আহমদ ছফার আশ্চর্য স্বপ্ন

            … terrible nouveauté!
Tout pour l’oeil, rien pour les oreilles!

            … কি ভয়ানক আবিষ্কার!
সকলই চোখে পড়িতেছে, কানে কিছুই পশিতেছে না!
—শার্ল বোদলেয়র

পরলোকগত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ জীবনের শেষদিকে একাধিক স্মৃতিকথায় মহাত্মা আহমদ ছফা প্রসঙ্গের অবতারণা করিয়াছিলেন। একটি স্মৃতি আলেখ্যে তিনি জানাইয়াছিলেন তাঁহার প্রথম জননন্দিত উপন্যাস—‘নন্দিত নরকে’—প্রকাশের সার্বিক ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন আহমদ ছফা। হুমায়ূন আহমেদ স্মরণ করিতেছিলেন, ‘এক রাতে লেখা ষাট পৃষ্ঠার এই লেখাটির কাছে আমি নানানভাবে ঋণী। এই লেখাই আমাকে ঔপন্যাসিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছিল। এই একটি লেখা প্রকাশিত হবার পর অন্য লেখা প্রকাশে আমার কোনো রকম বেগ পেতে হয়নি।’ হুমায়ূন আহমেদ আরো জানাইয়াছিলেন, ‘কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, নন্দিত নরকে আমার প্রথম উপন্যাস নয়। আমার প্রথম লেখা “শঙ্খনীল কারাগার”; প্রকাশিত হয় নন্দিত নরকের পরে।’ (আহমেদ ২০১২: ৮ এবং আহমেদ ২০১৬: [সাত])

হুমায়ূন আহমেদ লিখিয়াছেন, ‘“শঙ্খনীল কারাগার” উপন্যাসটির সঙ্গে আনন্দ-বেদনার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমার বাবা আমার কোনো লেখাই পড়ে যেতে পারেন নি—এই পাণ্ডুলিপিটি পড়েছিলেন। বাবা যাতে উপন্যাসটি পড়েন সেই আশায় আমি ভয়ে ভয়ে পাণ্ডুলিপিটি তার অফিসের অসংখ্য ফাইলের এক ফাঁকে লুকিয়ে রেখে এসেছিলাম। উপন্যাস পড়ে তিনি কী বলেছিলেন, তা এই রচনায় লিখতে চাচ্ছি না। পৃথিবীর সব বাবাই তাদের পুত্রকন্যাদের প্রতিভায় মুগ্ধ থাকেন। সন্তানের অতি অক্ষম রচনাকেও তারা ভাবেন চিরকালের চিরদিনের লেখা।’ (আহমেদ ২০১২: ৮; আহমেদ ২০১৬: [সাত])

‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি পড়িয়া লেখকের বাবা সত্য সত্য কি বলিয়াছিলেন তাহা তিনি অবশ্য আরেকটি স্মৃতিকথায় লিখিয়াছিলেন: ‘একসময় বাবা এসে গম্ভীর ভঙ্গিতে দুপুরের খাবার শেষ করলেন। আমার লেখা বিষয়ে কোন কথা বললেন না। সন্ধ্যাবেলা মাগরেবের নামাজ শেষ করে মা’কে ডেকে বললেন, আল্লাহপাক তোমার বড় ছেলেকে লেখক বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শুকুর আলহামদুল্লিাহ।’ (আহমেদ ২০০৯: ২৫)

২০১২ সনের পূর্বোক্ত স্মৃতিকথায় হুমায়ূন আহমেদ অধিক কিছু স্মরণ করিয়াছেন: ‘“শঙ্খনীল কারাগার” উৎসর্গ করি আহমদ ছফা এবং আনিস সাবেতকে। আহমদ ছফা আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অসাধারণ একজন মানুষ। আনিস সাবেত আরেকজন অদ্ভুত মানুষ!’ (আহমেদ ২০১২: ৮; আহমেদ ২০১৬: [সাত])

আহমদ ছফার কথা লইয়াই এই নিবন্ধ। তাই তাঁহার কথায় ফিরিবার আগে আনিস সাবেত নামটি লইয়া দুইটি কথা বলিয়া রাখি। বেশিদিন আগের কথা নহে। তবু বলিব এ যুগে যে সকল পাঠক-পাঠিকা আনিস সাবেতের নাম শুনিয়াছেন তাহাদের সংখ্যা আঙ্গুলেই গোণা যাইবে। জীবন এ রকমই। আনিস সাবেত চরিত্রটিকে হুমায়ূন আহমেদ বড় ভালবাসিতেন। তাঁহার অনেক কথাতে ইহার প্রমাণ মেলে: ‘রোগা লম্বা বৈশিষ্ট্যহীন এই মানুষটি হৃদয়ে ভালোবাসার সমুদ্র ধারণ করেছিলেন। মানুষ ফেরেশতা নয়। তার মধ্যে অন্ধকার কিছু দিক থেকেই যায়। আনিস সাবেতের ভিতরে অন্ধকার বলে কিছু ছিল না।’ হুমায়ূন আহমেদ স্মরণ করিয়াছিলেন, ‘সচেতন পাঠক হয়তো লক্ষ্য করেছেন, আমার অনেক উপন্যাস ও নাটকে আনিস নামটি ঘুরেফিরে এসেছে। যখনই কোন অসাধারণ চরিত্র আঁকতে চেয়েছি, আমি নাম দিয়েছি আনিস।’ (আহমেদ ২০১২: ৮, আহমেদ ২০১৬: [সাত]-[আট])

আনিস সাবেত বড় অল্প—অনুমান ৪১ বছর—বয়সে ইংরেজি ১৯৮৮ সনের নবেম্বর মাস নাগাদ কানাডার কোন শহরে এন্তেকাল করেন। তাঁহার অন্তর্ধান উপলক্ষে শোকাতুর আহমদ ছফা কিছুদিন পর লিখিয়াছিলেন, ‘আমার চেয়ে বয়সে কম অনেক তরুণ আছেন, যাঁদের নানা বিষয়ে পারঙ্গমতার জন্য পছন্দ করে থাকি। কিন্তু মানুষ হিসাবে যথার্থ বড় অধিক তরুণের সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য আমার অদ্যাবধি ঘটেনি। ক্ষমা, মেধা ইত্যাদিতে বড় বেশ কয়েকজন তরুণের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কিন্তু যথার্থ অর্থে চরিত্রবান, দয়া, মমতা, দৃঢ়তা এবং নানাবিধ মানবিক গুণসম্পন্ন তরুণ একটিই দেখেছি—তার নাম আনিস সাবেত।’ (ছফা ২০০৮: ২৪৩)

এই আনিস সাবেত প্রসঙ্গে বলার মত একটা গল্প আমারও আছে। সে গল্পও আহমদ ছফার সহিত জড়িত। সে কথা পরে হইবে, এক্ষণে অন্য একটা কথা বলি। আহমদ ছফার লেখা হইতেই জানিতে পারিলাম, আনিস সাবেতের গ্রামের বাড়ি ছিল কুমিল্লা জেলায়। প্রসঙ্গক্রমে ছফা জানাইয়াছিলেন, ‘ডেমোক্রেটিক লীগের নেতা অলি আহাদ ছিলেন আনিসের আপন মামা।’ আহমদ ছফা আরো প্রকাশ করিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের সহিত আনিস সাবেতের পরিচয়টাও সম্ভবত এই কুমিল্লাতেই ঘটিয়াছিল।

ঔপন্যাসিক পরিচয়ের আনন্দ গোটা বিশ কলা পুরা হইবার পর একপ্রস্ত স্মৃতিকথায় হুমায়ূন আহমেদ আরো একবার আহমদ ছফা আর আনিস সাবেতের কথা পাড়িয়াছিলেন। লিখিয়াছিলেন, ‘তখন দেশ সদ্য স্বাধীন হইয়াছে। আমি, আহমদ ছফা এবং আনিস ভাই তিন জন সারাক্ষণ একসঙ্গে থাকি। আমাদের চোখে কত না স্বপ্ন! সাহিত্যের সাধনায় জীবন উৎসর্গ করব। চিরকুমার থাকব, জীবনকে দেখার ও জানার জন্যে যা করণীয় সবই করব।’ (আহমেদ ২০১২: ৮)

আহা, স্বপ্ন শব্দটার কতই না অর্থ মনুষ্যের ভাষায়! একটা অর্থ এই রকম—উৎসর্গ করার, চিরকুমার থাকার কিংবা যাহা যাহা করণীয় তাহার সবটাই করার সংকল্প। আরও একটা অর্থ কিন্তু আছে স্বপ্নের। সে অর্থ নিদ্রার চাহিতেও ঠুন্কা—অল্প বাতাসেই তাহার ডগা ভাঙ্গিয়া যায়। হুমায়ূন আহমেদের সততা অনিন্দ্যসুন্দর। তিনি অকপটে স্বীকার করিয়াছিলেন, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ বইটির চাপে তিনি আর স্বপ্নের পথে অধিকদূর যাইতে পারিলেন না। জানাইলেন, এই লেখাটি পড়িয়া একটি ‘অষ্টম শ্রেণীর বালিকা’ তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। প্রথম আঘাতেই তাঁহার স্বপ্ন বা প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গিয়া গেল। শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর অতি বিখ্যাত একটি কথার পুনরাবৃত্তি করিয়া তিনিও নিবেদন করিলেন, ‘তারা দু’জন তাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলেন। আমি পরাজিত হলাম জীবনের মোহের কাছে।’ (আহমেদ  ২০১২: ৮ এবং ২০১৬: [আট])

আহমদ ছফা ২০০১ সালের মধ্যভাগ নাগাদ এন্তেকাল করিলেন। তাঁহার অন্তর্ধান উপলক্ষে হুমায়ূন আহমেদ আরো একপ্রস্ত স্মৃতিকথা লিখিয়াছিলেন। তাহাতে বেশ কিছু নতুন কথা পাইলাম। আবার ২০০৮ নাগাদ বলপয়েন্ট নামে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের নতুন কিছু স্মৃতিকথা বাহির হইয়াছিল। তাহাতেও আহমদ ছফার কথা সবিস্তার লেখা। হুমায়ূন আহমেদ বাহ্যত অত্যন্ত নিরীহ গোছের মানুষ ছিলেন। তাঁহার বিনয় অসাধারণ। তিনি কদাচ অতিশয় কথা বলিতেন না। বলপয়েন্টে তিনি লিখিতেছেন, ‘ছফা ভাইকে লইয়া আমার অসংখ্য স্মৃতি আছে। তাঁর ওপর দুশ’ পাতার একটা বই অবশ্যই লিখতে পারি।’ (আহমদ ২০০৯: ৩২)

এক্ষণে অন্তত একটি স্মৃতির আলোচনা করা যাইতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ লিখিয়াছেন, ‘ছফা ভাই তখন দারুণ অর্থকষ্টে। থাকার জায়গা নেই। ক্ষীণ সম্ভাবনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট পাবেন। পাচ্ছেন না। একদিন আমি ছফা ভাইকে ভয়ে ভয়ে বললাম, হলে সিট না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের বাসায় কি থাকবেন?’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০)

ঔপন্যাসিক বয়ান করিতেছেন, ‘আমার মা তখন বাবর রোডে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রী  হিসাবে একটা বাড়ির দোতলাটা বরাদ্দ পেয়েছেন। সেখানে না আছে পানির ব্যবস্থা, না আছে কিছু। ছফা ভাই আমাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হলেন। আমরা তাঁকে সবচেয়ে বড় কামরাটা ছেড়ে দিলাম। মা তাঁর নিজের সন্তানদের যে মমতায় দেখেন, একই মমতা ছফা ভাইয়ের দিকেও প্রসারিত করলেন।’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০)

মোহাম্মদপুরের বাসায় আহমদ ছফার স্বল্প সময়ের জীবনটা মন্দ কাটে নাই! হুমায়ূন আহমেদের সত্য কাহিনী মোতাবেক, ‘ছফা ভাই বাইরে-বাইরেই থাকতেন, রাতে এসে শুধু ঘুমাতেন। বেশির ভাগ সময় বাইরে থেকে খেয়ে আসতেন।’ আহমেদের ধারণাটা হয়ত পুরাপুরি ভুলও নয়: ‘অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া পরিবারটির উপর বাড়তি চাপ হয়তো তিনি দিতে চান নি।’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০)

আহমদ ছফার সহিত বসবাসের একটা আলাদা আনন্দ আছে না! আর সে আনন্দ তো নিতান্ত নিদ্রাপর্বে সীমিত থাকিতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ যোগ করিয়াছেন, ‘প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছফা ভাই কিছু সময় মা’র সঙ্গে কাটাতেন। গত রাত্রে যে সকল স্বপ্ন দেখেছেন তা মাকে বলতেন। মার দায়িত্ব স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা।’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০) আহমদ ছফার এই স্বপ্নের কাহিনী হুমায়ূন আহমেদের মা বেগম আয়েশা ফয়েজও তাঁহার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি কিন্তু শুদ্ধ বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে আহমদ ছফা ঐ সময় তাঁহার বাসাতেই বাস করিতেন।

বেগম আয়েশা ফয়েজ লিখিয়াছেন, হুমায়ূন আহমেদ—অর্থাৎ তাঁহার বড় ছেলে যাঁহার ডাকনাম কাজল—তখন ‘সত্যিকার লেখালেখি’ শুরু করিয়াছেন মাত্র। আহমদ ছফা সেই লেখা পড়িয়া মুগ্ধ। এই তরুণ লেখককে লইয়া তিনি প্রকাশক পাড়ায় ঘোরাঘুরি করিতেছেন। আয়েশা ফয়েজ লিখিয়াছেন, ‘সেই থেকে আমাদের সঙ্গে পরিচয়। প্রায়ই বাসায় আসে। কীভাবে তার ধারণা হয়েছে আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারি।’ (ফয়েজ ২০০৮: ৯৪)

‘কি স্বপ্ন বাবা?’

‘ছোট ছোট আধ আঙ্গুলের মানুষ, ঘরের উঠানে তেঁতুলের বিচি লাগাচ্ছে। এই স্বপ্নের মানে কি কাকীমা?’

‘দুরূহ স্বপ্ন! কিছু একটা ব্যাখ্যা না দেওয়া পর্যন্ত ছফা শান্ত হবে না, তাই আমার কিছু একটা ব্যাখ্যা দিতে হয়।’ (ফয়েজ ২০০৮: ৯৪)

হুমায়ূন আহমেদের বলপয়েন্ট আর আয়েশা ফয়েজের জীবন যে রকম একই বছরে—মানে ইংরেজি ২০০৮ সালে—প্রকাশিত হইয়াছিল। ভিতরের প্রমাণ—অর্থাৎ বেগম ফয়েজের লেখা ‘মুখবন্ধ’—অনুসারে অবশ্য আমরা জানিয়াছি বেগম ফয়েজের বইটি আদিতে লেখা হইয়াছিল ঢের আগে—সেই ১৯৯১ সালে। তখন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁহার ছেলের কাছে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। তাঁহার জবানবন্দী অবিশ্বাস করিবার তো কোন কারণ নাই। বইটি তিনি মার্কিন মুলুকে বসিয়া লিখিয়াছিলেন ‘নেহায়েতই খেয়ালের বশে’। বলা বাহুল্য, আহমদ ছফা তখনও বাঁচিয়া আছেন। আয়েশা ফয়েজ লিখিয়াছেন, ‘ভাল মন্দ কিছু স্বপ্ন দেখলেই সে চলে আসে বাসায়, আমাকে বলে, কাকীমা, আজ একটা স্বপ্ন দেখেছি।’

আহমদ ছফার এই খোয়াবনামাটা মুহম্মদ জাফর ইকবালও কিছুটা বিবৃত করিয়াছেন। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই নিজেও স্বনামধন্য অন্য পাঁচ কারণে। স্বপ্নের পূর্ব কাহিনীটাও বয়ান করিয়াছেন তিনি। লিখিয়াছেন, ‘বেঁচে থাকার দুঃসহ প্রচেষ্টার মধ্য থেকে ছফা ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা ঘনিষ্টতা হল। তিনি তখন প্রায় নিয়মিতভাবে আমাদের খোঁজ নিতে আসতেন। আমাদের মা ভাইবোন সকলের সঙ্গে তাঁর খাতির। আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর খাতির সবচেয়ে বেশি। কারণ কিভাবে জানি তাঁর ধারণা হয়েছে যে আমার মা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারেন।’ (ইকবাল ২০০১: ৭ এবং ২০০৩: ১২৩)

জাফর ইকবাল লিখিয়াছেন, ‘তিনি তখন প্রায় নিয়মিতভাবে আমাদের খোঁজ নিতে আসতেন।’ বেগম ফয়েজও মনে করিতেছেন, ‘ভাল মন্দ কিছু স্বপ্ন দেখলেই সে চলে আসে বাসায়।’ আহমদ ছফার জীবনচরিত লেখকদের জন্য একখানা সমস্যা এখানে তৈয়ার হইল। কেননা হুমায়ূন আহমেদের বয়ানের সহিত এখানে দেখিতেছি একপ্রস্ত গোলযোগ।

আহমদ ছফা সম্বন্ধে অতি উঁচু ধারণা পোষণ করিতেন হুমায়ূন আহমেদ। তাই তিনি ধরিয়া লইয়াছেন এ সকল স্বপ্ন আহমদ ছফার অতিকথা মাত্র। আহমেদ মন্তব্য করিতেছেন, ‘আমার ধারণা, ছফা ভাই স্বপ্নগুলি বলতেন বানিয়ে বানিয়ে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে মাকে খুশি করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। আমার এ রকম ধারণা হওয়ার কারণ হলো, ছফা ভাইয়ের স্বপ্নগুলিতে ডিটেলের কাজ খুব বেশি থাকত। স্বপ্নে এত ডিটেল থাকে না।’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০)

সান্ত্বনাস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ একটা ছফাবিয়া স্বপ্নের বয়ান স্মরণ করিয়াছেন। যেমন: ‘একটা স্বপ্ন বললেই পাঠক বুঝতে পারবেন—কাকিমা, কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম দুটা কাক। একটা বড় একটা ছোট। ছোট কাকটার একটা নখ নেই। তার স্বভাব চড়ুই পাখির মতো। তিড়িং-বিড়িং করে সে শুধু লাফায়। বড়টা শান্ত স্বভাবের। সে একটু পর পর হাই তোলার মতো করে। তাদেরকে ধান দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ ধান খাচ্ছে না। ধানগুলি ঠোঁটে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিচ্ছে। এখন, কাকিমা, বলুন, স্বপ্নটার অর্থ কী? আমি বিরাট চিন্তায় আছি।’ (আহমেদ ২০০৯: ৩০-৩১)

আহমদ ছফার স্বপ্নগুলি সত্য ছিল না, তিনি স্বপ্নগুলি বলিতেন বানাইয়া বানাইয়া, স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিতে চাহিয়া চাচিমাকে খুশি করাই ছিল তাঁহার উদ্দেশ্য—হুমায়ূন আহমেদের এই ধারণাটা মাত্র তাঁহার নিজের নহে। মুহম্মদ জাফর ইকবালও এই এজমালি ব্যাখ্যার শরিক। ইকবাল লিখিতেছেন, ‘প্রথম প্রথম সহজ সহজ স্বপ্ন দেখে চলে আসতেন। ধীরে ধীরে তাঁর স্বপ্ন জটিল হতে শুরু করল।’ (ইকবাল ২০০১: ৭ এবং ২০০৩: ১২৩)

আয়েশা ফয়েজ লিখিয়াছেন, ‘ছোট ছোট আধ আঙ্গুলের মানুষ, ঘরের উঠানে তেঁতুলের বিচি লাগাচ্ছে।’ আমরা এই গল্পটা একটু আগেই উদ্ধার করিয়াছিলাম। আর জাফর ইকবাল জানাইতেছেন, ‘গ্রামের বাসিন্দারা ছোট ছোট মানুষ। তাদের গায়ের রঙ কাল। সেই গ্রামে বড় বড় তেঁতুল গাছ। গ্রামের মানুষের সবার হাতে তেঁতুল বিচি। তারা তেঁতুল বিচি নিয়ে বাজারে বিক্রি করে।’ ইতি আদি। ইতি আদি। ইকবাল লিখিয়াছেন, ‘ছফা ভাইয়ের স্বপ্নের বর্ণনা শুনে শুনে আমরা হেসে গড়াগড়ি যেতাম এবং তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমার মা হিমশিম খেয়ে যেতেন।’ (ইকবাল ২০০১: ৭ এবং ২০০৩: ১২৩)

আহমদ ছফার স্বপ্নের বয়ান হুমায়ূন আহমেদ আর তাঁর পরিবারের অন্য দুই লেখকের মুখে শুনিতে শুনিতে আমার জার্মান মহাত্মা ফ্রয়েডের নাম মনে পড়িল না। কি কারণে জানি না মনে পড়িল ফরাশি কবি শার্ল বোদলেয়রের কথা। হুমায়ূন আহমেদ বলিয়াছেন ‘স্বপ্নে ডিটেল থাকে না।’ মহাত্মা ফ্রয়েড এই মন্তব্যের পরিপোষন করিবেন বলিয়া মনে হয় না। স্বপ্ন মানে কিন্তু দ্রষ্টা যাহা দেখিয়াছেন তাহা নহে! স্বপ্ন মানে দ্রষ্টা যাহা বয়ান করিতেছেন তাহা বৈ নহে। তাই বলিতে শরম নাই, স্বপ্নদ্রষ্টা যতখানি জাগিয়াও স্মরণ করিতে পারিতেছেন তাহা হইতেই আমরা শ্রোতা বা পাঠিকার দল স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিতেছি। ঘটনাটি কিছু পরিমাণে স্মৃতিকথার সহিত তুলনার যোগ্য।

যাহাকে সচরাচর ‘শৈশবস্মৃতি’ বলা হইয়া থাকে তাহা শৈশবে প্রকৃত প্রস্তাবে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল হুবহু তাহার প্রতিচ্ছবি হয় না। হয় যখন স্মরণ করিতে বসিয়াছি তখন মাত্র যাহা যাহা মনে পড়িতেছে তাহারই প্রতিবিম্ব। মহাত্মা ফ্রয়েড ইহার নাম রাখিয়াছিলেন ‘পর্দার উপরের স্মৃতি’ কিংবা ভাসাভাসা স্মৃতি। আহমদ ছফার অবিশ্বাস্য খোয়াবগুলি খানিক এই ‘পর্দাস্মৃতি’ জাতীয় জিনিশটারই নিকটতম তুলনা বলিয়া মনে হইতেছে।

স্বপ্নে আমরা যাহাই দেখি না কেন তাহাতে কদাচ ভবিষ্যত থাকে না, থাকে অতীত। তাই স্বপ্ন মানেই পুনরাবৃত্তির অর্থাৎ বর্তমান সত্যের চাপ। তাহাতেই পড়ে ভবিষ্যতের ছায়া। একই স্মৃতিকথায় মাত্র একপাতা আগে  হুমায়ূন আহমেদ যাহা লিখিয়াছেন তাহার সহিত অভিযুক্ত সডিটেল স্বপ্নের একটা সংযোগ আছে বলিয়াই আমার সংশয় হইতেছে। হুমায়ূন আহমেদ হইতে উদ্ধার করিতেছি:

আমি আমার যৌবনে হন্টন পীরের মতো একজনকে পেয়েছিলাম। আমরা দল বেঁধে তাঁর পেছনে হাঁটতাম। তিনি যদি কিছু বলতেন মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। গভীর রাতে নীলক্ষেত এলাকায় তিনি হাঁটতে হাঁটতে আবেগে অধীর হয়ে দুই হাত তুলে চিৎকার করতেন “আমার বাংলাদেশ। আমার বাংলাদেশ।” আমরা  গভীর মুগ্ধতায় তাঁর আবেগ এবং উচ্ছ্বাস দেখতাম। তাঁর নাম আহমদ ছফা। আমাদের সবার ছফা ভাই। (আহমেদ ২০০৯: ২৯)

মোহাম্মদপুরের যে বাসায় হুমায়ূন আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট না পাওয়া পর্যন্ত আহমদ ছফাকে থাকিবার উদার আমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন সেই বাসারও তো একটা কাহিনী আছে। হুমায়ূন আহমেদ তাহাও যদি দুদণ্ড স্মরণ করিতেন নগদ জানিতেন স্বপ্নে ডিটেলও থাকে। সত্য বলিতে, ডিটেলের অধিক থাকে। বাকি থাকে। ডিটেল এক অর্থে স্বপ্নেরই অপর নাম। এই ডিটেলের থাকে দুই প্রান্ত—একটাকে যদি বলি রূপক, অন্যটার নাম লক্ষণা। ডিটেল ভুলিয়া থাকেন কেবল তাঁহারাই যাঁহাদিগকে স্বয়ং আল্লাহপাক লেখক বানাইয়া এই দুনিয়ায় পাঠাইয়া দেন।

আমি এই জায়গায় মুহম্মদ জাফর ইকবাল হইতে কিঞ্চিৎ সাহায্য-সহায়তা গ্রহণ করিব। আশা করি ইহাতে আহমদ ছফার খোয়াবনামা কিছুটা প্রকটিত হইবে। তিনি স্মরণ করিতেছেন:

তখন সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধের সময় আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। পুরা পরিবারের খুব দুঃসময়। শহিদ পরিবার হিসেবে সরকার থেকে আমাদের একটা বাসা দিয়েছিল। একদিন [জাতীয়] রক্ষীবাহিনী এসে আমাদের বাড়ি থেকে উৎখাত করে দিল। দিয়ে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই পথে নামিয়ে দিল। আমরা তখন জগৎ সংসারের জটিলতায় একেবারে অনভিজ্ঞ। সারা বাংলাদেশে আমাদের পক্ষে কথা বলবার মতন কেউ নাই। তখন আহমদ ছফা তাঁর শুকনা পাতলা দেহ (কিন্তু বিশাল একটা হৃদয় আর সিংহের হৃদয়) দিয়ে আমাদের পাশে এলেন। সেই ভয়ংকর দুঃসময়ে আমাদের পাশে কেহ একজন আছেন সেই ভরসাটুকুন যে কত বড় সেটা শুধু আমরাই জানি। বেঁচে থাকবার দুঃসহ প্রচেষ্টার মধ্যখানে থেকে ছফা ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা ঘনিষ্ঠতা হলো। তিনি তখন প্রায় নিয়মিতভাবে আমাদের খোঁজ নিতে আসতেন। (ইকবাল ২০০১: ৭ এবং ২০০৩: ১২২-১২৩)

এই ঘটনা হইতে জাফর ইকবাল কিন্তু কোন বিশেষ বা ডিটেল স্মরণ করিলেন না। শুদ্ধ বিবরণটা পেশ করিয়াই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করিলেন তিনি। একই বৎসরে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় হুমায়ূন আহমেদ অবশ্য কিছুটা ডিটেলেও গিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন এক মধ্যরাত্রে রক্ষীবাহিনী তাহাদিগকে বাড়ি হইতে আক্ষরিক অর্থেই বাহির করিয়া দিয়াছিল। বাসার লোটা-কম্বল আর হাড়িপাতিল লইয়া হুমায়ূন আহমেদ আর তাঁহার ভাইবোন—মা আর এক টুকরা ‘আট বছর বয়েসী’ কাজের ছেলে—লইয়া রাস্তায় বসিয়া রহিলেন।

হুমায়ূন আহমেদ লিখিতেছেন, ‘তিন বোনের মধ্যে দুই জন ফিচফিচ করে কাঁদছে। মা কাঁদছেন। আমাদের কাজের ছেলে জিতু মিয়া কাঁদছে চিৎকার করে। আমি অধিক শোকে পাথর। একসময় রাত্রি কাটবে, সকাল হবে। এদের নিয়ে কোথায় যাব? জলে ভেসে যাওয়া একটি শহীদ পরিবারকে কে আশ্রয় দান করবে?’ এমন সময় আবির্ভাব আহমদ ছফার। হুমায়ূন আহমেদের বাকি জবানিটাও কম শুনিবার মতন নয়:

আমরা সারারাত পথে বসে রইলাম। সকাল হলো। হঠাৎ দেখি রিকশা করে ছফা ভাই এসে উপস্থিত। তাঁর সঙ্গে একটি কেরোসিনের টিন। মুখ অত্যন্ত গম্ভীর। আমাকে বললেন, ‘হুমায়ূন রিকশায় উঠুন।’

আমি বললাম, ‘কোথায় যাব?’

ছফা ভাই বললেন, ‘গণভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে—তার প্রতিবাদে এই কাজটা করব। আত্মাহুতি দেব।’

আমি বললাম, ‘কী বলছেন, ছফা ভাই?’

ছফা বললেন, ‘কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদর নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালমতো চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমতো লাগে।’

ছফা ভাই কেরোসিন ঢেলে জীবন বিসর্জন দিতে যাচ্ছেন, এই খবর চারদিকে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কবি সিকান্দার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফা ভাইয়ের কাছে এলেন। ধমক দিয়ে বললেন, ‘আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি এই শহীদ পরিবারের জন্যে থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিনের টিন আমার বাসায় দিয়ে আসো।’ হুমায়ূন আহমেদ ডিটেলে গেলেন না। তবে যোগ করিতে ভুলিলেনও না: ‘আমি ভাইবোন-মাকে নিয়ে আগের বাড়িতেই ওঠার সুযোগ পেলাম।’ (আহমেদ ২০০৩: ৬১-৬২)

হুমায়ূন আহমেদের মা বেগম আয়েশা ফয়েজ তাঁহার স্মৃতিকথায় ঘটনার আরো বিস্তারিত বিবরণ দিয়াছেন। এই বিবরণটা বরং অনেক ডিটেলে পূর্ণ। আমি এখানে যতদূর পারি পুরা বিবরণটাই তুলিয়া ধরিব: ‘বাবর রোডের বাসায় ওঠার তিন দিন পর হঠাৎ একদিন রক্ষীবাহিনী এসে হাজির হলো। একজন সুবেদার মেজর এসে জিজ্ঞেস করল, এ বাড়ি আপনি কোথা থেকে পেলেন?’

উত্তরে বেগম আয়েশা ফয়েজ কি বলিয়াছিলেন তাহা তিনি এইভাবে জানাইয়াছেন: ‘আমি বললাম, সরকার আমাকে দিয়েছে। আমার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তাই।’ তারপর কি ঘটিল সে বিবরণটা আরেকটু পড়া যাইতে পারে।

সুবেদার মেজর কিছু না বলে চলে গেল। আমার মনের ভিতরে হঠাৎ করে একটা খটকা লেগে গেল, হঠাৎ করে রক্ষীবাহিনী আসছে কেন?

খানিকক্ষণ পর হঠাৎ করে আরেকজন সুবেদার মেজর এসে হাজির। সে একা নয়, তার সঙ্গে এক ট্রাকবোঝাই রক্ষীবাহিনী। সবার হাতে অস্ত্র। সুবেদার মেজরের নাম হাফিজ, ভিতরে ঢুকে বলল, ‘এ বাড়ি আমার। শেখ সাহেব আমাকে দিয়েছেন।’

আমি বললাম, ‘সে কী করে হয়? আমার কাছে বাসার অ্যালটমেন্ট রয়েছে—’

সে কোনো কথা না বলে টান দিয়ে ঘরের একটা পর্দা ছিঁড়ে ফেলল। সাথে আসা রক্ষীবাহিনীর দলকে বলল, ‘ছেলেমেয়েদের ঘাড় ধরে বের কর।’

আমি এতদিনে পোড় খাওয়া পাথর হয়ে গিয়েছি। রুখে দাঁড়িয়ে বলেছি, ‘দেখি তোমার কত বড় সাহস।’

সুবেদার মেজর একটু থমকে গিয়ে। কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দেখতে দেখতে আক্ষরিক অর্থে শত শত রক্ষীবাহিনী দিয়ে পুরো এলাকা বোঝাই হয়ে গেল। বাসা চারদিকে ঘেরাও হয়ে আছে, কাউকে ঢুকতে দেয় না, কাউকে বেরও হতে দেয় না। কাজল মুহসীন হলে ছিল, খোঁজ পেয়ে এসেছে, তাকেও ঢুকতে দিল না। সারা রাত এভাবে কেটেছে। (ফয়েজ ২০০৮: ৯২-৯৩)

তাহার পরের ডিটেল হুমায়ূন আহমেদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবাল কেহই আর বিশেষ লিখিলেন না। কিন্তু আয়েশা ফয়েজ আর একটু না লিখিয়া পারেন নাই।

ভোর হতেই আমি বের হলাম। পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলাম। তারা বলল, ‘আমরা গোলামির পোশাক পরে বসে আছি! রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা কি করব?’

বঙ্গভবন, গণভবন এমন কোনো জায়গা নেই যা আমি বাকি রাখলাম না সাহায্যের জন্যে কিন্তু লাভ হলো না। আমি তুচ্ছ মানুষ। আমার জন্যে কার মাথাব্যথা?

রাতে ফিরে এসেছি। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না, অনেক বলে ভিতরে ঢুকেছি। রাত আটটার সময় রক্ষীবাহিনীর দল হঠাৎ করে লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল। ইকবাল আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে, একজন বেয়োনেট উঁচিয়ে লাফিয়ে এল। রাইফেল তুলে ট্রিগারে হাত দিয়েছে, চিৎকার করে কিছু একটা বলছে, গুলি করে মেরে ফেলবে আমাদের?

আমি ছেলেমেয়েদের হাত ধরে বের হয়ে এলাম। (ফয়েজ ২০০৮: ৯৩)

বেগম আয়েশা ফয়েজের রচনাশক্তির ঝাঁজ বড়ই তীক্ষ্ণ। আগুনের হলকার মতন তার স্পর্শ এখনও ঠাহর করিতে পারি। গল্পের শেষ কিন্তু এখানেই নহে। তিনি আরো এক অধ্যায় লিখিয়াছেন। ঐ অধ্যায়ের নাম ‘আহমদ ছফা’। এদিকে ‘রক্ষীবাহিনী’ নামা বর্তমান অধ্যায়টির তামাম তিনি শোধ করিলেন তিনটি আশ্চর্য—কাটা কাটা—ডিটেলমুক্ত বাক্যে। একটা আমরা আগেই উদ্ধার করিয়াছি। বাকি দুইটা এখনই তুলিয়া দিতেছি। তিনি জানিলেন এ জগত স্বপ্ন নয়, সত্য নিঃসন্দেহে। বেগম আয়েশা ফয়েজ উবাচ:

পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাকে প্রথমবার গৃহহারা করেছিল।

বাংলাদেশ সরকারের রক্ষীবাহিনী আমাকে দ্বিতীয়বার গৃহহারা করল। (ফয়েজ ২০১১: ৯৩)

জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে ‘এই গোলমালের মাঝে’ সাহায্যের জন্য যাঁহারা ছুটিয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে—আয়েশা ফয়েজ স্মরণ করিতেছেন—ছিলেন বিশেষ একজন। তাঁহার নাম আহমদ ছফা। আহমদ ছফা প্রসঙ্গে বেগম আয়েশা ফয়েজের বয়ানটা খানিক উদ্ধার করিতেই হয়। তিনি লিখিতেছেন, ‘এই খেয়ালি মানুষটি রক্ষীবাহিনীর আচরণে একেবারে ক্ষেপে গেল। চেনাজানা সমস্ত মানুষকে সে টেনে নিয়ে এল বাবর রোডে।’

শুদ্ধ কি তাহাই? আহমদ ছফার কল্যাণে অচেনা অজানা সমস্ত মানুষও জানিয়া গেল বাবার রোডে কি ঘটিয়াছে। আয়েশা ফয়েজ লিখিতেছেন:

প্রাণ নিয়ে বাসা থেকে বের হবার পর রক্ষীবাহিনীর বীর জওয়ানেরা আমাদের সব জিনিসপত্র রাস্তায় টেনে ফেলে দিয়েছে। তার মাঝে চেয়ার-টেবিলও আছে—রাত্রিবেলা সেখানেই সবাই বসেছে, খোলা আকাশের নিচে এক রাউন্ড চাও খেয়ে ফেলল সবাই। সরকারি যে দলিলটির জন্য আমার এত বড় লজ্জা ছফা যাওয়ার সময় সেটি হাতে করে নিয়ে গেল। (ফয়েজ ২০১১: ৯৪; বানান খানিক সংশোধিত)

বেগম আয়েশা ফয়েজের স্মৃতিকথা অনুসারে আরো জানা গেল, ‘পরদিন গণকণ্ঠ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় শহীদ পরিবারের নির্যাতন বিষয়ক এই খবরটি ছাপা হলো। সাথে সরকারি অ্যালটমেন্টের কপিটি।’

আয়েশা ফয়েজ সাহসী মানুষ। সঙ্গে একটি মন্তব্য যোগ করিতে তিনি কসুর করিলেন না তিনি: ‘আওয়ামী লীগ সরকার তখন প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছে। তাদের কিংবা রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলে সে রকম সাহস কারো নেই। গণকণ্ঠ একমাত্র কাগজ যারা সাহস করে কিছু বলত।’ (ফয়েজ ২০১১: ৯৫)

আমরা আগেই দেখিয়াছি শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াইয়াছিল এই ঘটনার ফলাফল। আহমদ ছফা, সিকান্দার আবু জাফর আর দৈনিক গণকণ্ঠ—এই তিনে মিলিয়া অবশেষে কি উপায়ে একটি অন্যায়ের প্রতিকারে সফল হইলেন তাহার কথাই বলিতেছি। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, নিজস্ব ধারণার অন্তর্গত স্বপ্নের মতন সকল ডিটেল বর্জন করিয়া হুমায়ূন আহমেদ একটি মাত্র বাক্যে এই কাহিনীর সমাপ্তি টানিয়াছিলেন: ‘আমি ভাইবোন-মাকে নিয়ে আগের বাড়িতেই ওঠার সুযোগ পেলাম।’ (আহমেদ ২০০৩: ৬২)

তাঁহার মা সত্যই বলিয়াছেন, হুমায়ূন আহমেদ ঝামেলা মোটেও সহ্য করিতে পারিতেন না। কৃতজ্ঞতার কথা আলাদা। ডিটেলে ঢের ঝামেলা। মা জননী কিন্তু একটুখানি আলাদা, তিনি এদিকে ডিটেল যোগাইয়াছেন অল্পবিস্তর। যে রাত্রে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বীর জওয়ানেরা পরিবারটিকে পথে নামাইয়া দিয়াছিল সে রাতটা তাঁহারা কাটাইয়াছিলেন কোথায়? উত্তর: ঠিক পথে নহে, পাশের বাসায়। ঐ বাসার মহাশয় মালিকের নাম ডাক্তার মনোয়ার। নামটা—দুঃখের মধ্যে—এই পর্যন্তই। সদাশয় ভদ্রমহোদয়ের বৃত্তান্ত অধিক জানিতে দেন নাই আয়েশা ফয়েজ।

বেগম ফয়েজ বলিয়াছেন, ডাক্তার সাহেব মুহম্মদ জাফর ইকবালকে লইয়া টানাটানি করিয়া মধ্যরাত্রে উদ্বাস্তু পরিবারটির জিনিশপত্র নিজের বাসায় তুলিয়া ফেলিলেন। পরের দুয়েকদিনের মধ্যে বেগম ফয়েজ পাশেই একটি ছোট্ট বাসা ভাড়া করিয়া উঠিয়া গেলেন।

বাসাটা ফেরত পাওয়ারও একটা অংক ছিল। সেই অংকটাও কম আদরের জিনিশ নহে। এই বিষয়ে নীরব থাকাই হুমায়ূন আহমেদ সমীচীন মনে করিয়াছেন। কিন্তু বেগম ফয়েজ দমিবার পাত্রী নহেন। ইহার মধ্যে কি ভূমিকা আহমদ ছফা কিংবা তাঁহার দেওয়া সংবাদ শিরোনামের তাহা পাঠিকা যে যাহার মত ভাবিয়া লইবেন।

কয়েকদিন পার হইল। আরেকদিন সেই চরম বিপদের রাতে আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী ডাক্তার মনোয়ার হঠাৎ বেগম আয়েশা ফয়েজের বাসায় আসিয়া হাজির। পর্বটা বেগম ফয়েজ এভাবে স্মরণ করিতেছেন। ডাক্তার সাহেব একটা সুখবর লইয়া আসিয়াছেন। খবরটা ঘোড়ার মুখে শুনিয়া লওয়াই বেহতর। আয়েশা ফয়েজ লিখিতেছেন:

[ডাক্তার মনোয়ার] বললেন, ‘রক্ষীবাহিনীর প্রধান নূরুজ্জামান আপনার সাথে ফোনে কথা বলতে চান।’

‘কেন?’

‘মনে হয় বাসাটা নিয়ে গোলমাল মিটিয়ে ফেলতে চান।’

‘তার আর দরকার নেই। সরকারি বাসার শখ আমার মিটে গেছে। পাকিস্তান আর্মির হাতে যারা মরেনি, এখন রক্ষীবাহিনীর হাতে তারা শেষ হবে?’

