মানুষ গান গায় কেন: লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ প্রসঙ্গে

[এই ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম মহাত্মা লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ উপন্যাসের শতবর্ষ উপলক্ষে—আজ হইতে কমপক্ষে চৌদ্দ বছর আগে—ইংরেজি ২০০৪ সালের প্রথম ভাগে। ‘সূর্যতরু’ নামক একটি প্রায় অপরিচিত পাক্ষিক পত্রিকার এক সংখ্যায় (বর্ষ ২, সংখ্যা ৬, জুন ২০০৪) লেখাটি পত্রস্থও হইয়াছিল। সম্প্রতি লেখাটির সহিত আকস্মিক দেখা হইল আরেকবার। ২০০৪ সালের মুদ্রিত সংস্করণে কিছু ছাপার ভুল ছিল। সেইগুলি সংশোধন করিতে বসিয়া আরো কিছু পরিমার্জনা করিবার সুযোগ পাইলাম। কিন্তু লেখার মূল কাঠামো বদলাইয়া লিখিবার অবকাশ আর হইল না। ঐ সময়ে যে রীতির গদ্য মকেশা করিতাম অনেকদিন হয় তাহা হইতে সরিয়া গিয়াছি। কিন্তু পুরানা দিনের গদ্যরীতিটা স্মৃতিস্বরূপ রাখিয়াই দিলাম। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮।]

এ বছর মহাত্মা লেব তলস্তয় রচিত ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর ১০০ বছর পূর্ণ হলো। তলস্তয় ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটি লেখা শেষ করেছিলেন ইংরেজি ১৯০৪ নাগাদ। লেখকের জীবদ্দশায় গল্পটির প্রকাশ কেন সম্ভব হয়নি, তা কাহিনীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পৌঁছলে স্পষ্ট হয়। তলস্তয় এন্তেকাল করেন ১৯১০ সালে। এক বছর পর ১৯১১ সালে গল্পটির প্রথম প্রকাশ। এ গল্পের একাধিক ইংরেজি তর্জমা পাওয়া যায়। রচনার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি আরো একটি নতুন অনুবাদ হাতে পেলাম। ১৯৮৪ সালে অশীতিপর মহাত্মা আকবরউদ্দীন গল্পটির একপ্রস্ত প্রাঞ্জল বাংলা তর্জমা প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমান নিবন্ধের সুবাদে ভদ্রলোকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আজ শান্তি ও প্রীতির বাণী নিবেদন করছি।

তলস্তয় বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের ধারণা, ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটির আরো দু-দুটি বিকল্প নাম তলস্তয় চিন্তা করেছিলেন— একটি নাম ‘কাঁটা,’ অন্যটি ‘জেহাদ’। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়তো চোখের পাতা কুঁচকে বলবে, ‘জেহাদ’! আবার জেহাদ কেন? এ সহূদয় পাঠক-সুহূদদের বরং ধৈর্য ধরার আবেদন জানাব আমি। তলস্তয়ের ব্যাখ্যা অনুসারে জেহাদ বলে সেই লড়াইকে, যে লড়াইয়ের মধ্যস্থতায় কৃষক আপনকার জমিজমার ওপর আপনার অধিকার কায়েম করে আর আপন জমির ফসল আপনার দখলে রাখে। তলস্তয়ের মতে, জেহাদ নিছক ধর্মযুদ্ধ নয়, জেহাদ বলতে চাষীর লড়াই বা কৃষকযুদ্ধ বুঝতে হবে। লেব তলস্তয়ের হাজি মুরাদ এমনই কৃষকযুদ্ধের নায়ক বিশেষ।

প্রশ্ন হলো কৃষকের অধিকার আর কৃষকের ধর্ম যেখানে একাকার, যেখানে কৃষক নিজেই নিজের লড়াইকে জেহাদ বলে অভিহিত করে, সেখানে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোন অধিকারবলে এ ন্যায়বোদ্ধা কৃষকদের ধর্মান্ধ কি মৌলবাদী বলে গাল দেবেন? ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর সারাংশ ধরে আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারব। জানা যায়, লেব তলস্তয় গোটা নয়-নয়টি বছর ধরে— মানে ১৮৯৬ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত— এ গল্পের মুসাবিদা করেছিলেন। এ সময়ের মধ্যে লেখা একটি খসড়ায়— যা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত সংস্করণে খুঁজে পাওয়া যায় নাই— তলস্তয় যে কথা লিখেছিলেন, তাতে গল্পের গোড়াটা ভালোমতোই পাওয়া যায়।

১৮১২ সালে খান শাসিত অবার দেশের খুনজাক জেলার দুই ভদ্রমহিলা একই রাতে দুটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এদের একজন স্বয়ং শাসক খান সাহেবের স্ত্রী: পাকু বিকে তার নাম। আরেকজনের নাম ফাতেমা। ফাতেমা পাহাড়িয়া কোনো এক সাধারণ কৃষকের বেগম। খান সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে ফাতেমার ঘনিষ্ঠ চেনা-পরিচয় ছিল, ফাতেমাকে তিনি নিজ পুত্রসন্তানের দাই মা নিয়োগ করেন। ফাতেমার দুঃখ এই, তাকে খান সাহেবের ছেলেকে দুধ খাওয়াতে হয়, আর তার নিজের ছেলেটা (দুধের অভাবে) মারা যায়। ফাতেমা বেগম খুনজাক জেলার খানম সাহেবার সখী বটেন। এদিকে ফাতেমার বড় দুই ছেলে ওসমান আর হাজি মুরাদ ওই খানের প্রাসাদেই বড় হয়। তারা খান সাহেবের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা আর ঘোড়ায় চড়া যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করত।

এ রকম একটি সাধারণ পরিবারে, তথাকথিত ছোটলোক সমাজে হাজি মুরাদের জন্ম। নিজের ছেলেদের ভাগের শেষ দুধটুকুন খান সন্তানদের খাওয়াব না— এই দাবিতে মুরাদের মা অনেকবার অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। একবার এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে আপন স্বামীপ্রবর তাকে খুন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন, ছোরার আঘাতে গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছিলেন। এমন মায়েরই পেটের ছেলে হাজি মুরাদ। একদিন বড় হয়ে আপন জাতির মুক্তির জন্য যুদ্ধবিগ্রহে যোগ দেয় সে, প্রাণবাজি লড়াই করে। কপাল তার মন্দ, যুদ্ধে সে আহত হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ল। কিন্তু আত্মসমর্পণ করল না। কে এই বীর! কত তার হিম্মত! এ প্রশ্নের উত্তরেই তলস্তয়ের ছোট্ট উপন্যাস ‘হাজি মুরাদ’।

১.

ককেসাস পর্বতের ছায়ায় ঘেরা চেচনিয়া হাজি মুরাদের দেশ। এ ককেসিয়া মহাদেশের ইতিহাস বড়ই জটিল, বড়ই ঝঞ্ঝাপূর্ণ। পয়গম্বর হজরত ঈসা (আ.)-এর তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত জর্জিয়া আর আর্মেনিয়া নামের দেশ দুটি রোমক সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন বা তাঁবেদার রাষ্ট্র ছিল। সেই সময় কাজার জাতি দেশ দুটি দখল করে নিলে এ দুই দেশে— এবং ককেসাস উপমহাদেশের আরো অনেক স্থানে— ছোট ছোট অনেক পার্বত্য জাতি স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। সেখানকার আদ্যের বাসিন্দা বা স্থানীয়দের সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের অভ্যন্তর থেকে আসা অনেক জাতি একদেহে মিলে যাকে বলে লীন হয়ে যায়। হজরত ঈসার উনিশ শতকের গোড়া নাগাদ নানা জাতির লোক— প্রায় ৭০টি ভাষায় কথা বলার মতো— ককেশাস জাহানে বসবাস করত।

তুরানি জাতি আর ইরানি ভাষার আধিপত্যের জায়গায় সে দেশে— প্রথমবারের মতো— রুশ জাতির আধিপত্য কায়েম হয় হজরত ঈসার পঞ্চদশ শতাব্দীতে। উনিশ শতকে এসে রুশ বিজয় ও দখলদারি আরো পাকাপোক্ত হয়। যেমন ১৮০১ সালে জর্জিয়া রুশ সাম্রাজ্যের অবিভাজ্য অংশ বলে স্বীকৃতি পায়। তিফলিস থেকে ব্লাদিকাবকাজ পর্যন্ত একটা আন্তঃমহাদেশীয় মহাসড়ক রুশ সেনাদের চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয়। প্রধানত এরমলব নামে প্রসিদ্ধ রুশ সেনাপতির প্রতিভাবলে যে অঞ্চলকে আমরা এখন ককেসিয়া পারের দেশ বা ট্রান্স-ককেসিয়া বলি, তার পুরোটাই ১৮৩০ নাগাদ রুশদের তাঁবে চলে আসে। শুদ্ধ দুটি বড় দেশ তখন পর্যন্ত রুশ শাসন মেনে নেয়নি। একটি পূর্বে— চেচনিয়া, অন্যটি পশ্চিমে— চরকাসিয়া। এরা আরো ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত বিদেশী দখলদারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে থাকে। এ প্রতিরোধ সংগ্রামেরই এক খ্যাতনামা নায়ক, বীরত্ব আর মনুষ্যত্বের শেষ অবলম্বন ওরফে সম্বল বা পতাকার নাম অবার জাতির সন্তান হাজি মুরাদ।

তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে চেচনিয়ার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের একপ্রস্ত ঐতিহাসিক বা সত্যকার ছবি পাওয়া যায়। এ সময় ককেসাস সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতেন অন্য এক পার্বত্য জাতির নেতা শামিল। শামিল মহোদয় শুদ্ধ এ দুনিয়ার শাসক নন, একই সঙ্গে পরকালের মুক্তির উপায় বা পথনির্দেশকও বটেন। যাকে বলে ধর্মীয় নেতা তিনি। তিনি ইমাম শামিল। পূর্ব ককেসিয়ার অনেক পার্বত্য জাতি ইমাম শামিলের নেতৃত্বে রুশ দখলদারদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধে। তার প্রতিরোধ যুদ্ধ সফল হয়। ১৮৪০-এর দশকে রুশ উপনিবেশবাদ পরাজয় স্বীকার করে, প্রায় পরাভূত চরকাসিয়া দেশে তারা সামরিক অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ১৮৫৩-৫৬ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ চলার সময় এ পার্বত্য জাতিসংঘ কিছুদিন শান্তিতে স্থির ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় তারা আবার রুশ আগ্রাসনের মুখে পড়ে। তাদের ধনদৌলত, রসদপত্র, গোলাবারুদ ফুরিয়ে যায়। তারা আত্মসমর্পণ করে দলে দলে। বলা হয়, এ যুদ্ধে চেচনিয়ার মূল ভূখণ্ডের জনসংখ্যার চার ভাগের তিন ভাগই উচ্ছন্ন হয়ে যায়। ১৮৬৪ সালে এক চরকাসিয়া থেকেই প্রায় ছয় লাখ মানুষকে বের করে দেয়া হয়। তারপর সেখানে স্থাপন করা হয় রুশ বসতি। আজো সেই যুদ্ধের শেষ হয়নি। যুদ্ধ এখনো চলছে। (লেরমন্তব ১৯৯৪: ২৪)

রুশ লেখকদের মধ্যে আলেকসান্দর পুশকিন, মিখাইল লেরমন্তব ও লেব তলস্তয় এই এশিয়াবি ককেসাস নিয়ে অনেক স্মরণীয় গল্প লিখেছেন। স্বাধীনতা-পূজারি এসব পার্বত্য জাতির আদর্শ বীরদের স্থানীয় ভাষায় বলে ‘জিগিত’। এই জিগিতের বৈশিষ্ট্য অকুতোভয় যোদ্ধার, বুদ্ধিমান সেনাপতির, দেশপ্রেমের, প্রতিশোধ গ্রহণে অপরাঙ্মুখ অশ্বারোহীর। চেচেন আর চরকাসিয়াবি জাতির আনুগত্য শুদ্ধ আপন আপন জাতির জন্য নয়, আপন আপন ধর্মের জন্যও বটে। বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা যেমন জাতির প্রতিটি সন্তানের, প্রত্যেক বীরের দায়িত্ব, বিধর্মীর হাত থেকে আপনার জাতীয় ধর্ম রক্ষা করাও তেমনই তাদের দায়িত্ব বৈ নয়। লেরমন্তবের ‘আমাদের কালের নায়ক’ গল্পে ঢের চরকাসিয়াবি চরিত্র দেখা যায়, আর তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে শোনা যায় চেচেন জাতির মাহাত্ম্যগাথা।

আদিতে রুশবিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধেই যোগ দিয়েছিলেন হাজি মুরাদ। প্রথমে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন ধর্মীয় নেতা ইমাম শামিলের নেতৃত্বেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামিলের বশ্যতা স্বীকারের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাননি তিনি। পরাধীনতা ব্যবসায়ী রুশদের কাছে একবার আত্মসমর্পণ করেন, আবার সেখান থেকে পালিয়েও আসেন হাজি মুরাদ। সেই পালানোর পথেই শেষ পর্যন্ত বীরের মতো লড়তে লড়তে প্রাণ দেন তিনি। তবে ঠিক রুশ বাহিনীর হাতে নয়, রুশপক্ষভুক্ত রাজাকার অর্থাৎ শামিলের অনুগত বাহিনীর হাতে। তাঁর কাটা মাথা অবশেষে রুশদের হাতেই পড়ে। তলস্তয়ের গল্পের মধ্যেই আমরা সেই কাটা মাথার দেখা পাই।

তলস্তয়ের মতে, এই রুশ-চেচেন যুদ্ধটি শেষ বিচারে এক ধরনের প্রভু ও ভৃত্যের যুদ্ধ, একজাতীয় জমিদার-কৃষক লড়াই বৈ নয়। তিনি দেখান, রুশ দেশের কৃষক আর চেচেন জাতির কৃষক— দুই জাতিরই অভিন্ন দুশমন রুশ স্বৈরতন্ত্র ও রুশ শাসক শ্রেণী। এই শাসক শ্রেণী চেচনিয়ার কৃষকদের ফসল, ক্ষেতের ভুট্টা সাবাড় করে ফেলছে আর সৈনিকের উর্দি গায়ে চাপিয়ে দিয়ে অভুক্ত রুশ কৃষককে চেচেন সন্তানদের পেছনে লেলিয়ে দিচ্ছে। তলস্তয় জানেন, রুশ কৃষক আর পার্বত্য জনগণ— উভয়েরই— এক নম্বর দুশমন রুশ দেশের সম্রাট— জার। ঘটনাচক্রে সে যুগে— গল্পের ঘটনা ১৮৫১ সালের— যিনি জারের সিংহাসনে আসীন তার নাম নিকোলাস, পরবর্তী ইতিহাসের আলোকে বললে প্রথম বা এক নম্বর নিকোলাস। ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে তলস্তয় জার এক নম্বর নিকোলাসের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ক্ষমতার ব্যবসায় আর স্বৈরতন্ত্রের হাতে সৃষ্ট যে অশুভ কাঠামো রুশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রমূলে স্থাপিত, সেই বড় অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নায়ক হাজি মুরাদ। পরিচয়ে তিনি যুগপথ চেচেন মুসলমান ও কৃষক সংগ্রামের নেতা।

তাই বলে তলস্তয় এ যুদ্ধে হাজি মুরাদকে জয়ী করেছেন এমন নয়। আমাদের মহাযুগের ট্র্যাজেডি যে কৃষকযুদ্ধের ট্র্যাজেডি, তলস্তয় এ সত্য ঠিকই ধরে ফেলেছেন। কারণ কৃষকরা সমবেত হয় কোনো রাজা, কোনো গান্ধী, কংগ্রেস, বেগ, খান বা এ-জাতীয় কোনো খেতাবধারীর পতাকাতলে আর ঘরে ফিরেই তারা দেখতে পায় মাথার ওপর তাদের নতুন প্রভু। হাজি মুরাদ কি মুসলমান না খ্রিস্টান? ইমানদার না পৌত্তলিক? এ প্রশ্ন বড় প্রশ্ন নয় তলস্তয়ের চোখে। অথচ হাজি মুরাদের চোখে ধর্ম বিশ্বাস আর ন্যায়ের সংগ্রাম আদপেই আলাদা জিনিস নয়। এখানেই আমরা দেখতে পাই, তলস্তয়ের মতো মনীষীও গোঁড়ামির কবজা থেকে ষোলআনা মুক্ত থাকতে পারেননি। তিনি নিজে ন্যায়ের সংগ্রামে মহাত্মা যিশুর পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, অথচ হাজি মুরাদের ইসলামী পতাকা তার চোখে বড়জোর একপ্রস্ত উপদ্রবের অধিক নয়। তলস্তয়ের ধারণা, হাজি মুরাদের মুসলমানিত্ব একটা কথার কথা বৈ নয়, তার অন্তরের কৃষক ভাবটাই আসল। ১৮৯৭ সালের ৪ এপ্রিলের রোজনামচায় তলস্তয় লিখেছিলেন: ‘হাজি মুরাদ লোকটি ধর্মান্ধতার শিকার— তার বিষয়ে বলার আমার মূল কথাটা এটাই। তা যদি না হতো বা লোকটাকে কি ভীষণ সুন্দরই না দেখাত!’ (শক্লোভস্কি ১৯৭৮: ৬৮৩)

গণ্যমান্য অভিজাত শ্রেণীর সুযোগ্য লেখক তলস্তয়ের এটুকু ভুলচুক হয়েছে, এ কথা অবশ্যই কবুল করা যায়। তবুও আমাদের অধিক যেতে হবে, স্বীকার করতে হবে, হাজি সাহেবের সমস্যাও নেহাত সরল সমস্যা ছিল না। হাজি মুরাদ কৃষক সমাজের নেতা, হাজি মুরাদের জেহাদ যুগপথ রুশ জারতন্ত্র ও শামিল স্বৈরাচার উভয়ের বিরুদ্ধেই। এছাড়া তার আর যাওয়ার অন্য কোনো পথও ছিল না। তলস্তয় চরিতামৃতকার শক্লোভস্কি লিখেছেন: ‘যদি সে শামিলের পথে যায়, তার যশ-মান-সম্মান সবই হবে, কিন্তু চাষী সমাজ কিছুই পাবে না। আবারো যে জোরজুলুম, সেই জোরজুলুমই চলতে থাকবে। যদি সে রুশ সম্রাটের কাছে যায়, টাকাপয়সা, মানসম্মান সবই তার হবে, কিন্তু এ রুশরাই তো চেচেন চাষীর ফসলের খেতখামার দুপায়ে দলন করছে।’

জার এক নম্বর নিকোলাসের চেয়ে জোরজুলুম অত্যাচারে শামিলও একচুল কম যান না। শামিলের ক্রোড় থেকে হাজি মুরাদ ছুটে যান নিকোলাসের বাহুডোরে। যাওয়ার পথে সে দেখা পায় জনৈক রুশ সৈন্যের— বেটা পালাচ্ছে ওই নিকোলাসের সৈন্যদল ছেড়ে। এমন সময় আচমকা একটা বুলেট এসে বেটার গায়ে বেঁধে। বেইমান সৈন্য নামের কলঙ্ক থেকে সে বেঁচে গেল। কারণ আচমকা গুলিটা এসেছিল চেচেনপক্ষের বন্দুক থেকে।

২.

হাজি মুরাদকে তলস্তয় দেখিয়েছেন যুদ্ধে আহত, বন্দি, পলাতক, সম্মুখযুদ্ধে অকুতোভয়, বীরদর্পে নিহত যোদ্ধা চরিত্র আকারে। তিনি শির দিয়েছেন, কিন্তু আমামা দেননি। সুতরাং তারই জয় হয়েছে। এ জয়টা তলস্তয় দেখান মোট দুই প্রকরণে। প্রথম প্রকরণে প্রেম, দুই নম্বরে যুদ্ধ। রুশপক্ষীয় দুর্গে জনৈক সেনাপতির স্ত্রী মারিয়া দিমিত্রিয়েবনা হাজি মুরাদের দিকে বেশ একটা ভালোবাসার টান অনুভব করেন। ওদিকে বাটলার নামক জনৈক সৈন্যাধিনায়কও এই মহীয়সী মারিয়ার কৃপাপ্রার্থী। জ্যোত্স্নাভরা এক রাতে বাটলারের সঙ্গে হাওয়া খাওয়ার তাগিদে সেনা শিবিরের চৌহদ্দির মধ্যে পাঁয়চারি করছেন মারিয়া। তখন ছোটখাটো এক সেনাপতি— নাম কামেনেব— কয়েকজন কসাক সৈন্য অভিব্যহারে তাদের মুখোমুখি। তারা ঝুলি খুলে হাজি মুরাদের কাটা মাথাটি টেনে বের করে দেখালেন মারিয়াকে। চাঁদের আলোয় অর্ধদৃষ্ট কাটা মুণ্ডুটা দেখিয়ে ওরা যেন বা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে— ‘দেখো তো মাথাটা, কার চেনা যায় কিনা?’ শত শত আঘাত আর ক্ষতের দাগধস হজম করেও জীবিত হাজি মুরাদের ঠোঁটের শিশুসুলভ হাসিটি হারায়নি এই কাটা মাথা। ঘৃণায় মারিয়া মুখ ঘুরিয়ে নেন। এই মহার্ঘ্য, খণ্ড মাথা দেখতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অসম যুদ্ধের এই বিজয়চিহ্নে, এই করুণ সম্বলে মোটেও আনন্দ হয় না তার।

মারিয়া দিমিত্রিয়েবনাকে এভাবে কাটা ছিন্নমাথা দেখানোর কিছুক্ষণ পরই তলস্তয় হাজি মুরাদের সঙ্গে পশ্চাদ্ধাবনরত রুশ সৈন্য দলের শেষ মহারণের বিবরণটা পেশ করেন। এদিকে আমরা বিলক্ষণ জানি, হাজি মুরাদের কাটা মুণ্ডু এখন রুশ বাহিনীর থলের ভেতরই। চাঁদের আলোয় দেখা না দেখা সেই কর্তিত শিরের স্মিত হাসিটি এখনো অম্লান। তবু শেষ অধ্যায়ের বিবরণটা আমরা পড়ি শিরা টান টান দশায়। এমনকি আশাও করি, হাজি মুরাদ তার শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে জিতবেন, প্রাণে বেঁচে যাবেন শেষ পর্যন্ত। একেই কি বলে ‘কবির বিচার’— ইংরেজদের ভাষায় পোয়েটিক জাস্টিস!

