শুদ্ধ দুই-তিনটি ঋণের কথা স্বীকার করিব। তবে বলিয়া রাখিব তাহাতেই আমার কর্তব্যের তামাম হইবে না।

পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তরফদার সাহেব একদিন আমাকে ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ নামক যে প্রতিষ্ঠানের সহিত তিনি নিখিল জড়াইয়া ছিলেন তাহার কোন এক শীতকালীন সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন। সনতারিখের বালাই আমার মনে বিশেষ থাকে না।  একটার নাম ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ আর একটার পরিচয় ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি’—এই ক্রমে যে দুইটা পদার্থ ঢাকায় আছে তাহাও আমি অনেকদিন পর্যন্ত আমল করি নাই। এতদিনে শুনিতেছি ইহাদের মধ্যে সংঘর্ষও  আছে। তাহাতে আমার মাথাব্যথা নাই।

ঘটনাটি খুব সম্ভব ইংরেজি ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের দোতলায় একটি সেমিনার ঘরে ইতিহাস পরিষদের ঐ অধিবেশন বসিয়াছিল। বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বিশেষ বলিতে ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখিবার সময় হইয়াছে কিনা তাহাই ছিল বিবেচ্য। কেহ কেহ বলিতেছিলেন সময় হইয়াছে; এখনই ইতিহাস লেখা শুরু করিতে হয়। আর কেহ বা না লেখার পক্ষে যুক্তি দেখাইতেছিলেন। বলিতেছিলেন: না, না, এখনো সময় হয় নাই। এক্ষণে শুদ্ধ ইতিহাসের মালমশলা যোগাড় করিতে হইবে, পরিণাম ইতিহাস পরে দেখা যাইবে। মনে রাখিতে হইবে, তখনো বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অর্ধযুগ পার হয় নাই।

অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন মমতাজুর রহমান তরফদার। প্রবন্ধ পড়িলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষক তাজুল ইসলাম হাশমী। হাশমী সাহেবের যুক্তি কি ছিল তাহা আমার এখন আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। ইতিহাস পরিষদের নথিপত্র ঘাঁটিলে হয়ত কিছু প্রমাণ এখনো পাওয়া যাইবে।

মনে পড়িতেছে ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণে একটু জড়তা ছিল। যতদূর জানি বাংলা তাঁহার মাতৃভাষা ছিল না কিন্তু তিনি দেখিলাম বাংলাতেই লিখিলেন। যাহা হৌক, আমাকে সেই অধিবেশনে হাজির করিয়াই তরফদার সাহেব আপন কর্তব্য সমাপন করেন নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢের ছাত্র ও সমাগত অনেক শিক্ষকের সামনে আমাকে দাঁড় করাইয়া পর্যন্ত দিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন হাশমীর প্রবন্ধের উপর মন্তব্য যোগ করিতে হইবে। বুঝিতে পারি নাই তিনি কেন এই অযৌক্তিক (‘গর্হিত’ বলা হয়ত সম্পূর্ণ ঠিক হইবে না) কাজটি করিতে গেলেন। এখন মনে হইতেছে ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত তাঁহার দেওয়ানে ইহা সম্ভব হইয়াছিল।

স্কুলবেলার পাঠ্যপুস্তকে পড়া একটি গল্প সেদিনের বক্তৃতার মধ্যে চোলাই করিয়াছিলাম। যতদূর মনে পড়ে পুস্তকের নাম ‘পাক মেট্রিকুলেশন ট্রান্সলেশন’। উপসংহারে বলিয়াছিলাম, ইতিহাস না পড়িয়াই মরিতে হইতেছে জানিয়া এক রাজা বড় দুঃখ পাইয়াছিলেন। দুঃখ দূর করিবার মানসে তাঁহার অন্তিম মুহূর্তে ধীমান এক মন্ত্রী রাজার কানে কানে বলিতেছিলেন, ‘রাজা মহাশয়, ইতিহাস পড়িতে না পাইলেন তাহাতে দুঃখ করিবেন না। পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম তো আমার জানাই আছে; এখনই শুনাইয়া দিতেছি: মানুষ জন্মিয়াছে, দুঃখ পাইয়াছে আর মরিয়াছে—ইহাই পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম।’ রাজা তখনই আনন্দাশ্রু নির্গত করিতে করিতে চক্ষু মুদিয়াছিলেন। কোন কোন আকলমন্দের জন্য—শুনিয়াছিলাম—গল্পের ইশারাই যথেষ্ট প্রমাণিত হইয়াছিল।

সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানে পা দিয়াছি। সময়টা বেশ। প্রথম বছরটা শেষ করিয়াছি কি করি নাই। তাহার উপর আমি ‘ইতিহাস’ কিংবা ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ কোন বিভাগের ছাত্র নহি। তরফদার সাহেবের সহিত আমার দেখা করাইয়া দিয়াছিলেন যিনি আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সহিত আমার মোলাকাতের কারণও ছিলেন সেই মহাত্মাই। নাম আহমদ ছফা। তখন মনে মনে সন্দেহ জাগিয়াছিল তরফদার সাহেব হয়ত আহমদ ছফার কথায় প্রভাবিত হইয়াছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হই বাহির হই এমন সময়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটা লিখিত বক্তৃতা বা প্রবন্ধ সমালোচনা করিয়া আমি একটি ছোট্ট বেজায় প্রবন্ধ লিখি। তাহাতে মহাত্মা আহমদ ছফা সত্য সত্যই বেজার হইয়াছিলেন। তিনি আমাকে একবার ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, ‘তোমার জিহ্বার মধ্যে একটি ঘাতক হাঙ্গর। তাহার আশীর্বাদে জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিবে না।’ গুরুজনের আশঙ্কা বৃথা যায় না। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিয়াও সেই অমৃতের ফল আমার হাত হইতে ছুটিয়া গিয়াছিল। চাকরির গোড়া শুকাইয়া গিয়াছিল।

আব্দুর রাজ্জাকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোন মহাশয়ের সমালোচনা বিশেষ করি নাই। যদি কাঁহারও করিতে হইত তো আমি মমতাজুর রহমান তরফদার কিংবা তাঁহার গুরু আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর কীর্তি লইয়াই তাহা করিতাম। মনোবল শেষ হইয়া গিয়াছিল। আর সাহস গিয়াছিল শুকাইয়া। সাহস বড়ই তরল পদার্থ। যে পাত্রে রাখেন তাহারই আকার ধারণ করে। আল্লাহতায়ালার পরম করুণায় অল্পেই—অপার বিলম্ব ঘটিবার আগেই—বুঝিয়াছিলাম অল্পবিদ্যা কত ভয়ংকর।

এক্ষণে বলিয়া রাখি, আমার চাকরি যাইবার পশ্চাতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোন হাত ছিল না। তিনি বরাবরই আমার বরাভয় ছিলেন। এই জাতীয় ঘটনাকে গ্রিক পুরানে ‘ট্রাজেডি’ বলা হইত। একালে আমরা বলি ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’।

এক্ষণে আমাকে আরেকটি ঋণের কথা বলিতে হয়। ১৯৮৬ সাল নাগাদ আমি উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশ যাইবার একটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দেশে ফিরিবার পথে কিছু দেরি হইয়াছিল। কিছু মানে গোটা চৌদ্দ বছর। আগেই কহিয়াছি আমার ফিরিবার আগেই তরফদার সাহেব পরলোকগমন করিলেন ৩১ জুলাই ১৯৯৭। এক্ষণে আঁক কষিয়া দেখি আর একদিন পার হইলেই তাঁহার জন্মের দিন আর মৃত্যুর দিন এক দিবস হইত। জীবনের ৬৮ বছর যেদিন পূর্ণ করিলেন সেদিনই তাঁহার ইহবিয়োগ হইল। তাঁহার সহিত এ জীবনে আর দেখা হইবে না। আমি যে তাঁহার কবিতা লইয়া এই প্রবন্ধ লিখিতেছি তিনি কোনদিন জানিতে পারিবেন না।

১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান খাড়া করিলে তরফদার সাহেব উহার সভাপতি নিযুক্ত হইলেন। আমি ততদিনে বছর দুই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটাইয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসিয়াছি। উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের প্রথমদিকের একটি সেমিনারের বিষয় ছিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন বিষয়ে কার্ল মার্কস যে সকল লেখা লিখিয়াছিলেন সে সকল লেখার পর্যালোচনা। তরফদার সাহেব সেই সেমিনারেও সরকারি খামে আমাকে কেন জানি নেমন্তন্ন করিয়াছিলেন।

প্রচার করা হইয়াছিল এই সেমিনারে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম একটা মূল্যবান প্রবন্ধ পড়িবেন। তাঁহার লেখার পর্যালোচনা করিতে মোট দুইজন আলোচক সরকারি ডাক পাইয়াছিলেন। একজনের নাম আবু আহমদ আবদুল্লাহ। নিজের নামেই ইনি যথারীতি দেশবিখ্যাত। সেই সময় ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ নামক এক আধা-সরকারি কেন্দ্রের অর্থনীতি ব্যবসায়ী পরিচয়ে ভূষিত তিনি। আরজন আমি। মাত্র নগণ্য প্রভাষক। তাহাও আবার ‘ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট’ নামক ইতিহাসে অব্যবসায়ী একটি গোমড়ামুখ শিক্ষাসত্রের।

এই অধিবেশনে আমি ঠিক কোন কোন বাক্য আওড়াইয়াছিলাম তাহা আমার এখন আর মনে নাই। শুদ্ধ এইটুকু মনে পড়িতেছে যে মোফাখ্খার সাহেব যাহা বলিয়াছিলেন তাহার অনেক কথাই আমার মনে ধরে নাই। সে যুগে আমি মার্কস ব্যবসায়ে নামিয়াছি খুব বেশিদিন হয় নাই। আর এদিকে মোফাখ্খার সাহেব পশ্চিম দেশীয় পণ্ডিতদের পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করিয়া কার্ল মার্কসের মুণ্ডুপাত করিতেছিলেন। আর যায় কোথায়! ইহার ফল—বলা বাহুল্য—ভাল হয় নাই। আহমদ ছফার আবিষ্কৃত দুশমন হাঙ্গরটি তখনো আমার জিহ্বা ত্যাগ করে নাই।

এখন আমার তৃতীয় দফা ঋণ বা ঋণমালার কথা বলিব। মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহার নিজের লেখা দুই-তিনটা পুস্তক আমাকে উপহারস্বরূপ দিয়াছিলেন। একটির নাম ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’। দ্বিতীয়টির নাম ‘চতুষ্ক’। চতুষ্কের কথা এই নিবন্ধের গোড়াতেই একবার বলিয়াছি। এক্ষণে আরেকটু বিস্তার করিবার বাসনা হইতেছে।

তিনি খুব সম্ভব আশা করিয়াছিলেন অন্তত শেষের কেতাবটি লইয়া আমি দুই কথা মুসাবিদা করিব। এই কবিতাবলির ভূমিকাচ্ছলে তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে যথেষ্ট ইশারা আছে যে লোকে ইহার সমালোচনা করেন। তাঁহার বিভাগের জনৈক সহকর্মী সমীপে প্রকাশ্যে এই বাসনা পেশও করিয়াছিলেন। তরফদার সাহেবের বাসনাটি ছিল এইরকম :

লিখেছিলাম নিতান্তই আত্মবিনোদনের জন্য। প্রফেসর আহমদ শরীফ, অধ্যাপক, কবি মুফাখ্খরুল ইসলাম এবং ডক্টর পারেশ ইসলাম মুস্তাফিজুর রহমানের তাগিদে কবিতাগুলো প্রকাশ করলাম। আমার বহু কবিতার জন্মলগ্নের সঙ্গে ডক্টর মুস্তাফিজুর রহমানের নিবিড় পরিচয় আছে। এখানে তাঁর নাম উল্লেখ করলেও আমার কবিতার সমালোচনার অধিকার তাঁর রইল। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ-ছয়)

‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ বইটি ছাপা হইতে না হইতে ১৯৭১ সাল আসিয়া গিয়াছিল। ইহার গায়ে ছাপ মারা ছিল ১৯৭১ সালের। প্রকাশকাল জানুয়ারি ১৯৭১ আর প্রকাশক—পুস্তকে মুদ্রিত পাঠ অনুসারে—‘অধ্যক্ষ মুনীর চৌধুরী, বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। মনে পড়িল সে যুগে বিভাগীয় প্রধান বাংলা প্রকরণে ‘অধ্যক্ষ’ পরিচয়ে চলিতেন।  তবে শব্দটা শেষ পর্যন্ত চলিল না কেন সে প্রশ্ন নিহিতই রহিল। আরো জানিলাম, ‘বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ’ তখনো এক পাত্রেই রাখা হইত।

সঙ্গত কারণেই বইটির ভালমত বিলিবিতরণ হয় নাই। ১৯৭৭-৭৮ সালের কোন একদিন আমার হাতে একটি কপি তুলিয়া দিবার কালে তরফদার সাহেব বলিতেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের বিপ্লবে আমার বইয়ের প্রায় সব কপি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। গোটা দশ কপি আমার নাগালে ছিল। একটা দিয়াছিলাম হুমায়ুন কবিরকে, ১৯৭২ সালে। সে বলিয়াছিল একটি আলোচনা লিখিবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে মারা যায় হুমায়ুন।’

আমার কপিটি হস্তান্তরের সময়ও তিনি সেই পুরাতন কথাই বলিতেছিলেন, ‘এটাই আমার শেষ কপি।’ তখন থাকিতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে। সেই এজমালি কাড়াকাড়ি ছাত্রাবাসের মধ্যেও কপিটি আমি বহুদিন যক্ষের ধনের মত রক্ষা করিয়াছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা করিতে পারি নাই। কথা রক্ষার প্রসঙ্গ উঠাইতেছি না। রক্ষার যোগ্যতা আমার তখন হয় নাই—সিদ্ধি আজও অধরাই রহিয়াছে।

পরে ‘আবদুর রহমানের সন্দেশ-রাস্ক’ নামে একটি আলাদা প্রবন্ধও তিনি প্রকাশ করেন। ইহাকে ‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’র পরিপূরক বলা যাইতে পারে। আওয়াধী-হিন্দী ও বাংলা কাব্যের তুলনায় সমালোচনা করিবার মানসে তরফদার সাহেব শুদ্ধ ‘আওয়াধী-হিন্দী’ ভাষাই শেখেন নাই, মনে হইতেছে বাংলা কবিতায়ও হাত মকশো করিতেছিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? তিনি দেখিতেছি ফরাশি ভাষাও অনেক দূর আত্মস্থ করিয়াছিলেন। মমতাজুর রহমান তরফদার ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত এই সাধনা তাঁহার দ্বিতীয় স্বভাব হইয়া উঠিয়াছিল।

পাঠিকা হয়ত লক্ষ্য করিবেন মমতাজুর রহমান তরফদার নিজেকে কদাচ ‘কবি’ বলেন নাই। বলিয়াছিলেন মাত্র ‘কবিতা-লেখক’। মনে পড়ে রাজা রামমোহন রায় তাঁহার জমানার কবিদের অন্তত একবেলা ‘কবিতাকার’ বলিয়া ডাকিয়াছিলেন। কোন এক কবি বলিয়াছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কথাটার সত্যাসত্য নির্ভর করে ‘কবি’ বলিতে আপনি কি বুঝাইতেছেন তাহার উপর। আমরা অন্য প্রকরণে বলিয়া থাকি মানুষ মাত্রেই কবি কেননা তাহার মধ্যে বাক্যের ঊষ হইয়াছে। আর কে না জানে ভাষার মধ্যে দুইটি নিয়ম যুগপদ ভাষাকে বাক্যের সমান করিয়াছে। ইহাদিগকে যথাক্রমে ‘রূপক’ ও ‘লক্ষণা’ বলিয়াই আমরা জানি।

এক্ষণে আমি তরফদার সাহেব আমাকে দুই নম্বরে যে বইটি দান করিয়াছিলেন তাহার কথা পাড়িতেছি। বইয়ের নাম ‘চতুষ্ক’। ইহা চারিটি বইয়ের একত্রিত নাম। বই চারিটি যথাক্রমে ‘প্রত্ন’, ‘অন্ধকার অভিজ্ঞতা: আলোক’, ‘আভা’ এবং ‘অনন্য সুরগুলো’ নামে রচিত। বহিচতুষ্টয়ের অন্তর্গত কবিতার সংখ্যা গোটা ছিয়ানব্বই। অতিরিক্ত সংযোজনা আকারে আরো সাতটি কবিতা পাওয়া যাইতেছে।

বই চারিটি তিনি চারিজন ইষ্টের নামে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। একটি উৎসর্গ প্রসঙ্গে খানিক শোকের কাহিনীও বিবৃত করিয়াছিলেন তিনি। তরফদার লিখিয়াছেন :

শেষ কাব্য ‘অনন্য সুরগুলো’ বহু দিন আগে পাণ্ডুলিপিতে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের প্রতি উৎসর্গ করেছিলাম। তখন উৎসর্গের অংশে একটি-মাত্র কবিতা-পংক্তি ছিল। তাঁর দাফন শেষ করে এসে দ্বিতীয় প্রুফে ২৮/৫/৭৬ তারিখে প্রথম লাইনটি যোগ করে দেই। শিল্পী বিদেশ থেকে ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে এপ্রিল মাসে দেখা করি। তাঁর শোয়ার ঘরে একটি অসমাপ্ত চিত্রের সামনে বসে দু’জন আড়াই ঘণ্টা কথা বলি। তারপর ‘জয়নুল আবেদিনের অসমাপ্ত চিত্র’ শীর্ষক কবিতাটি লিখি। কবিতাটি অথবা উৎসর্গের ঘটনাটি শিল্পী জানতে পারলেন না। আমার কাছে তাঁর মৃত্যুর মতই এই ঘটনাটি শোকাবহ। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ)

এখানে আমরা উৎসর্গপত্রের সেই দুইটি পংক্তি নকল করিয়া দিতেছি।
এখন ডুবেছে সূর্য সমাপ্তির গোধূলি-হাওয়ায়;
সব রঙ, সব রেখা বিদ্যুতের শিখা হয়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৫)