ডাক্তার সাহেব আমাকে বোঝালেন, ‘আপনার এখন মাথা গরম করলে হবে না। আপনাকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আপনি যদি বাসাটা পেয়ে যান খুব ভাল হয়। ঢাকায় বাচ্চাদের নিয়ে থাকতে, ওদের পড়াশোনা শেষ করতে পারবেন। আমার বাবা যখন মারা যায় আমার বয়স তিন। কত ঝামেলা গেছে আমার উপর দিয়ে, সে তুলনায় আপনার তো কিছুই হয়নি। আমি এখন দাঁড়িয়ে গেছি। আপনিও একদিন দাঁড়িয়ে যাবেন।’

ডাক্তার সাহেবের কথা শুনে আমি শেষ পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীর প্রধান নূরুজ্জামানের সাথে কথা বলতে রাজি হলাম। ভদ্রলোক বেশ ভালো ভালো কথা বলে বাসার ওপর তলাটি আমাকে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমার ওপর যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে তার বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। (ফয়েজ ২০০৮: ৯৫)

এতদিন পরও আপনকার স্বভাবজাত রসবোধ হারাইয়া বসেন নাই বেগম আয়েশা ফয়েজ। তিনি মন্তব্য করিলেন, ‘বিচারটি খারাপ হলো না। নীচের তলাটি দেয়া হলো সুবেদার মেজর হাফিজকে।

বেগম ফয়েজের রসগোল্লা হইতে তাঁহার প্রথিতযশা পুত্র, ঐশ্বর্যবান ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমদও কেন বঞ্চিত হইবেন? পুত্রের স্বভাবটি তিনি লক্ষণার আকারে বেশ দেখাইতে পারিয়াছেন। মা লিখিয়াছেন, ‘কাজল ঝামেলা মোটেও সহ্য করতে পারে না। এসব যন্ত্রণা দেখিয়া (সে) মহসীন হলে পাকাপাকি আশ্রয় নিল। প্রতিদিন সকালে উঠে কাগজে খুঁজে দেখে শহীদ পরিবারকে রক্ষীবাহিনী উচ্ছেদ করেছে এরকম খবর আছে কি না! যদি না থাকে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে।’ (ফয়েজ ২০০৮: ৯৫)

বলা হয়তো বাহুল্যই, এই সেই বাসা যাহার ছাদের তলায় আহমদ ছফা কিছুদিনের জন্য আশ্রয়ধন্য হইয়াছিলেন। তাঁহার আশ্চর্য স্বপ্নের সূচনা কি এই বাড়িতেই হইয়াছিল? এতদিনে এ জিজ্ঞাসার সদুত্তর পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে।

কোন কোন স্বপ্নে হয়ত ডিটেলই থাকে না। হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নেও সম্ভবত থাকিত না। মহাত্মা ফ্রয়েড প্রণীত ‘ডি ট্রাউমডয়টুংগ’ বা ‘খাবনামা’ নামক যুগান্তকারী গ্রন্থের ব্যবস্থা কিন্তু অন্য কথা বলিতেছে।

ফ্রয়েডের মতে স্বপ্নে কেবল ডিটেলের রাজত্ব। সেই ডিটেলের গঠন আবার ভাষার মতন—রূপকে আর লক্ষণায় ভরপুর। ফ্রয়েড বলিয়াছিলেন ডিটেল কোথাও হয় ঘন, কোথাও যায় হেলে। রূপক আর লক্ষণা কথা দুইটি চিরায়ত অলংকারশাস্ত্র হইতে উদ্ধার করিয়াছেন ফ্রয়েডের শাবক ফরাশি মহর্ষি জাক লাকাঁ।

হুমায়ূন আহমেদ মহাত্মা ফ্রয়েডের সহিত পরিচয়ের দৌঁড়ে কতখানি কাছাকাছি পৌঁছিলেন জানিবার সাধ আমার হয় নাই। তবে অনুমান করিতে দোষ নাই তিনি হয়তো শার্ল বোদলেয়ারের সহিত অপরিচয়ের বাধাটা অতিক্রম করিয়া থাকিবেন। কবিতার দৈবগুণ যে একদা জীবনপ্রভাতে তাঁহাকেও পাইয়া বসিয়াছিল সে সত্য তো তিনিও অস্বীকার করিতে পারেন নাই। তাঁহারও একটা বৃত্ত ছিল। তিনি সে বৃত্তের ভিতরে কি বাহিরে বসবাস করিতেন সে বড় কথা নয়। (আহমেদ ২০০৯: ৯-১৩)

‘পারিসিয়া স্বপ্ন’ নামে বোদলেয়রের একটি কবিতা আছে। মাত্র ষাট পংক্তির এই নাতিদীর্ঘ কবিতায় বোদলেয়রের নায়ক বলিতেছেন, ‘লো সোমেয় এ প্লাঁ দো মিরাক্ল’ অর্থাৎ নিদ্রাদেবের ভাঁড়ার অলৌকিক সব কাণ্ডকারখানায় ভরপুর: ‘চোখে সকলই পড়িতেছে, মগর কানে কিছুই পশিতেছে না।’

একদিন প্রাতবেলা এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখিয়াছেন বোদলেয়রের নায়ক। সেই স্বপ্নে এমন এক দেশ দেখা দিয়াছে অন্য কোন মরণশীল প্রাণী যে দেশ কোনদিন দেখিতে পায় নাই। সেই স্বপ্নের দেশে কোন প্রাণের ছোঁয়া নাই, এলোমেলো সবুজের বা প্রাণের দেখা নাই। ঘাসবিচালি পর্যন্ত দেখা যায় না সেখানে। ঐদেশে কেবল একঘেয়ে ধাতু, মর্মর পাথর আর পানির রাজত্ব। সে দেশের প্রাসাদরাজি অনন্তবিস্তৃত, চারিপাশে কেবল সিঁড়ি আর দালানকোঠার সারি।

ঐ দেশেই ঘরে ঘরে থরে থরে সাজান সোনাদানার বাহার, ফোয়ারার ছটা ঝরিয়া পড়িতেছে সোনার নানান পাত্রের উপর। সেখানে ধাতুর দেওয়াল হইতে ফটিকের পর্দার মতন ঝুলিছে ভারি ভারি জলপ্রপাত। গাছগাছালির চিহ্ন পর্যন্ত নাই সেখানে, আছে কেবল বড় বড় কতকগুলি থাম অর্থাৎ খাম্বা। সেখানে সরোবরে সামান্য নারীজাতির সন্তানের মতন আপনকার মুখের বিম্ব দেখিতেছে বিশাল বিশাল দানবীর দল।

বোদলেয়রের নায়কটি বলিতেছেন, তাঁহার স্বপ্নের দেশে গোলাপি আর হরিতবর্ণা দুই জেটির মাঝখানে কোটি কোটি ক্রোশ জুড়িয়া—নিখিলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত—কেবল নীল পানির সমুদ্র। সেখানে অলীক পাথর আর অলৌকিক তরঙ্গভঙ্গ। ফাটিয়া পড়িতেছে তীরে। আর বিশাল সব আয়নায় ঘটিতেছে এইসব দৃশ্যের প্রতিফলন। অস্থির আর নির্বাক নতুন আকাশগঙ্গা সেখানে তাহার হীরকখচিত গর্তে ধনরত্ন ঢালিয়া দিতেছে। এই ঘুমপাড়ানো মহাসমুদ্র পাথরের একটা সুড়ঙ্গ দিয়া বহিয়া যাইতেছে।

এই স্বপ্নলোকে দুনিয়ার তাবৎ বর্ণ—মায় ঘোর মসীকৃষ্ণ বর্ণ পর্যন্ত—চকচকে মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখাইতেছে। স্ফটিকে বিম্বিত আলোর ধারায় বহমান তরলের দীপ্তি প্রকাশ পাইতেছে। আকাশের কোথাও একটা তারা নাই, সূর্যের আভাস পর্যন্ত পাইতেছি না, তাহার চিহ্নও নাই আকাশের দশ দিগন্তে। আশ্চর্য সব আজব চিজ জ্বলিতেছে—এ কথা সত্য কিন্তু তাহাও আপন আপন প্রাণের আগুনে মাত্র।

আর সবচেয়ে বড় কথা, কি ভয়ানক কাণ্ড! চোখে সকলই পড়িতেছে, মগর কানে কিছুই পশিতেছে না! এই সকল চলন্ত বিস্ময়ের উপর বিরাজ করিতেছে এক অনন্ত নৈঃশব্দ্য।

এতখানি স্বপ্ন দেখিবার পর নায়ক মহাশয় জাগিয়া উঠিলেন। ততক্ষণে নির্দয় বেলার প্রগতি হইয়াছে—প্রায় বারটা বাজিয়া গিয়াছে। তাহার ঘরখানি নোংরা, ভাঙ্গাচোরা। হয়তো এখনি পাওনাদার আসিবে। মাথায় শত দুঃশ্চিন্তার ভার চাপিয়া যাইতেছে আরেকবার। বেলা বারটার শোকসন্তপ্ত ঘণ্টা বাজিতেছে আর আকাশের অন্ধকার গড়াইয়া গড়াইয়া পড়িতেছে দুঃখের বোঝায় ভারাতুর থমকিয়া থাকা পৃথিবীর পিঠে। ( বোদলেয়র ১৯৭৫: ১০১-১০৩ এবং ২০০৪: ১০৪-১০৬)

শার্ল বোদলেয়র এই পদ্যটি উৎসর্গ করিয়াছিলেন তাঁহার পরম বন্ধু শিল্পী কস্তাঁতাঁ গীকে। নগরীর চিত্রকর খ্যাতিতে ইনি তখন দেদীপ্যমান। যতদূর জানা গিয়াছে পদ্যটির রচনা ১৮৬০ সালের আগে নয়। এই কবিতায় বর্ণিত স্বপ্নের কি কোন অর্থ হয়? বোদলেয়র নিজেই ইহার একটা অর্থ প্রস্তাব করিয়াছিলেন—কবিতার ‘পারিসিয়া স্বপ্ন’ নামেই তাহার প্রকাশ। এমন স্বপ্ন বুঝি শুদ্ধ পারি নগরেই সম্ভব।

এক্ষণে প্রশ্ন জাগিতেছে আহমদ ছফার আশ্চর্য স্বপ্নটির আদৌ কোন ব্যাখ্যা কি দাঁড় করান যায়? যদি যায় তো প্রথমেই স্বীকার করিতে হইবে এমন স্বপ্ন তাঁহাকেই সাজে—যিনি ‘গভীর রাতে নীলক্ষেত এলাকায় … হাঁটতে হাঁটতে আবেগে অধীর হয়ে দুই হাত তুলে চিৎকার’ করিয়া বলিতে পারেন ‘আমার বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ!’ হুমায়ূন আহমেদ নিজেই সাক্ষ্য দিয়াছেন এই আবেগের অথচ তিনি ঠাহরই করিতে পারেন নাই আহমদ ছফার স্বপ্নের সহিত ‘বাংলাদেশ’ নামক আবেগের একটা সম্পর্ক আছে। কোথায় সে সম্পর্ক? তাহার আগে হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষ্যটা দেখা যাইতে পারে।

দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। শিশু রাষ্ট্র জন্মের যন্ত্রণায় তখনো ছটফট করছে। আর ছফা ভাই ছটফট করছেন আবেগে এবং উত্তেজনায়। কত অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনা তাঁর মাথায়। দেশকে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে এভারেস্ট শিখরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। দেশ মেধা এবং মননে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। ইত্যাদি। (আহমেদ ২০০৯: ২৯)

মহর্ষি ফ্রয়েড একদা লিখিয়াছিলেন, ‘আপনি চাহেন তো  তত্ত্বজ্ঞানী আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সহিত একমত পোষণ করিতে পারেন, উঁহারা যেমন স্বপ্নের অর্থানুসন্ধান জিনিশটাকে একান্তই কল্পনাবিলাস বলিয়া উড়াইয়া দেন তেমন উড়াইয়াও দিতে পারেন। কিন্তু আমার অন্যরকম একটা শিক্ষা হইয়াছে।’ (ফ্রয়েড ১৯৫৩: ৪/১০০; ফ্রয়েড ২০০৬: ১১২)

ফ্রয়েডের এই শিক্ষাটা কাঁহার দান? কে দিয়াছিল এই শিক্ষাটা? তিনি দেখাইয়াছেন, তিনি শিখিয়াছিলেন তাঁহার নিজের দেখা স্বপ্নের ভাঁড়ার আর তাঁহার কাছে চিকিৎসাপ্রার্থী রোগীসাধারণের স্বপ্নের বিবরণ হইতে আর—সবার উপরে—সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা হইতে।

সেকালের বড় বড় তত্ত্বজ্ঞানী আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলিতেন ‘স্বপ্নের কোন অর্থ হয় না’।

ফ্রয়েড তাঁহাদিগের মোকাবেলা করিবার লক্ষ্যে একটি ইতিহাসবিখ্যাত সাহিত্যকর্মের আশ্রয় লইয়াছিলেন। নিজের দেখা একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিতে বসিয়া ফ্রয়েড বলিয়াছিলেন, গ্রিক পুরাণের এদিপাস কাহিনী কানে পশিলে একালের সকল শ্রোতাই কমবেশি কান খাড়া করিয়া থাকেন। এই বাড়তি উদ্বেগের, বাড়তি কান খাড়া করিবার কারণটা কি? একটা কারণ হইতে পারে এই যে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটি একটি করিয়া ছোট ছোট এদিপাস বাস করে। ফ্রয়েড লিখিতেছেন:

কবি একদিকে এদিপাসের অপরাধটি ধরাইয়া দিয়াছেন, আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদেরও আমাদের আপন আপন মনের ভিতরের খবরটা লইতে বাধ্য করিতেছেন: এদিপাসের মতন আমরাও যে যাহার জীবনটা চালাইয়া যাইতেছি … আর খবর যখন রাষ্ট্র হইয়া গেল, হইতে পারে তখন আমরা সকলেই স্ব স্ব বাল্যদশার যত দৃশ্য পাছে তাহা দেখিতে পাই এই ভয়ে চক্ষু মুদিয়া থাকি। (ফ্রয়েড ১৯৫৩: ৬/২৬১-২৬৩)

ফ্রয়েডের এই বক্তব্যের মধ্যে বিজ্ঞানে বিপ্লবের একটি বিবরণ আছে। সেকালের প্রচলিত বিজ্ঞানকেও তিনি উচিত শিক্ষা দিয়াছিলেন। গ্রিক মহর্ষি আরস্তু বলিয়াছিলেন, মানুষ স্বভাবের বশে জানিতে চাহে। আর ফ্রয়েডের টিপ্পনী অনুসারে, মানুষ ভয়ে জানিতেই চাহে না, চোখ বন্ধ করিয়া রাখে।

ফ্রয়েডের এই প্রণালীর সহিত এয়ুনানি মহাত্মা সক্রাতেসের পদ্ধতির একটা মিল দেখা যায়। আফলাতুন লিখিত সুসমাচার অনুসারে কবিরা কবিতা লেখেন বটে কিন্তু কবিতার অর্থ কি তাহা বলিতে পারেন না। সক্রাতেসের ধারণা, কবিরা কবিতা লেখেন একধরণের প্রেরণা বা ঘোরের বশে অর্থাৎ জ্ঞান অথবা বিজ্ঞতাই কবিতার জননী নহে। তাই জ্যোতিষশাস্ত্র কিংবা হস্তরেখাবিদদের মতন মজার মজার অনেক কথা তাঁহারা বলিয়া যাইতে পারেন কিন্তু তাঁহাদের কথার অর্থটা কি তাঁহারা বলিতে অক্ষম।

এই দুনিয়ায় কিছু মানুষ আছেন যাঁহারা মনে করেন জগতের সকল রহস্য তাঁহাদের কাছে ধরা দিয়েছে কিংবা একদিন অন্তত দিতে পারে। ইঁহারাই যাহাকে বলে পরম জ্ঞানী। তত্ত্বজ্ঞানের ইতিহাস এই ধরনের পরম জ্ঞানীতে পরিপূর্ণ। ইঁহাদের এক নেতার নাম—জার্মান মহাত্মা গেওর্গ হেগেল। ইঁহার মতে পরম জ্ঞানের লক্ষণ হইল এই যে, সে যে জানে সে কথাটিও তাহার অজানা থাকে না। আমাদের পৃথিবীতে যখন একটা নতুন যুগের সূচনা হইয়াছিল—যে যুগের বর্তমান নাম দাঁড়াইয়াছে বুর্জোয়া যুগ—সেই যুগে এই অহমিকাই ছিল মনুষ্যজাতির পক্ষে পরম জ্ঞান।

বুর্জোয়া যুগে দুর্যোগ দেখা দিবার পর হইতে একধরণের সংশয়ভাব মাথাচাড়া দিয়াছে। যাঁহাকে এ যুগের তত্ত্বজ্ঞানীদের গুরু বলা যাইতে পারে তাঁহার নাম—আহা, আবারও এক জার্মান মহাত্মা—ফ্রিডরিখ নিৎশে। ইঁহার শিষ্য-শাবকেরা এখন পশ্চিমা দুনিয়ায় বলা যায় রাজত্বই করিতেছেন। উঁহারা কহিতেছেন (সক্রাতেসের আদলে) আমরা মাত্র একটা জিনিশই জানি—তাহা এই যে ‘আমরা জানি না’।

পরিশেষে আমরা তৃতীয় একটা দলের নাম লইতে প্রস্তুত। ইঁহাদের নেতার নাম জিগমুন্ট ফ্রয়েড—ঘটনাচক্রে ইনিও জার্মান মহাত্মাদের সারিতে। ফ্রয়েডের দল হইতে আমরা শিখিতেছি আমাদের অজানা জ্ঞানের গঠন অনেকটা স্বপ্নের মতন। ইহার মানে কি দাঁড়াইল? ফ্রয়েডের শিষ্য—ফরাশি দেশীয় মহর্ষি—জাক লাকাঁ জিনিশটা বানান করিয়া বলিয়াছেন: আমাদের স্বপ্ন ও সাহিত্যকর্ম একই গোত্রের জিনিশ। সাহিত্য একটা কথা জানে যে সে জানে, কিন্তু সে যাহা জানে তাহার অর্থ কি তাহা আর জানে না। (ফেলম্যান ১৯৮২)

স্বপ্নের ব্যাখ্যা হইতেই ফ্রয়েড বিজ্ঞানে একটা রীতিমত বিপ্লবের সূচনা করিয়াছিলেন। এই ব্যাখ্যার তাৎপর্য এইখানে যে স্বপ্নের গড়ন আছে এবং এই গড়ন ভাষার আদলে চলে। ফ্রয়েডের আবিষ্কার হইতে মানুষ ইচ্ছা করিলে শিখিতে পারিত যে ভাষাই মানুষের প্রকৃত জননী।

ভাষার উপর মানুষের অধিকার জন্মাইয়াছে—এই সত্যের একটা উল্টা পিঠও আছে। সেই পিঠে লেখা—মানুষের উপর ভাষার অধিকার ষোল আনা। যেখানে ভাষা নাই সেখানে মানুষই নাই। মানুষ ভাষার ক্রীড়নক বিশেষ—এই সত্যে যাঁহাদের সন্দেহ  তাঁহারা আজও মানুষ হইয়াছেন একথা বলা যাইবে কিনা সন্দেহ।

হুমায়ূন আহমেদ এবং মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুইজনেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার জয় করিয়াছেন। আহমদ ছফা বাংলা একাডেমির মন জয় করিতে ব্যর্থ হইয়াছিলেন কেন? তাঁহারা দুইজনে মিলিয়াও এই প্রশ্নের জবাবটা খুঁজিয়া বাহির করিতে সমর্থ হন নাই। এই দুঃখ তাঁহারা রাষ্ট্রও করিয়াছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল আহমদ ছফা বিষয়ে আপনকার স্মৃতিকথার নাম রাখিয়াছিলেন সেই দুঃখের অক্ষরেই—‘আহমদ ছফা এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কার’। একটি আবেদনে—মাত্র একটি আবেদনে—তিনি স্মৃতির নির্বন্ধ শেষ করিয়াছিলেন:

বাংলা একাডেমীর প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মকে যথাযথ মূল্যায়ন করে তাঁকে মরণোত্তর পুরস্কার দিয়ে হলেও আমাদেরকে একটি লজ্জা এবং অপমান থেকে মুক্তি দেয়া হোক। তা না হলে ভবিষ্যতে যাঁরা এই পুরস্কার পাবেন তাঁরা দশজনের সামনে কেমন করে মুখ দেখাবেন? (ইকবাল ২০০১: ৭ এবং ২০০৩: ১২৬)

আমি সামান্য মানুষ। এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই। তবুও বলিতে পারি যাঁহাদের দেখাইবার মতন মুখ নাই তাহারা অন্য কোন অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গ দেখাইলেই পারেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা লিখিবার সামর্থ্যই বা আমার কোথায়! কেন জানি মনে হইতেছে ১৯৭২ সালে আহমদ ছফা যে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন তাহার মধ্যে রক্ষীবাহিনী হইতে বাংলা একাডেমি—এমনকি আজিকার রাতের হেফাজতে ইসলাম—সকলের ইতিহাস স্বপ্নাক্ষরে লেখা ছিল। বলি কি হুমায়ূন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবাল যে একদিন বাংলা একাডেমি বিজয় করিবেন তাহার বাণী পর্যন্ত খোদাই করা ছিল ঐ স্বপ্নে। নতুবা এই স্বপ্নের অন্য অর্থ কি আর হইতে পারিত: ‘ছোট ছোট আধ আঙুলের মানুষ, ঘরের উঠানে তেঁতুলের বিচি লাগাচ্ছে’?

এই নিবন্ধের গোড়ার দিকে ওয়াদা করিয়াছিলাম আনিস সাবেত নামটি জড়াইয়া যে একটা গল্প আমারও জানা আছে তাহা পরে বলিব। এক্ষণে গল্পটি বলিতে চাহি। ইংরেজি ২০০১ সালের জানুয়ারি  কি ফেব্রুয়ারির কথা। আহমদ ছফা একদিন আমাকে টেলিফোনযোগে বলিলেন, ‘সলিমুল্লাহ খান, তোমাকে একটা বহি উৎসর্গ করিতে চাই।’ আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলাম। সপ্তাহখানিক পরে আহমদ ছফা আবার টেলিফোন করিলেন। জানাইলেন, ‘আমি দুঃখিত, বইটা তোমাকে উৎসর্গ করিতে পারিতেছি না। অনেকদিন হয় আমার বন্ধু আনিস সাবেত মারা গিয়াছেন, তাঁহার নামে কোন বই উৎসর্গ করা হয় নাই। তাঁহাকে এই বইটা উৎসর্গ করিতে হইবে।’

আমি আবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলাম। সঙ্গে যোগ করিলাম, ‘আল্লাহ যাহা করেন ভালোর জন্যই করেন।’ এক সপ্তাহ পর আহমদ ছফার বইটা ছাপা হইল। বইটির নাম ‘উপলক্ষের লেখা’। একদিন দেখা হইতে আহমদ ছফা বলিলেন, ‘একটা ভুল হইয়া গিয়াছে। আনিস সাবেতকে আমি আগেও একটা বই উৎসর্গ করিয়াছিলাম।’ পরের বইটা তোমাকে দিব। আবার বলিলাম, ‘আল্লাহ যাহা করেন ভালোর জন্যই করেন।’

আহমদ ছফা ইহলোক ত্যাগ করিয়াছিলেন ঐ বছরের জুলাই মাসের ২৮ তারিখ। ইহার মধ্যে তাঁহার লেখা কোন বই আর প্রকাশ  পায় নাই।

দোহাই

১. আয়েশা ফয়েজ, জীবন যে রকম, ১০ম মুদ্রণ (ঢাকা: সময় প্রকাশন, ২০১১)।

২. হুমায়ূন আহমেদ, ‘পড়বে না তাঁর পায়ের চিহ্ন’, আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থ, মোরশেদ শফিউল হাসান ও সোহরাব হাসান সম্পাদিত (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৩), পৃ. ৬১-৬৩।

৩. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ‘আহমদ ছফা এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কার’, প্রথম আলো, ১৮ আগস্ট ২০০১, পৃ. ৭; পুনর্মুদ্রণ, আহমদ ছফা স্মারক গ্রন্থ, ঐ, পৃ. ১২১-১২৬।

৪. হুমায়ূন আহমেদ, বলপয়েন্ট, ৫ম মুদ্রণ (ঢাকা: অন্য প্রকাশ, ২০০৯)।

৫. হুমায়ূন আহমেদ, ‘নিজের কিছু কথা’, পুনর্মুদ্রণ, সমকাল, ঈদ আনন্দ ২০১২ সংখ্যা, ১৭ আগস্ট ২০১২।

৬. হুমায়ূন আহমেদ, ‘নিজের কিছু কথা’, উপন্যাস সমগ্র: প্রথম খণ্ড, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা, ২০১৬), পৃ. [সাত]-[আট]।

৭. আহমদ ছফা, সেইসব লেখা, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদ্রার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ২০০৮)।

৮. Charles Baudelaire, ‘Rêve parisien,’ Oeuvres complètes, tome I, par Claude Pichois (Paris: Gallimard, 1975), pp. 101-103.

৯. Charles Baudleaire, ‘Paris Dream,‘ Selected Poems, Carol Clark, trans. (London: Penguin Books, 2004), pp. 104-107

১০. Sigmund Freud, The Complete Psychological Works of Sigmund Freud, James Strachey, ed., vols. 4 and 6 (London: Hogarth Press, 1953—).

১১. Sigmund Freud, Interpreting Dreams, J. A. Underwood, trans. (London: Penguin Books, 2006).

১২. Shoshana Felman, ‘Psychoanalysis and Education: Teaching Terminable and Interminable,’ Yale French Studies, no. 63 (1982), pp. 21-44.

 

১৩ নবেম্বর ২০১৮, এনটিভি

নজরুল ইসলাম, বাঙ্গালি মুসলমান ও তুর্কি বিপ্লব

kazi-nazrul-islam.jpg

তুর্কি সমাজের জন্য মোস্তফা কামাল যা করেছিলেন, নজরুল আন্তরিকভাবে বাঙালি মুসলমানের জন্য অনুরূপ কিছু করার বাসনা পোষণ করতেন। তাঁর কবিতা, গদ্য রচনা, অভিভাষণ, চিঠিপত্র—এসবের মধ্যে তার অজস্র প্রমাণ ছড়ান রয়েছে।
—আহমদ ছফা (২০০১: ১১০)

হাইস্কুলের শেষ পরীক্ষা শেষ না করিয়াই কাজী নজরুল ইসলাম ইংরেজ সরকারের অধীন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়াছিলেন। তখন ইংরেজি ১৯১৭ সাল। নজরুল ইসলামের বয়স টানিয়াটুনিয়া আঠার বছর। এয়ুরোপ মহাদেশের দুই পরাশক্তি ইংরেজ সাম্রাজ্য ও জার্মান সাম্রাজ্যের মধ্যে লড়াই চলিতেছে। আর ওসমানিয়া রাজবংশের শাসনাধীন তুর্কি সাম্রাজ্যও এই লড়াইয়ে শামিল হইয়াছে। তাঁহারা দাঁড়াইয়াছেন ইংরেজ, ফরাশি ও রুশ প্রভৃতি বড় বড় জাতির বিপক্ষে। এমতাবস্থায় পরাধীন ভারতের প্রত্যন্ত বাংলা প্রদেশের কোন এক গাঢ় মফস্বল শহরের দশম শ্রেণীর একটি মুসলমান ছাত্র পরিবার পরিজন কাহাকেও না বলিয়া, প্রাণসংহারের ত্রাস উপেক্ষা করিয়া ব্রিটিশভারতীয় যোদ্ধার দলে নাম স্বাক্ষর করিলেন। ইহা কম কথা নহে। আরো বড় কথা ইংরেজ সাম্রাজ্য লড়িতেছে যাহার তাহার বিরুদ্ধে নহে, লড়িতেছে ভারতীয় বা বাঙ্গালি মুসলমান কেন সারা দুনিয়ার সকল মুসলমানের আশাভরসাস্থল ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে।

এই যুদ্ধে ওসমানিয়া পক্ষের সাফল্যও কিছু কম ছিল না। রাজধানী ইস্তাম্বুলের প্রবেশদ্বার দার্দানেলিস প্রণালীতে গ্রেট ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর যৌথ হামলার মুখে তাঁহারা তিষ্ঠিয়া গিয়াছেন। তুর্কিজাতির ভবিষ্যত নায়ক মোস্তফা কামাল ছিলেন এই প্রতিরোধ যুদ্ধের সফল নেতা। ততদিনে চারিদিকে তাঁহার সুনাম ছড়াইয়া পড়িয়াছে। আর ঐদিকে পশ্চিম এশিয়ার আরেক রণাঙ্গন ইরাকের বুকে তুর্কি সেনাবাহিনী ব্রিটিশ সেনাপতিসহ ইংরেজদের অধীনস্ত গোটা একটি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বন্দী করে। ইহা ১৯১৫-১৯১৬ সালের কথা। ইংরেজ বাহিনীতে ততক্ষণে লোকবলের টান পড়িয়াছে। তখন ইংরেজ সরকার ভারতবর্ষের আর আর প্রদেশ হইতে সিপাহি সংগ্রহ করিতেছিলেন। এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ হইতে কিন্তু তাঁহারা সৈন্য লইতে চাহিতেন না। প্রচার করিতেন বাঙ্গালি জাতির লোকেরা যোদ্ধা হিশাবে ভাল নহে। তাহারা ননমার্শাল বা যুদ্ধবিমুখ জাতি। ইতিহাস বিশারদ কেহ কেহ বলেন ১৮৫৭-১৮৫৮ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ইংরেজগণের এই সন্দেহ আরও পাক্কা হইয়া গিয়াছিল।

এমতাবস্থায় ভারতের জাতীয় জনমতের একাংশ অন্তত চাহিতেছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যের বাহিনীতে বাঙ্গালিদেরও লওয়া হউক। শেষ পর্যন্ত ১৯১৬ সাল নাগাদ ইংরেজ সরকার বাঙ্গালি সেনাদের লইয়া একটি ডবল কোম্পানি গঠনে রাজি হইলেন। তাহাতে বেশ সাড়া মিলিল। এই ডবল কোম্পানি শেষমেষ ৪৯ নং বাঙ্গালি পল্টননামা রেজিমেন্ট বা বেটালিয়নে উন্নীত হইল। তাহার সৈন্যসংখ্যা ৭,০০০ মতো দাঁড়াইয়াছিল। কিন্তু ভারতের—বিশেষ বাংলা মুলুকের—সকলেই ততদিনে আর ইংরেজের দিকে প্রসন্নমুখে তাকাইতেছেন না। যাহাকে বলে ‘রাজার উপর ভক্তি’ তাহাও যতটুকু থাকা প্রয়োজন তাহা নাই।

এমতাবস্থায় ইংরেজের হইয়া জার্মানির—মোতাবেক তুরস্কের—বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য নজরুল ইসলাম কেন আগাইয়া গেলেন? এই প্রশ্ন আমরা করিতেই পারি। একটা উত্তর হইতে পারে ইংরেজ সরকারের কুশলী প্রচারণা। নজরুল ইসলামের পরম বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ও একই সঙ্গে যুদ্ধে নাম লেখাইতে গিয়াছিলেন। তাঁহার সাক্ষ্য হইতে কিছু কথা উদ্ধার করা যাইতেছে। সেই সময় তিনি লিখিতেছেন, ‘বাঙালী যুবকদের উদ্বুদ্ধ করবার চেষ্টা চলছে ক্রমাগত।’ তাঁহার কথায়, ‘শহরে তখন নিত্যনতুন পোস্টার পড়ছে। নানারকম রঙবেরঙের বড় বড় পোস্টার আঁটা হচ্ছে শহরের অলিতে গলিতে। কত বিচিত্র তার ছবি, কত বিচিত্র তার ভংগী আর কত বিচিত্র তার ভাষা।’ আর লেখা হইতেছে বিচিত্র কত কথাই না! শৈলজানন্দ উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে মনে হয় এই কথামালারই একফর্দ সারমর্ম পেশ করিয়াছেন। ‘কে বলে বাঙালী যোদ্ধা নয়? কে বলে বাঙালী ভীতু? জাতির এই কলঙ্ক মোচন করা একান্ত কর্তব্য, আর তা পারে একমাত্র বাংলার যুবশক্তি। ঝাঁপিয়ে পড় সিংহবিক্রমে। বাঙালী পল্টনে যোগ দাও! দুর্নাম ঘুচুক।’ (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৩৮)

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের জবানিতেই জানা যায় তিনি এবং নজরুল ইসলাম দুইজনেই নবগঠিত ৪৯ নম্বর বাঙ্গালী পল্টনে নাম লিখাইয়াছিলেন একসঙ্গে। কিন্তু—শৈলজানন্দের জবানি অনুসারে—তিনি ‘আন্ফিট্’ হইলেন তাঁহার ‘এক বিত্তবান পরমাত্মীয়’ মানে স্বয়ং মাতামহ মহোদয়ের ‘চক্রান্তে’ আর ‘নজরুল চলে গেল প্রথমে নৌসেরায়, তারপর করাচীতে।’ (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৭)

নজরুল ইসলামের যুদ্ধে যোগ হইবার আর একটা কারণ হইতে পারে একান্ত আপন পুরুষকার বা পরিবারের সহিত জড়িত কোন ঘটনা। শৈলজানন্দ সেই রকমই একটা ইঙ্গিত দিয়াছেন তাঁহার স্মৃতিকথায়। একটুখানি নকল করিতেছি।
“আবদুল চলে যেতেই নজরুল বললে, আর দেরি কেন, চল, কালই যাই আসানসোলে।
বললাম, কাল থেকে পরীক্ষা যে।
নজরুল বললে, পরীক্ষা আর দিতে হবে না। কি হবে পরীক্ষা দিয়ে! আমি তো আর ইস্কুলেই যাব না।
পরীক্ষা না দিলে দাদামশাই জানতে পারবে। জানাজানি হয়ে গেলেই বিপদ! লুকিয়ে পালাতে হবে। বললাম, তুমি কি বলে যাবে তোমার বাড়িতে?
— পাগল হয়েছ? আমি আর বাড়িই যাব না।
চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলাম নজরুলকে, তোমার মন কেমন করছে না?
নজরুল বলেছিল, না। মন কেমন করবার মত কেউ আমার নেই।” (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৪১-৪২)
আর একটুখানি পরে শৈলজানন্দ লিখিয়াছেন, ‘নজরুলের জীবনের নিগূঢ়তম বেদনার কাহিনীও আমি জানি। সেই বেদনার সঙ্গে মিশেছিল কৈশোরের দুর্দমনীয় অ্যাডভেঞ্চার-প্রীতি। তাই সবকিছু হাসিমুখে পরিত্যাগ করে সেও ঝাঁপ দিয়েছিল এই মারণ-যজ্ঞে।’ (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৫৩) অথচ এইদিকে শৈলজানন্দ নিজেই ইশারা করিতেছেন নজরুল ইসলামের যুদ্ধে যাইবার আসল কারণ অন্যত্র নিহিত। পরিবারে নহে, সে কারণ সমাজে আর রাষ্ট্রে। নিচের বয়ান হইতে তাহা খানিক বুঝা যাইবে। শৈলজানন্দ লিখিতেছেন:
“ইংরেজ যুদ্ধ করছে জার্মানীর সঙ্গে। আমরা তখন এইটুকুমাত্র জানি। ইংরেজের প্রতি আমরা কেউ প্রসন্ন নই, তার ওপর রাজার প্রতি ভক্তি যেটুকু থাকা প্রয়োজন তাও নেই। তবু আমরা ইংরেজের হয়ে তার শত্রু জার্মানীর বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য কেন যাচ্ছি তা সে কথা জিজ্ঞাসা করলাম নজরুলকে।
নজরুল বললে, যুদ্ধ একটা বিদ্যা তা জানো?
বললাম, জানি!
-সেই বিদ্যেটা আমরা শিখে নেবো আচ্ছা করে।
বললাম, লেখা শেষ হলেই তো দেবে ঠেলে।
-দিক না।
-তখন জার্মানীর একটি গুলি, ব্যস্-
-মরে যাবে? বেশ তো! যুদ্ধ করতে করতে মরে যাওয়া—ভারি মজা। মারতে মারতে মরবো।
নজরুলের সে কি উল্লাস!” (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৩৮)
আর একটু পরে গিয়া শৈলজানন্দ আসল বোমাটা ফাটাইলেন। আমাদের তিনি জানাইলেন, ‘নজরুল যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসে ভারতবর্ষে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করবে, তারপর দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবে—তার এই গোপন মতলবের কথা আমাকে সে বলেছিল একদিন।’ (শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৮: ১৩৯)
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের এই সাক্ষ্য যে ষোল আনা অমূলক নহে তাহার প্রমাণ স্বয়ং নজরুল ইসলামের লেখায়ও মিলিবে। বিশেষ করিয়া তাঁহার গল্পে আর উপন্যাসে। তাঁহার ‘রিক্তের বেদন’ নামক গল্পের বহিতে একজন যোদ্ধার জবানিতে শুনি এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ব্যবসায়টা নেহায়েত জনসাধারণের সমর্থনবঞ্চিত ছিল না। এই যোগদান ছিল জন্মভূমির মঙ্গলের জন্য, তাহার সুনামের খাতিরে। বাঙ্গালী পল্টনের সৈন্যদল চলিয়াছে পশ্চিমদেশের উদ্দেশে। বিদায়ের মুহূর্ত আসন্ন। সাকিন বীরভূম হইতে নজরুল ইসলামের বাণীমূর্তি স্বরূপ বয়ানকারটি কহিতেছেন, ‘আঃ! একি অভাবনীয় নতুন দৃশ্য দেখলুম আজ?… জননী জন্মভূমির মঙ্গলের জন্যে সে কোন অদেখা দেশের আগুনে প্রাণ আহুতি দিতে একি অগাধ অসীম উৎসাহ নিয়ে ছুটেছে তরুণ বাঙালিরা,—আমার ভাইরা! খাকি পোশাকের ম্লান আবরণে এ কোন আগুনভরা প্রাণ চাপা রয়েছে!—তাদের গলায় লাখো হাজার ফুলের মালা দোল খাচ্ছে, ওগুলো আমাদের মায়ের দেওয়া ভাবী বিজয়ের আশিষমাল্য,—বোনের দেওয়া স্নেহবিজড়িত অশ্রুর গৌরবোজ্জ্বল—কণ্ঠহার।’ (কাজী নজরুল ইসলাম ২০১১: ২/২৩৩)

খানিক আগাইয়া আবারও শুনি বয়ানকারের স্বগতোক্তি। এই উক্তি খোদ নজরুল ইসলামের বলিলে কোনই অত্যুক্তি হইবে না।
“এই যে জল ছলছল শ্যামোজ্জ্বল বিদায় ক্ষণটুকু অতীত হয়ে গেল, কে জানে সে আবার কত যুগ বাদে এমনি একটা সত্যিকার বিদায় মুহূর্ত আসবে?
আমরা ‘ইস্তকনাগাদ’ ত্যাগের মহিমা কীর্তন পঞ্চমুখে করে আসছি, কিন্তু কাজে কতটুকু করতে পেরেছি? আমাদের করার সমস্ত শক্তি বোধ হয় এই বলার মধ্য দিয়েই গলে যায়!
পারবে? বাংলার সাহসী যুবক! পারবে এমনি করে তোমাদের সবুজ, কাঁচা, তরুণ জীবনগুলো জ্বলন্ত আগুনে আহুতি দিতে, দেশের এতটুকু সুনামের জন্যে? তবে এস! ‘এস নবীন, এস! এস কাঁচা, এস!’ তোমরাই তো দেশের ভবিষ্যত আশা, ভরসা, সব! বৃদ্ধদের মানা শুনো না। তাঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুনাম কিনবার জন্যে ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে তোমাদের উদ্বুদ্ধ করেন, আবার কোনো মুগ্ধ যুবক নিজকে ঐ রকম বলিদান দিতে আসলে আড়ালে গিয়ে হাসেন এবং পরোক্ষে অভিসম্পাত করেন! মনে করেন, এই মাথা-গরম ছোকরাগুলো কি নির্বোধ।’ ভেঙে ফেলো ভাই, এদের এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থবন্ধন!
অনেকদিন পরে দেশে একটা প্রতিধ্বনি উঠছে, ‘জাগো হিন্দুস্তান, জাগো! হুঁশিয়ার।” (কাজী নজরুল ইসলাম ২০১১: ২/২৩৪)
নজরুল ইসলামের এই চিন্তাধারার সহিত মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সেকালের চিন্তার একপ্রস্ত সুন্দর মিল পাওয়া যায়। গান্ধীজী নিজেও সেই সময় ভারতবাসী জনসাধারণকে ইংরেজের যুদ্ধে যোগ দিবার দাওয়াত দিয়া গুজরাটের গ্রামগঞ্জ চষিয়া বেড়াইতেছিলেন। গান্ধীজী তখন বেশ ভারতবিখ্যাত হইয়াছেন। বিহারের ‘চম্পারন’ আর গুজরাটের ‘খেড়া’ সত্যাগ্রহ তাঁহার সুনাম দেশেবিদেশে ছড়াইয়া দিয়াছে। তবে কিনা তিনি তখনও ‘মহাত্মা’ খেতাবে ভূষিত হয়েন নাই। ব্রিটিশ সরকারের তরফে যুদ্ধের জন্য সিপাহি সংগ্রহ করা (গান্ধীর দেশের প্রচলিত ভাষায় রংরুট বা রিক্রুট ভর্তি করা) গান্ধীজী নিজ দায়িত্বের অংশ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রথমে তিনি গুজরাটে চেষ্টা করিলেন। গেলেন তাঁহার কর্মক্ষেত্র খেড়াতে। গান্ধীজী লিখিতেছেন, ‘সিপাহী যদি চাই, তাহার জন্য খেড়াতে না যাইয়া আর আমি কোথায় যাইব? আমার নিজের সঙ্গীদেরই যদি প্রথম সিপাহী হইতে নিমন্ত্রণ না করি, তবে কাহাকে করিব?’ (মোহন্দাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯৯৬: ৩২৭-২৮)

গান্ধীজীর এই চেষ্টাটা বিশেষ সফল হয় নাই। নিজেই সাক্ষ্য দিতেছেন তিনি, ‘যে সব গ্রামে যাইতাম সেই স্থানেই সভা করিতাম। লোকে সভায় আসিত, কিন্তু নাম পাওয়া যাইত মাত্র দুই জনের। “আপনি অহিংসাবাদী হইয়া অস্ত্র লওয়ার কথা কেন বলিতেছেন? সরকার কি হিন্দুস্থানী, সরকার কি আমাদের ভাল করিতেছেন যে সাহায্য করিতে বলিতেছেন?”—এই ধরনের আরও অনেক প্রশ্ন আমি শুনিতে পাইতাম।’ গান্ধীজী আরও লিখিয়াছেন:
“‘রংরুট’-এ ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন ছাপাইয়া বিতরণ করিতাম। সিপাই দলে ভর্তি হওয়ার ঐ আবেদনপত্রে একটি এরূপ যুক্তি ছিল যাহাতে [ইংরেজ] কমিশনারদের পীড়া বোধ হইত। তাহার সারমর্ম এই প্রকার ছিল—ব্রিটিশ রাজের অনেক অপকীর্তির মধ্যে সমস্ত প্রজাকে নিরস্ত্র করিয়া রাখার আইনকে ভবিষ্যত ইতিহাস সর্বাপেক্ষা গর্হিত কাজ বলিবে। এই আইন যদি তুলিয়া দিতে হয়, যদি অস্ত্রচালনার শিক্ষা লইতে হয়, তবে এই সুবর্ণ সুযোগ। রাষ্ট্রের বিপদের সময় মধ্যবিত্ত লোকেরা যদি সাহায্য করে, তবে অবিশ্বাস দূর হইয়া যাইবে। আর যাহার অস্ত্রধারণ করার ইচ্ছা, সে অক্লেশে অস্ত্রধারণ করিতে পারিবে।”