তলস্তয়ের বিচারে হাজি মুরাদের লড়াই রুশ জাতির বিরুদ্ধে, চেচেন জাতির লড়াই নয়। তিনি দেখাচ্ছেন হাজি মুরাদকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করল— ঠিক রুশ বাহিনী নয়, রুশপক্ষে যোগ দেয়া চেচেন রাজাকারের দল। তলস্তয় এখানে ন্যায় আর অন্যায়ের যুদ্ধ অপূর্ব সুন্দর চিত্রাকারে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন: ‘সুবেহ সাদেকের সময় হাজি মুরাদ অজু করার জন্য পানি নিতে আবার এই কামরায় এলেন। রাত্রি-দিবার এ সন্ধিক্ষণে ভোরের আলোর উদ্দেশে পাপিয়ার উল্লসিত কণ্ঠস্বর উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। আর এই সময় মুরিদদের কামরা থেকে শোনা যাচ্ছিল ছোরা শান দেয়ার পাথরের সঙ্গে লোহার ঘস ঘস শব্দ।’

হাজি মুরাদ টব থেকে পানি নিয়ে নিজের কামরায় দোরের কাছে এসেছেন, এমন সময় ছোরা শান দেয়ার ঘস ঘস শব্দ ছাপিয়ে ছাপিয়ে হানেফির কণ্ঠে শুনতে পেলেন পরিচিত গানের স্বর। শোনার জন্য দাঁড়ালেন। গানের বিষয়বস্তু এই: হামজা নামের একটি জোয়ান তার সাঙ্গোপাঙ্গ সমভিব্যহারে রুশদের একপাল ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়েছিল। জনৈক রুশ রাজপুরুষ বিস্তর সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের পিছু নেয়। পরিশেষে তেরেক নদীর পাড়ে এসে তাদের ঘেরাও করে। অনন্যোপায় হামজা ঘোড়াগুলো হত্যা করে। যতক্ষণ তাদের রাইফেলে গুলি, কোমরবন্দে ছোরা আর শিরায় রক্তপ্রবাহ জারি ছিল, ততক্ষণ তারা লড়াই করে। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে কতকগুলো পাখিকে উড়ে যেতে দেখে হামজা। তাদের উদ্দেশে চিত্কার করে সে। গান গাইতে থাকে—

         যাও পাখি উড়ে যাও, আমাদের বাড়ি যাও

         মায়েদের বলো আমাদের, বলো আমাদের বোনেদের

         আমাদের প্রিয়াদের বলো, যুদ্ধ করে মরেছি আমরা

         মরেছি জেহাদ করে! গিয়ে বলো তাদের

         কবরে আরামে থাকবে না আমাদের লাশ

         আমাদের খাবে বাঘে, টুকরো টুকরো ছিঁড়বে,

         কাক আর শকুন আমাদের চোখ উপড়াবে।

                                 (তলস্তয় ১৯৮৪: ১৪২-৪৩)

গানের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে গায়কেরা উপনীত হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চারণে। গানের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই তীক্ষ একটা আর্ত স্বর বাতাস খান খান করে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। তারপর সব স্তব্ধ, নীরব।

শোনা যায়, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা একবার লেব তলস্তয়কে জিজ্ঞাসা করেছিল: ‘মানুষ গান গায় কেন?’ শক্লোভস্কির মতে এ প্রশ্নের উত্তরেই তিনি ‘হাজি মুরাদ’ লিখেছিলেন। এখানেই তলস্তয় অজ্ঞাতসারে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, হাজি মুরাদের লড়াই আচমকা এক ব্যক্তির লড়াই নয়, এ লড়াইয়ের একটা পূর্ব আছে, সম্ভবত একটা উত্তরও আছে। হামজার জীবনের সঙ্গে হাজি মুরাদের জীবনদানের মিলটাও একান্ত আপতিক মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বীকার করতে হয়, তলস্তয় নিজের অজান্তেই যেন মেনে নিয়েছেন, হাজি মুরাদের লড়াই নিছক কৃষকের লড়াই নয়, এ লড়াই জাতীয় মুক্তির লড়াইও বৈকি!

দোহাই

১ লিও তলস্তয়, হাজি মুরাদ, আকবরউদ্দীন অনূদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪)।

২ M. Yu. Lermontov, A Hero of Our Time, D.J. Richards, ed. (London: Buitol Classical Press, 1994).

৩ V. Shklovsky, Lev Tolstoy, Olga Shartse, trans. (Moscow: Progress Publishers, 1978).

৪ Leo Tolstoy, Hadji Murat, Hugh Alpin, trans. (London: Hesperus Press, 2003).

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

আহমদ ছফার হুমায়ূননামা

[এই রচনাটি লিখিয়াছিলাম ইংরেজি ২০১২ সালের আগস্ট মাসের গোড়ায়। দুঃখের বিষয়, পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় রচনাটি ছাপাইতে রাজি হন নাই। সত্যের মধ্যে লেখাটি তাঁহাদের উপরোধেই লেখা হইয়াছিল। সহকারী মোমেন সাহেবের মধ্যস্থতায় সম্পাদক মহাশয় জানাইয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ মাত্র পরলোকগমন করিয়াছেন, এই লেখাটি পরলোকগত লেখকের স্মৃতির সহিত যাহাকে বলে মানানসই হইবে না। সম্প্রতি আমার বাসার পুরানা আবর্জনা সাফ করিতে বসিয়া লেখাটি খুঁজিয়া পাইয়াছি। এতদিন পর পড়িয়া দেখিতেছি ইহার সকল বাক্যই বর্জনীয় হয় নাই। অন্তত আহমদ ছফা ব্যবসায়ী সমাজে ইহার একপ্রকার চাহিদা থাকিতে পারে—এই বিবেচনায় রচনাটি পুনশ্চ সম্পাদিত হইল। ইহার ভিতর দেখিতে দেখিতে ছয় বৎসর পার হইয়া গিয়াছে। যৎসামান্য মাত্র পরিমার্জনার পর লেখাটি আরেকবার হাজির করিতেছি।—ইতি ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮]

ঈদসংখ্যার অজুহাতে ‘অন্যদিন’ পত্রিকার মোমেন সাহেবকে কথা দিয়াছিলাম এই বছরও একপ্রস্ত লেখা তাহার হাতে তুলিয়া দিব। বিষয় ঠিক করিয়াছিলাম ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। অতি অল্পবয়সে দত্তজ কবির মুণ্ডুপাত করিয়া ঠাকুরবাড়ি হইতে প্রকাশিত ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ছয় কিস্তিতে একপ্রস্ত ভয়াবহ নিবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রবন্ধটি একদা সহজে পাওয়া যাইত না। হালে এক বন্ধুর দয়ায় ‘ভারতী’ পত্রিকার আদি সংস্করণ হইতে ছাপ লওয়া এই অচলিত সংগ্রহটি হাতে পাইলাম। আর বিশ্বভারতী হইতে মুদ্রিত সংস্করণের সহিত তাহা মিলাইবার সুযোগও হইল। বলা যায় আমি এক প্রকার হালে পানি পাইলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলিত প্রবন্ধটির পর্যালোচনা লিখিব স্থির করিয়াও লেখাটা শেষ পর্যন্ত শেষ করিতে পারি নাই। ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দেনাশোধ করিবার নিমিত্ত অগত্যা এই নিবন্ধ লিখিতেছি। মনে হইতেছে নিজে মরিয়া হইলেও হুমায়ূন আহমেদ আমাকে—এই ঈদসংখ্যা দায়গ্রস্ত অনাহারী লেখককে—বাঁচাইলেন, অন্তত এই যাত্রা প্রাণে বাঁচাইয়া গেলেন।

আহমদ ছফার এন্তেকাল উপলক্ষে হুমায়ূন আহমেদও একদা একপ্রস্ত স্মৃতিকথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আহমদ ছফার লেখা কোন উপন্যাস বা প্রবন্ধ কি অন্য রচনা লইয়া তিনি নিশ্চয় আরো কিছু লিখিবার অধিকার রাখিতেন। সে অধিকার তিনি আদায় করিয়াছেন কিনা তাহা কালে জানা যাইবে। আজিকার লেখায় আমি ঐদিকের কথা তুলিতে চাহিতেছি না। এইদিকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিংবা গল্প লইয়া যাঁহারা বিশেষ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন আজ পর্যন্ত তাঁহাদের সংখ্যাও ক্ষুদ্রই রহিয়াছে। সেখানে আহমদ ছফার নামও আমি এখন পর্যন্ত দেখি নাই। সান্ত্বনার মধ্যে, সাক্ষাত্কার নামধেয় কয়েকটি রচনায় মহাত্মা আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে যে সকল মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহা হইতেও বিশেষ শিক্ষা করিবার জিনিশ আমি কয়েকটা খুঁজিয়া পাইয়াছি। স্থির করিয়াছি আজিকার লেখায় তাহার কিছু নমুনা তুলিয়া আনিব।

মহৎ মানুষেরও কখনও কখনও স্মৃতির বিভ্রম হয়। এক জায়গায় দেখিলাম মহাত্মা আহমদ ছফারও খুব সম্ভব একটা স্মৃতিবিভ্রম ঘটিয়াছিল। আহমদ ছফা এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘সকলে যে মধুদার টাকা মেরে দিতেন এটা সত্যি নয়। কাউকে কাউকে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসেও মধুদার টাকা শোধ করতে দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির। তিনি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। ফরেন সার্ভিসে আড়াই কি তিন বছর কাজ করার পর—আমি তাঁকে দেখেছি—দোকানে এসে মধুদার বাকি পাওনা পরিশোধ করতে।’ (ছফা ১৪০৪)

আহমদ ছফার বয়ানে উক্ত ‘এখন’—মানে ১৯৯৭ সালে—যিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন—তিনি নিজেই সম্প্রতি ঢাকায় আমাকে জানাইয়াছেন—তিনি আহমদ ছফার শিক্ষক ছিলেন না—ছিলেন শিষ্যস্থানীয় বা বন্ধুতুল্য অনুজ মাত্র। বিভ্রমের একটা সম্ভাব্য কারণ এই যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে একদা একই নামের অপর একজন সিনিয়র কূটনীতিকও কর্মরত ছিলেন। ঐ ভদ্রলোক শুনিলাম সম্প্রতি প্রয়াত হইয়াছেন। তিনি ১৯৬০ দশকের গোড়ায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তপাতী নাজিরহাট কলেজে শিক্ষক ছিলেন। আহমদ ছফা ছিলেন সেই কলেজেরও ছাত্র। আহমদ ছফার কলেজ শিক্ষক হুমায়ুন কবির সাহেব একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোন এক শাখার পরিচালক পদে আসীন হইয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। এদিকে মধুদা তো ১৯৭১ সালের আগের কালের—অতীত দিনের—স্মৃতি বৈ নহেন।

আহমদ ছফা একাধারে হুমায়ূন আহমেদকে—মানে তাঁহার কোন কোন লেখা পদার্থ—পছন্দ করিতেন, আবার কখনো কখনো তাঁহার কঠিন সমালোচনাও করিতেন। আমাদের জিজ্ঞাসা করিতে হইবে—এই পছন্দ আর অভিযোগের গোড়ায় কি লুকাইয়া আছে? এখানে আমরা আহমদ ছফার পরিণত বয়সের একটি জবানবন্দী হইতে শুরু করিব। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম হইতে বিমানযোগে ঢাকা আসিয়া দুইটি তরুণ আহমদ ছফার একটি সাক্ষাত্কার আদায় করেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বর নাগাদ নিজ হাতে সংশোধন করিয়া সাক্ষাত্কার রচনাটি তিনি আরেকবার লিখিয়াছিলেন। সেই সংশোধিত পাঠ হইতে আমি এখানে কিছু সারগ্রহণ করিতেছি। চট্টগ্রামীণ ঐ সাক্ষাত্কারপ্রার্থীর নাম ছিল মীজানুর রহমান। এক জায়গায় আসিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের এখানে আপনার প্রিয় লেখক কে কে আছেন?” উত্তরে আহমদ ছফা অনর্গল বেশ কয়েকজন লেখকের নাম বলিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমেই দেখি হুমায়ূন আহমেদের নাম—অন্তত তাঁহার লেখা একটি বহির নাম—জ্বলজ্বল করিতেছে। পুরা উত্তরটা তুলিয়া দিলে হয়ত আখেরে আমার রক্ষা হয়।

আহমদ ছফা বলিলেন: ‘এককভাবে প্রিয় লেখক কেউ নেই। বিশেষ লেখকের বিশেষ বই আমার ভাল লেগেছে। ভাল লাগা বইগুলো হল: হুমায়ূন আহমেদের “নন্দিত নরকে”, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই,” হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পগুলো, শওকত আলীর “প্রদোষে প্রাকৃতজন,” শওকত ওসমানের “জননী,” শাহেদ আলীর কোন কোন ছোটগল্প, রাজিয়া খান আমিনের “বটতলার উপাখ্যান,” মঞ্জু সরকারের “তমস,” সেলিম আল দীনের নাটক “কেরামতমঙ্গল,” সত্যেন সেনের “সেয়ানা,” “আলবেরুনী” এ সকল বই। আমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “লাল সালু” এবং তাঁর দুটি নাটককে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকি। আবু ইসহাকের “সূর্য-দীঘল বাড়ী”, আলাউদ্দিন আল আজাদের কোন কোন গল্পের কথা অবশ্যই উল্লেখ করব। আমার পছন্দের তালিকায় আরো কিছু লেখকের বই আছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৮০)

আরো দুই কি তিন জায়গায় আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদের—বিশেষ তাঁহার ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটির—তারিফ করিয়াছিলেন। সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসুর সহিত একখণ্ড সাক্ষাত্কারের তারিখ জানুয়ারি ১৯৯৬। এই রচনায়ও তিনি প্রাণ খুলিয়া বলিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা ‘নন্দিত নরকে’ সেই সময়ের জন্য ‘রেয়ার’ [মানে দুর্লভ অর্থাৎ অসাধারণ] লেখা। হুমায়ূন আহমেদের নাম মুখে আনিবার আগে তিনি আর যে দুই দুইজন লেখকের বিশেষ গুণকীর্তন করিয়াছিলেন, তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে শওকত ওসমান ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। আহমদ ছফার জবানিতেই পড়িতেছি: ‘যুগলক্ষণ আছে, কিন্তু যুগলক্ষণ অতিক্রম করে টিকে থাকবে দুজন লোক খুব সম্ভবত—আগের শওকত ওসমান, তাঁর “জননী”—আর ওয়ালিউল্লাহ সাহেব। তাঁর উপন্যাসগুলোর চাইতে নাটকগুলো মিনিংফুল বেশি। এগুলো সমাজে ইয়ে পায়নি। তারপরে এই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখাটা, “নন্দিত নরকে” … সেই সময়ের জন্য রেয়ার লেখা।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৮)

হুমায়ূন আহমেদের অসাক্ষাৎ তারিফ উপলক্ষে আহমদ ছফা আরও বলিলেন, হুমায়ূন ‘একবিন্দুও সেক্স না লিখে শ্রেষ্ঠ বাজারসফল বই’ লিখেছেন। এই জায়গায় তিনি তাঁহার বিপরীত-কোটির লোক পরিচয়ে সৈয়দ শামসুল হকের—বিশেষ তাঁহার ‘বাজার সুন্দরী’ নামক একটি বইয়ের—কথা উঠাইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘বাজার সুন্দরী বলে একটা উপন্যাস আমি পড়েছি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা। কি এগুলো! কি করে এগুলো মানুষ লেখে! সেক্স দিলে লোকে বই কিনবে, সেটার জন্যই করছে, বাজারের জন্য করছে।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৯)

এইদিকে আবার হুমায়ূন আহমেদের নামে একটা অভিযোগের ফিরিস্তিও দাখেল করিয়াছেন আহমদ ছফা। এই অভিযোগের তালিকাটা তেমন হ্রস্বও নহে। সাক্ষাত্প্রার্থীর নাতিদীর্ঘ এক সওয়ালের জবাবে তিনি আপনকার পরিচিত উপপাদ্য পুনঃপ্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রার্থী জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তার সাক্ষাৎ কারণ কি?’ উত্তরের জন্য আহমদ ছফা যেন তৈয়ার হইয়াই ছিলেন। তিনি বলিলেন: ‘হুমায়ূনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর এই উন্নতি বা অবনতির জন্য অংশত আমাকেই দায়ী করতে চান। তাঁর প্রথম বই যখন বেরিয়েছিল, আমিই সবচাইতে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল হয়ত হুমায়ূনের মধ্যে কালে কালে আমরা চেখভের মত একজন প্রতিভার সন্ধান পাব। তিনি তো সে পথে গেলেন না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

আহমদ ছফার মতে, হুমায়ূন আহমেদ গেলেন উন্নতির পথে নয়, অবনতির পথে। মানে গেলেন যে পথ চিন্তাহীনের—যে পথ অরাজকের—সেই পথে। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘উপর্যুপরি সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয়, সব মিলিয়ে এখানে যে চিন্তাহীন অরাজক পরিস্থিতি— হুমায়ূন সেই সময়ের প্রোডাক্ট।’ তাহার পরও প্রশ্ন থাকে। থাকে জনপ্রিয়তার প্রশ্ন। আহমদ ছফা কবুল করিলেন হুমায়ূন আহমেদ কামেল লেখক। কামেল না হইলে পাঠকদের মধ্যে তিনি জায়গা পাইলেন কেমন করিয়া? জায়গা শব্দের স্থলে ‘স্থান’ শব্দটাও বাংলাদেশের ভাষায় ব্যবহার্য। তাহার সত্য ব্যবহার করিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসিলেন: ‘আমার প্রশ্ন—এটা কি স্থান? হুমায়ূনের পরবর্তী রচনা চানাচুরের মত। খেতে মজা লাগে কিন্তু পেট ভরে না এবং সারপদার্থও বিশেষ নেই।’

একটু আগেই তিনি ব্যাখ্যা করিতেছিলেন ‘সফলতা’ কাহাকে বলে। বলিতেছিলেন, ‘সফলতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জাতির মর্মমূল স্পর্শ করে যদি ব্যর্থও হই, তার একটা আলাদা মূল্য আছে। মামুলি সার্থকতার চাইতে মহৎ ব্যর্থতার মূল্য অনেক বেশি। হুমায়ূন আহমেদ [প্রভৃতি] এঁরা ওই অর্থে সফল লেখক যে লিখে তাঁরা টাকা কামিয়েছেন। টাকা কামানোটাই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি?’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে এই পর্যন্ত আহমদ ছফা যাহা যাহা বলিয়াছেন তাহার সার তিন কথায় গ্রহণ করা যায়। একে আছে তাঁহার জনপ্রিয়তা মানে তিনি ভাল গল্প লেখেন—দুই নম্বরে তিনি সেক্স বিক্রয় করেন নাই, মানে সেক্স ছাড়াও বিক্রয় করার মতন অন্য পদার্থ তাঁহার আছে—আর তিন নম্বরে বলা যায় তিনি মার্শাল ল ওরফে সামরিক শাসনের প্রোডাক্ট। ‘প্রোডাক্ট’ মানে কি? ফসল বা সম্পত্তি বা পণ্য। যদি তাই হয় তো একটা ব্যাখ্যা আমিও পেশ করিতে পারি। তিনি কি সামরিক শাসনের শরিক বা সামরিক সমাজের সমর্থক বা বেসামরিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন? তবে কি একথা সত্য যে, যে সকল সমাজে একনায়কতান্ত্রিক শাসন স্বাভাবিক হুমায়ূন আহমেদ সেই ধরনের সমাজ হইতে আসিয়াছেন কিংবা সেই ধরনের সমাজেই ফিরিয়া যাইবেন?