মমতাজুর রহমান তরফদার বগুড়া জেলার যে গ্রামে জন্মিয়াছিলেন তাহার নামেও আছে রূপক, আছে কবিতার গন্ধ। আর কি বাহারি সে নাম! ‘মেঘগাছা’! ‘গাছগুলো মেঘরঙ’ নামক একটি কবিতায় তরফদার মোটে একবার নয়, গোটা দুইবার জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।

গাছগুলো মেঘরঙ—
এই নাম যারা দিয়েছিল গ্রামটিকে
তারা কি কবি ছিল?
(তরফদার ১৯৭৬ : ২২, ২৪)

‘একটি প্রার্থনা শুধু’ নামের আরেকটি কবিতাযোগে তিনিও ‘মেঘগাছা’ গ্রামের স্মৃতি পুনর্জাগ্রত করিয়াছিলেন। প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন সেই গ্রামে সমাহিত হইবার।

একটি প্রার্থনা শুধু তোমাদের কাছে—
যদি নানা রঙ ঝরে অমৃতের গাছে
জল দিও বনেদী আলবালে।

যদি অন্ধকার নামে অমৃতের গাছে
নিতান্ত অকালে,
লাশটিকে রেখে দিও মর্গের সোপানে।
যদি ঠাঁই নাই-ই মেলে, তবে অন্য খানে—
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘরঙ আর
যে গ্রামের বাতাসেও বসন্তবাহার
শুনেছি অনেক বার।…
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫২)

মমতাজুর রহমান তরফদার কখনো কখনো দূর বিদেশে বসিয়াও এই মেঘগাছা নধর গ্রামের স্মৃতিকাতর হইয়াছিলেন। ‘ঋণ’ নামক একটি কবিতায় দেখি তাঁহার পুরানা সেই আকুতি ফিরিয়া আসিয়াছে। কোন এক দূরদেশে গিয়াছেন তিনি। ধরিয়া লইলাম বেড়াইতেই গিয়াছেন। সেখানে ‘প্রিমরোজ হিল গার্ডেনের। স্বাপ্নিক চূড়ায়’ দেখিতেছেন ‘জুনের নরম রোদ মায়ের স্তনের মত স্নিগ্ধ ও মসৃণ’—এমন সময় হঠাৎ তাঁহার মনে পড়িল ‘মেঘগাছা’ গ্রামের কথা।

চমকে-ওঠা হরিণের মন
আকস্মিক চলে গেল উত্তর বঙ্গের কোনো গ্রামে,
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘের মতন,
যে গ্রামে এখন এক স্নিগ্ধ সন্ধ্যা নামে।
অনেক রক্তের ঋণ, অনেক অন্নের ঋণ
জমে আছে প্রিমরোজ হিলের মতন।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৯-৭০)

গ্রামের সহিত এই বাঁধাপড়া কি বোঝাপড়া শুদ্ধমাত্র একটি গ্রামের ঘটনা? মোটেই নহে। ‘গাছের উক্তি : অনিকেত নই’ নামাঙ্কিত অন্য একটি কবিতায় গ্রাম ছড়াইয়া পড়িয়াছে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বড় বড় সব জনপদে। ফরাশি চিত্রশিল্পী এদুয়ার্দ মানের একপ্রস্ত আপ্তবাক্য উদ্ধার করিয়া তরফদার এই কবিতাটির বিসমিল্লাহ করিয়াছিলেন। মানের কথাটা তিনি ফরাশি জবানেই লিখিয়াছিলেন : ‘ইল ফোতেত দো সোঁ তঁ’ (Il faut être de son temps)—অর্থাৎ আপন যুগের মানুষ হওয়াটাই দায়। তরফদারের কবিতায় এই বাক্যটিই দেখিতেছি নতুন নিয়ম আকারে হাজির হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘কেবলি আমার রক্তে বেজে ওঠে পুরাতন বীণা।’

আমার শিকড় বাঁধা বরেন্দ্রের রক্তিম মাটিতে
হাজার হাজার নিম্নগামী মূলের সম্ভারে।
কিন্তু এই সত্তা জাগে আকাশের সমুদ্রের গায়
রোদের বৃষ্টিতে আর রঙে রঙে নিসর্গের বিমুগ্ধ আমেজে,
ফুলে ফুলে, শাখা-প্রশাখায় অস্তিত্বের আকুল বিকাশে।
এখন আমার সত্তা ছায়া ফেলে সমুদ্র-আকাশে।

বারবার দুলে উঠি; ছায়া জাগে
অন্ধকার বঙ্গে, সমতটে, হরিকেলে,
কুয়াশার শালবন-বিহারের ধূসর প্রাকারে,
সুদূরের মহাস্থানে, করতোয়া নদীর কিনারে,
রক্তময় পাহাড়পুরের পথে, ভিক্ষুদের স্তূপের চূড়ায়,
সমুদ্রের কূলে-উপকূলে
সম্ভাবনাময় স্বপ্নে বারবার দুলে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪৮-৪৯)

শুদ্ধ এই কবিতায় কেন, তাঁহার প্রায় সকল কবিতায় এই একটু খোড়াখুড়ি করিতেই পৌঁছাইবেন—একটু আগাইতেই হোঁচট খাইবেন—এই ধরনের পংক্তিতে :

শুনেছি পাহাড়পুর, পৌণ্ড্রদেশ কিংবা ময়নামতী
পৃথিবীর ইতিহাসে রেখেছিল গভীর সঙ্গতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬১)

মমতাজুর রহমান তরফদারের তরফে পুরাতন ইতিহাস নেহায়েত নয়া জমানার প্রতীক মাত্র বনিবে না বা চাকরি মাত্র করিবে না, তাহার ঢের কাজ পড়িয়া রহিয়াছে। ‘কলরব তবু শোনা যায়’ শিরোনামের এক কবিতায় তাহাই দেখিতে পাইতেছি :

একটু দূরে খালটার নির্জন কিনারে
যখন হেমন্ত-সন্ধ্যা নেমে আসে বাবলার ঝাড়ে
কোনো এক নির্জন গুহায়
বারবার আজো শোনা যায়
অতীতের মৃদু কলরব;
নিসর্গ এখনো নয় গত-মহোৎসব।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩২)

অতীত ও বর্তমানের যুগল রচনা করিতে বসিয়া তিনি কখনো কখনো চমকিয়া উঠিবার মতন সাকার পংক্তিও লিখিয়াছেন। ‘এই গ্রামে’ নামক একটি কবিতার একটি চিত্রকল্প পরখ করিলেই ধরা পড়িবে চিত্রকল্পের ক্ষমতা বলিতে কি বুঝায়। তরফদার লিখিতেছেন :

এই গ্রাম দ্বিখণ্ডিত শব।
এই রাস্তা তলোয়ার এ গ্রামের বুকের ভিতর।
থেমেছে অনেক আগে গ্রামিকার আদিম উৎসব।
আশেপাশে শূন্য খেত, তার পর অসংখ্য কবর।
প্রাচীন কঙ্কালগুলো এখন ঘুমায়
সময়ের বুকের ভিতর।

এখন ধর্ষিতা চাঁদ জেগে আছে রাতের গুহায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫০; মোটা হরফ যোগ করা)

‘গ্রামিকা’ শব্দটি সামান্য শব্দ নহে। আমরা রোজকার কথাবার্তায় যেমন বলি পুস্তকের ছোট ‘পুস্তিকা’, পত্রের ছোট ‘পত্রিকা’, তেমনি গ্রামের ছোট ‘গ্রামিকা’। বাংলায় ‘ইকা’ প্রযুক্ত হয় ছোট অর্থাৎ তুচ্ছ অর্থে আবার এই শব্দের গর্ভাশয়ে নারী ও পুরুষের ভেদও বাসা বাঁধিতে পারে—যেমন শিক্ষকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘শিক্ষিকা,’ লেখকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘লেখিকা,’ কিংবা পাঠকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘পাঠিকা’। তরফদার সাহেবের ‘গ্রামিকা’ কি গ্রামের ছোট না গ্রামের স্ত্রীলিঙ্গ? ভাবিয়া দেখিতে হইবে। হইতে পারে দুইটার অর্থ একই। তরফদার আরো অনেক জায়গায় এই ‘গ্রামিকা’ পদটি কাজে খাটাইয়াছেন।

কিন্তু সেই সুরগুলো এখনো অনাবিষ্কৃত, এখনো অজানা,
হয়ত সৃষ্টির লগ্নে গ্রামিকার বুকে দেয় হানা।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৮; মোটা হরফ যোগ করা)

এই পর্যন্ত আমরা মাত্র মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতার পদার্থ ধরিয়া আলোচনা করিলাম। এক্ষণে কবিতার পদ লইয়া দুই কথা বলিব। তাঁহার অধিক কবিতা অক্ষরবৃত্তের সরল পয়ারে রচিত। কোন কোন কবিতা মাত্রাবৃত্তের হালকা চালেও দুলিয়া উঠিয়াছে। ‘খুলো না চুলের গুচ্ছ’ নামের কবিতার কয়েক পংক্তি বাজাইয়া দেখা যাইতে পারে। অক্ষরবৃত্তের পয়ারে রচা এই পদ্যটিতে মাত্রাবৃত্তের চালও ইচ্ছা হয় খুঁজিয়া লওয়া যায়। এই নিবন্ধের শেষে নিদর্শনস্বরূপ এই কবিতাটির আগাগোড়া তুলিয়া লইব। তবে এখানে নগদ মূল্যে কয়েক পংক্তি আলাদা করিয়া দেখাইতে চাই।

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারী;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
(তরফদার ১৯৭৬: ১৪১)

মাত্রাবৃত্তের চালেই মমতাজুর রহমান তরফদার অধিক সিদ্ধার্থ বলিয়া আমার ভ্রম হইয়াছে। উদাহরণের স্থলে বলিতে চাই, ‘জলের ধারে’ কিংবা ‘কালো মুখ’ নামক দুইটা কবিতায় একই ধরনের শক্তি ও সত্যের দেখা মিলিবে। পদ ও পদার্থের অভেদ বলিতে যাহা বুঝায়—বুনিয়াদি তত্ত্বজ্ঞানীরা যাহাকে বহুদিন ধরিয়া কলাসিদ্ধির পরাকাষ্ঠা জ্ঞান করিয়া আসিতেছেন—তাহার উদাহরণ এই সকল কবিতা।

মমতাজুর রহমান তরফদার কর্তৃক মাত্রাবৃত্তের চালে রচিত আরও একটি কবিতার কথা আমি পাড়িতে চাই যাহাতে পদ ও পদার্থের অভেদ প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে। কবিতাটির নাম ‘জাগ্রত’। এই কবিতার শক্তি গোটা চারি পংক্তি মাত্র উদ্ধার করিয়া বোঝান যাইবে না। আমরা গোটা কবিতাটিই সংযোজন অংশে জুড়িয়া দিতেছি। এই ক্রমে আরো অনেক কবিতা উদ্ধার করা যাইতে পারিবে। আশংকা হয় তাহাতে না স্মৃতিকথার সীমানা লঙ্ঘন করা হয়।

‘জাগ্রত’ নামের পদ্যটি শুদ্ধমাত্র ছন্দোসিদ্ধির উদাহরণই নহে, বেহ্তর বাগ্বিধির অভাবে যাহাকে আমরা বলিতে পারি ‘কবিতা লেখকের রাজনীতি’ ইহাতে তাহাও অনাবৃত হইয়াছে। বর্তমান দুনিয়ার বিবর্তমান শ্রেণীসংগ্রামের একটি স্থিরচিত্রও এখানে পাওয়া গিয়াছে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি লিখিত এই কবিতায় সে যুগের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি পরিস্ফূট। দেখিতেছি এই কবিতার চারিসীমানায় হ্যানয়, সায়গন, সিনাই, তিমুর আর অ্যাঙ্গোলার মঞ্চের পেছনে লিসবন, মাদ্রিদ, লন্ডন, পারি, প্রাগ, ভিয়েনা আর ওয়াশিংটননামা সবুজ ঘারের পর্দাও ভাসিয়া উঠিতেছে।

একদা শ্রমিকশ্রেণির জাগরণ পূর্ব এয়ুরোপের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ ছাপাইয়া চিনদেশে জাতীয় মুক্তির পথও খুলিয়া দিয়াছিল। আজ সে যাত্রায় কোথাও ছেদ পড়িয়াছে কি? তরফদার লিখিয়াছেন—হয়ত পড়িয়াছে। তাহাতেই দমিবেন এমন পাত্র তিনি নন কিন্তু।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে,
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে,
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদন্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান
হোয়াংহোর স্রোতত যদিও বা হয় ম্লান।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১০-১১)

তরফদারের এই দৃষ্টি আদৌ আপতিক নয়। এই দৃষ্টি তাঁহার ব্রতেরই অংশবিশেষ। বিষাদে পরিপূর্ণ তাঁহার অনেক কবিতা কিন্তু এই বিষাদ কদাচ বিতৃষ্ণায় পরিণতি পায় নাই। মহান ফরাশি কবি শার্ল বোদলেয়রের সহিত এই জায়গায় একটা তুলনা কাটিলে মন্দ হয় না। ‘একটি চিত্র দেখে’ নামের কবিতাটির মধ্যে খানিক বোদলেয়ারের ছায়া পড়িয়াছে এই কল্পনা করা চলে।

রাত্রি বমন করেছে এক রাশ আলকাতরা
পৃথিবীর বুকের উপরে।
অন্ধকার ঝুলে আছে কুয়াশার আস্তরণে
শবের ব্যারিকেড; ওদের মিছিল এখনো এগোয়নি
নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩৯)

আরেক কবিতায়—নাম ‘অন্য রূপ’—তরফদার সাহেব ‘বোদলেয়ারীয় বিতৃষ্ণার উৎস’ অনুসন্ধান করিতেছেন পারি নগরীর অন্তঃপাতী ধন ও দারিদ্রের বৈপরীত্যের মধ্যে। তিনি দেখিতেছেন ‘ওপেরা-থিয়েটারটাতে কোনো কমেড়ির অভিনয় চলছে’ আর ‘ইমারৎটা আলোয় আলোয় জ্বলছে।’ সম্পদ ও বিপদ, বৈভব ও নিঃস্বতা একই সত্যের দুই প্রান্ত বৈ নয়। একপ্রান্তে আছে সম্পদ। যুগপদ বিপদের ফলন না ঘটাইয়া সম্পদ আপন পদে স্থির হইতে পারে না। সম্পদ তবুও সত্য বৈ নয়।

রেপুবলিকের মত আরো বহু এলাকায়
আলোকে আলোকে, শেরী, শ্যাম্পেন এবং কোনইয়াকে
যে রূপ জেগে আছে, তা নিরেট সত্য।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

সমস্যার মধ্যে, ঘটনার আরো এক প্রান্ত আছে—সেই প্রান্তে আছে বিপদ। সম্পদের ‘আরো এক রূপ আছে’—সেই রূপ কিন্তু ‘মুলারুজ্বে,’ ‘ইফেল টাওয়ারের আশেপাশে,’ ‘লুকসেমবুর্গ বাগানে,’ ‘ল্যাটিন কোয়ার্টারে,’ কিংবা ‘কোনো চঞ্চল অথবা ঘুমন্ত স্টেশনেও’ দেখা যায় না। একই অঙ্গের কি সেই অপরূপ রূপ?

উৎসবের হয়ত অতি কাছেই
আলোয়, অন্ধকারে, জীবনে, মৃত্যুতে
নির্বেদে, আনন্দে
অতি প্রাচীন ব্যাধি দগ্দগ্ করে জ্বলছে
নতুন ক্ষতের পরিপূর্ণ যন্ত্রণা নিয়ে।’
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

‘অন্য রূপ’ কবিতার মাথায় মমতাজুর রহমান তরফদার বোদলেয়ারের ‘ঢাকনা’ নামক কবিতা হইতে দুইটি পংক্তি অলংকারস্বরূপ—না, ভুল বলিলাম, ইশতেহারস্বরূপ—স্থাপন করিয়াছিলেন।

Le Ciel ! Covuercle noir de la grande marmite
Où bout l’imperceptible et vaste Humanité.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ১৪১)

আকাশ একটা আস্ত কৃষ্ণবর্ণ ঢাকনার মতন পৃথিবীকে চাপিয়া আছে, আর ইহার নিচে সীমাসরহদহীন অবয়বহীন মানবজাতি টগবগ সিদ্ধ হইতেছে—এই রূপকল্পের দেখা আমরা বোদলেয়রের ‘বিতৃষ্ণা’ নামের চার নম্বর কবিতাটিতেও একবার পাইয়াছিলাম। সেই কবিতায় শার্ল বোদলেয়র লিখিয়াছিলেন, যখন আকাশ ভারে আনত হইয়া ঢাকনার মতন নামিয়া আসে যন্ত্রণাকাতর দীর্ঘ বিতৃষ্ণায় বিদ্ধ মনুষ্যের মাথায় ইতি আদি।

Quand le ciel bas et lourd pèse comme un covuercle
Sur l’esprit gémissant en proie axu longs ennuis,
Et que de l’horizon embrassant tout le cercle
II nous verse un jour noir plus triste que les nuits;
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৭৪)

শার্ল বোদলেয়ারের আরো ঢের ছাপ আছে তরফদারের কবিতায়। ফরাশি কবির Le Soleil বা ‘সূর্য’ কবিতাটির আলো বাঙালি কবিতা লেখকের ‘সূর্যের প্রণতি’ কবিতায় উজ্জ্বলতর হইয়াছে। আমরা এই নিবন্ধের পরিশিষ্টে দুই কবির কবিতাই পুরাপুরি তুলিয়া দিতেছি। এখানে আপাতত দুই কবির শেষ স্তবক দুইটি মাত্র পাশাপাশি পড়িতেছি। প্রথমে দেখি শার্ল বোদলেয়রের চারি পংক্তি:

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaxu et dans tous les palais.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৮৩)

[যখন এভাবে কবির মতন তিনি নামেন শহরে, অতি
তুচ্ছ পদার্থ যে তাহাকেও বানান মহান সন্ততি
নিরব নিঃসঙ্গ কোন রাজার মতন ধামাধরাহীন
আরোগ্য সদনে কি রাজপ্রসাদে কাটে নিরপেক্ষ দিন।]

তুলনীয় মমতাজুর রহমান তরফদারের ছয় পংক্তি:

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জ্বলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

মমতাজুর রহমান তরফদার আধুনিক বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘মূলধারা’ তাঁহার মধ্যে প্রবেশ করিতে চাহেন নাই। তাহা সত্ত্বেও তিনি যে ভাষায় লিখিয়াছেন তাহা ১৯৩০ সালের পরের কবিদের ভাষাই। তিনি নতুন ভাষার সন্ধান করেন নাই। এখানেই তাঁহার কবিতা মার খাইয়াছে। কিন্তু তিনি মরেন নাই। তিনি নিজের জগতে যাহা চাহিয়াছেন তাহাতেও বাংলা কবিতার দিগন্ত আরো দূরে সরিয়া গিয়াছে। এই মহান ইতিহাস লেখকের ‘কবিতা-লেখক’ পরিচয়—হয়ত সম্পূর্ণ বিফলে যায় নাই।

দোহাই

১. আহমদ ছফা, আহমদ ছফার কবিতা, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০)।

২. মমতাজুর রহমান তরফদার, চতুষ্ক (ঢাকা : মমতাজুর রহমান তরফদার, ১৯৭৬)।

৩. মমতাজুর রহমান তরফদার, বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭১)।

৪. মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম, ‘ভারত উপ-মহাদেশে ইংরেজ শাসন সম্পর্কে কার্ল মার্কস,’ সালাহউদ্দীন আহমদ গয়রহ সম্পাদিত, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা : বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ, ১৯৯১), পৃ. ৩২২-৪৭।

৫. Charles Baudelaire, Oevures complètes, tome 1, texte établi, présenté et annoté par Claude Pichois (Paris : Éditions Gallimard, 1975).