গান্ধীজীর এই বক্তব্যে মনে হয় বেশ কাজ হইয়াছিল। জনসাধারণের মনে প্রশ্ন থাকিলেও—তিনি লিখিতেছেন—‘ধীরে ধীরে আমাদের কার্যের প্রভাব লোকের উপর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। নামও বেশ আসিতে লাগিল।’ ঐ দিকে ইংরেজ কমিশনারগণ ইহাতে বিপদে পড়িয়া যাইতেন। তাঁহারা না পারিতেন ইহার বিরোধিতা করিতে, না পারিতেন পুরাপুরি মানিয়া লইতে। আপোস করিতে হইত তাঁহাদেরও। গান্ধীজী লিখিতেছেন, ‘আমার এই বক্তব্য সম্পর্কে কমিশনারকে বলিতে হইত যে, তাঁহার ও আমার মধ্যে মতভেদ থাকিলেও তিনি আমার সভায় যোগদান করা পছন্দ করেন। আমার মত আমি যতটা পারি মিষ্ট কথায় সমর্থন করিতাম।’ (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯৯৬: ৩২৭-৩২৯)
মনে রাখিতে হইবে সেই সময় মহাত্মা গান্ধী ‘খিলাফত আন্দোলন’ নামে পরিচিত আন্দোলনের—মানে ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয় দাবির—সপক্ষে দাঁড়াইয়াছেন। খিলাফত নেতা মৌলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী দুই ভাই তখন ইংরেজের হাতে কারারুদ্ধ হইয়াছেন। গান্ধীজীর সহিত তাঁহাদের পূর্ব হইতেই আলাপ ছিল। তাঁহারাও কারাগার হইতে তাঁহাকে পত্রাদি লিখিতেন। গান্ধীজী লিখিতেছেন:
“এই সময় আমি আলী ভাইদের খিলাফত আন্দোলনের লক্ষ্য ও আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হই। মুসলমানদের সঙ্গে আলোচনা করিলাম। আমার এই মনে হইল যে, যদি সত্যই আমি মুসলমানদের বন্ধু হইতে চাই, তবে যাহাতে আলী ভাইদের জেল হইতে খালাস করিতে পারা যায় ও খিলাফত প্রশ্নের ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি হয়, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সাহায্য করাই সঙ্গত। খিলাফত প্রশ্ন আমার কাছে সহজ বোধ হইতেছিল। আমার কাছে উহার ভালমন্দ বিচার করার আবশ্যকতা ছিল না। কেবল ঐ বিষয়ে মুসলমানদের দাবি নীতিবিরুদ্ধ না হইলেই আমার সাহায্য করা উচিত বলিয়া বুঝিলাম। ধর্ম বিষয়ক প্রশ্নে শ্রদ্ধার স্থান সর্বোপরি। সকলের শ্রদ্ধাই যদি একই বস্তুর উপর একই রকম হইত, তাহা হইলে জগতে একই ধর্ম হইত। খিলাফত আন্দোলনের দাবি আমার কাছে নীতিবিরুদ্ধ মনে হয় নাই। কেবল তাহাই নহে, এই দাবি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার সেই কথা কাজে রূপায়িত করিতে চেষ্টা করা একান্ত উচিত বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। লয়েড জর্জের প্রতিশ্রুতি এত স্পষ্ট ভাষায় ছিল যে, ঐ বিষয়ের দোষগুণ অনুসন্ধান করা কেবল আমার বিবেকের তুষ্টির জন্যই আবশ্যক ছিল।” (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯৯৬: ৩২৫-২৬)
মহাত্মা গান্ধী নিজে অহিংসার প্রচারক হইয়াও একই সঙ্গে কেমন করিয়া ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে দাঁড়াইয়া ভারতীয়দের যুদ্ধে নাম লিখাইতে বলিয়াছিলেন তাহা অনেকের মনে এখনও প্রশ্নবোধক চিহ্ন আকারেই বিরাজ করিতেছে। তাই অনেক লেখক আকারে ইঙ্গিতে—কেহবা সরাসরি—বলিয়াছেন নজরুল ইসলাম যুদ্ধে যোগ দিয়াছিলেন ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের—নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রমুখের ভাষায় ‘সত্যকার’ বিপ্লবীদের—পাল্লায় উঠিয়া। অনেকেই এ বিষয়ে সাক্ষ্যস্বরূপ একজন ত্রাসবাদী বিপ্লবীর নাম করিয়াছেন যিনি উচ্চবিদ্যালয়ে নজরুল ইসলামের শিক্ষক ছিলেন। এই শিক্ষক মহোদয়ের নাম শ্রীনিবারণচন্দ্র ঘটক। তিনি ছিলেন নজরুলের সর্বশেষ শিক্ষানুষ্ঠান শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের শিক্ষক। নিবারণচন্দ্র ঘটক বিষয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজফফর আহমদ এক স্থানে লিখিয়াছেন, “তাঁর বাড়ীও ছিল শিয়ারশোলেই। তিনি সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের পশ্চিমবঙ্গীয় দলের, অর্থাৎ যুগান্তর দলের সহিত সংযুক্ত ছিলেন। পল্টন হতে ফেরার পর নজরুল নিজেই আমার নিকট স্বীকার করেছিল যে, সে শ্রীঘটকের দ্বারা তাঁর মতবাদের দিকে আকর্ষিত হয়েছিল।” (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩৮)
কেহ কেহ বলিতে চাহিয়াছেন নিবারণ ঘটক মহাশয়ের পুলিশের হাতে আটক হইয়া বিচারে দণ্ডিত হইবার ফলে নজরুল ইসলাম হতাশাগ্রস্ত হইয়াছিলেন আর সেই কারণেই তিনি পরীক্ষা না দিয়া যুদ্ধে নাম দিয়াছিলেন। আমাদের বক্তব্য এই যে হতাশাগ্রস্ত হওয়া অসম্ভব কিছু নহে। কিন্তু যুদ্ধে যোগ দিবার কারণ হিসাবে এই ঘটনা পর্যাপ্ত বিবেচিত হইতে পারে না। মহাত্মা গান্ধীর ঘটনাটি আমি এই লেখায় পেশ করিয়াছি পরোক্ষ প্রমাণ আকারে। যুদ্ধে যোগ দিবার পক্ষে অনেক যুক্তি থাকিতে পারে। ত্রাসবাদের প্রভাবও থাকিতে পারে। কিন্তু তাহা অকাট্য কারণ হইতে পারে না। মুজফফর আহমদ নিবারণ ঘটক সম্বন্ধে আরও দুই কলম লিখিয়াছেন। আমাদের পক্ষেও তাহার আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক নহে।

“তাঁর [শ্রীনিবারণচন্দ্র ঘটকের] মাসীমা শ্রীযুক্ত দু’কড়িবালা দেবী (চক্রবর্তী) বোন-পো’র প্রভাবেই বোধ হয় সন্ত্রাসবাদী দলে এসেছিলেন। ১৯১৭ সালের ৮ই জানুয়ারী তারিখে শ্রীঘটক শিয়ারশোলে তাঁর নিজের বাড়ীতে ও শ্রীযুক্তা দু’কড়িবালা দেবী বীরভূম জিলার নলহাটি থানার অধীন ঝাউপাড়া গ্রামে তাঁর আপন বাড়ীতে অস্ত্র-আইন অনুসারে একই সময়ে গ্রেফতার হন। দু’কড়িবালা দেবীর সহিত তাঁর গ্রামের সুরধুনী মোল্লানীও (মোড়লানীর উচ্চারণ-বিকৃতি) গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই মহিলার বাড়ীতেই দু’কড়িবালা বে-আইনী অস্ত্র (বারোটি পিস্তল বা রিভলবার) রেখেছিলেন। সিউড়িতে স্পেশাল ট্রাইবিউনালে তাঁদের বিচার হয়েছিল। এই মোকদ্দমায় রায় বা’র হয়েছিল ১৯১৭ সালের ৯ই মার্চ তারিখে। শ্রীনিবারণচন্দ্র ঘটক পাঁচ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে ও স্ত্রীযুক্তা দু’কড়িবালা দেবী দু’বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। রাজসাক্ষী হওয়ায় সুরধুনী মোল্লানী ছাড়া পেয়েছিলেন। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের যে পর্যায় ১৯১৭ সালে শেষ হয়েছিল সে পর্যায়ে আমি যতটা জেনেছি একমাত্র দু’কড়িবালা দেবী ছাড়া অন্য কোন মহিলা এই আন্দোলনের সংস্রবে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হননি। বিনাবিচারে বন্দিনী (ডেটেনিউ) অবশ্য কেউ কেউ হয়েছিলেন। শ্রীঘটকের শেষ জীবন ঝাউগ্রামেই কেটেছে। সেখানেই তিনি ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ৬ই পৌষ (১৯৬০ খ্রীস্টাব্দের ২১ শে বা ২২ শে ডিসেম্বর?) তারিখে মারা গেছেন। ১৯৬৫ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর তারিখেও (ওই তারিখেই আমি শেষ খবর পেয়েছি) ৭৮ বৎসর বয়সে শ্রীযুক্তা দু’কড়িবালা দেবী জীবিত ছিলেন।” (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩৮-৩৯)

উদ্ধৃতিটা যথেষ্ট লম্বা হইয়াছে সন্দেহ নাই। তবু পেশ করিলাম একটি কারণে। দেখাইলাম মুজফফর আহমদ এমন কোন অনুমান করেন নাই যাহাতে কেহ বলিতে পারেন নজরুল ইসলাম তাঁহার শিক্ষকের দণ্ডাদেশে ক্ষুব্ধ কিম্বা নিরাশ হইয়া যুদ্ধে যাইবার সিদ্ধান্ত নিয়াছিলেন। এতক্ষণে আমরা পরিবারের কথায় ফিরিতে পারিলাম। নজরুল ইসলাম কেন যুদ্ধে যোগ দিয়াছিলেন? পারিবারিক দারিদ্র কিংবা প্রেম-ভালোবাসা কিম্বা কোন মান-অভিমানের সুবাদে? মুজফফর আহমদের লেখা হইতে আরও একবার উদ্ধার করিতে হইতেছে। তিনি লিখিয়াছেন:
“নজরুলের সঙ্গে শৈলজানন্দ সৈন্যদলে নাম লিখিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁর বড়লোক মাতামহ রায় সাহেব মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় পেছন হতে কি খেল যে খেললেন কে জানে, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তিনি উৎরাতে পারলেন না। নজরুল ইসলামকে একাই যেতে হলো সৈন্যদলে। ক’মাস পরেই যে ছাত্রের মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা হবে সে যদি কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ একদিন ফৌজে ভর্তি হয়ে যায় তবে স্বভাবতঃই অনেকের মনে ধারণা হবে যে, ছেলেটি বুঝি পরীক্ষার ভয়ে স্কুল পালালো। নজরুল ইসলামের বিষয়ে এমন ধারণা করা কিন্তু সহজ ছিল না। কারণ, সে ছিল তার ক্লাসের প্রথম ছাত্র। অনেকে মনে করতেন পরীক্ষা দিয়ে সে জলপানি পাবে। তাই, আমাদের বোঝা উচিত কেন সে ফৌজে নাম লেখাতে গেল? কিসের টানে গেল?” (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩২-৩৩)

সব পড়িয়া শুনিয়া মুজফফর আহমদ সিদ্ধান্ত করিয়াছেন নজরুল ইসলাম যুদ্ধে গিয়াছিলেন দেশপ্রেমের ডাকে। সেই ডাক এতই তীব্র ছিল যে নজরুল ইসলাম মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করার চেয়ে দেশপ্রেমকেই উচ্চতর আসন দিয়াছিলেন। কথাটা বিশেষ বলিবার কারণ আছে। মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিতে হইলে যেটুকু পড়াশুনার দরকার তাহাও নজরুল ইসলামকে লড়াই করিয়া উপায় করিতে হইয়াছিল। আবারও মুজফফর আহমদের বিশ্লেষণ ধার করিয়া এই প্রসঙ্গের তামাম শুদ করিব।
“নজরুল ইসলাম চুরুলিয়া গ্রামের কাজী পরিবারের ছেলে। কাজীরা মুসলিম সমাজে মানভাজন লোক। তাঁদের পূর্বপুরুষরা বাদশাহী আমলে বিচারকের কাজ করতেন বলে তাঁদের গৌরববোধ বড় বেশী। চুরুলিয়া জামুরিয়ার অধীন একটি গ্রাম। জামুরিয়া আবার বর্ধমান জিলার আসানশোল মহকুমার অন্তর্ভুক্ত একটি থানা। (আগে চুরুলিয়া রানীগঞ্জ থানার অধীনে ছিল)। পরগনার নাম শেরগড়। চুরুলিয়ার কাজীরা বাদশাহী আমলে পাওয়া আয়মা সম্পত্তির মালিক ছিলেন। আমরা তাকে লাখিরাজ (নিষ্কর) সম্পত্তিও বলে থাকি। কিন্তু নজরুলের পিতা কাজী ফকীর আহ্মদ নিঃস্ব অবস্থায় মরেছিলেন। নজরুলকে তাই নিজের ভাগ্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়েছে। অশেষ দুঃখ-কষ্টে কেটেছে তার বাল্যজীবন। যে সময়ে তার মতো একটি ছেলের, তাও আবার কাজী বাড়ীর ছেলের, মনোযোগ সহকারে স্কুলে পড়াশুনা করা উচিত সেই সময়ে দারিদ্র্যের বিড়ম্বনা তাকে এখান থেকে ওখানে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। একটি কথা আছে, কাজী বাড়ীর বিড়ালও কমপক্ষে তিনটি পাঠ পড়ে নেয়। আর কাজী বাড়ীর ছেলে নজরুল স্কুলে পাঠাভ্যাস করার পরিবর্তে লেটোর দলের গান বেঁধেছে, রেলওয়ের গার্ড সাহেবের বাসায় চাকরি করেছে, আর চাকরি করেছে আসানশোলের রুটির দোকানেও। কোন্টা ছোট কাজ, আর কোন্টা বড়, তাতে তার এতটুকুও আটকায়নি। সব কিছু শুনে যা ধারণায় আসে তাতে বোঝা যায় যে, সেই সময়ে চুরুলিয়া কাজী পরিবারের মধ্যে কিংবা নজরুলের অন্য সব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যাঁদের স্বচ্ছল অবস্থা ছিল তাঁরা নজরুলের বড় একটা খোঁজ-খবর নিতেন না। এটাও বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সে পড়াশুনা করতে চাইত। তার জন্যেই সে চারদিকে ছোটাছুটি করেছে। আবার এও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে স্কুলের ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করার চেয়ে সে দেশপ্রেমকেই উচ্চাসন দিয়েছিল। বেঙ্গলী ডবল কোম্পানীতে যোগ দেয়ার যে ডাক তার কানে পৌঁছেছিল সে ডাককে দেশপ্রেমের ডাক ধরে নিয়েই সে তাতে সাড়া দিয়েছিল।” (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩৫)


নজরুল ইসলাম ঠিক কত তারিখে ব্রিটিশ-বাঙ্গালি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়াছিলেন তাঁহার জীবনচরিত লেখকগণ তাহা এখনও সঠিক বলিতে পারিতেছেন না। রফিকুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘১৯১৭ [খ্রিস্টাব্দের] আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি ঠিক কোন তারিখে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তা জানা যায় না।’ (রফিকুল ইসলাম ২০১৩: ৪৩) তবে কখন তিনি যুদ্ধ হইতে ছাড়া পাইলেন তাহা এখন মোটামুটি সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। যুদ্ধশেষে ১৯২০ সালের মার্চ মাস নাগাদ ইংরেজ সরকার উনপঞ্চাশ নম্বর বাঙ্গালি পল্টন ভাঙ্গিয়া দিলেন। মুজফফর আহমদের বয়ান অনুসারে বলিতেছি, ‘নজরুল ইসলামও কলকাতায় ফিরে এলো এই মার্চ মাসে।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৪২)

দেখা যাইতেছে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তিনি কাজ করিয়াছিলেন সব মিলাইয়া আড়াই বছর বা তাহার এক কি দুই মাস বেশি। এই সৈনিক জীবনের পুরোটা সময়ই তিনি কাটাইয়াছিলেন বর্তমান পাকিস্তান দেশের দুইটি এলাকায়। প্রথমে উত্তর পশ্চিম প্রদেশের নৌ শহরা ওরফে নৌসেরায়। দ্বিতীয় স্থানে সিন্ধুরাজ্যের করাচি নগরে। অনেকে একসময় মনে করিতেন নজরুল ইসলাম বুঝিবা যুদ্ধোপলক্ষে মেসোপটেমিয়া ওরফে এরাক রণাঙ্গনে গিয়াছিলেন। কিন্তু এতদিনে সংশয় থাকার কোন কারণ নাই। নজরুল করাচির বাহিরে যাইবার সুযোগ কখনো পান নাই। কিন্তু এই অল্প সময়ের ভিতরই তাঁহার প্রথম লেখা কবিতা ও গল্পকাহিনী ছাপার জন্য তিনি করাচি হইতে কলিকাতায় পাঠাইতে শুরু করিয়াছিলেন। ফলে যুদ্ধশেষে লেখক হিসাবে তাঁহার আবির্ভাব খানিক সহজ হইয়াছিল। মুজফফর আহমদের দোহাই:
“১৩২৬ সালের শ্রাবণ সংখ্যক (খ্রীস্টীয় হিসাবে ১৯১৯ সালের জুলাই-আগস্ট মাস) ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় নজরুল ইসলামের ‘মুক্তি’ শীর্ষক কবিতাটি ছাপা হয়। যতটা জানা গিয়াছে, এটিই ছিল তার প্রথম পত্রিকায় ছাপানো কবিতা। তার আগেও সে অনেক কবিতা লিখেছে, কিন্তু এটিই প্রথম ছাপা হয়েছিল। কাঁচা লেখা মনে করে তার কোনো পুস্তকে এই কবিতাটিকে সে স্থান দেয়নি।” (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ২৪)
১৩২৬ বাংলার শ্রাবণ মাস—মানে ১৯১৯ ইংরেজির জুলাই—হইতে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নজরুল ইসলামের লেখা ছাপা আরম্ভ করে। ঐ বছরের কার্তিক—অর্থাৎ ১৯১৯ ইংরেজির নবেম্বরে—ছাপা হয় ‘হেনা’নামা গল্প। এই গল্পটি তাঁহার ‘ব্যথার দান’ নামা গল্পগ্রন্থে লওয়া হইয়াছে। আর মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত হইল ‘ব্যথার দান’ নাম দেওয়া আরেকটি গল্প। ১৩২৬ বাংলার মাঘ মানে ১৯২০ ইংরেজির জানুয়ারি। ইহার তিন মাস পর আনকোরা নজরুল ইসলাম আপাদমস্তক হাজির হইলেন কলিকাতায়। প্রথম প্রথম তিনি নামের আগে ‘হাবিলদার’ কথাটি লিখিতেন। উহা খসিয়া পড়িতে কিছু সময় লাগিয়াছিল।
এখানে বলিবার কথা হইতেছে একটি। নজরুল ইসলাম যখন ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে তখন পৃথিবীর ইতিহাসের একটি বড় ঘটনা—রুশ সামাজিক বিপ্লব—ঘটিতেছে। মুজফফর আহমদ সাক্ষ্য দিয়াছেন রুশ বিপ্লব ও বিপ্লবী সেনাবাহিনী বা লালফৌজের দিকে নজরুল ইসলামের মনে একটা টান তৈয়ার হইয়াছিল। সুশীল কুমার গুপ্ত তেমন কোন টান দেখিতে পান নাই। তাহাতে ক্ষতি নাই। রুশ বিপ্লব সম্বন্ধে নজরুল ইসলাম যে ওয়াকেবহাল ছিলেন তাহা সন্দেহের অতীত! টানের কথাটা তোলা থাকুক। ‘“ব্যথার দান” গল্পের অন্যতর নায়ক এক নবীন সৈনিক, নাম “সয়ফুল-মুল্ক”। প্রেমে ব্যর্থ হইয়া তিনি এক প্রকার আত্মহত্যা করিতে বসিয়াছিলেন বলিলে বেশি বলা হয় না। সয়ফুল-মুল্কের স্বগতোক্তির মধ্যে আমরা পড়ি, ‘আমি সেই শয়তান, আমি সেই পাপী, যে এক দেবীকে বিপথে চালিয়েছিল। ভাবলুম, এই ভুবনব্যাপী যুদ্ধে যে কোনো দিকে যোগ দিয়ে যত শীগ্গির পারি এই পাপ-জীবনের অবসান করে দিই।’ ব্রিটিশ বাহিনীতে থাকিতে থাকিতে সেই জীবন তিষ্ঠিয়া গেল। তাহার অবসান হইল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি গিয়া যোগ দিলেন রুশ বিপ্লবী সৈন্যদের দলে। ঘটনাটা নজরুল রচনাবলীতে ছাপা পাঠ অনুসারে পড়িতেছি। সয়ফুল-মুলক কহিতেছেন:
“যা ভাবলুম, তা আর হল কই! ঘুরতে ঘুরতে শেষে এই মুক্তিসেবক সৈন্যদের দলে যোগ দিলুম। এ পরদেশীকে তাদের দলে আসতে দেখে এই সৈন্যদল খুব উৎফুল্ল হয়েছে। এরা মনে করছে, এদের এই মহান নিঃস্বার্থ ইচ্ছা বিশ্বের অন্তরে অন্তরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আমায় আদর করে এদের দলে নিয়ে এরা বুঝিয়ে দিলো যে, কত মহাপ্রাণতা আর পবিত্র নিঃস্বার্থপরতা-প্রণোদিত হয়ে তারা উৎপীড়িত বিশ্ববাসীর পক্ষ নিয়ে অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং আমিও সেই মহান ব্যক্তিসঙ্ঘের একজন। আমার কালো বুকে অনেকটা তৃপ্তির আলোক পেলুম!”
খানিক পরে সয়ফুল-মুল্ক দেখিতে পাইলেন যে দলে তিনি যোগ দিয়াছেন তাহার পূর্বতন প্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক দারাও সেই দলে সেখানে। বিস্মিত যুবকের উক্তি, ‘কি, সহসা এ কি দেখলুম? দারা কোথা থেকে এল এখানে। সেদিন তাকে অনেক করে জিজ্ঞাসা করায় সে বললে, ‘এর চেয়ে ভাল কাজ আর দুনিয়ায় খুঁজে পেলুম না। তাই এ দলে এসেছি।’
দারা নামক এই নায়কটি সেদিন এক ‘অচিন্ত্য অপূর্ব অসমসাহসিকতা’ লইয়া যুদ্ধ করিতেছিল। সয়ফুল-মুল্কের বয়ান অনুযায়ী বলিতে, ‘সবাই ভাবছে, এত অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাণের প্রতি ভ্রুক্ষেপও না করে বিশ্ববাসীর মঙ্গলের জন্যে হাসতে হাসতে যে এমন করে বুকের রক্ত দিচ্ছে, সে বাস্তবিকই বীর, আর তাদের জাতিও বীরের জাতি! এমন দিন নেই, যে দিন একটা না একটা আঘাত আর চোট না খেয়েছে সে। সে দিকে কি দৃষ্টিই নেই তার! সে যেন অগাধ অসীম এক যুদ্ধপিপাসা নিয়ে প্রচণ্ড বেগে মৃত্যুর মত কঠোর হয়ে অন্যায়কে আক্রমণ করছে।’ যুদ্ধের এক পর্যায়ে বীরযোদ্ধা দারার দুই চোখ অন্ধ আর কান দুইটাও বধির হইয়া গেল। বিদায় আসন্ন হইয়া উঠিল তাহার। সয়ফুল-মুল্ক বলিতেছেন:
“আজ অন্ধ সেনানী দারার বিদায়ের দিন! অন্ধ-বধির-আহত দারা যখন আমার কাঁধে ভর করে সৈনিকদের সামনে দাঁড়াল, তখন সমস্ত মুক্তিসেবক সেনার নয়ন দিয়ে হু হু অশ্রুর বন্যা ছুটেছে! আমাদের কঠোর সৈনিকদের কান্না যে কত মর্মন্তুদ, তা বোঝাবার ভাষা নেই। মুক্তিসেবক সৈন্যাধ্যক্ষ বললেন,—তাঁর স্বর বারংবার অশ্রুজড়িত হয়ে যাচ্ছিল,—‘ভাই দারাবী! আমাদের মধ্যে “ভিক্টোরিয়া ক্রস,” “মিলিটারি ক্রস” প্রভৃতি পুরস্কার দেওয়া হয় না, আমরা নিজে নিজেই তো আমাদের কাজকে পুরস্কৃত করতে পারি নে। আমাদের বীরত্বের, ত্যাগের পুরস্কার বিশ্ববাসীর কল্যাণ। কি যারা তোমার মতো এই রকম বীরত্ব আর পবিত্র নিঃস্বার্থ ত্যাগ দেখায়, আমরা শুধু তাদেরই বীর বলি!”

সরফুল-মুল্ক আরও বয়ান করিতেছেন: ‘সৈন্যাধ্যক্ষ পুনরায় ঢোক গিলে আর কোটের আস্তিনে তাঁর অবাধ্য অশ্রুফোঁটা কটি মুছে নিয়ে বললেন—“তুমি অন্ধ-হয়েছ, তুমি বধির হয়েছ, তোমার সারা অঙ্গে জখমের কঠোর চিহ্ন,—আমরা বলব, এই তোমার বীরত্বের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার! অনাহূত তুমি বিশ্বের মঙ্গল-কামনায় প্রাণ দিতে এসেছিলে, তার বিনিময়ে খোদা নিজ হাতে যা দিয়েছেন,—হোক না তা বাইরের চোখে নির্মম—তার বড় পুরস্কার মানুষ আমরা কি দেব ভাই? “খোদা নিশ্চয়ই মহান এবং তিনি ভালো কাজের জন্য লোকদের পুরস্কৃত করেন!”—এ যে তোমাদেরই পবিত্র কোরআনের বাণী! অতএব হে বীর সেনানী, হয়তো তোমার এই অন্ধত্ব ও বধিরতার বুকেই সব শান্তি সব সুখ সুপ্ত রয়েছে! খোদা তোমায় শান্তি দিন!’ (কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/১৯৬-১৯৮)
নজরুল ইসলামের ‘ব্যথার দান’ গল্প হইতে আমার টুকিয়া লওয়া অংশটি বেশ চওড়া হইয়াছে। আমার ইচ্ছা দেখাই নজরুলের এই নায়ক ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী হইতে রুশ বিপ্লবের পক্ষে যোগ দিয়াছিল যে উদ্দেশ্যে তাহার নাম ‘বিশ্বের মঙ্গলকামনা’ আর ইহাতে তাঁহার ধর্মপরিচয় কোন বাধা হইয়া দাঁড়ায় নাই। বরং ধর্মগ্রন্থ হইতে ন্যায়ের পক্ষে দোহাই যোগাড় করা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হইয়াছে। নজরুল ইসলামকে বুঝিতে হইলে এসলামকে বাদ দেওয়া চলে না। কিন্তু এসলাম বলিতে কি বুঝায়? জিজ্ঞাসার কথা এইটাই। পরে যখন আমরা দেখিব নজরুল ইসলাম তুরস্কের জাতীয় বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়াইবেন তখনও তিনি সেই বিপ্লবের সহিত এসলাম ধর্মের কোন বিরোধাভাস দেখিতে পাইবেন না। দেশপ্রেম আর ‘বিশ্বের মঙ্গলসাধন’ তাঁহার চোখে এক আকার হইয়া গিয়াছে। একই কারণে আমরা দেখিব রুশ বিপ্লবের পরম সমজদার হইয়াও তিনি তুর্কিজাতির স্বাধীনতা যুদ্ধে মানে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে অকুণ্ঠ সমর্থন জানাইতেছেন। দুইয়ের মধ্যে কোন বিরোধ তিনি দেখিতে পাইতেছেন না। খোদ রুশ বিপ্লবের নায়কেরাও দেখিতে পান নাই। তাঁহারাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুযুধান নবীন তুরস্ক প্রজাতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়াছিলেন।
নজরুল ইসলামের ব্যথার দান নামা গল্প পুস্তকের আরেকটি গল্প ‘হেনা’। এই গল্পের নায়কের নাম ‘সোহরাব’। তিনিও বেলুচিস্তানের কোয়েটায় আছেন। ফিরিয়াছেন এয়ুরোপের যুদ্ধক্ষেত্র হইতে। সোহরাবের বয়ান: ‘আমাদের সব ভারতীয় সৈন্য দেশে ফিরে এল, আমিও এলুম। কিন্তু সে দুটো বছর কি সুখেই কেটেছে!’ সোহরাব জাতে আফগান, ধাতে ইংরেজ। তাঁহার এক দুঃখ। আফগান মেয়ে হেনার ভালোবাসা তিনি পান নাই। কিন্তু তাঁহার প্রাণ পড়িয়া রহিয়াছে অন্য কোথায়ও, অন্য কোনোখানে। সোহরাব জানাইতেছেন, ‘আমি “অফিসার” হয়ে “সর্দার বাহাদুর” খেতাব পেলুম। সাহেব আমায় কিছুতেই ছাড়বে না। হায়, কে বুঝবে আর কাকেই বা বোঝাব, ওগো আমি বাঁধন কিনতে আসিনি। সিন্ধুপারে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েও যাইনি। ও শুধু নিজেকে পুড়িয়ে খাঁটি করে নিয়ে—নিজেকে চাপা দিতে।… আবার এইখানটাতেই, যেখানে কখনো আসব না মনে করেছিলুম, আসতে হলো। একি নাড়ির টান!…’
এক্ষণে তিনি কাবুলে আছেন। সেখান হইতে জানাইতেছেন, আফগানিস্তানের বাদশাহ হাবিবুল্লাহ খান নিহত হইয়াছেন। সোহরাব উচ্চারণ করিলেন, ‘যখন মানুষের মতো মানুষ আমির হাবিবুল্লাহ খাঁ শহীদ হয়েছেন শুনলুম, তখন আমার মনে হলো এত দিনে হিন্দুকুশের চূড়াটা ভেঙে পড়ল! সুলেমান পর্বত জড়শুদ্ধ উখড়িয়ে গেল!’
‘ভাবতে লাগলুম, আমার এখন কি করা উচিত? দশ দিন ধরে ভাবলুম। বড়ো শক্ত কথা!’
‘নাঃ, আমিরের হয়ে যুদ্ধ করাই ঠিক মনে করলুম। কেন? এ “কেন”র উত্তর নেই। তবু আমি সরল মনে বলছি, ইংরেজ আমার শত্রু নয়। সে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।’ সোহরাব জানেন না কেন তিনি যুদ্ধে যাবেন। তবে একটা জিনিশ অন্তত তিনি জানেন। তাহাকে যুদ্ধে যাইতে হইবে। সোহরাব বলিতেছেন: ‘যদি বলি, আমার এবার এযুদ্ধে আসার কারণ একটা দুর্বলকে রক্ষা করার জন্যে প্রাণ আহুতি দেওয়া, তাহলেও ঠিক উত্তর হয় না।’
‘আমার অনেক খামখেয়ালির অর্থ আমি নিজেই বুঝি না।’
অর্থ বুঝিতে হইবে কেন? ‘খামখেয়ালি’ একটি শব্দ বিশেষ। অর্থ না থাকিলেও শব্দটি কিন্তু আছে। একালের মনোবিশ্লেষণ শাস্ত্রে তাহা ‘খাস’ বা রিয়াল নামে অভিহিত হয়। শেষ পর্যন্ত এই খামখেয়ালিরই জয় হইল। সোহরাবের বিবরণ এই রকম। সিদ্ধান্ত করিলেন তিনি যুদ্ধে যাইবেন। ‘কেন’র উত্তরও জুটিল। আমরা না হয় একটা কথা যোগ করিব এইখানে। যদি বলি সোহরাব ‘হেনা’র ভালোবাসার জন্য যুদ্ধে যাইতেছেন, তাহা হইলেও সঠিক উত্তর হইবে না। কিন্তু যুদ্ধে তিনি যাইতেছেনই।
‘আমি বললুম,—‘হেনা, আমিরের হয়ে যুদ্ধে যাচ্ছি। আর ফিরে আসব না। বাঁচলেও আসব না!’
‘সে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললে,—‘সোহরাব, প্রিয়তম! তাই যাও! আজ যে আমার বলবার সময় হয়েছে, তোমায় কত ভালবাসি!—আজ আর আমার অন্তরের সত্যিকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে ‘আশেক’কে কষ্ট দেব না। …’
‘আমি বুঝলুম, সে বীরাঙ্গনা—আফগানের মেয়ে। যদিও আফগান হয়েও আমি শুধু পরদেশির জীবন যাপন করেই বেড়িয়েছি, তবু এখন নিজের দেশের পায়ে আমার জীবনটা উৎসর্গ করি, এই সে চাচ্ছিল।’ (কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/২১০-২১২)
আমার প্রস্তাব এমত যে ‘ব্যথার দান’ এবং ‘হেনা’—আলোচনা মাত্র এই দুই গল্পে আটক রাখা ঠিক হইবে না। তবু আমরা এই জায়গায় আর অধিক লিখিব না। শুদ্ধ স্মরণ করিব মুজফফর আহমদ যাহা বলিয়াছেন তাহাই সহি। ‘১৯১৯ সালে নজরুলের “ব্যথার দান” গল্পে যে দেশপ্রেম ফুটে উঠেছিল তার জন্যে কলকাতার একটি প্রেস অন্তত গল্পটি ছাপাতে রাজী হয়নি। শুধু দেশপ্রেম নয়, নজরুল ইসলামের এই গল্পের ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিকতাও ফুটে উঠেছে। আমাদের সাহিত্যে [এটাও] একটা নূতন জিনিস বলতে হবে।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ১৬১-৬২)
মুজফফর আহমদের দ্বিতীয় প্রশ্ন দাঁড়াইয়াছিল রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজ নজরুল ইসলামের সহানুভূতি অর্জন করিয়াছিল কিনা। তিনি মনে করেন—করিয়াছিল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আসল কথা হচ্ছে এই রুশ দেশের অক্টোবর বিপ্লব ও লাল ফৌজের লড়াই নজরুল ইসলামের মনে সাড়া জাগিয়েছিল। তাই সে ইচ্ছা করেই বেলুচিস্তানকে তার গল্পের ঘটনাস্থল করেছিল। কারণ, বেলুচিস্তান হতে অনেক সহজে সোবিয়েৎ দেশের সীমানায় পৌঁছানো যায়।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ১৬৪)
সুশীল কুমার গুপ্ত এই প্রশ্নে একটি ঝগড়া বাধাইয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘কিন্তু নজরুল সে সময় তাঁর লেখায় “লাল ফৌজ” কথাটি ব্যবহার করলেও এবং “লাল ফৌজে”র মহৎ আদর্শের কথা তুলে ধরলেও একথা বলা বোধ হয় ঠিক নয় যে, তিনি সচেতন ভাবে রুশবিপ্লবের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন বা তার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।’ এই লেখকের ধারণা, ‘নজরুলের নায়কদের জীবনে বা চরিত্রে একমাত্র ব্যক্তিগত প্রেমের ব্যর্থতা ও নৈরাশ্য ছাড়া “লাল-ফৌজের” যোদ্ধাদের মতো কোন সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সজ্ঞান বিদ্রোহ নেই। তাদের যুদ্ধ নেহাতই আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাক্রান্ত ও রোমান্টিক ভাবালুতাময়।’ এখানেই থামেন নাই সুশীল গুপ্ত। তিনি অনুমান করিয়াছেন, ‘এমনও হতে পারে যে নজরুল বিপ্লবী বা সন্ত্রাসবাদী অর্থে “লাল” কথাটিকে “ফৌজের” আগে ব্যবহার করেছিলেন। “লাল নিশান”, “লাল পল্টন” ইত্যাদি কথা ব্যবহারের সময় তিনি বিপ্লব বা বিদ্রোহের প্রতীক হিসাবে “লাল” কথাটিকে গ্রহণ করতেন বলে মনে করা যেতে পারে।’ গুপ্ত মহাশয়ের এই অনুমান একেবারেই যে ফেলনা তাহা নহে। ১৯২১ সালের আগস্টে রচিত ‘রণভেরী’ কবিতায়ও ইহার খানিক প্রমাণ মিলিবে।
“ওরে আয়!
মোরা খুন্-জোশি বীর, কঞ্জুশি লেখা আমাদের খুনে নাই!
দিয়ে সত্য ও ন্যায়ে বাদশাহি মোরা জালিমের খুন খাই!
মোরা দুর্মদ, ভরপুর মদ
খাই ইশকের, ঘাত-শম্সের র্ফে নিই বুক নাঙ্গায়
লাল পল্টন মোরা সাচ্চা
মোরা সৈনিক, মোরা শহীদান বীর বাচ্চা,
মরি জালিমের দাঙ্গায়!
মোরা অসি বুকে পরি হাসি মুখে মরি জয় স্বাধীনতা গাই!
ওরে আয়
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়!!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১৩৯-১৪০)
শেষমেষ সুশীল বাবুর সিদ্ধান্ত দাঁড়াইয়াছে এই রকম: ‘মনে হয়—দুএকটি শব্দের ব্যবহার বা কোন ভাবাদর্শের কুয়াশাচ্ছন্ন অস্পষ্ট ইঙ্গিতের উপর ভিত্তি করে কবিমানসের বিচার করতে গেলে ভ্রান্তির সম্ভাবনাই বেশী। এসব ক্ষেত্রে ঘটনার আকস্মিক মিল ঘটাও বিচিত্র নয়।’ (সুশীল কুমার গুপ্ত ১৩৮৪: ৪৬)
আমরা সুশীল কুমার গুপ্তের এই মতটির পোষকতা করিব না। আমাদের বিচারে এই সিদ্ধান্তের সঠিক বিচার মুজফফর আহমদই করিয়াছেন। প্রশ্নটা হইতেছে রুশ বিপ্লবের প্রভাব নজরুল ইসলামের মনে (বা ‘মানসে’) পড়িয়াছিল কিনা। পড়িলেও বা তাহা কতটা গাঢ় ছিল? আমরাও মনে করি মুজফফর আহমদ যাহা অনুমান করিয়াছেন—রুশ বিপ্লবের দ্বারা নজরুল ইসলাম সত্যই প্রভাবিত হইয়াছিলেন—তাহা অস্বীকার করার উপায় নাই। আলোচনা হইতে পারে সেই প্রভাবের প্রকৃতি, ব্যাপ্তি কিম্বা ঘনত্ব লইয়া। আমরা পরের আলোচনায় দেখিব রুশ বিপ্লবের দ্বারা যতটা তিনি প্রভাবিত হইয়াছিলেন তাহার তুলনায় আরও বেশি প্রভাবিত হইয়াছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত তুর্কি বিপ্লবের দ্বারা। এই প্রভাবের প্রকৃতি লইয়া আলোচনা প্রকট করিলে দেখা যাইবে মুজফফর আহমদও কিছুটা ভুল করিয়াছিলেন। নজরুল ইসলামের মন দেখা যাইতেছে তিনিও ষোল কলায় বুঝিতে পারেন নাই। মুনিদেরও ভুল হইতে পারে। মুজফফর আহমদের হইবে না কেন? নজরুল ইসলাম যে তুর্কি প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের নায়ক মোস্তফা কামাল ওরফে কামাল পাশার আদর্শ কিছু পরিমাণে গ্রহণ করিয়াছিলেন সে কথা মুজফফর আহমদ অস্বীকার করেন নাই। তিনি শুদ্ধ আপত্তি করিয়াছিলেন একটা। নজরুল কেন ‘কামাল পাশা’ কবিতায় অকারণে আনোয়ার পাশাকে টানিয়া আনিতে গেলেন? কারণ তিনি জানেন, ‘কামাল পাশার তুর্কি রাজ্যের, সাম্রাজ্যের নয়, পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সহিত আন্ওয়ার পাশার এতটুকুও সংযোগ ছিল না।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৪)
আমরা সকাতরে নিবেদন করি নজরুল ইসলাম ‘কামাল পাশা’ কবিতায় ‘আনোয়ার’ নামটা অকারণে টানিয়া আনেন নাই। দুঃখের মধ্যে সেই কারণটা বুঝিবার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি মুজফফর আহমদেরও ছিল না। যাহাকে ‘খামখেয়ালি’ বলিয়াছেন সুশীল কুমার গুপ্ত, মুজফফর আহমদ তাহারই নাম রাখিয়াছেন ‘অকারণ’। পার্থক্যের মধ্যে এইটুকু। কিন্তু ইহা খামখেয়ালি যেমন নহে তেমন অকারণও ছিল না। ইহারই অপর নাম মনোবিশ্লেষণ শাস্ত্রে দাঁড়াইয়াছে ‘অজ্ঞান’। ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘আনকনসাস’।

কাজী নজরুলের রাজনৈতিক ধ্যানধারণা কোন বর্ণের ছিল তাহা লইয়া মতবিরোধ আছে। মুজফফর আহমদের সহিত সুশীল কুমার গুপ্তের বিবাদ তাহার উদাহরণ বিশেষ। বিবাদের বিষয় আরও আছে। ১৯৬৬ সালে ‘নজরুল রচনাবলী’ সম্পাদক কবি আবদুল কাদির এই বৈচিত্র্যের খানিক আভাস দিয়াছিলেন এইভাবে:
নজরুলের দেশাত্মবোধের স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা নানা জনে নানাভাবে করেছেন। রাজনীতিক পরাধীনতা ও অর্থনীতিক পরবশতা থেকে তিনি দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীন মুক্তি চেয়েছিলেন; তার পথও তিনি নির্দেশ করেছিলেন। সেদিনের তাঁর সেই পথকে কেউ ভেবেছেন সন্ত্রাসবাদ—কারণ তিনি ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে আহবান করেছিলেন; কেউ ভেবেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা—কারণ তিনি ‘চিত্তনামা’ লিখেছিলেন; কেউ ভেবেছেন প্যান-ইস্লামিজম্—কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন; আবার কেউ ভেবেছেন মহাত্মা গান্ধীর চরকা-তত্ত্ব—কারণ তিনি গান্ধীজীকে তাঁর রচিত ‘চরকার গান’ শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছিলেন। (আবদুল কাদির ১৯৬৬: পাঁচ)।
এই বিচিত্রবিধ পথের কোনটাই আগাগোড়া প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহার পথ ছিল না। আবদুল কাদিরের বক্তব্য, ‘কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে, এসব ভাবনার কোনোটাই সত্যের সম্পূর্ণ স্বরূপ উদঘাটনের সহায় নয়।’ আবদুল কাদিরের প্রস্তাব, ‘প্রকৃতপক্ষে নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রথম যুগে ছিলেন কামাল-পন্থী,—কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই তিনি ভেবেছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সর্বাপেক্ষা সমীচীন পথ।’ (আবদুল কাদির ১৯৬৬: পাঁচ)
প্রশ্ন করা যাইতে পারে এই জায়গায় ‘কামালপন্থী’ কথাটার অর্থ কি? এমন আড়ম্বর করিয়া তাহা ঘোষণা করিবারই বা আবশ্যক কি? কামাল—মানে নতুন তুরস্কের বড় নেতা মোস্তফা কামাল—কোন পথের পথিক ছিলেন? আসল প্রশ্ন এইটাই। এয়ুরোপের মহাযুদ্ধ প্রথম দফা শেষ হইবার পর পরাজিত ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ হইতে তুর্কিজাতির বাসভূমিটা আলাদা করিয়া রক্ষা করাই ছিল মোস্তফা কামালের এক নম্বর কীর্তি। তিনি সম্মুখ যুদ্ধে তুর্কিজাতির বাসভূমি আক্রমণকারী গ্রিক বাহিনীকে পরাজিত করেন। গ্রিক বাহিনীর পিছনে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তাই নব্য তুরস্কের এই জয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধোত্তর দুনিয়ার একমাত্র বিজয় বলিয়া অভিনন্দন লাভ করিয়াছিল। সারা দুনিয়াকে তাক লাগাইয়া দিয়াছিল। বাংলাদেশের একজন প্রধান মুসলমান লেখক কথাটা তখন এইভাবে বলিয়াছিলেন:
“মুসলমান-জগতের, বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানদের, আবেদন-নিবেদন, কান্না-অভিমান, হুঙ্কার আর আস্ফালন, যখন এক বিদ্রুপের চেহারা নিয়ে জগতের শক্তিমানদের সভায় মনোরঞ্জনের কার্যে ব্যাপৃত ছিল, তখন একদিন কামালের বজ্রহস্তে উদ্যত হলো তাঁর জন্মভূমির এককোণে নিরালায় শাণিত তলোয়ার। সেবারকার মতো শক্তিমানদের আরাম আর কৌতুকের উপর যবনিকা পতন হলো; আর মুসলমানজগত বিস্ময়, পুলক, আর তারীফের বন্যায় দিকহীন লক্ষ্যহীন হয়ে ভাস্তে লাগলো। আমাদের তরুণ কবির সেদিনকার যে প্রাণময় উচ্ছ্বাস—
‘কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই!’
সেদিন ঐ-ই ছিল আমাদের সকলেরই অন্তরের অন্তরতম কথা।” (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৩৬৭/১৯৮৮: ৫)