আহমদ ছফাকে যাহারাই সামান্য চিনিতেন বা জানিতেন তাহারাই জানেন, নিরুত্তর থাকিবার লোক ছিলেন না তিনি। সাজ্জাদ শরিফও বেশ শরিফ লোক। তাঁহার সেদিনের সওয়ালটাও যথেষ্ট আশরাফ সওয়াল ছিল। রাখিয়া-ঢাকিয়া পরাণে কাচুলি পরিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন হুমায়ূনের সহিত বিবাদটা আহমদ ছফার একান্ত ব্যক্তিগত মামলা কিনা। আহমদ ছফা সঙ্গে সঙ্গে জানাইয়া দিলেন এই মামলার একটি এজমালি কিংবা পাবলিক তরফও আছে। বলিলেন, ‘না, না, হুমায়ূনের বড় প্রবলেমটা হচ্ছে মার্শাল ল।’ মানে ইঁহারা মার্শাল লয়ের মধ্যে বাড়িয়া উঠিয়াছেন। এই জায়গায় ইমদাদুল হক মিলনের নামটাও আসিয়াছিল।

সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে ঐদিন তাঁহার সহকর্মী, তাঁহার পেশাত ভাই, ব্রাত্য রাইসুও হাজির-নাজির ছিলেন। রাইসু সাহেব পোঁছ করিলেন, ‘মার্শাল লয়ের মধ্যে’ কথাটা জানি কি অর্থ বহন করিতেছে? আপনকার স্বভাবধর্ম মতেই এ কথাটার জবাব দিয়াছিলেন আহমদ ছফা। বলিয়াছিলেন, ‘মার্শাল ল’র ভেতরেই একদম’ বাড়িয়া উঠিয়াছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ছফার জবানবন্দী ছিল এই রকম, ‘লেখক হিশেবে সেভেন্টি—ফোরে তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে, সেভেন্টি—ফাইভ থেকে এদের গ্রোথ। মার্শাল ল’র মধ্যে আমাদের গ্রেটেস্ট সোশ্যাল ডিসকোর্স যেগুলো… একজন লেখককে সোশ্যাল ডিসকোর্সে অংশগ্রহণ করতে হয়।’ আহমদ ছফার মুখ হইতে কথাটা কাড়িয়া লইলেন ব্রাত্য রাইসু। ফোড়ন কাটিলেন: ‘ওনারা করেন নাই?’ ছফা বলিলেন, ‘হুমায়ূন করে নাই একদম।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৩)

এই জায়গায় আসিবার পর হঠাৎ ইমদাদুল হক মিলনের কথাটা উঠিল। আহমদ ছফা জানাইলেন, মিলন ভারতবর্ষের দক্ষিণপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’ যে ডিসকোর্স বাংলাদেশে রপ্তানি করিতেছে তাহার সহিত গলা মিলাইয়াছেন। এক্ষণে সাজ্জাদ শরিফ পর্যন্ত অগত্যা আপনকার শরিফ মুখোশটি সরাইয়া লইতে বাধ্য হইলেন। তাঁহার সহি বড় খোদ চরিত্রটি প্রকটিত করিলেন। অন্তরের অন্তস্থলে যে আদি ও আসল সত্য এতদিন লুকাইয়া ছিল সেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত থলির সত্য বিড়ালের মত বাহির হইল। তিনি দাবি করিলেন, ‘কিন্তু নূরজাহানের ঘটনা তো সত্যি, ছফা ভাই।’ আহমদ ছফা মনে হইল এই দাবিটার সত্যকার জবাব আর দিতে পারিলেন না। সুতরাং নিম্ন-মধ্যবিত্তের জয় হইল। না, জয় হইল কই? তিনি মাত্র প্রসঙ্গান্তরে গমন করিলেন। বলিলেন, ‘তসলিমা কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ডিসকোর্স থেকে জন্মেছে, ইন্ডিয়ানরা ব্যবহার করেছে তাঁকে। কিন্তু মিলন আমাদের ডিসকোর্স থেকে জন্মায়নি। আর হুমায়ূন ডিসকোর্সটা এভয়েড করেছে।’ এই প্রতিপাদ্যের প্রমাণ বাবদ আহমদ ছফা তসলিমা নাসরিনের দোহাই পাড়িয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তসলিমা একটা ইন্টারভিউতে বলেছিল, আমি হুমায়ূন আহমেদের মত লিখতে পারতাম, লিখি নাই।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৪)

আহমদ ছফা ঠিকই ধরিতে পারিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ শেষের দিকে সোশ্যাল ডিসকোর্সে ঢুকিবার পথ—তক্কে তক্কে মোকামে যাইবার খানকা—খুঁজিতেছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে সেই মোকাম পর্যন্ত পৌঁছিতে তিনি পারেন নাই। কেন পারেন নাই তাহার একটা নির্ণয়ও তিনি বাতলাইয়াছিলেন। চেষ্টা করিয়াও হুমায়ূন পারেন নাই। কারণটা হয়ত তাঁহার মনের মধ্যেই লুকাইয়া ছিল। আহমদ ছফা পদার্থটার নাম রাখিয়াছিলেন বড়ই কোমল: ‘মানসিক শুদ্ধতা’। বাহিরের রাস্তার লোক যাহা চায় তাহা লিখিব বলিয়া যাঁহারা পণ করেন তাঁহাদের মানসিক শুদ্ধতায় টান আছে। আমার প্রাণ যাহা চায় তাহা লিখিবার কোশেস করিব—এই পণ করিলে অশুদ্ধিদোষ খানিক কাটিয়া যায়। আহমদ ছফার গুরু অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার বর্তমান লেখককে কহিয়াছিলেন, ‘চায়ের পেয়ালায় দুই ফোঁটা লেবুর রস টিপিয়া দিবেন, দোষটোষ কিছু থাকিলে এক্কেরে কাইট্টা যাইব।’ আহমদ ছফার ভাষা প্রাঞ্জল। তাঁহার ভাষা বুঝিবার আশায় জলাঞ্জলি দিতে হইবে না। তিনি পরিষ্কার লিখিয়াছেন, ‘আমাদের পরাজয়গুলো আমাদের অক্ষমতাগুলো কেউ যদি বলতে পারতেন খুব সরল ভাষায়, সেটা হত সবচাইতে গ্রেটনেসের ব্যাপার। এটা কেউ বলছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৬)

আর কিছুদিন যদি বাঁচিয়া থাকিতেন তো আহমদ ছফা দেখিতেন হুমায়ূন আহমেদও সোশ্যাল ডিসকোর্সে প্রবেশের নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছিলেন। গোঁফ দেখিয়া যদি বিড়াল চিনা যায় তো বলিব সেই গোঁফওয়ালা বিড়ালটি সামরিক যুগে মোটেও ইঁদুর মারিবার মতন ছিল না। ২০০৭ হইতে ২০০৯ পর্যন্ত যে অলৌকিক সরকার তত্ত্বাবধানের নামে বাংলাদেশের আইনসঙ্গত ক্ষমতায় আসীন ছিলেন সেই সরকারকেও হুমায়ূন আহমেদ ‘স্বাগতম’ বলিয়াছিলেন। আহমদ ছফার আশার গুড়ে বালি পড়িতে দেরি যে হয় নাই তাহা আমরাও ঠাহর করিতেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি পত্রিকায় যে উপন্যাসটি ছাপাইতেছিলেন সেখানেও লোকে একই সমস্যা খুঁজিয়া পাইয়াছে। কথাটা আদালত পর্যন্ত উঠিয়াছিল—এ কথা সকলেই জানেন। বিশেষ কি লিখিব?

এই নিবন্ধ সংহার করিবার আগে আমাকে অবশ্য দুইটা আনকোরা কথাও যোগ করিতে হইতেছে। একনম্বরে মনে পড়িল, হুমায়ূন আহমেদের তুলনা দিতে গিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা সবচেয়ে বড় যে লেখকের নাম খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন তাঁহার নাম আন্তন চেখভ (ওরফে শেখভ)। এইটা কিন্তু খুব বড় কথা নয়। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরও একটি কথা মনে পড়িতেছে। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি তখন বেনিতো মুসোলিনির কারাগারে আটক। তাঁহার সন্তানেরা রুশদেশে—মামাবাড়িতে—বড় হইতেছে। ১৯৩৪ সালের দিকে তাঁহার দশবছর বয়সী পুত্র দেলিয়ো মস্কো হইতে কারারুদ্ধ বাবাকে লেখা একটি পত্রে চেখভের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিল। দেলিয়ো লিখিয়াছিল, তাহার স্কুলের মাস্টার মহাশয় বলিয়াছিলেন চেখভ পৃথিবীর সেরা লেখক বা এই জাতীয় কিছু একটা। জবাবে পুত্রকে কারারুদ্ধ বাবা লিখিয়াছিলেন, চেখভ বড় ভাল লেখক সন্দেহ নাই, কিন্তু পৃথিবীর সেরা লেখক তিনি নহেন। সে রকম একটি লেখক খোদ রুশিয়াতেও আছেন অবশ্য। তাঁহার নাম লিও তলস্তয়। (গ্রামসি ২০০৮: ৩৬০-৬১)

এই তুলনাটি সেদিন আহমদ ছফার সাক্ষাত্কারধাত্রীদের  খুব পছন্দ হইয়াছিল এমন মনে করিবার কোন কারণ নাই। একটুখানি পরে আহমদ ছফাকে সাজ্জাদ শরিফ মহাশয় জিজ্ঞাসিয়াছিলেন, ‘আপনার নিজের সাহিত্যিক ব্যর্থতাগুলো কি?’ উত্তরদাতা শেষ পর্যন্ত যাহা বলিয়াছিলেন তাহা প্রাতঃস্মরণীয়: ‘আমি যে সমস্ত লেখককে পড়েছি, পুজো করেছি তাঁদের ধারেকাছেও যেতে পারি নাই।’ এই সার্থকনামা লেখকদের মধ্যে তিনি এয়োহান গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির সহিত লিও তলস্তয়ের নামও করিয়াছিলেন।

আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ূন আহমদের সমস্যা কি তাহা আহমদ ছফা ধরিতে পারিয়াছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁহার প্রকাশটা অপূর্ণ থাকিয়া গিয়াছে। হুমায়ূন আহমেদ যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহাদের মাপেই তিনি গড়িয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহারা কাঁহারা? যদি বলি সাজ্জাদ শরিফ কিংবা ব্রাত্য রাইসুর মত পাঠকদের জন্য তবে পরিচয়টা পূর্ণ হয় না। ইঁহারাও একটি দলের সভ্য। কি তাঁহাদের পরিচয়? তাঁহারা ‘বাঙ্গালি মুসলমান’ বা বাংলাদেশের ‘বাঙ্গালি’ বলিলেও কথাটা ফুরাইতেছে না। তাঁহারা আরও। তাঁহারা অধিক। তাঁহারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। ফরাশি আওয়াজে ‘লো পুতি বুর্জোয়া’। ইংরেজিতে বলে ‘মিডল ক্লাস’। আহমদ ছফা সেই শ্রেণি-বিশ্লেষণে প্রবেশই করেন নাই। কিন্তু আকলমন্দের জন্য যথেষ্ট ইশারা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। সান্ত্বনা এইটুকুই। (ছফা ২০০৮: ৩৪৯-৫০)

হুমায়ূন আহমেদের এন্তেকালের পর আজ অনেকে বলিতেছেন, তিনি শরত্চন্দ্রের মত জনপ্রিয় হইয়াছিলেন কিংবা জনপ্রিয়তায় তাঁহাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। কথাটা মিছা নয় তবে আরও একটা কথা আছে। শরত্চন্দ্র কি চরিত্রের বস্তু ছিলেন? আমার হাতে বিশেষ সময় নাই। হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে আজ আমি নতুন কোন কথা বলিব না। শুদ্ধ শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একদা যে উক্তি করিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করিব মাত্র। শরত্চন্দ্র স্থলে কাটিয়া হুমায়ূন শব্দটা বসাইলে হয়ত কাজ হইবে। চট্টোপাধ্যায়ের জায়গায় আহমেদ বসাইলেও মন্দ হইবে না। ১৯৩০ দশকের শেষাশেষি ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কোথায়ও বা লিখিয়াছিলেন: ‘আমাদের সমাজ এখনও প্রধানত নিম্নবিত্তশালীর সমাজ—এই গঠন যদি আরো কিছুকাল থাকে কিংবা অমর হয় তবে শরত্চন্দ্র অমর হবেন। আর যদি বদলায় তবে দ্বীপসৃষ্টিতে প্রবালের মতনই তাঁর কীর্তি আত্মবলির সমতুল্য হলেও হবে কেবল ব্যবহারিক।’ (মুখোপাধ্যায় ১৩৯৬: ৫৮)

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী গয়রহ (সম্পাদিত), মধু দা: শহীদ মধুসূদন দে স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা: মধু দা স্মৃতি সংসদ, ১৪০৪) এবং আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ বাংলালিপি, ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৪/ পৌষ-ফাল্গুন ১৪২০), পৃ. ৩৪-৩৭।

২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮)।

৩. ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ‘আমার দৃষ্টিতে শরত্চন্দ্র,’ শরত্-স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত) (কলিকাতা: সাহিত্যম্, পুনর্মুদ্রণ ১৩৯৬)।

৪. Antonio Gramsci, Letters from Prison, vol. II, trans. F. Rosengarten, (New York: Columbia University Press, 2008).

২ আগস্ট ২০১২

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না

দুইটা জিনিশ যাহাকে বলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—তাহার মধ্যে একটার নাম মৃত্যু। আজ পর্যন্ত এই দুনিয়ায় যত মানুষের পা পড়িয়াছে তাহাদের বেশির ভাগই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছেন কিন্তু একজনও সেই অভিজ্ঞতার কাহিনী বলিয়া যাইতে পারেন নাই। মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অকথ্য—তাহা কথায় প্রকাশ করা যায় না। মাত্র আরেক মানুষের—অপরের—মৃত্যুর মধ্য দিয়াই আমরা আপনাপন মৃত্যুর নিকটতম তুলনা কি তাহার আভাস পাইতে পারি।

সম্প্রতি আমার এমনই এক অভিজ্ঞতা হইয়াছে। বহুদিন হইল আমি এই ঢাকার শহরে বন্দী হইয়া আছি। একান্ত দায়ে না পড়িলে শহরের বাইরে যাই না। বিগত জুলাই মাসের বিশ তারিখ—সেদিন ছিল শুক্রবার—অগতির গতি মৌলভীবাজার গিয়াছিলাম। বলা বাহুল্য মৌলভীবাজার এখন একটি জেলার স্থানে উঠিয়াছে। এই জায়গাটি একদা সিলেট (দক্ষিণ) সদর বলিয়া অভিহিত হইত। সেখানে একদিনের কিছু বেশি সময় কাটাইয়া আমরা ঢাকা ফিরিয়াছি একুশে জুলাই।

প্রায় দশ বছর আগে আরও একবার মৌলভীবাজার গিয়াছিলাম। সেবারের অভিজ্ঞতার সহিত  এবারের বিদ্যার একটা প্রভেদ ঘটিয়াছে। সেবার গিয়াছিলাম নিজের উদ্যোগে এবং শহর হইতে দূরে—বলা যায় ঝর্ণায় আর জঙ্গলে। এবার গিয়াছিলাম শুদ্ধ একজন মানুষের টানে—এবং শহরে। মৌলভীবাজারের মাহফুজুর রহমানকে আমি প্রথম দিনের আলাপ হইতেই ‘মাহফুজ ভাই’ সম্বোধন করিয়া আসিতেছিলাম। তাঁহার সহিত প্রথম দেখার অনেক আগেই আমি তাঁহার লেখার সহিত পরিচিত ছিলাম।

মাহফুজ ভাইয়ের সহিত আমার প্রথম পরিচয় টেলিফোনযোগে। ঠিক কত তারিখে বা কোন ক্ষণে তাহা এতদিনে আর মনে নাই। প্রথম আলাপের কিছুদিনের মধ্যেই জানিতে পারিলাম আমার শিক্ষক আহমদ ছফার সহিত তাহার একপ্রকার আলাপ ও পরিচয় ছিল। জানিতে চাহিলাম আহমদ ছফার লেখা কোন চিঠিপত্র বা কোন অপ্রকাশিত লেখাজোকা তাহার মহাফেজখানায় আছে কিনা। জবাবে তিনি যাহা বলিলেন তাহাতে বড়ই শরমিন্দা হইলাম। তিনি জানাইলেন ইংরেজি ২০০৭ সাল নাগাদ তাঁহার লেখা একটি বহি ছাপা হইয়াছিল। বইয়ের নাম ‘নানা প্রসঙ্গ নানা ভাবনা’। সেই বইয়ে আহমদ ছফার একটি চিঠি বিলক্ষণ ছাপা আছে।

আমার অনুরোধে মাহফুজ ভাই তাঁহার বইয়ের প্রয়োজনীয় পাতাগুলি আমাকে গোটা দুইবার ফটোকপি করিয়া পাঠাইয়াছিলেন। সঙ্গে দিয়াছিলেন—তোহফাস্বরূপ—আহমদ ছফা লিখিত মূল চিঠিটির প্রতিচিত্রও। এই চিঠির ভূমিকাচ্ছলে তিনি নিজের জবানে আহমদ ছফা সম্পর্কে আর দুই কথাও লিখিয়াছিলেন। সেই দুই কথার মধ্যে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কথিত নীরব মহাসিন্ধুর কল্লোল শুনিতে পাইয়াছিলাম। সংক্ষেপে—অতি সংক্ষেপে—মাত্র একটি অনুচ্ছেদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান আহমদ ছফার ঐতিহাসিক মূল্য সত্য সত্যই নিরূপই করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। এই এক অনুচ্ছেদ পড়িয়াই আমি আবিষ্কার করিয়াছিলাম এমন একজন মানুষকে যাহাকে আহমদ ছফার যোগ্য উত্তরাধিকারী বলা যায়। এক্ষণে সেই অনুচ্ছেদটি উদ্ধার করিতেছি। আহমদ ছফার চিঠিটির ভূমিকার পরিবর্তে মাহফুজুর রহমান লিখিয়াছিলেন, ‘কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আলোকিত মনীষী আহমদ ছফা ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক সব্যসাচী লেখক। চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ার আহমদ ছফা নিজের সমাজ-সংস্কৃতির ঘাত-প্রতিঘাত ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়েই একদিন আদর্শ সমাজের স্বপ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙ্গিনায়। উচ্চতর মানব চৈতন্যের অধিকারী আহমদ ছফার সৃষ্টিকর্ম আমাদের ইতিহাসের এক মহৎ পর্ব—যা আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানার সন্ধানে অনস্বীকার্য।’

মাহফুজুর রহমানের কাছে লেখা—সম্ভবত একমাত্র—এই চিঠিতে আহমদ ছফা আশা প্রকাশ করিয়াছিলেন, তিনি একবার মৌলভীবাজার যাইবেন, শুদ্ধ কবে তাহা স্থির করিয়া লইতে হইবে। এই চিঠির দোহাই দিয়া মাহফুজুর রহমান শুদ্ধমাত্র লিখিয়াছিলেন, ‘তাঁর ইচ্ছে ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার ভ্রমণের। সিলেটের কথা এলে দুজনের কথা বলতেন। এঁদের একজন ষাটের দশকের কবি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যাপক শাহজাহান হাফিজ অন্যজন কবি দিলওয়ার। মৃত্যুর আকস্মিকতার কারণে তাঁর সিলেট অঞ্চল ভ্রমণের ইচ্ছা পূর্ণ হল না।’

মাহফুজুর রহমান

আমার সহিত যখনই টেলিফোনে কথা হইত তখনই মাহফুজ ভাই এই প্রসঙ্গটি মনে করাইয়া দিতেন। আক্ষেপ করিতেন আহমদ ছফার মৌলভীবাজার আসার ইচ্ছাটা অপূরণীয় হইয়া গেল। গত প্রায় এক বছর ধরিয়া তিনি আমাকে বলিতেছিলেন আমি যেন একবার মৌলভীবাজার আসিয়া আমার অকালমৃত শিক্ষকের অপূর্ণ ইচ্ছাটা স্পর্শ করিয়া যাই। অনেকটা এই যুক্তিতেই আমার অনিচ্ছাটা পরাজিত হইয়াছিল। মাহফুজ ভাই নিজেই আমাদের স্বাগত জানাইতে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে আসিয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আসিয়াছিলেন একজন তরুণ রাজনীতিবিদ, বৃত্তি হিশাবে যিনি আইন ব্যবসায়ের পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। পরের দিন আমাদের বিদায় জানাইতেও তিনিই আসিয়াছিলেন। সঙ্গে আসিয়াছিলেন আরেকজন যিনি ব্যবসায়ে চিকিৎসাশাস্ত্রী কিন্তু প্রাণের তাগিদে কবি ও চিত্রশিল্পী। কে জানিত ট্রেনের জানালা হইতে পড়ন্ত বিকালের ঐ দেখাটাই হইবে আমাদের শেষ দেখা। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

মাহফুজ ভাইয়ের সহিত আমাদের বিদায় জানাইতে যিনি শ্রীমঙ্গল আসিয়াছিলেন তিনি—কবি ও বৈজ্ঞানিক নজমুদ্দিন মহসীন—মাত্র একমাসের মাথায়—মোতাবেক তেইশে আগস্ট সন্ধ্যাবেলা—আমাকে প্রথম খবর দিলেন মাহফুজ ভাই সম্ভবত আর নাই। আমরা যতক্ষণ মৌলভীবাজার ছিলাম ততক্ষণই—কেবল  বিশ আর একুশ জুলাই তারিখের মাঝখানের রাতটা ছাড়া—মাহফুজ ভাই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় আমাদের দাওয়াত দিয়াছিলেন। সেখানে মাহফুজ ভাইয়ের আলাদা মর্যাদাটা আমাদের চোখে না পড়িয়া যায় নাই। আমরা গিয়াছিলাম উদীচীর ছোট্ট কার্যালয়ে। সেখানে মির ইউসূফ ও তাঁহার সঙ্গীদের গান আমাদের মুক্ত করিয়াছিল। মাহফুজ ভাইকে এখানে সকলেই বলেন গবেষক। আমার মনে হইয়াছিল তিনি আসলেই কবি। বাংলাদেশের ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁহার যে বোধ তাহা একমাত্র কবির পক্ষেই মানায়।

আগেই বলিয়াছি আমার মৌলভীবাজার যাত্রার আসল লক্ষ্য ছিল মাহফুজ ভাইয়ের সহিত দেখা করা। তিনি ছিলেন আমাদের মৌলভীবাজার যাত্রার রথ। আমার সে আশা পূর্ণ হইয়াছিল। কিন্তু আমরা এক কাঁদি কলাও বেচিতে পারিয়াছিলাম। ঘটনাচক্রে মহাত্মা কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশত বছর পূর্ণ হইতেছে এই ইংরেজি ২০১৮ সালেই। এই উপলক্ষে শহরের টাউন হলে একটি ছোট্ট সমাবেশের আয়োজন করা হইয়াছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ নেতা অধ্যাপক অভিনু কিবরিয়া এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের প্রবীণ নেতা কমরেড রাজেকুজ্জামান রতনের সহিত সেই সমাবেশে আমিও উপস্থিত হইয়াছিলাম। আশা করিয়াছিলাম, ঐ সমাবেশে মাহফুজ ভাইও কিছু বলিবেন। কিন্তু তিনি কেন জানি নীরব থাকার মধ্যেই কার্ল মার্কসের শিক্ষা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। এহেন বিনয় এ যুগে বড় বেশি দেখা যায় না।

একুশে জুলাই সকাল বেলা মাহফুজ ভাইয়ের ঘরে গেলাম। তাঁহার স্ত্রী এবং একমাত্র পুত্রের সহিত পরিচয় হইল। মাহফুজ ভাইয়ের লেখা আট-দশটি বইয়ের সহিত দেখাও হইল। তাঁহার কাছে লেখা আহমদ ছফার চিঠিতে পড়িয়াছিলাম এই কথাগুলি: ‘আপনার লেখা বিপিনচন্দ্র পালের জীবনীটা বেশ ভাল হয়েছে। আরো একটু বিস্তারিত লিখতে পারতেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিপিন পালের মতবিরোধের বিষয়টি স্পর্শ করলে গ্রন্থটি অধিকতর তথ্যবহুল হতে পারত। তবে বাংলা একাডেমী প্রকাশিত এই ধরনের গ্রন্থে খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো তুলে ধরার বিশেষ অবকাশ নেই। আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনি বইটি লিখে আমাদের সবাইকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করেছেন।’

বিপিনচন্দ্র পাল—বলা নিষ্প্রয়োজন—জন্মিয়াছিলেন হবিগঞ্জে। যেমন জন্মিয়াছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসও। মাহফুজ ভাই হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটা জীবনীও লিখিয়াছেন। তিনি আক্ষেপ করিয়াছিলেন বইটা প্রকাশ করিতে বাংলা একাডেমি দেরি করিতেছে। আমি অনুরোধ করিয়াছিলাম তিনি যেন একটু হালকা বোধ করিতেই আমাদের কাছে পাণ্ডুলিপিটা পাঠাইয়া দেন। একাডেমি না করিলে আমরা কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে বইটা ছাপাইতে বলিব। আমাদের সেই ইচ্ছাটা আর পূরণ হইল না।

৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এনটিভি, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আমি ব্যাখ্যাকার: সলিমুল্লাহ খান

সমাজতাত্ত্বিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান ৬০ বছর পূরণ করছেন এ বছর। তিনি ১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কক্সবাজারে। ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিধান রিবেরু। গত ২৮ জুলাই সলিমুল্লাহ খানের বাসায় এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়

বিধান রিবেরু : কবিতা লেখা বা অনুবাদ করলেও আপনি যেহেতু প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন, তাই প্রশ্ন করছি, প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনার মনে হয়। আর প্রবন্ধ লেখার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেন?
সলিমুল্লাহ খান : 
লেখক হবই সেভাবে তো শুরু করিনি, ঘটনাচক্রে পেছন ফিরে দেখি, আমি আর সে রকম কিছুই লিখিনি, শুধু প্রবন্ধ লিখেছি। তাতে বোঝা যাচ্ছে কি, আমি অন্য কিছু আর লিখতে পারি না। কবি সাখাওয়াত টিপু একটা ভালো প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা ব্যর্থ কবি তারাই ভালো গদ্যকার হয়, কিন্তু ব্যর্থ গদ্যকাররা কী হয়?