৬. Momtayur Rahman Tarafdar, Husain Shahi Bengal 1494-1538 A.D.: A Socio-Political Study (Dacca : Asiatic Society of Pakistan, 1965).

 

সংযোজন

কালো মুখ

হানা দেয় একটি কালো মুখ
শার্সিভাঙা জীর্ণ জানালায়।
কিছুতেই ভাঙে না কৌতুক,
বারবার সে যে ফিরে চায়।

জানে না সে অথবা সে জানে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাটির পাহাড়
বুক ভরে কি বিশাল গানে।
ক্ষুদ্র দেহ বিশ্বের প্রাকার।

পথ আজো নভ-চারী নয়;
কিন্তু এ সরণী করে ভেদ
সুদূরের সূর্য জ্যোতির্ময়।
এই গানে পড়ে নাক ছেদ।

পরাজিত নোংরা কালো মুখ
জানালায় এখানে উন্মুখ।

১৯ জুন  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৭৩)

 

জাগ্রত

আকাশের হ্রদে চাঁদ গলে গলে যায়
শরতের মেঘে ঈষৎ বজ্ররেখা।
লতাপাতাহীন অগণিত প্রশাখায়
নীরব অগ্নি এখন দিয়েছে দেখা।

বড় মহীরুহ সরবে গুটায় পাখা—
জেগে থাকে শুধু দিগন্তময় মরু।
রসকণাহীন ফুল, ফল, বহু শাখা—
সব গাছ মৃত; কোথায় কল্পতরু?

হ্যানয়-সায়গনে চলছে পলেস্তারা
ধ্বসে যাওয়া যত সুপ্রাচীন ইমারতে।
খামারেও ছিল শকুনির পাঁয়তারা—
সবুজ আলোক ভরবে কি মরকতে?

প্রতিশ্রুতির ফলকের গায়ে আলো—
বারবার এল বিমুখী প্রস্তাবনা।
ভোরের বাতাস পরিমেল ঝলসালো—
কালিক সিঁড়িতে কস্মিন সম্ভাবনা।

মুসার সিনায়ে এখন নতুন নবী—
চেয়ে দেখে শুধু খনিজ ফল্গুধারা।
নীলনদে ভাসে উটপক্ষীর ছবি—
মরুভূমি-রাতে জাগে তবু ধ্রুবতারা।

তিমোর-এ্যাঙ্গোলায় এখন অগ্নি উঠে;
লিসবন কাঁপে অভাবিত ভাবনায়।
কোন অলক্ষ্যে মাদ্রিদ এখন ছুটে—
পিরেনিজ বুঝি আলোকের সীমানায়।

লন্ডন, পারি, প্রাগ ও ভিয়েনা জাগে;
লক্ষ্মীপেচক এখন ওয়াশিংটনে।
শাম্পেন-শেরীতে বেয়ারের অনুরাগে
কর্নিয়া-আলো উদগত লিসবনে।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে;
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়—
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদণ্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে;
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা—

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান,
হোয়াংহোর স্রোত যদিও বা হয় ম্লান।

১৯ আগস্ট  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১০৯-১১)

 

জলের ধারে

জলের ধারে যদি বা তুমি গেলে,
আবার কেন মাটির ঘরে এলে?
ভালই ছিল পাহাড়ী মৃদু ঢেউ,
আঙুল তুলে রুখত নাক কেউ।
নদীর আলো তন্বী স্বচ্ছতা;
আকাশ বেয়ে সরু আলোক-লতা।

জীবন দিয়ে কে পায় জলধারা?
স্বপ্নসিঁড়ি কোথায় ধ্রুবতারা?
অন্ধকারে যদি বা স্রোত বয়,
তুমি ত জান সে ত আলোক নয়।
দিবসরাত অন্ধ হাতী জাগে,
সবুজ গাছে কেবল খাদ্য মাগে।
নরম দেহে যদিও বায়ু ভাসে,
ধরবে তাকে সে কোন অভিলাষে?

অন্ধকারে আংটি খুলে রাখা,
পথের ধারে ভ্রুণ রক্তমাখা।

আজকে ভোরে জানালা খুলে দাও।
আকাশ, আভা আবার ফিরে নাও।
ঘরের পাশে বাউলি-সিঁড়ি বেয়ে
শেওলা-ঢাকা জলের ধারে মেয়ে
আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে দেখ।
আঁধারটুকু ঢেকেই তুমি রেখ।

১৪ জুন ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৮-৬৯)

সূর্যের প্রণতি

বারবার কলরব শোনা যায় রাস্তায় রাস্তায়
এবং শার্শিতে ভাসে স্বচ্ছ রোদে প্রাচীন পিপাসা।
মনে হয় বুঝি কোনো মানবিক সূর্যের উদয়ে
শস্যের বাগান আর প্রাণীদেহ পরিণতি পায়
বাঞ্ছিত আকারে আর পরিপূর্ণ জৈবিক সত্তায়।
শরীরে রৌদ্রের বৃষ্টি, প্রাণেরও প্রদেশে রোদ ঝরে;
কিন্তু আসে প্রাচীন বীজাণুগুলো দেহকোষ ভরে।
রোগের বিরাম নেই, প্রাণেরও যে নেই-ক সীমানা—
উত্তমর্ণ, অধমর্ণ একই বৃত্তে খুঁজেছে ঠিকানা।
স্বদেশে, বিদেশে আর অন্য গৃহে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি;
তাই ত শরীরে-মনে আলোকের অবারিত গতি।

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে, ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।

২০ নবেম্বর  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

 

খুলো না চুলের গুচ্ছ

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারি;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
নিঃশব্দ কান্নায় ভাঙে আদিগন্ত নিরেট পাথর;
তৃষিত আকাশতলে পৃথিবীও কাঁপে থর থর।
ধূসর আকাশে সূর্য জাগে বটে অনেক প্রহর;
মৃত্যুর চোখের মত তারকারা অনন্ত ভাস্বর।
গোধূলির সীমা থেকে যদিও বা স্নিগ্ধ রাত্রি আসে
অনন্ত কান্নার স্রোত ভেঙে পড়ে আকাশে-বাতাসে
আর ঝরে আলকাতরার মত ঘন পুরু অন্ধকার
যে আঁধারে বহু আলোবর্ষ গড়ে মৃত্যুর পাহাড়।

এই বার রাখ হাত আলোকের লৌকিক হাতলে
যেখানে পৃথিবী জাগে বীজকম্প্র ফসলে ফসলে
এবং রৌদ্রের ধারা ঝরে পড়ে স্নিগ্ধ নীলিমায়
অথবা সঙ্গীত গায় বহু পাখি সবুজ আভায়।
তুমি ত দেখেছ বহু বার
উন্মুক্ত গানের নদী, অবারিত আলোকের ধার।
পাহাড়ে পাহাড়ে কাঁপে আলোকিত বরফের ঝড়;
খেতে, মাঠে, গানে গানে আলোয় আলোয় অনন্ত নির্ঝর।

খুলো না চুলের গুচ্ছ পৌরাণিক নদীটির তীরে;
আলোর মতন হাত রাখ এই আলোর শরীরে।

১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪১-৪২)

 

Le Soleil

Charles Baudelaire

 

Le long du vieux faubourg, où pendent aux masures
Les persiennes, abri des secrètes luxures,
Quand le soleil cruel frappe à traits redoublés
Sur la ville et les champs, sur les toits et les blés,
Je vais m’exercer seul à ma fantasque escrime,
Flairant dans tous les coins les hasards de la rime,
Trébuchant sur les mots comme sur les pavés
Heurtant parfois des vers depuis longtemps rêvés.

Ce père nourricier, ennemi des chloroses,
Eveille dans les champs les vers comme les roses;
II fait s’évaporer les soucis vers le ciel,
Et remplit les cerveaux et les ruches de miel.
C’est lui qui rajeunit les porteurs de béquilles
Et les rend gais et doux comme des jeunes filles,
Et commande aux moissons de croître et de mûrir
Dans le coeur immortel qui toujours veut fleurir!

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaux et dans tous les palais.

 (Charles Baudelaire 1975 : 83)

আহমদ ছফার সত্য ও সাহিত্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

মহাত্মা আহমদ ছফা এন্তেকাল করিয়াছেন ইংরেজি ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। দেখিতে দেখিতে এক যুগ — বলিতে ১২ বছর — পার হইল। আমার পরম সৌভাগ্য আমার যৌবনের প্রারম্ভেই তাঁহার দেখা পাইয়াছিলাম। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে — অকুণ্ঠ ভাষায় বলিব — তাঁহার মতন মানুষ আর দ্বিতীয়টি দেখি নাই।

দুর্ভাগ্যের মধ্যে এইটুকু মাত্র বলিবার আছে। তাঁহার যথার্থ কদর করিবার ক্ষমতা আমার আয়ত্ত হয় নাই। একবার ভাবিয়াছিলাম যে বছর তাঁহার বয়স ষাট বছর হইবে সেই বছরের সম্মানে একটি সংবর্ধনার ডাক দিব। মানুষ ভাবে এক, খোদা করেন আর। সেই ভাবনা বুদবুদ হইল। তিনি লোকান্তরিত হইলেন। কিন্তু যাহা রাখিয়া গিয়াছেন তাহার মূল্য কত তাহাও আমরা ঠিক করিতে পারি নাই। আজিকার এই লেখায় আমি তাঁহার একটি নাতিদীর্ঘ লেখার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাহিতেছি।

আমার এক সময় একটি ভুল ধারণা জন্মাইয়াছিল। মনে করিতাম আহমদ ছফা এক জীবনে যেখানে যত লেখা প্রকাশ করিয়াছেন তাহার প্রতিটি অক্ষর আমি পড়িয়া রাখিয়াছি। এতক্ষণে আমার ভুল ভাঙ্গিল। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ দানা বাঁধিয়াছিল আহমদ ছফার সকল লেখার কেন্দ্রে সেই মুক্তিযুদ্ধ। তাহার প্রস্তুতি এবং পরিণতি। ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকে তিনি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নাম দিয়া একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। তাহাতে বলিয়াছিলেন বাংলাদেশ হইবে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের আদর্শ। যাহাকে বলে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, তাহার আদর্শ। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অমীমাংসিত জাতি সমস্যার মীমাংসা কোন পথে হইতে পারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাহার একটি প্রমাণ হাজির করিয়াছে। এই বিশ্বাসে আহমদ ছফা আমৃত্যু অবিচল ছিলেন।

১৯৮০ সালে যে দশকটি শুরু হইয়াছিল তাহার মাঝামাঝি প্রকাশিত একটি মুখ রচনায় তিনি অনুযোগ করিয়াছিলেন সাহিত্য এই দেশের মহান মুক্তিসংগ্রামকে কিভাবে, কতটুকু অনুপ্রাণিত করিয়াছে বলা মুশকিল। তিনি মনে করিতেন স্বাধীনতা যুদ্ধ এই দেশের সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলিয়া দিয়াছে অথচ তখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করিয়া লেখা সাহিত্যে যুদ্ধের জীবন অনুপস্থিত। এই লেখাটি আমার আগে পড়ার সৌভাগ্য হয় নাই। চট্টগ্রামের সৈয়দ মনজুর মোরশেদ ইহার সন্ধান দিয়া আমাদের সবাইকে বাধিত করিয়াছেন।

তাঁহার কথা একটুখানি হুবহু তুলিয়া ধরি:

আসলে যুদ্ধের শুরু কিভাবে, কারা ভারতে গেলো, কিভাবে গেলো, শরণার্থী শিবিরে কারা কিভাবে ছিলো? কারা শরণার্থী শিবিরে ছিলো না, কারা থিয়েটার রোডে ছিলো কিংবা কারা ঘরে ফিরে এলো, কারা ফিরতে পারলো না — সেই সব বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে মনে করে একটি কল্পনার নায়ক বানিয়ে পাকবাহিনীকে কষে গাল দিলে, দু’একজন ধর্ষিতা বোনের চিত্র অংকন করলে একটি যুদ্ধের সাহিত্য রচনা করা যায় — এরকম একটা অপচেষ্টা আমাদেরকে পেয়ে বসেছে।

এই প্রবণতা তিনি, বলা বাহুল্য, অনুমোদন করেন নাই। তাঁহার আশঙ্কা ছিল এই প্রবণতা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের বিপথগামী করিবে। দুঃখের সহিত স্বীকার করিতে হইবে আজও সেই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয় নাই।

আহমদ ছফা লক্ষ্য করিয়াছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আমাদের সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য ছিল ত্রিকোণাকৃতির প্রেম। এই ধরনের ছকেই রচিত হইত গল্প। উদাহরণ আকারে তিনি শওকত ওসমানের রচিত ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসটির কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন শওকত ওসমানের মতন সাহিত্যিকেরও বাগদাদের কাহিনী লইয়া লিখিতে হইয়াছে ‘ক্রীতদাসের হাসি’।

আহমদ ছফা বিশ্বাস করিতেন স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই ধারাটা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে। তবে সেই বিশ্বাস কোথাও তখন পর্যন্ত কোন সন্তান প্রসব করে নাই। সৈয়দ শামসুল হকের একটি কাব্যনাট্যের নাম — ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ — উল্লেখ করিয়া তিনি বলিতে কসুর করেন নাই — বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছাপ অনুপস্থিত। আহমদ ছফা বলিয়াছেন, নাটকটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করিয়া লেখা, তবে ‘মনে হয়, এটি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লেখা’। আহমদ ছফা সত্যকে সত্য আকারেই প্রকাশ করিতেন।

একই ধরনের অকপট সত্য তিনি উচ্চারণ করিয়াছেন সেলিনা হোসেন প্রসঙ্গেও। উঁহার একখানি উপন্যাসের নামোল্লেখ না করিয়াই তিনি বলিয়াছেন উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা। কাহিনীর কাল মুক্তিযুদ্ধের বছর। স্থান কোন এক বস্তি। শুদ্ধ অভিজ্ঞতা কিংবা মানবিক আবেদন থাকিলেই যে লেখাবস্তু সাহিত্য পদবাচ্য হইয়া উঠে না সে সত্যে আহমদ ছফার সংশয় ছিল না। অপ্রীতিকর সত্যকে যে অবশ্য প্রীতির ভাষায় প্রকাশ করা যায় তাহার প্রমাণ আহমদ ছফার এই দুই বাক্যে উপস্থিত হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেন, ‘সাহিত্যে এই উপন্যাসটির স্থান কোথায় হবে জানি না। কিন্তু উপন্যাসটির মানবিক আবেদন আমাকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে।’

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘কাঠামো ও আঙ্গিকের দিক থেকে ঠিক আছে, কিন্তু প্রাণ-প্রবাহের দিক থেকে সেটা ব্যর্থ।’ আর সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত’ অথচ সাহিত্যে তাহার কোন স্থান হইবে না। এই যে সরল ঘটনা আহমদ ছফা তাহাকে তির্যক করেন নাই। তঁাঁহার দুঃখ — এখন পর্যন্ত আমি ইংরেজি ১৯৮৫ কিংবা ১৯৮৬ সালের কথা পাড়িতেছি — ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থাকে ধারণ করে সত্যিকার সাহিত্য রচনা’ হয় নাই।

কিন্তু আশা নাছোড়বান্দা। ছফার সঙ্গ পরিত্যাগ করেন নাই। ছফা লিখিয়াছেন, ‘আমার ধারণা, ১৫ বছর সময় যথেষ্ট নয়। “ওয়ার এন্ড পীসের” মত গ্রন্থ যুদ্ধের পরপরই রচিত হয়নি — হয়েছে অনেক পরে। সুতরাং এ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন সাহিত্যে না ঘটলেও, ভবিষ্যতেও যে ঘটবে না, আমি তা মনে করি না।’ আহমদ ছফা মনে করিতেন স্বাধীনতা সংগ্রামের মত একটি গৌরবময় সংগ্রাম যেহেতু আমাদের জাতীয় জীবনে আসিয়াছে সুতরাং সেরকম সাহিত্যও রচিত হইবে। ধন্য আশা, কুহকিনী।