১৯২১ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে নতুন তুর্কি সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তিবাহিনী দখলদার গ্রিক বাহিনীকে পর্যুদস্ত ও অনেক দূর বিতাড়িত করিতে সক্ষম হয়। যতদূর জানা যায় নজরুল ইসলামের ‘কামাল পাশা’ তখন—তখনই রচিত হয়। এই কবিতার প্রকাশ ১৩২৮ বাংলার কার্তিক—মানে ১৯২১ ইংরেজির অক্টোবর—নাগাদ। এই সময় নব্য তুরস্কের বিজয় উলক্ষে কলিকাতায় যে আনন্দ মিছিল বাহির হইয়াছিল তাহাতে সুর করিয়া এই কবিতা গাওয়া হইয়াছিল। বাদ্য বাজিয়াছিল তালে তালে। সেই দৃশ্য দেখিয়াছিলেন ৪১ মির্জাপুর স্ট্রীটের বাসিন্দা পরকালের বিখ্যাত লেখক শ্রী নীরদচন্দ্র চৌধুরী। চুরাশি বছর বয়স পার হইবার পর লেখা তদীয় আত্মকথার দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি সেই দৃশ্য স্মরণ করিয়াছেন। নীরদবাবু লিখিয়াছেন:
“১৯২২ সালে মোস্তফা কামালের বিজয়োপলক্ষে রচিত নজরুলের একটি কবিতা আওড়াইতে আওড়াইতে মুসলমানদের একটি শোভাযাত্রা যাইতেছিল। আমি তাহা ৪১ নম্বর মির্জাপুর স্ট্রীটে আমার বাসার জানালায় দাঁড়াইয়া উপর হইতে দেখিতেছিলাম। দেখিয়া আমার কি রকম ঘৃণা যে হইয়াছিল তাহা ভাষায় প্রকাশ করিতে পারিতেছি না। কবিতাটা ছিল একটা সুদীর্ঘ প্রলাপ বিশেষ। দৈবক্রমে কামাল যদি কোনদিন এই প্রলাপটা পড়িবার সুযোগ পাইতেন, নিঃসন্দেহে পায়ের তলায় দিয়া দলামলা করিতেন। এই কবিতার একটা ধুয়া ছিল, ‘হুররো, হো, হুররো, হো, তু নে কামাল কিয়া ভাই!” (নীরদ সি. চৌধুরী ২০০৮: ১৪৮)
দেখা যাইতেছে কবি গাহিয়াই শেষ করিতে পারেন নাই। একদিকে যেমন বিস্ময়, পুলক আর তারিফের বন্যা অন্যদিকে তেমনি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও অবজ্ঞার কোপদৃষ্টি। তো এই কবিতার দোষটা কোথায়? নীরদচন্দ্র চৌধুরী ইহাকে বলিয়াছেন সুদীর্ঘ প্রলাপ বা অর্থহীন বকাবকি। ইংরেজিতেই তিনি লিখিয়াছেন। তাঁহার ব্যবহার করা শব্দ ‘রিগমারোল’। এই অর্থহীনতার দোষেই বুঝি মোস্তফা কামাল ইহা পায়ে দলিতেন! পরের বাক্যে অবশ্য নীরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁহার ঘৃণার প্রকৃত কারণটা উদ্ঘাটন করিয়াছেন। বলিয়াছেন, ‘ইহা তো বাংলা নহে, উর্দু—অবশ্য আবেগে আক্রান্ত হইলে বাঙ্গালিরা ইংরেজি অথবা উর্দু আর হিন্দিতে বুকনি ঝাড়িয়া থাকেন। ইহা সেই অভ্যাসের সহিত সংগত।’ ইংরেজি ভাষার পাঠককে তিনি জানাইয়াছেন ‘কামাল’ শব্দের অর্থ নিখুঁত বা বাহাদুর গোছের কিছু। মোস্তফা কামালের নামের সহিত এই অর্থের চমকটা লাগানো হইয়াছে এই কবিতায়। ইহা তো কৃতিত্বের মধ্যেই পড়িবে। যদি তাহাই হইয়া থাকে তবে মোস্তফা কামাল কেন ইহা পায়ে দলিবেন! আমি অধম। ইহার অর্থ উদ্ধার করিতে পারিতেছি না।
সকলেই জানেন রাগের মাথায় বাঙ্গালিরা কেন—দুনিয়ার প্রায় সকল মানুষই—উদ্ধৃতিতে ভুল করেন। নীরদবাবুও ইহার ব্যতিক্রম নহেন। এই কবিতার একজায়গায় দুই দুইবার ‘হুররো হো!’ ‘হুররো হো!!’ উচ্চারণের পর একটি চরণ ছিল এই রকম: ‘দনুজ দলে দল্তে এমনি দামাল কামাল চাই!’ এই চরণটার পরেই আছে:
“কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!!”
কে এই দনুজের দল? তাহাদের পরিচয় আর যাহাই হৌক, নবীন তুরস্কের মাটিতে তাহারাই হামলা করিতে আসিয়াছিলেন। তাহারা সৈনিক নামের অবমাননা বৈ নহেন। নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন:
“হিংসুটে ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ, আমরা মোটেই হইনি জের!
পরের মুলুক লুট করে খায় ডাকাত তারা ডাকাত!
তাই তাদের তরে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত!
কি বলো ভাই শ্যাঙাত!
হুররো হো!
হুররো হো!
দনুজ দলে দলতে দাদা এম্নি দামাল কামাল চাই।
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬/১:২৩)
পরের মুলুক যাঁহারা লুট করিয়া খান তাঁহারা সাম্রাজ্যবাদী। যাঁহারা লোভ করেন তাঁহারাও। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হইবার একটুখানি আগে এয়ুরোপের ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র গ্রিসও ব্রিটিশপক্ষে যোগ দিয়াছিল। তাঁহারাই প্রথম আগ্রাসী হইয়া পরাজিত তুরস্কের মাটিতে ভাগ বসাইতে আগাইয়া আসেন। পিছনে বিশ্বাসঘাতক ‘আলবিয়ন’ ওরফে গ্রেট ব্রিটেন দাঁড়াইয়া। তখন সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা ছিল তুরস্ককে খণ্ডবিখণ্ড করা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে এই পরিকল্পনা যিনি প্রণয়ন করিলেন সেই মহাশয়ের নাম আর্নল্ড জে. টয়নবি। ইতিহাসবিদ। নীরদচন্দ্র চৌধুরী ইঁহার বিশেষ অনুরাগী বটেন। বিখ্যাত বাঙ্গালি হিন্দু সাংবাদিক শংকর ঘোষ অনুমান করিয়াছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী নিজের নাম ইংরেজিতে লেখার সময় যে লেখেন নীরদ সি. চৌধুরী তাহা আর্নল্ড জে. টয়েনবির অনুকরণ বৈ নহে। (শংকর ঘোষ ২০১০: ৫৪)
তাহা যাহাই হৌক, নীরদবাবুর এক টুকরা অনুযোগ কিন্তু ষোল আনা অসত্যও নহে। ইহা কি বাংলা? না, উর্দু? ইহা কি! ইহা কি! ইহা বাংলা অক্ষরে বা হরফে ছাপা। তাহা তো চোখের সামনেই আছে। দেখিতে পাইতেছি। কিন্তু মাত্র কানে শুনিলে তো ইহা উর্দু মনে হইতেই পারে। পারে না কি!
“খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
বুজদিল্ ঐ দুশ্মন্ সব বিলকুল্ সাফ হো গিয়া!
খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
হুররো হো!
হুররো হো!
দস্যুগুলোয় সাম্লাতে যে এমনি দামাল কামাল চাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬/১: ২২-২৩)
উর্দুর এই অনাস্বাদিতপূর্ব প্রবেশ আর আর জায়গায়ও দেখা যায়। নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘কতকগুলি লোক অশ্রুপূর্ণ নয়নে এই দৃশ্য দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছিল। তাহাদের দেখিয়া সৈন্যগণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল।’
“মার দিয়া ভাই মার দিয়া!
দুশমন্ সব হার গিয়া!
কিল্লা ফতে হো গিয়া
পরওয়া নেহি, যা নে দো ভাই যো গিয়া
কিল্লা ফতে হো গিয়া!
হুররো হো!
হুররো হো!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/২৭)
প্রশ্ন উঠিয়াছে এই কবিতা অর্থহীন প্রলাপের সমষ্টি কিনা। উর্দু কি অর্থহীন? আপত্তিটা ঠিক উর্দুর বিরুদ্ধে তো নহে, আপত্তি বাংলার সহিত উর্দু মেশানোর মধ্যে। নজরুল ইসলাম এই অপরাধ শুধু ‘কামাল পাশা’ কবিতায় নহে আর আর রচনায়ও ঢের করিয়াছেন। খোদ এই কবিতাতেও তিনি ঢের খিচুড়ি পাকাইয়াছেন।

“আসমানের ঐ আঙরাখা
খুন-খারাবির রঙ মাখা
কি খুবসুরৎ বাঃ রে বা!
জোর বাজা ভাই কাহারবা!
হোক না ভাই এ কারবালা ময়দান—
আমরা যে গাই সাচ্চারই জয়-গান!
হোক না তোর র্কাবালা ময়দান!!
হুররো হো!
হুর রো—”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/২৫)
অথবা
“জোরসে চলো পা মিলিয়ে,
গা হিলিয়ে,
এম্নি করে হাত দুলিয়ে!
দাদ্রা তালে ‘এক দুই তিন’ পা মিলিয়ে
ঢেউএর মতন যাই!
আজ স্বাধীন এ দেশ! আজাদ মোরা বেহেশ্তও না চাই!
আর বেহেশ্তও না চাই!!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/২৭)
নজরুল ইসলাম যখন যুদ্ধে যোগ দিয়াছিলেন তখন যদি তাঁহাকে সত্য সত্যই যুদ্ধের ময়দানে লড়িতে হইত, তো তিনি লড়িতেন খুব সম্ভব কামালের দেশের সৈন্যদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া তিনি এমন করিয়া কামাল অর্চনা করিলেন শুরু কিভাবে? নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী হইতে বিদায় হইলেন মাত্র ১৯২০ সালের গোড়ায়—যতদূর জানা যায় তিনি ঐ বছরের মার্চ নাগাদ কলিকাতায় অবরোহন করিয়াছিলেন। নতুন তুর্কি সরকারের নেতৃত্বে তখন তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হইয়া গিয়াছে। খুব সংক্ষেপে লিখিতে হইলে এইটুকু লেখা যায়।
১৯১৮ সনের অক্টোবরে ব্রিটিশ বাহিনীর সহিত ওসমানিয়া তুর্কি সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির শর্তানুসারে ব্রিটিশ, ফরাশি ও ইতালি বিজয়ী শক্তিগুলি খোদ তুর্কিজাতির স্বদেশভূমির নানা অংশে হাত দিয়া বসিয়া থাকে। ক্ষুদ্র গ্রিক বাহিনীও পিছনে বসিয়া থাকিল না। তাঁহারা ১৯১৯ সনের মে মাসে তুরস্কের পশ্চিমাংশ দখল করিয়া লইলেন। এই দখল ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল ছিল। এই সময়টা নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সময়ও বটে। দেবতারা রসিক বটেন! মোস্তফা কামাল নতুন তুর্কি সরকারের রাষ্ট্রপতি হইলেন ১৯২০ সালের মে মাসে। (ফিরোজ আহমদ ২০০০: ৫০) আর নজরুল ইসলাম মার্চ মাসেই কলিকাতায় ফিরিয়াছিলেন। ১৯১৯ সালের মাঝামাঝি মোস্তফা কামাল পুরানা তুর্কি সরকারের চাকরি হইতে পদত্যাগ করিয়া নব্য তুর্কি সরকার গঠনের এন্তেজাম শুরু করিলেন। এই প্রতিরোধ সংগ্রামের কেন্দ্র হইল মূল তুর্কি ভূখণ্ড বা আনাতোলিয়ার একটু পূর্বদিকের একটি ক্ষুদে শহর। সেকালে বাংলায় লেখা হইত ‘আঙ্গোরা’। এখন আমরা লিখি আংকারা। ১৯২০ সনের মাঝামাঝি (১০ আগস্ট) ফরাশিদেশের পারী নগরের কাছের এক ক্ষুদে [সের্ব বা সেউর] শহরে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে তুর্কিজাতির স্বাধীনতা খর্ব করা হইল। তাহাতে সায় দিলেন ওসমানিয়া সুলতান। সার্বভৌমত্ব বিকাইয়া দেওয়ার দলিলে স্বাক্ষর করিয়া ওসমানিয়া বংশ আপনকার শাসনাধিকার আপনিই বিলোপ করিলেন। ১৯২০ সালের ১৬ মার্চ হইতে ব্রিটিশাদি মিত্র বাহিনী ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করে। ইহার পর তুর্কিজাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে গঠিত আংকারা সরকারকে কেন্দ্রে রাখিয়া আবর্তিত হইতেছিল। আংকারা সরকার তখন ব্রিটিশের সাহায্যে পরিচালিত গ্রিকজাতির অভিযান প্রতিরোধে লিপ্ত। ১৯২২ সনের আগস্ট মাস। প্রতিরোধ যুদ্ধ তখন তুঙ্গে উঠিয়াছে। জয় পরাজয় তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। তুর্কি সেনাপতি নূরি ইসমত পাশা তখন পর্যন্ত মাত্র দুই কি একটা উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করিয়াছেন। কিন্তু গ্রিক বাহিনী আনাতোলিয়ার বেশির ভাগ ভূমি দখলে নিয়াছে। তাহারা নব্য তুরস্কের রাজধানী আংকারার পঞ্চাশ মাইল পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত সাকারিয়া নদীর পারে পৌঁছিয়া ঘাঁটি গাড়িয়াছেন।
দুনিয়ার বিশেষ হিন্দের মুসলমান তখন দুই পক্ষ হইয়া গিয়াছে। একদল মোস্তফা কামাল ও জাতীয় সরকারের পক্ষে। অন্যদল সুলতান ওয়াহিদুদ্দিন আর ওসমানিয়া রাজবংশের পক্ষে। খিলাফত আন্দোলন নামে অভিহিত হিন্দি মুসলমানদের আন্দোলনেও ফাটল ধরিয়াছে। নজরুল ইসলাম ফাটলের বামপাশে দাঁড়াইয়া লিখিলেন ‘রণভেরী’। কবিতাটির কপালে রাজটিকা লিখিলেন তিনি: ‘গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্ণমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সইে যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত।’ এই কবিতায় মন যোগ করিয়া পড়িলেই দেখিবেন কপালে সাঁটা রাজটিকায় ছাড়া আর কোথায়ও কামাল পাশা বা তুর্কিজাতির নামলেশ পর্যন্ত নাই। আছে মাত্র ‘ইসলাম’, ‘মুসলমান’ আর ‘স্বাধীনতা’ সংবাদ। স্বাধীনতাই এই কবিতার মূল সুর: ‘মোরা অসি বুকে বরি হাসি মুখে মরি জয় স্বাধীনতা গাই’। আর ইহার ধুয়া: ‘ঐ মহা-সিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়’।
নজরুল ইসলামের কবিতায় ‘ইসলাম’ শব্দে শুনিয়া বা দেখিয়া যাঁহারা তাঁহাকে জনৈক মুসলমানের অধিক ভাবেন নাই তাঁহারা অভাগা। নীরদচন্দ্র চৌধুরী কিম্বা বা তাঁহার পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’ প্রভৃতি এই অভাগার বিশেষ উদাহরণ। নীরদবাবু এক স্থলে লিখিয়াছেন, ‘মোহিতবাবুর সহিত পরিচিত হইবার আগে হইতেই নবীন একটি বাঙ্গালি কবিকে অপছন্দ করিতে শুরু করিয়াছিলাম। ইঁহাকে তিনি আমার চাহিতেও ঢের বেশি অপছন্দ করেন একথা পরে জানিতে পারিয়াছিলাম। এই কবিটি জাতে মুসলমান, নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে মেসোপটেমিয়া রণাঙ্গনে ৪৯ নং বাঙ্গালি পল্টনের অন্তর্ভুক্ত সৈনিক হিসাবে সমরে অংশগ্রহণ করেন।’ (নীরদ সি. চৌধুরী ২০০৮: ১৪৮)
নীরদচন্দ্র চৌধুরী অকপট লেখক। তিনি কপট বলিয়া কখনও কাহারও নিন্দার মুখে পড়েন নাই। কথাটা তিনি সত্যই বলিয়াছেন। কিন্তু শ্রদ্ধার অভাব ঘটিলে মানুষের বিদ্যাও হ্রাস পায় বৈ কি। নজরুল ইসলাম যে কখনও মেসোপটেমিয়ার রণাঙ্গন পর্যন্ত পৌঁছিবার সৌভাগ্য অর্জন করেন নাই সেটা জানিবার সুযোগ নীরদবাবু লভিবেন কি করিয়া! বাংলা সাহিত্যের সেরা সবচেয়ে বড় মোটাসোটা ইতিহাসকার পণ্ডিত সুকুমার সেনও দেখি এই খবর রাখেন না। ঘৃণা ও অবজ্ঞার সহিত বিদ্যার সদ্ভাব থাকে না, রাখা কঠিন। (রফিকুল ইসলাম ২০১৩: ৪৫)
কিন্তু ঘৃণাই যেখানে চালিকাশক্তি সেখানে জোরের অভাব হয় না। নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখিয়াছেন, ‘এই পল্টনটি কোন কাজের সেনাবাহিনী হইয়া উঠে নাই। তাই যুদ্ধের পর ইহা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয়। নজরুল ইসলাম এই বাহিনীতে হাবিলদার পদ পর্যন্ত উঠিয়াছিলেন। মর্যাদায় ইহা সার্জেন্ট পদবীর সমান।’ (নীরদ সি. চৌধুরী ২০০৮: ১৪৮) নীরদবাবুর আপত্তি অন্য জায়গায়। সামান্য ‘হাবিলদার’ পদে চড়িয়া কি সাহস লোকটার! এই মাত্র বিদ্যা পুঁজি করিয়া ইনি তাঁহার কবিতায় কতগুলি সস্তা সামরিক হম্বিতম্বি (ক্ল্যাপট্র্যাপ) ব্যবহার করিতে উদ্যোগী হইলেন। শুদ্ধ কি তাহাই! সেকালের লোকজন এই সব সস্তা বাজিমাতের কৌশলকেই ধরিয়া লইলেন নবযুগের বিপ্লবী ভাবধারার প্রকাশ! এইসব করিয়া ইনি যুগের মন মজাইলেন। হুজুগ পড়িল ইঁহাকে লইয়া। নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলিলেন, ‘ভাষা ও ছন্দের ব্যবহারে তাঁহার কিছুটা অশিক্ষিত পটুত্ব আছে একথা মানিতেই হইবে। তাহা সত্ত্বেও আমার মনে হইয়াছিল ইনি ভারি ভাসাভাসা, বিশৃঙ্খল এবং মুখে ফেনাতোলা লোক বৈ নহেন।’ এতটুকু হইলেও না হয় সারিত। দুঃখের মধ্যে, নজরুলের আরও দোষ রহিয়াছে।
নীরদবাবু বলিয়াছেন, ‘আমি তাঁহাকে এমনিতেই ঘৃণা করিতাম। যেন এইটুকুই যথেষ্ট ঘৃণা জাগাইতে পারিতেছিল না। তিনি বিপ্লবী ভাবধারার নিশানা মনে করিয়া টর্পেড়ো আর মাইনের দোহাই দিতে লাগিলেন। ইহাতে যেন আমার ঘৃণার আগুনে ঘৃতের আহুতি দেওয়া হইল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গোড়ার দিকে খাস বা খাঁটি বাঙ্গালি বিপ্লবী ভাবধারা একবার জাগিয়া উঠিয়াছিল। আমি এমনকি সেই ভাবধারাকেও ছাড়াইয়া উঠিয়াছিলাম আর সেই পুরানা জিনিশের দুর্বল আর নকল সংস্করণ দিয়া আমার মন ভোলাইবে—ইহা তো আর হইবার নহে।’ (নীরদ সি. চৌধুরী ২০০৮: ১৪৮)
আহা, অভাগা নজরুল ইসলাম এদিকে ডাক দিতেছেন ওরে আয়, কে যাবি আয়!
“ওরে আয়!
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়—
ওরে আয়!
ঐ ইস্লাম ডুবে যায়!
যত শয়তান
সারা ময়দান
জুড়ি খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয়-গান শোন্ গায়!

আজ শখ করে জুতি-টক্করে
তোড়ে শহীদের খুলি দুশ্মন পায় পায়—
ওরে আয়!
তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!
অরে ঝঞ্ঝঝার ঝুঁটি দাপটিয়া শুধু মুসলিম-পঞ্জায়!
তোর মান যায় প্রাণ যায়—
তবে বাজাও বিষাণ, ওড়াও নিশান! বৃথা ভীরু সম্ঝায়!
রণ— দুর্মদ রণ চায়!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬/১: ৩৭)
মনে রাখিতে হইবে এই কবিতা লিখিবার সময় পর্যন্ত মোস্তফা কামাল তুরস্কের সুলতানকে সিংহাসনচ্যুত করেন নাই। আর খেলাফত অনুষ্ঠানের বিলুপ্তিটা আরও খানিক পরে হইবে। হিন্দি মুসলমানরা ধরিয়া লইয়াছেন মোস্তফা কামাল লড়াই করিতেছেন এসলাম রক্ষা করার জন্য। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ততদিনে অন্যদিকে মোড় লইয়াছে। তুরস্ককে রক্ষা করিতে হইবে। সামাল দিতে হইবে জাতীয় স্বাধীনতা। ইস্তাম্বুলের সুলতান যেমন মোস্তফা কামাল আর অন্যান্য নবীন নেতাকে একাধারে নাস্তিক ও দেশদ্রোহী ঘোষণা করিয়াছেন আর অন্যাধারে তাঁহাদের দণ্ডিত করিয়াছেন প্রাণদণ্ডে তেমনি নব্য তুরস্কও সুলতানের সুলতানি ক্ষমতা বাজেয়াপ্ত করিবেন। লড়াই তাহার শীর্ষশিখরে পৌঁছিয়াছে।
১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে যখন ‘কামাল পাশা’ প্রকাশিত হইতেছে তখন নজরুল ইসলাম অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা, বাহির করিতেছেন। ধূমকেতুর একটি সংখ্যায়—মধ্য অক্টোবর নাগাদ—নজরুল ইসলাম ‘কামাল’ নাম দিয়া একটি ক্ষুদে সম্পাদকীয় গোছের প্রবন্ধও ছাড়িলেন। এই প্রবন্ধ হইতে কয়েকটি শব্দ ও বাক্যাংশ মাত্র উদ্ধার করিয়া আবদুল কাদির ১৯৬৬ সনে রায় দিয়াছিলেন নজরুল ইসলাম রচনাবলীর প্রথম খণ্ডে সংগৃহিত অর্থাৎ লেখকের সেই যুগের লেখাগুলি একত্রে পাঠ করিলে তাঁহার প্রস্তাবিত উপপাদ্য সঠিক মনে হইবে। কিন্তু তাঁহার উদ্ধৃতিটা ছিল ভালোমতো পোকায় খাওয়া পাকা আমের মতন। এ আম খালি কুড়াইতেই সুখ! আবদুল কাদিরের উপপাদ্য ছিল এই দাবিটি: ‘কামাল আতাতুর্কের প্রবল দেশপ্রেম, মুক্ত বিচারবুদ্ধি ও উদার মানবিকতা নজরুলের এই যুগের রচনায় যে প্রভৃতি প্রেরণা যুগিয়েছিল তা বর্তমান [প্রথম] খণ্ডের লেখাগুলো একত্রে পাঠ করলে সম্যক উপলব্ধ হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।’ (আবদুল কাদির ১৯৬৬: পাঁচ)
আবদুল কাদির সেই কঠিন পাকিস্তানী জমানায় এই লেখাটার উল্লেখ করিয়া ভালো রকমের একটা সাহসের সমাচার প্রেরণ করিয়াছিলেন। তবে সাহসটা ভালোমত দেখাইতে পারেন নাই। উদ্ধৃতিতে তিনি যতটা দেখাইয়াছিলেন তাহার অধিক লুকাইয়াও রাখিয়াছিলেন। নজরুল ইসলাম যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা দাহ্য পদার্থ বলিয়া গণ্য। ১৯২০ দশকের গণ্যমান্য মুসলমানেরা তাঁহাকে ‘ধর্মদ্রোহী’ ও ‘কাফের’ ইত্যাদি মনোহর উপাধি দিয়াছিলেন। ‘কামাল’নামা প্রবন্ধ যোগে নজরুল ইসলাম মোস্তফা কামালের প্রশস্তি গাহিলেন এইভাবে: ‘যাক, এতদিনের পর একটা ছেলের মতো বেটাছেলে দেখলাম। এমন দেখা দেখে মরতেও আর আপত্তি নাই।’
নজরুল বিশদ করিলেন, কেন মরিতেও আর আপত্তি নাই: ‘বিশ্বে যখন, যেদিকে ফিরাই আঁখি, কেবল মাদিই দেখি’ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সইে সময় মদ্দা পুরুষ কামাল এল তার বিশ্বত্রাস মহা তরবারি নিয়ে সামাল সামাল করে রোজ কিয়ামতের ঝঞ্ঝার মতো, রুদ্রের মহারোষের মতো। অত্যাচারীর মুখে গোখরো সাপের বিষাক্ত চাবুক মেরে মুখ ছিঁড়ে ফেললে খ্যাপা ছেলে। ঘুষি মেরে তার মুখটা ঘুরিয়ে দিলে, পেঁদিয়ে তিন ভুবন দেখিয়ে দিলে।’ মোস্তফা কামালের বিজয়ে উল্লসিত নজরুল ইসলাম আপনকার স্বভাবসিদ্ধ রূপকেই বলিলেন: ‘ইচ্ছা করছে, খুশির চোটে তার পায়ের কাছে পড়ে নিজের বুকে নিজেই খঞ্জর বসিয়ে দিই।’ কেন এই আত্মহননের ইচ্ছা? এই ইচ্ছা আনন্দের। পথ হারাইয়া পথিক যখন আবার পথ খুঁজিয়া পায় তখন বুঝি বা এমনই আনন্দ হয়!
“আজাদ মানুষ বন্দী করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,
কুুল্ মুলুকে কুষ্টি করে জোর দেখালে ক’দিন বেশ,
মোদের হাতে তুর্কি-নাচন নাচ্লে তাধিন্ তাধিন শেষ!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/২৪)
এই স্বাধীনতার অকালবোধনই—নজরুল ইসলামের মতে-‘সত্য “মুসলমান”। ইহা মোস্তফা কামালেরই অপর নাম। তিনি লিখিলেন আরও একটু: ‘এই তো সত্যিকারের মুসলিম। এই তো ইসলামের রক্ত-কেতন।’
“দাড়ি রেখে গোশত খেয়ে নামাজরোজা করে যে খিলাফত উদ্ধার হবে না, দেশ উদ্ধার হবে না, তা সত্য মুসলমান কামাল বুঝেছিল, তা নাহলে সে এতদিন আমাদের বাঙলার কাছা-খোলা মোল্লাদের মতন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কাছা না খুলে কাবার দিকে মুখ করে হর্দম ওঠবোস্ শুরু করে দিত। কিন্তু সে দেখলে যে বাবা, যত পেল্লাই দাড়িই রাখি আর ওঠবোস্ করে যতই পেটে খিল ধরাই, ওতে আল্লার আরশ কেঁপে উঠবে না। আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হাইদরি হাঁক হাঁকা চাই, মারের চোটে স্রষ্টারও পিলে চমকিয়ে দেওয়া চাই। ওসব ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে ইসলামের উদ্ধার হবে না—ইসলামের বিশেষ তলোয়ার, দাড়িও নয়, নামাজ-রোজাও নয়।” (কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৮: ৭/১৯)
হিন্দুস্তানের মুসলমান—বিশেষ বাঙালি মুসলমান—নজরুল ইসলামের এই অভিব্যক্তি সহজ মনে লয়েন নাই। একজন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখিয়া জানাইলেন, ‘লোকটা শয়তানের পূর্ণাবতার। ইহার কথা আলোচনা করিতেও ঘৃণা হয়। দুর্মতি তারপর মোটা মোটা হরফে ছাপিয়েছে—“ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার’, দাড়িও নয়, নামাজ-রোজাও নয়।”’ (মুস্তফা নূরউল ইসলাম ১৯৮৩: ১৮)
মুনশী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ নামের এই লেখক মহাশয়টি ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকাযোগে সিদ্ধান্ত করিলেন, ‘এইরূপ ধর্মদ্রোহী কুবিশ্বাসীকে মুসলমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না, [সে] পুনর্জন্ম বিশ্বাসী কাফের বলিয়াই পরিগণিত হইবে।’ এই ধরনের সিদ্ধান্তই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রকটিত হইলে ‘ফতোয়া’ বলিয়া গণ্য হয়। কাজী নজরুল ইসলাম তো ইঁহাদের চোখে জনৈক নিতান্ত ‘বসরা-প্রত্যাগত উদ্দাম যুবক’ ‘হাবিলদার’ মাত্র। খোদ স্মার্নাবিজয়ী তুর্কি সেনাপতি মোস্তফা কামালও কিন্তু ইঁহাদের হাত হইতে নিস্তার পান নাই। হিন্দি মুসলমানজগতের সমস্যার একপ্রস্ত সারমর্ম কাজী আবদুল ওদুদ সেই ১৯২৫ সালেই লিখিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন, ‘কিন্তু বিধাতা যে নীরব উপহাসে আমাদের সেদিনকার সমস্ত মুগ্ধতা উপভোগ করছিলেন সে কথা কি আর আমরা ভাবতে পেরেছিলাম। তুর্ক সুলতানের সিংহাসন-চ্যুতি, কামালের পত্নীর পর্দাহীনতা, এবং তাঁর এরকম আরো ছোট-খাটো ‘অনৈসলামিকতা’র ভিতর দিয়ে ক্রমে আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা শুরু হলো।’
কামালের কীর্তি যখন আরো বিস্তৃত হইল, তখন এই পরীক্ষার্থী মুসলমানদেরও আরো কঠোর কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হইতে হইল। কাজী আবদুল ওদুদ লিখিতেছেন, ‘যুগধর্ম অর্থশূন্য নয়; আমাদের অশেষ গৌরব-আর আশা-ভরসা-স্থল কামালের এই সব অনাচার নীরবে সহ্য করে যাওয়া হয়তো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হতো না। কিন্তু অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস! যাঁর হাতে আমাদের নষ্ট গৌরবের পুনরুদ্ধার হবে বলে আমরা সর্বান্তকরণে আশা করেছিলাম, তিনিই ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন আমাদের বহু স্বপ্ন বহু অশ্রু দিয়ে গড়া খেলাফত!’ এখানেই শেষ নহে। মোস্তফা কামালের অপরাধ আরও আছে। ‘শুধু তাই নয়; সমাজের শীর্ষস্থানীয়, যুগে যুগে পুঞ্জীভূত শাস্ত্র জ্ঞানের যাঁরা ডাক্তারাী, সেই আলেম সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর যে দৃষ্টি তা আদৌ শ্রদ্ধাবিনম্র নয়। আর তাঁর যোদ্ধার কঠোর হস্ত নিপাতিত হয়েছে মুসলিম নারীর সুপবিত্র, সুবিহিত, যুগযুগান্তরাগত অবরোধের উপরে!’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৩৬৭/১৯৮৮:৫)