রিবেরু : অনেকেই বলেন, আপনার মুখ থেকেও বহুবার শুনেছি, অনেকে অনুযোগ করেন আপনার লেখা উদ্ধৃতিসর্বস্ব হয়। তবে সেখানে উদ্ধৃতিগুলো জাক্সটাপোজ হয়, এতে নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়। তাই কি?
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা পুরনো কথা। সিনেমা শিল্পের কথা। আপনি ভালো জানেন, যেটাকে একাধারে মন্তাজ বলে। লেখক কী? লেখক একাধারে সম্পাদক, চলচ্চিত্রের মন্তাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে সম্পাদনা। ফরাসিতে মন্তাজ মানে এডিটিং। চলচ্চিত্রকারের যে কাজ, একটি ছবির ওপর আরেকটি ছবি বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা, প্রবন্ধ লেখার মধ্যেও সেটা আছে। চলচ্চিত্র প্রবন্ধকে প্রভাবিত করবেই। এ প্রভাবে প্রধান নাট্যকার, আমি দেখলাম, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখার ভেতর আপনি কোথাও ‘আমি’ শব্দ খুঁজে পাবেন না, ‘আই’ নেই। ‘আমি’ হচ্ছে রোমান্টিকতার চিহ্ন, উনি বলেন। তার কোনো প্রবন্ধে ‘আমি’ পাবেন কিনা সন্দেহ, দু-একটা থাকলেও খুব গোপনে আছে। তার লেখা হলো মন্তাজের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনি যদি নিকটতম উদাহরণ খুঁজতে চান, আমি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের কথাই বলব।
আরেকজনের কথা বলব জাক লাকাঁ, যার লেখার ধরন আমাকে প্রভাবিত করেছে। এর কারণ হচ্ছে, আপনার কথা যদি আপনার ঐতিহ্যের সহায়তায় বলতে পারেন, তাহলে সমস্যা কি? লাকাঁ বলছেন, আমি তো ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাকার মাত্র। লোকে যখন আমাকে অনুবাদক বলে তখন আমার হাসি পায়। পৃথিবীতে অনুবাদ বলে কোনো কাজ নেই, সবই ব্যাখ্যা। আমি ব্যাখ্যাকার। আমি গদ্য লেখার সময় লক্ষ করি, আমার উদ্দিষ্ট কী? আমি কোন কথাটা পাঠকের কাছে নিতে চাই। আমাকে যদি বলা হয়, আপনি ২ মিনিটের মধ্যে লেখেন, তাহলে প্রথম কথাটা আমি আগে বলব। আমি সাধারণত লিনিয়ার ওয়েতে লিখি না। যেগুলো বিশ^বিদ্যালয়ে লেখা হয়, সেখানে একটি প্রস্তাবনা থাকে, তার একটি বিকাশ থাকে, প্রমাণ থাকে, তারপর সিদ্ধান্ত থাকে। আমি প্রথমেই আমার সিদ্ধান্তটা জানাই, এ কথাটি আমি বলতে চাই। তখন তার চারপাশে আমি ঘুরতে থাকি। সেভাবে লিখলে লেখাটা স্পাইরাল হয়, লিনিয়ার হয় না। এখন লেখার বহু ধরন আছে, আমি একটি ধরনের কথা বললাম।

রিবেরু : আপনার লেখালেখিসংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ শোনা যায়, হঠাৎ করেই সাধু ভাষায় লেখা শুরু করেছেন, আপনি উল্টোপথে হাঁটছেন, কারণ এখন তো কেউ আর ওই ভাষায় লেখেন না। আগে আপনি চলতি ভাষায় লিখেছেন। মুখের ভাষাও এসেছে লেখায়। সাধু ভাষায় লেখা নিয়ে আপনি কী বলবেন?
সলিমুল্লাহ খান :
 আমি পেছনে হাঁটছি বা সামনে হাঁটছি, এগুলো মেটাফোর। লেনিনের একটি উক্তি আছে না, এক কদম পেছনে যান, দুই কদম আগানোর জন্য। লক্ষ্যটা আগানোই, মেটাফরিক্যালি। আমাদের বাংলা ভাষার যে ক্ষমতা আছে, সেটা আমি দেখেছি। বর্তমানে যারা চলিত গদ্য লিখছেন, তাদের গদ্য কোনো গভীর চিন্তাভাবনা প্রকাশের উপযোগী আর নেই। এটা ছিল আমার প্রথম সমস্যা। আমি ২০০৩-০৪-০৫-এর দিকে চিন্তা করেছিলাম এ সমস্যা নিয়ে। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি সাধুতে লিখব। সাধুতে লেখার সমস্যা আছে, কিন্তু চলিত ভাষার সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমি সেখানে ফিরেছি। নদী যেমন মাঝেমধ্যে বাঁক পরিবর্তন করে, আপনারা এটাকে পিছ পরিবর্তন বলতে পারেন, আমি বাক পরিবর্তনই বলি। এ বাঁক পরিবর্তনকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন আধুনিকতার আরেক নাম। আমি মনে করি, আমাদের আধুনিক গদ্য হচ্ছে সাধু ভাষা। চলিত ভাষা হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক। মানুষ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত এ দেশে, এখনও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষায় সাধু টান আছে। জসীমউদ্দীনের গদ্য দেখেন, এটাকে পিছুটান বলা যাবে না। জসীমউদ্্দীন রবীন্দ্রনাথের পরে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথও অর্ধেক সাধু ভাষাতেই লিখেছেন। ১৯১৪ সালে তিনি সাধু ভাষা ছেড়েছেন, তবে এর আগেও চলতি লিখেছেন, ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ তো চলতি ভাষায় লেখা।
থিওরিটা হলো এই- সাধু ভাষার পর হলো চলিত ভাষা, এই যে পর্যায়ক্রম, যেটা আপনার প্রশ্নের মধ্যে নিহিত আছে, আগে আর পিছে, এটা কিন্তু সঠিক নয়, আমার মতে। বরং বাংলা ভাষায় বিভিন্ন রেজিস্টার আছে। গদ্যও আছে, পদ্যও আছে, কেউ কি বলবেন, পদ্য প্রাচীন, গদ্য আধুনিক? তো পদ্য লেখা মানে তো পেছনে ফিরে যাওয়া। কাজেই পদ্য লেখেন কেন? আমি এজন্য বলব, গদ্য-পদ্য যেমন পাশাপাশি থাকে, তেমনি সাধু ও চলিতও পাশাপাশি থাকে। এটাকে ইংরেজিতে রেজিস্টার বলে। বাংলায় আমরা অনুবাদ করে বলতে পারি, নানা রকমের খাতা খোলা আছে। আমরা সেরেস্তা কথাটা ফারসিতে ব্যবহার করি, ইংরেজিতে রেজিস্টার। অর্থাৎ আপনি এক খাতা থেকে আরেক খাতায় যাচ্ছেন। একসময় আমরা একটা বই শেষ করে আরেকটা বই পড়ি। আবার অনেক সময় পাশাপাশি দুইটা বই পড়ি। কিছুক্ষণ এ বই পড়ে ক্লান্ত হলাম, তারপর আরেকটি বই পড়লাম। তো সাধু আর চলিত দুটি ভাষা রীতি বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই স্বীকৃত। আমি মনে করি, এরা ঐতিহাসিক ক্রম নির্দেশ করে না। এটা বরং কাঠামোগত অবস্থান নির্ধারণ করে।
আমাদের ভাষার একটা সাধু রীতি আছে, একটা চলিত রীতি আছে। আপনি যেকোনো একটাতে সুইচ করতে পারেন। এখন বেশির ভাগ লোক চলিত রীতি ব্যবহার করে, এর কারণ কী? এখন বেশির ভাগ লোক তো সংবাদপত্র পড়ে। আমিও বক্তৃতা চলিত ভাষাতেই দিই, কিন্তু লেখার সময় সাধুতে লিখি। এটা আমাকে এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়। অর্থাৎ আসল কথা হচ্ছে, আমার প্রকাশভঙ্গি ও বক্তব্য কোনটাতে বেশি সহজে করতে পারি, আমার মতে কোনটাতে বেশি ফল লাভ করতে পারি। এখন যেসব পাঠক আমাকে বলে, আপনি সাধু ভাষায় লেখেন কেন, তাতে আপনার বিক্রি কমে যায়, এটা এম্পেরিক্যালি সত্যি নয়। ধরেন, নীরদচন্দ্র চৌধুরী সাধু ভাষায় লেখেন, তাতে কি আপনি মনে করেন তার পাঠক একজনও কমেছে? তিনি চলিততে লিখলে যত পাঠক পেতেন, তার চেয়ে কি কমেছে? উনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। এখন যদি বলেন, আপনি ইংরেজিতে লেখেন কেন? জবাব কি? সে বলবে, আমি ইংল্যান্ডের লোকজনকে পড়ানোর জন্য লিখি। আসলে কি সেজন্যই লেখেন? না, আমাদের সাহেবদের পড়ানোর জন্য তিনি লেখেন। সাদা বাঙালি সাহেবরা পড়বে। কালো সাহেব বাঙালিরা পড়বে।
তাহলে আমি আপনাকে তিনটা উদাহরণ দিলাম, আমি ইংরেজিতে লিখি, আমি সাধুতে লিখি, আমি চলিততেও লিখেছি, আমি পদ্যও লিখি। আমি এই চার ধরনের অপকর্ম করেছি। যেমন আমি প্লেটো অনুবাদ করেছি চলিত ভাষায়, সেটা ২০০৫-এ। ‘ফ্রয়েড পড়ার ভূমিকা’ আমি প্রথম সাধু ভাষায় লিখেছি। ভূমিকাটা, কিন্তু মূল লেখাটি চলিত ভাষায় লেখা। এর পর থেকে ধীরে ধীরে সাধু ভাষায় লিখতে শুরু করি। আমি হঠাৎ করে চলিত ভাষা ছেড়ে সাধু ভাষায় আসিনি। এখনও আমি মনে করি, সাধু ভাষার শক্তি চলিত ভাষার চেয়ে বেশি।

রিবেরু : অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তৃতার ওপর আপনি যে লেখাটা লিখেছিলেন সেটা চলিত ছিল, আবার সংস্কৃত শব্দের আধিক্যও ছিল। ১৯৮৩ সালে বেরিয়েছিল।
সলিমুল্লাহ খান : 
ওটা লিখেছি ১৯৮১ সালে, বের হয়েছে ১৯৮৩ সালে। তার আগেও প্রাক্সিস জার্নালে যে লেখা শুরু করেছি, সেখানে আমাদের গদ্যের মধ্যে দেখবেন কিছুটা সংস্কৃতবহতা আছে। তবে আমার লক্ষ্য ছিল সবসময় প্রাঞ্জল্য। প্রাঞ্জল্যের অভাব যেখানে হয়েছে, সেখানে আমার অক্ষমতা মাত্র। আমি তো গদ্য লেখা শুরু করেছি ১৯৭৬ সালেই। ১৯৭৬-এর আগে আমি কখনও গদ্য প্রকাশ করিনি। পদ্য প্রকাশ করেছি ১৯৭২ সাল থেকে। আমি প্রথম গদ্য লিখেছি পরীক্ষার খাতায় ছাড়া, ১৯৭৬ সালে, প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মুহম্মদ নুরুল হুদা সম্পাদিত একটি পত্রিকা ছিল, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি, পত্রিকার নাম ‘বিশ্বাস’, সেখানে আমার প্রথম একটি লেখা ছাপা হয়। তারপর আরেকটি পত্রিকা বেরিয়েছিল ‘স্বরূপের সন্ধানে’, সেখানেও আমার একটা গদ্য ছাপা হয়, ১৯৭৮-এ। ১৯৭৭-৭৮ সালে আমি প্রচুর গদ্য লিখেছি। হুদার ওখানে যা লিখেছিলাম, তা ছিল খুবই সংস্কৃতবহুল। কিন্তু লিখতে গিয়ে আমি যখন পরিচিত হলাম, বিশেষ করে কমরেড মোজাফফর আহমদের লেখা, প্রবন্ধ সংকলনের সাথে যখন পরিচিত হলাম, তখন দেখলাম, আরও প্রাঞ্জল ভালো বাংলা তো লেখা যায়! তারপর ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হলো।

রিবেরু : আপনি বলেছিলেন জসীমউদ্‌দীনের লেখা পড়েও আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা ২০০৩-এর পরে। আগে যখন লিখেছি, তখন কমরেড মোজাফফর আহমদকে আমার ভালো লেগেছে। যেমন একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন কেন তিনি কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, ওটার গদ্য বেশ প্রাঞ্জল, ওটা কিন্তু বেশি পরে দেখিনি। এই ১৯৮০/৮২তে দেখেছি। তার মানে একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমার দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১-এর মধ্যে, আমি লেখক হয়েছি।

রিবেরু : একটা সময় পর, ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে, আপনার গদ্যের মধ্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বেশি দেখা গেছে।
সলিমুল্লাহ খান : 
আমি প্রথম থেকেই আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য ‘হুতুম পেঁচার নকশা’ বা ‘আলালের ঘরের দুলালে’ যে আরবি-ফারসি শব্দ আছে, আমি এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করিনি। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার আমি শিখেছি, বিশেষ করে নজরুল ইসলামের লেখা পড়ে। আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি ডেফিনিটলি প্রভাবিত হয়েছি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দ্বারা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যত আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা পড়ে দেখলাম, আরে এটা তো বাংলা ভাষার মহাসম্পদ। প্রমথ চৌধুরীও ব্যবহার করেছেন, সেগুলো অল্প অল্প, পায়েসের মধ্যে কিশমিশের মতো। আরবি-ফারসি শব্দ একই কারণে ব্যবহার করি, যে কারণে নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন। এটা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে প্রসারিত করা। বাংলা ভাষার মজা হচ্ছে, এখানে সংস্কৃতও চলে, আরবি-ফারসিও চলে।

রিবেরু : আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারণে ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে মানুষের এক ধরনের পারসেপশন ছিল। মৌলবাদের সঙ্গেও অনেকে আপনাকে গুলিয়ে ফেলতেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
আপনি তো বলেছেনই ‘পারসেপশন’, এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যেমন আমার কোনো একটি আইডিয়া আছে, হেগেল বলছেন, আইডিয়াই পারসেপশনের প্রকাশ। কিন্তু আইডিয়ার সাথে কনসেপ্টের পার্থক্য কী? অর্থাৎ আপনি একটা সাপ দেখে দড়ি মনে করতে পারেন, এটা আপনার পারসেপশন নয়, এটা আপনার আইডিয়া, কেননা সাপও লম্বা, দড়িও লম্বা। কামড় দিলে না বুঝবেন, এটা সাপ। কামড় খাওয়ার আগে তারা এটা বোঝেনি। ২০১৩কে আপনি কামড় মনে করতে পারেন। তারা বোঝেনি, এজন্য আমি আমার লেখার কোনো নিন্দা করব না। আমি আমার লেখায় কোনো গুণগত উত্তরণ দেখি না, তার মধ্যে ক্রমাগত উত্তরণ আছে, ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি। কাজেই যারা আমার লেখাকে মৌলবাদী বা ইসলামি মনে করেছে, সেটা তাদের সমস্যা, আমার সমস্যা নয়। আমি সবসময়ই ইসলামি, আমি সবসময়ই মৌলবাদী, যদি তখনও থাকি, এখনও আছি, আর এখনও না থাকলে তখনও নেই। এর মধ্যে কোনো গুণগত রূপান্তর হয়নি আমার লেখায়। এখন আমি বলি, আমাকে যদি মৌলবাদী বলেন, তাহলে নজরুল ইসলামকে কী বলবেন? অর্থাৎ আমি যত উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি, এর চেয়ে কম বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেননি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা ভাষার চরিত্র সম্পর্কে যাদের পরিচয় নেই, এটা তাদের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একটা উদাহরণ দিই, যেমন আমার একটি বইয়ের নাম ‘আদম বোমা’। ‘বোমা’ শব্দটা হচ্ছে ইংরেজি থেকে নেয়া, ‘বোম্ব’ থেকে আমরা বানিয়েছি। ‘আদম’ হলো আরবি ও হিব্রু শব্দ। ফার্স্ট ম্যান। আদম ব্যাপারি, আদম ব্যবসা, সে রকম দুটো মিলিয়ে আমি নাম রেখেছি ‘আদম বোমা’। আরেকটি বইয়ের নাম ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’, কাছাকাছি ধরেন, ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’, অথবা ‘সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা’। এখন আমার নতুন একটি বই বেরোবে ‘মর্সিয়া’, মর্সিয়া মানে শোককথা। ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। মর্সিয়া মানে যারা মারা গেছে, তাদের জন্য আমি কাঁদছি। এখন বাংলা ভাষায় মর্সিয়ার চেয়ে ভালো শব্দ আর নেই। যেমন জার্মান ভাষায় ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’, মর্সিয়া তো এটারই অনুবাদ। এটা মোর্নিং প্লে নয়, এটা মোর্নিং সং। কিন্তু মোর্নিং এটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মোর্নিং অ্যান্ড ম্যালানকলিয়া, এটা দিয়ে লাকাঁ হেমলেটের ক্রাইসিস ব্যাখ্যা করেছেন। সমস্যা হলো, এটা জানতে হবে ম্যালানকোলিয়ায় ভোগা যাবে না। হেমলেট মোর্ন করতে পারছিলেন না, তাই ম্যালানকলিয়ায় ভুগছিলেন। তো মোর্নিং শব্দটি জার্মান ভাষায় ট্রাউয়ারস্পিয়েল, গ্রিক ভাষায় ট্র্যাজেডি। গ্রিক শব্দ ট্র্যাজেডি ইংরেজি ভাষায় চালু হয়েছে। এখন বাংলায় আমি জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল চালানোর চেষ্টা করছি, লোকে নিচ্ছে না। আমার আরেকটি বইয়ের নাম খুব মজার, সেটি হলো ‘আল্লাহর বাদশাহী’, এটা একটা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের বই। ইংরেজিতে আছে ‘কিংডম অব গড’, এখন গডকে আল্লাহ অনুবাদ করা যায় কিনা বা আল্লাহকে গড অনুবাদ করা যায় কিনা, সে সমস্যা তো আছেই। কিন্তু আমি করেছি। কিংডমের অনুবাদ করেছি বাদশাহী।

 

সাম্প্রতিক দেশকাল, বর্ষ ৫, সংখ্যা ২৮, ৩০ আগস্ট ২০১৮

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান

২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবাধিকার বিষয়ক জার্মানিভিত্তিক সংস্থা নেটসের (NETZ) পক্ষ থেকে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন আনাসতাসিয়া রাউ। সাক্ষাৎকারটির তর্জমা করেছেন বিধান রিবেরু।

আনাসতাসিয়া রাউ : শিক্ষা ও জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী?

সলিমুল্লাহ খান : প্রায়ই লোকে শিক্ষা ও জ্ঞানকে এক করে দেখে। কোনো বিষয়ে ওপর জ্ঞান অর্জনের চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করার নাম শিক্ষা। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, নো হাউ (Know how)-এর অর্থ কীভাবে কার্য সম্পাদন হয়, সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। কিন্তু আপনি যদি আরেকটু গভীরে গিয়ে ভাবেন, কোনো ঘটনার পেছনের কার্যকারণ যদি অনুসন্ধান করেন, বলা যেতে পারে ‘নো হোয়াই’ করেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা শিক্ষা বলতে আমাদের দেশে প্রচলিত ১৪ রকমের শিক্ষার মধ্যে কেবল স্কুল শিক্ষাই বুঝি। এর কারণ স্কুলের শিক্ষাকে ওভাবেই—শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে—দেখা হয় এ দেশে। কিন্তু এখানে বহুদিন ধরেই নানাবিধ শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে, এমনকি স্কুলের বাইরেও। বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের যে সমস্যা : এখানে কোন শিক্ষিত মানুষকে বিচার করা হয়। তিনি কয় বছর স্কুলে লেখাপড়া করেছেন, সেটা দিয়েই। পরে সেটাই হয়ে ওঠে আমাদের আজীবন সম্মাননা। আর এটা দিয়েই ‘পণ্য’ বা কমোডিটি হিসেবে আমাদের মূল্যটা কত, তা নির্ধারিত হয়। মানুষকে পণ্যে পরিণত করাটাই এখন শিক্ষার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যবশত শিক্ষাকে আমরা যেভাবে বুঝি ও প্রয়োগ করি, সেটারই ফল এটা।

রাউ : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন জায়গায় সমস্যা আছে বলে আপনি মনে করেন?