সেই আশা এখনো ফলবতী হয়েন নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে স্বয়ং আহমদ ছফা। তাঁহার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ — বেশ খানিকটা যাহাকে বলে আত্মজীবনীর মত — ধরা আছে ‘অলাতচক্র’ নামধারী একটি অসাধারণ উপন্যাস কণিকায়। এই উপন্যাসের দুইটি পাঠ আমরা পাইয়াছি। একটি ১৯৮৪/৮৫ সালের। আরটি ১৯৯৩ নাগাদ প্রকাশিত হইয়াছিল। সেই কাহিনী অন্যত্র লিখিয়াছি। আরো লিখিতে হইবে।

আজ মাত্র একটি বাক্য লিখিয়াই বিদায় হইতেছি। এই উপন্যাসে ‘ওয়ার এন্ড পীস’ গ্রন্থের গুণাবলি বিদ্যমান। পার্থক্যের মধ্যে, ইহার আকারটাই মাত্র ছোট্ট।

দোহাই

১ আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি,’ সচিত্র স্বদেশ [আনুমানিক প্রকাশকাল ১৯৮৬], পৃ. ৫৩।

 

৩১ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

‘‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বহিঙ্গ পুরাণ’’ ও মার্কিনদেশের ডানাহম পরিবার

সকলেই জানেন মহাত্মা আহমদ ছফা এন্তেকাল করিয়াছেন ইংরেজি ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না মাত্র এক মাস আগে — মোতাবেক ২৮ জুন ২০০১ তারিখে —  অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় তিনি তাঁহার মার্কিন বান্ধবী বেগম মেরি ফ্রান্সিস ডানাহ্মের সদ্যপ্রয়াত স্বামী ড. ড্যানিয়েল ডানাহ্ম সম্বন্ধে একটি নাতিহ্রস্ব রচনা প্রকাশ করিয়াছিলেন। ঐ বছরের গোড়ার দিকে ড. ডানাহ্ম মার্কিন মুলুকের নয়া ইয়র্ক শহরে দেহত্যাগ করেন।

মেরি ডানাহ্মের সহিত আহমদ ছফার কিভাবে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় তাহার বিবরণ আমরা দুই জায়গাতেই পাইতে পারি। এক মেরির লেখায়, বিশেষ চিঠিপত্রে, আর পাইতে পারি আহমদ ছফার পত্রাবলি যখন পূর্ণাঙ্গে প্রকাশিত হইবে তখন। আহমদ ছফার সহিত মেরির অনেক পত্রালাপ হইয়াছিল। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘এ পর্যন্ত মেরিকে আমি যত চিঠি লিখেছি এবং মেরি আমাকে যত চিঠি লিখেছেন তা সংগ্রহ করে প্রকাশ করলে চারশ পাতার একটা বই দাঁড়িয়ে যাবে।’ (ছফা ২০১১: ১৫৩)

আমরা আশা করি আহমদ ছফার জীবনচরিত যাঁহারা লিখিবেন তাঁহারা এই মূল্যবান দলিলের সন্ধান ও সদ্ব্যবহারে আগুয়ান হইবেন। ইতিমধ্যে একজন লেখক আহমদ ছফার সহিত মেরির পরিচয় কাহিনী খোদ মেরির জবানিতে প্রকাশ করিয়াছেন। (উদ্দীন ২০১১: ১০৩-১০) মেরি ডানাহ্ম ও আহমদ ছফা উভয়ের বিবৃতি হইতে জানা যায় তাঁহাদের পরিচয় ঘটিয়াছিল ঢাকায়, ইংরেজি ১৯৯৫ সালের গরম কালে। আহমদ ছফা তখন ১২ ময়মনসিংহ রোডের বাসায় থাকিতেন। বলা প্রয়োজন এই বাসাতেই তাঁহার আয়ুর অবসান হয়। মেরি আসিয়াছিলেন তাঁহার প্রকাশিতব্য গবেষণা পুস্তক ‘জারিগান’ গবেষণা সম্পন্ন করিতে। এই গবেষণা তিনি শুরু করিয়াছিলেন ১৯৬০ সালের পর কোন এক সময়। তখন জসীম উদদীন তাঁহার সহায় হইয়াছিলেন। মেরি তখন হইতেই বাংলা শিখিতে শুরু করেন। এক সময় তিনি আহমদ ছফার কক্ষেও পড়াশোনা করিয়াছিলেন।

মেরির সহিত আহমদ ছফার বন্ধুত্ব ফলপ্রসূ হইয়াছিল। আমরা শুধু একটা বিষয়ে কথা সীমিত রাখিব। ১৯৯৬ সালের দিকে আহমদ ছফা ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ নামধেয় নতুন উপন্যাসটি লিখিয়াছিলেন। এই উপন্যাসটির ইংরেজি তর্জমা করার অভিলাষ জাগিয়াছিল আহমদ ছফার। যোগ্যতর অনুবাদকের অপেক্ষা না করিয়াই আহমদ ছফা নিজ হস্তে এই অসাধারণ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ শুরু করিয়া দেন। এমন সময় মেরি একদিন তাঁহার সহিত পুনরায় সাক্ষাৎ করিলেন। এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল মেরির জারিগান সম্পর্কে আহমদ ছফার নির্দেশনা লাভ। আর আহমদ ছফাও তখন যোগ্যতর কোন অনুবাদক বা সম্পাদক খুঁজিতেছিলেন। এই শুভ যোগাযোগের ফলাফল ব্যর্থ হইবার আগেই আহমদ ছফা লোকান্তরে গিয়াছেন। ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ পুস্তকের ইংরেজি অনুবাদটি এখনো প্রকাশের পথে বা গন্তব্যে পৌঁছায় নাই।

ড্যানিয়েল ডানাহ্মের স্মৃতিতে আহমদ ছফা যে নিবন্ধ লিখিয়াছেন তাহাতে এই যোগাযোগের কাহিনী কিছু পরিমাণে বয়ান করা হইয়াছে। লাভের মধ্যে আমরা এই উপন্যাসটির জন্ম কি করিয়া সম্ভব হইয়াছিল তাহারও সামান্য বিস্তার পাইয়াছি। এইটুকুই বাড়তি পাওনা।

আহমদ ছফা জানাইয়াছেন ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে এক ধরনের মানসিক উদ্বেগাকুল মুহূর্তে — লেখকের ভাষায় একটা ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানসিক অবস্থা’য় — তিনি উপন্যাসটি লিখিয়া ফেলেন। খানিক উদ্ধৃতি পেশ করিলে বিশেষ অবস্থাটা হয়তো পরিষ্কার হইবে:

১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত চলছিলো, সে সময়টিতে মানসিকভাবে আমি অত্যন্ত উতলা হয়ে পড়েছিলাম। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যেভাবে অনবরত হরতাল ইত্যাদি করে যাচ্ছিলো, সেগুলোর সঙ্গে আমি মন মেলাতে পারছিলাম না। অন্যদিকে বিএনপিকে সমর্থন করাও আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানসিক অবস্থাতেই আমি একটি উপন্যাস লেখার কাজে হাত দেই এবং ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ উপন্যাসটি লিখে ফেলি। অল্পদিনের মধ্যেই লেখাটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। (ছফা ২০১১: ১৫২)

 যে অস্থিরতা হইতে বইটির জন্ম সেই অস্থিরতায় আবার ইহার নবজন্মের — মানে ইংরেজি তর্জমারও — কারণ হইয়া দাঁড়াইল। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছিলো। আমি ছিলাম মানসিকভাবে প্রচণ্ড রকম অশান্ত। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে উপন্যাসটি ইংরেজি করা যায় কিনা চেষ্টা করছিলাম। প্রিসিলা [রাজ] নামের একটি স্নেহভাজন মেয়ে আমাকে সাহায্য করতে রাজি হলো। আমি মূলত বই দেখে ইংরেজিটা বলে যেতাম, প্রিসিলা লিখে নিতো। এইভাবে অনুবাদ কাজটি শেষ করে ফেলি।’ (ছফা ২০১১: ১৫২)

এমতাবস্থায় মেরি ডানাহ্মের সহিত আহমদ ছফার ‘যোগাযোগের সেতু’ তৈরি হইল। প্রিসিলা রাজের সহায়তায় আহমদ ছফা যে অনুবাদ প্রস্তুত করিয়াছিলেন, তাহা আহমদ ছফার সহায়তায় মেরি ডানাহ্ম সংশোধন করিলেন। সেই সংশোধিত অনুবাদটি সংশোধনে আমি — মানে এই নিবন্ধের লেখক — মেরিকে যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছিলাম। মেরি আমার সকল পরামর্শ গ্রহণ না করিলেও আমাকে ধন্যবাদ দান করিতে কুণ্ঠা করেন নাই। আমার যৎসামন্য সহায়তার কথা তিনি যে আহমদ ছফার কাছেও প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহার প্রমাণ আহমদ ছফার শেষ জীবনের এই ডানাহ্ম স্মৃতিনিবন্ধটিতেও পাইতেছি। (ছফা ২০১১: ১৫৩)

দুর্ভাগ্যের মধ্যে সেই ইংরেজি তর্জমাটি অদ্যাবধি যোগ্য প্রকাশকের অভাবে কোন চিলেকোঠায় পড়িয়াই রহিয়াছে। একপ্রস্ত আমার ঘরেও সেদিন খুঁজিয়া পাইয়াছি। তাহাতে শুধুমাত্র দুইটি অধ্যায় পাওয়া যাইতেছে না। মেরির তর্জমাটি আমার বিচারে আরো একটু সম্পাদনা করিয়া প্রকাশ করা অসম্ভব হইবে না। কেহ ইচ্ছা হয় সম্পূর্ণ আনকোরা তর্জমাও করিতে পারেন। মন্তব্যের মধ্যে শুধু বলিব এই অনুবাদের পিছনে অত সময় ব্যয় করার দরকার আর যাহার থাকুক, আহমদ ছফার ছিল না। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একদা এক লেখায় — আহমদ ছফা লিখিত ইংরেজি ভ্রমণ কাহিনী ‘জার্মান পারস্পেক্টিব’ গ্রন্থের ভূমিকায় — বলিয়াছিলেন আহমদ ছফার উচিত কেবল বাংলায় লেখা। তাঁহার উচিত যোগ্য অনুবাদকের অপেক্ষায় থাকা। আমিও অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের প্রস্তাবে সায় না দিবার কোন কারণ দেখি নাই।

যাহা হৌক, আহমদ ছফার স্মৃতিকথা হইতে আমরা আরো একটি বিষয় জানিতে পারিয়াছি। প্রসঙ্গটি ফেলনা নহে। আহমদ ছফার লেখা হইতে অন্য অনেকের মত আমিও জানিতে পারিয়াছি,

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমেরিকায় জনমত গড়ে তোলার কাজে মেরি এবং [ড্যানিয়েল] ডানাহম সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানি সৈন্যের নৃশংসতা এবং বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার কাজে তাদের বাড়িটি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশী তরুণেরা দলে দলে তাদের বাড়িতে এসে সমবেত হতেন এবং কিভাবে জনমত সৃষ্টি করা যায় সে বিষয়ে নানারকম পন্থা উদ্ভাবন করার জন্যে সর্বক্ষণ চেষ্টিত থাকতেন। এই সমস্ত তরুণকে মেরি এবং [ড্যানিয়েল] ডানাহম নিজ হাতে রান্নাবান্না করে খাইয়েছেন। (ছফা ২০১১: ১৫০)

মেরি ডানাহ্মের স্মৃতিকথা হইতে জানা যায়, তিনি ও  ড্যানিয়েল ডানাহ্ম ঢাকায় প্রথম আসিয়াছিলেন ইংরেজি ১৯৬০ সালের শরৎ কি হেমন্ত [ইংরেজি ‘ফল’] ঋতুতে। আসিয়াই তাহারা সে কালের শাহবাগ হোটেলে — এখন যেখানে স্নাতকোত্তর চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় — উঠিয়াছিলেন। ড্যানিয়েল ছিলেন হার্বার্ড বিশ্ববিদ্যালয় হইতে পাশ করা স্থপতি। তিনি অনেক কাজ করিয়াছিলেন ঢাকায়। তিনি ঢাকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। কমলাপুর রেল স্টেশনের নকশার সঙ্গেও গোড়ার দিকে তিনি জড়াইয়া ছিলেন।

১৯৬৮ সালের দিকে ড্যানিয়েল ডানাহ্ম কলিকাতায় চলিয়া যান। কিন্তু ঢাকার সহিত তাঁহার যোগাযোগ ক্ষুণœ হয় নাই। মেরি ডানাহ্ম উল্লেখ করিয়াছেন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স (এখন সোহরাওয়ার্দী) উদ্যানে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দিয়াছিলেন ড্যানিয়েল ডানাহ্ম তাহাতেও উপস্থিত ছিলেন। তিনি পরের কয়েক সপ্তাহ অনেক বিদেশি ভদ্রমহিলার বহির্গমনে সাহায্য করেন। তিনি পরেও ঢাকায় আসিয়াছিলেন কয়েকবার। (উদ্দীন ২০১১: ১০৭)

মেরি ফ্রান্সিস ও ড্যানিয়েল ডানাহ্ম আহমদ ছফাকে তাঁহাদের নয়া ইয়র্ক বাসভবনে সাদর আপ্যায়ন করেন ১৯৯৯ সালে। আমার সহিত মেরির দেখা সাক্ষাৎ হইয়াছিল আমার বাসায়। সেটা ছিল নয়া ইয়র্ক শহরের একটি অতি দরিদ্র বস্তিতে। ব্রংকস নামক একটা বড় মহল্লার এক অখ্যাত গলিতে। আমি একটা ভাঙ্গা বাসায় থাকিতাম। সেই বাসায় তাঁহাকে কয়েক বেলা ডালভাত রান্না করিয়া খাওয়াইতে পারিয়াছিলাম আমি। ড্যানিয়েলের সহিত আমার কোনদিন দেখা হয় নাই। আমি এক কি দুইবার তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়াই তৃপ্ত হইয়াছিলাম। তাহাও নিছক যন্ত্রযোগে।

আহমদ ছফা মেরি ফ্রান্সিস সম্পর্কে বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন ‘অত্যন্ত বিদূষী মহিলা’। তিনি বাংলাদেশে আসিয়া কবি জসীম উদদীনের সহিত পরিচিত হইয়াছিলেন। আর সেই সূত্রেই জারিগানের গুণগ্রহণ করেন। আহমদ ছফার কথা খানিক উদ্ধার করা চলে: ‘মেরীর পূর্বে কোন পশ্চিমা পণ্ডিত বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে কোন গ্রন্থাদি প্রকাশ করেননি। মেরী বাঙালি মুসলমান সমাজকে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ধরে নিয়ে তার যে কতগুলো আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে [তা] তার গ্রন্থটিতে তুলে ধরেছেন।’

আর ড্যানিয়েল সম্পর্কে ছফার উক্তিও প্রণিধান করিবার মতন। তিনি বলিয়াছেন,

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলগুলোর গৃহনির্মাণ ব্যবস্থার প্রতি তিনি খুব গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন। একসময়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, এ এলাকায় অধিকাংশ মানুষ গরীব। অধিকাংশ মানুষের ইট সিমেন্ট রড এগুলো ক্রয় করার সামর্থ্য থাকে না। কম খরচে কিভাবে গৃহনির্মাণের উপকরণ সংগ্রহ করা যায় তাই নিয়ে তিনি মাথা ঘামিয়েছিলেন এবং এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন [যে] মানুষ যদি চারপাশের প্রকৃতি থেকে গৃহনির্মাণের উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে [তবে] কম খরচে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব হয়ে উঠবে। (ছফা ২০১১: ১৫৩)

আহমদ ছফার আরো একটি উদ্ধৃতি প্রকাশ করিয়া এই নিবন্ধ শেষ করিব। আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিয়াছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য নানা ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান হইতে এই পরিবারটি চাঁদা তুলিয়া দিয়াছিলেন। লেখকের ভাষায়, ‘এই পরিবারটির কাছে আমাদের বাংলাদেশীদের অনেক ঋণ রয়েছে।’ বাংলাদেশের এমন অকৃত্রিম বন্ধু আমেরিকায় আর আছে কিনা,’ আহমদ ছফা বলিলেন, ‘আমি জানি না।’ (ছফা ২০১১: ১৫০)

 ২৩ জুলাই ২০১৩

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘ড. ড্যানিয়েল ডানহাম এবং আমাদের মুক্তিসংগ্রাম,’ [আজকের কাগজ, ২৮ জুন ২০০১], সংকলন: এবিএম সালেহ উদ্দীন সম্পাদিত, আহমদ ছফা: ব্যক্তি ও সমাজ (ঢাকা: বাড পাবলিকেশন্স, ২০১১), পৃ. ১৪৯-৫৪।
২. Mary Frances Dunham, ‘In Praise of Ahmed Sofa by one of his many friends,’ এবিএম সালেহ উদ্দীন সম্পাদিত, আহমদ ছফা: ব্যক্তি ও সমাজ (ঢাকা: বাড পাবলিকেশন্স, ২০১১), পৃ. ১০৪-১০।

 

৩০ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

অলাত চক্র: আহমদ ছফার একখানা চিঠি প্রসঙ্গে

ইংরেজি ২০০৯ সালে ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনা সংস্থা হইতে ‘চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল। গ্রন্থটির সম্পাদক হিশাবে আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম ছাপা আছে। এই গ্রন্থে মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা একপ্রস্ত পত্রও স্থান পাইয়াছে। আমরা কৃতজ্ঞতার সহিত তাহা অত্র পত্রস্থ করিতেছি।

পত্র সম্পর্কে কিছু বলিবার আগে ইহার প্রাপকের কথা দুই বাক্যে বলিতে হইবে। ‘মুক্তধারা’ প্রতিষ্ঠার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা আহমদ ছফার একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি ব্যবসায় করিতেন। যুগপৎ নোয়াখালি জেলার চৌমুহনি শহর আর ঢাকা শহরের ফরাশগঞ্জ মহল্লায় তাঁহার প্রতিষ্ঠান। পুঁথিঘর নামক প্রতিষ্ঠান হইতে তিনি উঠিয়াছিলেন ‘মুক্তধারা’ পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলিকাতা মহানগরে ইহার প্রতিষ্ঠা। তখন প্রকাশিত বইপত্রে মুক্তধারা নামের পাশে অথবা নিচে ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ কথাটাও মুদ্রিত থাকিতে আমরা দেখিয়াছি।