কাজী নজরুল ইসলামের ‘কামাল পাশা’ কবিতা বিষয়ে মহাত্মা মুজফফর আহমদেরও একপ্রস্ত আপত্তি আছে। তিনি লিখিয়াছেন: ‘“কামাল পাশা” নজরুল ইসলামের একটি অভূতপূর্ব সৃষ্টি। বাঙলা ভাষায় এর কোনো তুলনা তো নেই-ই, ভারতের আর কোনো ভাষায় আছে বলেও আমি শুনিনি। কিন্তু এই কবিতায় কবির অন্তত একটি স্বেচ্ছাকৃত বিচ্যুতি আছে।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৪)
নজরুল ইসলাম কামাল পাশা রচনা করেন ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে। ইহা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আগেকার—অন্তত দুই কি আড়াই মাস আগেকার—লেখা। কামাল তখন লড়াই করিতেছেন দখলদার গ্রিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। নব্য তুরস্কের তিনিই তখন প্রধান নেতা। মোস্তফা কামালের সংগ্রামটা কত কঠিন ছিল তাহা বুঝিতে হইলে কতকগুলি সত্য মনে রাখার অন্যথা নাই। ১৯২০ সালের ১১ এপ্রিল নাগাদ ইস্তাম্বুল সরকারের আজ্ঞাহীন প্রধান মুফতি বা ‘শেখুল এসলাম’ আবদুল্লাহ এফেন্দি জাতীয় সরকারের নেতাদের মুরতাদ বা ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করেন এবং ১১ মে তারিখে মোস্তফা কামাল এবং আর আর জাতীয় আন্দোলন পরিচালক নেতাদের (সামরিক আদালতের বিচারে) অনুপস্থিতিতে প্রাণদ- দেওয়া হয়।
এই সময়ে তুরস্কের পাশের দেশ গ্রিসের নেতারা মূল তুর্কি ভূখণ্ড বা আনাতোলিয়া দখল করিতে শুরু করিলেন। আগ্রাসী গ্রিকদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যস্থতায় মাত্র মোস্তফা কামাল নতুন তুরস্কের অবিসম্বাদিত নেতা হইয়া উঠিলেন। ১৯২০ সালে গ্রিক বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা দেওয়ার মতন শক্তি তুর্কিদের ছিল না। গ্রিকরা আনাতোলিয়ায়—অর্থাৎ এশিয়া মাইনরে—ও রুমেলিয়ায়—অর্থাৎ এয়ুরোপখণ্ডে—দুই জায়গাতেই তুর্কিজাতির জাতীয় বাসভূমির বড় একটা অংশ দখল করিয়া লয়। তুর্কিজাতির প্রতিরোধ সংগ্রাম সফল হইতে শুরু করিল মাত্র ১৯২১ সনের গোড়ায়। ঐ বছরের ১০ জানুয়ারি তারিখে সেনাপতি ইসমতের নেতৃত্বে তুর্কি যোদ্ধারা ‘ইনোয়নু’ নামক যুদ্ধক্ষেত্রে গ্রিকদের প্রথম পরাজিত করিলেন। ৩১শে মার্চ—৪ঠা এপ্রিল একই স্থানে আরো একবার গ্রিকরা পরাজিত হইলেন।
জুলাই মাসে গ্রিকরা আবারও হামলা করিলেন। তুর্কিরা বাধ্য হইলেন পিছু হটিতে। শেষ পর্যন্ত সাকারিয়া নামক বিখ্যাত নদীর তীরে উভয় পক্ষ মিলিত হইলেন। ২৪শে আগস্ট জঙ্গ শুরু হইল। এই যুদ্ধ প্রায় তিন সপ্তাহ চলিয়াছিল। এইবার তুর্কি বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খোদ মোস্তফা কামাল। তুর্কিজাতির বিজয় হইল। নতুন তুরস্কের বড় জাতীয় পরিষদ—বুয়ুক মিল্লি মজলিশি—মোস্তফা কামালের নামের আগে ‘গাজি’ উপাধি যোগ করিলেন। সাকারিয়ার যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া তুর্কিজাতির নতুন সরকার হারানো জাতীয় গৌরব আবার কিছু পরিমাণে ফিরাইতে সক্ষম হইলেন। গ্রিকরা হটিয়া একটু পিছনে সরিলেন বটে, কিন্তু আনাতোলিয়া ছাড়িলেন না। ১৯২২ সালের আগস্ট মাসে শেষ যুদ্ধ হইল। আর সেপ্টেম্বর মাসের ৯ তারিখ নাগাদ গ্রিক বাহিনীর সর্বশেষ সৈনিক ‘স্মার্না’—বর্তমান নাম ইজমির—ত্যাগ করিল। পুরা আনাতোলিয়া বিদেশি সৈন্যের দখলমুক্ত হইল।
নজরুল ইসলাম ‘কামাল পাশা’ কবিতাটি লিখিয়াছিলেন সাকারিয়ার যুদ্ধে কামাল পাশার বিজয়ের পর। তাহার কিছু আগে—খুব সম্ভব সেপ্টেম্বর নাগাদ—তিনি ‘আনোয়ার’ নামে একটি কবিতাও লিখিয়াছিলেন। ইহারও এক মাস মতো আগে লেখা হইয়াছিল ‘রণভেরী’। লিখিত হইয়াছিল ‘গ্রীকদের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্নমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইয়াতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া’। এই সময় এয়ুরোপে স্বেচ্ছানির্বাসিত তিন তুর্কি নেতা—যাঁহারা ১৯০৮ সালের বিপ্লবযোগে এতদিন পর্যন্ত দেশ শাসন করিতেছিলেন—তাঁহারা কি করিতেছিলেন? প্রথমে জার্মানিতে আশ্রয় চাহিলেন তাঁহারা। কিন্তু জার্মানির পক্ষে তাঁহাদের রাজনৈতিক তৎপরতায় সমর্থন দেওয়ার সামর্থ্য ততদিনে আর অবশিষ্ট ছিল না। তাঁহাদের মধ্যে একজন—জ্যেষ্ঠ নেতা তালাত পাশা—জার্মানিতেই থাকিয়া গেলেন আর জনৈক আর্মানি আততায়ীর হাতে প্রাণ হারাইলেন। বাকী দুই নেতা বিপ্লবোত্তর রুশদেশে চলিয়া আসিলেন। একজন রুশ সরকারের সাহায্যে জাতীয়তাবাদী তুরস্কের সহিত কাজ করিতে রাজি হইলেন। তিনি—জামাল পাশা—পথিমধ্যে আর্মেনিয়বি আততায়ীর গুলিতে হত হইলেন। দ্বিতীয় জন আনোয়ার পাশা সোবিয়েত রাশিয়ার সাহায্য লইয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করিতে চাহিলেন। কথা দিলেন জার সরকারের আমলে মধ্য এশিয়া—বিশেষ তুর্কিস্থান—অঞ্চলের যে সকল মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্য রুশদেশের অধীনস্থ প্রদেশ সেখানে তিনি কাজ করিবেন। রুশ বিপ্লবী সরকার অনুমতিও দিলেন তাঁহাকে।
মনে রাখিতে হইবে বিপ্লবী রুশ সরকার তখন মোস্তফা কামালের সরকারকে পুরাদমে সাহায্য করিতেছেন। সাকারিয়ার যুদ্ধে জয়ের চারি-পাঁচ মাস আগে—১৯২০ সালের মার্চে—রুশ সরকার আংকারা তুর্কি সরকারের সহিত মিত্রতার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আনোয়ার যদি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশের বাহির হইতেও কামালকে লড়াই চালাইতে সাহায্য করেন তবে তাঁহাকে সাহায্য করিতেও দোষ নাই। মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলিকে বিপ্লবী রুশ সরকারের মিত্র করিয়া রাখিতে অথবা তাহাদিগের সহিত হাত মিলাইয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করিতে পারিলে নবজাগ্রত তুর্কিজাতির স্বাধীনতা সংগ্রামকেই আগাইয়া নেওয়া হয়। আনোয়ার পাশা রুশ বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন না। কিন্তু রুশ সরকারের সহায়তা তাঁহার দরকার ছিল। একইভাবে বলা যায়, বিপ্লবী রুশ সরকারও প্যান-ইসলাম কি প্যান-তুর্কি মতবাদের সমর্থক ছিলেন না। তবে আনোয়ার পাশার উপস্থিতিকে তাঁহারাও স্বাগত জানাইয়াছিলেন। প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁহার স্মৃতিকথায় লিখিয়াছেন, ‘প্যান-ইসলামবাদকে বিপ্লবের সম্ভাব্য মিত্র ধরিয়া লওয়া ছিল সরকারের অনুসৃত নীতি।’ (মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৮৪: ৪৪০)
মুজফফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘তুর্কিস্থানে তখন বিশৃঙ্খলা চলেছিল। আন্ওয়ার পাশা সোবিয়েৎ গবর্নমেন্টের নিকট ইচ্ছা প্রকাশ করলেন যে তিনি তুর্কিস্থানে গিয়ে সেখানকার অবস্থা শান্ত করতে চান। সোবিয়েৎ সরকার তাঁকে তাসকন্দ যাওয়ার অনুমতি দিলেন, কিন্তু খুব কড়া নজর রাখলেন তাঁর ওপরে। আন্ওয়ার পাশার ইচ্ছা ছিল যে তাঁর ছয় শ বছর আগেকার পিতৃভূমিতে এই সুযোগে তিনি একটি তুর্কি রাজ্য স্থাপন করে নিবেন। তিনি তলে তলে প্রতিক্রিয়াশীল মুল্লা ও বে’দের (জমীদারদের) সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন এবং একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন নবগঠিত তুর্কিস্থান রিপাবলিকের বিরুদ্ধে। সেই যোদ্ধৃবেশে মারা গেলেন আন্ওয়ার পাশা।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৫)
মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সাক্ষ্য অনুসারে, আনোয়ার পাশার এই উধাও হওয়া ব্যাপারটির সহিত আফগানিস্তানের বাদশাহ আর বোখারার আমিরও জড়িত ছিলেন। বোখারার আমির নিজেও উধাও হইয়াছিলেন আর আফগান বাদশাহও কাবুলে আশ্রিত ভারতীয় বিপ্লবীদের বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। ততদিনে মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখিয়াছেন, ‘নয়াদিল্লীর সহিত সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য কাবুল ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল।’ (মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৮৪: ৪৪৩)
এই সমস্ত ঘটনার পিছনে মানবেন্দ্রনাথ রায় ব্রিটিশ সরকারের হাত আবিষ্কার করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ১৯২২ সাল নাগাদ বিপ্লবী-তুর্কিস্থান প্রজাতন্ত্রের লালফৌজের হাতে ‘যখন বিদ্রোহী তুর্কিস্থানীদের শেষ ঘাঁটির পতন ঘটিল তখন যুদ্ধের ময়দানে আনোয়ার পাশার মৃতদেহ পাওয়া যায়। তাঁহার পরিধানে ছিল ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তার উর্দি।’ (মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৮৪: ৪৪৪)
এখানে একটি প্রশ্ন থাকিয়াই যাইতেছে। আফগানিস্তানের বাদশাহ আমানুল্লাহ একদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়িয়াছেন। এক্ষণে তিনিও তাঁহাদের সহিত হাত মিলাইতেছেন। তুর্কিস্থানের মুসলমান মোল্লা আর আমিরেরা ব্রিটিশের মিত্র হইয়া উঠিলেন। আর খোদ আনোয়ার পাশাও—যিনি ব্রিটিশের হাত হইতে বাঁচিবার জন্য একবার জার্মানি আরবার রুশদেশ করিতেছেন তিনিও—ব্রিটিশের সহিত হাত মিলাইতেছেন। এই রাজনীতি বড় কঠিন! ইহার সহিত নজরুল ইসলাম যদি আঁটিয়া উঠিতে না পারেন তাহাকে কি ‘স্বেচ্ছাকৃত বিচ্যুতি’ বলা যায়?
আরও একটি কথা। এসলাম, ওসমানিয়া সাম্রাজ্য আর তুরস্ক—এই তিনটা কথার তাৎপর্য তখনও খুব স্পষ্ট হয় নাই। তুরস্কের বাসিন্দা তুর্কিরা তখন পর্যন্ত নিজেদের পরিচয় কখনও দিতেন ‘মুসলমান’ আবার কখনও দিতেন ‘তুর্কি’। ১৯১৯-১৯২০ সালে তাহারা যে নতুন ‘জাতীয় চুক্তিপত্র’ ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহাতেও বলা হইয়াছিল ধর্ম, জাতি ও লক্ষ্য—এই তিন বিচারে ‘ওসমানিয়া সাম্রাজ্যভুক্ত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণই’ নতুন তুরস্কের স্বাধীনতা দাবি করিতেছে। (বার্নার্ড লুইস ২০০২: ৩৫২)
এই অবস্থায় নজরুল ইসলাম যদি মনে করিয়া থাকেন আনোয়ার পাশাও কামাল পাশার সংগ্রামে দূর হইতে সহায়তা করিতেছেন তবে তাঁহাকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না। মনে রাখিতে হইবে নজরুল ইসলাম কবিতাটি যখন লিখিতেছেন তখনও আনোয়ার পাশা জীবিত এবং লালফৌজের আশ্রয়ে আছেন। তিনি রুশদেশের লালফৌজের বিরুদ্ধে লড়িতেছেন বলিয়া কোন প্রমাণ জাহির হয় নাই। মুজফফর আহমদ জানাইতেছেন, ‘১৯২১ সালে নজরুল যখন “কামাল পাশা” রচনা করল (এটা ‘বিদ্রোহী’র আগেকার রচনা) তখন আমি ওপরে যত খবর দিলাম অত খবর জানতাম না।’ জানিবেন কি করিয়া? আনোয়ার পাশা তখনও মারা যান নাই। তিনি আরও লিখিতেছেন, ‘তবে, নানান খবরের কাগজের মারফতে, বিশেষ করে উর্দু খবরের কাগজের মারফতে এতটা আমরা নিশ্চিত জানতাম যে কামাল পাশার সঙ্গে আন্ওয়ার পাশা নেই। আমি নজরুলকে বললাম যে তার “কামাল পাশা” কবিতা তুলনাহীন। কেন সে মিছামিছি এমন একটি কবিতায় আন্ওয়ার পাশাকে টেনে আন্ছে? যিনি সত্য সত্যই কামাল পাশার পক্ষে নেই। কিন্তু নজরুল তার এই মহান সৃষ্টিতে আন্ওয়ার পাশার নামটি ছুঁইয়ে রাখবেই!’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৫-৩১৬)
আমরা অন্য কাহিনী—সবিনয়ে—নিবেদন করিতেছি। ‘মিছামিছি’ বা ‘অকারণ’ শব্দ দুটিকে গ্রিক ভাষায় বলে ‘সুম্বল’। ইংরেজি ‘সিম্বল’ (Symbol) এই গ্রিক শব্দেরই অপভ্রংশ বিশেষ। উচ্চারণটাই শুদ্ধ আলাদা। আমাদের চট্টগ্রামের বাংলায়ও ‘সুম্বল’ শব্দের অর্থ ‘মিছামিছি’ বা ‘অকারণ’ বটে। সংস্কৃত বাংলায় আমরা যাহাকে ‘প্রতীক’ বলি আর কি! ‘কামাল পাশা’ কবিতায় ‘আনোয়ার’ আসিয়াছেন প্রতীক আকারে, অর্থাৎ অকারণে বা মিছামিছি। কবিতায় এই ‘মিছামিছি’ জিনিশটাও একটি বড় কারণ বটে!
মোস্তফা কামাল যে বিজয় লাভ করিয়াছেন তাহা বিজয় বলিয়া গণ্য হইবে না যতদিন পর্যন্ত না তাহা অপরপক্ষের স্বীকৃতি লাভ করে। আনোয়ার পাশাকে টানিয়া আনিবার কারণ আর কিছু নহে, এই স্বীকৃতি হাজির করা। ‘কামাল পাশা’ কবিতার উপসংহারে আনোয়ারের উপস্থিতি এই উপপাদ্যকেই প্রবল করে। আহা, কবিত্বের দোষ মহাত্মা মুজফফর আহমদকে দেখিয়াছি স্পর্শই করে নাই! একটু বিবেচনা করা যাউক। এই কবিতা নাটকের উপান্তের পূর্ব প্রান্তে নজরুল ইসলাম নির্দেশ করিতেছেন: ‘নিহত সৈন্যদের নামাইয়া রাখিয়া দিয়া সেতু পার হইয়া আবার জোরে মার্চ করিতে করিতে তাহাদের [কুচকাওয়াজরত সৈন্যদের] রক্ত গরম হইয়া উঠিল।’ তাহারা গাওয়া শুরু করিলেন।
“ঠিক বলেছ দোস্ত তুমি!
চোস্ত কথা! আয় দেখি—তোর হস্ত চুমি!
মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের?
আব-জম্-জম্ আনলে এরা, আপনি পিয়ে কল্সি বিষের!
কে মরেছে? কান্না কিসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপ্নারি জান শেষ করেছে!
বেশ করেছে!!
শহীদ ওরাই শহীদ!
বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে খুন ওদেরি লোহিত!
শহীদ ওরাই শহীদ!!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/৩০)
নজরুল ইসলাম নির্দেশ করিতেছেন, ‘এইবার তাহাদের তাম্বু দেখা গেল। মহাবীর আনোয়ার পাশা বহু সৈন্যসামন্ত ও সৈনিকদের আত্মীয়-স্বজন লইয়া বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন দেখিয়া সৈন্যরা আত্মহারা হইয়া “ডবল মার্চ” করিতে লাগিল।’ সৈন্যরা গাহিতে থাকিল:
“হুররো হো!
হুররো হো!!
ভাই-বেরাদর পালাও এখন! দূর রহো! দূর রহো!!
হুররো হো! হুররো হো!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/৩১)
এমন সময় সৈন্যরা ‘কামাল পাশাকে কোলে করিয়া নাচিতে লাগিল’। তাঁহাদের বাণীটি কিন্তু বেশ শুনিবার মতন। যদিও আমার ভয় হইতেছে মহাত্মা মুজফফর আহমদ কথাগুলি বড় কান পাতিয়া শোনেন নাই। সৈন্যরা বলিতেছিলেন, ভাই-বেরাদর, আপনারা পালান এখন! ‘দূর রহো! দূর রহো!!’ মানে ‘তফাত যাও’, ‘তফাত যাও’। এই আওয়াজের সহিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে শোনা ‘সব ঝুটা হ্যায়, সব ঝুটা হ্যায়’ আওয়াজের দূরাগত মিলটা যাহার কান আছে তাহার প্রাণে না বাজিয়া যাইতে পারে না।
একটু পরে শুনি তাহারই প্রতিধ্বনি। ইহার অর্থও একই রকম। ‘সব কুছ আব দূর রহো!’ ‘হুররো হো! হুররো হো!!’ আনোয়ারকেও সৈন্যরা এই পয়গামই দিতেছে। কান পাতিলেই শোনা যাইবে।
“হৌ হৌ হৌ! কামাল জিতা রও!
কামাল জিতা রও!
ও কে আসে? আনোয়ার ভাই?—
আনোয়ার ভাই! জানোয়ার সব সাফ
জোর নাচো ভাই! হর্দম দাও লাফ!
আজ জানোয়ার সব সাফ!
হুররো হো! হুররো হো!!”
এই কবিতায়—যেমন সত্য সত্য ইতিহাসেও—শেষ আদেশ দিলেন মোস্তফা কামালই। আহতদের নামাইতে নামাইতে সৈন্যরা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কে ভাই? হাঁ হাঁ; সালাম!’ তাহাদের শেষ কথা, ‘ঐ শোন শোন্ সিপাহ্-সালার কামাল ভাই-এর কালাম।’ ‘সেনাপতির অর্ডার আসিল’—
“সাবাস! থামো! হো! হো!
সাবাস! হল্ট! এক! দো!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/৩১)
মুজফফর আহমদও প্রকারান্তরে ইহা কবুল করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘নজরুল যখন “কামাল পাশা” কবিতাটি রচনা করেছিল তখনও কামাল পাশা পরিপূর্ণরূপে জয়লাভ করেননি। কবিতাটি কিন্তু তাঁর জয়লাভেরই কবিতা। কামাল পাশা গ্রীকদের বিরুদ্ধে তাঁর শেষ অভিযান আরম্ভ করেছিলেন ১৯২২ সালের ১৮ই আগস্ট তারিখে এবং ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখে পূর্ণরূপে বিজয়লাভ করেন।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৬)
মুজফফর আহমদ ঠিকই লিখিয়াছেন। খুঁটিনাটির মধ্যে, গ্রিক-তুর্কি সমরের এই তৃতীয় পর্বটি শুরু হইয়াছিল ঠিক ১৮ আগস্ট নহে, কয়েকদিন পরে, ১৯২২ সালের ২৬ আগস্ট নাগাদ। প্রায় তিনশত মাইল বিস্তৃত দীর্ঘ যুদ্ধরেখার এক জায়গায় মোস্তফা কামাল গ্রিক বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করিলেন। জায়গাটির নাম দুমলপিনার। ৯ই সেপ্টেম্বর নাগাদ তিনি স্মার্না ওরফে ইজমির দখলে লইলেন। আনাতোলিয়া শত্রুমুক্ত হইল। (বার্নাড লুইস ২০০২: ২৫৩-২৫৪; হাওয়ার্ড সাচার ১৯৬৯: ৪৩৩-৩৬)
মুজফফর আহমদের গুণকীর্তন করিয়া শেষ করিতে পারিব না। তবে কবিতা জিনিশটা তাঁহার হাতে ঠিক ধরা দিতে চাহে নাই বলিয়াই মনে হয়। তিনি খুব সরল লিখিয়াছেন, ‘আমি ঠিক জানি না, কাব্য-রচনার সময়ে কবিদের হয়তো ঘটনা হতে বিচ্যুত হওয়ার অধিকার আছে। তবে, যে-ঘটনা কবিতা লেখার সময়ে ঘটছে সে-ঘটনা হতেও কবিরা কি বিচ্যুত হতে পারেন?’ আমরা দেখিয়াছি প্রতিটি ঘটনারই একাধিক দাগ বা মাত্রা আছে। একটা মাত্রা আমরা চোখ দিয়া দেখি। ইহা ঘটনার মূর্তরূপ। আরেকটা মাত্রা চোখে দেখা যায় না কিন্তু হিসাবে ধরা যায়। ইহাকেই বলে বিমূর্ত বা মিছামিছি রূপ। ইহা আকার বিশেষ। ঘটনার আরও মাত্রা আছে। এখানে প্রাসঙ্গিক নহে বিধায় আর অধিক লিখিলাম না। মুজফফর আহমদও এই সত্য কবুল করিয়াছেন। তিনি লিখিতেছেন, ‘সমস্ত জগতের মুসলিম যুবকদের মনে তুর্কি বীর আন্ওয়ার পাশা একটি বীরের আসন অধিকার করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে নজরুলের মনেও তাঁর সেই আসন ছিল। নজরুল ‘আন্ওয়ার পাশা’ নাম দিয়ে কবিতাও লিখেছে। সেই কবিতাটির ভিতর দিয়েও তার প্রবল দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে।’ (মুজফফর আহমদ ১৯৭৩: ৩১৪)
১৯১৮ সালের শেষভাগে পুরাতন তুরস্ক ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তির হাতে অস্ত্রসমর্পণ করিল। আমরা আগেই দেখিয়াছি ১৯১৪–১৯১৮ সালের যুদ্ধকালীন সমরমন্ত্রী আনোয়ার পাশা—তাঁহার অপর দুই সহকর্মী তালাত ও জামালকে সঙ্গে লইয়া—জার্মানি পলাইয়া গেলেন। পলাইতে না পারিলে তাঁহারাও বন্দী হইতেন। ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করিবামাত্র দখলদার মিত্রশক্তি ১৫০ জন তুর্কি রাজনৈতিক নেতাকে বন্দী করিয়াছিলেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার নবগঠিত তুর্কি সরকার ১৯১৯ সাল নাগাদ আনোয়ার পাশা ও অন্য দুইজনকে অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার করিয়া প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। বলিয়া রাখা ভালো, ওসমানিয়া সুলতানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হাসান ইজ্জত পাশার তাঁবেদার সরকার ইস্তাম্বুল ওরফে কনস্টান্টিনোপলে যাঁহাদের প্রাণদ- মঞ্জুর করেন আংকারার মোস্তফা কামাল সরকারও তাঁহাদের প্রাণদণ্ড নাকচ করেন নাই। ১৯২১ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের প্রধান স্যার বেয়সল টমসন আর খ্যাতনামা লেখক অব্রে হার্বার্ট বার্লিনে তালাত পাশার সহিত দেখা করেন। তাঁহাদের সাক্ষ্য অনুসারে তুর্কিজাতির নবজাগরণে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। (হাওয়ার্ড সাচার ১৯৬৯: ২৫০)
ইহার কয়েকদিন পর বার্লিনে সোলেমান তায়লিরিয়ান নামের একজন আর্মানি যুবক তাঁহাকে হত্যা করেন। আমরা দেখিয়াছি ১৯২২ নাগাদ জামাল পাশা ও আনোয়ার পাশাও আলাদা আলাদা জায়গায় প্রাণ হারাইয়াছিলেন। কেহ কেহ অনুমান করিয়াছেন আনোয়ার পাশা ১৯২২ সালের ৪ আগস্ট রুশ লালফৌজের সহিত যুদ্ধরত অবস্থায় মারা যান। এই দুই কথা আবার স্মরণ করিতেছি নজরুল ইসলামের ‘আনোয়ার’ কবিতার শান বুঝিবার ইচ্ছা হইতে। ‘আনোয়ার’ কবিতার রচনাকাল—যতদূর জানা যায়—১৯২১ সালের আগস্ট কিম্বা সেপ্টেম্বর মাস। (প্রীতিকুমার মিত্র ২০০৭: ৫০) এই কবিতায় আনোয়ার পাশাকে পুরাদমে হাজির দেখা যায় না। তিনি হাজির আছেন নিতান্ত ‘স্মৃতি’ কিম্বা বলা যাইতে পারে ‘ছায়া’ আকারে। ‘কামাল পাশা’ কবিতায়—আমরা কিন্তু দেখিয়াছি—‘মহাবীর’ আনোয়ার পাশা সশরীরে বহু সৈন্যসামন্ত ও সৈনিকদের আত্মীয়-স্বজন লইয়া বিজয়ী-বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন। আর ‘আনোয়ার’নামা কবিতায় তিনি এক অর্থে একান্তই অনুপস্থিত। এই কবিতার অকুস্থল ‘প্রহরী-বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনস্ট্যান্টিনোপ্ল্’। কাল-‘অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি’।
এই কবিতায় শীর্ষটীকাযোগে নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘ঐ জিন্দানখানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয় সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ সেনানী বন্দী। তাহার কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, ডাগর চোখ, সুন্দর গঠনÑসমস্ত কিছুতে যেন একটা ব্যথিত-বিদ্রোহের তিক্ত-ক্রন্দন ছলছল করিতেছিল। তরুণ-প্রদীপ্ত মুখম-লে চিন্তার রেখাপাতে তাহাকে তাহার বয়স অপেক্ষা অনেকটা বেশি বয়স্ক বোধ হইতেছিল।‘ আরও লেখা হইয়াছে: ‘সেইদিনই ধামা-ধরা সরকারের কোর্ট-মার্শালের বিচারে নির্ধারিত হইয়া গিয়াছে যে, পরদিন নিশিভোরে তরুণ সেনানীকে তোপের মুখে উড়াইয়া দেওয়া হইবে।’ আরও পড়িতেছি: ‘আজ হতভাগ্যের সেই মুক্তি-নিশীথ, জীবনের শেষরাত্রি। তাহার হাতে, পায়ে, কটিদেশে, গর্দানে উৎপীড়নের লৌহ-শৃঙ্খল। শৃঙ্খল-ভারাতুর তরুণ সেনানী স্বপ্নে তাহার “মা”কে দেখিতেছিল। সহসা চীৎকার করিয়া সে জাগিয়া উঠিল। তাহার পর চারিদিকে কাতর নয়নে একবার চাহিয়া দেখিল, কোথাও কেহ নাই। শুধু হিমানি-সিক্ত বায়ু হা হা স্বরে কাঁদিয়া গেল, হায় মাতৃহারা!’ একটু পরে: ‘স্বদেশবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা স্মরণ করিয়া তরুণ সেনানী ব্যর্থ-রোষে নিজের বাহু নিজে দংশন করিয়া ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিল। কারাগৃহের লৌহ-শলাকায় তাহার শৃঙ্খলিত দেহভার বারে বারে নিপতিত হইয়া কারাগৃহ কাঁপাইয়া তুলিতেছিল।’
শেষ মুহূর্তে সমাগত। ‘এখন তাহার অস্ত্র-গুরু আনোয়ারকে মনে পড়িল। তরুণ বন্দী চীৎকার করিয়া উঠিল, “আনোয়ার!”’
আমরা অন্যত্র দেখিয়াছি আবদুল কাদির জানাইতেছেন, একদিন কেহবা ভাবিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের পথ প্যান-ইসলামবাদ, ‘কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন’। এখানে দুইপ্রস্ত প্রশ্ন করিতেই হয়। আনোয়ার পাশার সহিত ‘প্যান-ইসলামবাদ’ নামক চিন্তাধারার সম্বন্ধ কি? আর নজরুল ইসলামের কবিতায় বা ঠিক কোন বস্তুর প্রশস্তি গাওয়া হইতেছে? অন্ধকার রাত্রিতে সকল গাভীকে কালো দেখায়। এখানে এই বাক্যটি ভুলিয়া যাওয়া ঠিক হইবে না। প্রশ্নটা ছিল স্বাধীনতার। তাহাকে ‘ইসলাম’ বলিয়া ভয় পাইবার কারণ নাই। ইহাই তো নজরুলের আনোয়ার পাশা। মুত্যৃপথযাত্রী বন্দী সৈনিকের অজ্ঞান হইতে যতটুকু বাহির হইয়াছে তাহা নজরুল ইসলামেরও অজ্ঞান বটে। এই অভেদের বিবরণ: ‘তাহার কুঞ্চিত কেশ, ডাগর চোখ, সুন্দর গঠন—সমস্ত কিছুতে যেন একটা ব্যথিত-বিদ্রোহের রিক্ত-ক্রন্দন ছলছল করিতেছিল।’
‘আনোয়ার’ কবিতায় আমরা দেখিব অনুপ্রাস আর অন্ত্যমিল দেখিয়া নজরুল ইসলাম বার বার ‘জানোয়ার’ শব্দটি এস্তেমাল করিতেছেন। কিন্তু ইহা কি শুদ্ধ অনুপ্রাস? না, তাহার অধিক? সভ্যতার আর বর্বরতার, সংস্কৃতির আর বন্যদশার তুলনা, মানুষ আর অমানুষের স্পর্ধা হিসাবেও আনোয়ার আর জানোয়ার হাজির হইয়াছে এই কবিতায়। মাত্র এই কবিতায় নহে। ‘কামাল পাশা’ কবিতায়ও ‘আনোয়ার’ যতবার আসিয়াছে ‘জানোয়ার’ও আসিয়াছে ততবার। পরাজয় মানুষকে জানোয়ার করিয়া তোলে, সন্দেহ কি! একদা যে জানোয়ার মারিত, আজ সেই আনোয়ারও জানোয়ার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কারণ সে পরাস্ত, সে বন্দী। কবিতার শুরু এইভাবে:
“আনোয়ার! আনোয়ার!
দিলাওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো, আর
নেস্ত-ও-নাবুদ করো, মারো যত জানোয়ার!”
আর এখন! অন্ত্যানুপ্রাস হইয়াছে আদ্যানুপ্রাস। আনোয়ার হইয়াছে আফশোস্!
“আনোয়ার! আনোয়ার!
বখতেরই সাফ্ দোষ,
রক্তেরও নাই ভাই আর সে যে তাপ জোশ,
ভেঙে গেছে শম্সের—পড়ে আছে খাপ কোষ!
আনোয়ার! আফশোস্!”
দান উল্টাইয়া গিয়াছে। এখন সব সুমসাম। আনোয়ারই এখন জানোয়ার। কবি গাহিতেছেন:
“আনোয়ার! আনোয়ার!
সব যদি সুমসাম, তুমি কেন কাঁদো আর?
দুনিয়াতে মুসলিম আজ পোষা জানোয়ার!
আনোয়ার! আর না!
দিল্ কাঁপে কার না?
তল্ওয়ারে তেজ নাই!—তুচ্ছ স্মার্ণা,
ঐ কাঁপে থর থর মদিনার দ্বার না?
আনোয়ার! আর না!”
আনোয়ারকে সম্বোধন করিয়া বন্দী তরুণ সৈনিক আহাজারি করিতেছে। বলিতেছে, ‘কোথা খোঁজো মুসলিম?—শুধু বুনো জানোয়ার!’ আরেক জায়গায় ভাবিতেছে, ‘আজো যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার!’ পরের জায়গায় আবার তাহার আর্ত চীৎকার:
“যে বলে সে মুসলিম—জিভ্ ধরে টানো তার!
বেইমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার!”
অথবা
“পাশা তুমি নাশা হও মুসলিম—জানোয়ার
ঘরে যত দুশমন, পরে কেন হানো মার?—”
আর বন্দী সৈনিকের শেষ উপলব্ধি:
“ইসলামও ডুবে গেল, মুক্ত স্বদেশও নাই!—
তেগ ত্যাজি বরিয়াছি ভিখারির বেশও তাই!
আনোয়ার! এসো ভাই!!”
এই কবিতায় ঘন ঘন ‘মুসলিম’, ‘মদিনা’, ‘ইসলাম’ প্রভৃতি পদের উদার ব্যবহার দেখিয়া ইহাকে প্যান-ইসলাম পদের কবিতা মনে করা অসম্ভব নহে। ইহাতে কবিতার খনিজ পদার্থ কিন্তু পাওয়া যাইবে না। সেই পদার্থের খানিক সন্ধান খোদ নজরুল ইসলামই দিয়াছেন। এই কবিতা দেশপ্রেমের। যখন প্রহরী—কাফ্রি সান্ত্রী—হুঙ্কার দিয়া উঠিল ‘এয়্ নৌ জওয়ান, হুঁশিয়ার!’ তখন ‘অধীর ক্ষোভে তিক্ত রোষে তরুণের দেহের রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল! তাহার কটিদেশের, গর্দানের, পায়ের শৃঙ্খল খানখান হইয়া টুটিয়া গেল, শুধু হাতের শৃঙ্খল টুটিল না। সে সিংহ-শাবকের মতো গর্জন করিয়া উঠিল—‘এয়্ খোদা! এয়্ আলি! লাও মেরি তলোয়ার!’
আর তখন ‘সহসা তাহার ক্লান্ত আঁখির চাওয়ায় তুরস্কের বন্দিনী মাতৃমূর্তি ভাসিয়া উঠিল।’ অতপর নজরুল ইসলাম উবাচ: ‘আজ নিখিল বন্দী-গৃহে গৃহে ঐ মাতৃমুক্তিকামী তরুণেররই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে। যেদিন এ ক্রন্দন থামিবে, সেদিন সে-কোন অচিন্ দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিত জানি না!’ আরো অভেদ আছে। নজরুল ইসলাম ঐ বিশেষ তুর্কি সেনাকে নিখিল করিয়া লইয়াছেন: ‘তখন হয়তো হারা-মা-আমার আমায় “তারার পানে চেয়ে চেয়ে” ডাকিবেন। আমিও হয়তো আবার আসিব। মা কি আমার তখন নূতন নামে ডাকিবেন? আমার প্রিয়জন কি আমার নূতন বাহুর ডোরে বাঁধিবে? আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, ‘আসিবে সেদিন আসিবে!’ (কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/৩৩-৩৬)
আমাদের দেশে কিছু লেখক আছেন যাঁহারা ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ প্রভৃতি পদ দেখিলে চিন্তাশক্তি হারাইয়া ফেলেন। আরেক ধরনের লেখক আছেন যাঁহারা চিন্তাফল ভক্ষণ করেন না, কেবল কুড়ান। তাঁহারা গাছেরটা খাইবেন না কিন্তু তলারটা ঠিকই কুড়াইবেন। আনিসুজ্জামানকে এই দ্বিতীয় শ্রেণিতে রাখা যায়। তিনি লিখিয়াছেন, ‘সাধারণতন্ত্রের সমর্থক কামাল পাশা ও প্যান ইসলামবাদের সমর্থক আনোয়ার পাশাকে একইভাবে অভিনন্দিত করতে তাঁর [মানে নজরুল ইসলামের] বাধে নি।’ (আনিসুজ্জামান ১৯৬৯: ৬২; মোটা হরফ আমাদের)
দুঃখের মধ্যে, আনিসুজ্জামান পার্থক্যটা খেয়াল করেন নাই। নজরুল ইসলাম কোথাও আনোয়ার পাশাকে কামাল পাশার সমান কিম্বা একই ভাবের অভিনন্দন জানান নাই। তিনি আনোয়ার কি অন্য কোন তুর্কি নায়ককে হয় কামাল পাশার পাশে ঠেলিয়া নয় পেছনে টানিয়া রাখিয়াছিলেন একথা ভুলিয়া বসা উচিত হইবে না। আনিসুজ্জামান যে নজরুল ইসলামের লেখা বিশেষ মন যোগ করিয়া পড়েন নাই তাহার প্রমাণ এই ধরনের বিয়োগান্ত বিচারে পাওয়া যাইতেছে। তিনি লিখিয়াছেন:
“এখানে একদিকে মনে রাখতে হবে যে, তখনকার মুসলিম জগতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তুমুল আলোড়ন চলেছিল এবং তাঁর থেকে জনশক্তির অভ্যুদয়ের সম্ভাবনায় আশাবাদী কবির পক্ষে উল্লসিত হওয়া যেমন স্বাভাবিক তেমনি সেই দৃষ্টান্ত থেকে মানুষের—বিশেষত, বাঙালী মুসলমানের মনে নব জাগরণের প্রেরণা সহজেই সঞ্চার করার সুযোগ এসেছিল। এই অভ্যুত্থানের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বরূপ তিনি বিশ্লেষণ করতে চাননি, শুধু চেয়েছেন মানুষ জেগে উঠুক, ভেঙ্গে পড়ুক বিদেশী শাসনের শৃঙ্খল।” (আনিসুজ্জামান ১৯৬৯: ৬২)
আনিসুজ্জামানের এই বিচার একান্তই একদেশদর্শী এবং অসত্য। হয়তো ‘এসলাম’ লইয়া তাঁহার একটা সমস্যা আছে। থাকিতেই পারে। কিন্তু নজরুল ইসলামের সেই সমস্যা ছিল না। নজরুল ইসলাম শুদ্ধ বিদেশি শাসনের অবসান চাহিয়াছিলেন, দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করিতে চাহেন নাই—এমন কথা বলা ঘোরতর অন্যায়। মনে রাখিতে হইবে, নজরুল ইসলামের চোখে ‘ইসলামের সত্যকার প্রাণশক্তি’ ছিল ‘গণশক্তি, গণতন্ত্রবাদ, সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সমানধিকারবাদ।’ মোস্তফা কামালকে তিনি দেখিয়াছিলেন শুদ্ধ নব্য তুরস্কের জাতীয় বীর আকারেই নহে, এসলামের সত্যকার প্রাণশক্তির নতুন প্রতিষ্ঠাতা বা সংস্কারক পরিচয়েও। মোস্তফা কামাল যখন তুর্কি প্রজাতন্ত্রের নামে ‘খেলাফত’ নামক মায়াবী অনুষ্ঠানটি বাতিল করিলেন তখন নজরুল ইসলাম ইবরাহিম খাঁর নিকট পত্রযোগে জিজ্ঞাসিয়াছিলেন, ‘ইসলামের নামে যে কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছে—তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইস্লামের বিরুদ্ধে অভিযান?’ ইহাতেই বুঝা যায় ‘এসলাম’ শব্দে নজরুল ইসলামের কোন সমস্যা ছিল না।
আনিসুজ্জামানের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি শোনা যায় প্রীতিকুমার মিত্রের প্রস্তাবেও। ইনি লিখিয়াছেন আনোয়ার পাশা দেখা দিয়াছিলেন না তুর্কি জাতীয়তাবাদীর না সমাজতন্ত্রী আন্তর্জাতিকতাবাদীর ভূমিকায়। তিনি হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন নিখিল ইসলামবাদী (প্যান-ইসলামবাদী) আর নিখিল তুর্কিবাদী (প্যান-তুর্কীবাদী) বিপ্লববিরোধী। প্রীতিকুমার মিত্রের কথায়, ‘১৯২১ অব্দে আনোয়ার পাশার প্রতিক্রিয়াশীল মনোবাসনার খবর নজরুল স্বভাবতই রাখিতেন না। তিনি তাঁহাকেও আঁকিয়াছিলেন কামালের পাশে দাঁড়ানো অক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায়।’ মুজফফর আহমদের দোহাই পাড়িয়া প্রীতিকুমার মিত্র আরো লিখিতেছেন, ‘আর এমন কি ঘটনার সত্য বয়ানটা তাঁহাকে জানাইয়া দেওয়ার পরও তিনি আনোয়ারের ভাবমূর্তিতে নড়চড় করিবেন না। অধিক কি, নেহাত দৃষ্টিকটু আর মিছামিছি “কামাল পাশা” কবিতায়ও তাঁহার নামটা টানিয়া আনিলেন।’ (প্রীতিকুমার মিত্র ২০০৭: ৫০)
আমরা শুদ্ধ এইটুকই নিবেদন করিব যে একটা লোক যখন একই সঙ্গে ‘নিখিল ইসলামবাদী’ আর ‘নিখিল তুর্কি জাতীয়তাবাদী’ হয় তখন তাঁহার পক্ষে বিশুদ্ধ ‘তুর্কি জাতীয়তাবাদ’কে সমর্থন করাও অসম্ভব হইবে না। এইখানে সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন এই যে নজরুল ইসলাম কামাল পাশার সহিত আনোয়ারকে একই সমতলে কদাচ দাঁড় করান নাই। দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাদের বিচারকরা কেহই জিনিশটা ধরিতে পারেন নাই। কবিতার সেমিয়টিক বা চিহ্নশাস্ত্র বিচার করিলে ইহা ধরা না পড়িয়া যাইত না। সমস্যাটা হইতেছে ‘ইসলাম’ বা ‘নিখিল ইসলামবাদ’ লইয়া। কাজী আবদুল ওদুদ বহু আগেই অভিযোগ করিয়াছিলেন নজরুল ইসলাম নিখিল ইসলামবাদের দিকে খানিক ঝোঁকা ছিলেন। ওদুদের ভাষায়: ‘তাঁর “বিদ্রোহী”-যুগের প্রায় সমস্ত কবিতায় এই সাম্যবাদের প্রভাব সুষ্পষ্ট। কিন্তু পুরোপুরি সাম্যবাদী নজরুল কখনো হননি, হলে তাঁর এই সাম্যবাদ প্রচারের দিনে “খালেদ”, “ওমর”, “জগলুল” প্রভৃতি প্যান-ইসলামী ভাবের কবিতা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হতো না।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮৭; ১৯৮৮: ৪৩৩)
পরিষ্কার দেখা যাইতেছে কাজী আবদুল ওদুদেরও একটি ইসলাম সমস্যা আছে।

নজরুল ইসলাম বিষয়ে যাঁহাদের ‘এসলাম’ সমস্যা প্রবল তাঁহাদের একান্ত সহায় হইয়াছেন বিনয় কুমার সরকার। তিনি যাহা ১৯৪৩ সনে বলিয়া রাখিয়াছেন তাহাই এই প্রশ্নে শেষ কথা বলিয়া গণ্য হইতে পারে। তিনি বলিয়াছেন: ‘নজরুলের মুসলিম নামে চিহ্নিত কবিতাগুলির ভেতর পাওয়া যায় স্বদেশ-নিষ্ঠার তারিফ। জাতীয়তা ও রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা হচ্ছে আফ্রিকা ও এশিয়ার মুসলমান বিষয়ক গানগুলির মুদ্দা। এই সব কবিতায় ইসলাম ভক্তি বা ইসলাম প্রচারের গন্ধ মাত্র আছে কিনা সন্দেহ।’ (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ১৯৮৩: ২০২)
উদাহরণ হিশাবে ‘কোরবাণী’ কবিতাটি লওয়া যাউক। ‘কোরবাণী’ ছাপা হইয়াছিল ১৩২৭ বাংলার ভাদ্র সংখ্যা (মানে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর) ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায়। এই কবিতার সহিতও তুর্কি বিপ্লবের একটি সম্পর্ক দেখা যাইতেছে। ইব্রাহিম খাঁর দোহাই দিয়া সে কথা আবদুল কাদিরও জানাইয়াছেন: ‘“তরীকুল আলম” বলে একজন ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট “কোরবানী”কে বর্বর-যুগের চিহ্ন বলে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধ পড়ে নজরুল ইসলামের কলম গর্জে উঠল। নব্য তুর্কীরা তখন স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জান কোরবান করছিল। সেই ব্যাপারের সাথে মিলিয়ে তিনি লিখলেন: “ওরে হত্যা নয়, আজ সত্যাগ্রহ, শক্তির উদ্বোধন।”’ ইবরাহিম খাঁর আত্মজীবনী ‘বাতায়ন’ পুস্তকে আছে এইরকম: ‘মৌলভী তরিকুল আলম ভাল বিদ্ধান—সুন্দর চেহারা—সাহিত্যিক রুচিসম্পন্ন পরম ভদ্রজন। তিনি কাগজে এক প্রবন্ধ লিখে যা বললেন তাঁর মর্ম এই যে, কোরবানিতে অকারণে পশু হত্যা করা হয়; এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোন মানে নেই। নজরুল ইসলাম অমনি তার জওয়াবে লিখলেন “কোরবাণী” কবিতা।’ (ইব্রাহিম খাঁ ১৯৬৭: ৪২৭) তরীকুল আলমের প্রকৃত নাম—রফিকুল ইসলাম জানাইতেছেন—‘তালীমুদ্দিন আহমদ’। তিনি ‘রংপুরের বিখ্যাত উকীল, পবিত্র কোরান শরীফের বঙ্গানুবাদক তাস্লীমুদ্দীন আহমদ সাহেবের পুত্র।’ (রফিকুল ইসলাম ২০১৩: ৮৯-৯০)
তাঁহার লেখাটি ছাপা হইয়াছিল, ‘আজ ঈদ’ শিরোনামে। প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার ১৩২৭ সালের শ্রাবণ সংখ্যায়। নজরুল ইসলাম ‘কোরবানী’ লিখিলেন পরের মাসের ‘মোসলেম ভারত’ কাগজে। তরিকুল আলমের লেখার একাংশ আবদুল কাদির তুলিয়া আনিয়াছেন: ‘… আজ এই আনন্দ উৎসবে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভাগই মনের উপর চাপ দিচ্ছে বেশী করে। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেই দিকে কেবল নিষ্ঠুরতার অভিনয়। অতীত এবং বর্তমানের ইতিহাস চোখের সামনে অগণিত জীবনের রক্তে ভিজে লাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। এই লাল রঙ আকাশে-বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে—যেন সমস্ত প্রকৃতি তার রক্তনেত্রের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবী বিভীষিকা করে তুলেছে। প্রাণ একেবারে হাঁপিয়ে উঠছে।’ (কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ১/৪৪০)
‘কোরবাণী’ কবিতার সহিত—এইখানে নিবেদন করিয়া রাখিতেছি—তুর্কি বিপ্লবের যোগ একটা আছে। কবিতার ভিতরেই সাক্ষ্য পাইতেছি তাহার। নজরুল ইসলাম লিখিয়াছিলেন আজ রুম-বাসীর শির দুম্বার শিরের মতো শহীদ হইতেছে। রহমান আজ রুদ্র হইয়াছেন। ‘রুম’ হইতেছে ইস্তাম্বুল ওরফে কনস্টান্টিনোপলের অপর নাম। বাদশাহ কনস্তাস্তিন এই শহর কায়েম করিবার সময় ইহাকে আদ্যের রুম বা রোম শহরের বিকল্প ভাবিয়াছিলেন। ইস্তাম্বুল ইহা বহুদিন তাই দ্বিতীয় রোম বা রুম বলিয়া পরিচিত হইত। এক সময় দ্বিতীয় উপাধিটা খসিয়া শুধু ‘রুম’ টিকিয়া থাকে। এখনও ভারতে তুর্কি টুপির অপর নাম ‘রুমী টুপি’ এই কারণেই। দুনিয়ার আর আর মুলুকে রুমী টুপির আসল নাম ‘ফেজ’। কারণ ইহার আদিভূমি মরক্কোর ‘ফেজ’ শহর। এই সুবাদেই নজরুল ইসলাম রুমবাসী পদের মধ্যে তুর্কিজাতি নির্দেশ করিয়াছেন।
“ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,—
আজিকার এ খুন র্কোবানির!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি।—রহমান কি রুদ্র নন?
ব্যস্! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর ‘খুন দে, জান দে, শির দে বৎস’ শোন্!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০১: ৪৩)
বর্তমানের কবি লিখিতেছেন, ‘ওরে হত্যা নয় আজ “সত্যাগ্রহ” শক্তি উদ্বোধন।’ তাঁহার বাণী অতীত নহে, ভবিষ্যত মাত্র। মুক্তির জন্য চাই আত্মত্যাগ, চাই কোরবানি।
“চড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
মুসলিমে সারা দুনিয়াটার।
‘জুলফেকার’ খুলবে তার
দুধারী ধার শেরে-খোদার রক্তে-পূত-বদন!
খুনে আজকে রুধব মন!
ওরে শক্তি হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!”
কোরবানির লক্ষ্য ‘আজাদি’ অর্থাৎ স্বাধীনতা, পরাধীনতার অবসান। নজরুল লিখিয়াছেন:
“আস্তানা সিধা রাস্তা নয়
‘আজাদি’ মেলে না পস্তানোয়!
দস্তা নয় সে সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্তে-লুব্ধ কোন্
কাঁদে? শক্তি-দুঃস্থ শোন্—
‘এয়্ ইব্রাহিম্ আজ কোরবানি কর শ্রেষ্ঠ পুত্রধন!”
‘কোরবাণী’ কবিতার মূল ধুয়া, ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’। স্বাধীনতা দেবীর বেদীতেই নিবেদিত এই বাণী। এই স্বাধীনতাই সত্য মুক্তি।
“মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে
ওরে হুঙ্কারে ভাঙ্গি গড়া ভীম কারা লড়ব রণ-মরণ!
ঢালে বাজবে ঝন্-ঝনন্!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!”
‘কোরবাণী’র শেষ থোকায় প্রার্থনা করা হইতেছে ‘জোর’। যাচ্ঞা আর প্রার্থনা দিয়া কাজ নাই। আজ জান্ আর মাল দিয়া মুক্তির পথ পরিষ্কার করাই কর্তব্য। রক্ত যদি উপায় তবে উদ্দেশ্য মুক্তি। কোরবাণীটা বোধন মাত্র, ‘লক্ষ্য ঐ তোরণ’।
“জোর চাই আর যাচ্না নয়
কোরবানি-ছিল আজ না ওই?
বাজ্না কই? সাজ্না কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ?
বল্Ñ‘যুঝব জান ভি পণ!’
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ!
আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পুত বোধন।”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪৩-৪৪)

‘মোহররম’ কবিতার আহবানও একই অঙ্গীকারের।
“উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ আরবির,
দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির;—
তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,
শমশের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা।
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য!
হুঁশিয়ার ইসলাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো ওঠো মুস্লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।
শহীদের দিনে সব লালে-লাল হয়ে যাক!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪৮)
পরের মাসে [আশ্বিন ১৩২৭] ছাপা ‘মোহররম’ কবিতায় এই লক্ষ্য আরও সংহত হইয়াছে। এই পদ্যটাও যে তুর্কি বিপ্লবের বিপর্যয় পর্বে লেখা হইয়াছিল তাহা অকারণ নহে। এই পদ্যের এক পদে পাই কোরবানির অন্য চেহারা। পুত্রধন বা বেটাদের রক্তের বিনিময়ে গোনাহ বা পাপের মার্জনা। ভাগ্যের বদলা।
“বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্—
‘আরশে’র পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা,
‘এয় খোদা বদ্লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জনা করো গোনা পাপী কমবখতের!’”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪৭)

‘লোহু-রাঙা পিরাহান’ ওরফে ‘পিরান’ পদটি ‘কামাল পাশা’য় এইভাবে হাজির হইবে:
“দেখচ কি দোস্ত-অমন করে? হৌ হৌ হৌ!
সত্যি তো ভাই!—সন্ধেটা আজ দেখতে যেন সৈনিকেরই বৌ!
শহীদ সেনার টুকটুকে বৌ লাল-পিরাহান-পরা,
স্বামীর খুনের ছোপ-দেওয়া, তাই ডগডগে আনকোরা!—
না না না,—কলজে-যেন টুকরো-করে-কাটা
হাজার তরুণ-শহীদ-বীরের,—শিউরে উঠে গা’টা!
আস্মানের ঐ সিং-দরজায় টাঙিয়েছে কোন্ কসাই!
দেখতে পেলে এক্ষুণি যে এই ছোরাটা কলজেতে তার বসাই!
মু-ুটা তার খসাই!
গোস্বাতে আর পাইনে ভেবে কি যে করি দশাই!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ২৫)