খান : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত, অন্যান্য দেশের মতো এখানেও রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চস্তরের শিক্ষা, তবে প্রাথমিক ও বুনিয়াদি শিক্ষা বলতে আমরা যা বুঝি সেটি একান্তই গোলমেলে। ১৯৪৮ সালে প্রণীত জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার বা ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে দেখা যায়, বুনিয়াদি শিক্ষাকে ‘প্রাথমিক ও মৌলিক’ শিক্ষা বলা হয়েছে আর জোর সুপারিশ করা হয়েছে যে এই পর্যন্ত শিক্ষাটা হতে হবে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক। যা হোক, সেখানে ব্যাপ্তিকাল কত, তা কিন্তু উল্লেখ করা হয়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে স্কুলে কত বছর ব্যয়িত হওয়া জরুরি? আর সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিকের জন্য কতটুকু সময়কে জরুরি বলে মনে করছে এখানে? ষাটের দশকে আমরা যখন স্কুলে যাচ্ছি, তখন পাঁচ বছর বরাদ্দ ছিল প্রাথমিকের জন্য। এরই মধ্যে অনেক জল গড়িয়েছে, প্রায় পঞ্চাশ বছর পর, প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ এখন আট বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আমার মতে, স্কুলের বুনিয়াদি শিক্ষা বা ‘প্রাথমিক ও মৌলিক’ স্তরের শিক্ষাটা হওয়া উচিত বারো বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত।

রাউ : কেন?

খান : কারণ ওটাই আসল বয়স যখন মানুষ জীবনে পরিপক্বতা লাভ করে ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। জাতিসংঘও ঘোষণা করেছে যে উচ্চশিক্ষার বিকল্পস্বরূপ ‘কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা’ সকলের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে এবং সেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকতে পারবে না। তবে দেখা যাচ্ছে, এসব শিক্ষাই তাঁরাই পাচ্ছেন, যাঁদের সামর্থ্য আছে। উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের অধিকারে পরিষ্কার বলা আছে সামর্থ্য, অর্থাৎ অর্থই আগে, মেধা পরে—যদিও এখানে বাহ্যত আর কোনো বৈষম্য কাজ করে না। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে উচ্চতর শিক্ষা সকলের জন্য সহজলভ্য নয়। এ তো মানবাধিকারের বড় ধরনের লঙ্ঘন। আর বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাও এই বিদ্যমান বৈষম্যচর্চাকে আরো শক্তিশালী করছে। একটা অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করে, এঁরা এর নাম রেখেছেন ‘উপানুষ্ঠানিক’ শিক্ষা। ওপরে ওপরে এ দেরকে বেশ প্রগতিশীল বলেই মনে হয়।

রাউ : অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনার সমালোচনা কী?

খান : প্রথমেই আমি বলব, এটি পক্ষপাতমূলক। ছাত্র বা ছাত্রীর দারিদ্র্যের বিবেচনায় শিক্ষাকে যে দরিদ্র করা যায় না, একথা এতে ভুলে থাকা হয়েছে। ১৯২৩ সালে ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনকালে এক ধরনের শিক্ষানীতি চালু হয়েছিল, সেটি এখনো বিভিন্ন দেশে চলছে, বাংলাদেশেও সেই জিনিসই চলছে। মুসোলিনির শিক্ষামন্ত্রী জেন্তিলের নামানুসারে এই নীতির নাম দাঁড়িয়েছিল জেন্তিলে সংস্কার। এই ব্যবস্থার আগের শিক্ষাব্যবস্থায়—এটি চালু হয়েছিল ১৮৫৯ সালে—পাঁচ বছর সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাটিয়ে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেত, এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যেত—একে আমরা শিক্ষায় মইয়ে চড়বার নীতি বলতে পারি!

এই পাঁচ বছরের শেষে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল, ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে সাধারণ কাজ করবে। কিন্তু তখন এটি ছিল শিক্ষাদীক্ষার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে—কঠোর পরিশ্রমের জীবনে ঢোকা। সমাজের গরিব লোকেরাই এই সুযোগ নিত, কারণ ওটা করতে তারা বাধ্য হতো। বাংলাদেশে আজও সেই একই জিনিস চলছে এবং বলা হচ্ছে হতদরিদ্র শিশুদের জন্য চার বছরের (এমনকি পাঁচও নয়) অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট। এমনকি পাঠক্রম কখনো কখনো তিন বছরের মধ্যেই শেষ করা হচ্ছে।

দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি এই অতি গরিব পরিবারের বাচ্চারা যে শিক্ষা পাচ্ছে, আমি সেটার বিপক্ষে নই। বরং আমি সেই ব্যবস্থার পক্ষে যেখানে চার বা পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা নয়, অন্যদের মতো ওই গরিব পরিবারের বাচ্চারাও যেন সর্বাঙ্গীণ শিক্ষা—অন্তত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা—পায়, তারাও যেন মেধা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলো যে ভবিষ্যৎ নিয়ে লোকজনদের এত আশা দেয়, এটা কি ঠিক? এই বাচ্চাগুলো পরে নিজেদের জীবনধারণের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই তো করতে পারবে, এর বেশি কিছু নয়।

রাউ : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কোন জিনিসটার অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

খান : সারা বাংলাদেশে এখন যা শেখানো হচ্ছে তা প্রকৃত বুনিয়াদি শিক্ষা নয়। এর কারণ সত্যিকার অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝা উচিত ‘গণ্ডির বাইরে এসে বিশ্ব দেখা’—শিক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তিও তেমনটাই বলে। বাংলাদেশে লেখাপড়া করে অনেকেই বেরিয়ে আসছেন, তবে তাতে বিশ্বকে দেখা বা বোঝা হচ্ছে না। লোকে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে হয় কারখানায় ঢুকছে বা আরো খারাপ কোন জায়গায়, শহুরে কোন বস্তিতে—তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক খাতে বা ইনফরমাল সেক্টরে—ঢুকছে। এসব ডামাডোলে শিক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির উপাদানটাই আর থাকছে না। শিক্ষায় ঔচিত্য ও কর্তব্যবোধের মতো ক্রান্তিকালীন করণীয়টাই এখন আর হাতে নেই।

বরং বলা ভালো বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা হলো গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান আহরণের ঠুনকো ব্যবস্থা। শুধু মুখস্থবিদ্যা, মুখস্থের মাধ্যমে শেখা। এটাই একজন মানুষকে দ্রব্য, বস্তু বা অবজেক্টে পরিণত করছে, রাষ্ট্রের নাগরিক বা সাবজেক্ট আর হতে পারছে না কেউ। তারা উৎপাদন পদ্ধতির সঙ্গে পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে জুতে যাচ্ছে। এটাই বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। অথচ শিক্ষা তো আমাদের লক্ষ্যকে আরো সুদূরে, আরো উঁচুতে নিয়ে যাবে, নিজেদের আরো মানবিক মনুষ্যসদৃশ হতে শেখাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও আসলে প্রচলিত ব্যবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ তাদেরও তো পাঠ্যসূচি অনুসরণ করতে হয়।

রাউ : গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন?

খান : এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মাত্র বিদেশি ভাষা শেখাতেই বেশি আগ্রহী, অথচ নিজের ভাষাটাই আমরা ভালো করে শিখিনি। বাচ্চাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পাঠানোর হার বাড়ছে, সেখানে জাতীয় ভাষার পরিবর্তে সাধারণ নির্দেশনাও ইংরেজিতে দেওয়া হয়। এতে নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এতে যা হয়েছে তাতে অনেক শিশু এখন নিজেদের দেশের ভাষার চেয়ে—বাংলা ভাষার চেয়ে—ইংরেজিটাই ভালো বলছে। এতে সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবৈষম্য আরো বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয়, ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা দুনিয়ার সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকেই বেশি করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে, আর দমন করছে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে। এটা কি এক ধরনের নয়া উপনিবেশবাদ নয়?

রাউ : এমন প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক অতীত কেমন ভূমিকা রাখছে?

খান : ঔপনিবেশিক শিক্ষা এখনো আমাদের বর্তমানে ভিড় করে আছে, ভার হয়ে আছে। দুইশ বছরের একটু কম সময় ধরে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন এ দেশে বিরাজ করেছিল। এখনো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে জোরালোভাবে প্রভাবিত করছে। শুধু গণ্ডায় গণ্ডায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলই এর একমাত্র অকাট্য প্রমাণ নয়। কেন্দ্রীয় পাঠক্রম দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে সাংস্কৃতিকভাবে একমুখী করার প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি পালিত হয়নি। অন্যদিকে আদিবাসী সম্প্রদায় ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের থেকে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শিশুদের আলাদা করে ফেলার ঘটনাও বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক অতীতের আরেক ফল। এতে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একই রকম বিশ্ববীক্ষার প্রচার হয়েছে।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তাই, পশ্চিমের অনুকরণ করাই যেন একমাত্র রীতিতে পরিণত হয়েছে এবং এই নীতির কারণে অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে বাংলাদেশে খুব সহজে স্বতন্ত্র চিন্তাবিদ পাওয়া যায় না। সকলকে রবীন্দ্রনাথের মতো চিন্তাবিদ হতে হবে তা বলছি না। উনি ব্যতিক্রম বিশেষ। এটা হচ্ছে আধিপত্যশীল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। স্কুলে পড়ার কাল থেকেই যদি আমরা পণ্যমুখী হই, আত্মশক্তিসম্পন্ন মানুষ (self-acting subject) হওয়ার বদলে আত্মবিক্রয়ের উপায়সন্ধানী সওদাগর হই, তাহলে পশ্চিমকে অনুকরণের অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

রাউ : এনজিও স্কুলগুলো কি এই উদ্বেগ আরো বাড়াচ্ছে নাকি শিক্ষা-সংক্রান্ত রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ছিল, সেটা কিছুটা লাঘব করছে?

খান : আমাদের দেশের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। কতজন শিশু স্কুলে যেতে পারছে, আর কতজন পারছে না? কতজন শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে? সেই অনুপাতে এনজিও বা আসলে কতটুকু করতে পারে? বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কমপক্ষে ১৪ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এটা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বললাম। আমরা যদি আরো মডেল স্কুলের পদ্ধতি আমলে নিতে পারতাম, তাহলে ওই সংখ্যাটা আরো বাড়ত। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে ঐক্যবিধান বা ঐক্যসাধন করাই ছিল রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। এতে করে সকলেই সমান সুযোগ পেত পড়ালেখা করার। অথচ আমরা বাস্তবে কিছু ছেলেমেয়েকে মাত্র চার বছরের শিক্ষা দিয়েই খুশি, কোনো কোনো এনজিও স্কুলে যেমনটা দেয়। অন্য সবার জন্য আট বছরের শিক্ষা দিই। এই দেওয়াই কি যথেষ্ট?

রাউ : এই অবস্থার পরিবর্তনের কি কোন পথ আছে?

খান : সব সময়ই একটি ওজর দেওয়া হয় যে সকলকে সমান সুযোগ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। কিন্তু সেই সামর্থ্য আমরা অর্জন করব না কেন? উদাহরণস্বরূপ ২০১৬ সালে শিক্ষায় আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের দুই শতাংশের ঢের কম খরচ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালেও সেটা প্রায় দুই শতাংশই ছিল। প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, ২০০৬ সালে খরচ করা হয়েছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা অনেক বড় গলায় বলা হচ্ছে, অথচ শিক্ষা যে তর্কাতীত জাতীয় সামগ্রী বা নিত্যপ্রয়োজনের বিষয় এবং এটাকে এগিয়ে নেয়া যে দরকার সেটাকেই পুরোপুরি অবহেলা করা হচ্ছে। বহু বছর আগে—১৯৬০ সালের দশকে—জাতিসংঘের সংস্থাগুলো লক্ষ্য স্থির করেছিল যে কোনো দেশের শিক্ষার জন্য ওই দেশের মোট জাতীয় আয়ের ন্যূনতম ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। বাংলাদেশ এই ন্যূনতম বরাদ্দ থেকেও আজও অনেক অনেক দূরে।

রাউ : শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি আর এনজিওর কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া বন্ধ করা, এটা কি বাস্তবানুগ হবে?

খান : এনজিও অনেকের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে, যাদের শিক্ষা পাওয়ার অন্য কোন পথ খোলা নেই—এ কথা অসত্য নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা সহযোগী মাত্র। তবে এটাও ঠিক যে মাঝেমধ্যে তারা বৈষম্য বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছেন। উদাহরণ হিসেবে বলছি, প্রকল্প এলাকা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা যে এলাকায় প্রকল্প গ্রহণ করেন, সে এলাকা তো এগিয়ে যাবেই। তুলনায় পাশের গ্রামটাকে নিষ্প্রভ দেখাবে, তাই না?

অবশ্যই ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যক্তিকে সহায়তা করা, একেবারে কিছু না হওয়ার চেয়ে অন্তত ভালো। তবে এর সঙ্গে আমাদের আরো যা দরকার তা হলো এনজিও, সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী সমন্বয়সাধন। সরকারি কার্যক্রমের ভেতর এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে, যাতে তারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় এবং শিক্ষার ভূচিত্রটা যেন জোড়াতালি মারা গালিচার মতো না হয়।

রাউ : সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

খান : ধন্যবাদ আপনারই প্রাপ্য।

 

এনটিভি, ২৮ আগস্ট ২০১৮

প্রাথমিক সংগ্রামগুলো এখনো শেষ হয়নি—সলিমুল্লাহ খান

বিধান রিবেরু: বাংলায় বালাইষাট বলে একটা শব্দ আছে। তো আপনার ষাট বছরে বালাই বা বিপদ-আপদ কম দেখেননি, সেসব পেরিয়ে এসে আজ আপনার কি মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের ভাগ্যে সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সলিমুল্লাহ খান: আমাদের দেশ ঐতিহাসিক কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তের দেশ। পৃথিবীর কেন্দ্র যেদিন থেকে ইউরোপ হয়েছে, সেদিন থেকেই আমরা প্রান্ত হয়ে গেছি, ইউরোপ একসময় প্রান্ত ছিল। ইউরোপের সবচেয়ে বড় যেসব ঘটনার কথা মনে পড়ে, আমি মনে করি—সেগুলোর মধ্যে ফরাসি বিপ্লব একটি। ফরাসি বিপ্লবের সাথে আমি বাংলাদেশের ১৯৭১ সনের ঘটনার তুলনা করি। মানে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা দুদিক দিয়েই। ফরাসি বিপ্লব প্রথমে ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লব। মানে একচেটিয়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের একটা ব্যাপক অংশের আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, যেটা হেগেলের দর্শনে ‘মাস্টার অ্যান্ড স্লেভ’ বলা হয়। সেটার ঐতিহাসিক প্যারাডাইম বা মডেল হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব। মাস্টার এবং স্লেভ অথবা প্রভূ এবং দাস তাদের সমন্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন ১৯৭১-কে যদি আমরা সেভাবে দেখি, ১৯৭১-এর সংগ্রামটি ফরাসি বিপ্লবের মতোই আশা আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছিল। এর মধ্যে একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা। ফরাসিদের মধ্যেও সাম্য ছিল। ওরা বলত স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী। আর আমরা চেয়েছি সাম্য, মানুষের মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ফরাসি বিপ্লবের মতোই ব্যর্থ। ব্যর্থ কেন তা বলি, আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি, কিন্তু স্বাধীনতাটা করতে চেয়েছিলাম যেজন্য, দেশের জন্য, মানুষে মানুষে সাম্য থাকবে, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, শ্রেণি-শোষণ থাকবে না, নারী পুরুষের বৈষম্য থাকবে না, সবকিছুর বিরুদ্ধে যত প্রকার বৈষম্য আছে, সবকিছুর বিরুদ্ধে আমরা বলি সাম্য, ফরাসিতে বলে ইগালিতে বা ইকুয়ালিটি। আমাদের এখানে মানুষের মর্যাদা কলোনিয়াল আমলের আগেও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেটাকে আমরা প্রতিষ্ঠা করার জন্য বহুবার লড়াই করেছি, সাম্য আসেনি। এটাই হচ্ছে বালাই। আমি এটা দেখেছি। ১৯৭১-এ আমার বয়স ১৩ বছরে পড়েছে মাত্র, আপনি যে বালাইষাট বললেন, এরপর আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হয়ে গেছে।  এখানে আমাদের প্রাথমিক সংগ্রামগুলো এখনো শেষ হয়নি—মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা। বরং যা হয়েছে এখন, যেটাকে অর্থনৈতিক উন্নতি বলছি, সেটা এক অর্থে  অর্থনৈতিক সূচকে দেখলে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তাতে সমাজের যে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, যেটাকে আমরা বলব মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—ফরাসি বিপ্লবের সময় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল—সেটা বাস্তবায়িত  হয়নি। ইউরোপে যে ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল এবং তার পরে ৪৭ বছর কী হয়েছিল, সেটা তুলনা করেই বলছি। কার্ল মার্কস যখন পিএইচডি করছিলেন, তখন ফরাসি বিপ্লবের ৪৭ বছর পার হয়েছে, বা আরেকটু বেশি।

রিবেরু: ফরাসি বিপ্লব বা পরে প্যারিস কমিউনের ব্যর্থতা নিয়ে মার্কস বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করার মতো তেমন কোনো লোক এখনো নেই।

খান: ফরাসি বিপ্লবের তারিখ যদি আমরা ধরি, ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৭৮৭ সালে। ৮৯-তে এর বিকাশ হয়েছিল।  নেপোলিয়ন ৯৯-তে ক্ষমতায় আসে, নেপোলিয়ন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ১৮১৫-তে, এরপরে মার্কসের জন্ম। ফরাসি বিপ্লবের মাপে, শুধু বৈজ্ঞানিক মাপে বলছি না, মানসিক মাপে বিপ্লব ফরাসি ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে কিন্তু বিপ্লবের যে সুফল মানুষ চেয়েছিল—সাম্য—সেটা হয়নি। তো বাংলাদেশে কী হবে, তা আমি বলতে পারি না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে আশা আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত করেছিল জনগণকে—সেটার মাত্র আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। মানে বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র হয়েছে, পতাকা হয়েছে, কিন্তু আমার কাছে খুব অবাক লাগে বিশ্বজনীন পরিস্থিতির কারণে, ফরাসি দেশে ফরাসি ভাষা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, আমরা বাংলাভাষাকে জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। সবচেয়ে উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এটাই ১৯৭১-এর প্যারাডক্স। আপনার ষাটের বালাই বলতে আমার যেটা মনে হয়, সেটা হলো এটাই। আমাদের জীবনকালে যদি আমরা বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারি—তাহলে সেটা আমার কাছে শান্তি লাগবে।

রিবেরু: রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর—আদালতে বাংলার ব্যবহার বা শিক্ষার মাধ্যম কী হবে ইত্যাদি। কিন্তু আমি যদি জনগণের দিকে তাকাই দেখি তাদেরও সঙ্কট আছে। রাস্তাঘাটে সাইনবোর্ড প্রায় সবই ইংরেজিতে লেখা। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের নামই ইংরেজিতে। এমনকি বাচ্চাদের নামেও খুব একটা বাংলা দেখা যায় না। বাংলা নাম রাখা হলে বলা হয় এটা হিন্দুদের নাম। সাধারণ মানুষের ভেতরেই ভাষা নিয়ে এরকম একটা মানসিকতা কিন্তু আছে।

খান: এটা দুরকম। দুই জায়গা থেকে দেখতে হবে। ১৯৭১-এ আমরা যে রাষ্ট্রভাষা পেলাম, সেটার পেছনে যদি যাই, অন্তত ২৩ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সনে ব্রিটেনের শাসন থেকে ভারত আলাদা হচ্ছে, এটা একট সূচনা। এল নতুন রাষ্ট্র। তখন একটা প্রশ্ন উঠল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে? সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে? আমরা যেহেতু পাকিস্তানের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলাম, যুক্তিসঙ্গত কারণেই বাংলাই হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রভাষা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের যুক্তি দিয়েও যদি আসে, তাহলেও বাংলাভাষার বিরুদ্ধে যায় না। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাংলাভাষায় কথা বলে। তখন কথা হলো, সারা ভারতবর্ষের মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা হচ্ছে উর্দু, এই যুক্তি দিয়ে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, পাকিস্তান হওয়ার আগেই, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা তাই উর্দুই হবে। তখন আমাদের এখান থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রস্তাব করেছিলেন যে এটা সঠিক নয়, বাংলাই হবে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা। এই হলো একটা পর্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ নিয়ে তর্কের কোনো কথা ছিল না।

বাংলায় নামকরণের বিষয়টির আগে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার। আমরা শব্দ ইংরেজি থেকেও ধার করি, আবার আরবি থেকেও শব্দ ধার করি, কিন্তু সেটা বাংলা হরফে লিখতে হবে। সমস্যা হচ্ছে এটাই। কাজেই মানুষের ছেলেমেয়েদের নাম বাংলায় হবে, না আরবিতে হবে সেটা আলাদা তর্ক। যে নামই বাবা-মা দিন না কেন, সেই নামটা বাংলায় লেখা হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলায় লেখা হবে। আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পাকিস্তান আমলে ২১ ফেব্রুয়ারির সময়  আমরা ব্যবসায়ীদের বাধ্য করতাম সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে। তখন যে জাতীয়তাবোধ থেকে এটা হয়েছিল, সেটা বাংলাদেশ থেকে উবে গেল কেন? এর কারণটা যদি বলি, তো বলতে হয়—মাছের মাথা থেকে পচন শুরু হয়। আমাদের উচ্চশ্রেণির মনে যে অভিজ্ঞতা, তাদের মনে যে আকাঙ্ক্ষা, এখন সেটা বাংলা ছাড়িয়ে উর্দুর দিকে যাচ্ছে না, আরবির দিকেও যাচ্ছে না, ইংরেজির দিকে যাচ্ছে।  এটা মনে রাখা দরকার। এর পক্ষে একটা যুক্তি যে ইংরেজি আগে থেকেই ঔপনিবেশিক ভাষা ছিল। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ক্ষমতার যে নতুন বিন্যাস হয় পৃথিবীতে, সেখানে ইংরেজিই প্রধান ভাষা হয়েছে। সেটাই হচ্ছে প্রধান কারণ।