আহমদ ছফার ‘স্মৃতির দিয়া’ নামক স্মৃতিকথায় চিত্তরঞ্জন সাহার কথাও পাওয়া যায়। তিনি লিখিয়াছেন, “চিত্তবাবুর ‘মুক্তধারা’ অফিসটি ছিল ছয় নম্বর এন্টনি বাগান লেনে। তিনি আমার ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটি ছাপছিলেন।” ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটির প্রথম সংস্করণ ছাপা শেষ হইয়াছিল ২৮ জুলাই ১৯৭১। আর আহমদ ছফা এন্তেকাল করিয়াছিলেন একই দিনে। শুদ্ধ তিরিশ বছর পর। মানে ২০০১ সাল নাগাদ। বইটার আরো কয়েকটা সংস্করণ হইয়াছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও হইয়াছিল। চিত্তরঞ্জন সাহাকে লেখা এই পত্রে দেখা যাইতেছে ‘অলাতচক্র’ বইটির কথাও আছে।

এখানে অতি সংকোচের সহিত একটি কথা নিবেদন করিয়া রাখিতে চাই। ‘চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা’ বইটিতে সম্পাদক হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দ ছাড়াও আরো দুইজন মহান মানুষ অন্তত জড়িত আছেন দেখিতে পাইলাম। একজনের নাম আহমাদ কাফিল, আরেকজনের পরিচয় শ্যামল দত্ত। তদুপরি পরিকল্পক বলিয়া আরো একটি নাম শোভা পাইতেছে শিরোনাম পাতায়। ‘অলাত চক্র’ বইটির নাম এত সম্পাদক ও পরিকল্পকের চারিজোড়া চক্ষু এড়াইয়া ছাপা হইয়াছে ‘অলাত ফ্রে’। (সৈয়দ ২০০৯: ৫১) টাকা পয়সা মন্দ জিনিশ নহে। তাহা আমাদের সকলেরই কাজে লাগে। তবে সম্পাদনা না করিয়া কেন আমরা সম্পাদক বলিয়া আপনাপন নামধাম ধার দিতে যাই, বুঝিতে বড় বেগ লাগে। ইহাতে চিত্তরঞ্জন সাহারও অগৌরব হয়।

যাহা হৌক এতক্ষণে পত্রে প্রবেশ করা যাইতেছে। পত্রের তারিখ দেওয়া আছে ১১ জুলাই ১৯৯১। আহমদ ছফা জানাইতেছেন তিনি মার্চ মাসের মাঝামাঝি জার্মানি হইতে ফিরিয়াছেন।

দেখা যাইতেছে আহমদ ছফা একটা কৈফিয়ৎ দিতেছেন ‘অলাত চক্র’ সম্বন্ধে। আমরা জানি বইটি তিনি পত্রিকান্তরে প্রকাশ করিয়াছিলেন ইংরেজি ১৯৮৫ সনের দিকে। দেখা যাইতেছে এই ১৯৯১ সনের মাঝামাঝি আসিয়াও তাহা শেষ করেন নাই। চিত্তরঞ্জন সাহার সমীপে তিনি লিখিতেছেন,

লেখাটি আমি অবহেলা করে ফেলে রেখেছি সে কথা ঠিক নয়। এই বইটির মধ্যে আমার জাতি ও দেশ সম্পর্কে বিশেষ কিছু বক্তব্য রাখতে চাই। আমার মনে হচ্ছে তাতে আমি সফলও হয়েছি। কিন্তু একটি কথা: বইটি যেভাবে ছাপা হয়েছে, তাতে দৃষ্টি আকর্ষণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সে জন্য আমিই দায়ী। লেখাটি তো আমার প্রেস থেকেই ছাপা হয়েছে। অযোগ্য মানুষকে সাহায্য করলে কোনো কাজে আসে না এটা নতুন করে প্রমাণিত হলো। পুরোনো ফর্মাগুলো ফেলে দিয়ে আবার নতুনভাবে ছাপাতে চাই। বলা বাহুল্য এই বাড়তি খরচটা আমিই করবো। এ ব্যাপারে আপনার সদয় মতামত জানতে পেলে খুশী হবো।

এই প্রসঙ্গটা আহমদ ছফার চিঠিতেই আমরা জানিতে পারিলাম। দেখিতেছি বইটা ১৯৯৩ সালে মাত্র বাহির হইয়াছিল। ‘প্রিয় প্রজন্ম’ নামক একটি ক্ষুদ্র ম্যাগাজিনের ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর তারিখ দেওয়া এক সংখ্যায় মহাত্মা আহমদ ছফার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ পায়। তাহাতেও প্রশ্নটির বয়ান পাওয়া যাইতেছে। আহমদ ছফার উল্লেখ করিতেছেন,

তবে আমি কিন্তু ‘ওঙ্কার’ [উপন্যাসের] পরে আরো তিনটি উপন্যাস লিখেছি। বিষয় গৌরবে এ গুলো ‘ওঙ্কার’ [লেখাটির] চেয়ে আরো সিরিয়াস লেখা। তাছাড়া বাংলাদেশের উত্থান নিয়ে আরেকটি উপন্যাস আমি লিখেছি, সেটার নাম হচ্ছে ‘অলাত চক্র’। লেখাটা ‘নিপুণ’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় খানিকটা ছাপা হয়েছে। বইটা প্রায় পুরোটাই ছাপা হয়ে গিয়েছে মুক্তধারা থেকে। শুধু লাস্ট ত্রিশ পাতা লেখা বাকি। এই ত্রিশ পাতা আমি লিখতে পারছি না। কি লিখব জানি না। প্রতি সপ্তাহ্য় চিত্তরঞ্জন বাবু আমাকে তাগাদা দেন। কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠে না। (ছফা ২০০৮: ৩৯৩)

মহাত্মা আহমদ ছফার এই চিঠিতে আরো একটি বাক্য আছে যাহা উদ্ধার করিবার     মতন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমি কোন দল করিনে এবং ছোটো ছোটো মানুষদের মধ্যে  মিশে ছোট হতে পারিনে সেটাই [আমার]  অপরাধ এবং আমাকে অবহেলা করার কারণ সেটাই। এ অবস্থার কোনোদিন পরিবর্তন বোধ করি ঘটবে না।’

এই দীর্ঘ বাক্যটিতেও সম্পাদক মহোদয়গণ একটি ভুল মুদ্রণের অনুমতি করিয়াছিলেন। ‘আমার অপরাধ’ কথাটা ছাপা হইয়াছিল ‘আবার অপরাধ’ আকারে। (সৈয়দ ২০০৯: ৫২)

এই দুই ভুল শোধন করিয়া আমরাও চিঠিটি আবার ছাপাইবার স্বাধীনতা গ্রহণ করিলাম। চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্দেশে আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘বেঁচে থাকা মানে কর্ম করা, এটা তো আপনার কাছেই শিখেছি।’

দোহাই

১      আবদুল মান্নান সৈয়দ গয়রহ সম্পাদিত, চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা (ঢাকা: মুক্তধারা, ২০০৯)।
২   আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা বললেন…’; আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৩০৩-৪২৪।

৩০ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

এসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র অথবা খেলাফত আন্দোলনের করুণ পরিণতি

রাজনীতির সহিত ধর্ম মিশাইলে কি পদার্থ তৈয়ার হইতে পারে তাহার খানিক উদাহরণ খেলাফত আন্দোলন। ১৯১৭ সনে প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ভারতীয় মুসলমান আগে মুসলমান, না আগে ভারতীয়? এই মূঢ়তার উত্তর ইতিহাসে ভাল করিয়াই মিলিতেছে। তথাপি হালফিল বাংলাদেশেও একই ধরনের প্রশ্ন হইতে নিস্তার নাই

যে রাষ্ট্র আপনার প্রাণ আপনি বাঁচাইতে পারে না সে রাষ্ট্র শতচ্ছিন্ন হইয়া যায়। — ফিদেল কাস্ত্রো (২০০৮: ৫৪২)

‘হেফজতে ইসলাম’ আন্দোলনের আবির্ভাবে আনন্দিত হইয়া কোন কোন বুদ্ধিজীবী বলিতেছেন, এই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করিয়াছে। কথিত আছে মহাত্মা মোহনদাস গান্ধিকে একবার সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা সমন্ধে আপনার মত কি?’ জবাবে গান্ধিজি বলিয়াছিলেন, ‘হইলে ভাল হইত।’ বুদ্ধিজীবীদের বাহবা শুনিয়া আমারও এই রকম মনে হইল, ‘হইলে ভাল হইত।’

‘নতুন বোতলে পুরানা মদ’ কথাটা ইহার ভিতর আবার পুরান হইয়া গিয়াছে। তাই উহা ব্যবহার করিব না। শুদ্ধ বলিব এমনকি বোতলটাও নতুন নহে। রাজনীতির সহিত ধর্মের মিশ্রণ এই দেশের ইতিহাসেও নতুন নহে। তাহার ফলাফল ভালর মধ্যে অসার, আর মন্দের মধ্যে বিষময় হইয়া উঠে। পুরানা ‘খেলাফত’ আন্দোলনের সহিত নতুন ‘হেফাজত’ আন্দোলনের তুলনা করিলে অনেকে হয়তো হাসিয়া উড়াইয়া দিবেন। আমি ধৈর্যের আবেদন পেশ করিব।

১৯১৪ সনে এয়ুরোপ মহাদেশে যে যুদ্ধ শুরু হইয়াছিল তাহাকে আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বলিয়া জানি। এই যুদ্ধের একপক্ষে ইংলন্ড, আরপক্ষে জার্মানি। যুদ্ধ শুরু হইবার পর তুরস্ক কিছুদিন কোন পক্ষ লয় নাই। ভারতবর্ষস্থ ইংরেজ সরকারের অনুরোধে ভারতীয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর দুই নেতা মৌলানা মোহাম্মদ আলী ও ডাক্তার আনসারি তুর্কি নেতাদের কাছে তারবার্তা পাঠাইলেন। অনুরোধ করিলেন তাহারা যেন নিরপেক্ষ থাকেন। কিন্তু তুরস্ক তাঁহাদের কথা রাখিল না। দেশটি যুদ্ধ ঘোষণা করিল ইংলন্ডের বিরুদ্ধে। মোহাম্মদ আলী ‘তুর্কজাতির পছন্দ’ বলিয়া এক প্রবন্ধ ফাঁদিলেন। সিদ্ধান্ত করিলেন ভারতবর্ষের মুসলমান জনসাধারণ ইংরেজ সরকারের আজ্ঞাই বহন করিবেন। মাত্র দুইটি শর্ত যোগ করিয়া বলিলেন, আরবদেশে কোন হামলা করা চলিবে না আর এসলামের তিন পবিত্র তীর্থ — মক্কা, মদিনা ও জেরুজালেম — সত্যকার স্বাধীন কোন মুসলমান রাজশক্তির হাত হইতে ছিনাইয়া লওয়া হইবে না।

এই ধরনের শর্ত আরোপ করাটাও বিলায়েতি সরকারের পছন্দ হয় নাই। তাহারা শওকাত আলী, মোহাম্মদ আলী, আবুল কালাম আজাদ, জাফর আলী খান প্রভৃতি মুসলমান নেতাকে কয়েদ করিলেন। তাঁহাদের পত্রপত্রিকাও বন্ধ করিয়া দিলেন। তবে ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়কেরা কথা দিলেন মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলি — আরবদের তীর্থস্থান তো বটেই এমনকি এরাকের দরগাহ ইত্যাদিও — রক্ষা পাইবে। ইহাতেই মুসলমান জনমত ঠাণ্ডা হইল।

এই আন্দোলনের কালে ভারতের মুসলমান সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু সমাজের সহিতও মিত্রতার সূত্রপাত করিল। মুসলিম লীগের আদি উদ্যোক্তা আগা খান লীগ ছাড়িলেন ১৯১২ সালে। তিনি তথাকথিত ‘প্যান-এসলাম’ পথিকদের সহিতে পারিতেছিলেন না। ১৯১৩ সালে ঢাকার নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ মরিলেন। আর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ হইলেন। এই যুগেই শ্রীমতি সরোজিনী নাইড়– জিন্নাহ সাহেবকে ‘হিন্দু-মুসলমান মিলনের বার্তাবাহক’ উপাধি দিয়াছিলেন। ১৯১৬ সালে লক্ষেèৗ শহরে লীগ-কংগ্রেস সমঝোতা হইয়াছিল এই সৌহার্দ্যরে আবেশেই। আর ঐদিকে ১৯১৬ সালে ইংরেজ জাতির সহিত মৈত্রী করিয়া তুর্কি মুসলমান সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়াইয়া দিল আরব মুসলমানদের নেতা শরিফ হোসেন। ভারতীয় মুসলমানরা মহা ফাঁপরে পড়িলেন। আরব বিদ্রোহের ফল দাঁড়াইল তুর্কিদের পরাজয়। ১৯১৮ সালের শেষ নাগাদ তুরস্ক আত্মসমর্পণ করিলে বিজয়ী ইংরেজরা ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে ঢুকিয়া পড়িল। তুর্কি সুলতান ইংরেজদের হাতে বন্দি হইলেন। তুরস্কের জন্য শত টুকরায় ভাগ হইবার বিপদ দেখা দিল।

ইহার মধ্যে রাশিয়ায় বিপ্লব হওয়ার ফলে আগেই জানা হইয়াছে কিভাবে যুদ্ধ শেষ হইবার আগেই ইংরেজ আর ফরাশি জাতির কূটনীতিকেরা ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীনস্ত নানান দেশ ও প্রদেশ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া লইবে। ভারতীয় মুসলমানরা বুঝিতে শুরু করিলেন, কি আরব কি তুর্কি কেহই তাহাদের কথা শোনে নাই। আর ইংরেজ সরকারই বা শুনিবেন কেন?

তাহারা স্থির করিলেন স্বদেশের জাতি ভাই হিন্দুদের সহিত হাত মিলাইবেন। নহিলে ইংরেজকে দুইটি কথা শুনাইবেন সেই শক্তিও তাঁহাদের হাতে থাকিবে না। ১৯১৯ সালের মধ্যভাগ নাগাদ তাঁহারা ‘খেলাফত সম্মেলন’ নামে একটি আন্দোলন রচনা করিলেন। আর বুদ্ধির কি বাহার! ১৯১৯ সালের নবেম্বর নাগাদ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত খেলাফত সম্মেলনের মহাসমাবেশে সভাপতির আসনে বসাইলেন অমুসলমান মহাত্মা গান্ধিকে। রাউলাট আইন নামে কুখ্যাত কিছু আইন ইংরেজ সরকার যুদ্ধের সময় প্রবর্তন করিয়াছিলেন। যুদ্ধের পরও সেইগুলি চালু রাখার চেষ্টা করিতেছিলেন তাঁহারা। হিন্দু ও মুসলমান উভয় জনগোষ্ঠীর নেতারা এই সময় এই আইনগুলিকে উপলক্ষ করিয়া একত্র হইলেন।

ইতিহাসে এই যুগটাকে অসহযোগ আন্দোলনের যুগ বলা হয়। ১৯২২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে মহাত্মা গান্ধি হঠাৎ করিয়া এই আন্দোলন বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। ইহার সঙ্গত কারণ ছিল। বিহারে চৌরিচৌরা নামক এক গ্রামে গ্রামবাসীদের সহিত দাঙ্গায় ১৭ জন পুলিশ ও ১৭২ জন চাষী মারা গিয়াছিল। গান্ধিজি ক্ষেপিয়া গেলেন। আন্দোলন হইতে তিনি সরিয়া দাঁড়াইলে জবাহরলাল নেহরু প্রভৃতি নেতাও মনে প্রচুর ব্যথা পাইয়াছিলেন।

হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর মধুচন্দ্রিমাও মনে হইতেছে এই সময় শেষ হইয়া গেল। মৌলানা মোহাম্মদ আলী কয়েদ হইলেন। বছর খানিক পর কারামুক্ত হইয়া তিনিও হিন্দু ও মুসলমান সমস্যা লইয়া ব্যস্ত হইতে শুরু করিলেন।

ধর্মের সহিত রাজনীতি কিছু পরিমাণে সবসময়েই মিশিয়া থাকে। ইহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু রাজনীতির সহিত ধর্ম মিশাইলে কি পদার্থ তৈরি হইতে পারে তাহার উদাহরণ খেলাফত আন্দোলন হইতে খানিক পাওয়া যাইবে। এই সময় আমরা দেখিতেছি সেই মিশ্রণের বিষময় ফল ফলিতে শুরু করিল। ভারতীয় মুসলমানদের উপর প্রশ্নটা তখন কেহ চাপাইয়া দিয়াছিল কিনা জানি না, কিন্তু প্রশ্নটা কিভাবে জানি উঠিয়া দাঁড়াইল। ১৯১৭ সনের  ডিসেম্বর মাসে মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে বা বৈঠকে প্রশ্ন উঠান হইল — ভারতীয় মুসলমান কি আগে মুসলমান, না আগে ভারতীয়?

হালফিল বাংলাদেশে আসিয়াও আমরা একই ধরনের প্রশ্নের হাত হইতে ছাড়া পাইতেছি না। বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর লোকজন কি আগে মুসলমান পরে বাঙ্গালি, নাকি আগে বাঙ্গালি পরে মুসলমান? এই মূঢ়তার উত্তর ভারতীয় মুসলমানের ইতিহাসে ভাল করিয়াই মিলিতেছে। কিন্তু সাধু কেন মূঢ়তার কাহিনী শুনিবেন?

ধরিয়া লওয়া হইয়াছিল এসলামধর্মে রাজনীতি হইতে ধর্মকে আলাদা করিবার বিধান নাই। আরো ধরিয়া লওয়া হয় এসলাম যদি রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলিয়া নির্দেশ না দেয় তো মুসলমানরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও শরিক হইবে না। এই দুই অনুমানের উপর ভর করিয়া উলেমা অর্থাৎ ধর্মবিদদের রাজনীতিতে টানিয়া আনা হইয়াছিল। রাষ্ট্র আন্দোলন বা রাজনীতিতে বৈধতা পাইবার জন্য ধর্মীয় রায় বা ফতোয়া দেওয়া শুরু  হইল।

সকলেই জানেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের এক প্রস্তাববলে ইংরেজ সরকারের সহিত অসহযোগিতার সিদ্ধান্ত পাশ হয়। অসহযোগ আন্দোলনের এই প্রস্তাবকে শক্তিশালী করার জন্য ‘জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ’ বা ভারতীয় উলেমা সমিতির ‘ফতোয়া’ গ্রহণ করা হয়। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে মৌলানা মোহাম্মদ আলী একটি প্রস্তাব তুলিলেন আর নিখিল ভারত খেলাফত সম্মেলনে তাহা পাশও হইল। প্রস্তাবে বলা হইল:

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন মুসলমান যদি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকুরিরত থাকেন তবে তাহাকে চাকুরি ছাড়িতে হইবে, সেনাবাহিনীতে নতুন করিয়া কোন মুসলমান ঢুকিতে পারিবেন না, বা কাহাকেও ঢুকিতে সাহায্য করিবেন না। করিলে তাহা যে কোন বিচারেই  ধর্র্র্মীয় দৃষ্টিতে অবৈধ বা হারাম হইবে। তাহা ছাড়া এই সকল ধর্ম নির্দেশিত আজ্ঞা সেনাবাহিনীতে চাকুরিরত সকল মুসলমানের বাটিতে পৌঁছাইয়াছে কিনা তাহার তদারক করা সাধারণ বিচারে সকল মুসলমানের আর বিশেষ বিচারে উলেমার উপর ফরজ বলিয়া বিবেচিত হইবে।

এই সম্মেলন (জুলাই ১৯২১) আরো একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিল যাহা শুনিলে এখনকার শিশুরাও কৌতুকবোধ করিবে। সিদ্ধান্ত হইয়াছিল ব্রিটেন যদি তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তবে ভারতবর্ষের মুসলমানরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণা করিবে আর কংগ্রেসের পরবর্র্তী অধিবেশনে স্বাধীন ভারত প্রজাতন্ত্রের পতাকা উড়াইয়া দিবে।

গান্ধিজি যখন ১৯২২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে অসহযোগ আন্দোলনটা স্থগিত করিলেন তখন ঐ আন্দোলনে যাঁহারা প্রাণ বাজি রাখিয়াছিলেন তাঁহারা ভাল একটা চাপড় খাইলেন আর মুসলমানরা হইলেন দিশাহারা। তাঁহারা তো কোন প্রকার কিন্তু না রাখিয়া জবান দিয়াছিলেন, ধর্মীয় কর্তব্য হিশাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন একটা প্রস্তাবকে। এখন কোন ধর্মীয় অছিলায় সেই কর্তব্য হইতে বিরত হইবেন? নেতাদের এই অবিমৃষ্যকারিতাই প্রমাণ করিল তাঁহারা ভ্রান্ত। তাঁহারা কোথায় আর পৃথিবী কোথায়?

ইংরেজ সরকার কর্তৃক ১৯১৯ সনের আইনবলে গঠিত পরিষদ বা কাউন্সিলে যোগদান না করা ঠিক হইবে কিনা — এই প্রশ্ন লইয়া কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটি আমতা আমতা আলোচনা করিল। কিন্তু ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ ঘোষণা করিল ১৯২০ সালের ফতোয়া মোতাবেক চলিতেই হইবে।

ভারতীয় মুসলমানরা যে ধরনের ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি দিয়া কাজে নামিয়াছিলেন, আরব মুসলমান ও তুর্কি মুসলমানরাও সেই একই আবেগ অনুভূতি দ্বারা পরিচালিত হইতেন। ইহা ধরিয়া লওয়ার ফলে ভয়ানক এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। ভারতীয় মুসলমানদের কথা না ভাবিয়া, তাঁহাদের আবেগ অনুভূতির তোয়াক্কা না করিয়াই আরবরা তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তখন ১৯১৬ সাল। আর ১৯২৪ সালে তুর্কিরা খোদ খেলাফত নামক প্রতিষ্ঠানটিই বিলুপ্ত করিয়া দেয়।

রাজনীতির সহিত ধর্ম মিশাইবার ফল এমনই কর”ণ হয়। এই মূঢ়তাকে যদি আপনার প্রহসন বলিতে চাহেন বলিতে পারেন। ইহার তুলনায় আগের ঘটনাটিকে হয়তো ট্রাজেডি বলা চলিবে। আজ সময়াভাবে তার উল্লেখ মাত্র করিয়া ক্ষান্ত হইব।

প্রস্তাব পাশ করিয়া খেলাফত আন্দোলন শুরু হইবার আগে সিন্ধু, পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের প্রায় ১৮,০০০ মুসলমান তাহাদের সহায় সম্বল যাহা ছিল সব বিক্রয় করিয়া শত্র“ কবলিত ভারতবর্ষ হইতে হিজরত করিয়াছিলেন পাশের মুসলমান শাসিত দেশ আফগানিস্তানে। তাঁহারাও অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন একটি ধর্মীয় আদেশ বা ফতোয়ার আলোকে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, সরলপ্রাণ এই শরণার্থী বা মোহাজের মুসলমানরা যখন আফগান সীমান্তে পারি দিলেন তখন এসলামের দেশ তাঁহাদিগকে প্রবেশ করিতে দিল না। তাহারা বহু কষ্টে, দীনহীন অবস্থায়, নিজ নিজ গ্রামে প্রাণ লইয়া ফিরিতে পারিয়াছিলেন বটে। খেলাফত আন্দোলনের নেতারা যে মাঝে মধ্যে তাঁহাদের খোঁজখবর লইয়াছিলেন তাহার প্রমাণ অবশ্য আছে।

তাই ভাবিতেছিলাম ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়া যে হেফাজত নেতারা প্রচার করিতেছেন তাহারা কি জানেন না যে ইতিহাসে একই ঘটনা ও চরিত্র অন্তত দুইবার ঘটিয়া থাকে? আর প্রথমবার যাহা ঘটে তাহাকে যদি বা ট্রাজেডি বলি তো দ্বিতীয়বারকে প্রহসন বৈ বলা যায় না?

১১ এপ্রিল ২০১২

দোহাই

Fidel Castro, My Life, ed. Ignacio Ramonet, trans. Andrew Husley (London: Penguin Books, 2008).
Mohammad Mujeeb, The Indian Muslims (London: George Allen and Unwin, 1967).
Saiyid Athar Abbas Rizvi, Landmarks of South Asian Civilizations (New Delhi: unshiran Manoharlal, 1983).

 

১২ এপ্রিল ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ৪

রাষ্ট্র আর জাতীয় সমাজ: বাদশাহি আমলের ধর্মনীতি

১৯৭১ সাল বাংলাদেশে যে রাষ্ট্র কায়েম করিয়াছে তাহার চারিসীমানা নির্ধারিত হইয়াছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ চুক্তিমাফিক। এই চুক্তির গোড়ায় ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস আর নিখিল ভারত মুসলিম লিগের মতৈক্য। আর ১৯৪৭ চুক্তির ভিত্তি ছিল ব্রিটিশশাসিত বাংলা (ও কিছু পরিমাণে আসাম) প্রদেশের মুসলমান ও অমুসলমান প্রজাসাধারণের সংখ্যা। কিছু কিছু জেলার ভাগাভাগি আর কয়েকটি স্থানের ভারতব্যাপী বিনিময়ের হিস্যাসহ মোটের উপর মুসলমানপ্রধান অঞ্চল লইয়া ১৯৪৭ সালে গঠিত পূর্ব বাংলা প্রদেশই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হইয়াছে। সকলেই স্বীকার করিবেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমান অমুসলমান বিভাজনটা বড় বিষয় হয় নাই। বড় বিষয় বরং হইয়াছিল মুসলমান আর অমুসলমানসহ বাংলাদেশের চারিসীমানার বাসিন্দা সর্বজনের ঐক্য বা মৈত্রী। এই ঐক্য গড়িতে স্বভাবতই জোর পড়িয়াছিল সকল জাতি ও শ্রেণির সমানাধিকার দাবির উপর।

সম্প্রতি কোন কোন নতুন ব্যবসায়ী প্রচার করিতেছেন বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব করা হইয়াছে। প্রশ্ন উঠিবে এই কাজটি কে করিয়াছে। প্রচারকেরা কর্তার একটা নামও খুঁজিয়া পাইয়াছেন: ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ’। আর এই দুশমনের প্রতিপক্ষ আকারে তাহারা দাঁড় করাইতেছেন এসলামধর্মকে। আর কিছুদিন না যাইতেই হয়ত ইহারা আরো এক শত্রুর নাম লইবেন: বলিবেন ধর্মনিরপেক্ষতাই সমস্ত অনিষ্টের মূল। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর উপর সংখ্যালঘু অমুসলমান জনসাধারণ অত্যাচার করিতেছেন — কথাটা বিশ্বাস করিতে কষ্ট হয়।

যতদূর মনে পড়ে সকল জাতি আর ধর্মের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আদি অঙ্গীকার। সকল ধর্মের সমানাধিকার যদি প্রতিষ্ঠা না পায় তো ‘গণতন্ত্র’ বলিতে বর্তমান জগতে সীমিত অর্থে যাহা বুঝায় তাহাও কায়েম হইতে পারিবে না। তাই আশংকা করি এসলাম উপেক্ষিত বলিয়া তৎপর ব্যবসায়ীরা যাহা কায়েম করিতে চাহিতেছেন তাহা হইবে একপ্রকারের স্বৈরতন্ত্র। এয়ুরোপের ইতিহাসে এই জাতীয় স্বৈরতন্ত্রের নাম দাঁড়াইয়াছিল ফ্যাসিবাদ।

সম্রাট আকবর

সম্রাট আকবর

বাংলাদেশ যে ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির অঙ্গীকার করিয়াছিল — অন্তত ১৯৭১ সালে করিয়াছিল — সৌভাগ্যের মধ্যে তাহার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসেই আছে। মোগল বাদশাহ আকবর যে ধর্মনীতি পালন করিয়াছিলেন তাহাকে বাংলাদেশের অঙ্গ মনে করিলেই তো হয়। কথাটা কিন্তু নতুন নহে। ভারতবর্ষের ইতিহাস লইয়া যাহারা কিছু সময় অন্তত কাটাইয়াছেন তাহারাই সত্যটা জানেন। আমার কাজ কথাটা শুদ্ধ মনে করাইয়া দেওয়া। বর্তমান ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতারাও সে সত্যের আংশিক স্বীকৃতি দিয়াছেন। চতুর লোকেরা হয়তো ইহাতে খুশি হইবেন না। তাহারা হয়তো বলিবেন আমি মোগল স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করিতেছি। বয়ান করিবেন বাদশাহ আকবর তো এসলামধর্ম ত্যাগ করিয়া অমুসলমান হইয়া গিয়াছিলেন। আমরা দেখিব এই অভিযোগ খানিকটা অতিশায়নের দোষে দুষ্ট।

একালের ইংরেজ ইতিহাস ব্যবসায়ী পার্সিবাল স্পিয়ার সাহেব মনে করেন বাদশাহ আকবর মনে মনে বরাবরই ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়ী’ বা লিবারেল ছিলেন। অনেকেই মনে করাইয়া দিয়াছেন হুমায়ুনের অকালপ্রয়াণে আকবর বাদশাহ নামদার হইলেন ১৫৫৬ নাগাদ। ততদিনে তাঁহার বয়স টানিয়াটুনিয়া ১৪ বছর আর রাজ্যভার বা সত্যকার রাষ্ট্রক্ষমতাটা বাদশাহ নামদার হাতে লইলেন আরো চারি বছর পর। ক্ষমতা হাতে লইবার দুই বছরের মাথায়, মোতাবেক ১৫৬২ এসায়ি সালে, মহাত্মা আকবর হিন্দুজাতির পবিত্র তীর্থ মথুরা নগরের তীর্থকর মওকুফ করিয়া দিলেন। রাজার ব্যবসায় প্রজাসাধারণের যাহার যে ধর্ম সেই ধর্মপালনের স্বাধীনতা যতদূর পারা যায় অবারিত করা। আকবর বাদশাহ তাহাই করিলেন। ইহার পর তিনি অম্বরের হিন্দু রাজপুত পরিবারে বিবাহ করিলেন। রাজপুত জাতির সহিত মিত্রতার কারণে প্রশাসনের অনেক উচ্চপদ হিন্দু রাজাদের হাতে সঁপিয়া দিলেন। এক পর্যায়ে ‘জিজিয়া’ নামে হিন্দুজাতির মাথায় আরোপিত বিতর্কিত একটি করও তিনি রহিত করিলেন। এইসব ঘটনা অসত্য নহে। তবে আলিগড়ের মোগল ইতিহাসবিদ ইকতেদার আলম খান মনে করেন এহ বাহ্য।

১৫৭০ সালের দশকে বাদশাহ আকবর চমৎকার ধর্মচিন্তায় মাতিয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি ধর্মসভার আয়োজন করেন। সেখানে এয়াহুদি, নাসারা, জৈন, বৌদ্ধ আর পারস্যধর্মাবলম্বীদের (জরাথুস্ত্রপন্থী) পর্যন্ত দাওয়াত করা হইয়াছিল। এই ধর্মসভার যুগেই আকবরের আধাআধি ভাই কাবুলের শাসক মির্জা হাকিমের রাষ্ট্রবিদ্রোহ ঘটে। অনেক ভারতীয় আলেম ওলামাও এই বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিলেন। বলা যায় আকবরের ধর্মনীতিতে যাহারা অসন্তুষ্ট ছিলেন তাহারাও এই বিদ্রোহের হোতা ছিলেন। ১৫৮১ নাগাদ আকবর এই বিদ্রোহ নিবারণে সমর্থ হন। ইহার পর বড় আকারের বিদ্রোহ বড় আর হয় নাই। কিন্তু এই বিদ্রোহের অনুগামীরা আকবরের বিরুদ্ধে প্রচারণায় কোনদিনই ক্ষান্ত দেন নাই। আদতে তাহারাই নিরন্তর প্রচার করিয়াছেন বাদশাহ আকবর এসলাম ত্যাগ করিয়াছিলেন। আমরা বলিব কথাটি সামান্য অতিরঞ্জিত!

আকবরের এসলামধর্ম পরিত্যাগ নামক ঘটনা কল্পনা করিয়া এয়ুরোপ হইতে আগত খ্রিস্টান মিশনারি (খাস করিয়া বলিতে গোয়ার পর্তুগিস জেসুইট) পাদরিগণ পাইয়াছিলেন বিশেষ আনন্দ। খবরটা ইঁহারাই বিশেষ আমোদের সহিত এয়ুরোপ মহাদেশে প্রচার করিয়াছিলেন। তাঁহারা কখনো হয়তো বা আশা করিয়া থাকিবেন বাদশাহ আকবর বুঝি একটানে খ্রিস্টান হইয়া যাইতেছেন। তাঁহাদিগের সে আশা বলাবাহুল্য পূরণ হয় নাই। তাহাতে কি হইয়াছে! কল্পনাশক্তি উর্বরা পদার্থ। শুদ্ধ তাঁহারা নহেন, ইংরেজতনয় বিনসেন্ট স্মিথ প্রভৃতি ইতিহাসবেত্তা পুরুষও সদ্য বিগত এই বিশ শতকে আসিয়াও একটি না হয় আরেকটি মিছাকথা অবিরত প্রচার করিয়া গিয়াছেন। খ্রিস্টান না হইলে কি হইবে আকবর এসলামধর্ম পরিত্যাগ করিয়াছিলেন! চালু করিয়াছিলেন নতুন একটি ধর্মমত! এই সেদিনও জিব টানিয়া কথাটি বলিয়া গিয়াছেন বিনসেন্ট স্মিথ।

এখানে সবিস্তার আলোচনার অবকাশ নাই। আপাতত বলিয়া রাখিতেছি, একালের ভারতীয় হিন্দু মুসলমান আর এয়ুরোপিয়া খ্রিস্টান সকল ইতিহাসবিদই একমত যে বাদশাহ আকবর এসলামধর্ম আদৌ ত্যাগ করেন নাই। তিনি এসলামের একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির করিয়াছিলেন মাত্র। গোঁড়া মুসলমান আলেমদের কেহ কেহ তাঁহাকে এ ব্যাপারে ভুল বুঝিয়াছিলেন। কেহ কেহ স্বার্থসিদ্ধি ও প্রতিহিংসার অধীন হইয়া তাঁহার উপর হামলা করিয়াছিলেন। আকবর আপনকার রাষ্ট্রকে একটা জাতীয় ভিত্তি দিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি চাহিয়াছিলেন ভারতবর্ষের রাষ্ট্রকে জাতীয় সমাজের উপর দাঁড় করাইতে আর ভারতের নতুন জায়মান ‘জাতীয় সমাজ’কে হিন্দু আর মুসলমানের ঐক্যের উপর দাঁড় করাইতে। হিন্দু আর মুসলমানের ঐক্যমাত্র নহে, তিনি চাহিয়াছিলেন আরো। শিয়া আর সুন্নি এই দুই মুসলমান সমাজের ঐক্যবিধানও তাঁহার লক্ষ্যের অন্তর্গত ছিল। আকবর বাদশাহ সকল ধর্মকে সমান মর্যাদা দিয়াছিলেন। তাহার উপর তিনি শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতিও বজায় রাখিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন।

আলিগড়ের ইতিহাসবেত্তা মহাত্মা আতার আলি এক জায়গায় দেখাইয়াছেন বাদশাহ আকবর যে হিশাবে সর্বোচ্চ সামরিক পদমর্যাদা (বা মনসব) বিতরণ করিয়াছিলেন তাহাতে এই বাসনার প্রকাশ পরিষ্কার। তিনি চাহিয়াছিলেন মোগল শাসকশ্রেণি যেন গঠনে সত্যসত্য ‘জাতীয়’ ঐক্যের প্রতিফলন ঘটায়। ১৫৯৫ নাগাদ জীবিত মনসবদারদের তালিকা ধরিয়া তিনি হিশাব করিয়াছেন (বাদশাহর পুত্র আর পৌত্রদের হিশাবের বাহিরে রাখিলে) আকবরের অধীন সর্বমোট ২৭৯ মনসবদারের মধ্যে হিন্দু মনসবদার ছিলেন ৪৭ জন। আর ৭৫ জন ছিলেন ইরানি অর্থাৎ শিয়া মুসলমান। মোট ৮ জন সর্বোচ্চ (৫,০০০ বা তদূর্ধ্ব) মনসবদারের মধ্যে হিন্দু ছিলেন মাত্র ১ জন আর শিয়া ৪ জন। মোট ১৩ জন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শ্রেণির (৩,০০০-৪,৫০০) মনসবদারদের মধ্যে হিন্দু ৩ জন আর শিয়াজাতির মুসলমান ছিলেন ৫ জন। মোট ৩৭ জন তৃতীয় শ্রেণির (১,০০০-২,৫০০০) মনসবদারের মধ্যে ৬ জন হিন্দু আর ৬ জন ছিলেন শিয়াজাতির। চতুর্থ শ্রেণির (৫০০-৯০০) ৬১ জনের মধ্যেও হিন্দু আর শিয়া ছিল সংখ্যায় সমান সমান, দুই গোষ্ঠীতেই ১২ জন করিয়া। সর্বশেষ শ্রেণির (২০০-৪৫০) মোট ১৬০ জনের সারিতে দেখা যাইতেছে  শিয়া ৪৮ আর হিন্দু ২৫।

আকবরপুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর এক সময় তাঁহার বাবার সরকার প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, উঁহার আমলে শিয়া-সুন্নি এক মসজিদে নমাজ পড়িত। একবার এক মোগল শাহজাদা (মির্জা ফৌলদ) শিয়া ধর্মবিশারদ মোল্লা আহমদ থাট্টাবিকে হত্যা করেন। প্রকাশ এই মোল্লা সাহেবটি খুব রাখঢাক না করিয়াই শিয়া ধর্মমতের পক্ষে প্রচারে মাতিতেন আর শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্য লইয়া নিত্য বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইতেন। এই মামলার বিচারে মোগল শাহজাদার মৃত্যুদণ্ড হয়। অনেক তদবির সত্ত্বেও আকবর উঁহাকে ক্ষমা করেন নাই।

যাহাকে বলা হয় ‘ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা’ তাহার মধ্যে থাকিয়াও পাঠিকা দেখিবেন মোগল শাসকশ্রেণির আধিপত্য যতদিন বজায় ছিল তাহার কঠিন গঠন এই বরাবর ছিল। আওরঙ্গজীবে আর আকবরের ধর্মাচরণে যত ভেদ থাকে তাহা শুদ্ধ আচরণধর্মেই। এই বিষয়ে শাসকশ্রেণির গঠনধর্মে তাঁহাদিগের মধ্যে প্রভেদ বড় একটা দেখা যায় না।

আজ পর্যন্ত আকবর সম্বন্ধে এয়ুরোপিয়া নানান ভাষায় পুস্তকাদি যত লেখা হইয়াছে দেখা গিয়াছে তাহাদের সিংহভাগ জুড়িয়াই আছে তাঁহার প্রবর্তিত নতুন ধর্মমতের কাহিনী। ধর্মের গুজবে কান দিবার আগে সাধুলোকের উচিত ছিল সহজ কয়েকটা সওয়াল অন্তত পেশ করা। ‘ধর্মমত’ জিনিশটা কি পদার্থ — তাঁহাদের কি জিজ্ঞাসা করা বিধেয় ছিল না? আকবর যাহা প্রচার করিয়াছিলেন তাহাকে ‘ধর্মমত’ বলা চলে কিনা এ কথা জিজ্ঞাসা করিতেই বা দোষটা কোথায়? ইচ্ছা করিলে আপনি খানিক আগাইয়া অধিকও জিজ্ঞাসিতে পারেন। যাহাই হৌক ‘দিনে এলাহি’ নামক মতবাদটা কি সত্যকার ধর্মমত পদবাচ্য পদার্থ? নাকি ধর্মমত বিশেষের সহস্রবিধ ব্যাখ্যার এক ব্যাখ্যাবিশেষ? প্রয়োজনীয় জেরা না করিয়া প্রায় সকলেই একটা গুজবই রটাইয়াছেন। বলিয়াছেন সম্রাট আকবর নতুন একটা ‘ধর্মমত’ চালাইয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে ভারত আর বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে এখনো এই গুজবটা জারি আছে। অন্তত কিছুদিন আগেও ছিল। বলিতে পারিব না পুরাপুরি লোপ পাইয়াছে কিনা।

আকবর ধর্ম লইয়া ভাবিয়াছেন। তিনি সবসময় সকল আলেমের সহিত একমত হয়েন নাই। আলেমরাও নিজেদের মধ্যে সবসময় একমত হইতে পারেন নাই। ১৫৭৯ সনে ভারতবর্ষের সর্দার আলেমরা একটি ঘোষণাপত্রে দস্তখত করিলেন। ইহাতে বলা হইয়াছিল যে সকল প্রশ্নে আলেমদের মধ্যে কোন ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হইবার সম্ভাবনা নাই সেখানে দশমতের মধ্য হইতে একটি মত বাছিয়া লইবার অধিকার (‘সুলতানুল আদেল’) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহের হাতে সংরক্ষিত থাকিবে। এই ‘মাহজার’ বা ঘোষণাপত্রের ঢের অপব্যাখ্যা হইয়াছে। এয়ুরোপিয়া লেখকরা ইহার অনুবাদ করিয়াছেন ‘ডিক্রি অব ইনফলিবিলিটি’ (অর্থাৎ বাদশাহি অভ্রান্তির ফরমান)।

আরো একটা প্রশ্ন কেন করা যাইবে না? ধর্মপ্রাণ ভারতীয় মুসলমান আলেমজাতি বা ধর্মপ্রাণ এয়ুরোপিয়া খ্রিস্টান প্রচারকগণ কি কারণে আকবরের ধর্মমত লইয়া এতটা বাড়াবাড়ি করিলেন? তদুপরি মনে রাখিতে হইবে প্রচারকদেরও জাতি আছে, ধর্ম আছে, বর্ণ আছে, আর আছে স্বার্থবুদ্ধি। দেখিতে হইবে আকবর বাদশাহ কোন সময়ে এই নতুন ধর্মমতে মতি দিলেন। কিংবা জিজ্ঞাসিতে হইবে ইহার আগে আর কি কি কাজে তিনি হাত দিয়াছিলেন। তাহাতে কোথাও কিন্তু নতুন ধর্মমত প্রচারের আলামত নাই। যদি কিছু থাকিয়া থাকে তবে তাহার নাম হইতে পারে নতুন ধর্মনীতি। ইহাই পরে ‘সুলেহ কুল’ বা নিরঙ্কুশ শান্তির নীতি নামে সমধিক পরিচিত হইয়াছে।

Secularism Signআকবরের ‘দিনে এলাহি’ জিনিশটা ছিল রাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। এই রাষ্ট্রনীতির অপর নাম ‘সুলেহ কুল’ বা নিরঙ্কুুশ শান্তি। নতুন ধর্মমত প্রচার করিতে বসিয়া হাতের রাষ্ট্রক্ষমতা পর্যন্ত বিপন্ন করিয়া তুলিবেন এমন নাদান ছিলেন না আকবর। পার্সিবাল স্পিয়ার ঠিকই বলিতেছেন — আকবর বাদশাহকে এতটা বেকুব মনে করা বোধ হয় ঠিক হইবে না। মনে রাখিতে হইবে রাষ্ট্রই ছিল তাঁহার ভাবনার মধ্যবিন্দু। ধর্মসমন্বয় ছিল আকবরের রাষ্ট্রভাবনার অঙ্গবিশেষ। তাঁহার প্রধান ভাবনা ছিল কি করিয়া সকল শ্রেণি ও জাতির মন পাওয়া যাইবে। আজিকালি ইহার নাম হইয়াছে ‘হেজিমনি’ ওরফে সম্মতিলাভ বা আনুগত্য অর্জন।

অতীতকালে যত রাজা বা বাদশাহ অখিল ভারতবর্ষ একযোগে শাসন করিতে চাহিয়াছেন তাহাদের সকলকেই এই সমস্যার মোকাবেলা করিয়া চলিতে হইয়াছিল। হিন্দু আর মুসলমান এই দুই জাতিকে নতুন কোন একটা ধর্মের ছায়াতলে টানিয়া আনা যেমন সম্ভব ছিল না তেমনি এই দুই ধর্মবিশ্বাসের একটির জায়গায় অন্যটি স্থাপনের কল্পনাও ছিল সমান অবাস্তব। ভারতেতিহাসের আর দশ রাজযোগীর ন্যায় বাদশাহ আকবরও এই দুই সত্যে সমান ওয়াকেবহাল ছিলেন।

আকবর মনে হয় আরো একটা কথা ভাবিয়াছিলেন। রাষ্ট্রের জায়গায় যখন বিশেষ ধর্মমতকে টানিয়া আনা যাইতেছে না তখন দেখা যাউক অন্তত ধর্মের বিশেষ জায়গায় রাষ্ট্রটাকে লইয়া গেলে কেমন হয়। হিন্দু আর মুসলমান একে অপরের ধর্মমত মানিবে না ঠিক আছে। তৃতীয় একটা পদার্র্থ মানিতে তো কাহারও আপত্তি থাকিবার কথা নয়। রাষ্ট্র কিংবা সম্রাটকে মানিয়া লইতে কাহারও বাধা নাই, অন্তত থাকার কথা নয়। বেশ ইহার তাৎপর্য। এই যুক্তি অনুসারে রাষ্ট্রও একপ্রকার ধর্মমত বৈকি। এই ধর্ম ‘ধর্মমতবিশেষ’ নহে, ধর্মনীতি মাত্র। ইচ্ছা হয় বলিতে পারেন ‘সুলেহ কুল’ — ‘রাষ্ট্রের নগণ্য ধর্মনীতি’ মাত্র। কোনক্রমেই ইহা এসলাম, নাসারাধর্ম কিংবা ব্রাহ্মণ্যধর্মের মতন ধর্মমত গণ্য হইতে পারে না।

আকবর প্রজাসাধারণের নিকট রাষ্ট্রের প্রাপ্য দাবি করিয়াছিলেন। সেই প্রাপ্য শুদ্ধ কর কিংবা খাজনায় প্রদেয় নহে। সেই প্রাপ্য প্রজাসাধারণের ভক্তি বা আনুগত্য। বাদশাহকে শুদ্ধমাত্র ধর্মীয় ভক্তিতুল্য ভক্তি করিলেই হইবে না। শ্রদ্ধাটাও দেখাইতে হইবে। মাথা নত করিয়া বা সেজদা প্রভৃতি দিয়া ভক্তিপ্রদর্শনের যে রীতি সেকালের ইরানে আর ভারতে চালু ছিল আকবর নিজেও তাহা খানিক এস্তেমাল করিয়া থাকিবেন। ভারতবর্ষ গুরুভক্তি আর পিরফকিরপরস্তির দেশ। আকবরের উপরও তাহার আছর হইয়াছিল হয়তো। হইতেই পারে। এই আছর ইতর আছর নহে, বিশেষ আছর। রাজারা কোন অধিকারে রাজা হইয়াছেন? এই প্রশ্নের জওয়াবে তখন কি এয়ুরোপে কি এশিয়ায় ভগবানের নাম কে না লইতেন! বলা হইত এই বা সেই রাষ্ট্রশাসনের অধিকার এই বা সেই বংশের ভগবানপ্রদত্ত অধিকার। রাজা হইতেছেন ভূপৃষ্ঠে ভগবানের ছায়া। আকবর এই বাক্যে আস্থা রাখিয়া নতুন আর কি বা করিবেন! তিনিও নিজেকে ভগবানের কিছুটা ছায়াসদৃশ ভাবিয়াছেন।

‘ভগবানের ছায়া’ কথাটা এস্তেমাল করিলে রাজাকে ভগবানের সহিত এক করিয়া ফেলা হয় না। ইহাতে বরং রাজাকে আর দশজনের তুলনায় একটা উচা পৃথক মর্যাদা দেওয়া হয় মাত্র। এয়ুরোপ মহাদেশের কোন রাজা না এই সেদিন পর্যন্ত ‘ডিবাইন রাইট’ ওরফে দিব্যাধিকারের দিব্য না দিয়া কর্তৃত্ব করিয়াছেন? এই সত্যেরই একটা অতিরিক্ত প্রমাণ পাওয়া গিয়াছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে। মোগল বাদশাহি পরিবারের সত্যক্ষমতা একেবারে নিঃশেষ হইয়া যাইবার একশত বছর পরও দেখা গিয়াছে সেই যুদ্ধে ভারতবর্ষে ইংরেজ কোম্পানি বাহাদুরের কর্মচারীরা, হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিরা, হাতে এনফিল্ড রাইফেল আর মুখে মোগল বাদশাহের নাম লইয়া লড়াই করিতেছে। বাহাদুর শাহ জাফর শুদ্ধ কি বাদশাহ ছিলেন! তিনি অজস্র মানুষের মুর্শিদও ছিলেন। তাঁহার পিরালি ব্যবসায়টা দিব্যাধিকারের ছায়া নহে এ কথা কে হলপ করিয়া বলিবে! বাদশাহ আকবরের ধর্মবিশ্বাসে এই হিন্দুস্তানি ধারার চলও যে কিছু পরিমাণে অবিকল ছিল তাহাতে সন্দেহ করা চলে না। ধর্মনীতি আর ধর্মচিন্তার মধ্যে কোন জল অচল সুপরিসর কুঠুরি নাই।

আকবরের ধর্মনীতি, পার্সিবাল স্পিয়ার ঠিকই ধরিয়াছেন, মিঠা মিঠা ফলপ্রসব করিয়াছিল। এই ইংরেজ বুদ্ধিমান অবশেষে বলিয়াছেন মোগলেরাই ভারতদেশের প্রথম মুসলমান রাজবংশ যাঁহারা কি হিন্দু কি মুসলমান সকল জাতির নির্বিশেষ ভালবাসা বা নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভ করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান, সুন্নি আর শিয়া সকল জাতিই মোগল শাসন মানিয়া লইয়াছিল শুদ্ধমাত্র তলোয়ারের ডরে নয়, অন্য কারণে। এই সকল কারণের মধ্যে আকবর শাহের ধর্মনীতিরও একটা জায়গা নিঃসন্দেহে আছে। মনে রাখিতে হইবে যেমন ফল তেমন বিষ! যেমন বন্য ওল তেমন বাঘা তেতুল। এই দুনিয়ায় কোন পদাথর্টাই বা আপনি নিখরচায় পাইয়াছেন!

আকবর বাদশাহকে এই ধর্মনীতি বাবদ কিছু দামও গণিতে হইয়াছিল। কুড়াইতে হইয়াছিল গোঁড়া আলেমদের কাঁড়ি কাঁড়ি অভিসম্পাৎ।

২৮ মার্চ ২০১৩

দোহাই

M. Athar Ali, ‘Sul-i Kul and the Religious Ideas of Akbar,’ in Mughal India: Studies in Polity, Ideas, Society, and Culture, 6th imp (New Delhi: Oxford University Press, 2011), pp. 158-72.

Percival Spear, A History of India, vol. 2 (Harmondsworth, Middlesex: Penguin Books, 1965).

 

২৯ মার্চ ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২
২৯ মার্চ ২০১৩, arts.bdnews24.com

১৯৭১: সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা

‘ইতিহাসে কোন কোন সময় আসে যখন এক একটা মিনিটের ব্যাপ্তি, গভীরতা এবং ঘনত্ব হাজার বছরকে ছাড়িয়ে যায়। আমাদের জীবনে একাত্তর সাল যে রকম। একাত্তর সালকে যারা দেখেছে, ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যারা বড় হয়েছে, একাত্তর সালের মর্মবাণী মোহন সুন্দর বজ্রনিনাদে যাদের বুকে বেজেছে, তারা ছাড়া কেউ একাত্তরের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’ এই দুইটি বাক্য পরলোকগত মহাত্মা আহমদ ছফা হইতে উদ্ধার করিলাম। ১৯৭১ সালের অন্যূন ২২ বছর পর ‘একাত্তর: মহাসিন্ধুর কল্লোল’ নামে এক নাতিদীর্ঘ নিবন্ধের একেবারে বিসমিল্লায় এই বাক্য দুটি তিনি পেশ করিয়াছিলেন। কি বলিয়াছিলেন সেই কল্লোল, মহাসিন্ধুর কল্লোল? আর আমরা কে কি শুনিয়াছিলাম?

বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি গল্পে জাহির আছে প্রজাপতি তাঁহার তিন ছাত্রকেই এক কথা বলিয়াছিলেন: দ, দ, দ। কিন্তু দেবতাছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দম্যত, মানে দমন করিতে হইবে। মনুষ্য ছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দত্ত, মানে দান করিতে আজ্ঞা হয়। সবিশেষ অসুরছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দয়াধ্বম, মানে দয়া করাই বিধেয়। ১৯৭১ সালের মহাসিন্ধু কি বলিয়াছিলেন? আর আমরা কে কি বুঝিয়াছিলাম? সেই পুরাতন ইংরেজি, মার্কিন, ফরাশি বিপ্লবের বাণী: স্বাধীনতা , মৈত্রী, সাম্য? নাকি ফরাশি, রুশ, চিনা বিপ্লবের বজ্রনির্ঘোষ: সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা?

এয়ুরোপ মহাদেশে ‘স্বাধীনতা’ বলিতে কি বুঝায় তাহার প্রথম দোহাই শুনিতে পাই ইংলন্ডের ইতিহাসে। এখানে ১৭ শতকের গোড়া — মানে শেকসপিয়র সাহেবের এন্তেকালের সময় — হইতে সেদেশে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহাতে দুই হিশাব করা গিয়াছে। এক হিশাবে বিপ্লব ছিল হজরত এসার অনুসারীদের দুই শাখার মধ্যে লড়াই — একদিকে গোঁড়া বা পিয়ুরিটান দল, আর দিকে মহাবিশপ লডের দল। দ্বিতীয় হিশাব মোতাবেক ইংলন্ডের বিপ্লবটি ছিল একপাশের নিরঙ্কুশ রাজার সহিত আর পাশের আম জনগণের বা সর্বজনের সংঘাত। বহুদিন যাবৎ ইতিহাস লেখকেরা এই বিপ্লবের নাম রাখিয়াছিলেন পিযুরিটান বা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপ্লব। অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে ধর্মের পর্দায় এই সমাজ বিপ্লবের ঢাকের আওয়াজ লুকাইয়া রাখা যায় নাই। এই বিপ্লব ইংলন্ডে রাজার নিরঙ্কুশ বা বেপরোয়া ক্ষমতার কেয়ামত ডাকিয়া আনিয়াছিল। তাহার জায়গায় ষোল আনা না হইলেও কিছু পরিমাণে গণতান্ত্রিক অর্থাৎ প্রতিনিধির সরকার কায়েম করিয়াছিল। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রধর্ম নামক বিশেষ ধর্মের জাতীয়তাবাদ উচ্ছেদ করিয়াছিল। অন্যান্যের মধ্যে, দেশে ধনদৌলতের রাজত্ব বা ধনতন্ত্র কায়েমের পথ প্রশস্ত করিয়াছিল।

সতের শতকের শেষ নাগাদ ইংলন্ডের বিপ্লব এক জায়গায় আসিয়া আপোসরফার পথ ধরিয়াছিল। পুরাতন জমিদার আর নতুন সওদাগর মিলিয়া দেশ শাসনের নতুন বন্দোবস্ত কায়েম করিয়াছিল। ইংরেজ জাতির অভিধানে তখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির অর্থ দাঁড়াইয়া গেল ধনদৌলতের স্বাধীনতা।

ইংরেজ জাতির ইতিহাস হইতে সারা দুনিয়ার লোক শিখিল কি করিয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামকে জয়ী করিয়াও ধনদৌলতের অসাম্যকে বজায় রাখা সম্ভব হইতে পারে। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ তাহাকে এড়াইয়া ইংলন্ড ব্যবসায়ী ও ধনিক শ্রেণির সমতা স্থাপন করিতে সমর্থ হইয়াছিল। এই ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বাধীনতার ধ্বনিকেই ইতিহাসে লিবারেলিজম বা স্বাধীনতা ব্যবসায় বলা হইয়া থাকে।

ইহাদের গুরুর নাম জন লক। ১৬৮৮ সালের ইংলন্ড বিপ্লবের সময় ইনি বিকশিত হইয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে প্রজার স্বাধীনতাকে রক্ষা করিবার ওয়াস্তেই সমাজ স্থাপিত হইয়াছিল। আর প্রজাসাধারণের মধ্যকার স্বাধীনতা চুক্তির উপরই সমাজের সৌধ দাঁড়াইয়া আছে। এই চুক্তিটা এক নম্বর। লক সাহেব আরো একটা চুক্তি বা একরারনামার কথা মনে করাইয়া দিলেন। এই দোসরা চুক্তিটা হইয়াছিল সর্বেসর্বা শক্তি বা সর্বজনের সহিত তাহাদের কর্মচারীস্বরূপ মনোনীত সরকার বা শাসন কর্তৃপক্ষের। সরকারের কাজ হইবে জনে জনে সর্বজনের স্বাধীনতা পাহারা দেওয়া।

দুঃখের মধ্যে লক সাহেবের এই যুক্তির সিঁড়ি বা মই বাহিয়া ইংলন্ডের নতুন ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়াও কিছুদিন পর তাঁহাকে ভুলিয়া গেলেন। ইংলন্ডের ইতিহাসে ইহারা হুইগ দল বা স্বাধীনতা ব্যবসায় দল নামে খ্যাত আছেন। ইহারা কহিলেন দর্শন ব্যবসায়ীর কপোলকল্পিত স্বাধীনতায় কাজ নাই। দাবি করিলেন ইংরেজ জাতির স্বাধীনতার মূলা গজাইয়াছে তাহার ইতিহাসে। তাহারা ফিরিয়া গেলেন বেপরোয়া রাজার বিরুদ্ধে বড় জমিদারদের সংঘাতের গল্পে।

১২১৫ এসায়ি সালের মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা হইতে শুরু হইল ইংরেজ জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস। সার কথা দাঁড়াইল ‘স্বাধীনতা’ পদার্থটা শুদ্ধ ইংরেজ জাতির সম্পত্তি। অন্যের কভু নহে। ইংরেজ বা ক্ষেত্রানুসারে ব্রিটিশ জাতির স্বাধীনতা স্বীকার করা সম্ভব হইবে না। ইংলন্ডের ইতিহাস হইতে আমরা মহাসিন্ধুর এই কল্লোলটুকু শুনিয়াছিলাম।

ইংলন্ড হইতে রাজা আর রাষ্ট্রধর্মের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া যাঁহারা মার্কিনখণ্ডে পলাইয়াছিলেন তাঁহারাও জন লকের যুক্তি — স্বাধীনতার গোড়ার চুক্তি — গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই স্বাধীনতা ও চুক্তির দোহাই দিয়াই মার্কিন জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হইয়াছিল এসায়ি আঠার শতকের মাঝামাঝি। মার্কিনিরা একটা নতুন কথা শুনাইলেন — স্বাধীনতা জিনিশটার মালিক খালি ইংরেজ জাতি হইবে কেন? সকল মানুষের বা মনুষ্যজাতির সম্পত্তি এই স্বাধীনতা পদার্থটি। না শুনাইলে মার্কিনজাতির নিজ রাষ্ট্র কোন যুক্তিতে নিজেকে কায়েম করিবে? মার্কিনিরা শুদ্ধ মার্কিন জাতির স্বাধীনতা লাভের অধিকার আছে না বলিয়া কবুল করিলেন দুনিয়ার সকল জাতিরই স্বাধীন হইবার অধিকার আছে।

কিন্তু ইংরেজ হুইগ বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের পথ ধরিতে নব্য স্বাধীন মার্কিন জাতিরও বেশি বেগ পাইতে হয় নাই। মার্কিনিরাও ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা বা সাম্য স্বীকার করিলেন না। লাল আদিবাসীদের কথা না হয় ছাড়িয়া দিলাম, কালা আদমিদের মানুষ বলিয়া গণ্য করা হইল না। কালা দাসেরা দাসই রহিল স্বাধীন আমেরিকায়। আর ধলাদের মধ্যে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের স্বাধীনতা সমান স্বীকার করা হইলেও কার্যক্ষেত্রে ইংলন্ডের মত অসাম্য শুদ্ধ কায়েমই হইল না, দিন দিন তাহার শ্রীবৃদ্ধিও ঘটিতে থাকিল।

স্বাধীন আমেরিকার শরিক অঙ্গরাজ্যের পর অঙ্গরাজ্যে যাহাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ ধনদৌলতের মালিকানা নাই তাহাদের ভোট দিবার স্বাধীনতা কাড়িয়া লওয়া হইয়াছিল। মার্কিন মুলুকের স্বাধীনতার চরিত্র কি রকম ছিল তাহা বুঝিতে হইলে সেই দেশের জাতির পিতা বলিয়া খ্যাত দুইজনের ইতিহাস পড়িবেন। ওয়াশিংটন দক্ষিণে ছিলেন বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক জমিদার শ্রেণির নেতা আর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন উত্তরের নতুন শিল্প কারখানার মালিক ও কারিকর শ্রেণির নেতা। মার্কিনদেশে স্বাধীনতার এত জয়গান অথচ সেখানে ধনসম্পত্তির সাম্যের কথা তোলা এক প্রকার হারাম হইয়া গিয়াছিল।

মার্কিনদেশ স্বাধীন হইয়াছিল সেই সময় যখন ভারতবর্ষ ইংরেজ জাতির হাতে পরাধীন হইতেছে। আর সেদিন ভারতবর্ষ স্বাধীনতার স্বাদ লাভের জন্য জিহ্বা বাহির করিয়াছে যেদিন মার্কিন জাতির সাম্রাজ্যলিপ্সা পূর্ব এশিয়ায় আণবিক বোমা লইয়া হাত মকশো করিতেছে। বুর্জোয়া স্বাধীনতার সহিত সাম্যের বিবাহবিচ্ছেদ এতদিনে চূড়ান্ত হইয়াছে। ইংলন্ড ও আমেরিকার বিপ্লব হইতে আমরা শুদ্ধ স্বাধীনতার আওয়াজ শুনিলাম। যে আওয়াজে সাম্যের পদার্থ নাই সে আওয়াজ ফাঁকা। সাম্যহীন স্বাধীনতাকেই তো লোকে বলে স্বাধীনতা ব্যবসায়।

ফরাশিদেশের বিপ্লবটা এই তালিকার সর্বশেষ। এই বিপ্লবে সাম্য ও মৈত্রীর কথা জোরেশোরে উঠিয়াছিল। কেন উঠিয়াছিল তাহার কারণও আছে। ফরাশিদেশের জমিদার আর রাজার পরিবার যদি কিছু পরিমাণে কম একগুয়ে হইতেন তাহা হইলে সেদেশের নতুন ধনিক বা বুর্জোয়াশ্রেণিও আপোস করিবার একটা রাহা বাহির করিতে পারিতেন। ফরাশি বুর্জোয়ারা আদপে জমিদার বা অভিজাত শ্রেণির সম্পূর্ণ পরাজয় মাগেন নাই। জমিদাররাই গোঁয়ারের মত গোঁৎ গোঁৎ করিয়া নিজেদের সর্বনাশ করিয়াছিলেন। জমিদারি প্রথার সহিত সেখানে জোট পাঁকাইয়াছিলেন বড় বড় ধর্মব্যবসায়ীরাও। ফলে ফরাশি বিপ্লব অনেক বেশি সংঘাতে জড়াইয়া পড়িয়াছিল।

ফরাশি বিপ্লবে সাম্যের আওয়াজটা কেন বেশি সামনে আগাইয়া আসিল তাহার উত্তর পাইতে হইলে সে দেশের শহরের কারিকর আর শ্রমিকদের কথা যেমন হিশাব করিতে হইবে তেমনি আমলে আনিতে হইবে কৃষকের সমস্যা বা জমির মালিকানার দাবিটিও। ফরাশিদেশের ইতিহাস লেখকরা তাহাদের বিপ্লবের চারি ক্ষেত্র নির্দেশ করিয়া থাকেন। জমিদারদের ক্ষেত্র, বুর্জোয়াদের ক্ষেত্র, সর্বজনের ক্ষেত্র এবং চাষীর ক্ষেত্র।

ফরাশিদেশে রাজার শাসন শেষ হইল। জমিদারদের ক্ষমতা শেষ হইল। কিন্তু সামাজিক সমতা সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হইল না। নতুন সম্পর্ক কায়েম করিতে হইলে বিপ্লবের বিস্তার দরকার ছিল। দরকার ছিল আরো সময়ের। ফরাশিরা সেই কালক্ষেপণে কসুর করেন নাই।

ইংলন্ডে স্বাধীনতার ধ্বনি পরিণত হইয়াছিল সাম্যের প্রতিপক্ষে। মার্কিনদেশেও সাম্যের প্রশ্ন কিছুদিন পর চাপা পড়িয়া গেল। কিন্তু ফরাশিদেশে এই প্রশ্নের মিমাংসা করিতে প্রায় শত বছর পার হইয়া গিয়াছিল। এসায়ি উনিশ শতকের শেষদিকে পারি নগরী শ্রমিকের রক্তে ভাসিয়া গেল। বুঝা গেল ফরাশিদেশেও বুর্জোয়া শ্রেণিরই জয় হইয়াছে। তাহা হইলে সকলই বৃথা হইয়া গেল বলিবেন কি?

না, বলিব না। ফরাশি বিপ্লব হইতে যে দাবি উঠিয়াছিল তাহার গোড়ার কথা সাম্য। সাম্য না হইলে মৈত্রী কথা ফাঁকাবুলির অধিক হয় না। ফরাশিজাতির জনগণ ‘মৈত্রী’ কথাটাকে একটা নতুন ভিত্তি যোগাইলেন। মৈত্রীর প্লাবন বলিয়া ফরাশি বিপ্লব পরিচিত হইয়াছিল। মৈত্রীর অপর নামই তাই জাতি হইল। ফরাশিরা বলিলেন জাতিকে টুকরা টুকরা ভাগ করা যাইবে না। জাতি একক ও অবিভাজ্য থাকিবে। সর্বৈব ক্ষমতা থাকিবে জাতির হাতে। জাতির অপর নাম দাঁড়াইল ‘সর্বজন’। প্রতিষ্ঠিত হইল সর্বজনই সর্বেসর্বা বা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার প্রয়োগ করিবেন।

এই ‘মৈত্রী’ ধারণাটি  ফরাশি বিপ্লবের মর্যাদা রক্ষা করিয়াছিল। কিন্তু মৈত্রী বা জাতীয় ঐক্য গঠিত হইলে তো সাম্য প্রতিষ্ঠার দরকার আছে। ফরাশি বিপ্লবের প্রথম পর্বে — মানে ১৭৮৯ সালের গঠন পরিষদে যে অধিকারনামার ঘোষণা গ্রহণ করা হয় তাহাতে — সাম্য বলিতে বুঝানো হইয়াছিল মাত্র অধিকারের সাম্য। ১৭৮৯ সালের ইশতেহারে ফরাশিদেশের স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা সাম্য কথাটা ব্যবহার করিয়াছিলেন স্বাধীনতা শব্দের মানিকজোড় আকারে।

বুর্জোয়া স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল পুরানা জমিদার আর ধর্মব্যবসায়ীদের বিশেষ অধিকার বাতিল করিতে হইবে। কায়েম করিতে হইবে সকলের সমান অধিকার। এই দাবির গূঢ় তাৎপর্য পুরানা জমিদারতন্ত্রের পতন তাড়াতাড়ি ঘটানো। সর্বসাধারণ কিন্তু সমানাধিকার বলিতে অধিক বুঝিতেন। অধিকার প্রয়োগের উপায়ের বা সম্পত্তির সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হইলে সাম্য কখনোই প্রতিষ্ঠা পাইতে পারে না। স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা ইহা জানিতেন। তাই তাহারা গোড়াতেই লিখিয়া রাখিলেন স্বাধীনতা মানে ‘সম্পত্তি অর্জন ও রক্ষার স্বাধীনতা’।

এই বুর্জোয়া স্বাধীনতাই শেষ পর্যন্ত ফরাশিদেশে কায়েম হইল। কিন্তু স্বাধীনতার দুই ধারণার সংঘাত সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িল। ১৯১৭ সালে রুশিয়ার বিপ্লব আর ১৯৪৯ সালে চিনা বিপ্লবের মধ্যে এই সংঘাত আরো বড় আকার লাভ করিল।

ফরাশি বিপ্লবে অনেক ধারা উপধারার সংঘাত স্ফূর্তিলাভ করিয়াছিল। অনেক ধারা মরুপথে হারাইয়া গিয়াছে বটে কিন্তু কোন কোন ধারা এখনো তরতাজা। ১৭৮৯ সালে প্রজা অধিকারের এশতেহারে ব্যক্তি মনুষ্যের বিবেকের স্বাধীনতা অর্থাৎ ধর্মবিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। ভিন্নমতাবলম্বী খ্রিস্টান বা প্রতিবাদী নাসারা ধর্মমণ্ডলি এবং এয়াহুদি ধর্মাবলম্বীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ারও অঙ্গীকার করা হয়। আরো বড় কথা ১৭৯২ এসায়ি সালের ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে গৃহীত সংবিধান বা জাতীয় গঠনতন্ত্রে বলা হয় যে কোন মানুষের অধিকার বা হক আছে প্রচলিত কোন ধর্মের পায়রবি না করিয়া স্বাধীনভাবে বসবাস করিবার।

এই ধরনের স্বাধীনতার ঘোষণা আজিকার মাপেও চারিটিখানি কথা মাত্র নহে। বলিতে পারেন শুকনা ঘোষণায় কি চিড়া ভিজিবে? কথার শক্তি আছে কিন্তু। না, এই স্বাধীনতা তো মাত্র ধলা মানুষের স্বাধীনতা নহে। ১৭৯৪ এসায়ির ৪ ফেব্র“য়ারি তারিখে পাশ করা এক আইনের বলে ফরাশিদেশের সকল উপনিবেশে বা পরাধীন দেশে ‘নিগ্রোজাতির’ অন্তর্গত সকল দাসকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। সেই আইন অবশ্য পরে নাপোলেয়ঁ বাতিল করেন।

এই কারণেই বলিতেছিলাম ফরাশি বিপ্লবের তিন আওয়াজের মধ্যে সাম্যের স্থান সর্বাগ্রে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। ফরাশিরা যে পদবিন্যাসে বলিয়াছিলেন স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী আমরা তাহার সামান্য পুনর্বিন্যাস করিতেই পারি। বলিতে পারি সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। বলিতে পারি সাম্য, মৈত্রী আনিয়াছি আমরা, বিশ্বে করিয়াছি জ্ঞাতি। ইহ্ইা আমাদের জাতি।

১৯৭১ সালের মহাসিন্ধু আজও কল্লোল করিতেছে। যাহার ইচ্ছা কান পাতিতে পারেন। দেবতারা শুনিবেন ‘সাম্য’। মনুষ্যের কানে বাজিবে ‘মৈত্রী’। আর অসুরেরা কেবল একটা বেসুরই পাকড়াইবেন — স্বাধীনতা।

আহা, আমার স্বাধীনতা রে! তোমাকে একেলা আগলাইয়া আমি কি করিব? আমার মৈত্রী চাই। চাই নতুন দাসপ্রথার অবসান। চাই সাম্য, সম্পত্তির সমানাধিকার। আমরা তিনটাই চাই। কারণ তিনের যে কোনটাই পড়িয়া গেলে সকলই যায়।

২১ মার্চ ২০১৩

২২ মার্চ ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১