‘মোহররম’ কবিতায় ইহার পূর্বাভাস:
“কত মোহররম এল, গেল চলে বহু কাল—
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুস্লিম! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,
‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজি সেই মোহররম মাহিনা,—
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না।”
‘শাত্-ইল-আরব’ ছাপা হইয়াছিল ‘মোহররম’ কবিতার চারি মাস আগে, ১৩২৭ বাংলার জ্যৈষ্ঠ মাসে। দেশভক্তির উদ্বোধন এই কবিতায়ও আবৃত নাই। প্রথম মহাযুদ্ধে তুর্কি সেনারা শাতিল আরবের উত্তমর্ণ দজলা নদীর তীরে, কুতল আমারার যুদ্ধ ক্ষেত্রে একটি ইংরেজ সেনাবাহিনীকে বন্দী করে। ইহা ১৯১৬ সনের এপ্রিল মাসের কথা। তাহার আগে প্রায় ছয় মাস ধরিয়া ঐখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। ২৮ এপ্রিল মেজর জেনারেল চার্লস টাউনসেন্ড বিশাল এক সৈন্যবাহিনীসহ আত্মসমর্পণ করেন।
‘শাত-ইল-আরব’ তুর্কি বিপ্লবের রক্তে বিধৌত বৈ কি! নজরুল লিখিলেন:—
“যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,
য়ুনানি, মিস্রি, আরবি, কেনানি—
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ, বেদুইনদের চাঙ্গা শির!
নাঙ্গা-শির,—
শমসের হাতে, আঁসু আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল্ আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!”
‘কুত আল-আমরা’র যুদ্ধের দোহাই সরাসরি হাজির হইয়াছে এই কবিতায়।
“কুত-আমারার রক্তে ভরিয়া
দজলা এনেছে লোহুর দরিয়া;
উগারি সে খুন তোমাতে দর্জলা নাচে ভৈরব ‘মস্তানি’র।
ত্রস্তা-নীর
গর্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত,—‘শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখির!
দজলা-ফোরাত-বাহিনী শাতিল! পুত যুগে যুগে তোমার তীর।”
নজরল ইসলামের মন বুঝিতে হইলে দেখিতে হইবে শাতিল আরবের আয়নায় তিনি কিভাবে বাংলাদেশের মুখ দেখিয়াছেন। শাতিল আরব দজলা ও ফোরাত দুই নদীর প্রবাহ বহন করে। নজরুল তাহাকে ডাকিয়াছেন একবার ‘দজলা-ফোরাত-বাহিনী’ নামে, আরবার ‘ইরাক-বাহিনী’ নামে। এখানে বাংলাদেশ আসিয়া হাজির নজরুল ইসলামের কল্যাণে।
“ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনী,—
কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী
তোমারও দুঃখে ‘জননী আমার!’ বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর!
রক্ত-ক্ষীর—
পরাধীনা! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দুফোঁটা ভক্ত-বীর।
শহীদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজ নোয়ায় শির!”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪১)

নজরুল ইসলাম করাচী হইতে বন্ধুদের যে সকল চিঠি লিখিতেন তাহার ডানদিকের উপরে কোণায় বাঙালী পল্টন বা বেঙ্গলি রেজিমেন্ট কথার জায়গায় তিনি কখনো বা ‘বঙ্গ বাহিনী’ কথাটা ব্যবহার করিতেন। অনেক চিঠিতেই আমরা ইহা দেখিয়াছি। এই কবিতায় সেই প্রতিজ্ঞাটাই তিনি এস্তেমাল করিতেছেন।
“বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা
ইরাক আজমে করেছ ধন্যা:—
বীর-প্রসূ দেশ হলো বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দমির!
মর্দ বীর
সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির।”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪০-৪১)
চোখ খুলিলেই দেখি ১৮৫৭ সালের বড় ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি অকস্মাৎ হাজির হইয়াছে নিচের স্তবকটিতে। দুনিয়ার সকল মুক্তি সংগ্রামী এখানে এক হইয়া গিয়াছে।
“শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব! পুত যুগে যুগে তোমার তীর!
দুশমন্-লোহু ঈর্ষায় নীল
তব তরঙ্গে করে ঝিলমিল,
বাঁকে বাঁকে রোষে মোচড় খেয়েছ পিয়ে নীল খুন পিণ্ডারির!
জিন্দা বীর
‘জুলফিকার’ আর ‘হায়দরি’ হাঁক হেথা আজো হজরত আলীর—
শাতিল্-আরব! শাতিল-আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।”
(কাজী নজরুল ইসলাম ২০০৬: ৪১)


এতক্ষণে আমরা এই দীর্ঘ নিবন্ধের শেষভাগে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। সাহিত্য জীবনের প্রথম যুগে নজরুল ইসলাম প্রকৃতপক্ষে কামালপন্থী ছিলেন। আবদুল কাদিরের এই দাবি আমরা মোটের উপর সঠিক বলিয়াই ধরিয়া লইতে পারি। একাধারে প্রবল দেশপ্রেম, মুক্ত বিচারবুদ্ধি আর উদার মানবিকতা—এই তিন লক্ষণেই আবদুল কাদিরের প্রস্তাব মানিয়া লওয়া সম্ভব। কিন্তু একটা খটকা থাকিয়াই যায়। নজরুল ইসলাম কি তবে সাহিত্য ব্যবসায়ের অন্য যুগে–দ্বিতীয়, তৃতীয় কি চতুর্থ যুগে—কামালপন্থা হইতে সরিয়া গিয়াছিলেন? আবদুল কাদির ১৯৮৪ সালে আসিয়া—ওনজরুল রচনাবলী ৫ম খণ্ড ২য় অর্ধাংশের ভূমিকায়—জানাইয়াছিলেন জীবনের শেষভাগে নজরুল ইসলাম একপ্রকার ‘স্পিরিচুয়াল কমিউনিজম’ বা মনোবাক্যের সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। আবদুল কাদির ইহার পরম রমণীয় অনুবাদ করিয়াছেন ‘আধ্যাত্মিক ধনসাম্যবাদ’। (আবদুল কাদির ১৯৮৪: পাঁচ)

ইহাতে কি মনে হয় নজরুল ইসলাম দেশকালের সমাজতন্ত্রে কিংবা মোস্তফা কামালের দেশপ্রেম, বিচারবুদ্ধি বা মানবিকতায় আস্থা হারাইয়াছিলেন? মনিরুজ্জামান এই প্রশ্নের অন্য উত্তর দিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন নজরুল ইসলাম কখনোই কামালপন্থা হইতে সরিয়া দাঁড়ান নাই। মনিরুজ্জামান লিখিয়াছিলেন, ‘কামাল পাশার মৃত্যুর পর মোহাম্মদীতে কোন কবি উক্তি করেন, “কামাল মরে নাই, মরিয়াছে নজরুল”। নজরুল এর জবাব দেন “নবযুগের” ভার হাতে নিয়ে (১৯৪৪)।’ তিনি আরো লিখিয়াছেন: ‘বলা দরকার, ১৯৬৫ সালে কবির কাব্য প্রেরণা ফুরিয়ে গিয়েছিল চাকুরীর ধান্দা এবং দারিদ্র্যের চাপে। এর পরই তিনি জীবনের নানা সমস্যায় জড়িত থেকে কাব্যজগতের একেবারে বাইরে ছিলেন। ১৯৪১ সালে তাঁর দ্বিতীয় আবির্ভাব সেদিন একটা বৈশিষ্ট্য এনেছিল।’ (মনিরুজ্জামান ১৯৬৯: ১০৩-১০৪)

এক্ষণে মূল গল্পে ফেরা যাউক। তুর্কিজাতির নব সৌভাগ্যের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল এক পর্যায়ে ‘আতাতুর্ক’ বা তুর্কিজাতির পিতা উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১৯৩৮ সালে তাঁহার এন্তেকালের পর এক লেখক অনুযোগ করিয়াছিলেন এই মহাত্মার মৃত্যুতে নজরুল ইসলাম নিরব কেন? এম. ইউসূফ নামক এই লেখক ঘোষণা দিয়াছিলেন: ‘দেশবন্ধুর মহাপ্রয়াণে যে দরদী কবির প্রশ্ন ‘চিত্তনামা’য় হইয়া উঠিয়াছিল মূর্ত, সেই বেদনার কবির আজ চোখে নাই এক বিন্দু অশ্রু, মুখে নাই ভাষা, বুকে নাই স্পন্দন! কামাল মরিয়াও মরে নাই, মুত্যুকে উপহাস করিয়াছে মাত্র। কিন্তু বাঁচিয়াও আজ মরিয়াছে নজরুল।’ এই ভদ্রমহোদয়ের লেখাটা ছাপা হইয়াছিল মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার ভাদ্র ১৩৪৬—মানে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯—সংখ্যায়। মোস্তফা কামালের মৃত্যুতে নজরুল ইসলামের নিরব থাকার তাৎপর্য বৃদ্ধি করিবার জন্য লেখক আমাদের স্মরণ করাইয়া দিলেন একদা এই কবিই না ‘কামাল পাশা’ লিখিয়া যশস্বী হইয়াছিলেন। তিনি লিখিলেন, ‘বিদ্রোহী কামালের জয়যাত্রাতে যে বিদ্রোহী কবির অগ্নিবীণায় জ্বলিয়া উঠিয়াছিল অগ্নিসূর, জয়ডংকার তালে তালে যে কবি গদ গদ কণ্ঠে গাহিয়া উঠিয়াছিল–“কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই”–আজ গাজী কামালের চিরবিদায়ে বিশ্ব যখন কাঁদিয়া গাহে শোকের মর্সিয়া, তখন সে কবি স্থির, নিশ্চল, নির্বিকার, নির্বাক।’ (নীরদচন্দ্র চৌধুরী ১৩৩৪: ২৬৯; মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ১৯৮৩: ১৮৪)

আমার লেখাটি সামান্য বড় হইয়া গিয়াছে। তাই আর কোন নতুন প্রসঙ্গ তুলিব না। নজরুল ইসলাম যাহা লিখিয়াছেন—আমি আলোচনা যদি শুদ্ধমাত্র কবিতার ভিতরই সীমিত রাখি—তাহাতেই প্রমাণ তুর্কি বিপ্লব তাঁহার মরমে প্রবেশ করিয়াছিল। এই কথার পিছনে প্রমাণস্বরূপ একেলা ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’ আর ‘রণভেরী’ কবিতাই নাই। আছে ‘কোরবাণী’, ‘মোহররম’ আর ‘শাতিল আরব’ প্রভৃতি কবিতার সাক্ষ্যও। এমনকি ‘খেয়াপারের তরণী’কেও এই সাক্ষ্যতালিকায় তোলা যায়। খোদ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও ব্যতিক্রম নহে। এয়ুরোপের ইতিহাসে ফরাশি বিপ্লবের যে জায়গা, এশিয়া আর আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামী জাতিসংঘের ইতিহাসে তুর্কি বিপ্লবের জায়গাও সেরকম। বিশেষ দুনিয়ার যে সমস্ত দেশে জনসাধারণের প্রধান অংশ মুসলমান সে সমস্ত দেশে তুর্কি বিপ্লবের প্রভাব খুব গভীরে পড়িয়াছিল। বাংলাদেশে এই প্রভাব যাঁহার উপর সবচেয়ে গভীর এবং খাড়া হইয়া পড়িয়াছিল তাঁহার নাম নজরুল ইসলাম। খোদ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও এই প্রভাবেরই ফসল। যে বিদ্রোহ নজরুল ইসলামের মনে বিমূর্ত (বা সামান্য) আকার ধারণ করিয়াছিল তাহাই মোস্তফা কামালের মধ্যে মূর্তি ধরিয়া হাজির হইয়াছিল।
দুঃখের মধ্যে দেশের বেশির ভাগ বিচারকই এই প্রশ্নে তাঁহাকে ভুল বুঝিয়াছেন। যেমন আবদুল কাদির যাহা বলিয়াছিলেন—সাহিত্য জীবনের প্রথম যুগে নজরুল ছিলেন প্রকৃতপক্ষে কামালপন্থী—কাজী আবদুল ওদুদ বলিয়াছিলেন তাহার ষোল আনা বিপরীত কথা। আবদুল ওদুদের ধারণা, ‘“শাতিল আরব”, “মোহররম”, “কোরবাণী” প্রভৃতি যে-সব জনপ্রিয় কবিতা তিনি লিখেছিলেন সে-সবে ব্যক্ত হয়েছিল মুসলমান সমাজের গতানুগতিক জীবনের প্রতি ধিক্কার, এক বলিষ্ঠ নব জীবনারম্ভের জন্য তীব্র কামনা, আর অস্ত্রশস্ত্রের শক্তি ও মহিমায় তাঁর প্রত্যয়। এটি ছিল ভারতীয় মুসলমানদের জন্য খেলাফত যুগ।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮১)
তদুপরি কাজী আবদুল ওদুদ প্রমাণ করিতে চাহিয়াছেন ‘তরুণ নজরুল, অর্থাৎ “বিদ্রোহী” রচনার পূর্বের নজরুল, এক হিশাবে ছিলেন এই খেলাফত যুগের প্রতিনিধিস্থানীয় কবি।’ প্রমাণস্বরূপ তিনি ‘মোহররম’ কবিতার অধুনা-পরিত্যক্ত শেষ দুটি চরণ চয়ন করিয়াছেন:
“দুনিয়াতে দুর্মদ খুনিয়ারা ইসলাম—
লহু লাও, নাহি চাই নিষ্কাম বিশ্রাম।”
এই প্রমাণ পেশ করিবামাত্র তিনি জানাইলেন এই কুয়াশা এক সময় কাটিয়া গিয়াছিল। বলিলেন, ‘কিন্তু “বিদ্রোহী”তে তাঁর মানসিক কুয়াসা এতখানি কেটে যায় যে, তিনি যেন এক নতুন জীবন নিয়ে জেগে ওঠেন, নিজেকে ও জগৎকে দেখতে আরম্ভ করেন এক নতুন দৃষ্টিতে।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮২) খানিক না আগাইতেই তিনি আবার বলিলেন, ‘“বিদ্রোহী” ও “ধূমকেতু” প্রভৃতি কবিতায় তিনি যে “বিদ্রোহ” প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতে রাশিয়ার সাম্যবাদের দিকে কবি বিশেষভাবে’ ঝুঁকিয়াছেন। কাজী আবদুল ওদুদ লিখিয়াছেন:
“তাঁর বিদ্রোহী যুগের প্রায় সমস্ত কবিতায় এই সাম্যবাদের প্রভাব সুস্পষ্ট। কিন্তু পুরোপুরি সাম্যবাদী নজরুল কখনো হননি, হলে তাঁর এই সাম্যবাদ প্রচারের দিনে ‘খালেদ’ ‘ওমর’ ‘জগলুল’ প্রভৃতি প্যান-ইস্লামী ভাবের কবিতা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হতো না। সাম্যবাদের প্রভাবে তাঁর ভেতরে ঘনীভূত হয়েছে দুঃস্থ ও বঞ্চিত মানবতার জন্য তাঁর দরদ। তাঁর ঈশ্বর দ্রোহ মানব সমাজের দুর্বল ন্যায়-অন্যায়-বোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ—অভিমানের ভঙ্গিতে, তার বেশী কিছু বলে মনে হয় না।” (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮৭-৮৮)
কাজী আবদুল ওদুদের ধারণা নজরুল ইসলাম স্ববিরোধী লেখক। তিনি একবার ১৯১৪-১৯১৮ সনের যুদ্ধোত্তর বিপন্ন ইসলামের জন্য বেদনা পাইতেছেন। ইহা একপ্রকার মানসিক কুয়াশা। সাম্যবাদের প্রভাবে এই কুয়াশা একসময় কাটিয়া যাইতেছে। পরক্ষণে দেখা যাইতেছে এই সাম্যবাদ জিনিশটাও কখনো তাহাকে পুরোপুরি পাইয়া বসে নাই। তাই পরক্ষণেই তিনি প্যান-ইসলামী ভাবের কবিতা লিখিতেছেন। ওদুদের চোখে ইহা একপ্রকার গোলকধাঁধা বৈ নহে। কাজী আবদুল ওদুদ যদি ধরিয়া লইতেন নজরুল ইসলাম যে দৃষ্টিতে জগতকে দেখিয়াছিলেন তাহা মোটের উপর তুর্কি বিপ্লবের—বিশেষ খেলাফত বিলোপকারী মোস্তফা কামালের—দৃষ্টি তবে তিনি হয়তো এই ধাঁধার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজিয়া পাইতেন।


এই প্রবন্ধে আমরা মোটের উপর দুইটি পুরানা উত্তরের ঘরে দুইটা নতুন প্রশ্নের বাসা বাধিতে চাহিব। কাজী আবদুল ওদুদ নজরুল ইসলামের সমসাময়িক। তিনি বলিয়াছিলেন এক নম্বরে নজরুল ইসলাম বাংলার মুসলমান সমাজের প্রতিনিধিস্থানীয় লেখক। তাঁহার দোসরা প্রস্তাব নজরুল ইসলামকে দেখিতে হইবে বাংলা সাহিত্যে খেলাফত যুগের প্রতিনিধি হিসাবে। আমরা এই প্রস্তাবের অনুমোদক নহি। আমাদের প্রস্তাব নজরুল ইসলামকে বাংলার মুসলমান সমাজের তুর্কি বিপ্লব বা মোস্তফা কামাল যুগের প্রতিনিধি আকারে দেখিলেই সত্যের এক কদম কাছে আসা হয়। কাজী আবদুল ওদুদ একদিন কঠিন ভাষায় বলিয়াছিলেন, ‘নজরুলের প্রসঙ্গে সহজেই এসে পড়ে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের সাহিত্যিক দানের কথা।’ ইহার কারণ ওদুদ বলিয়াছিলেন, সেকালের মুসলমান বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ করিলেও একালের ‘শিক্ষিত মুসলমান’ একালের বাংলা সাহিত্য তেমন উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি। নজরুল ইসলাম সাহিত্য প্রবেশ করেন এই পরিবেশে। এই পরিবেশের প্রধান কারণ, ওদুদের বিচারে, ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক পরিবর্তন আর ঊনবিংশ শতাব্দীর ওহাবী আন্দোলন।’ রাজনৈতিক পরিবর্তনে সহজেই পূর্বের প্রাধান্যগর্বিত মুসলমান অপ্রধান হয়ে পড়লো। তিনি লক্ষ্য করিয়াছেন:
“ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলমান প্রধানত ইংরেজের সঙ্গে করলে বিরোধিতা, হিন্দু করলে মিতালি। দ্বিতীয়ার্ধের সূচনায় ঘটলো সিপাহী বিদ্রোহ যার ফলে মুসলমান ব্যাপকভাবে রাজরোষের পাত্র হলো। এর সঙ্গে ওহাবী আন্দোলন তাদের কবলে অতীতমুখী। স্যার সৈয়দ আহ্মদের আলিগড় আন্দোলনের ফলে পশ্চিমা মুসলমানের মানসিক ও সাংসারিক অবস্থার কিছু উন্নতি হলো, কিন্তু বাংলায় সে-ঢেউ তেমন পৌঁছালো না। স্যার সৈয়দের শিষ্য সৈয়দ আমির আলি বাংলার ইংরেজি-শিক্ষিত মুসলমানদের অন্তরে নবীন-পন্থিত্বের এক ক্ষীণ রশ্মি প্রবেশ করাতে পারলেন, কিন্তু সে-রশ্মি এত ক্ষীণ যে কার্যক্ষেত্রে তা নিস্ফল হলো। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় বাংলার শিক্ষিত হিন্দু বিশেষ করে স্বদেশী আন্দোলনে তার সাফল্যের ফলে…।” (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৭৭)

নজরুল ইসলামের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের পরিবেশে এবং ভাবাদর্শে কিছু পরিবর্তনের সূচনা করিয়াছিল। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা কবিতায় ভরকেন্দ্রের পালাবদল ঘটে—কবিতা গজদন্ত মিনার ছেড়ে রাজপথে নেমে এল এবং সামাজিক শক্তির অংশ হিসেবে স্বরূপ প্রকাশ করল। সমাজের নির্যাতিত মানুষেরা কবিতায় স্বীকৃত পেল, কাজী নজরুলের কবিতা তাঁদের ভাগ্যলিপি হয়ে দেখা দিল।’ (আহমদ ছফা ২০০৮/২: ২১৩) এই ‘নির্যাতিত মানুষের’ কাতারেই—অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য—দাঁড়াইয়া ছিল বাংলার মুসলমান সমাজ। নজরুল ইসলাম তাহাদের মুক মুখে নতুন ভাষা, অবুঝ হৃদয়ে নতুন আশা যোগ করিলেন। আহমদ ছফার কথায়, ‘মুসলমান সম্প্রদায়ের সমাজ অভিজ্ঞতায় বলিষ্ঠ এক কুশলী রূপায়ণ ঘটতে থাকে কাজী নজরুলের কবিতায়। ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ, রূপকথা, মুসলিম গৃহে উচ্চারিত আরবি, ফরাসি এবং উর্দু শব্দ সম্ভার কবিতায় এন্তার ব্যবহার করতে থাকেন তিনি নিঃসঙ্কোচে।’ (আহমদ ছফা ২০০৮/২: ২১৩)
সমস্যার মধ্যে, হিন্দু-পুরাণের সঙ্গেও নজরুল ইসলামের গভীর পরিচয় ছিল। কাজী আবদুল ওদুদ ইহার ব্যাখ্যা খুঁজিয়াছেন ইংরেজি কিম্বা শতাব্দীর সূচনায় স্বদেশী আন্দোলনে বাংলার হিন্দু জাতির সাফল্যের মধ্যে। তিনি লিখিয়াছেন ‘১৮৬৮ খৃষ্টাব্দের ওহাবী-বিদ্রোহ দমনের পরে থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের স্বদেশী আন্দোলন পর্যন্ত বাংলার মুসলমানের ইতিহাস মোটের উপর এক গভীর নৈরাশ্যের ইতিহাস। সেই নৈরাশ্যের কালোমেঘ তাদের চোখের সামনে খানিকটা কেটে গেল স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রে যখন আধুনিক শিক্ষার দিকে তাদের মন স্পষ্টভাবেই ঝুঁকে পড়লো। সেই দিনে বাংলার মুসলমানের জন্য—অন্তত শিক্ষিত মুসলমানের জন্য—আদর্শস্থানীয় ছিল বাংলার শিক্ষিত হিন্দু-সমাজ যদিও স্বদেশী আন্দোলনে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়া এই শিক্ষিত মুসলমানদের অনেকের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি।‘ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮১-৮২)

কাজী আবদুল ওদুদ খবর দিয়াছেন, ‘মনে পড়ে, ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ স্বদেশী আন্দোলনের কিছু পরে, কলকাতায় সদ্য-আগত তরুণ নজরুল ইসলামকে মোহম্মদ এয়াকুব আলি চৌধুরির মতো একজন চরিত্রবান্ ও ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান সাহিত্যিক বলেছিলেন: “আপনাকে মুসলমান বারীণ ঘোষ হতে হবে।”’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮২) কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালের শেষভাগে প্রকাশিত ‘অগ্নিবীনা’ কাব্য উৎসর্গ করিলেন সত্য সত্যই ‘ভাঙা বাংলা রাঙা যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্রিক বীর শ্রীবারীন্দ্র কুমার ঘোষ’ মহাশয়ের শ্রীচরণে। এই উৎসর্গটা অলীক নহে।
কাজী আবদুল ওদুদের হিসাব অনুসারে প্রথম যুগের নজরুল ইসলাম ছিলেন ‘খেলাফত-যুগের প্রতিনিধি স্থানীয় কবি’। আর এই খেলাফত আন্দোলনের প্রেরণা যোগাইয়াছিল ‘স্বদেশী আন্দোলনে বাংলার হিন্দুর সাফল্য’। খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে নজরুলের যোগ থাকিবার প্রমাণও দিয়াছেন কাজী আবদুল ওদুদ। লিখিয়াছেন: ‘তাঁর “মোর্হরম” কবিতার অধুনা-পরিত্যক্ত শেষ দুটি চরণ এই সম্পর্কে স্মরণ করা যেতে পারে—
“দুনিয়াতে দুর্মদ খুনিয়ারা ইসলাম—
লহু লাও, নাহি চাই নিষ্কাম বিশ্রাম।”
এই মানসিকতার নাম কাজী আবদুল ওদুদ দিয়াছেন ‘দিগদেশবিহীন এক বিক্ষুব্ধ মানসিকতা‘ বা ‘মানসিক কুয়াশা’। আবদুল ওদুদ স্বীকার করিয়া বলিতেছেন, ‘কিন্তু “বিদ্রোহী”তে তাঁর মানসিক কুয়াশা এতখানি কেটে যায় যে, তিনি যেন এক নতুন জীবন নিয়ে জেগে ওঠেন, নিজেকে ও জগৎকে দেখতে আরম্ভ করেন এক নতুন দৃষ্টিতে।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮২)
কিন্তু কেন এবং কিভাবে এই মানসিক কুয়াশা কাটিয়া গেল? এমনিতেই? না, কোন ঘটনার বা চিন্তাভাবনার আছরে? ইহার উত্তর তিনি দেন নাই। ইহার একটি উত্তর হইতে পারিত, নতুন তুরস্কের নেতা মোস্তফা কামালের সাফল্য তথা তুর্কি বিপ্লবের প্রভাব। এই বিষয়ে নিরুত্তর থাকাই শ্রেয় মনে করিয়াছেন কাজী আবদুল ওদুদ। অথচ ‘বিদ্রোহী’ রচনার আগের কবিতাগুলিকে খেলাফত যুগের কবিতা বলিতে তাঁহার বাধে নাই। খানিক উদ্ধার করিতেছি:
“১৩২৬ সালে—ইংরেজি ১৯১৯—সালে নজরুল ইসলাম যখন কলকাতার সাহিত্যিক-সমাজে পরিচিত হন তখনই এক হিসাবে তিনি ছিলেন বিদ্রোহী। সেদিনে বাংলার সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল সে কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে এই কথাও স্মরণ করা যেতে পারে যে, “বিদ্রোহী” প্রকাশের পূর্বেই “শাতিল আরব”, “মোহররম”, “কোরবাণী” প্রভৃতি যে-সব জনপ্রিয় কবিতা তিনি লিখেছিলেন সে-সবে ব্যক্ত হয়েছিল মুসলমান সমাজের গতানুগতিক জীবনের প্রতি ধিক্কার, এক বলিষ্ঠ নব জীবনারম্ভের জন্য তীব্র কামনা, আর অস্ত্রশস্ত্রের শক্তি ও মহিমায় তাঁর প্রত্যয়। এটি ছিল ভারতীয় মুসলমানদের জন্য খেলাফত যুগ।” (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৮২)
কাজী আবদুল ওদুদের নিরবতা নিরর্থক নহে। নজরুল ইসলাম মাত্র খেলাফত যুগের কবি নহেন, তিনি খেলাফত যুগকে ছাড়াইয়া তুর্কি বিপ্লবের বা কামাল যুগের কবি হইয়া উঠিয়াছিলেন—এই সত্য তিনি স্বীকার করিতে চাহেন না বলিয়াই এই নিরবতা আমাদের বিচারে এই নিরবতা নিছক নহে, অর্থপূর্ণ। ইহার কারণ কি এই হইতে পারে যে ওদুদ নিজেই কামালপন্থার একচেটিয়া দাবিদার? প্রমাণস্বরূপ কাজী আবদুল ওদুদ কর্তৃক ১৯৪৫ সালে লিখিত একটি নিবন্ধ হইতে উদ্ধার করিরতেছি:
“নজরুল যখন গণ-সংযোগে একান্ত রত সেই দিনে—১৯২৬-২৭ খৃষ্টাব্দে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে একটি ক্ষুদ্র মুসলিম চিন্তাশীল দলের উদ্ভব হলো। এই দলের মন্ত্র হলো ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আর নিজেদের তাঁরা ঘোষণা করলেন ‘কামাল-পন্থী’ বলে। সেই দিনে মুসলিম তরুণ-সমাজে এই দল একটি বিশিষ্ট চিন্তাধারা প্রবর্তিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এর সঙ্গে নজরুলের সংস্রব এর প্রভাব কিছু বাড়িয়েছিল।” (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৭৭-৭৮)

‘এর সঙ্গে নজরুলের সঙস্রব’? ইা কি ‘নজরুলের সঙ্গে ইহার সংস্রব? কাজী আবদুল ওদুদ যদি প্রকৃত সত্যবাদী হইতেন তো দ্বিতীয়টাই বলিতেন। কে না জানে, নজরুল ইলাম ১৯১৯ সনে ‘তুর্কি মহিলার ঘোমটা খোলা’ নামে প্রবন্ধ লিখিয়া তুর্কি বিপ্লবের শর্তাবহের ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন? এই বিশিষ্ট চিন্তাধারা কেন বিশেষ সফল হয় নাই সেই জিজ্ঞাসাও কাজী আব্দুল ওদুদ করেন নাই। তিনি শুদ্ধ জানাইয়াছেন, ‘কিন্তু অচিরেই ব্যাপকভাবে মুসলমান সমাজ থেকে এর প্রতি বিরোধিতা এমন প্রবল হলো যে যোগ্যভাবে কাজ করবার সুযোগ এর লাভ হলো মাত্র চার পাঁচ বৎসরের জন্য। এই সমাজ অবশ্য সক্রিয় ছিল আরো দীর্ঘ দিন। এর দুই এক জন সাহিত্যিক আজো একান্ত রত রয়েছেন সাহিত্য-সেবায়। কিন্তু ব্যাপকভাবে বাংলার শিক্ষিত মুসলমান সমাজে এঁদের প্রভাব আজ কম। এঁদের “বুদ্ধির মুক্তি”র মন্ত্রের পরিবর্তে বাংলার মুসলমান সমাজ আজ ব্যাপকভাবে নিতে চাচ্ছেন “আত্মনিয়ন্ত্রণের মন্ত্র।”’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৭৮)
নজরুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত কোন দলে পৌঁছিলেন? এই প্রশ্নেও কাজী আবদুল ওদুদ সম্পূর্ণ নিরুত্তর। তবে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণী’ দলের প্রতিনিধি পরিচয়ে তিনি—তখনও তরুণ—ফররুখ আহমদের নাম লইতে ভুল করেন নাই। ইহা ইংরেজি ১৯৪৫ সালের লেখা। কাজী আবদুল ওদুদ লিখিতেছেন: ‘আত্মনিয়ন্ত্রণী দলের সাহিত্যিক ও সাহিত্যোৎসাহীদের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য হয়েছেন ফররুখ আহ্মদ। তিনি ইকবালের অনুবর্তী হতে চেষ্টা করছেন যদিও ইকবালের দার্শনিক মেজাজ তাঁর নয়। তিনি তরুণ, কোনো বিচার-বিশ্লেষণ নয় সুপরিণতিই তাঁর জন্য আজ কাম্য।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৭৮) নজরুল ইসলাম ইসলামী ভাবধারা লইয়া কবিতা লিখিয়াছেন—একথা সত্য। শুদ্ধ সত্য নহে, সত্যের অধিক। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘নজরুল ইসলাম যেমনটি পেরেছেন অন্য কোন মুসলমান কবি বাংলা সাহিত্যে ইসলামি ভাবধারা নিয়ে [তেমন] সার্থক কবিতা লিখতে পারেন নি।’ (আহমদ ছফা ২০০৮/২: ২১৩)
কাজী আবদুল ওদুদ লিখিতেছেন, ‘নজরুল ইসলাম মুসলমানের প্রিয় হয়েছেন তাঁর ইসলামী কবিতা ও ইসলামী গান দিয়ে। তাঁর প্রভাবে সে সমাজে নব উদ্দীপনা এসেছে, একথাও সর্ববাদিসম্মত। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি গেয়েছেন হিন্দু দেব দেবীর মহিমার গান—এইটি তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের যথেষ্ট মনোদুঃখের কারণ।‘ আরো যোগ করিতে কসুর করেন নাই, ‘কিন্তু আশ্চর্য এই, নজরুলের প্রতিভায় একইি সঙ্গে ইসলাম-প্রীতি আর প্রতীক-প্রীতি কেন দেখা দিল সে সম্বন্ধে প্রশ্ন তাঁদের মনে তেমন জাগে না–অথচ নজরুল একই সঙ্গে ইসলামী কবিতা আর দেবদেবীর স্তোত্র লিখে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।’ (কাজী আবদুল ওদুদ ১৯৮৩: ৯১) এই ঘটনা ব্যাখ্যা করিবার জন্য কাজী আবদুল ওদুদ যথাক্রমে এয়ুরোপের ‘রেনেসাঁস’ বা নবজন্ম আর ‘ফেরদৌসীর প্রভাবে ইরানের রেনেসাঁস’ নামা দুই দুইটি ঘটনার কথা ভাবিয়াছেন। আশ্চর্য! এই তিনি এই প্রসঙ্গে কোথাও তুর্কি বিপ্লবের নাম পর্যন্ত মুখে আনেন নাই। এই একদেশদর্শিতা অত্যন্ত পরিতাপের জিনিশ।
কাজী নজরুল ইসলাম ‘ইসলামী’ কবিতা লিখিয়াছেন কিন্তু মাত্র ইসলামী কবিতা লিখিয়া ক্লান্ত হয়েন নাই। ফররুখ আহমদ প্রভৃতি অনুবর্তী কবির সহিত তাঁহার পার্থক্য এখানেই। ১৯৭১ সালের দিকে আহমদ ছফা একদা লিখিয়াছিলেন, ‘ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন যাঁদের স্বপ্ন এবং বিশ্বাস ইসলামী আদর্শের পুনর্জীবনের মধ্যে প্রোথিত, তাঁরা আজও নজরুলের পরিত্যক্ত জগতে অসহায় বন্দীর মত আটকা পড়ে আছেন।’ (আহমদ ছফা ২০০৮/২: ২১৪) স্বভাবতই প্রশ্ন জাগিবে নজরুল ইসলাম কেন ‘ইসলামী বিষয়’ লইয়া অনেক কবিতা এবং অসংখ্য গান লিখিয়াছিলেন। আহমদ ছফার মতে, ‘এটা আকস্মিক খাপছাড়া কোন ব্যাপার নয়।’ তাঁহার প্রস্তাব অনুসারে, ‘নজরুলের একটা স্থির লক্ষ্য ছিল। নজরুল ইসলাম, ইসলাম ধর্ম এবং বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যবর্তী ঐতিহাসিক ব্যবধানটুকু যথাসম্ভব কমিয়ে আনার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।’ আহমদ ছফার প্রস্তাবের মধ্যে আরো আছে: যে সমস্ত বিষয় মুসলমানদের প্রিয়, সেগুলো নিয়ে বাংলার মুসলমান সঙ্গত কারণে গর্ব করতে পারে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে [সেগুলোর] উদ্ভাসন না ঘটালে ভেতরে এবটা তাড়না সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাঁর রচিত ‘মোহররম’, ‘কোরবাণী’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজফহম’, ‘কামাল পাশা’, ‘উমর ফারুক’ এ সকল কবিতা তিনি সে কারণে লিখেছেন। (আহমদ ছফা ২০১১: ১১০)
এখানেই শেষ নহে। নজরুল ইসলাম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান শরিফের অনুবাদ (আংশিক হইলেও) করিয়াছিলেন। ধর্মপ্রবর্তক হজরত মোহাম্মদের জীবনচরিত লইয়া কাব্যও রচনা করিয়াছিলেন। অনুবাদ করিয়াছিলেন পারস্যের কবি হাফিজের গজল আর ওমর খৈয়ামের চতুষ্পদী কবিতাবলী বা রুবাইয়াত। এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের অর্থ কি? আহমদ ছফার জওয়াব আজও শুনিবার যোগ্য:
“মুসলমানদের মধ্যে যে হীনমন্যতাবোধের শেকড় প্রোথিত ছিল তার সেই মূলে আঘাত করে মুসলিম তরুণদের সৃষ্টিশক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের একটা সমন্বয় সাধনের প্রয়াস তিনি করে গেছেন। নজরুলের এ প্রয়াস কতটা সঙ্গত ছিল এবং তা করতে গিয়ে তাঁর সৃষ্টিক্ষমতা কিছু পরিমাণে হলেও অপচিত হয়েছে কিনা তা নিযে তর্ক চলতে পারে। কেউ কেউ নজরুলকে ধর্মীয় আদর্শের লাশ বহন করেছেন বলে অভিযুক্ত করতে পারেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম তাঁর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতির মধ্যে যে একটা যোগসূত্র স্থাপন করে দিয়েছিলেন, তার তো কোন তুলনা হয় না।” (আহমদ ছফা ২০১১: ১১০)
কাজী নজরুল ইসলামের আপন জবানেও এই প্রস্তাবের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ১৯২৭ সালের এক চিঠিতে নজরুল লিখিলেন: ‘আমি জানি যে, বাঙলার মুসলমানকে উন্নত করার মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এদের আত্ম-জাগরণ হয়নি বলেই ভারতের স্বাধীনতার পথ আজ রুদ্ধ!’ (কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৮৪: ২৮৬)
এক্ষণে আমার দোসরা প্রশ্ন। নজরুল ইসলাম যাহার ভাবে প্রভাবিত হইয়াছিলেন তাহার নাম কি খেলাফত আন্দোলন না তুর্কি বিপ্লব? যদি এই পদার্থের নাম বা পদ তুর্কি বিপ্লব হইযা থাকে তবে তাহার প্রকৃতি কি? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বাংলাদেশে খেলাফত যুগের অন্যতম নেতা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর সহায়তা লইব। এছলামাবাদী সাক্ষ্য দিয়াছেন, বাংলার মুসলমান সমাজকে রাজনৈতিক আন্দোলনে, বিশেষ জাতীয় স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনে টানিয়া আনার বিষয়ে তুরস্কের ঘটনা বড় এক প্রস্ত ভূমিকা পালন করিয়াছিল। বাংলার মুসলমানরা প্রথম দিকে রাজনীতিতে শামিল হইয়াছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সমর্থক পরিচয়ে। সেই পরিচয় কাটাইয়া জাতীয় আন্দোলনে যুক্ত হইতে তাহাদের সাহায্য করিয়াছিল তুরস্কের কাহিনী। মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী লিখিয়াছেন:
“যে মোগল পাঠানের স্মৃতি ভারতের প্রত্যেক নদ-নদী ও বৃক্ষ-লতা এমন কি প্রত্যেক অনুপরমাণু হইতে জাগিয়া উঠিতেছে—সেই ভারতের মোছলমান আজ সুপ্ত, অধঃপতিত, লাঞ্ছনা ও অবমাননার চরম স্তরে নিপতিত—ইহা ভাবিতেও মানুষ বিস্ময় ও ক্ষোভে বিমূঢ় হইয়া পড়ে। অল্পদিন হইল তাহাদের রাজত্ব গিয়াছে কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক জাতির পক্ষে কিরূপে যে রাজনীতিক চর্চ্চা ও উচ্চ-আকাক্সক্ষা পোষণের পবিত্র ও মনুষ্যোচিত ভাব দূরীভূত হইয়া যাইতে পারে তাহা ভাবিতে গেলে স্বপ্নকাহিনী বলিয়া প্রতিপন্ন হয়।” (মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ১৯৯৩: ২৯০)
মৌলানা আরও লিখিয়াছেন: ‘হিন্দু ও পার্সীরা যখন ভারতে স্বায়ত্ত্বশাসন লাভের জন্য কংগ্রেস স্থাপন করিলেন, তখন মোছলমানগন সে আন্দোলন হইতে ভিন্ন হইয়া থাকিলেন বরং তাঁহারা ছরকার বাহাদুরের পক্ষ সমর্থন করিয়া কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করিলেন। আলিগড়ের শিক্ষা সমিতিকে কংগ্রেসের প্রতিযোগী সমিতিরূপে খাড়া করিয়া মোছলমানদিগকে রাজনৈতিক ক্ষেত্র হইতে দূরে সরাইয়া রাখিবার চেষ্টা করা হইতেছিল। মোছলমান মনে করিতেছিলেন—রাজনৈতিক অধিকার লাভ করা মোছলমানের কাজ নহে। ইহা হিন্দুদের জন্যই শোভা পায়।’ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী লিখিয়াছেন, সেই সময় ‘রাজনীতিক আন্দোলন মোছলমানের পক্ষে যেন হারাম বলিয়া গণ্য হইতেছিল।’ বিষয়টা তিনি বিশদ করিয়াছেন এইভাবে: ‘মোছলমান ছরকার বাহাদুরকে সর্ব্বদা সন্তুষ্ট রাখিয়া যেন তেন প্রকারে দু’একটী কেরাণীগিরি অথবা ডবডিপুটী ও ডিপুটিগিরি পদ লাভ করিতে পারিলেই যথেষ্ট, ইহার অধিক আর কি বাঞ্ছনীয় হইতে পারে। এমন কি ঐ সময় যে ২/৪ জন মোছলমান কংগ্রেসে যোগ দিতেছিলেন—তাঁহারা খাঁটী মোছলমান শ্রেণী হইতে একটী স্বতন্ত্র জীব বলিয়া গণ্য হইতেন। এ লাঞ্ছনা মোছলমানগণকে আজ হইতে ৭/৮ বৎসর পূর্ব্ব পর্য্যন্ত ভোগিতে হইয়াছে। রাজনীতিক আন্দোলন মোছলমানের পক্ষে যেন হারাম বলিয়া গণ্য হইতেছিল। (মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ১৯৯৩: ২৯০)
মুহম্মদ এনামুল হক তুর্কি বিপ্লবে ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থনকে দুই দিক হইতে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তাহারা একদিকে যেমন তুরস্কের সাফল্য কামনা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের সহায়তায় আগাইয়া গিয়াছিলেন তেমনি অন্যদিকে নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুর্কি জাতির আর্থিক ও নৈতিক সমর্থনের স্বপ্নও দেখিয়াছিলেন। ইহার এক কারণ, ‘শুধু বাঙ্গালী মুসলমানরা কেন, গোটা পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও কোন দিন তুর্কীদেরকে বিদেশী বলে মনে করেনি; বরং একই ধর্ম বিশ্বাস এবং আচারনুষ্ঠান অনুযায়ী ভাই বলে মনে করেছে। নিজেদেরকে তুরান বা তুর্কীস্থান থেকে আগত বলে মনে করেন এমন অনেক বাঙ্গালী মুসলমানও তুর্কীদেরকে তাদের জ্ঞাতি বলে বিশ্বাস করেন।’ মুহম্মদ এনামুল হক উল্লেখ করিতেছেন, ‘কাজেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন খৃষ্টান শক্তিবর্গের কুচক্রে তুর্কী জাতি ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে প্রায় লুপ্ত হতে যাচ্ছিল তখন তারেদ দুঃখ এবং মনোপীড়ায় অবাধ ছিল না। (মুহম্মদ এনামুল হক ১৯৯৭: ৩৫৯)
এই মনোপীড়াই খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত হইয়াছিল। ইহার মধ্যে কিন্তু সত্য ছিল। সত্যের সহিত অলীক পদার্থও কম ছিল না। বাংলা-ভারতের মুসলমান সমাজের মোকাবেলার চিন্তা এই অলীক পদার্থে ভরপুর ছিল। মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী নিজেই তো লিখিয়াছিলেন: ‘মহামান্য তুরস্কের সোল্তান সমগ্র ইসলাম-জগতের হৃদয়-রাজ্যের অধীশ্বর। তিনি “আমিরুল-মোমেনিন” ও “খলিফাতুল-মোস্লেমিন” উপাধিতে বিভূষিত। মুসলমান সমাজ তাঁহার সুখে, সম্পদে সুখী এবং তাঁহার দুঃখে দুঃখী। তুরস্ক বা ‘রুমে’র নামে মুসলমান মাত্রই মাতোয়ারা। কনস্ট্যান্টিনোপল তুরস্ক-সম্রাটের রাজধানী এবং ইসলাম জগতের কেন্দ্রভূমি।’ (এছলামাবাদী ১৯৯৩: ১৫৬)
তুরস্কের ওসমানিয়া বংশীয় সম্রাটের যে শেষ পর্যন্ত তুর্কি জাতির পুনর্জাগরণের পথের কাঁটাস্বরূপ হইয়া বসিয়াছে তাহা সেদিন বাংলা-ভারতীয় মুসলমানদের পক্ষে বলা তো দূরের কথা, জানাও সম্ভব ছিল না। সম্ভব হইল যখন প্রথম এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধে তুরস্ক পরাজিত হইল এবং তুরস্ক সম্রাট নিজের নামকা ওয়াস্তে সিংহাসন বাঁচাইবার লোভে এয়ুরোপিয়া বিজেতাদের ক্রীড়নক হইয়া তুর্কিজাতির জাতীয় স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে কসুর করিলেন না তখন। এক পর্যায়ে তুর্কিজাতির নতুন নেতা মোস্তফা কামাল প্রমাণ করিলেন খোদ তুরস্কের সম্রাটই তুর্কিজাতির শত্রু এবং মুসলমান জগতের কলংকস্বরূপ। এখন ভারতীয় মুসলমানরা দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেলেন। যাহারা তুর্কি জাতির পুনর্জাগরণে আনন্দিত হইলেন নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁহাদের দলে। তিনি মোস্তফা কামালকে বাংলাদেশে আমদানি করিতে আগ পাড়াইয়া গেলেন। কাজী আবদুল ওদুদও কম যান নাই। কিন্তু গেলেন নজরুল ইসলামের পিছে পিছে।
এক্ষণে নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে আমাদের প্রশ্ন হইতেছে তিনি কিভাবে, কখন এবং কেন তুর্কি বিপ্লবের সমর্থক হইয়া উঠিলেন? খোদ তুর্কি বিপ্লবের গতিবিধি খানিক পর্যালোচনা না করিলে বিষয়টি পরিষ্কার হইবে না। মুহম্মদ এনামুল হক লিখিতেছেন, ‘তুরস্কে তিনি [মোস্তফা কামাল[ যে সংস্কার সাধন করেছেন, তা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক, মৌলিক এবং বৈপ্লবিক। কেবল মাত্র মুষ্টিমেয় লোকই তা সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন।‘ (মুহম্মদ এনামুল হক ১৯৯৭: ৩৫৯)
‘বিশ্বের মুসলমানদের পুরাতনের প্রতি প্রগাঢ় ভঙ্গি এবং তার সাথে ধর্ম হানির একটা ভ্রান্ত ভীতি ছিল বলে তাদের মনে এই সমস্ত সংস্কার কঠিন আঘাত হানল। তাঁদের নিকট কামাল এবং তাঁর জাতীয়তাবাদী দলের এহেন কার্যকলাপ ধর্মবিরুদ্ধ বলে মনে হলো। তাদের ধর্মানুভূতি জাগ্রত হওয়ার ফলে মুসলমানদের মনে তুর্কীদের এসব অধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি হল। বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মনে কামালের এরূপ কার্যকলাপ অসন্তোষ মিশ্রিত এক বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করল, কারণ তারা এতদিন খৃষ্টান জগতের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাদের স্বধর্মী তুর্কী জনগণের সাফল্যকে খোদার দান হিসাবেই সাগ্রহে লক্ষ্য করে আসলিছ।’
তুরস্কের মুসলমান কি পদার্থ ছিলেন তাহা তুরস্কের মুসলমানদের মতো ভারতের মুসলমানদের জানার কথা নহে। তুরস্কের বিষযে তুর্কি জাতির নেতৃত্ব মানিয়া লইতে কয়েক বৎসর লাগিয়াছিল বাংলার মুসলমানদেরও। ‘আস্তে আস্তে মুসলমানদের নিকট একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে পার্থিব ক্ষমতাচ্যুত খলিফা খৃষ্টান জগতের পোপের নামান্তর বই আর কিছু নয়। এ অবস্থা মুসলমানদের মোটেই কাম্য ছিল না।’ (মুহম্মদ এনামুল হক ১৯৯৭: ৩৬০)
মোস্তফা কামাল ১৯১৯ সালে তুরস্ক সম্রাটের সেনাবাহিনী হইতে পদত্যাগ করিয়া জাতীয় আন্দোলন গঠন করিতে শুরু করিলেন। ১৯২০ সালে তিনি নতুন তুরস্কের জাতীয় মহাসভা বা ‘বুয়ুক মিল্লি মজলিসি’ স্থাপন করিয়া নিজে সেই সভার সভাপতি হইলেন। ১৯২১ সালে তাঁহার সামরিক বিজয় সূচিত হইল। ১৯২২ সালে তিনি বিদেশি দখলদার—বিশেষ গ্রিক সেনাবাহিনীকে পরাজিত করিলেন। ১৯২৩ সালের মধ্যে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করিলেন। তিনি তুরস্কের সুলতান পদ ১৯২২ সালে বিলুপ্ত করিয়া ১৯২৩ সালে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র গঠন করিলেন। ১৯২৪ সালের গোড়ায় মুসলমান জগতের খলিফার পদও বিলুপ্ত করিলেন। পর্যায়ক্রমে তিনি তুরস্কের সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক পরিবর্তন ঘটাইলেন। এই ঘটনাগুলির নামই এতদিনে দাঁড়াইয়াছে তুর্কি বিপ্লব। এই ঘটনাকে বিপ্লব বলা যায় কিনা তাহা লইয়া কাহারও কাহারও সংস্কার থাকিতে পারে।