আমার বক্তব্য হলো বাংলাদেশে ইংরেজি শেখা বা বাংলা শেখা পরস্পর বিরোধী নয়। বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজি শেখালে সেটার বিরোধিতা কেউ করবে না। কিন্তু বাংলাকে স্থানচ্যুত করে ইংরেজি করাটা বিপদজনক। আর যে কথাটা আমি শেষে বলেছিলাম মুসলমানদের ক্ষেত্রে—তারা মনে করে আরবি ভাষায় নাম না দিলে সে নামটা যথেষ্ট ধর্মসম্মত হচ্ছে না। সেটা ধর্মীয় রীতি। যেমন যারা খ্রিষ্টান ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছে—তারাও তাদের নামের একটা অংশ ইংরেজিতে দেয়।

রিবেরু: সেইন্টের নাম দেয়।

খান: হ্যাঁ সেটা দেয়।… বাংলাদেশে আমার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আমি পাকিস্তান আমলেও বেড়ে উঠেছি, এখনও বেড়ে উঠছি, এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যে, যারা বাংলাদেশে ক্ষমতা পেয়েছেন—তারা সোজা কথায় তাদের শ্রেণিস্বার্থে ইংরেজি ব্যবহার করাকে বেশি দরকার মনে করছে। সেজন্য তারা তাদের বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ সবজায়গাতে ইংরেজি ব্যবহার করছে। এটা আমার কাছে বিস্ময়কর। যদি আমি খুব বেশি সেন্টিমেনটালি বলি, এটা আমার কাছে বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়।

রিবেরু: কেউ যদি চায়ও তার সন্তানকে ভালো বাংলা মিডিয়ামে পড়াবে সে সুযোগও খুব কম। কারণ পরিকাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে—সবগুলো ভালো স্কুলই এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে।

খান: পাকিস্তান আমলে একটা লক্ষ্য ছিল, আন্দোলন ছিল, জাতীয় শত্রু ছিল, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারতেন। এখন মজার বিষয় হয়েছে কী, এখন কোনো শত্রু নেই। আপনি কার বিরুদ্ধে লড়বেন? অর্থাত্ এখন ইংরেজির পক্ষে ওকালতি করছেন, তিন বছরের বাচ্চাকে কিন্ডার গার্টেন, প্লে ওয়ান, প্লে টুতে ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন, তারা তো চামড়ায় বাঙালি, ওইজন্য তার বিরুদ্ধে আপনি আন্দোলন করতে পারবেন না। এটা কিন্তু একটা শ্রেণি সংঘাতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আবার যারা এখানে পেটি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত আছে, তারাও গোপনে গোপনে উচ্চ শ্রেণিকে অনুকরণ করাকে শ্রেয় মনে করে। এটা একটা বিশেষ পরিস্থিতি, যাকে ট্র্যাজিক পরিস্থিতি বলা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে নতুন ট্র্যাজেডিতে আমরা পড়েছি, সেটা হচ্ছে—বাংলাভাষা শুধু এখানে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও চলে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দির আগ্রাসন আছে, এখানেও উর্দুর আগ্রাসন ছিল। আমরা মনে করেছিলাম একটা সীমান্ত থাকলে আমরা বোধহয় হিন্দির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে পারব, সেটাও আমরা পারছি না। ফলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো—যেহেতু আমি অল্প লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি, বাংলাভাষায় দুচার লাইন লেখার চেষ্টা করে থাকি, আমার কাছে এটা বিশেষভাবে বেদনাদায়ক হয়ে বাজে যে—বাংলাদেশে বাংলাভাষা তার সমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

রিবেরু: এটার জন্য কি শুধু শাসকগোষ্ঠী, এলিট গোষ্ঠী, নাকি গোটা  জাতি দায়ী?

খান: আমি এখানে একটু নির্দয় হয়ে বলব, মানে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে আর কি, কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে যে বাক্যটা জগদ্বিখ্যাত করে গেছেন—আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। তার মানেটা কী? তার নির্গলিত অর্থ হচ্ছে—সমাজে যে পরিবর্তন হয়, তার নেতৃত্ব থাকে একটা না একটা শ্রেণিতে। গোটা জাতিকে ধরলে আমরা এক ইঞ্চিও আগাতে পারব না। কাউকে গালি দেওয়ার জন্য নয়, বিশ্লেষণের খাতিরে বলব, এই সমাজের কর্ণধার যে শ্রেণি, তা শুধু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নয়, কর্নধার শ্রেণি বলে একটা কিছু আছে, যাকে আমরা সিভিল সোসাইটি বলি, সেই গোটা শ্রেণি ইংরেজিমুখি হয়েছে। গোটা শ্রেণির শতকরা ১০০ জন না হোক, শতকরা ৯৯ জন ওই পথে গিয়েছে। এটাই সমাজকে নিয়ে গেছে ওই পথে। আমি এটাকে বলি—কান টানলে মাথা আসে। শাসক শ্রেণি যেদিকে যায়, সারাদেশ সেদিকে যাবে। আজকে বড়লোকেরা যা করে গ্রামের লোকেরা তা অনুসরণ করে। এখন এদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা দরকার—সেটা একেবারেই নেই। যে শ্রেণি নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের মধ্যে যদি জাতীয় চেতনা না আসে, তাহলে অন্যদের মধ্যেও আসবে না। এখন সত্যি কথা বলি, ৫২-তে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছে বাংলা ভাষার জন্যে, তখন বাঙালিদের মধ্যে উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা এখন শাসক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। তারা যদি ওই আন্দোলন সমর্থন না করত, তাহলে গ্রামের কৃষকেরা একা একা আন্দোলন সফল হতে পারতেন না।
ইত্তেফাক, ১৭ আগস্ট ২০১৮

চতুষ্কের কবি

মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯২৮-১৯৯৭) বগুড়া জেলার মেঘগাছা গ্রামে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটেনের নুফিল্ড ফাউন্ডেশন (১৯৭২-১৯৭৪), আমেরিকার ডারহামস্থ ডিউক ইউনিভার্সিটি (১৯৯৬) এবং ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমি (১৯৯৭) ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (১৯৯৭) ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সাহিত্য পদক প্রদান করে। হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা (১৯৬৫), বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (১৯৭১) ও Trade, Technology and Society in Medieval Bengal (১৯৯৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সাহিত্য, ধর্ম ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ছাড়াও সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার সমস্যা নিয়ে একাধিক রচনা লিখেছেন তরফদার। কবিতাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। নিজে কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলা রোমান্টিক কাব্যের ঠিকুজিও অনুসন্ধান করেছেন তিনি।

আজ এই লেখকের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্তমান লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
– ফিচার সম্পাদক, এনটিভি

নার্সিসাস নই আমি; আত্মরতি শিখিনি জীবনে;
তবুও আমারই ছায়া ভেসে ওঠে আশ্চর্য দর্পণে।
—মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯৭৬ : ১৪৩)

অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার দেহত্যাগ করিয়াছিলেন ১৯৯৭ সালের ৩১ জুলাই। সেই দুঃখের দিনে কোন শোক প্রকাশ করিতে না পারিয়া আরো দুঃখ হইয়াছিল। তখন আমি উচ্চশিক্ষার ঘাস কাটিতে বিদেশে বসবাস করিতেছি। এই মৃত্যুর দেড় বছরের মাথায় অধ্যাপক আহমদ শরীফ আর আড়াই বছরের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও ইহলোক ত্যাগ করেন। এই তিন অধ্যাপকের গুণ আমি যতদূর পারি গ্রহণ করিতে তৎপর ছিলাম। তিনের মধ্যে মাত্র আব্দুর রাজ্জাকের মর্সিয়াই আমি তখন তখন লিখিতে পারিয়াছিলাম। পাক্কা কুড়ি বছর পর আজ মমতাজুর রহমান তরফদারের কথা দুই কলম লিখিতে বসিয়াছি।

তরফদার সাহেব ভূ-বাংলাদেশে ইতিহাস লেখক পরিচয়ে বিশিষ্ট। বস্তুত তাঁহার সহিত তুলনা দিবার মতন ইতিহাস লেখক এদেশে বড় বেশি নাই। তাঁহার লেখা ‘হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা’ (১৯৬৫) আর ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ (১৯৭১) বাংলাদেশের ইতিহাস সাহিত্যের দুইটি অমূল্য সম্পদ। একদা এক জায়গায় তিনি নিজেকে ‘কবিতা-লেখক’ উপাধিও দিয়াছিলেন। এই সত্যের সহিত সাক্ষাৎ-পরিচয় না থাকিলে অন্য অনেকের মত হয়ত আমিও বিশেষ অবগত থাকিতাম না।

১৯৭৬ সালে তরফদার সাহেব ‘চতুষ্ক’ নামক একটি কবিতা সংগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন নিজ খরচায়। সংগ্রহের মুখবন্ধ উপলক্ষে তিনি খবর দিয়াছিলেন কৈশোরে—মায় যৌবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত—তিনি কবিতা ব্যবসায়ে শরিক ছিলেন। ১৯৭৬ সালের তথ্য অনুসারে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তাঁহার কিছু কবিতা সেকালের পত্রপত্রিকায় মুদ্রিতও হইয়াছিল। ‘তারপর’—তাঁহার ভাষায়—‘কবিতা-রচনায় বিরতি ঘটে বিশেষ কারণে।’ বিশেষ কি তিনি আর বিশদ করেন নাই।

অনেকদিন—মানে কুড়ি বছর—পর আবার কবিতাক্ষেত্রে ফিরিয়া আসিলেন তিনি। অনধিক দুই বছরে গোটা চারি কেতাব ভরাইবার মতন কবিতা লিখিয়াও ফেলিলেন। এ সত্যের নিশ্চয় কোন তাৎপর্য আছে। একটা তাৎপর্য কবির একান্ত বা দৈনন্দিন জীবনের সহিত জড়িত বিষয়—সেই তাৎপর্যানুসারে চরিতামৃত লেখকেরা নিশ্চয়ই পদাবলি লিখিবেন। আরেকটা তাৎপর্য অনেকান্ত—ইহার সত্য ইতিহাসের অন্তর্গত। আমি আজ সেদিকেই মন যোগ করিতে চাই।

আমাদের পরম সৌভাগ্য যে মমতাজুর রহমান তরফদার প্রতিটি কবিতার পাদদেশেই একটি করিয়া রচনার তারিখ উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। চোখের পলকেই দেখা যায় ‘চতুষ্কে’র সকল কবিতা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে রচিত। ততদিনে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হইয়া গিয়াছে। এ সত্যে সন্দেহ ছিল না বলিয়াই তরফদার সাহেব লিখিতে পারিয়াছিলেন, ‘কবিতা-লেখক হিসেবে আমি উদীয়মান নই, উদিতও নই, বরং অস্তগামী।’

স্বভাবের বশেই প্রশ্ন উঠিবে—কবিতা কবির কীর্তি, পড়িলেই বুঝিতে পারি কিন্তু যিনি এই কবিতাগুলি রাখিয়া গিয়াছেন তিনি কোন কারণে এইগুলি লিখিবার জন্য ১৯৭৫-৭৬ সাল বাছিয়া লইয়াছিলেন? প্রশ্নের একটা অপ্রত্যক্ষ জওয়াবও তরফদার সাহেব দিয়াছিলেন এইভাবে : ‘ইতিহাসকে বারবার ব্যবহার করেছি অতীতের কঙ্কাল হিসেবে নয়, বর্তমান সমাজ-জীবনের প্রতীক এবং অনুষঙ্গ রূপে, কখনো বা বৃহত্তর জীবনের পটভূমি রূপে।’ এই সত্যের আভাস কবিতার মধ্যেও ঢের পাওয়া যায়। উদাহরণ দিতেছি একটা। ‘ব্লাড ব্যাংক’ নামা একটি কবিতার নিচের তারিখ ৩০ জুন ১৯৭৬। তাহার একাংশে পড়িতেছি এমন এক বৈপরীত্যের গল্প যাহা রূপকথার অঙ্গ নহে। ইহাকে বরং ‘ইতিকথার পরের কথা’ বলা যাইতে পারে।

এখানে মানুষ ইস্পাত বা অন্য কোনো কঠিন ধাতুতে গড়া।
তারা রুপোর টেবিলে ঝুঁকে পড়ে সোনার অক্ষরে নাম সই করে।
আসবাব-পত্র, ঘরদুয়ার, পথঘাট, গাছপালা মুক্তায় তৈরী।
মেয়েদের শাটিন আর বুতিক কঠিন পাথরের
আর তাতে রক্তময় মণির আলো ঠিকরে পড়ে।
হীরকের কাছ থেকে অমৃতের ফল ঝরে।
পানীয় এখানে তরল সোনা; এখানে রক্ত নেই।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯)

একদিকে তিনি দেখিয়াছেন হাসপাতালে রক্ত নাই, ব্লাড ব্যাংকে রক্ত পাওয়া ভার, রক্তের অভাবে রোগী মারা গিয়াছে অথচ চারিদিকে রক্তের সমুদ্র। এই বৈপরীত্যে তিনি হতবাক।

হাজার হাজার গ্রাম মানচিত্রে শুয়ে আছে
সবুজে, নীলে, আরো বিচিত্র রঙের সম্ভারে।
ভরে ওঠে লাখ লাখ সিরিন্জ্ তরমুজের রসের মত রক্তে—
গোলাপী, লাল লাল রক্তে।

এখন শহরের ব্লাড ব্যাংক রক্তের সমুদ্র,
তাতে অণু-পরমাণুর তরঙ্গ ওঠে।
গ্রামে গ্রামে নেমে আসে সন্ধ্যা—নরম নরম সন্ধ্যা।
আকাশে তারাগুলো কাঁপছে।
খেতে, খামারে, আঙিনায়, বারান্দায়
পড়ে আছে লাখ লাখ লাশ।
নিসর্গ ডুবে গেছে স্তব্ধতার সমুদ্রে।

সাত নম্বর ক্যাবিন ফাঁকা।
সে মর্গে—বোধ হয় রক্তের সন্ধানে।

ফিকে চাঁদ দিগন্তে;
আকাশ তারায় তারায় ঝাঁঝরা—
ওটা ক্যান্সার রোগীর হৃৎপিণ্ড।

গ্রামের আকাশের তারাগুলো
লাশের উপর মৃদু মৃদু আলো ছড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯-৬০)

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের তুলনা খুব কম আছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর ক্রান্তিকাল এদেশের ইতিবৃত্তে বহুদিন অনতিক্রান্ত থাকিবে বলিয়াই মনে হয়। মমতাজুর রহমান তরফদার দেখিতেছি কবিতায় ফিরিয়া আসিতেছেন এই কালসংক্রান্তির—এই ১৯৭৫ সালের—গোড়ার দিকেই। তাঁহার ‘চতুষ্ক’ গ্রন্থের পহিলা কবিতার নিচে তারিখ ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। এই দিনই তিনি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙ্গিলেন। তরফদারের প্রথম কবিতার নাম ‘অরণ্য’। এই সমাপতন একান্ত আকস্মিক মনে করার কোন হেতু দেখিতেছি না। চতুষ্কের শেষ কবিতা ‘বুকের আগুনে’। ইহার একটি পংক্তি : ‘আর কত বার আমরা নতুন ব্যাখ্যা দেব স্বাধীনতার’।

বাংলাদেশে একখণ্ড জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। যাঁহারা দীর্ঘ সাধনার বলে এই ভিত্তিটি পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করিতেছিলেন ইতিহাস ব্যবসায়ী মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহাদের প্রথম সারিতে। দিল্লিতে সুলতানি শাসন প্রবর্তনের পরপরই বাংলাদেশেও স্বাধীন রাষ্ট্রের নতুন করিয়া গোড়াপত্তন হইয়াছিল। সেই গোড়াই পত্রেপুষ্পে ফলবান হইয়াছিল ইংরেজি পনের শতকের শেষ ও ষোল শতকের শুরুতে। এই সত্যে তরফদারের সন্দেহ ছিল না।

জনসাধারণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি—এই সত্যের উপর দাঁড়াইয়াই বাংলাদেশের নতুন প্রজাতন্ত্র আপনার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা অর্জন করিয়াছিল। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম প্রকৃত প্রস্তাবে সেই ন্যায্যতার মূলেই জয়ী হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জনগণের সেই ইচ্ছার সাময়িক বিয়োগ ঘটায়। তরফদারের ‘অরণ্য’ কবিতায় দেখিতেছি সেই আবহের রূপকই পুরাদস্তুর উপস্থিত।

আদিম অরণ্য এই স্বর্গ, মর্ত্য অথবা পাতালে;
ছিল না সূর্যের আলো এ অরণ্যে আমাদের কালে।
স্যাঁৎস্যাঁতে এই মাটি, কর্দমাক্ত পথ ও প্রান্তর
নিঃশব্দ আরণ্য নদী, শব্দহীন বনবনান্তর।
এখন বাতাস ভারি এবং রক্তের গন্ধ সহজাত যেন;
প্রকৃতি আর্দ্রতা ঝেড়ে কঙ্কালের শুভ্রতা বাড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৩)

এই জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে মহান লেখক আহমদ ছফার কথাও উল্লেখ করিতে হয়। তিনি কবিতা লেখা শুরু করিয়াছিলেন ১৯৫০ সালের পরের কোন এক পর্যায়ে। ১৯৬৪ সালের পর তাঁহার কোন কোন কবিতা ঢাকা শহরের পত্রপত্রিকায় ছাপা হইতে শুরু করে। ১৯৬৬ সালের পর হইতে তিনি উপন্যাস-শুদ্ধ নানা প্রকার লেখা প্রকাশ করিতেছিলেন। কিন্তু যতদূর জানি ১৯৭৫ সালের আগে তিনিও নিজের লেখা কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন নাই। অথচ ১৯৭৫ সনের প্রথম ভাগে আহমদ ছফা যেন বা বড় কোন তাড়ায় পড়িয়া পরপর দুইটি ছোট ছোট কবিতার বই—যথাক্রমে ‘জল্লাদ সময়’ ও ‘দুঃখের দিনের দোহা’—প্রকাশ করেন। ‘জল্লাদ সময়’ কবিতা সংকলনের নামকবিতায় আহমদ ছফা অন্যান্যের মধ্যে এই কথা-গুলিও লিখিয়াছিলেন :

সূর্যালোকে পিঠ দেয় আততায়ী লজ্জিত সময়
যা কিছু প্রকাশ্য তুমি বামহস্তে করছ গোপন
সমূহ ধ্বংসের বীজ গর্ভাশয়ে করেছ রোপণ
কিন্তু কিছু সত্য আছে কোনদিন লুকোবার নয়।
(ছফা ২০১০ : ২৪)

আহমদ ছফার আরেকটি কবিতার নাম ‘দুঃসময়’। এই কবিতাটি ‘দুঃখের দিনের দোহা’ নামক সংকলনের অংশ। এখানেও কবি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা দুর্দিনের বার্তা বৈ নয়।

নদীতে বইছে বেগে খরতর খরস্রোত
দুকূলে নামছে ধ্বস, অবিরত চলছে ভাঙন
ভাঙন ভাঙন শুধু চারদিকে ভাঙনের ক্ষণ।

বইছে কুটিল জল তটরেখা করে না শাসন
এই জলে পলি নেই, নেই কোন গর্ভের সঞ্চার
জাগবে না স্রোতোপথে চরের আদল।
(ছফা ২০১০ : ৫২)

আমার মনে হইয়াছে মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতা পড়িবার পূর্বাহ্নে ভূমিকাস্বরূপ এই কয়টি কথা না বলিলেই নয়। আমি আমার একান্ত অভিজ্ঞতা হইতেই জানি, আহমদ ছফার সহিত তরফদারের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তিনি যে আহমদ ছফার কবিতার সহিত পরিচয় রাখিবেন—তাহা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় না।

বাংলাদেশে যাহাকে বলে অনগ্রসর—তদুপরি মুসলমান—কৃষক-সমাজ তাহার অনেক সদস্যের মত আমিও কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্দুকে জীবনপাত্র বন্ধক রাখিবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার সুবাদে হাতে গোনা কয়েকজন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম। এই গুণীদের মধ্যে অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার। তাঁহার কাছে আমার অনেক ঋণ আজও অপরিশোধিত। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি শুদ্ধ দুই-তিনটি ঋণের কথা স্বীকার করিব। তবে বলিয়া রাখিব তাহাতেই আমার কর্তব্যের তামাম হইবে না।

পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তরফদার সাহেব একদিন আমাকে ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ নামক যে প্রতিষ্ঠানের সহিত তিনি নিখিল জড়াইয়া ছিলেন তাহার কোন এক শীতকালীন সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন। সনতারিখের বালাই আমার মনে বিশেষ থাকে না।  একটার নাম ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ আর একটার পরিচয় ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি’—এই ক্রমে যে দুইটা পদার্থ ঢাকায় আছে তাহাও আমি অনেকদিন পর্যন্ত আমল করি নাই। এতদিনে শুনিতেছি ইহাদের মধ্যে সংঘর্ষও  আছে। তাহাতে আমার মাথাব্যথা নাই।

ঘটনাটি খুব সম্ভব ইংরেজি ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের দোতলায় একটি সেমিনার ঘরে ইতিহাস পরিষদের ঐ অধিবেশন বসিয়াছিল। বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বিশেষ বলিতে ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখিবার সময় হইয়াছে কিনা তাহাই ছিল বিবেচ্য। কেহ কেহ বলিতেছিলেন সময় হইয়াছে; এখনই ইতিহাস লেখা শুরু করিতে হয়। আর কেহ বা না লেখার পক্ষে যুক্তি দেখাইতেছিলেন। বলিতেছিলেন: না, না, এখনো সময় হয় নাই। এক্ষণে শুদ্ধ ইতিহাসের মালমশলা যোগাড় করিতে হইবে, পরিণাম ইতিহাস পরে দেখা যাইবে। মনে রাখিতে হইবে, তখনো বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অর্ধযুগ পার হয় নাই।

অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন মমতাজুর রহমান তরফদার। প্রবন্ধ পড়িলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষক তাজুল ইসলাম হাশমী। হাশমী সাহেবের যুক্তি কি ছিল তাহা আমার এখন আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। ইতিহাস পরিষদের নথিপত্র ঘাঁটিলে হয়ত কিছু প্রমাণ এখনো পাওয়া যাইবে।

মনে পড়িতেছে ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণে একটু জড়তা ছিল। যতদূর জানি বাংলা তাঁহার মাতৃভাষা ছিল না কিন্তু তিনি দেখিলাম বাংলাতেই লিখিলেন। যাহা হৌক, আমাকে সেই অধিবেশনে হাজির করিয়াই তরফদার সাহেব আপন কর্তব্য সমাপন করেন নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢের ছাত্র ও সমাগত অনেক শিক্ষকের সামনে আমাকে দাঁড় করাইয়া পর্যন্ত দিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন হাশমীর প্রবন্ধের উপর মন্তব্য যোগ করিতে হইবে। বুঝিতে পারি নাই তিনি কেন এই অযৌক্তিক (‘গর্হিত’ বলা হয়ত সম্পূর্ণ ঠিক হইবে না) কাজটি করিতে গেলেন। এখন মনে হইতেছে ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত তাঁহার দেওয়ানে ইহা সম্ভব হইয়াছিল।

স্কুলবেলার পাঠ্যপুস্তকে পড়া একটি গল্প সেদিনের বক্তৃতার মধ্যে চোলাই করিয়াছিলাম। যতদূর মনে পড়ে পুস্তকের নাম ‘পাক মেট্রিকুলেশন ট্রান্সলেশন’। উপসংহারে বলিয়াছিলাম, ইতিহাস না পড়িয়াই মরিতে হইতেছে জানিয়া এক রাজা বড় দুঃখ পাইয়াছিলেন। দুঃখ দূর করিবার মানসে তাঁহার অন্তিম মুহূর্তে ধীমান এক মন্ত্রী রাজার কানে কানে বলিতেছিলেন, ‘রাজা মহাশয়, ইতিহাস পড়িতে না পাইলেন তাহাতে দুঃখ করিবেন না। পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম তো আমার জানাই আছে; এখনই শুনাইয়া দিতেছি: মানুষ জন্মিয়াছে, দুঃখ পাইয়াছে আর মরিয়াছে—ইহাই পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম।’ রাজা তখনই আনন্দাশ্রু নির্গত করিতে করিতে চক্ষু মুদিয়াছিলেন। কোন কোন আকলমন্দের জন্য—শুনিয়াছিলাম—গল্পের ইশারাই যথেষ্ট প্রমাণিত হইয়াছিল।

সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানে পা দিয়াছি। সময়টা বেশ। প্রথম বছরটা শেষ করিয়াছি কি করি নাই। তাহার উপর আমি ‘ইতিহাস’ কিংবা ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ কোন বিভাগের ছাত্র নহি। তরফদার সাহেবের সহিত আমার দেখা করাইয়া দিয়াছিলেন যিনি আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সহিত আমার মোলাকাতের কারণও ছিলেন সেই মহাত্মাই। নাম আহমদ ছফা। তখন মনে মনে সন্দেহ জাগিয়াছিল তরফদার সাহেব হয়ত আহমদ ছফার কথায় প্রভাবিত হইয়াছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হই বাহির হই এমন সময়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটা লিখিত বক্তৃতা বা প্রবন্ধ সমালোচনা করিয়া আমি একটি ছোট্ট বেজায় প্রবন্ধ লিখি। তাহাতে মহাত্মা আহমদ ছফা সত্য সত্যই বেজার হইয়াছিলেন। তিনি আমাকে একবার ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, ‘তোমার জিহ্বার মধ্যে একটি ঘাতক হাঙ্গর। তাহার আশীর্বাদে জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিবে না।’ গুরুজনের আশঙ্কা বৃথা যায় না। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিয়াও সেই অমৃতের ফল আমার হাত হইতে ছুটিয়া গিয়াছিল। চাকরির গোড়া শুকাইয়া গিয়াছিল।

আব্দুর রাজ্জাকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোন মহাশয়ের সমালোচনা বিশেষ করি নাই। যদি কাঁহারও করিতে হইত তো আমি মমতাজুর রহমান তরফদার কিংবা তাঁহার গুরু আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর কীর্তি লইয়াই তাহা করিতাম। মনোবল শেষ হইয়া গিয়াছিল। আর সাহস গিয়াছিল শুকাইয়া। সাহস বড়ই তরল পদার্থ। যে পাত্রে রাখেন তাহারই আকার ধারণ করে। আল্লাহতায়ালার পরম করুণায় অল্পেই—অপার বিলম্ব ঘটিবার আগেই—বুঝিয়াছিলাম অল্পবিদ্যা কত ভয়ংকর।

এক্ষণে বলিয়া রাখি, আমার চাকরি যাইবার পশ্চাতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোন হাত ছিল না। তিনি বরাবরই আমার বরাভয় ছিলেন। এই জাতীয় ঘটনাকে গ্রিক পুরানে ‘ট্রাজেডি’ বলা হইত। একালে আমরা বলি ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’।

এক্ষণে আমাকে আরেকটি ঋণের কথা বলিতে হয়। ১৯৮৬ সাল নাগাদ আমি উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশ যাইবার একটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দেশে ফিরিবার পথে কিছু দেরি হইয়াছিল। কিছু মানে গোটা চৌদ্দ বছর। আগেই কহিয়াছি আমার ফিরিবার আগেই তরফদার সাহেব পরলোকগমন করিলেন ৩১ জুলাই ১৯৯৭। এক্ষণে আঁক কষিয়া দেখি আর একদিন পার হইলেই তাঁহার জন্মের দিন আর মৃত্যুর দিন এক দিবস হইত। জীবনের ৬৮ বছর যেদিন পূর্ণ করিলেন সেদিনই তাঁহার ইহবিয়োগ হইল। তাঁহার সহিত এ জীবনে আর দেখা হইবে না। আমি যে তাঁহার কবিতা লইয়া এই প্রবন্ধ লিখিতেছি তিনি কোনদিন জানিতে পারিবেন না।

১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান খাড়া করিলে তরফদার সাহেব উহার সভাপতি নিযুক্ত হইলেন। আমি ততদিনে বছর দুই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটাইয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসিয়াছি। উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের প্রথমদিকের একটি সেমিনারের বিষয় ছিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন বিষয়ে কার্ল মার্কস যে সকল লেখা লিখিয়াছিলেন সে সকল লেখার পর্যালোচনা। তরফদার সাহেব সেই সেমিনারেও সরকারি খামে আমাকে কেন জানি নেমন্তন্ন করিয়াছিলেন।

প্রচার করা হইয়াছিল এই সেমিনারে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম একটা মূল্যবান প্রবন্ধ পড়িবেন। তাঁহার লেখার পর্যালোচনা করিতে মোট দুইজন আলোচক সরকারি ডাক পাইয়াছিলেন। একজনের নাম আবু আহমদ আবদুল্লাহ। নিজের নামেই ইনি যথারীতি দেশবিখ্যাত। সেই সময় ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ নামক এক আধা-সরকারি কেন্দ্রের অর্থনীতি ব্যবসায়ী পরিচয়ে ভূষিত তিনি। আরজন আমি। মাত্র নগণ্য প্রভাষক। তাহাও আবার ‘ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট’ নামক ইতিহাসে অব্যবসায়ী একটি গোমড়ামুখ শিক্ষাসত্রের।

এই অধিবেশনে আমি ঠিক কোন কোন বাক্য আওড়াইয়াছিলাম তাহা আমার এখন আর মনে নাই। শুদ্ধ এইটুকু মনে পড়িতেছে যে মোফাখ্খার সাহেব যাহা বলিয়াছিলেন তাহার অনেক কথাই আমার মনে ধরে নাই। সে যুগে আমি মার্কস ব্যবসায়ে নামিয়াছি খুব বেশিদিন হয় নাই। আর এদিকে মোফাখ্খার সাহেব পশ্চিম দেশীয় পণ্ডিতদের পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করিয়া কার্ল মার্কসের মুণ্ডুপাত করিতেছিলেন। আর যায় কোথায়! ইহার ফল—বলা বাহুল্য—ভাল হয় নাই। আহমদ ছফার আবিষ্কৃত দুশমন হাঙ্গরটি তখনো আমার জিহ্বা ত্যাগ করে নাই।

এখন আমার তৃতীয় দফা ঋণ বা ঋণমালার কথা বলিব। মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহার নিজের লেখা দুই-তিনটা পুস্তক আমাকে উপহারস্বরূপ দিয়াছিলেন। একটির নাম ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’। দ্বিতীয়টির নাম ‘চতুষ্ক’। চতুষ্কের কথা এই নিবন্ধের গোড়াতেই একবার বলিয়াছি। এক্ষণে আরেকটু বিস্তার করিবার বাসনা হইতেছে।

তিনি খুব সম্ভব আশা করিয়াছিলেন অন্তত শেষের কেতাবটি লইয়া আমি দুই কথা মুসাবিদা করিব। এই কবিতাবলির ভূমিকাচ্ছলে তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে যথেষ্ট ইশারা আছে যে লোকে ইহার সমালোচনা করেন। তাঁহার বিভাগের জনৈক সহকর্মী সমীপে প্রকাশ্যে এই বাসনা পেশও করিয়াছিলেন। তরফদার সাহেবের বাসনাটি ছিল এইরকম :

লিখেছিলাম নিতান্তই আত্মবিনোদনের জন্য। প্রফেসর আহমদ শরীফ, অধ্যাপক, কবি মুফাখ্খরুল ইসলাম এবং ডক্টর পারেশ ইসলাম মুস্তাফিজুর রহমানের তাগিদে কবিতাগুলো প্রকাশ করলাম। আমার বহু কবিতার জন্মলগ্নের সঙ্গে ডক্টর মুস্তাফিজুর রহমানের নিবিড় পরিচয় আছে। এখানে তাঁর নাম উল্লেখ করলেও আমার কবিতার সমালোচনার অধিকার তাঁর রইল। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ-ছয়)

‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ বইটি ছাপা হইতে না হইতে ১৯৭১ সাল আসিয়া গিয়াছিল। ইহার গায়ে ছাপ মারা ছিল ১৯৭১ সালের। প্রকাশকাল জানুয়ারি ১৯৭১ আর প্রকাশক—পুস্তকে মুদ্রিত পাঠ অনুসারে—‘অধ্যক্ষ মুনীর চৌধুরী, বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। মনে পড়িল সে যুগে বিভাগীয় প্রধান বাংলা প্রকরণে ‘অধ্যক্ষ’ পরিচয়ে চলিতেন।  তবে শব্দটা শেষ পর্যন্ত চলিল না কেন সে প্রশ্ন নিহিতই রহিল। আরো জানিলাম, ‘বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ’ তখনো এক পাত্রেই রাখা হইত।

সঙ্গত কারণেই বইটির ভালমত বিলিবিতরণ হয় নাই। ১৯৭৭-৭৮ সালের কোন একদিন আমার হাতে একটি কপি তুলিয়া দিবার কালে তরফদার সাহেব বলিতেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের বিপ্লবে আমার বইয়ের প্রায় সব কপি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। গোটা দশ কপি আমার নাগালে ছিল। একটা দিয়াছিলাম হুমায়ুন কবিরকে, ১৯৭২ সালে। সে বলিয়াছিল একটি আলোচনা লিখিবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে মারা যায় হুমায়ুন।’

আমার কপিটি হস্তান্তরের সময়ও তিনি সেই পুরাতন কথাই বলিতেছিলেন, ‘এটাই আমার শেষ কপি।’ তখন থাকিতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে। সেই এজমালি কাড়াকাড়ি ছাত্রাবাসের মধ্যেও কপিটি আমি বহুদিন যক্ষের ধনের মত রক্ষা করিয়াছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা করিতে পারি নাই। কথা রক্ষার প্রসঙ্গ উঠাইতেছি না। রক্ষার যোগ্যতা আমার তখন হয় নাই—সিদ্ধি আজও অধরাই রহিয়াছে।

পরে ‘আবদুর রহমানের সন্দেশ-রাস্ক’ নামে একটি আলাদা প্রবন্ধও তিনি প্রকাশ করেন। ইহাকে ‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’র পরিপূরক বলা যাইতে পারে। আওয়াধী-হিন্দী ও বাংলা কাব্যের তুলনায় সমালোচনা করিবার মানসে তরফদার সাহেব শুদ্ধ ‘আওয়াধী-হিন্দী’ ভাষাই শেখেন নাই, মনে হইতেছে বাংলা কবিতায়ও হাত মকশো করিতেছিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? তিনি দেখিতেছি ফরাশি ভাষাও অনেক দূর আত্মস্থ করিয়াছিলেন। মমতাজুর রহমান তরফদার ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত এই সাধনা তাঁহার দ্বিতীয় স্বভাব হইয়া উঠিয়াছিল।

পাঠিকা হয়ত লক্ষ্য করিবেন মমতাজুর রহমান তরফদার নিজেকে কদাচ ‘কবি’ বলেন নাই। বলিয়াছিলেন মাত্র ‘কবিতা-লেখক’। মনে পড়ে রাজা রামমোহন রায় তাঁহার জমানার কবিদের অন্তত একবেলা ‘কবিতাকার’ বলিয়া ডাকিয়াছিলেন। কোন এক কবি বলিয়াছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কথাটার সত্যাসত্য নির্ভর করে ‘কবি’ বলিতে আপনি কি বুঝাইতেছেন তাহার উপর। আমরা অন্য প্রকরণে বলিয়া থাকি মানুষ মাত্রেই কবি কেননা তাহার মধ্যে বাক্যের ঊষ হইয়াছে। আর কে না জানে ভাষার মধ্যে দুইটি নিয়ম যুগপদ ভাষাকে বাক্যের সমান করিয়াছে। ইহাদিগকে যথাক্রমে ‘রূপক’ ও ‘লক্ষণা’ বলিয়াই আমরা জানি।

এক্ষণে আমি তরফদার সাহেব আমাকে দুই নম্বরে যে বইটি দান করিয়াছিলেন তাহার কথা পাড়িতেছি। বইয়ের নাম ‘চতুষ্ক’। ইহা চারিটি বইয়ের একত্রিত নাম। বই চারিটি যথাক্রমে ‘প্রত্ন’, ‘অন্ধকার অভিজ্ঞতা: আলোক’, ‘আভা’ এবং ‘অনন্য সুরগুলো’ নামে রচিত। বহিচতুষ্টয়ের অন্তর্গত কবিতার সংখ্যা গোটা ছিয়ানব্বই। অতিরিক্ত সংযোজনা আকারে আরো সাতটি কবিতা পাওয়া যাইতেছে।

বই চারিটি তিনি চারিজন ইষ্টের নামে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। একটি উৎসর্গ প্রসঙ্গে খানিক শোকের কাহিনীও বিবৃত করিয়াছিলেন তিনি। তরফদার লিখিয়াছেন :

শেষ কাব্য ‘অনন্য সুরগুলো’ বহু দিন আগে পাণ্ডুলিপিতে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের প্রতি উৎসর্গ করেছিলাম। তখন উৎসর্গের অংশে একটি-মাত্র কবিতা-পংক্তি ছিল। তাঁর দাফন শেষ করে এসে দ্বিতীয় প্রুফে ২৮/৫/৭৬ তারিখে প্রথম লাইনটি যোগ করে দেই। শিল্পী বিদেশ থেকে ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে এপ্রিল মাসে দেখা করি। তাঁর শোয়ার ঘরে একটি অসমাপ্ত চিত্রের সামনে বসে দু’জন আড়াই ঘণ্টা কথা বলি। তারপর ‘জয়নুল আবেদিনের অসমাপ্ত চিত্র’ শীর্ষক কবিতাটি লিখি। কবিতাটি অথবা উৎসর্গের ঘটনাটি শিল্পী জানতে পারলেন না। আমার কাছে তাঁর মৃত্যুর মতই এই ঘটনাটি শোকাবহ। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ)

এখানে আমরা উৎসর্গপত্রের সেই দুইটি পংক্তি নকল করিয়া দিতেছি।
এখন ডুবেছে সূর্য সমাপ্তির গোধূলি-হাওয়ায়;
সব রঙ, সব রেখা বিদ্যুতের শিখা হয়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৫)

মমতাজুর রহমান তরফদার বগুড়া জেলার যে গ্রামে জন্মিয়াছিলেন তাহার নামেও আছে রূপক, আছে কবিতার গন্ধ। আর কি বাহারি সে নাম! ‘মেঘগাছা’! ‘গাছগুলো মেঘরঙ’ নামক একটি কবিতায় তরফদার মোটে একবার নয়, গোটা দুইবার জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।

গাছগুলো মেঘরঙ—
এই নাম যারা দিয়েছিল গ্রামটিকে
তারা কি কবি ছিল?
(তরফদার ১৯৭৬ : ২২, ২৪)

‘একটি প্রার্থনা শুধু’ নামের আরেকটি কবিতাযোগে তিনিও ‘মেঘগাছা’ গ্রামের স্মৃতি পুনর্জাগ্রত করিয়াছিলেন। প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন সেই গ্রামে সমাহিত হইবার।

একটি প্রার্থনা শুধু তোমাদের কাছে—
যদি নানা রঙ ঝরে অমৃতের গাছে
জল দিও বনেদী আলবালে।

যদি অন্ধকার নামে অমৃতের গাছে
নিতান্ত অকালে,
লাশটিকে রেখে দিও মর্গের সোপানে।
যদি ঠাঁই নাই-ই মেলে, তবে অন্য খানে—
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘরঙ আর
যে গ্রামের বাতাসেও বসন্তবাহার
শুনেছি অনেক বার।…
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫২)

মমতাজুর রহমান তরফদার কখনো কখনো দূর বিদেশে বসিয়াও এই মেঘগাছা নধর গ্রামের স্মৃতিকাতর হইয়াছিলেন। ‘ঋণ’ নামক একটি কবিতায় দেখি তাঁহার পুরানা সেই আকুতি ফিরিয়া আসিয়াছে। কোন এক দূরদেশে গিয়াছেন তিনি। ধরিয়া লইলাম বেড়াইতেই গিয়াছেন। সেখানে ‘প্রিমরোজ হিল গার্ডেনের। স্বাপ্নিক চূড়ায়’ দেখিতেছেন ‘জুনের নরম রোদ মায়ের স্তনের মত স্নিগ্ধ ও মসৃণ’—এমন সময় হঠাৎ তাঁহার মনে পড়িল ‘মেঘগাছা’ গ্রামের কথা।

চমকে-ওঠা হরিণের মন
আকস্মিক চলে গেল উত্তর বঙ্গের কোনো গ্রামে,
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘের মতন,
যে গ্রামে এখন এক স্নিগ্ধ সন্ধ্যা নামে।
অনেক রক্তের ঋণ, অনেক অন্নের ঋণ
জমে আছে প্রিমরোজ হিলের মতন।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৯-৭০)

গ্রামের সহিত এই বাঁধাপড়া কি বোঝাপড়া শুদ্ধমাত্র একটি গ্রামের ঘটনা? মোটেই নহে। ‘গাছের উক্তি : অনিকেত নই’ নামাঙ্কিত অন্য একটি কবিতায় গ্রাম ছড়াইয়া পড়িয়াছে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বড় বড় সব জনপদে। ফরাশি চিত্রশিল্পী এদুয়ার্দ মানের একপ্রস্ত আপ্তবাক্য উদ্ধার করিয়া তরফদার এই কবিতাটির বিসমিল্লাহ করিয়াছিলেন। মানের কথাটা তিনি ফরাশি জবানেই লিখিয়াছিলেন : ‘ইল ফোতেত দো সোঁ তঁ’ (Il faut être de son temps)—অর্থাৎ আপন যুগের মানুষ হওয়াটাই দায়। তরফদারের কবিতায় এই বাক্যটিই দেখিতেছি নতুন নিয়ম আকারে হাজির হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘কেবলি আমার রক্তে বেজে ওঠে পুরাতন বীণা।’

আমার শিকড় বাঁধা বরেন্দ্রের রক্তিম মাটিতে
হাজার হাজার নিম্নগামী মূলের সম্ভারে।
কিন্তু এই সত্তা জাগে আকাশের সমুদ্রের গায়
রোদের বৃষ্টিতে আর রঙে রঙে নিসর্গের বিমুগ্ধ আমেজে,
ফুলে ফুলে, শাখা-প্রশাখায় অস্তিত্বের আকুল বিকাশে।
এখন আমার সত্তা ছায়া ফেলে সমুদ্র-আকাশে।

বারবার দুলে উঠি; ছায়া জাগে
অন্ধকার বঙ্গে, সমতটে, হরিকেলে,
কুয়াশার শালবন-বিহারের ধূসর প্রাকারে,
সুদূরের মহাস্থানে, করতোয়া নদীর কিনারে,
রক্তময় পাহাড়পুরের পথে, ভিক্ষুদের স্তূপের চূড়ায়,
সমুদ্রের কূলে-উপকূলে
সম্ভাবনাময় স্বপ্নে বারবার দুলে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪৮-৪৯)

শুদ্ধ এই কবিতায় কেন, তাঁহার প্রায় সকল কবিতায় এই একটু খোড়াখুড়ি করিতেই পৌঁছাইবেন—একটু আগাইতেই হোঁচট খাইবেন—এই ধরনের পংক্তিতে :

শুনেছি পাহাড়পুর, পৌণ্ড্রদেশ কিংবা ময়নামতী
পৃথিবীর ইতিহাসে রেখেছিল গভীর সঙ্গতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬১)

মমতাজুর রহমান তরফদারের তরফে পুরাতন ইতিহাস নেহায়েত নয়া জমানার প্রতীক মাত্র বনিবে না বা চাকরি মাত্র করিবে না, তাহার ঢের কাজ পড়িয়া রহিয়াছে। ‘কলরব তবু শোনা যায়’ শিরোনামের এক কবিতায় তাহাই দেখিতে পাইতেছি :

একটু দূরে খালটার নির্জন কিনারে
যখন হেমন্ত-সন্ধ্যা নেমে আসে বাবলার ঝাড়ে
কোনো এক নির্জন গুহায়
বারবার আজো শোনা যায়
অতীতের মৃদু কলরব;
নিসর্গ এখনো নয় গত-মহোৎসব।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩২)

অতীত ও বর্তমানের যুগল রচনা করিতে বসিয়া তিনি কখনো কখনো চমকিয়া উঠিবার মতন সাকার পংক্তিও লিখিয়াছেন। ‘এই গ্রামে’ নামক একটি কবিতার একটি চিত্রকল্প পরখ করিলেই ধরা পড়িবে চিত্রকল্পের ক্ষমতা বলিতে কি বুঝায়। তরফদার লিখিতেছেন :

এই গ্রাম দ্বিখণ্ডিত শব।
এই রাস্তা তলোয়ার এ গ্রামের বুকের ভিতর।
থেমেছে অনেক আগে গ্রামিকার আদিম উৎসব।
আশেপাশে শূন্য খেত, তার পর অসংখ্য কবর।
প্রাচীন কঙ্কালগুলো এখন ঘুমায়
সময়ের বুকের ভিতর।

এখন ধর্ষিতা চাঁদ জেগে আছে রাতের গুহায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫০; মোটা হরফ যোগ করা)

‘গ্রামিকা’ শব্দটি সামান্য শব্দ নহে। আমরা রোজকার কথাবার্তায় যেমন বলি পুস্তকের ছোট ‘পুস্তিকা’, পত্রের ছোট ‘পত্রিকা’, তেমনি গ্রামের ছোট ‘গ্রামিকা’। বাংলায় ‘ইকা’ প্রযুক্ত হয় ছোট অর্থাৎ তুচ্ছ অর্থে আবার এই শব্দের গর্ভাশয়ে নারী ও পুরুষের ভেদও বাসা বাঁধিতে পারে—যেমন শিক্ষকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘শিক্ষিকা,’ লেখকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘লেখিকা,’ কিংবা পাঠকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘পাঠিকা’। তরফদার সাহেবের ‘গ্রামিকা’ কি গ্রামের ছোট না গ্রামের স্ত্রীলিঙ্গ? ভাবিয়া দেখিতে হইবে। হইতে পারে দুইটার অর্থ একই। তরফদার আরো অনেক জায়গায় এই ‘গ্রামিকা’ পদটি কাজে খাটাইয়াছেন।

কিন্তু সেই সুরগুলো এখনো অনাবিষ্কৃত, এখনো অজানা,
হয়ত সৃষ্টির লগ্নে গ্রামিকার বুকে দেয় হানা।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৮; মোটা হরফ যোগ করা)

এই পর্যন্ত আমরা মাত্র মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতার পদার্থ ধরিয়া আলোচনা করিলাম। এক্ষণে কবিতার পদ লইয়া দুই কথা বলিব। তাঁহার অধিক কবিতা অক্ষরবৃত্তের সরল পয়ারে রচিত। কোন কোন কবিতা মাত্রাবৃত্তের হালকা চালেও দুলিয়া উঠিয়াছে। ‘খুলো না চুলের গুচ্ছ’ নামের কবিতার কয়েক পংক্তি বাজাইয়া দেখা যাইতে পারে। অক্ষরবৃত্তের পয়ারে রচা এই পদ্যটিতে মাত্রাবৃত্তের চালও ইচ্ছা হয় খুঁজিয়া লওয়া যায়। এই নিবন্ধের শেষে নিদর্শনস্বরূপ এই কবিতাটির আগাগোড়া তুলিয়া লইব। তবে এখানে নগদ মূল্যে কয়েক পংক্তি আলাদা করিয়া দেখাইতে চাই।

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারী;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
(তরফদার ১৯৭৬: ১৪১)

মাত্রাবৃত্তের চালেই মমতাজুর রহমান তরফদার অধিক সিদ্ধার্থ বলিয়া আমার ভ্রম হইয়াছে। উদাহরণের স্থলে বলিতে চাই, ‘জলের ধারে’ কিংবা ‘কালো মুখ’ নামক দুইটা কবিতায় একই ধরনের শক্তি ও সত্যের দেখা মিলিবে। পদ ও পদার্থের অভেদ বলিতে যাহা বুঝায়—বুনিয়াদি তত্ত্বজ্ঞানীরা যাহাকে বহুদিন ধরিয়া কলাসিদ্ধির পরাকাষ্ঠা জ্ঞান করিয়া আসিতেছেন—তাহার উদাহরণ এই সকল কবিতা।

মমতাজুর রহমান তরফদার কর্তৃক মাত্রাবৃত্তের চালে রচিত আরও একটি কবিতার কথা আমি পাড়িতে চাই যাহাতে পদ ও পদার্থের অভেদ প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে। কবিতাটির নাম ‘জাগ্রত’। এই কবিতার শক্তি গোটা চারি পংক্তি মাত্র উদ্ধার করিয়া বোঝান যাইবে না। আমরা গোটা কবিতাটিই সংযোজন অংশে জুড়িয়া দিতেছি। এই ক্রমে আরো অনেক কবিতা উদ্ধার করা যাইতে পারিবে। আশংকা হয় তাহাতে না স্মৃতিকথার সীমানা লঙ্ঘন করা হয়।

‘জাগ্রত’ নামের পদ্যটি শুদ্ধমাত্র ছন্দোসিদ্ধির উদাহরণই নহে, বেহ্তর বাগ্বিধির অভাবে যাহাকে আমরা বলিতে পারি ‘কবিতা লেখকের রাজনীতি’ ইহাতে তাহাও অনাবৃত হইয়াছে। বর্তমান দুনিয়ার বিবর্তমান শ্রেণীসংগ্রামের একটি স্থিরচিত্রও এখানে পাওয়া গিয়াছে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি লিখিত এই কবিতায় সে যুগের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি পরিস্ফূট। দেখিতেছি এই কবিতার চারিসীমানায় হ্যানয়, সায়গন, সিনাই, তিমুর আর অ্যাঙ্গোলার মঞ্চের পেছনে লিসবন, মাদ্রিদ, লন্ডন, পারি, প্রাগ, ভিয়েনা আর ওয়াশিংটননামা সবুজ ঘারের পর্দাও ভাসিয়া উঠিতেছে।

একদা শ্রমিকশ্রেণির জাগরণ পূর্ব এয়ুরোপের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ ছাপাইয়া চিনদেশে জাতীয় মুক্তির পথও খুলিয়া দিয়াছিল। আজ সে যাত্রায় কোথাও ছেদ পড়িয়াছে কি? তরফদার লিখিয়াছেন—হয়ত পড়িয়াছে। তাহাতেই দমিবেন এমন পাত্র তিনি নন কিন্তু।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে,
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে,
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদন্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান
হোয়াংহোর স্রোতত যদিও বা হয় ম্লান।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১০-১১)

তরফদারের এই দৃষ্টি আদৌ আপতিক নয়। এই দৃষ্টি তাঁহার ব্রতেরই অংশবিশেষ। বিষাদে পরিপূর্ণ তাঁহার অনেক কবিতা কিন্তু এই বিষাদ কদাচ বিতৃষ্ণায় পরিণতি পায় নাই। মহান ফরাশি কবি শার্ল বোদলেয়রের সহিত এই জায়গায় একটা তুলনা কাটিলে মন্দ হয় না। ‘একটি চিত্র দেখে’ নামের কবিতাটির মধ্যে খানিক বোদলেয়ারের ছায়া পড়িয়াছে এই কল্পনা করা চলে।

রাত্রি বমন করেছে এক রাশ আলকাতরা
পৃথিবীর বুকের উপরে।
অন্ধকার ঝুলে আছে কুয়াশার আস্তরণে
শবের ব্যারিকেড; ওদের মিছিল এখনো এগোয়নি
নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩৯)

আরেক কবিতায়—নাম ‘অন্য রূপ’—তরফদার সাহেব ‘বোদলেয়ারীয় বিতৃষ্ণার উৎস’ অনুসন্ধান করিতেছেন পারি নগরীর অন্তঃপাতী ধন ও দারিদ্রের বৈপরীত্যের মধ্যে। তিনি দেখিতেছেন ‘ওপেরা-থিয়েটারটাতে কোনো কমেড়ির অভিনয় চলছে’ আর ‘ইমারৎটা আলোয় আলোয় জ্বলছে।’ সম্পদ ও বিপদ, বৈভব ও নিঃস্বতা একই সত্যের দুই প্রান্ত বৈ নয়। একপ্রান্তে আছে সম্পদ। যুগপদ বিপদের ফলন না ঘটাইয়া সম্পদ আপন পদে স্থির হইতে পারে না। সম্পদ তবুও সত্য বৈ নয়।

রেপুবলিকের মত আরো বহু এলাকায়
আলোকে আলোকে, শেরী, শ্যাম্পেন এবং কোনইয়াকে
যে রূপ জেগে আছে, তা নিরেট সত্য।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

সমস্যার মধ্যে, ঘটনার আরো এক প্রান্ত আছে—সেই প্রান্তে আছে বিপদ। সম্পদের ‘আরো এক রূপ আছে’—সেই রূপ কিন্তু ‘মুলারুজ্বে,’ ‘ইফেল টাওয়ারের আশেপাশে,’ ‘লুকসেমবুর্গ বাগানে,’ ‘ল্যাটিন কোয়ার্টারে,’ কিংবা ‘কোনো চঞ্চল অথবা ঘুমন্ত স্টেশনেও’ দেখা যায় না। একই অঙ্গের কি সেই অপরূপ রূপ?

উৎসবের হয়ত অতি কাছেই
আলোয়, অন্ধকারে, জীবনে, মৃত্যুতে
নির্বেদে, আনন্দে
অতি প্রাচীন ব্যাধি দগ্দগ্ করে জ্বলছে
নতুন ক্ষতের পরিপূর্ণ যন্ত্রণা নিয়ে।’
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

‘অন্য রূপ’ কবিতার মাথায় মমতাজুর রহমান তরফদার বোদলেয়ারের ‘ঢাকনা’ নামক কবিতা হইতে দুইটি পংক্তি অলংকারস্বরূপ—না, ভুল বলিলাম, ইশতেহারস্বরূপ—স্থাপন করিয়াছিলেন।

Le Ciel ! Covuercle noir de la grande marmite
Où bout l’imperceptible et vaste Humanité.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ১৪১)

আকাশ একটা আস্ত কৃষ্ণবর্ণ ঢাকনার মতন পৃথিবীকে চাপিয়া আছে, আর ইহার নিচে সীমাসরহদহীন অবয়বহীন মানবজাতি টগবগ সিদ্ধ হইতেছে—এই রূপকল্পের দেখা আমরা বোদলেয়রের ‘বিতৃষ্ণা’ নামের চার নম্বর কবিতাটিতেও একবার পাইয়াছিলাম। সেই কবিতায় শার্ল বোদলেয়র লিখিয়াছিলেন, যখন আকাশ ভারে আনত হইয়া ঢাকনার মতন নামিয়া আসে যন্ত্রণাকাতর দীর্ঘ বিতৃষ্ণায় বিদ্ধ মনুষ্যের মাথায় ইতি আদি।

Quand le ciel bas et lourd pèse comme un covuercle
Sur l’esprit gémissant en proie axu longs ennuis,
Et que de l’horizon embrassant tout le cercle
II nous verse un jour noir plus triste que les nuits;
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৭৪)

শার্ল বোদলেয়ারের আরো ঢের ছাপ আছে তরফদারের কবিতায়। ফরাশি কবির Le Soleil বা ‘সূর্য’ কবিতাটির আলো বাঙালি কবিতা লেখকের ‘সূর্যের প্রণতি’ কবিতায় উজ্জ্বলতর হইয়াছে। আমরা এই নিবন্ধের পরিশিষ্টে দুই কবির কবিতাই পুরাপুরি তুলিয়া দিতেছি। এখানে আপাতত দুই কবির শেষ স্তবক দুইটি মাত্র পাশাপাশি পড়িতেছি। প্রথমে দেখি শার্ল বোদলেয়রের চারি পংক্তি:

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaxu et dans tous les palais.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৮৩)

[যখন এভাবে কবির মতন তিনি নামেন শহরে, অতি
তুচ্ছ পদার্থ যে তাহাকেও বানান মহান সন্ততি
নিরব নিঃসঙ্গ কোন রাজার মতন ধামাধরাহীন
আরোগ্য সদনে কি রাজপ্রসাদে কাটে নিরপেক্ষ দিন।]

তুলনীয় মমতাজুর রহমান তরফদারের ছয় পংক্তি:

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জ্বলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

মমতাজুর রহমান তরফদার আধুনিক বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘মূলধারা’ তাঁহার মধ্যে প্রবেশ করিতে চাহেন নাই। তাহা সত্ত্বেও তিনি যে ভাষায় লিখিয়াছেন তাহা ১৯৩০ সালের পরের কবিদের ভাষাই। তিনি নতুন ভাষার সন্ধান করেন নাই। এখানেই তাঁহার কবিতা মার খাইয়াছে। কিন্তু তিনি মরেন নাই। তিনি নিজের জগতে যাহা চাহিয়াছেন তাহাতেও বাংলা কবিতার দিগন্ত আরো দূরে সরিয়া গিয়াছে। এই মহান ইতিহাস লেখকের ‘কবিতা-লেখক’ পরিচয়—হয়ত সম্পূর্ণ বিফলে যায় নাই।

দোহাই

১. আহমদ ছফা, আহমদ ছফার কবিতা, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০)।

২. মমতাজুর রহমান তরফদার, চতুষ্ক (ঢাকা : মমতাজুর রহমান তরফদার, ১৯৭৬)।

৩. মমতাজুর রহমান তরফদার, বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭১)।

৪. মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম, ‘ভারত উপ-মহাদেশে ইংরেজ শাসন সম্পর্কে কার্ল মার্কস,’ সালাহউদ্দীন আহমদ গয়রহ সম্পাদিত, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা : বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ, ১৯৯১), পৃ. ৩২২-৪৭।

৫. Charles Baudelaire, Oevures complètes, tome 1, texte établi, présenté et annoté par Claude Pichois (Paris : Éditions Gallimard, 1975).

৬. Momtayur Rahman Tarafdar, Husain Shahi Bengal 1494-1538 A.D.: A Socio-Political Study (Dacca : Asiatic Society of Pakistan, 1965).

 

সংযোজন

কালো মুখ

হানা দেয় একটি কালো মুখ
শার্সিভাঙা জীর্ণ জানালায়।
কিছুতেই ভাঙে না কৌতুক,
বারবার সে যে ফিরে চায়।

জানে না সে অথবা সে জানে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাটির পাহাড়
বুক ভরে কি বিশাল গানে।
ক্ষুদ্র দেহ বিশ্বের প্রাকার।

পথ আজো নভ-চারী নয়;
কিন্তু এ সরণী করে ভেদ
সুদূরের সূর্য জ্যোতির্ময়।
এই গানে পড়ে নাক ছেদ।

পরাজিত নোংরা কালো মুখ
জানালায় এখানে উন্মুখ।

১৯ জুন  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৭৩)

 

জাগ্রত

আকাশের হ্রদে চাঁদ গলে গলে যায়
শরতের মেঘে ঈষৎ বজ্ররেখা।
লতাপাতাহীন অগণিত প্রশাখায়
নীরব অগ্নি এখন দিয়েছে দেখা।

বড় মহীরুহ সরবে গুটায় পাখা—
জেগে থাকে শুধু দিগন্তময় মরু।
রসকণাহীন ফুল, ফল, বহু শাখা—
সব গাছ মৃত; কোথায় কল্পতরু?

হ্যানয়-সায়গনে চলছে পলেস্তারা
ধ্বসে যাওয়া যত সুপ্রাচীন ইমারতে।
খামারেও ছিল শকুনির পাঁয়তারা—
সবুজ আলোক ভরবে কি মরকতে?

প্রতিশ্রুতির ফলকের গায়ে আলো—
বারবার এল বিমুখী প্রস্তাবনা।
ভোরের বাতাস পরিমেল ঝলসালো—
কালিক সিঁড়িতে কস্মিন সম্ভাবনা।

মুসার সিনায়ে এখন নতুন নবী—
চেয়ে দেখে শুধু খনিজ ফল্গুধারা।
নীলনদে ভাসে উটপক্ষীর ছবি—
মরুভূমি-রাতে জাগে তবু ধ্রুবতারা।

তিমোর-এ্যাঙ্গোলায় এখন অগ্নি উঠে;
লিসবন কাঁপে অভাবিত ভাবনায়।
কোন অলক্ষ্যে মাদ্রিদ এখন ছুটে—
পিরেনিজ বুঝি আলোকের সীমানায়।

লন্ডন, পারি, প্রাগ ও ভিয়েনা জাগে;
লক্ষ্মীপেচক এখন ওয়াশিংটনে।
শাম্পেন-শেরীতে বেয়ারের অনুরাগে
কর্নিয়া-আলো উদগত লিসবনে।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে;
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়—
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদণ্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে;
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা—

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান,
হোয়াংহোর স্রোত যদিও বা হয় ম্লান।

১৯ আগস্ট  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১০৯-১১)

 

জলের ধারে

জলের ধারে যদি বা তুমি গেলে,
আবার কেন মাটির ঘরে এলে?
ভালই ছিল পাহাড়ী মৃদু ঢেউ,
আঙুল তুলে রুখত নাক কেউ।
নদীর আলো তন্বী স্বচ্ছতা;
আকাশ বেয়ে সরু আলোক-লতা।

জীবন দিয়ে কে পায় জলধারা?
স্বপ্নসিঁড়ি কোথায় ধ্রুবতারা?
অন্ধকারে যদি বা স্রোত বয়,
তুমি ত জান সে ত আলোক নয়।
দিবসরাত অন্ধ হাতী জাগে,
সবুজ গাছে কেবল খাদ্য মাগে।
নরম দেহে যদিও বায়ু ভাসে,
ধরবে তাকে সে কোন অভিলাষে?

অন্ধকারে আংটি খুলে রাখা,
পথের ধারে ভ্রুণ রক্তমাখা।

আজকে ভোরে জানালা খুলে দাও।
আকাশ, আভা আবার ফিরে নাও।
ঘরের পাশে বাউলি-সিঁড়ি বেয়ে
শেওলা-ঢাকা জলের ধারে মেয়ে
আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে দেখ।
আঁধারটুকু ঢেকেই তুমি রেখ।

১৪ জুন ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৮-৬৯)

সূর্যের প্রণতি

বারবার কলরব শোনা যায় রাস্তায় রাস্তায়
এবং শার্শিতে ভাসে স্বচ্ছ রোদে প্রাচীন পিপাসা।
মনে হয় বুঝি কোনো মানবিক সূর্যের উদয়ে
শস্যের বাগান আর প্রাণীদেহ পরিণতি পায়
বাঞ্ছিত আকারে আর পরিপূর্ণ জৈবিক সত্তায়।
শরীরে রৌদ্রের বৃষ্টি, প্রাণেরও প্রদেশে রোদ ঝরে;
কিন্তু আসে প্রাচীন বীজাণুগুলো দেহকোষ ভরে।
রোগের বিরাম নেই, প্রাণেরও যে নেই-ক সীমানা—
উত্তমর্ণ, অধমর্ণ একই বৃত্তে খুঁজেছে ঠিকানা।
স্বদেশে, বিদেশে আর অন্য গৃহে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি;
তাই ত শরীরে-মনে আলোকের অবারিত গতি।

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে, ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।

২০ নবেম্বর  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

 

খুলো না চুলের গুচ্ছ

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারি;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
নিঃশব্দ কান্নায় ভাঙে আদিগন্ত নিরেট পাথর;
তৃষিত আকাশতলে পৃথিবীও কাঁপে থর থর।
ধূসর আকাশে সূর্য জাগে বটে অনেক প্রহর;
মৃত্যুর চোখের মত তারকারা অনন্ত ভাস্বর।
গোধূলির সীমা থেকে যদিও বা স্নিগ্ধ রাত্রি আসে
অনন্ত কান্নার স্রোত ভেঙে পড়ে আকাশে-বাতাসে
আর ঝরে আলকাতরার মত ঘন পুরু অন্ধকার
যে আঁধারে বহু আলোবর্ষ গড়ে মৃত্যুর পাহাড়।

এই বার রাখ হাত আলোকের লৌকিক হাতলে
যেখানে পৃথিবী জাগে বীজকম্প্র ফসলে ফসলে
এবং রৌদ্রের ধারা ঝরে পড়ে স্নিগ্ধ নীলিমায়
অথবা সঙ্গীত গায় বহু পাখি সবুজ আভায়।
তুমি ত দেখেছ বহু বার
উন্মুক্ত গানের নদী, অবারিত আলোকের ধার।
পাহাড়ে পাহাড়ে কাঁপে আলোকিত বরফের ঝড়;
খেতে, মাঠে, গানে গানে আলোয় আলোয় অনন্ত নির্ঝর।

খুলো না চুলের গুচ্ছ পৌরাণিক নদীটির তীরে;
আলোর মতন হাত রাখ এই আলোর শরীরে।

১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪১-৪২)

 

Le Soleil

Charles Baudelaire

 

Le long du vieux faubourg, où pendent aux masures
Les persiennes, abri des secrètes luxures,
Quand le soleil cruel frappe à traits redoublés
Sur la ville et les champs, sur les toits et les blés,
Je vais m’exercer seul à ma fantasque escrime,
Flairant dans tous les coins les hasards de la rime,
Trébuchant sur les mots comme sur les pavés
Heurtant parfois des vers depuis longtemps rêvés.

Ce père nourricier, ennemi des chloroses,
Eveille dans les champs les vers comme les roses;
II fait s’évaporer les soucis vers le ciel,
Et remplit les cerveaux et les ruches de miel.
C’est lui qui rajeunit les porteurs de béquilles
Et les rend gais et doux comme des jeunes filles,
Et commande aux moissons de croître et de mûrir
Dans le coeur immortel qui toujours veut fleurir!

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaux et dans tous les palais.

 (Charles Baudelaire 1975 : 83)