দোহাই
১। আনিসুজ্জামান, নজরুল ইসলাম ও তাঁর কবিতা, নজরুল ইসলাম, মুস্তফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত, (করাচী: বাংলা বিভাগ, করাচী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৯)।
২। আবদুল কাদির, ‘সম্পাদকের নিবেদন’, নজরুল রচনাবলী: ১ম খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, (ঢাকা: কেন্দ্রীয় বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড, ১৯৬৬)।
৩। আবদুল কাদির, ‘সম্পাদকের নিবেদন’, নজরুল রচনাবলী: ৫ম খণ্ড ২য় অংশ, আবদুল কাদির সম্পাদিত, (ঢাকা: বাংলা একাডেমী ১৯৮৪)।
৪। আহমদ ছফা, ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’, আহমদ ছফা রচনাবলী, উত্তর খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১), ৯৮-১১১।
৫। আহমদ ছফা, ‘বাংলার সাহিত্যদর্শ’, আহমদ ছফা রচনাবলী, ২য় খণ্ড, (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ২০৩-২১৪।
৬। ইব্রাহিম খাঁ, বাতায়ন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৬৭)।
৭। কাজী আবুদল ওদুদ, ‘মুস্তফা কামাল সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’, কাজী আবদুল ওদুদ রচনাবলী, ১ম খণ্ড, আবদুল হক সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮), ৫-১০।
৭। কাজী আবুদল ওদুদ, ‘নজরুল প্রতিভা’, কাজী আবদুল ওদুদ রচনাবলী, ১ম খণ্ড, আবদুল হক সম্পাদিত, (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮), ৪২৬-৪৩৬।
৮। কাজী আবুদল ওদুদ, শ্বাশ্বত বঙ্গ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩)।
৯। কাজী নজরুল ইসলাম, পত্র নং ‘একত্রিশ’, ২৭৫-২৮৭, নজরুল রচনাবলী: ২য় খণ্ডঅর্ধ. আবদুল কাদির গং সম্পাদিত, (ঢাকা: বাংলা একাডেমী ১৯৮৪)।
৯। কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী: ২য় খণ্ড আবদুল কাদির গং সম্পাদিত, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী ২০১১)।
১০। কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী: ১ম খণ্ড আবদুল কাদির গং সম্পাদিত, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী ২০০৬)।
১১। কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী: ৭ম খণ্ড, আবদুল কাদির গং সম্পাদিত, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী ২০০৬)।
১২। [নীরদচন্দ্র চৌধুরী?], ‘পুস্তক পরিচয়: সর্ব্বহারা-কবিতা পুস্তক’, প্রবাসী, ২৭শ ভাগ, ১ম খণ্ড, ১৩৩৪, ২৬৯।
১৩। মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: মুক্তধারা, ১৯৭৩)।
১৪। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সমকালে নজরুল ইসলাম (ঢাকা: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ১৯৮৩)।
১৫। মুহম্মদ এনামুল হক, ‘বাঙালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব,’ মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, ৫ম খণ্ড, মনসুর মুসা সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭), ৩৫৭-৩৬৫।
১৫। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ, সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত অনূদিত, পুনর্মুদ্রণ (আমেদাবাদ: নবজীবন পাবলিশিং হাউস, ১৯৬৬)।
১৬। মনিরুজ্জামান, ‘নজরুল কাব্যের চিরন্তন মূল্য’, নজরুল ইসলাম, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত, (করাচী: বাংলা বিভাগ, করাচী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৯)।
১৭। রফিকুল ইসলাম, নজরুল-জীবনী, নতুন সংস্করণ (ঢাকা: নজরুল ইন্সিটিটিউট, ২০১৩)।
১৮। শংকর ঘোষ, বাবু ও বিপ্লবী (কলিকাতা: উর্বী প্রকাশন, ২০১০)।
১৯। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আমার বন্ধু নজরুল (কলকাতা: হরফ প্রকাশনী, ১৯৬৮)।
২০। সজনীকান্ত দাস, আত্মস্মৃতি, পুনর্মুদ্রণ (কলিকাতা: নাথ পাবলিশিং, ১৯৯৬)।
২১। সুশীল কুমার গুপ্ত, নজরুল-চরিত মানস, ৩য় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ (কলিকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৩৮৪)।
২২| Bernard Lewis, The Emergence of Modern Turkey, 3rd ed. (New York: Oxford University Press, 2002).
২৩| Feroz Ahmad, The Making of Modern Turkey, reprint (London: Routledge, 2000).
২৪| Howard M. Sachar, The Emergence of the Middle East: 1914-1924 (New York: Alfred A. Knopf, 1969).
২৫| Manabendra Nath Roy, M. N. Roy’s Memoirs, reprint (Delhi: Ajanta Publications, 1984).

২৬। মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, মনসুর মুসা সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫), ৪৫৭-৪৬৮।
২৭| Nirad C. Choudhuri, Autobiography of an Unknown Indian, Part II: India 1921-1952, reprint (Mumbai: Jaico Publishing Hous, 2008).
২৮| Mriti Kumar Mitra, The Dissent of Nazrul Islma: Poetry and History (New Delhi: Oxford University Press, 2007).

২৭ আগস্ট ২০১৪, arts.bdnews24.com

THE ORIGINS OF COMMUNALISM

Politicians, journalists, writers and intellectuals are used to saying that people have been living with “communal harmony” in this region for a thousand years. Do you agree with this statement?

How can one talk of ‘communal harmony’ without identifying what one means by a ‘community’ or its derivative ‘communal’ for that matter? They signify completely antithetical stuff in South Asia and in most of the world. ‘Communalism,’ is an extraordinary word. It’s a special gift of India to the English vocabulary. It signifies something completely different in South Asia than what it does, say, in North America. It hits like ‘fascism’ in your face. However, it is a British import to India, it thrived well there. I would go so far as to say that the British conquest of India would not have been complete without it. Many Indians, or a good majority of them, stood behind it, didn’t they?
I think it suffices to cite Rabindranath Tagore, just for one, who too succumbed to this hideous ideology of communalism, in so far as he too considered the six centuries of Muslim rule in South Asia as ‘foreign’ (bideshi) rule and equated that with British rule. This was Tagore in his middling years, say around age 45 to 50. Did he ever shy away from this position? I am sorry to say, never, at any rate not entirely. For him, as for many others in late nineteenth and early twentieth century, Mughal rule or pre-Mughal rule in South Asia was just as foreign as British rule. And I believe this world view lies at the root of communalism in Indian history. It originates in the view that Indian history might be divided into Hindu, Muslim and British eras. Curiously, one does not find the British as Christian era.
Ever since Islam came to Bengal, and I cannot vouch for India as a whole, until the advent of the British you cannot find any evidence of what may be called ‘communal’ riots or communal warfare. As the late Professor Abdur Razzaq used to say, you cannot cite one single war between a Muslim king and a Hindu king fighting on communal ground.
Interestingly, Akbar in trying to occupy Bengal in that good old imperial manner sent a Rajput general Mansingh. And he was opposed by Raja Pratapaditya of Jessore, Isha Khan of Mymensing and many others (the legendary twelve feudal kinglets), wasn’t he. So both Hindus and Muslims, in a manner of speaking, opposed Akbar. It cannot be depicted a Hindu struggle against a Muslim king. In modern parlance we can say it was a political struggle for regional autonomy. One refers to occasional clashes between some Muslim clerics or Qazis with sundry Hindu priests, as one finds in the biographical accounts of Chaitanya. But I don’t think they reflect patterns of conflict.
It is only in this sense that, namely by postulating an absence, one can say communities lived in communal harmony. There was hardly a Muslim community by the 16th century in Bengal. But who can say that there were no conflicts or contradictions. Again this presupposes the meaning what do you mean by harmony? I would define it in a negative way. By excluding warfare I will call it harmony. In the five hundred years or so before the British presence you would hardly locate one single fight or war exclusively between Hindus and Muslims, or between Buddhists and Muslims.

Do you think the term ‘minority’ while referring to people of a particular faith is a contradiction to democratic ideals?
It all depends on what do you mean by community, again. If the nation is a community then how is it constituted? In one view, the nation is composed of its members, the ‘population’ as it is called today. Fie, we don’t even use the word “people” any longer, we call it “population”. There is a mechanisation of the concept of the “people”, it has been turned into a statistic, i.e. the “population”. Now the population consists of men and woman, nearly 50 percent are man and 50 percent are woman, which is called sexual division, a division not unlike those based on religion, race and caste. See the constitution of Bangladesh, article 121, if you are curious.
Thus in Bangladesh, there are no constitutional minorities in the religious, racial, caste, or gender senses. But there is history. Take, for instance, ‘scheduled caste’, introduced in the censuses taken onwards from 1872. What is a member of a “scheduled caste”, but a euphemism for “outcaste” or untouchables? Mohandas Gandhi’s invention “Harijan” is but a shrewd metaphor for that isn’t it? Whether you are a minority or majority depends on what definition of community you take for your wonder.
In Bengal, interestingly, the Hindus had been shown to be a numerical minority ever since 1872, the year the first British census was published. Up until then, Hindus were supposed to be in a majority in Bengal. Bankimchandra Chattopadhyay, for one, comments on this. He opined, citing British ethnologists, that it is by conversion that Muslims have become a majority in Bengal. Muslim aristocracy in Bengal took exception. Khondokar Fazle Rabbi, Dewan of Murshidabad, in his Persian text “Hakikate Muselmanan i Bangala” (or its English version ‘Origins of the Mussalmans of Bengal’) claimed Arabian, Persian or central Asian descent for them. This is, as they say, history. The facts are otherwise. As many as ninety-nine out of hundred Bengal Muslims are by common consent considered Bengali Muslims.
The point the communal differences are products of ideologies, of creeds, faiths, and religious identities. After 1947, when Bengal was partitioned, parts of Bengal which were Muslim majority constituted East Bengal, parts inhabited by Hindu majority (not only presidencies or divisions but district also) were put in West Bengal.  Majority and minority were census categories, and then it became political ones.
What are the results/implications of policies formed by the imperial British Raj in the Indian Subcontinent? How do you evaluate the policies of pre-partition British rule?
In Bangladesh people are oblivious of history, especially of the colonial era. It is unfortunate, indeed! The fabric of our polity today is a text woven in the warp and woof of events both pre-1947 and post-1947. The British in India found their main stake, their fundamental article of faith, in the concept of community along religious lines. The British thought they could rule India by harping on it. They did succeed in extending their tenure for 190 years, at any rate in Bengal. If this was possible because of mixing ice with wine, or politics with religion, why won’t people exploit the legacy?
To be honest, India faced its biggest crisis ever in the eighteenth century. The Mughal were losing control over its “successor states”- Bengal, Awadh, and Hyderabad. And “challenger states”- the Marathas, the Sikhs, and Mysore were waxing in your face, without being themselves strong enough to deter the usurpers from Europe.
So eighteen century India was suffering from what one should describe, using a Gramscian term, as an “organic crisis of the state”. The Mughal state was collapsing but no local successor state or rival power could claim suzerainty over the whole of India. It was in this interregnum or interlude that the British entered the stage. But the British were not alone. You know, they had strong competitors, namely the French, the Dutch and many other Europeans.
Not unlike Europe, India is a multinational continent. This is a fundamental truth. But the British pretended that India was neither a nation, nor was it a conglomerate of nations. They upheld the view that the only nations in the continent could be ‘Hindus’ and ‘Muslims’. This was a Manichean super-imposition on an otherwise very colorful map.
India had many as, let’s say, more than 50 nations. Whatever definition you use Bengal by the time was evolving as a colourful nationality, if not a full-bloomed Bengali nation. But the British would not allow it. So, they demanded, be a Muslim or be a Hindu. And Bengali Hindus actually stepped into the shoes which the British left for them. Rabindranath Tagore’s grim instance that I was forced to cite earlier is only a mild testimony to this misfortune.
Caste (or kind of upper class) Hindus of Bengal thought it better to be Indians than being Bengalis. Thus they went for Indian nationalism in 1947 under Shyama Prasad Mukherjee, MLA from the Calcutta University. He was president, by the way, of Hindhu Mahashabha. The Bengal leadership of the Indian National Congress, went along. In India, by 1947, communal identities overwhelmed national identities.
India was never a nation, but a collection of nations or ‘nationalities’ if you prefer. So one may call it a ‘civilization’, it is not a nation, at any rate not yet. But before the idea of nation matures the British fostered the idea that the two great religious communities are two nations in India. What about other communities? For truth’s sake, there should have been as many nations as there were communities.
Ostensibly, it was the Muslims of India, especially the aristocrats, who put forward this demand. But the truth was that the Muslims put forward their demands in reaction to the developments in late 19th century, especially after the exclusion of Muslims in the Governor-General’s Legislative Council in 1892. So the organic crisis that led to the usurpation by foreigners of India’s administration in the 18th century continued throughout the 19th century by a different path to mutation. The sense of nationality was converted to a religious communal sense. And this was not without its repercussions. Today’s India is a multinational state. So is today’s Pakistan and Bangladesh. Even Bangladesh is also a multinational state. But the ruling classes would not admit that honestly. They are trying to suppress the word ‘Advasi’, for instance. In other words, they are trying to suppress national minorities.
In order to understand origins of the communal problem in Bangladesh well one must refer to India. This may sound not well advised. But it is true. Our borders, especially cultural ones, are porous. And what we see in Bangladesh as communalism is more often reverse communalism. It is most often the flip side of communalism in India. Communalists of all nations are united in one thing, they are oppressors. Therefore communalists in India, Pakistan, Bangladesh they are part of a South Asian communalist international, so to speak. In order to resist them you should form a people’s international, there is no exit outside. Exactly as the case was in the 18th century, so it is going on today. The 20th century, its second half especially saw the worst. Alas, it is not yet over, not in the 21st either. The Indian state (officially secular) in this regard is a failed state, so is the (officially communal) state of Pakistan, (officially semi-communal) Bangladesh proves not exception. None of these states could put it the legacy of communalism behind. Communal conflicts do flourish, with official and sometimes civil social support, everywhere. That means the organic crisis with the British inherited and passed on continues to this day.
It has not been solved. Why, on earth? For a fundamental social revolution has not been carried out. 1947 is not a fundamental social revolution and I’m very sorry to observe it despite my great commitment to 1971 warfare I must admit that we are a failure sate. The revolution has become “passive”, to use again a Gramscian signifier, which in Bangla we sometimes translate it as “Behat”. Even 1971, our liberation war, could not put an end to the legacy of 1947. So it remains as a half-baked revolution. Our struggle continues. Bangladesh must accomplish a social revolution, which alone can make the communal question perhaps completely superfluous. Why do we need to continue? For it is a continuation of the unfinished struggle against British colonialism.

Why do you think people believe in rumours?
Why people buy, you ask, rumours? It is a very metaphysical question. Our minds are hungry, or thirsty if you prefer. If you are not going to feed them with the right stuff they are going to purchase the wrong. Getting them the right thing, I mean politically right thing, is your business. A Bengali daily, namely Inqilab (what an irony) recently published in its columns a rumor that the Indian army came into the terrain of Bangladesh, intervening in Satkhira. Why was it that they alone were the ones to find it out? Or take the instance of the group named Hefajate Islam. I refer to the incidents on the day and night of May 5-6 in Dhaka. Some human rights organisations claimed first and then at least 61 people being killed. Whatever happened to those claims? These are classical examples of rumors. The point is why whould you lend your ears to this tales, if you too don’t have a felt gap?
Rumours spread the truth in a fictional way. So what is fiction here? That the Indian Army came to Bangladesh to repress political dissidents is the fiction. What is the truth, then? It is that there is a fear in the mind of the people. That India might come is the truth. Truth, unfortunately, is always structured in the form of a fiction. I borrowed this thesis from a Frenchman. You know him, Jacques Lacan, the great Freudian psychoanalyst. Fiction stands at an angle to the truth.
I would say many a citizen in Bangladesh feel they are dominated by the colossus India. Everybody knows it and yet nobody admits to know it. That is why this repressed social truth gets around in a fictional form and often gets credence, even at times can become truly popular.
That the Indian army might one day invade that is a fear in the mind of the people. Why, because Indian market has already invaded it, hasn’t it. Bangladesh-India economic relation portends worse. It is already pretty bad in the imaginary. There already exists the anxiety that Bangladesh has become a colony of India, economically speaking. Also there is cultural invasion, the unevenness of the playing field, for all to see but the wide-eyed blinds.  Is there a future for a home market, I mean a national economy space, an industrial base, for Bangladesh? So the fear is real. It is however only a short road, and transport is cheap too, to rumor and people buy it.
Rumors are sustained by anxieties, in fact. But what is an anxiety? It comes out of trauma, real or imaginary, or it may originate in a persistent repression. And traumas get embedded, in many cases, in a psychotic structure. Communal riots are one of them. They are a good mixture of imaginary and the real.
Bangladeshi Hindus got nothing to do with anything being done by communal parties in India. But why not only Jamaate Islami, but even a ruling political party, would hold the Bangladeshi Hindus responsible on that account? There is political machination, relating to war crimes trial and contested elections, in the recent communal attacks on poor Hindu communities throughout the length and breadth of the country. There is a social imaginary behind it.
But in many communal slaughters in India, as in Awadh or in Gujrat, even in New Delhi, there had been many examples of a social psychosis. In Bangladesh all those who vote for Awami League, the present ruling party, are not Hindus, nor do all Hindus vote for Awami League. Why then only the Hindus are being selectively attacked? Why the opposition parties, especially BNP, don’t take a strong stand against such crimes? This is a perversion.
That is why one can claim rumors are riots in ideological form; so may one call these communal attacks a kind of rumors in uniform, weapons in hand.

 

24 January 2014, The Daily Star, Star Magazine

বিচারপতি হাবিবুর রহমান: মহাপ্রয়াণের পর

কিমাশ্চর্যম্! টানা আট বছর কোমায় থাকার পর গতকাল–১১ জানুয়ারি ২০১৪–পশ্চিম এশিয়ার ত্রাস জঙ্গিরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের, অনেক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করিয়া ১৯৮২ সনে লেবাননের দক্ষিণে দুই ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে বিস্তর অসামরিক নিরস্ত্র মানুষকে পাইকারী হারে হত্যা করিয়াছিলেন তিনি। শিবির দুইটার নাম শাবরা ও শাতিলা।

গায়ের জোরে তিনি রেহাই পাইয়াছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই বাবদ তাঁহাকে আজও ক্ষমা করে নাই। আমি সন্ধ্যায় এই খবরটা দেখিয়া ঘুমাইতে গিয়াছিলাম। সকালে ঘুম হইতে জাগিয়া পত্রিকায় দেখিলাম আরেক শিরোনাম: ‘আরেক এক গুণীজনের প্রস্থান’। বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেব গত হইয়াছেন গতকাল। গতকাল ছিল ১১ জানুয়ারি। কিমাশ্চর্যম্! বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ জানুয়ারি একটি আশ্চর্য দিন।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হিসাবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের জন্ম হইয়াছিল ইংরেজি ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। অতয়েব হিসাবমাফিক বলিতে তিনি ৮৫ বছর পরমায়ু পাইয়াছিলেন। আমার পরম সৌভাগ্য ২০০০ সালের পরে কোন এক সময় তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়াছিলাম। এমনকি বার কয়েক ইস্কাটনের উপকণ্ঠে ইস্পাহানি উপনিবেশে তাঁহার বাসাবাড়িতে তাঁহার মহান সান্নিধ্যও লাভ করিয়াছিলাম। সাবেক সরকার প্রধান বলিয়া তাঁহার বাসার সামনে একটি কি দুইটি পুলিশের লোক দণ্ডায়মান থাকিত।

শুমার করিয়া দেখিতেছি বয়সে তিনি আমার তিরিশ বছরের বড় ছিলেন। কিন্তু ব্যবহার দেখিয়া কখনও কখনও বুঝিতাম তিনি আমার সহিত বয়স্যোচিত আচরণই করিতেছেন। তিনি নানাবিদ্যায় এবং নানান বিদ্যায় মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। এমন কি কবিতার মতন ক্ষেত্রেও তিনি কখনও কখনও কাচা ফসল ফলাইয়াছিলেন। সাহিত্যের নানারাজ্য-পর্যটক রাজু আলাউদ্দিন তাঁহার রূপক নাম রাখিয়াছেন ‘গালিভার’। আর এক আলোক-বিশারদ সাজ্জাদ শরিফ তাঁহাকে বলিয়াছেন ‘আলোর দিশারি’। দুইটি উপাধিই যথার্থ হইয়াছে।

যখন তাঁহার পরিচয় লাভ করিয়া ধন্য হই ততদিনে তিনি সাবেক হইয়াছেন। সকলেই বলিতেন তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা।’ পত্রিকা সম্পাদকরা শুদ্ধ ব্যাকরণে লিখিতেন ‘সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।’ যতদূর মনে পড়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সহিত আমার পরিচয় ঘটাইয়া দিয়াছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। আজিকার ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার প্রথম পাতায় তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার কিয়দংশ উদ্ধার করিবার উপযুক্ত। কি কঠিন সময়ে না দেশ পরিচালনার ভার কাঁধে লইয়াছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান! তাঁহার পথ ফুলে ফুলে ছাওয়া ছিল না।

সাজ্জাদ শরিফ লিখিতেছেন, ‘বাংলাদেশের অবিশ্বাসের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সুচারুভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন।’ তাহা সত্ত্বেও স্বীকার করিতে হইবে তিনি সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। নির্বাচনে যাঁহারা সেইবার পরাজিত হইয়াছিলেন তাঁহারা নির্বাচনের পর তাঁহার বাড়িঘরে পর্যন্ত হামলা করিয়াছিলেন। কথাটা সত্যই মিথ্যা নহে।

তাঁহার অন্যতর কীর্তির কথা সাজ্জাদ শরিফ উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে: ‘এ দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বিদ্রোহ করলে জাতির উদ্দেশে এক নেতাসুলভ প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে সুসংবদ্ধ ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’ এই কথাটাও সত্য। অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

কিন্তু চাঁদেরও কলঙ্ক আছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ভরাযৌবনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষা করিবার আন্দোলনে এক প্রকার নেতৃত্ব দিয়াছিলেন। দেশ স্বাধীন হইবার পর একসময় প্রায় কুড়ি বছর ধরিয়া তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক পদে আসীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধান বিচারপতিও হইয়াছিলেন। ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’–সংবিধানের এই প্রস্তাবনার তাৎপর্য কি? তাহা কি তিনিও ধরিতে পারেন নাই? সমালোচকরা বলিতেছেন তিনিও রাষ্ট্রভাষায় আদালতের রায় বিশেষ লেখেন নাই। কেন এমন হয়?

উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রবর্তনে তাঁহার ভূমিকা তিনি পালন করিয়াছেন। তবে পরে। অবসর গ্রহণের পরে তিনি অনেক প্রবন্ধে এই বিষয়ে তাঁহার মতামত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখিয়াছেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের মত বাংলাদেশে আদালতের ভাষাও বাংলা হওয়াই উচিত। দুঃখের মধ্যে এদেশের বিচার বিভাগে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও অবাধ হয় নাই। তাহার দায় একা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের উপর চাপান ঠিক হইবে না। তবে একথা ঠিক যে লোকে তাঁহার কাছে কিছু বাংলা রায় উদাহরণস্বরূপ আশা করিত।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাটা নিজে ভাল লিখিতেন। তাঁহার লেখা যে বহিটির সহিত আমার প্রথম পরিচয় ঘটে সেই বহির নাম যথাশব্দ। বইটা ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী হইতে বাহির হইয়াছিল। এই বহির লেখক হিসাবে তাঁহার নামযশ আমি এখনও করিতেছি। অনেক দিনই করিব। এই জাতীয় বইকে ইংরেজিতে ‘থেসরাস’ বলা হয়। তাঁহার লেখা বাংলা থেসরাসটি বেশ উপকারী বই হইয়াছিল। তিনি বাংলা ভাষাটাও খুঁটাইয়া পড়িতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা তাঁহার প্রিয় ছিল–একথা বলাই বাহুল্য। শেষ বয়সে–আমাকে একবার বলিয়াছিলেন–তিনি চীনা ভাষাও শিখিতেছিলেন।

সমালোচকরা তাঁহার দুইটি দোষ ধরিতেন। একেত তিনি বেশি লিখিতেন। দ্বিতীয়ে অন্যের লেখা হইতে অধিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করিতেন। কেহ কেহ এমন অভিযোগও করিয়াছেন তিনি উদ্ধৃতি না দিয়াও অন্যের লেখা কখনও কখনও ব্যবহার করিতেন। দৃষ্টান্তের মধ্যে পরলোকগত মহান লেখক আহমদ ছফা আমাকে একবার একথাটি বলিয়াছিলেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতি রোমন্থন করিয়া আহমদ ছফা যে বইটি লিখিয়াছিলেন তাহার নাম যদ্যপি আমার গুরু। ইহা হইতে কোন কোন অংশ হাবিবুর রহমান সাহেব তাঁহার লেখায় চাকা চাকা ব্যবহার করিয়াছেন। অভিযোগটির সত্যতা আমি যাচাই করিয়া দেখি নাই। তবে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেবের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছিল ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘লিবারেল’ তাহার প্রমাণস্বরূপ। বাংলায় এই শব্দটির প্রচলিত অনুবাদ ‘উদারনৈতিক’। লিবারেল অর্থ যাঁহারা লিবার্টি বা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজম এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত। এই গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল মামলার আপীলের যে রায় ১৯৯৪ সালে দেওয়া হইয়াছিল তাহাকে উদারনৈতিক ব্যবহারশাস্ত্রের পরাকাষ্ঠা বলা যায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমানও এই মামলার অন্যতম বিচারক–সত্য বলিতে প্রধান বিচারক–ছিলেন। এই মামলায় গোলাম আজমের নাগরিকত্ব মঞ্জুর করা হইয়াছিল। প্রকাশ থাকে যে গোলাম আজম সাহেব ১৯৭৮ সাল হইতে বিনা ভিসায় বিনা নাগরিকত্বে বাংলাদেশে অবস্থান করিতেছিলেন। ১৯৯৪ সাল নাগাদ তিনি নাগরিক হইলেন। ইহার সামান্য কৃতিত্বে বিচারপতি হাবিবুর রহমানেরও ভাগ আছে।

এই মামলায় মাননীয় বিচারপতিরা যে সিদ্ধান্ত লইয়াছিলেন তাহার গোড়ায় একটি চিন্তা কাজ করিতেছিল। সেই চিন্তা অনুসারে, নাগরিকত্ব জিনিশটা জন্মের–অর্থাৎ প্রাণীবিজ্ঞানের–বিষয়। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুসারে নাগরিকত্ব জিনিশটা কর্মের–কৃতকর্ম বা রাজনৈতিক ব্যবহারের–বিষয় বটে। যাহারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহিত সহযোগিতা করিয়াছিলেন–মায় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী–তাহাদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার বাতিল হইবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সামান্য তত্ত্ব যাহা ‘সমাজচুক্তি উপপাদ্য’ নামে পরিচিত–অন্তত সপ্তদশ শতাব্দী হইতে যাহা আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি বলিয়া গণ্য–তাহাতে সাব্যস্ত আছে যে যুদ্ধাপরাধীর নাগরিকত্ব বাতিল হইতেই পারে।
কিন্তু সেদিন–১৯৯৪ সালে–বাংলাদেশের বিচারপতিরা অন্য চিন্তা করিতেছিলেন। মনে হইতেছে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের পবিত্র স্মৃতির তলায়ও এই শ্যামল ছায়াটি পড়িয়াই থাকিবে। কতদিন থাকিবে কে জানে!

১২ জানুয়ারি ২০১৪

১২ জানুয়ারি ২০১৪, bdnews24.com

জেনারেল এরশাদের রাজনীতি লইয়া আহমদ ছফার দুইটি নিবন্ধ

পরলোকগত মনীষী মহাত্মা আহমদ ছফা ইংরেজি ২০০০ সালের আগায় ও ২০০১ সালের গোড়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে মুখ্য বিষয় করিয়া দুই দুইটি নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। লেখা দুইটি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল যথাক্রমে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। দ্বিতীয় নিবন্ধটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পরলোকগমন করেন। বলা প্রয়োজন লেখা দুটি এখনও আহমদ ছফার রচনাবলিতে যোগ করা হয় নাই।

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেক সময় নিজের হাতে লিখিতে পারিতেন না। কিম্বা লিখিতে চাহিতেন না। তাঁহার তিনদিকে জড় হওয়া তরুণতরুণীরা অনেক সময় শ্র“তি লিখিতেন। এখানে উৎকলিত প্রথম নিবন্ধটির শ্র“তি লিখিয়াছিলেন মেকী খীসা। দ্বিতীয় লেখাটির শেষে এমন কাহারও নাম লেখা আছে কিনা দেখা যাইতেছে না। অধুনালুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ কর্তৃপক্ষের ঋণস্বীকার করিয়া আমরা লেখা দুটি নতুন করিয়া এখানে ছাপাইতেছি। ছাপার সময় আমরা কিছু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধন করিয়াছি। কোন কোন জায়গায় বানানরীতির সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংশোধন আবশ্যক হইয়াছে আর কোথাও কোথাও সঙ্গতিবিধানের জন্য একটা দুইটা শব্দ যোগ করা হইয়াছে। সংযুক্ত শব্দগুলি তৃতীয় বন্ধনীযোগে দেখান আছে।

 3

এই দুই নিবন্ধযোগে মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গোড়ার গলদ চোখে বুড়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছিলেন। এই আদি গলদের প্রকাশ্য লক্ষণ বা আলামত আকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের নাম লওয়া যায়। জেনারেল এরশাদ ১৯৮০ সালের দশকটার বলিতে গেলে প্রায় পুরাটা জুড়িয়াই বাংলাদেশ শাসন করিয়া তটস্থ রাখিয়াছিলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন একটি পূর্বঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থানের দৌলতে। আর ১৯৯০ ইংরেজি নাগাদ একধরনের ব্যাপ্তিতে জনপ্রিয় অথচ ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্যস্থতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন। তবে সকলেই জানেন সেই অভ্যুত্থানে তিনি নিহত কিম্বা নির্বাসিত কোনটাই হন নাই। তাঁহাকে কিছুদিন একটি কারাগারে রাখা হইয়াছিল।

কারাগার জায়গাটা বিশেষ সুখের জিনিশ নহে। তাই বেশিদিন না যাইতেই জেনারেল এরশাদ রাজনীতিতে ফিরিয়া আসিলেন। শুদ্ধ আসিলেন বলিলে যথেষ্ট বলা হইবে না। তিনি রীতিমত পুনর্বাসিতই হইলেন। পর পর দুইটি সংসদীয় নির্বাচনে তাঁহার দল গর্ব করিবার মতন অনেকগুলি আসনে জয়লাভ করিল। লোকের মনে প্রশ্ন দেখা দিল — এরশাদ সাহেবের এই শক্তির উৎস কোথায়?

আহমদ ছফা এই নিবন্ধে এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসংগত উত্তর দিয়াছেন। ১৯৯০ সালের পর যে দুই দুইটি চাঁদ — যাঁহাদের নাম যথাক্রমে হাসিনা ও খালেদা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে পালা করিয়া উদিত হইয়াছেন, তাঁহাদের সামনে ধ্র“বনক্ষত্রের জ্যোতির মতন জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামবাহী এই বিশেষ রাজনীতিবিদটি। এখানে উৎকলিত প্রবন্ধদ্বয়ের প্রথমটিযোগে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে রাজনীতির মধ্যেই।’

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নিবন্ধ দুটি লেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা আহমদ ছফা এই ধুলির ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ আজও — এই ভূমিকা মুসাবিদার ক্ষণ ২০১৩ ইংরেজির ডিসেম্বর মাসেও — বাঁচিয়া আছেন। নিছক বাঁচিয়াই নহেন, দিব্যই আছেন। কেন এবং কিভাবে আছেন তাহার জবাবে নানান মুনি নানান মত প্রকাশ করিবেন একথা নিশ্চিত জানি। আমাদের হাতে আহমদ ছফার যে মতটি আছে তাহাও — কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে — বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আহমদ ছফার কথা আমরা যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি তো বলিব তিনি বলিয়াছেন এরশাদ সাহেবের পতন হইলেও তিনি যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রতিনিধি প্রকৃত প্রস্তাবে সেই স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় নাই। তাহা একটা বেসামরিক লেবাস পরিয়াছে মাত্র।

এখানে উৎকলিত প্রথম প্রবন্ধে — অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ — আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত এইরকম: ‘আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসাবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন।’ আহমদ ছফার এই সিদ্ধান্তের সহিত যাঁহারা একমত হইবেন না, তাঁহারাও নিচের বাক্য দুইটি পড়িয়া বিশ্বাস করি ক্ষণকাল তিষ্ঠাইবেন। আর নিঃশ্বাস চাপিয়া বলিবেন, সাধু! সাধু! তিনি লিখিয়াছেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজস্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে।’

মাস ছয়েক পর অর্থাৎ ২০০১ সালের গোড়ায় প্রকাশিত দ্বিতীয় নিবন্ধযোগে আহমদ ছফা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না।’ সেই দিন আহমদ ছফা যে পরিস্থিতি দিব্যচোখে দেখিতে পাইয়াছিলেন আজ — এক যুগ পর — আমরা তাহা দানবের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতে বাধ্য হইতেছি। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।’ আর আজও আমরা বলিতে পারিতেছি না সংকট কাটিয়া যাইতেছে।

৮ জানুয়ারি ২০১৪, সর্বজন: নবপর্যায় ৩৬

যুদ্ধ ও শান্তি : তলস্তয়ের উপসংহার

[এই রচনাটি প্রথম দফা প্রকাশিত হইয়াছিল দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ‘শান্তি’ শীর্ষনামক একটি  বিশেষ (১২ এপ্রিল ২০০৪) সংখ্যায়। এখানে লেব তলস্তয়ের ‘হাজী মুরাদ’ কাহিনীর অল্পবিস্তর একটু উল্লেখ আছে। হাজী মুরাদ প্রসঙ্গে ইহার দুই মাসের মাথায় আমি মহাত্মা তলস্তয়ের ‘হাজী মুরাদ’ কাহিনী প্রসঙ্গে আরেকটা নিবন্ধও লিখিয়াছিলাম। কবুল করিতে হইবে, দুই নিবন্ধের মধ্যে একটু পুনরাবৃত্তি দোষ ঘটিয়াছে। বর্তমান প্রবন্ধের গদ্যরীতিও—বলা বাহুল্য—যেমন ছিল তেমনই রাখিয়া দিয়াছি। তবে স্থানে স্থানে পরিমার্জনার সুযোগটা গ্রহণ করাই বিধেয় মনে হওয়ায় তাহা করিতে কসুর করি নাই।—২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ]

‘শান্তি’ বিষয়ে কোন কাগজের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ সত্যই সুখের বিষয়। পত্রপত্রিকার সামান্য সংখ্যা সচরাচর—দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করা দরকার—যুদ্ধ, নৈরাজ্য আর অশান্তি নিয়েই ব্যাপ্ত। ‘শান্তি’ সকলেই চায়, অন্তত কথায় কথায়। কিন্তু কে জানে ‘শান্তি’ কোথায় পাওয়া যায়! এর উত্তর পাওয়া সহজ নয়। সান্ত্বনার একমাত্র কথা সম্ভবত এই—শান্তিরও একটা চাহিদা আছে। অন্তত আজ পর্যন্ত এই চাহিদা ষোল আনা ফুরায় নাই। এই হক কথাটা ধরেই আমি এগুতে চাই।

এয়ুনানের বিখ্যাত মনীষী আফলাতুন তাঁর অতি বিখ্যাত ‘রাষ্ট্র’ (ওরফে ‘রিপাবলিক’) নামক কেতাবে জাহির করেছেন এই দুনিয়ায় মানুষের জগতে অশান্তির প্রধান কারণ ক্ষুধা নয়, বিলাসিতা। তাঁর বিচার মোতাবেক যে দেশে দশের নিত্যচাহিদা বা প্রয়োজন মেটানোর পর বাড়তি কোন ধনদৌলত জমা থাকে না সে দেশে যুদ্ধ—অন্তত যুদ্ধের কারণ—থাকে না। যখনই ধনদৌলতের প্রাচুর্য বা বিলাসদ্রব্যের চাহিদা দেখা দেয়—যে দ্রব্যাদি যা নিজ দেশে তৈরি করা সম্ভব নয়—তখনই আশপাশের দেশে—অর্থাৎ পরের জায়গা পরের জমিনে—চোখ যায়। যখন পরদেশি মজুর ধরে বা ডেকে আনতে হয় তখনই যুদ্ধের কারণ দেখা দেয়।

আর কে না জানে যুদ্ধ ও শান্তি একে অপরের বিপরীত ধর্ম? আপনি অবশ্য বলতে পারেন যুদ্ধ তো শান্তির দোসরই। এক অর্থে আপনার কথাটা ব্যর্থ নয়। একমাত্র যুদ্ধই কায়েম করতে পারে শান্তি। সওয়াল করা চলে, তো সে শান্তি স্থায়ী হয় না কেন? এখানেই জন্ম হয় আরেকটি সওয়ালের: ন্যায় কিংবা ইনসাফ কি বস্তু? যুদ্ধ যদি সত্যই শান্তির জননী হয়, তো পালা করে বলতে হয় যুদ্ধের জনকও শান্তিই। বাদ ও প্রতিবাদ, প্রতিবাদ ও বাদ ক্রমে গড়ায়, গড়াতে থাকে। এই চক্রাবর্তের একটা মীমাংসা চাই। এই মীমাংসার ওয়াস্তেই গ্রিক দার্শনিক আফলাতুন ন্যায়ের কথা তুলেছিলেন। অন্যায় আর শান্তি একে অপরের সতীন তারা এক ঘরে এক দেশে বাস করতে পারে না—এই তাঁর রায়।

হেকিম আফলাতুন নিজেও স্বীকার করেছিলেন বিলাসী চাহিদার দেশ কোনদিন আদিম সাম্যের জগতে ফেরত যাবে না। অতয়েব একমাত্র উপায় ন্যায়ের কথাটা পাড়া। শান্তির প্রধান পাণ্ডা ন্যায়। ন্যায় পদার্থটা নাই বলেই ‘অশান্তির রাজা’র শাসনে মানুস বসবাস করে। এক্ষণে প্রশ্ন দাঁড়ায়—ন্যায় কোথায় পাই। উত্তরে বলতে হয়—যেখানে দেখিবে ছাই। যেমন এই বাক্যেও ‘ন্যায়’ পাবেন: ‘আমি দেখতে বাবার ন্যায়’।

কথিত আছে মানুষই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। প্রাচীন ধর্মের বিধানেও মানুষের নামে এই দাবিটা জাহির করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে ‘শ্রেষ্ঠ’ মানে কি? এর মানে ‘নিকৃষ্ট’ও করা চলে? ভারতবর্ষের পুরানা ঋষিরা বলেছিলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট কোনটাই নয়, সবচেয়ে বেশি ‘বিস্ময়কর’ জীব সে। মানুষ মাত্রই জানে সে মরবে। এই তার ‘জ্ঞান’। কিন্তু মানুষ মাত্রেই এমন ভাবে চলে—কাজ করে—যেন কোনদিন সে মরবে না। মানুষ পদার্থের এই ‘অজ্ঞান’ ভাবকেই খুব সম্ভব হিন্দুস্তানের বড় কবিরা—যেমন মহাভারতের মহামনীষীরা—‘মানুষ’ পদে বরণ করেছিলেন। সেই সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর জীব। আমার সন্দেহ হয়, মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ আর শান্তির সম্পর্ক বিষয়েও একই অনুমান করা চলবে।

মানুষ শান্তির কথা বলবে কিন্তু করবে যুদ্ধ। মানুষ ন্যায়ের কথা বলে, কিন্তু করে অন্যায়। শুদ্ধ মানুষজাতির কথা বললে হয়ত এই গোলকধাঁধার কুলকিনারা পাওয়া যাবে না। যদি বা আলাদা আলাদা মানুষের কথাও পাড়ি সমস্যার সুরাহা হবে না। কারণ যে মানুষ আজ শান্তির কথা বলছে সেই কাল আবার অশান্তি বাধাচ্ছে। যে অন্যায় করে সেও চিরদিন অন্যায় করে না। আমরা এখন ‘বিশেষ’ মানুষের কথা বলছি না। আমরা সামান্য মানুষ, তাহলে দাঁড়াই কোথা?

শান্তি কি পদার্থ তা কিন্তু আমরা এখনও বলিনি। বিশেষ বিশেষ মানুষের দল কি বলে আমরা তা পরে দেখব, কিন্তু সামান্য মানুষ বলে, যুদ্ধ মানেই অশান্তি। সুতরাং শান্তি মানে অযুদ্ধ বা যুদ্ধের অভাব। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে, শান্তির এই সংজ্ঞাটাও বা যুক্তিসই পদার্থ নয়। যুদ্ধ বাধার পূর্বক্ষণের কথাটা ধরা যাক। যাকে বলে সশস্ত্র শান্তি ওরফে (ইংরেজি ভাষায়) ‘আর্মড পিস’। যুদ্ধ বাধার পূর্বক্ষণে শান্তি আছে তবে সে শান্তি স্থায়ী নয়। স্থায়ী শান্তির স্বপ্ন ও ন্যায়বিচারে যোগাযোগ কোথায়? এই সওয়ালটা এক্ষণে বিবেচনা করা যায়।

রুশ মনীষী লেব তলস্তয় শুনেছি তাঁহার গদ্য মহাকাব্য ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ বইটির অন্য একটা নামও রেখেছিলেন একবার। সে নাম বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ—‘সব ভাল তার শেষ ভাল যার’। ঐ বইয়ে মহাত্মা তলস্তয় যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল নিয়ে তদন্ত আর বিচার দুটাই অনেকদূর করেছিলেন। তলস্তয়ের যুক্তি মতে, যুদ্ধের পক্ষে কোন যুক্তিই নাই। তবু নাপোলেয়ঁর মতন বড় যোদ্ধারা কত যুক্তির মোড়কেই না যুদ্ধের অযুক্তিটা পেশ করেছিলেন। কোন প্রকার যুক্তির তোয়াক্কা না করেই যে কাজটা করা হয় তার পক্ষে যুক্তির সমর্থন যোগাড় করার চেষ্টাকেই তলস্তয় বলতেন, পরম বিস্ময়ের বস্তু। মনে হতে পারে আবারও সেই জ্ঞান ও অজ্ঞানের খেলা।

মানুষের এই যুদ্ধ বিলাসিতার সত্য ব্যাখ্যা তলস্তয়ও খুঁজে পাননি। তলস্তয় ভেবেছিলেন দেশের সাধারণ মানুষ, তাঁর আপন ভাষায় চাষীসমাজই, সভ্য সমাজের চালিকাশক্তি। অতয়েব তাদের কায়দা-আকিদা ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যেই মানব জাতির বিকাশের নিয়ম। যুদ্ধবিগ্রহও তার অন্তর্গত নিয়মেই চলে। বড় বড় যোদ্ধা সেনাপতি, আর রাজা-মহারাজারাও ইতিহাসের নিয়ামক নন, ক্রীড়নক মাত্র।  ফলে নতুন নতুন প্রশ্ন জাগে: ইতিহাসের নিয়ামক কে বা কোন বস্তু?এই নিয়ামক শক্তির মুখপাত্রস্বরূপ যাঁরা ইতিহাসে প্রকাশিত তাঁরাই নিয়ামক। এটুকুই আমরা ধরে নিই। শেষ বয়সে লেখা ‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসে এই সত্য প্রচারের একটা চেষ্টা করেছিলেন তলস্তয়। এই উপন্যাস তিনি লিখেছিলেন শেষ বয়সে—‘যুদ্ধ ও শান্তি’র মতো ঠিক ভরাযৌবনে নয়। বর্তমানে যে সকল যুদ্ধকে আমরা বলি ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ সেই সব নতুন যুদ্ধ ঘটা করে শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার ওলন্দাজ বসতির বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের যে যুদ্ধকে এ যুগের বইপত্রে ‘বুয়র যুদ্ধ’ বলা হয় শুদ্ধমাত্র তা মহরতের খবর পাওয়ার পরই তলস্তয় ‘হাজী মুরাদ’ লেখা শুরু করেন।

জানা গিয়াছে, ‘হাজী মুরাদ’ বইয়ের আরও দুটি খসড়া নাম রেখেছিলেন তলস্তয় ‘কাঁটা’ এবং ‘জেহাদ’। তলস্তয়ের মতে, চাষী-সমাজ জমির অধিকার লাভের জন্য যে যুদ্ধ করে তাকেই ‘জেহাদ’ বলে। রুশ সাম্রাজ্যের অধিকার ভুক্ত চেচনিয়ার চাষীরা লড়ছিল নিজেদের দেশের জমির ওপর নিজেদের অধিকার বজায় রাখতে। কাউকে কর-খাজনা না দিয়ে নিজ বাসভূমে বসবাস করতে এবং নিজেদের জমির ফলানো ফসল নিজেরাই ভোগদখল করতে। চেচনিয়ার কৃষক-সমাজ রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সারা উনিশ ঈসায়ী শতক জুড়ে লড়াই করেছে। তাদেরই তৎকালীন এক যোদ্ধা নেতার নাম হাজী মুরাদ। তলস্তয় এই ভদ্রলোকের জীবন ও আদর্শের আশ্চর্য দরদি বর্ণনা পেশ করেছেন। চেচনিয়ার যুদ্ধকে তলস্তয় ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে মহীয়ান করেননি, বলেছেন এ লড়াই ‘চাষীর লড়াই’। জেহাদের সাথে যুক্ত ধর্মযুদ্ধ নয়, কৃষক যুদ্ধ। তলস্তয়ের এই অন্তর্দৃষ্টি কম সমীহ জাগানোর মত নয়।

তলস্তয় রচিত হাজী মুরাদের চোখে ইসলাম এই রকম : ‘… প্রথমে ছিলেন মোল্লা মোহাম্মদ। তাঁকে আমি চোখে দেখি নাই। তিনি পাক মানুষ। তিনি বলতেন ‘হে আমার জাতি, আমরা মুসলমানও নই, খ্রিষ্টানও নই, আমরা মূর্তিপূজাও করি না। ইসলামের সত্য আইন এই রকম: কোন মুসলমান জাতির ওপর অমুসলমানের রাজত্ব চলে না। কোন মুসলমান অন্য কোন মানুষের গোলাম হতে পারবে না। মুসলমান কাউকে কর দেয় না, এমনকি অন্য কোন মুসলমানকেও সে কর দেয় না।’ তলস্তয়ের এই বড় চোখেও হাজী মুরাদ একসময় ‘মৌলবাদী’ বলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তলস্তয় জানতেন, মুরাদের লড়াই চেচেন চাষীদের মুক্তির লড়াই। আমরা একপ্রকার আবিষ্কার করি শেষ পর্যন্ত মুরাদকে রুশ মনীষীও ভালবেসেছিলেন।

হাজী মুরাদের ট্রাজেডি আর সাধারণ কৃষকের ট্রাজেডি আদতে এক জিনিশই—এই প্রতিজ্ঞাটা প্রমাণ করার জন্য তলস্তয় দেখান কৃষক মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক ও প্রধান সমস্যাটা কোন জায়গায়। হাজী মুরাদের পথ দুদিক থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। সে যদি চেচেনদের রাজা শামিলের দলে যোগ দেয়, তো তার ইজ্জত-গৌরব হবে কিন্তু চেচেন কৃষক, তার আপন জাতির মানুষ তো যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে। জালেমি শাসনের অবসান হবে না। অপরপক্ষে সে যদি শাদা জার অর্থাৎ রুশ সম্রাটের কাছে আত্মসমর্পণ করে তো তার টাকাপয়সা হবে, নামধাম চারদিকে ছড়াবে, কিন্তু চেচেন চাষীর জমি রুশ সৈন্যসামন্ত। উপনিবেশবাদের পায়ের তলায় আরো দেবে যাবে। জার এক নম্বর নিকোলাস যে কিসিমের শয়তান, চেচেনদের নেতা শামিলও সেই গোছেরই শয়তান আর সেই কারণেই হাজী মুরাদ ঐ মুহূর্তে শামিলের বাহুডোর থেকে জারের আলিঙ্গনে ধরা দিতে ঘোড়া ছোটান। পথে যেতে যেতে তিনি দেখেন একটি ছুটকা রুশ সৈন্য জারের সেনাবাহিনী ছেড়ে পালাচ্ছে। সে সৈন্যটিও রেহাই পায় নাই। রুশ সেনাবাহিনীর বুলেটে নয় চেচেন যোদ্ধাদের গুলিতেই সে মারা পড়ে। বিশ্বাসহন্তার কলঙ্ক তাকে ছোঁবার সুযোগ পায় না।

‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসে তলস্তয় দেখাচ্ছেন, চেচেনিয়ার চাষী আর রুশিয়ার চাষী দুজনারই দুশমন এক ও অভিন্ন একজনই—রুশ স্বৈরতন্ত্র। এই স্বৈরতন্ত্র চেচেন চাষীর যব, ভুট্টাদি ফসল কাটতে বাধা দেয়। একই স্বৈরতন্ত্র রুশ চাষীর হাতে তলোয়ার, আর কাঁধে-পিঠে বন্দুক দিয়ে ককেসাস জয় করতে পাঠায়। জারের বিরুদ্ধে হাজী মুরাদের শেষ যুদ্ধ—তলস্তয় দেখাচ্ছেন—রুশের বিরুদ্ধে চেচেনের যুদ্ধ নয়। হাজী মুরাদের দুশমনরাও দেখা গেল জাতে চেচেনই—রুশ সরকারের হয়ে সেই রাজাকার চেচেনরাই তাঁর প্রাণ নিয়েছে। তলস্তয়ের মতে রুশ জারের বিরুদ্ধে চেচেন মুরাদের যুদ্ধ, রুশের বিরুদ্ধে অতি রুশের, চেচেনের বিরুদ্ধে অতি চেচেনের যুদ্ধ—অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও বিচারের যুদ্ধ। গোলামের শান্তির চেয়ে এই ধরনের যুদ্ধ ভালো নয়—বেহতর—কি? মনে হয়—এই প্রশ্নটাই তলস্তয়কে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

ন্যায় সততই সুন্দর এবং ন্যায়ই শেষ বিচারে সত্য। হাজী মুরাদের ছবি এই সত্য ও সুন্দর দিয়ে রাঙ্গা করেছেন তলস্তয়। হাজী মুরাদের মৃত্যুর একটুক্ষণ মাত্র আগে তার মনে পড়ে এইরকম ফাঁড়ায় পড়েই পূর্বসূরী এক যোদ্ধা হামজাও মারা গিয়েছিল। তলস্তয় সে কাহিনী ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতিতে স্মরণ করেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হবার পূর্বক্ষণে ততক্ষণে গভীর ভোর হয়েছে—যাকে বলে সুবেহ সাদেক তার আলো ফুটেছে। হামজার নজর যায় কয়েকটা পাখির দিকে: ‘পাখিরে পাখি, পথিক পাখি, যাও পাখি গিয়ে বলো, আমাদের মা-বোন, আমাদের মেয়েছেলেদের গিয়ে বলো, আমরা সকলেই প্রাণ দিয়েছি জিহাদে, ন্যায় যুদ্ধে। ওদের বলো আমাদের লাশ কবরে পড়ে থাকবে না। আমাদের হাড্ডি খুলে চেটে চেটে খাবে লোলুপ নেকড়ে বাঘে, আর আমাদের চোখ উপড়ে ঠুকরে খাবে কালো কালো কাউয়ায়।’

তলস্তয়ের বাড়িতে—ইয়াসনায়া পলিয়ানা ওরফে উজ্জ্বলাবাদে—একটা পাঠশালা ছিল। শোনা যায় ওই পাঠশালার ছাত্রছাত্রীরা—এরা সকলেই ছিল চাষা পরিবারের—একবার পথে হাঁটতে হাঁটতে তলস্তয়ের কাছে জানতে চেয়েছিল: ‘মানুষ গান গায় কেন?’ উত্তরে মহাত্মা তলস্তয় ঠিক কি বলেছিলেন জানা যায়নি। কিন্তু হাজী মুরাদ বইয়ে নাকি সেই প্রশ্নের উত্তরটাই লেখা হয়েছে। ‘মানুষ গান গায়, কারণ গান মানুষকে শেখায় মানুষের মত বাঁচতে, গোলাম না বনতে। গান শেখায় লড়াই করতে, লড়াই চালিয়ে যেতে, শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে। এমন কি সঙ্গের শেষ সঙ্গী যোদ্ধাটিরও যখন পতন হয় তখনও লড়াইটা না থামাতে। শুদ্ধ এই লড়াইয়ের মধ্যেই শান্তি আছে।’

হাজী মুরাদও শেষ পর্যন্ত লড়াই থামান নাই। তাই ন্যায় যুদ্ধের উদ্দেশ্যে তলস্তয়ের শেষ প্রণামের নাম ‘হাজী মুরাদ’। সেখান থেকেই আমাদের প্রশ্নের একটা উত্তর হয়ত জোগাড় করা যায়। মানুষ গান গায় যে কারণে সে কারণে সে শান্তিও চায়। শান্তি মানে যুদ্ধের অভাব নয়। যুদ্ধের অভাব থেকে আসতে পারে আরও যুদ্ধ, আরও অশান্তি। অতয়েব শান্তির রক্ষাকবচ একমাত্র ন্যায় যুদ্ধই। হাজী মুরাদ—তলস্তয় বলেছেন—শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু পরাজিত হন নাই। আমাদের যুগেও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপোসের মধ্যে শান্তি নাই—শুদ্ধমাত্র ন্যায় যুদ্ধেই শান্তি আর বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। মাত্র এই কড়ারেই শান্তির পরাজয় নাই।

দোহাই

১. Victor Shklovsky, Lev Tolstoy, O. Shartse, trans. (Moscow: Progress Publishers, 1978)|

২. Plato, The Republic of Plato, A. Bloom, trans. (New York: Basic Books, 1968)|

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, এনটিভি

মানুষ গান গায় কেন: লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ প্রসঙ্গে

[এই ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম মহাত্মা লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ উপন্যাসের শতবর্ষ উপলক্ষে—আজ হইতে কমপক্ষে চৌদ্দ বছর আগে—ইংরেজি ২০০৪ সালের প্রথম ভাগে। ‘সূর্যতরু’ নামক একটি প্রায় অপরিচিত পাক্ষিক পত্রিকার এক সংখ্যায় (বর্ষ ২, সংখ্যা ৬, জুন ২০০৪) লেখাটি পত্রস্থও হইয়াছিল। সম্প্রতি লেখাটির সহিত আকস্মিক দেখা হইল আরেকবার। ২০০৪ সালের মুদ্রিত সংস্করণে কিছু ছাপার ভুল ছিল। সেইগুলি সংশোধন করিতে বসিয়া আরো কিছু পরিমার্জনা করিবার সুযোগ পাইলাম। কিন্তু লেখার মূল কাঠামো বদলাইয়া লিখিবার অবকাশ আর হইল না। ঐ সময়ে যে রীতির গদ্য মকেশা করিতাম অনেকদিন হয় তাহা হইতে সরিয়া গিয়াছি। কিন্তু পুরানা দিনের গদ্যরীতিটা স্মৃতিস্বরূপ রাখিয়াই দিলাম। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮।]

এ বছর মহাত্মা লেব তলস্তয় রচিত ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর ১০০ বছর পূর্ণ হলো। তলস্তয় ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটি লেখা শেষ করেছিলেন ইংরেজি ১৯০৪ নাগাদ। লেখকের জীবদ্দশায় গল্পটির প্রকাশ কেন সম্ভব হয়নি, তা কাহিনীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পৌঁছলে স্পষ্ট হয়। তলস্তয় এন্তেকাল করেন ১৯১০ সালে। এক বছর পর ১৯১১ সালে গল্পটির প্রথম প্রকাশ। এ গল্পের একাধিক ইংরেজি তর্জমা পাওয়া যায়। রচনার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি আরো একটি নতুন অনুবাদ হাতে পেলাম। ১৯৮৪ সালে অশীতিপর মহাত্মা আকবরউদ্দীন গল্পটির একপ্রস্ত প্রাঞ্জল বাংলা তর্জমা প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমান নিবন্ধের সুবাদে ভদ্রলোকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আজ শান্তি ও প্রীতির বাণী নিবেদন করছি।

তলস্তয় বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের ধারণা, ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটির আরো দু-দুটি বিকল্প নাম তলস্তয় চিন্তা করেছিলেন— একটি নাম ‘কাঁটা,’ অন্যটি ‘জেহাদ’। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়তো চোখের পাতা কুঁচকে বলবে, ‘জেহাদ’! আবার জেহাদ কেন? এ সহূদয় পাঠক-সুহূদদের বরং ধৈর্য ধরার আবেদন জানাব আমি। তলস্তয়ের ব্যাখ্যা অনুসারে জেহাদ বলে সেই লড়াইকে, যে লড়াইয়ের মধ্যস্থতায় কৃষক আপনকার জমিজমার ওপর আপনার অধিকার কায়েম করে আর আপন জমির ফসল আপনার দখলে রাখে। তলস্তয়ের মতে, জেহাদ নিছক ধর্মযুদ্ধ নয়, জেহাদ বলতে চাষীর লড়াই বা কৃষকযুদ্ধ বুঝতে হবে। লেব তলস্তয়ের হাজি মুরাদ এমনই কৃষকযুদ্ধের নায়ক বিশেষ।

প্রশ্ন হলো কৃষকের অধিকার আর কৃষকের ধর্ম যেখানে একাকার, যেখানে কৃষক নিজেই নিজের লড়াইকে জেহাদ বলে অভিহিত করে, সেখানে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোন অধিকারবলে এ ন্যায়বোদ্ধা কৃষকদের ধর্মান্ধ কি মৌলবাদী বলে গাল দেবেন? ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর সারাংশ ধরে আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারব। জানা যায়, লেব তলস্তয় গোটা নয়-নয়টি বছর ধরে— মানে ১৮৯৬ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত— এ গল্পের মুসাবিদা করেছিলেন। এ সময়ের মধ্যে লেখা একটি খসড়ায়— যা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত সংস্করণে খুঁজে পাওয়া যায় নাই— তলস্তয় যে কথা লিখেছিলেন, তাতে গল্পের গোড়াটা ভালোমতোই পাওয়া যায়।

১৮১২ সালে খান শাসিত অবার দেশের খুনজাক জেলার দুই ভদ্রমহিলা একই রাতে দুটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এদের একজন স্বয়ং শাসক খান সাহেবের স্ত্রী: পাকু বিকে তার নাম। আরেকজনের নাম ফাতেমা। ফাতেমা পাহাড়িয়া কোনো এক সাধারণ কৃষকের বেগম। খান সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে ফাতেমার ঘনিষ্ঠ চেনা-পরিচয় ছিল, ফাতেমাকে তিনি নিজ পুত্রসন্তানের দাই মা নিয়োগ করেন। ফাতেমার দুঃখ এই, তাকে খান সাহেবের ছেলেকে দুধ খাওয়াতে হয়, আর তার নিজের ছেলেটা (দুধের অভাবে) মারা যায়। ফাতেমা বেগম খুনজাক জেলার খানম সাহেবার সখী বটেন। এদিকে ফাতেমার বড় দুই ছেলে ওসমান আর হাজি মুরাদ ওই খানের প্রাসাদেই বড় হয়। তারা খান সাহেবের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা আর ঘোড়ায় চড়া যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করত।

এ রকম একটি সাধারণ পরিবারে, তথাকথিত ছোটলোক সমাজে হাজি মুরাদের জন্ম। নিজের ছেলেদের ভাগের শেষ দুধটুকুন খান সন্তানদের খাওয়াব না— এই দাবিতে মুরাদের মা অনেকবার অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। একবার এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে আপন স্বামীপ্রবর তাকে খুন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন, ছোরার আঘাতে গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছিলেন। এমন মায়েরই পেটের ছেলে হাজি মুরাদ। একদিন বড় হয়ে আপন জাতির মুক্তির জন্য যুদ্ধবিগ্রহে যোগ দেয় সে, প্রাণবাজি লড়াই করে। কপাল তার মন্দ, যুদ্ধে সে আহত হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ল। কিন্তু আত্মসমর্পণ করল না। কে এই বীর! কত তার হিম্মত! এ প্রশ্নের উত্তরেই তলস্তয়ের ছোট্ট উপন্যাস ‘হাজি মুরাদ’।

১.

ককেসাস পর্বতের ছায়ায় ঘেরা চেচনিয়া হাজি মুরাদের দেশ। এ ককেসিয়া মহাদেশের ইতিহাস বড়ই জটিল, বড়ই ঝঞ্ঝাপূর্ণ। পয়গম্বর হজরত ঈসা (আ.)-এর তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত জর্জিয়া আর আর্মেনিয়া নামের দেশ দুটি রোমক সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন বা তাঁবেদার রাষ্ট্র ছিল। সেই সময় কাজার জাতি দেশ দুটি দখল করে নিলে এ দুই দেশে— এবং ককেসাস উপমহাদেশের আরো অনেক স্থানে— ছোট ছোট অনেক পার্বত্য জাতি স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। সেখানকার আদ্যের বাসিন্দা বা স্থানীয়দের সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের অভ্যন্তর থেকে আসা অনেক জাতি একদেহে মিলে যাকে বলে লীন হয়ে যায়। হজরত ঈসার উনিশ শতকের গোড়া নাগাদ নানা জাতির লোক— প্রায় ৭০টি ভাষায় কথা বলার মতো— ককেশাস জাহানে বসবাস করত।

তুরানি জাতি আর ইরানি ভাষার আধিপত্যের জায়গায় সে দেশে— প্রথমবারের মতো— রুশ জাতির আধিপত্য কায়েম হয় হজরত ঈসার পঞ্চদশ শতাব্দীতে। উনিশ শতকে এসে রুশ বিজয় ও দখলদারি আরো পাকাপোক্ত হয়। যেমন ১৮০১ সালে জর্জিয়া রুশ সাম্রাজ্যের অবিভাজ্য অংশ বলে স্বীকৃতি পায়। তিফলিস থেকে ব্লাদিকাবকাজ পর্যন্ত একটা আন্তঃমহাদেশীয় মহাসড়ক রুশ সেনাদের চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয়। প্রধানত এরমলব নামে প্রসিদ্ধ রুশ সেনাপতির প্রতিভাবলে যে অঞ্চলকে আমরা এখন ককেসিয়া পারের দেশ বা ট্রান্স-ককেসিয়া বলি, তার পুরোটাই ১৮৩০ নাগাদ রুশদের তাঁবে চলে আসে। শুদ্ধ দুটি বড় দেশ তখন পর্যন্ত রুশ শাসন মেনে নেয়নি। একটি পূর্বে— চেচনিয়া, অন্যটি পশ্চিমে— চরকাসিয়া। এরা আরো ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত বিদেশী দখলদারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে থাকে। এ প্রতিরোধ সংগ্রামেরই এক খ্যাতনামা নায়ক, বীরত্ব আর মনুষ্যত্বের শেষ অবলম্বন ওরফে সম্বল বা পতাকার নাম অবার জাতির সন্তান হাজি মুরাদ।

তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে চেচনিয়ার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের একপ্রস্ত ঐতিহাসিক বা সত্যকার ছবি পাওয়া যায়। এ সময় ককেসাস সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতেন অন্য এক পার্বত্য জাতির নেতা শামিল। শামিল মহোদয় শুদ্ধ এ দুনিয়ার শাসক নন, একই সঙ্গে পরকালের মুক্তির উপায় বা পথনির্দেশকও বটেন। যাকে বলে ধর্মীয় নেতা তিনি। তিনি ইমাম শামিল। পূর্ব ককেসিয়ার অনেক পার্বত্য জাতি ইমাম শামিলের নেতৃত্বে রুশ দখলদারদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধে। তার প্রতিরোধ যুদ্ধ সফল হয়। ১৮৪০-এর দশকে রুশ উপনিবেশবাদ পরাজয় স্বীকার করে, প্রায় পরাভূত চরকাসিয়া দেশে তারা সামরিক অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ১৮৫৩-৫৬ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ চলার সময় এ পার্বত্য জাতিসংঘ কিছুদিন শান্তিতে স্থির ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় তারা আবার রুশ আগ্রাসনের মুখে পড়ে। তাদের ধনদৌলত, রসদপত্র, গোলাবারুদ ফুরিয়ে যায়। তারা আত্মসমর্পণ করে দলে দলে। বলা হয়, এ যুদ্ধে চেচনিয়ার মূল ভূখণ্ডের জনসংখ্যার চার ভাগের তিন ভাগই উচ্ছন্ন হয়ে যায়। ১৮৬৪ সালে এক চরকাসিয়া থেকেই প্রায় ছয় লাখ মানুষকে বের করে দেয়া হয়। তারপর সেখানে স্থাপন করা হয় রুশ বসতি। আজো সেই যুদ্ধের শেষ হয়নি। যুদ্ধ এখনো চলছে। (লেরমন্তব ১৯৯৪: ২৪)

রুশ লেখকদের মধ্যে আলেকসান্দর পুশকিন, মিখাইল লেরমন্তব ও লেব তলস্তয় এই এশিয়াবি ককেসাস নিয়ে অনেক স্মরণীয় গল্প লিখেছেন। স্বাধীনতা-পূজারি এসব পার্বত্য জাতির আদর্শ বীরদের স্থানীয় ভাষায় বলে ‘জিগিত’। এই জিগিতের বৈশিষ্ট্য অকুতোভয় যোদ্ধার, বুদ্ধিমান সেনাপতির, দেশপ্রেমের, প্রতিশোধ গ্রহণে অপরাঙ্মুখ অশ্বারোহীর। চেচেন আর চরকাসিয়াবি জাতির আনুগত্য শুদ্ধ আপন আপন জাতির জন্য নয়, আপন আপন ধর্মের জন্যও বটে। বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা যেমন জাতির প্রতিটি সন্তানের, প্রত্যেক বীরের দায়িত্ব, বিধর্মীর হাত থেকে আপনার জাতীয় ধর্ম রক্ষা করাও তেমনই তাদের দায়িত্ব বৈ নয়। লেরমন্তবের ‘আমাদের কালের নায়ক’ গল্পে ঢের চরকাসিয়াবি চরিত্র দেখা যায়, আর তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে শোনা যায় চেচেন জাতির মাহাত্ম্যগাথা।

আদিতে রুশবিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধেই যোগ দিয়েছিলেন হাজি মুরাদ। প্রথমে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন ধর্মীয় নেতা ইমাম শামিলের নেতৃত্বেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামিলের বশ্যতা স্বীকারের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাননি তিনি। পরাধীনতা ব্যবসায়ী রুশদের কাছে একবার আত্মসমর্পণ করেন, আবার সেখান থেকে পালিয়েও আসেন হাজি মুরাদ। সেই পালানোর পথেই শেষ পর্যন্ত বীরের মতো লড়তে লড়তে প্রাণ দেন তিনি। তবে ঠিক রুশ বাহিনীর হাতে নয়, রুশপক্ষভুক্ত রাজাকার অর্থাৎ শামিলের অনুগত বাহিনীর হাতে। তাঁর কাটা মাথা অবশেষে রুশদের হাতেই পড়ে। তলস্তয়ের গল্পের মধ্যেই আমরা সেই কাটা মাথার দেখা পাই।

তলস্তয়ের মতে, এই রুশ-চেচেন যুদ্ধটি শেষ বিচারে এক ধরনের প্রভু ও ভৃত্যের যুদ্ধ, একজাতীয় জমিদার-কৃষক লড়াই বৈ নয়। তিনি দেখান, রুশ দেশের কৃষক আর চেচেন জাতির কৃষক— দুই জাতিরই অভিন্ন দুশমন রুশ স্বৈরতন্ত্র ও রুশ শাসক শ্রেণী। এই শাসক শ্রেণী চেচনিয়ার কৃষকদের ফসল, ক্ষেতের ভুট্টা সাবাড় করে ফেলছে আর সৈনিকের উর্দি গায়ে চাপিয়ে দিয়ে অভুক্ত রুশ কৃষককে চেচেন সন্তানদের পেছনে লেলিয়ে দিচ্ছে। তলস্তয় জানেন, রুশ কৃষক আর পার্বত্য জনগণ— উভয়েরই— এক নম্বর দুশমন রুশ দেশের সম্রাট— জার। ঘটনাচক্রে সে যুগে— গল্পের ঘটনা ১৮৫১ সালের— যিনি জারের সিংহাসনে আসীন তার নাম নিকোলাস, পরবর্তী ইতিহাসের আলোকে বললে প্রথম বা এক নম্বর নিকোলাস। ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে তলস্তয় জার এক নম্বর নিকোলাসের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ক্ষমতার ব্যবসায় আর স্বৈরতন্ত্রের হাতে সৃষ্ট যে অশুভ কাঠামো রুশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রমূলে স্থাপিত, সেই বড় অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নায়ক হাজি মুরাদ। পরিচয়ে তিনি যুগপথ চেচেন মুসলমান ও কৃষক সংগ্রামের নেতা।

তাই বলে তলস্তয় এ যুদ্ধে হাজি মুরাদকে জয়ী করেছেন এমন নয়। আমাদের মহাযুগের ট্র্যাজেডি যে কৃষকযুদ্ধের ট্র্যাজেডি, তলস্তয় এ সত্য ঠিকই ধরে ফেলেছেন। কারণ কৃষকরা সমবেত হয় কোনো রাজা, কোনো গান্ধী, কংগ্রেস, বেগ, খান বা এ-জাতীয় কোনো খেতাবধারীর পতাকাতলে আর ঘরে ফিরেই তারা দেখতে পায় মাথার ওপর তাদের নতুন প্রভু। হাজি মুরাদ কি মুসলমান না খ্রিস্টান? ইমানদার না পৌত্তলিক? এ প্রশ্ন বড় প্রশ্ন নয় তলস্তয়ের চোখে। অথচ হাজি মুরাদের চোখে ধর্ম বিশ্বাস আর ন্যায়ের সংগ্রাম আদপেই আলাদা জিনিস নয়। এখানেই আমরা দেখতে পাই, তলস্তয়ের মতো মনীষীও গোঁড়ামির কবজা থেকে ষোলআনা মুক্ত থাকতে পারেননি। তিনি নিজে ন্যায়ের সংগ্রামে মহাত্মা যিশুর পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, অথচ হাজি মুরাদের ইসলামী পতাকা তার চোখে বড়জোর একপ্রস্ত উপদ্রবের অধিক নয়। তলস্তয়ের ধারণা, হাজি মুরাদের মুসলমানিত্ব একটা কথার কথা বৈ নয়, তার অন্তরের কৃষক ভাবটাই আসল। ১৮৯৭ সালের ৪ এপ্রিলের রোজনামচায় তলস্তয় লিখেছিলেন: ‘হাজি মুরাদ লোকটি ধর্মান্ধতার শিকার— তার বিষয়ে বলার আমার মূল কথাটা এটাই। তা যদি না হতো বা লোকটাকে কি ভীষণ সুন্দরই না দেখাত!’ (শক্লোভস্কি ১৯৭৮: ৬৮৩)

গণ্যমান্য অভিজাত শ্রেণীর সুযোগ্য লেখক তলস্তয়ের এটুকু ভুলচুক হয়েছে, এ কথা অবশ্যই কবুল করা যায়। তবুও আমাদের অধিক যেতে হবে, স্বীকার করতে হবে, হাজি সাহেবের সমস্যাও নেহাত সরল সমস্যা ছিল না। হাজি মুরাদ কৃষক সমাজের নেতা, হাজি মুরাদের জেহাদ যুগপথ রুশ জারতন্ত্র ও শামিল স্বৈরাচার উভয়ের বিরুদ্ধেই। এছাড়া তার আর যাওয়ার অন্য কোনো পথও ছিল না। তলস্তয় চরিতামৃতকার শক্লোভস্কি লিখেছেন: ‘যদি সে শামিলের পথে যায়, তার যশ-মান-সম্মান সবই হবে, কিন্তু চাষী সমাজ কিছুই পাবে না। আবারো যে জোরজুলুম, সেই জোরজুলুমই চলতে থাকবে। যদি সে রুশ সম্রাটের কাছে যায়, টাকাপয়সা, মানসম্মান সবই তার হবে, কিন্তু এ রুশরাই তো চেচেন চাষীর ফসলের খেতখামার দুপায়ে দলন করছে।’

জার এক নম্বর নিকোলাসের চেয়ে জোরজুলুম অত্যাচারে শামিলও একচুল কম যান না। শামিলের ক্রোড় থেকে হাজি মুরাদ ছুটে যান নিকোলাসের বাহুডোরে। যাওয়ার পথে সে দেখা পায় জনৈক রুশ সৈন্যের— বেটা পালাচ্ছে ওই নিকোলাসের সৈন্যদল ছেড়ে। এমন সময় আচমকা একটা বুলেট এসে বেটার গায়ে বেঁধে। বেইমান সৈন্য নামের কলঙ্ক থেকে সে বেঁচে গেল। কারণ আচমকা গুলিটা এসেছিল চেচেনপক্ষের বন্দুক থেকে।

২.

হাজি মুরাদকে তলস্তয় দেখিয়েছেন যুদ্ধে আহত, বন্দি, পলাতক, সম্মুখযুদ্ধে অকুতোভয়, বীরদর্পে নিহত যোদ্ধা চরিত্র আকারে। তিনি শির দিয়েছেন, কিন্তু আমামা দেননি। সুতরাং তারই জয় হয়েছে। এ জয়টা তলস্তয় দেখান মোট দুই প্রকরণে। প্রথম প্রকরণে প্রেম, দুই নম্বরে যুদ্ধ। রুশপক্ষীয় দুর্গে জনৈক সেনাপতির স্ত্রী মারিয়া দিমিত্রিয়েবনা হাজি মুরাদের দিকে বেশ একটা ভালোবাসার টান অনুভব করেন। ওদিকে বাটলার নামক জনৈক সৈন্যাধিনায়কও এই মহীয়সী মারিয়ার কৃপাপ্রার্থী। জ্যোত্স্নাভরা এক রাতে বাটলারের সঙ্গে হাওয়া খাওয়ার তাগিদে সেনা শিবিরের চৌহদ্দির মধ্যে পাঁয়চারি করছেন মারিয়া। তখন ছোটখাটো এক সেনাপতি— নাম কামেনেব— কয়েকজন কসাক সৈন্য অভিব্যহারে তাদের মুখোমুখি। তারা ঝুলি খুলে হাজি মুরাদের কাটা মাথাটি টেনে বের করে দেখালেন মারিয়াকে। চাঁদের আলোয় অর্ধদৃষ্ট কাটা মুণ্ডুটা দেখিয়ে ওরা যেন বা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে— ‘দেখো তো মাথাটা, কার চেনা যায় কিনা?’ শত শত আঘাত আর ক্ষতের দাগধস হজম করেও জীবিত হাজি মুরাদের ঠোঁটের শিশুসুলভ হাসিটি হারায়নি এই কাটা মাথা। ঘৃণায় মারিয়া মুখ ঘুরিয়ে নেন। এই মহার্ঘ্য, খণ্ড মাথা দেখতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অসম যুদ্ধের এই বিজয়চিহ্নে, এই করুণ সম্বলে মোটেও আনন্দ হয় না তার।

মারিয়া দিমিত্রিয়েবনাকে এভাবে কাটা ছিন্নমাথা দেখানোর কিছুক্ষণ পরই তলস্তয় হাজি মুরাদের সঙ্গে পশ্চাদ্ধাবনরত রুশ সৈন্য দলের শেষ মহারণের বিবরণটা পেশ করেন। এদিকে আমরা বিলক্ষণ জানি, হাজি মুরাদের কাটা মুণ্ডু এখন রুশ বাহিনীর থলের ভেতরই। চাঁদের আলোয় দেখা না দেখা সেই কর্তিত শিরের স্মিত হাসিটি এখনো অম্লান। তবু শেষ অধ্যায়ের বিবরণটা আমরা পড়ি শিরা টান টান দশায়। এমনকি আশাও করি, হাজি মুরাদ তার শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে জিতবেন, প্রাণে বেঁচে যাবেন শেষ পর্যন্ত। একেই কি বলে ‘কবির বিচার’— ইংরেজদের ভাষায় পোয়েটিক জাস্টিস!

তলস্তয়ের বিচারে হাজি মুরাদের লড়াই রুশ জাতির বিরুদ্ধে, চেচেন জাতির লড়াই নয়। তিনি দেখাচ্ছেন হাজি মুরাদকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করল— ঠিক রুশ বাহিনী নয়, রুশপক্ষে যোগ দেয়া চেচেন রাজাকারের দল। তলস্তয় এখানে ন্যায় আর অন্যায়ের যুদ্ধ অপূর্ব সুন্দর চিত্রাকারে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন: ‘সুবেহ সাদেকের সময় হাজি মুরাদ অজু করার জন্য পানি নিতে আবার এই কামরায় এলেন। রাত্রি-দিবার এ সন্ধিক্ষণে ভোরের আলোর উদ্দেশে পাপিয়ার উল্লসিত কণ্ঠস্বর উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। আর এই সময় মুরিদদের কামরা থেকে শোনা যাচ্ছিল ছোরা শান দেয়ার পাথরের সঙ্গে লোহার ঘস ঘস শব্দ।’

হাজি মুরাদ টব থেকে পানি নিয়ে নিজের কামরায় দোরের কাছে এসেছেন, এমন সময় ছোরা শান দেয়ার ঘস ঘস শব্দ ছাপিয়ে ছাপিয়ে হানেফির কণ্ঠে শুনতে পেলেন পরিচিত গানের স্বর। শোনার জন্য দাঁড়ালেন। গানের বিষয়বস্তু এই: হামজা নামের একটি জোয়ান তার সাঙ্গোপাঙ্গ সমভিব্যহারে রুশদের একপাল ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়েছিল। জনৈক রুশ রাজপুরুষ বিস্তর সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের পিছু নেয়। পরিশেষে তেরেক নদীর পাড়ে এসে তাদের ঘেরাও করে। অনন্যোপায় হামজা ঘোড়াগুলো হত্যা করে। যতক্ষণ তাদের রাইফেলে গুলি, কোমরবন্দে ছোরা আর শিরায় রক্তপ্রবাহ জারি ছিল, ততক্ষণ তারা লড়াই করে। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে কতকগুলো পাখিকে উড়ে যেতে দেখে হামজা। তাদের উদ্দেশে চিত্কার করে সে। গান গাইতে থাকে—

         যাও পাখি উড়ে যাও, আমাদের বাড়ি যাও

         মায়েদের বলো আমাদের, বলো আমাদের বোনেদের

         আমাদের প্রিয়াদের বলো, যুদ্ধ করে মরেছি আমরা

         মরেছি জেহাদ করে! গিয়ে বলো তাদের

         কবরে আরামে থাকবে না আমাদের লাশ

         আমাদের খাবে বাঘে, টুকরো টুকরো ছিঁড়বে,

         কাক আর শকুন আমাদের চোখ উপড়াবে।

                                 (তলস্তয় ১৯৮৪: ১৪২-৪৩)

গানের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে গায়কেরা উপনীত হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চারণে। গানের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই তীক্ষ একটা আর্ত স্বর বাতাস খান খান করে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। তারপর সব স্তব্ধ, নীরব।

শোনা যায়, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা একবার লেব তলস্তয়কে জিজ্ঞাসা করেছিল: ‘মানুষ গান গায় কেন?’ শক্লোভস্কির মতে এ প্রশ্নের উত্তরেই তিনি ‘হাজি মুরাদ’ লিখেছিলেন। এখানেই তলস্তয় অজ্ঞাতসারে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, হাজি মুরাদের লড়াই আচমকা এক ব্যক্তির লড়াই নয়, এ লড়াইয়ের একটা পূর্ব আছে, সম্ভবত একটা উত্তরও আছে। হামজার জীবনের সঙ্গে হাজি মুরাদের জীবনদানের মিলটাও একান্ত আপতিক মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বীকার করতে হয়, তলস্তয় নিজের অজান্তেই যেন মেনে নিয়েছেন, হাজি মুরাদের লড়াই নিছক কৃষকের লড়াই নয়, এ লড়াই জাতীয় মুক্তির লড়াইও বৈকি!

দোহাই

১ লিও তলস্তয়, হাজি মুরাদ, আকবরউদ্দীন অনূদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪)।

২ M. Yu. Lermontov, A Hero of Our Time, D.J. Richards, ed. (London: Buitol Classical Press, 1994).

৩ V. Shklovsky, Lev Tolstoy, Olga Shartse, trans. (Moscow: Progress Publishers, 1978).

৪ Leo Tolstoy, Hadji Murat, Hugh Alpin, trans. (London: Hesperus Press, 2003).

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা