বিচারপতি হাবিবুর রহমান: মহাপ্রয়াণের পর

কিমাশ্চর্যম্! টানা আট বছর কোমায় থাকার পর গতকাল–১১ জানুয়ারি ২০১৪–পশ্চিম এশিয়ার ত্রাস জঙ্গিরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের, অনেক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করিয়া ১৯৮২ সনে লেবাননের দক্ষিণে দুই ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে বিস্তর অসামরিক নিরস্ত্র মানুষকে পাইকারী হারে হত্যা করিয়াছিলেন তিনি। শিবির দুইটার নাম শাবরা ও শাতিলা।

গায়ের জোরে তিনি রেহাই পাইয়াছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই বাবদ তাঁহাকে আজও ক্ষমা করে নাই। আমি সন্ধ্যায় এই খবরটা দেখিয়া ঘুমাইতে গিয়াছিলাম। সকালে ঘুম হইতে জাগিয়া পত্রিকায় দেখিলাম আরেক শিরোনাম: ‘আরেক এক গুণীজনের প্রস্থান’। বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেব গত হইয়াছেন গতকাল। গতকাল ছিল ১১ জানুয়ারি। কিমাশ্চর্যম্! বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ জানুয়ারি একটি আশ্চর্য দিন।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হিসাবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের জন্ম হইয়াছিল ইংরেজি ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। অতয়েব হিসাবমাফিক বলিতে তিনি ৮৫ বছর পরমায়ু পাইয়াছিলেন। আমার পরম সৌভাগ্য ২০০০ সালের পরে কোন এক সময় তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়াছিলাম। এমনকি বার কয়েক ইস্কাটনের উপকণ্ঠে ইস্পাহানি উপনিবেশে তাঁহার বাসাবাড়িতে তাঁহার মহান সান্নিধ্যও লাভ করিয়াছিলাম। সাবেক সরকার প্রধান বলিয়া তাঁহার বাসার সামনে একটি কি দুইটি পুলিশের লোক দণ্ডায়মান থাকিত।

শুমার করিয়া দেখিতেছি বয়সে তিনি আমার তিরিশ বছরের বড় ছিলেন। কিন্তু ব্যবহার দেখিয়া কখনও কখনও বুঝিতাম তিনি আমার সহিত বয়স্যোচিত আচরণই করিতেছেন। তিনি নানাবিদ্যায় এবং নানান বিদ্যায় মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। এমন কি কবিতার মতন ক্ষেত্রেও তিনি কখনও কখনও কাচা ফসল ফলাইয়াছিলেন। সাহিত্যের নানারাজ্য-পর্যটক রাজু আলাউদ্দিন তাঁহার রূপক নাম রাখিয়াছেন ‘গালিভার’। আর এক আলোক-বিশারদ সাজ্জাদ শরিফ তাঁহাকে বলিয়াছেন ‘আলোর দিশারি’। দুইটি উপাধিই যথার্থ হইয়াছে।

যখন তাঁহার পরিচয় লাভ করিয়া ধন্য হই ততদিনে তিনি সাবেক হইয়াছেন। সকলেই বলিতেন তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা।’ পত্রিকা সম্পাদকরা শুদ্ধ ব্যাকরণে লিখিতেন ‘সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।’ যতদূর মনে পড়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সহিত আমার পরিচয় ঘটাইয়া দিয়াছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। আজিকার ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার প্রথম পাতায় তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার কিয়দংশ উদ্ধার করিবার উপযুক্ত। কি কঠিন সময়ে না দেশ পরিচালনার ভার কাঁধে লইয়াছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান! তাঁহার পথ ফুলে ফুলে ছাওয়া ছিল না।

সাজ্জাদ শরিফ লিখিতেছেন, ‘বাংলাদেশের অবিশ্বাসের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সুচারুভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন।’ তাহা সত্ত্বেও স্বীকার করিতে হইবে তিনি সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। নির্বাচনে যাঁহারা সেইবার পরাজিত হইয়াছিলেন তাঁহারা নির্বাচনের পর তাঁহার বাড়িঘরে পর্যন্ত হামলা করিয়াছিলেন। কথাটা সত্যই মিথ্যা নহে।

তাঁহার অন্যতর কীর্তির কথা সাজ্জাদ শরিফ উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে: ‘এ দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বিদ্রোহ করলে জাতির উদ্দেশে এক নেতাসুলভ প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে সুসংবদ্ধ ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’ এই কথাটাও সত্য। অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

কিন্তু চাঁদেরও কলঙ্ক আছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ভরাযৌবনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষা করিবার আন্দোলনে এক প্রকার নেতৃত্ব দিয়াছিলেন। দেশ স্বাধীন হইবার পর একসময় প্রায় কুড়ি বছর ধরিয়া তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক পদে আসীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধান বিচারপতিও হইয়াছিলেন। ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’–সংবিধানের এই প্রস্তাবনার তাৎপর্য কি? তাহা কি তিনিও ধরিতে পারেন নাই? সমালোচকরা বলিতেছেন তিনিও রাষ্ট্রভাষায় আদালতের রায় বিশেষ লেখেন নাই। কেন এমন হয়?

উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রবর্তনে তাঁহার ভূমিকা তিনি পালন করিয়াছেন। তবে পরে। অবসর গ্রহণের পরে তিনি অনেক প্রবন্ধে এই বিষয়ে তাঁহার মতামত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখিয়াছেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের মত বাংলাদেশে আদালতের ভাষাও বাংলা হওয়াই উচিত। দুঃখের মধ্যে এদেশের বিচার বিভাগে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও অবাধ হয় নাই। তাহার দায় একা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের উপর চাপান ঠিক হইবে না। তবে একথা ঠিক যে লোকে তাঁহার কাছে কিছু বাংলা রায় উদাহরণস্বরূপ আশা করিত।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাটা নিজে ভাল লিখিতেন। তাঁহার লেখা যে বহিটির সহিত আমার প্রথম পরিচয় ঘটে সেই বহির নাম যথাশব্দ। বইটা ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী হইতে বাহির হইয়াছিল। এই বহির লেখক হিসাবে তাঁহার নামযশ আমি এখনও করিতেছি। অনেক দিনই করিব। এই জাতীয় বইকে ইংরেজিতে ‘থেসরাস’ বলা হয়। তাঁহার লেখা বাংলা থেসরাসটি বেশ উপকারী বই হইয়াছিল। তিনি বাংলা ভাষাটাও খুঁটাইয়া পড়িতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা তাঁহার প্রিয় ছিল–একথা বলাই বাহুল্য। শেষ বয়সে–আমাকে একবার বলিয়াছিলেন–তিনি চীনা ভাষাও শিখিতেছিলেন।

সমালোচকরা তাঁহার দুইটি দোষ ধরিতেন। একেত তিনি বেশি লিখিতেন। দ্বিতীয়ে অন্যের লেখা হইতে অধিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করিতেন। কেহ কেহ এমন অভিযোগও করিয়াছেন তিনি উদ্ধৃতি না দিয়াও অন্যের লেখা কখনও কখনও ব্যবহার করিতেন। দৃষ্টান্তের মধ্যে পরলোকগত মহান লেখক আহমদ ছফা আমাকে একবার একথাটি বলিয়াছিলেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতি রোমন্থন করিয়া আহমদ ছফা যে বইটি লিখিয়াছিলেন তাহার নাম যদ্যপি আমার গুরু। ইহা হইতে কোন কোন অংশ হাবিবুর রহমান সাহেব তাঁহার লেখায় চাকা চাকা ব্যবহার করিয়াছেন। অভিযোগটির সত্যতা আমি যাচাই করিয়া দেখি নাই। তবে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেবের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছিল ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘লিবারেল’ তাহার প্রমাণস্বরূপ। বাংলায় এই শব্দটির প্রচলিত অনুবাদ ‘উদারনৈতিক’। লিবারেল অর্থ যাঁহারা লিবার্টি বা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজম এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত। এই গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল মামলার আপীলের যে রায় ১৯৯৪ সালে দেওয়া হইয়াছিল তাহাকে উদারনৈতিক ব্যবহারশাস্ত্রের পরাকাষ্ঠা বলা যায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমানও এই মামলার অন্যতম বিচারক–সত্য বলিতে প্রধান বিচারক–ছিলেন। এই মামলায় গোলাম আজমের নাগরিকত্ব মঞ্জুর করা হইয়াছিল। প্রকাশ থাকে যে গোলাম আজম সাহেব ১৯৭৮ সাল হইতে বিনা ভিসায় বিনা নাগরিকত্বে বাংলাদেশে অবস্থান করিতেছিলেন। ১৯৯৪ সাল নাগাদ তিনি নাগরিক হইলেন। ইহার সামান্য কৃতিত্বে বিচারপতি হাবিবুর রহমানেরও ভাগ আছে।

এই মামলায় মাননীয় বিচারপতিরা যে সিদ্ধান্ত লইয়াছিলেন তাহার গোড়ায় একটি চিন্তা কাজ করিতেছিল। সেই চিন্তা অনুসারে, নাগরিকত্ব জিনিশটা জন্মের–অর্থাৎ প্রাণীবিজ্ঞানের–বিষয়। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুসারে নাগরিকত্ব জিনিশটা কর্মের–কৃতকর্ম বা রাজনৈতিক ব্যবহারের–বিষয় বটে। যাহারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহিত সহযোগিতা করিয়াছিলেন–মায় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী–তাহাদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার বাতিল হইবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সামান্য তত্ত্ব যাহা ‘সমাজচুক্তি উপপাদ্য’ নামে পরিচিত–অন্তত সপ্তদশ শতাব্দী হইতে যাহা আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি বলিয়া গণ্য–তাহাতে সাব্যস্ত আছে যে যুদ্ধাপরাধীর নাগরিকত্ব বাতিল হইতেই পারে।
কিন্তু সেদিন–১৯৯৪ সালে–বাংলাদেশের বিচারপতিরা অন্য চিন্তা করিতেছিলেন। মনে হইতেছে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের পবিত্র স্মৃতির তলায়ও এই শ্যামল ছায়াটি পড়িয়াই থাকিবে। কতদিন থাকিবে কে জানে!

১২ জানুয়ারি ২০১৪

১২ জানুয়ারি ২০১৪, bdnews24.com

জেনারেল এরশাদের রাজনীতি লইয়া আহমদ ছফার দুইটি নিবন্ধ

পরলোকগত মনীষী মহাত্মা আহমদ ছফা ইংরেজি ২০০০ সালের আগায় ও ২০০১ সালের গোড়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে মুখ্য বিষয় করিয়া দুই দুইটি নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। লেখা দুইটি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল যথাক্রমে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। দ্বিতীয় নিবন্ধটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পরলোকগমন করেন। বলা প্রয়োজন লেখা দুটি এখনও আহমদ ছফার রচনাবলিতে যোগ করা হয় নাই।

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেক সময় নিজের হাতে লিখিতে পারিতেন না। কিম্বা লিখিতে চাহিতেন না। তাঁহার তিনদিকে জড় হওয়া তরুণতরুণীরা অনেক সময় শ্র“তি লিখিতেন। এখানে উৎকলিত প্রথম নিবন্ধটির শ্র“তি লিখিয়াছিলেন মেকী খীসা। দ্বিতীয় লেখাটির শেষে এমন কাহারও নাম লেখা আছে কিনা দেখা যাইতেছে না। অধুনালুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ কর্তৃপক্ষের ঋণস্বীকার করিয়া আমরা লেখা দুটি নতুন করিয়া এখানে ছাপাইতেছি। ছাপার সময় আমরা কিছু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধন করিয়াছি। কোন কোন জায়গায় বানানরীতির সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংশোধন আবশ্যক হইয়াছে আর কোথাও কোথাও সঙ্গতিবিধানের জন্য একটা দুইটা শব্দ যোগ করা হইয়াছে। সংযুক্ত শব্দগুলি তৃতীয় বন্ধনীযোগে দেখান আছে।

 3

এই দুই নিবন্ধযোগে মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গোড়ার গলদ চোখে বুড়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছিলেন। এই আদি গলদের প্রকাশ্য লক্ষণ বা আলামত আকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের নাম লওয়া যায়। জেনারেল এরশাদ ১৯৮০ সালের দশকটার বলিতে গেলে প্রায় পুরাটা জুড়িয়াই বাংলাদেশ শাসন করিয়া তটস্থ রাখিয়াছিলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন একটি পূর্বঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থানের দৌলতে। আর ১৯৯০ ইংরেজি নাগাদ একধরনের ব্যাপ্তিতে জনপ্রিয় অথচ ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্যস্থতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন। তবে সকলেই জানেন সেই অভ্যুত্থানে তিনি নিহত কিম্বা নির্বাসিত কোনটাই হন নাই। তাঁহাকে কিছুদিন একটি কারাগারে রাখা হইয়াছিল।

কারাগার জায়গাটা বিশেষ সুখের জিনিশ নহে। তাই বেশিদিন না যাইতেই জেনারেল এরশাদ রাজনীতিতে ফিরিয়া আসিলেন। শুদ্ধ আসিলেন বলিলে যথেষ্ট বলা হইবে না। তিনি রীতিমত পুনর্বাসিতই হইলেন। পর পর দুইটি সংসদীয় নির্বাচনে তাঁহার দল গর্ব করিবার মতন অনেকগুলি আসনে জয়লাভ করিল। লোকের মনে প্রশ্ন দেখা দিল — এরশাদ সাহেবের এই শক্তির উৎস কোথায়?

আহমদ ছফা এই নিবন্ধে এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসংগত উত্তর দিয়াছেন। ১৯৯০ সালের পর যে দুই দুইটি চাঁদ — যাঁহাদের নাম যথাক্রমে হাসিনা ও খালেদা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে পালা করিয়া উদিত হইয়াছেন, তাঁহাদের সামনে ধ্র“বনক্ষত্রের জ্যোতির মতন জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামবাহী এই বিশেষ রাজনীতিবিদটি। এখানে উৎকলিত প্রবন্ধদ্বয়ের প্রথমটিযোগে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে রাজনীতির মধ্যেই।’

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নিবন্ধ দুটি লেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা আহমদ ছফা এই ধুলির ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ আজও — এই ভূমিকা মুসাবিদার ক্ষণ ২০১৩ ইংরেজির ডিসেম্বর মাসেও — বাঁচিয়া আছেন। নিছক বাঁচিয়াই নহেন, দিব্যই আছেন। কেন এবং কিভাবে আছেন তাহার জবাবে নানান মুনি নানান মত প্রকাশ করিবেন একথা নিশ্চিত জানি। আমাদের হাতে আহমদ ছফার যে মতটি আছে তাহাও — কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে — বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আহমদ ছফার কথা আমরা যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি তো বলিব তিনি বলিয়াছেন এরশাদ সাহেবের পতন হইলেও তিনি যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রতিনিধি প্রকৃত প্রস্তাবে সেই স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় নাই। তাহা একটা বেসামরিক লেবাস পরিয়াছে মাত্র।

এখানে উৎকলিত প্রথম প্রবন্ধে — অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ — আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত এইরকম: ‘আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসাবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন।’ আহমদ ছফার এই সিদ্ধান্তের সহিত যাঁহারা একমত হইবেন না, তাঁহারাও নিচের বাক্য দুইটি পড়িয়া বিশ্বাস করি ক্ষণকাল তিষ্ঠাইবেন। আর নিঃশ্বাস চাপিয়া বলিবেন, সাধু! সাধু! তিনি লিখিয়াছেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজস্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে।’

মাস ছয়েক পর অর্থাৎ ২০০১ সালের গোড়ায় প্রকাশিত দ্বিতীয় নিবন্ধযোগে আহমদ ছফা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না।’ সেই দিন আহমদ ছফা যে পরিস্থিতি দিব্যচোখে দেখিতে পাইয়াছিলেন আজ — এক যুগ পর — আমরা তাহা দানবের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতে বাধ্য হইতেছি। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।’ আর আজও আমরা বলিতে পারিতেছি না সংকট কাটিয়া যাইতেছে।

৮ জানুয়ারি ২০১৪, সর্বজন: নবপর্যায় ৩৬

যুদ্ধ ও শান্তি : তলস্তয়ের উপসংহার

[এই রচনাটি প্রথম দফা প্রকাশিত হইয়াছিল দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ‘শান্তি’ শীর্ষনামক একটি  বিশেষ (১২ এপ্রিল ২০০৪) সংখ্যায়। এখানে লেব তলস্তয়ের ‘হাজী মুরাদ’ কাহিনীর অল্পবিস্তর একটু উল্লেখ আছে। হাজী মুরাদ প্রসঙ্গে ইহার দুই মাসের মাথায় আমি মহাত্মা তলস্তয়ের ‘হাজী মুরাদ’ কাহিনী প্রসঙ্গে আরেকটা নিবন্ধও লিখিয়াছিলাম। কবুল করিতে হইবে, দুই নিবন্ধের মধ্যে একটু পুনরাবৃত্তি দোষ ঘটিয়াছে। বর্তমান প্রবন্ধের গদ্যরীতিও—বলা বাহুল্য—যেমন ছিল তেমনই রাখিয়া দিয়াছি। তবে স্থানে স্থানে পরিমার্জনার সুযোগটা গ্রহণ করাই বিধেয় মনে হওয়ায় তাহা করিতে কসুর করি নাই।—২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ]

‘শান্তি’ বিষয়ে কোন কাগজের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ সত্যই সুখের বিষয়। পত্রপত্রিকার সামান্য সংখ্যা সচরাচর—দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করা দরকার—যুদ্ধ, নৈরাজ্য আর অশান্তি নিয়েই ব্যাপ্ত। ‘শান্তি’ সকলেই চায়, অন্তত কথায় কথায়। কিন্তু কে জানে ‘শান্তি’ কোথায় পাওয়া যায়! এর উত্তর পাওয়া সহজ নয়। সান্ত্বনার একমাত্র কথা সম্ভবত এই—শান্তিরও একটা চাহিদা আছে। অন্তত আজ পর্যন্ত এই চাহিদা ষোল আনা ফুরায় নাই। এই হক কথাটা ধরেই আমি এগুতে চাই।

এয়ুনানের বিখ্যাত মনীষী আফলাতুন তাঁর অতি বিখ্যাত ‘রাষ্ট্র’ (ওরফে ‘রিপাবলিক’) নামক কেতাবে জাহির করেছেন এই দুনিয়ায় মানুষের জগতে অশান্তির প্রধান কারণ ক্ষুধা নয়, বিলাসিতা। তাঁর বিচার মোতাবেক যে দেশে দশের নিত্যচাহিদা বা প্রয়োজন মেটানোর পর বাড়তি কোন ধনদৌলত জমা থাকে না সে দেশে যুদ্ধ—অন্তত যুদ্ধের কারণ—থাকে না। যখনই ধনদৌলতের প্রাচুর্য বা বিলাসদ্রব্যের চাহিদা দেখা দেয়—যে দ্রব্যাদি যা নিজ দেশে তৈরি করা সম্ভব নয়—তখনই আশপাশের দেশে—অর্থাৎ পরের জায়গা পরের জমিনে—চোখ যায়। যখন পরদেশি মজুর ধরে বা ডেকে আনতে হয় তখনই যুদ্ধের কারণ দেখা দেয়।

আর কে না জানে যুদ্ধ ও শান্তি একে অপরের বিপরীত ধর্ম? আপনি অবশ্য বলতে পারেন যুদ্ধ তো শান্তির দোসরই। এক অর্থে আপনার কথাটা ব্যর্থ নয়। একমাত্র যুদ্ধই কায়েম করতে পারে শান্তি। সওয়াল করা চলে, তো সে শান্তি স্থায়ী হয় না কেন? এখানেই জন্ম হয় আরেকটি সওয়ালের: ন্যায় কিংবা ইনসাফ কি বস্তু? যুদ্ধ যদি সত্যই শান্তির জননী হয়, তো পালা করে বলতে হয় যুদ্ধের জনকও শান্তিই। বাদ ও প্রতিবাদ, প্রতিবাদ ও বাদ ক্রমে গড়ায়, গড়াতে থাকে। এই চক্রাবর্তের একটা মীমাংসা চাই। এই মীমাংসার ওয়াস্তেই গ্রিক দার্শনিক আফলাতুন ন্যায়ের কথা তুলেছিলেন। অন্যায় আর শান্তি একে অপরের সতীন তারা এক ঘরে এক দেশে বাস করতে পারে না—এই তাঁর রায়।

হেকিম আফলাতুন নিজেও স্বীকার করেছিলেন বিলাসী চাহিদার দেশ কোনদিন আদিম সাম্যের জগতে ফেরত যাবে না। অতয়েব একমাত্র উপায় ন্যায়ের কথাটা পাড়া। শান্তির প্রধান পাণ্ডা ন্যায়। ন্যায় পদার্থটা নাই বলেই ‘অশান্তির রাজা’র শাসনে মানুস বসবাস করে। এক্ষণে প্রশ্ন দাঁড়ায়—ন্যায় কোথায় পাই। উত্তরে বলতে হয়—যেখানে দেখিবে ছাই। যেমন এই বাক্যেও ‘ন্যায়’ পাবেন: ‘আমি দেখতে বাবার ন্যায়’।

কথিত আছে মানুষই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। প্রাচীন ধর্মের বিধানেও মানুষের নামে এই দাবিটা জাহির করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে ‘শ্রেষ্ঠ’ মানে কি? এর মানে ‘নিকৃষ্ট’ও করা চলে? ভারতবর্ষের পুরানা ঋষিরা বলেছিলেন, প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট কোনটাই নয়, সবচেয়ে বেশি ‘বিস্ময়কর’ জীব সে। মানুষ মাত্রই জানে সে মরবে। এই তার ‘জ্ঞান’। কিন্তু মানুষ মাত্রেই এমন ভাবে চলে—কাজ করে—যেন কোনদিন সে মরবে না। মানুষ পদার্থের এই ‘অজ্ঞান’ ভাবকেই খুব সম্ভব হিন্দুস্তানের বড় কবিরা—যেমন মহাভারতের মহামনীষীরা—‘মানুষ’ পদে বরণ করেছিলেন। সেই সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর জীব। আমার সন্দেহ হয়, মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ আর শান্তির সম্পর্ক বিষয়েও একই অনুমান করা চলবে।

মানুষ শান্তির কথা বলবে কিন্তু করবে যুদ্ধ। মানুষ ন্যায়ের কথা বলে, কিন্তু করে অন্যায়। শুদ্ধ মানুষজাতির কথা বললে হয়ত এই গোলকধাঁধার কুলকিনারা পাওয়া যাবে না। যদি বা আলাদা আলাদা মানুষের কথাও পাড়ি সমস্যার সুরাহা হবে না। কারণ যে মানুষ আজ শান্তির কথা বলছে সেই কাল আবার অশান্তি বাধাচ্ছে। যে অন্যায় করে সেও চিরদিন অন্যায় করে না। আমরা এখন ‘বিশেষ’ মানুষের কথা বলছি না। আমরা সামান্য মানুষ, তাহলে দাঁড়াই কোথা?

শান্তি কি পদার্থ তা কিন্তু আমরা এখনও বলিনি। বিশেষ বিশেষ মানুষের দল কি বলে আমরা তা পরে দেখব, কিন্তু সামান্য মানুষ বলে, যুদ্ধ মানেই অশান্তি। সুতরাং শান্তি মানে অযুদ্ধ বা যুদ্ধের অভাব। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে, শান্তির এই সংজ্ঞাটাও বা যুক্তিসই পদার্থ নয়। যুদ্ধ বাধার পূর্বক্ষণের কথাটা ধরা যাক। যাকে বলে সশস্ত্র শান্তি ওরফে (ইংরেজি ভাষায়) ‘আর্মড পিস’। যুদ্ধ বাধার পূর্বক্ষণে শান্তি আছে তবে সে শান্তি স্থায়ী নয়। স্থায়ী শান্তির স্বপ্ন ও ন্যায়বিচারে যোগাযোগ কোথায়? এই সওয়ালটা এক্ষণে বিবেচনা করা যায়।

রুশ মনীষী লেব তলস্তয় শুনেছি তাঁহার গদ্য মহাকাব্য ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ বইটির অন্য একটা নামও রেখেছিলেন একবার। সে নাম বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ—‘সব ভাল তার শেষ ভাল যার’। ঐ বইয়ে মহাত্মা তলস্তয় যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল নিয়ে তদন্ত আর বিচার দুটাই অনেকদূর করেছিলেন। তলস্তয়ের যুক্তি মতে, যুদ্ধের পক্ষে কোন যুক্তিই নাই। তবু নাপোলেয়ঁর মতন বড় যোদ্ধারা কত যুক্তির মোড়কেই না যুদ্ধের অযুক্তিটা পেশ করেছিলেন। কোন প্রকার যুক্তির তোয়াক্কা না করেই যে কাজটা করা হয় তার পক্ষে যুক্তির সমর্থন যোগাড় করার চেষ্টাকেই তলস্তয় বলতেন, পরম বিস্ময়ের বস্তু। মনে হতে পারে আবারও সেই জ্ঞান ও অজ্ঞানের খেলা।

মানুষের এই যুদ্ধ বিলাসিতার সত্য ব্যাখ্যা তলস্তয়ও খুঁজে পাননি। তলস্তয় ভেবেছিলেন দেশের সাধারণ মানুষ, তাঁর আপন ভাষায় চাষীসমাজই, সভ্য সমাজের চালিকাশক্তি। অতয়েব তাদের কায়দা-আকিদা ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যেই মানব জাতির বিকাশের নিয়ম। যুদ্ধবিগ্রহও তার অন্তর্গত নিয়মেই চলে। বড় বড় যোদ্ধা সেনাপতি, আর রাজা-মহারাজারাও ইতিহাসের নিয়ামক নন, ক্রীড়নক মাত্র।  ফলে নতুন নতুন প্রশ্ন জাগে: ইতিহাসের নিয়ামক কে বা কোন বস্তু?এই নিয়ামক শক্তির মুখপাত্রস্বরূপ যাঁরা ইতিহাসে প্রকাশিত তাঁরাই নিয়ামক। এটুকুই আমরা ধরে নিই। শেষ বয়সে লেখা ‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসে এই সত্য প্রচারের একটা চেষ্টা করেছিলেন তলস্তয়। এই উপন্যাস তিনি লিখেছিলেন শেষ বয়সে—‘যুদ্ধ ও শান্তি’র মতো ঠিক ভরাযৌবনে নয়। বর্তমানে যে সকল যুদ্ধকে আমরা বলি ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ সেই সব নতুন যুদ্ধ ঘটা করে শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার ওলন্দাজ বসতির বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের যে যুদ্ধকে এ যুগের বইপত্রে ‘বুয়র যুদ্ধ’ বলা হয় শুদ্ধমাত্র তা মহরতের খবর পাওয়ার পরই তলস্তয় ‘হাজী মুরাদ’ লেখা শুরু করেন।

জানা গিয়াছে, ‘হাজী মুরাদ’ বইয়ের আরও দুটি খসড়া নাম রেখেছিলেন তলস্তয় ‘কাঁটা’ এবং ‘জেহাদ’। তলস্তয়ের মতে, চাষী-সমাজ জমির অধিকার লাভের জন্য যে যুদ্ধ করে তাকেই ‘জেহাদ’ বলে। রুশ সাম্রাজ্যের অধিকার ভুক্ত চেচনিয়ার চাষীরা লড়ছিল নিজেদের দেশের জমির ওপর নিজেদের অধিকার বজায় রাখতে। কাউকে কর-খাজনা না দিয়ে নিজ বাসভূমে বসবাস করতে এবং নিজেদের জমির ফলানো ফসল নিজেরাই ভোগদখল করতে। চেচনিয়ার কৃষক-সমাজ রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সারা উনিশ ঈসায়ী শতক জুড়ে লড়াই করেছে। তাদেরই তৎকালীন এক যোদ্ধা নেতার নাম হাজী মুরাদ। তলস্তয় এই ভদ্রলোকের জীবন ও আদর্শের আশ্চর্য দরদি বর্ণনা পেশ করেছেন। চেচনিয়ার যুদ্ধকে তলস্তয় ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে মহীয়ান করেননি, বলেছেন এ লড়াই ‘চাষীর লড়াই’। জেহাদের সাথে যুক্ত ধর্মযুদ্ধ নয়, কৃষক যুদ্ধ। তলস্তয়ের এই অন্তর্দৃষ্টি কম সমীহ জাগানোর মত নয়।

তলস্তয় রচিত হাজী মুরাদের চোখে ইসলাম এই রকম : ‘… প্রথমে ছিলেন মোল্লা মোহাম্মদ। তাঁকে আমি চোখে দেখি নাই। তিনি পাক মানুষ। তিনি বলতেন ‘হে আমার জাতি, আমরা মুসলমানও নই, খ্রিষ্টানও নই, আমরা মূর্তিপূজাও করি না। ইসলামের সত্য আইন এই রকম: কোন মুসলমান জাতির ওপর অমুসলমানের রাজত্ব চলে না। কোন মুসলমান অন্য কোন মানুষের গোলাম হতে পারবে না। মুসলমান কাউকে কর দেয় না, এমনকি অন্য কোন মুসলমানকেও সে কর দেয় না।’ তলস্তয়ের এই বড় চোখেও হাজী মুরাদ একসময় ‘মৌলবাদী’ বলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তলস্তয় জানতেন, মুরাদের লড়াই চেচেন চাষীদের মুক্তির লড়াই। আমরা একপ্রকার আবিষ্কার করি শেষ পর্যন্ত মুরাদকে রুশ মনীষীও ভালবেসেছিলেন।

হাজী মুরাদের ট্রাজেডি আর সাধারণ কৃষকের ট্রাজেডি আদতে এক জিনিশই—এই প্রতিজ্ঞাটা প্রমাণ করার জন্য তলস্তয় দেখান কৃষক মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক ও প্রধান সমস্যাটা কোন জায়গায়। হাজী মুরাদের পথ দুদিক থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। সে যদি চেচেনদের রাজা শামিলের দলে যোগ দেয়, তো তার ইজ্জত-গৌরব হবে কিন্তু চেচেন কৃষক, তার আপন জাতির মানুষ তো যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে। জালেমি শাসনের অবসান হবে না। অপরপক্ষে সে যদি শাদা জার অর্থাৎ রুশ সম্রাটের কাছে আত্মসমর্পণ করে তো তার টাকাপয়সা হবে, নামধাম চারদিকে ছড়াবে, কিন্তু চেচেন চাষীর জমি রুশ সৈন্যসামন্ত। উপনিবেশবাদের পায়ের তলায় আরো দেবে যাবে। জার এক নম্বর নিকোলাস যে কিসিমের শয়তান, চেচেনদের নেতা শামিলও সেই গোছেরই শয়তান আর সেই কারণেই হাজী মুরাদ ঐ মুহূর্তে শামিলের বাহুডোর থেকে জারের আলিঙ্গনে ধরা দিতে ঘোড়া ছোটান। পথে যেতে যেতে তিনি দেখেন একটি ছুটকা রুশ সৈন্য জারের সেনাবাহিনী ছেড়ে পালাচ্ছে। সে সৈন্যটিও রেহাই পায় নাই। রুশ সেনাবাহিনীর বুলেটে নয় চেচেন যোদ্ধাদের গুলিতেই সে মারা পড়ে। বিশ্বাসহন্তার কলঙ্ক তাকে ছোঁবার সুযোগ পায় না।

‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসে তলস্তয় দেখাচ্ছেন, চেচেনিয়ার চাষী আর রুশিয়ার চাষী দুজনারই দুশমন এক ও অভিন্ন একজনই—রুশ স্বৈরতন্ত্র। এই স্বৈরতন্ত্র চেচেন চাষীর যব, ভুট্টাদি ফসল কাটতে বাধা দেয়। একই স্বৈরতন্ত্র রুশ চাষীর হাতে তলোয়ার, আর কাঁধে-পিঠে বন্দুক দিয়ে ককেসাস জয় করতে পাঠায়। জারের বিরুদ্ধে হাজী মুরাদের শেষ যুদ্ধ—তলস্তয় দেখাচ্ছেন—রুশের বিরুদ্ধে চেচেনের যুদ্ধ নয়। হাজী মুরাদের দুশমনরাও দেখা গেল জাতে চেচেনই—রুশ সরকারের হয়ে সেই রাজাকার চেচেনরাই তাঁর প্রাণ নিয়েছে। তলস্তয়ের মতে রুশ জারের বিরুদ্ধে চেচেন মুরাদের যুদ্ধ, রুশের বিরুদ্ধে অতি রুশের, চেচেনের বিরুদ্ধে অতি চেচেনের যুদ্ধ—অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও বিচারের যুদ্ধ। গোলামের শান্তির চেয়ে এই ধরনের যুদ্ধ ভালো নয়—বেহতর—কি? মনে হয়—এই প্রশ্নটাই তলস্তয়কে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

ন্যায় সততই সুন্দর এবং ন্যায়ই শেষ বিচারে সত্য। হাজী মুরাদের ছবি এই সত্য ও সুন্দর দিয়ে রাঙ্গা করেছেন তলস্তয়। হাজী মুরাদের মৃত্যুর একটুক্ষণ মাত্র আগে তার মনে পড়ে এইরকম ফাঁড়ায় পড়েই পূর্বসূরী এক যোদ্ধা হামজাও মারা গিয়েছিল। তলস্তয় সে কাহিনী ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতিতে স্মরণ করেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হবার পূর্বক্ষণে ততক্ষণে গভীর ভোর হয়েছে—যাকে বলে সুবেহ সাদেক তার আলো ফুটেছে। হামজার নজর যায় কয়েকটা পাখির দিকে: ‘পাখিরে পাখি, পথিক পাখি, যাও পাখি গিয়ে বলো, আমাদের মা-বোন, আমাদের মেয়েছেলেদের গিয়ে বলো, আমরা সকলেই প্রাণ দিয়েছি জিহাদে, ন্যায় যুদ্ধে। ওদের বলো আমাদের লাশ কবরে পড়ে থাকবে না। আমাদের হাড্ডি খুলে চেটে চেটে খাবে লোলুপ নেকড়ে বাঘে, আর আমাদের চোখ উপড়ে ঠুকরে খাবে কালো কালো কাউয়ায়।’

তলস্তয়ের বাড়িতে—ইয়াসনায়া পলিয়ানা ওরফে উজ্জ্বলাবাদে—একটা পাঠশালা ছিল। শোনা যায় ওই পাঠশালার ছাত্রছাত্রীরা—এরা সকলেই ছিল চাষা পরিবারের—একবার পথে হাঁটতে হাঁটতে তলস্তয়ের কাছে জানতে চেয়েছিল: ‘মানুষ গান গায় কেন?’ উত্তরে মহাত্মা তলস্তয় ঠিক কি বলেছিলেন জানা যায়নি। কিন্তু হাজী মুরাদ বইয়ে নাকি সেই প্রশ্নের উত্তরটাই লেখা হয়েছে। ‘মানুষ গান গায়, কারণ গান মানুষকে শেখায় মানুষের মত বাঁচতে, গোলাম না বনতে। গান শেখায় লড়াই করতে, লড়াই চালিয়ে যেতে, শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে। এমন কি সঙ্গের শেষ সঙ্গী যোদ্ধাটিরও যখন পতন হয় তখনও লড়াইটা না থামাতে। শুদ্ধ এই লড়াইয়ের মধ্যেই শান্তি আছে।’

হাজী মুরাদও শেষ পর্যন্ত লড়াই থামান নাই। তাই ন্যায় যুদ্ধের উদ্দেশ্যে তলস্তয়ের শেষ প্রণামের নাম ‘হাজী মুরাদ’। সেখান থেকেই আমাদের প্রশ্নের একটা উত্তর হয়ত জোগাড় করা যায়। মানুষ গান গায় যে কারণে সে কারণে সে শান্তিও চায়। শান্তি মানে যুদ্ধের অভাব নয়। যুদ্ধের অভাব থেকে আসতে পারে আরও যুদ্ধ, আরও অশান্তি। অতয়েব শান্তির রক্ষাকবচ একমাত্র ন্যায় যুদ্ধই। হাজী মুরাদ—তলস্তয় বলেছেন—শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু পরাজিত হন নাই। আমাদের যুগেও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপোসের মধ্যে শান্তি নাই—শুদ্ধমাত্র ন্যায় যুদ্ধেই শান্তি আর বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। মাত্র এই কড়ারেই শান্তির পরাজয় নাই।

দোহাই

১. Victor Shklovsky, Lev Tolstoy, O. Shartse, trans. (Moscow: Progress Publishers, 1978)|

২. Plato, The Republic of Plato, A. Bloom, trans. (New York: Basic Books, 1968)|

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, এনটিভি

মানুষ গান গায় কেন: লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ প্রসঙ্গে

[এই ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম মহাত্মা লেব তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ উপন্যাসের শতবর্ষ উপলক্ষে—আজ হইতে কমপক্ষে চৌদ্দ বছর আগে—ইংরেজি ২০০৪ সালের প্রথম ভাগে। ‘সূর্যতরু’ নামক একটি প্রায় অপরিচিত পাক্ষিক পত্রিকার এক সংখ্যায় (বর্ষ ২, সংখ্যা ৬, জুন ২০০৪) লেখাটি পত্রস্থও হইয়াছিল। সম্প্রতি লেখাটির সহিত আকস্মিক দেখা হইল আরেকবার। ২০০৪ সালের মুদ্রিত সংস্করণে কিছু ছাপার ভুল ছিল। সেইগুলি সংশোধন করিতে বসিয়া আরো কিছু পরিমার্জনা করিবার সুযোগ পাইলাম। কিন্তু লেখার মূল কাঠামো বদলাইয়া লিখিবার অবকাশ আর হইল না। ঐ সময়ে যে রীতির গদ্য মকেশা করিতাম অনেকদিন হয় তাহা হইতে সরিয়া গিয়াছি। কিন্তু পুরানা দিনের গদ্যরীতিটা স্মৃতিস্বরূপ রাখিয়াই দিলাম। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮।]

এ বছর মহাত্মা লেব তলস্তয় রচিত ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর ১০০ বছর পূর্ণ হলো। তলস্তয় ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটি লেখা শেষ করেছিলেন ইংরেজি ১৯০৪ নাগাদ। লেখকের জীবদ্দশায় গল্পটির প্রকাশ কেন সম্ভব হয়নি, তা কাহিনীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পৌঁছলে স্পষ্ট হয়। তলস্তয় এন্তেকাল করেন ১৯১০ সালে। এক বছর পর ১৯১১ সালে গল্পটির প্রথম প্রকাশ। এ গল্পের একাধিক ইংরেজি তর্জমা পাওয়া যায়। রচনার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি আরো একটি নতুন অনুবাদ হাতে পেলাম। ১৯৮৪ সালে অশীতিপর মহাত্মা আকবরউদ্দীন গল্পটির একপ্রস্ত প্রাঞ্জল বাংলা তর্জমা প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমান নিবন্ধের সুবাদে ভদ্রলোকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আজ শান্তি ও প্রীতির বাণী নিবেদন করছি।

তলস্তয় বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের ধারণা, ‘হাজি মুরাদ’ গল্পটির আরো দু-দুটি বিকল্প নাম তলস্তয় চিন্তা করেছিলেন— একটি নাম ‘কাঁটা,’ অন্যটি ‘জেহাদ’। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়তো চোখের পাতা কুঁচকে বলবে, ‘জেহাদ’! আবার জেহাদ কেন? এ সহূদয় পাঠক-সুহূদদের বরং ধৈর্য ধরার আবেদন জানাব আমি। তলস্তয়ের ব্যাখ্যা অনুসারে জেহাদ বলে সেই লড়াইকে, যে লড়াইয়ের মধ্যস্থতায় কৃষক আপনকার জমিজমার ওপর আপনার অধিকার কায়েম করে আর আপন জমির ফসল আপনার দখলে রাখে। তলস্তয়ের মতে, জেহাদ নিছক ধর্মযুদ্ধ নয়, জেহাদ বলতে চাষীর লড়াই বা কৃষকযুদ্ধ বুঝতে হবে। লেব তলস্তয়ের হাজি মুরাদ এমনই কৃষকযুদ্ধের নায়ক বিশেষ।

প্রশ্ন হলো কৃষকের অধিকার আর কৃষকের ধর্ম যেখানে একাকার, যেখানে কৃষক নিজেই নিজের লড়াইকে জেহাদ বলে অভিহিত করে, সেখানে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোন অধিকারবলে এ ন্যায়বোদ্ধা কৃষকদের ধর্মান্ধ কি মৌলবাদী বলে গাল দেবেন? ‘হাজি মুরাদ’ কাহিনীর সারাংশ ধরে আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারব। জানা যায়, লেব তলস্তয় গোটা নয়-নয়টি বছর ধরে— মানে ১৮৯৬ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত— এ গল্পের মুসাবিদা করেছিলেন। এ সময়ের মধ্যে লেখা একটি খসড়ায়— যা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত সংস্করণে খুঁজে পাওয়া যায় নাই— তলস্তয় যে কথা লিখেছিলেন, তাতে গল্পের গোড়াটা ভালোমতোই পাওয়া যায়।

১৮১২ সালে খান শাসিত অবার দেশের খুনজাক জেলার দুই ভদ্রমহিলা একই রাতে দুটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এদের একজন স্বয়ং শাসক খান সাহেবের স্ত্রী: পাকু বিকে তার নাম। আরেকজনের নাম ফাতেমা। ফাতেমা পাহাড়িয়া কোনো এক সাধারণ কৃষকের বেগম। খান সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে ফাতেমার ঘনিষ্ঠ চেনা-পরিচয় ছিল, ফাতেমাকে তিনি নিজ পুত্রসন্তানের দাই মা নিয়োগ করেন। ফাতেমার দুঃখ এই, তাকে খান সাহেবের ছেলেকে দুধ খাওয়াতে হয়, আর তার নিজের ছেলেটা (দুধের অভাবে) মারা যায়। ফাতেমা বেগম খুনজাক জেলার খানম সাহেবার সখী বটেন। এদিকে ফাতেমার বড় দুই ছেলে ওসমান আর হাজি মুরাদ ওই খানের প্রাসাদেই বড় হয়। তারা খান সাহেবের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা আর ঘোড়ায় চড়া যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করত।

এ রকম একটি সাধারণ পরিবারে, তথাকথিত ছোটলোক সমাজে হাজি মুরাদের জন্ম। নিজের ছেলেদের ভাগের শেষ দুধটুকুন খান সন্তানদের খাওয়াব না— এই দাবিতে মুরাদের মা অনেকবার অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। একবার এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে আপন স্বামীপ্রবর তাকে খুন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন, ছোরার আঘাতে গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছিলেন। এমন মায়েরই পেটের ছেলে হাজি মুরাদ। একদিন বড় হয়ে আপন জাতির মুক্তির জন্য যুদ্ধবিগ্রহে যোগ দেয় সে, প্রাণবাজি লড়াই করে। কপাল তার মন্দ, যুদ্ধে সে আহত হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ল। কিন্তু আত্মসমর্পণ করল না। কে এই বীর! কত তার হিম্মত! এ প্রশ্নের উত্তরেই তলস্তয়ের ছোট্ট উপন্যাস ‘হাজি মুরাদ’।

১.

ককেসাস পর্বতের ছায়ায় ঘেরা চেচনিয়া হাজি মুরাদের দেশ। এ ককেসিয়া মহাদেশের ইতিহাস বড়ই জটিল, বড়ই ঝঞ্ঝাপূর্ণ। পয়গম্বর হজরত ঈসা (আ.)-এর তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত জর্জিয়া আর আর্মেনিয়া নামের দেশ দুটি রোমক সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন বা তাঁবেদার রাষ্ট্র ছিল। সেই সময় কাজার জাতি দেশ দুটি দখল করে নিলে এ দুই দেশে— এবং ককেসাস উপমহাদেশের আরো অনেক স্থানে— ছোট ছোট অনেক পার্বত্য জাতি স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। সেখানকার আদ্যের বাসিন্দা বা স্থানীয়দের সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের অভ্যন্তর থেকে আসা অনেক জাতি একদেহে মিলে যাকে বলে লীন হয়ে যায়। হজরত ঈসার উনিশ শতকের গোড়া নাগাদ নানা জাতির লোক— প্রায় ৭০টি ভাষায় কথা বলার মতো— ককেশাস জাহানে বসবাস করত।

তুরানি জাতি আর ইরানি ভাষার আধিপত্যের জায়গায় সে দেশে— প্রথমবারের মতো— রুশ জাতির আধিপত্য কায়েম হয় হজরত ঈসার পঞ্চদশ শতাব্দীতে। উনিশ শতকে এসে রুশ বিজয় ও দখলদারি আরো পাকাপোক্ত হয়। যেমন ১৮০১ সালে জর্জিয়া রুশ সাম্রাজ্যের অবিভাজ্য অংশ বলে স্বীকৃতি পায়। তিফলিস থেকে ব্লাদিকাবকাজ পর্যন্ত একটা আন্তঃমহাদেশীয় মহাসড়ক রুশ সেনাদের চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হয়। প্রধানত এরমলব নামে প্রসিদ্ধ রুশ সেনাপতির প্রতিভাবলে যে অঞ্চলকে আমরা এখন ককেসিয়া পারের দেশ বা ট্রান্স-ককেসিয়া বলি, তার পুরোটাই ১৮৩০ নাগাদ রুশদের তাঁবে চলে আসে। শুদ্ধ দুটি বড় দেশ তখন পর্যন্ত রুশ শাসন মেনে নেয়নি। একটি পূর্বে— চেচনিয়া, অন্যটি পশ্চিমে— চরকাসিয়া। এরা আরো ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত বিদেশী দখলদারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে থাকে। এ প্রতিরোধ সংগ্রামেরই এক খ্যাতনামা নায়ক, বীরত্ব আর মনুষ্যত্বের শেষ অবলম্বন ওরফে সম্বল বা পতাকার নাম অবার জাতির সন্তান হাজি মুরাদ।

তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে চেচনিয়ার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের একপ্রস্ত ঐতিহাসিক বা সত্যকার ছবি পাওয়া যায়। এ সময় ককেসাস সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতেন অন্য এক পার্বত্য জাতির নেতা শামিল। শামিল মহোদয় শুদ্ধ এ দুনিয়ার শাসক নন, একই সঙ্গে পরকালের মুক্তির উপায় বা পথনির্দেশকও বটেন। যাকে বলে ধর্মীয় নেতা তিনি। তিনি ইমাম শামিল। পূর্ব ককেসিয়ার অনেক পার্বত্য জাতি ইমাম শামিলের নেতৃত্বে রুশ দখলদারদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধে। তার প্রতিরোধ যুদ্ধ সফল হয়। ১৮৪০-এর দশকে রুশ উপনিবেশবাদ পরাজয় স্বীকার করে, প্রায় পরাভূত চরকাসিয়া দেশে তারা সামরিক অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ১৮৫৩-৫৬ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ চলার সময় এ পার্বত্য জাতিসংঘ কিছুদিন শান্তিতে স্থির ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় তারা আবার রুশ আগ্রাসনের মুখে পড়ে। তাদের ধনদৌলত, রসদপত্র, গোলাবারুদ ফুরিয়ে যায়। তারা আত্মসমর্পণ করে দলে দলে। বলা হয়, এ যুদ্ধে চেচনিয়ার মূল ভূখণ্ডের জনসংখ্যার চার ভাগের তিন ভাগই উচ্ছন্ন হয়ে যায়। ১৮৬৪ সালে এক চরকাসিয়া থেকেই প্রায় ছয় লাখ মানুষকে বের করে দেয়া হয়। তারপর সেখানে স্থাপন করা হয় রুশ বসতি। আজো সেই যুদ্ধের শেষ হয়নি। যুদ্ধ এখনো চলছে। (লেরমন্তব ১৯৯৪: ২৪)

রুশ লেখকদের মধ্যে আলেকসান্দর পুশকিন, মিখাইল লেরমন্তব ও লেব তলস্তয় এই এশিয়াবি ককেসাস নিয়ে অনেক স্মরণীয় গল্প লিখেছেন। স্বাধীনতা-পূজারি এসব পার্বত্য জাতির আদর্শ বীরদের স্থানীয় ভাষায় বলে ‘জিগিত’। এই জিগিতের বৈশিষ্ট্য অকুতোভয় যোদ্ধার, বুদ্ধিমান সেনাপতির, দেশপ্রেমের, প্রতিশোধ গ্রহণে অপরাঙ্মুখ অশ্বারোহীর। চেচেন আর চরকাসিয়াবি জাতির আনুগত্য শুদ্ধ আপন আপন জাতির জন্য নয়, আপন আপন ধর্মের জন্যও বটে। বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা যেমন জাতির প্রতিটি সন্তানের, প্রত্যেক বীরের দায়িত্ব, বিধর্মীর হাত থেকে আপনার জাতীয় ধর্ম রক্ষা করাও তেমনই তাদের দায়িত্ব বৈ নয়। লেরমন্তবের ‘আমাদের কালের নায়ক’ গল্পে ঢের চরকাসিয়াবি চরিত্র দেখা যায়, আর তলস্তয়ের ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে শোনা যায় চেচেন জাতির মাহাত্ম্যগাথা।

আদিতে রুশবিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধেই যোগ দিয়েছিলেন হাজি মুরাদ। প্রথমে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন ধর্মীয় নেতা ইমাম শামিলের নেতৃত্বেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামিলের বশ্যতা স্বীকারের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাননি তিনি। পরাধীনতা ব্যবসায়ী রুশদের কাছে একবার আত্মসমর্পণ করেন, আবার সেখান থেকে পালিয়েও আসেন হাজি মুরাদ। সেই পালানোর পথেই শেষ পর্যন্ত বীরের মতো লড়তে লড়তে প্রাণ দেন তিনি। তবে ঠিক রুশ বাহিনীর হাতে নয়, রুশপক্ষভুক্ত রাজাকার অর্থাৎ শামিলের অনুগত বাহিনীর হাতে। তাঁর কাটা মাথা অবশেষে রুশদের হাতেই পড়ে। তলস্তয়ের গল্পের মধ্যেই আমরা সেই কাটা মাথার দেখা পাই।

তলস্তয়ের মতে, এই রুশ-চেচেন যুদ্ধটি শেষ বিচারে এক ধরনের প্রভু ও ভৃত্যের যুদ্ধ, একজাতীয় জমিদার-কৃষক লড়াই বৈ নয়। তিনি দেখান, রুশ দেশের কৃষক আর চেচেন জাতির কৃষক— দুই জাতিরই অভিন্ন দুশমন রুশ স্বৈরতন্ত্র ও রুশ শাসক শ্রেণী। এই শাসক শ্রেণী চেচনিয়ার কৃষকদের ফসল, ক্ষেতের ভুট্টা সাবাড় করে ফেলছে আর সৈনিকের উর্দি গায়ে চাপিয়ে দিয়ে অভুক্ত রুশ কৃষককে চেচেন সন্তানদের পেছনে লেলিয়ে দিচ্ছে। তলস্তয় জানেন, রুশ কৃষক আর পার্বত্য জনগণ— উভয়েরই— এক নম্বর দুশমন রুশ দেশের সম্রাট— জার। ঘটনাচক্রে সে যুগে— গল্পের ঘটনা ১৮৫১ সালের— যিনি জারের সিংহাসনে আসীন তার নাম নিকোলাস, পরবর্তী ইতিহাসের আলোকে বললে প্রথম বা এক নম্বর নিকোলাস। ‘হাজি মুরাদ’ গল্পে তলস্তয় জার এক নম্বর নিকোলাসের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ক্ষমতার ব্যবসায় আর স্বৈরতন্ত্রের হাতে সৃষ্ট যে অশুভ কাঠামো রুশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রমূলে স্থাপিত, সেই বড় অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নায়ক হাজি মুরাদ। পরিচয়ে তিনি যুগপথ চেচেন মুসলমান ও কৃষক সংগ্রামের নেতা।

তাই বলে তলস্তয় এ যুদ্ধে হাজি মুরাদকে জয়ী করেছেন এমন নয়। আমাদের মহাযুগের ট্র্যাজেডি যে কৃষকযুদ্ধের ট্র্যাজেডি, তলস্তয় এ সত্য ঠিকই ধরে ফেলেছেন। কারণ কৃষকরা সমবেত হয় কোনো রাজা, কোনো গান্ধী, কংগ্রেস, বেগ, খান বা এ-জাতীয় কোনো খেতাবধারীর পতাকাতলে আর ঘরে ফিরেই তারা দেখতে পায় মাথার ওপর তাদের নতুন প্রভু। হাজি মুরাদ কি মুসলমান না খ্রিস্টান? ইমানদার না পৌত্তলিক? এ প্রশ্ন বড় প্রশ্ন নয় তলস্তয়ের চোখে। অথচ হাজি মুরাদের চোখে ধর্ম বিশ্বাস আর ন্যায়ের সংগ্রাম আদপেই আলাদা জিনিস নয়। এখানেই আমরা দেখতে পাই, তলস্তয়ের মতো মনীষীও গোঁড়ামির কবজা থেকে ষোলআনা মুক্ত থাকতে পারেননি। তিনি নিজে ন্যায়ের সংগ্রামে মহাত্মা যিশুর পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, অথচ হাজি মুরাদের ইসলামী পতাকা তার চোখে বড়জোর একপ্রস্ত উপদ্রবের অধিক নয়। তলস্তয়ের ধারণা, হাজি মুরাদের মুসলমানিত্ব একটা কথার কথা বৈ নয়, তার অন্তরের কৃষক ভাবটাই আসল। ১৮৯৭ সালের ৪ এপ্রিলের রোজনামচায় তলস্তয় লিখেছিলেন: ‘হাজি মুরাদ লোকটি ধর্মান্ধতার শিকার— তার বিষয়ে বলার আমার মূল কথাটা এটাই। তা যদি না হতো বা লোকটাকে কি ভীষণ সুন্দরই না দেখাত!’ (শক্লোভস্কি ১৯৭৮: ৬৮৩)

গণ্যমান্য অভিজাত শ্রেণীর সুযোগ্য লেখক তলস্তয়ের এটুকু ভুলচুক হয়েছে, এ কথা অবশ্যই কবুল করা যায়। তবুও আমাদের অধিক যেতে হবে, স্বীকার করতে হবে, হাজি সাহেবের সমস্যাও নেহাত সরল সমস্যা ছিল না। হাজি মুরাদ কৃষক সমাজের নেতা, হাজি মুরাদের জেহাদ যুগপথ রুশ জারতন্ত্র ও শামিল স্বৈরাচার উভয়ের বিরুদ্ধেই। এছাড়া তার আর যাওয়ার অন্য কোনো পথও ছিল না। তলস্তয় চরিতামৃতকার শক্লোভস্কি লিখেছেন: ‘যদি সে শামিলের পথে যায়, তার যশ-মান-সম্মান সবই হবে, কিন্তু চাষী সমাজ কিছুই পাবে না। আবারো যে জোরজুলুম, সেই জোরজুলুমই চলতে থাকবে। যদি সে রুশ সম্রাটের কাছে যায়, টাকাপয়সা, মানসম্মান সবই তার হবে, কিন্তু এ রুশরাই তো চেচেন চাষীর ফসলের খেতখামার দুপায়ে দলন করছে।’

জার এক নম্বর নিকোলাসের চেয়ে জোরজুলুম অত্যাচারে শামিলও একচুল কম যান না। শামিলের ক্রোড় থেকে হাজি মুরাদ ছুটে যান নিকোলাসের বাহুডোরে। যাওয়ার পথে সে দেখা পায় জনৈক রুশ সৈন্যের— বেটা পালাচ্ছে ওই নিকোলাসের সৈন্যদল ছেড়ে। এমন সময় আচমকা একটা বুলেট এসে বেটার গায়ে বেঁধে। বেইমান সৈন্য নামের কলঙ্ক থেকে সে বেঁচে গেল। কারণ আচমকা গুলিটা এসেছিল চেচেনপক্ষের বন্দুক থেকে।

২.

হাজি মুরাদকে তলস্তয় দেখিয়েছেন যুদ্ধে আহত, বন্দি, পলাতক, সম্মুখযুদ্ধে অকুতোভয়, বীরদর্পে নিহত যোদ্ধা চরিত্র আকারে। তিনি শির দিয়েছেন, কিন্তু আমামা দেননি। সুতরাং তারই জয় হয়েছে। এ জয়টা তলস্তয় দেখান মোট দুই প্রকরণে। প্রথম প্রকরণে প্রেম, দুই নম্বরে যুদ্ধ। রুশপক্ষীয় দুর্গে জনৈক সেনাপতির স্ত্রী মারিয়া দিমিত্রিয়েবনা হাজি মুরাদের দিকে বেশ একটা ভালোবাসার টান অনুভব করেন। ওদিকে বাটলার নামক জনৈক সৈন্যাধিনায়কও এই মহীয়সী মারিয়ার কৃপাপ্রার্থী। জ্যোত্স্নাভরা এক রাতে বাটলারের সঙ্গে হাওয়া খাওয়ার তাগিদে সেনা শিবিরের চৌহদ্দির মধ্যে পাঁয়চারি করছেন মারিয়া। তখন ছোটখাটো এক সেনাপতি— নাম কামেনেব— কয়েকজন কসাক সৈন্য অভিব্যহারে তাদের মুখোমুখি। তারা ঝুলি খুলে হাজি মুরাদের কাটা মাথাটি টেনে বের করে দেখালেন মারিয়াকে। চাঁদের আলোয় অর্ধদৃষ্ট কাটা মুণ্ডুটা দেখিয়ে ওরা যেন বা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে— ‘দেখো তো মাথাটা, কার চেনা যায় কিনা?’ শত শত আঘাত আর ক্ষতের দাগধস হজম করেও জীবিত হাজি মুরাদের ঠোঁটের শিশুসুলভ হাসিটি হারায়নি এই কাটা মাথা। ঘৃণায় মারিয়া মুখ ঘুরিয়ে নেন। এই মহার্ঘ্য, খণ্ড মাথা দেখতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অসম যুদ্ধের এই বিজয়চিহ্নে, এই করুণ সম্বলে মোটেও আনন্দ হয় না তার।

মারিয়া দিমিত্রিয়েবনাকে এভাবে কাটা ছিন্নমাথা দেখানোর কিছুক্ষণ পরই তলস্তয় হাজি মুরাদের সঙ্গে পশ্চাদ্ধাবনরত রুশ সৈন্য দলের শেষ মহারণের বিবরণটা পেশ করেন। এদিকে আমরা বিলক্ষণ জানি, হাজি মুরাদের কাটা মুণ্ডু এখন রুশ বাহিনীর থলের ভেতরই। চাঁদের আলোয় দেখা না দেখা সেই কর্তিত শিরের স্মিত হাসিটি এখনো অম্লান। তবু শেষ অধ্যায়ের বিবরণটা আমরা পড়ি শিরা টান টান দশায়। এমনকি আশাও করি, হাজি মুরাদ তার শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে জিতবেন, প্রাণে বেঁচে যাবেন শেষ পর্যন্ত। একেই কি বলে ‘কবির বিচার’— ইংরেজদের ভাষায় পোয়েটিক জাস্টিস!

তলস্তয়ের বিচারে হাজি মুরাদের লড়াই রুশ জাতির বিরুদ্ধে, চেচেন জাতির লড়াই নয়। তিনি দেখাচ্ছেন হাজি মুরাদকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করল— ঠিক রুশ বাহিনী নয়, রুশপক্ষে যোগ দেয়া চেচেন রাজাকারের দল। তলস্তয় এখানে ন্যায় আর অন্যায়ের যুদ্ধ অপূর্ব সুন্দর চিত্রাকারে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন: ‘সুবেহ সাদেকের সময় হাজি মুরাদ অজু করার জন্য পানি নিতে আবার এই কামরায় এলেন। রাত্রি-দিবার এ সন্ধিক্ষণে ভোরের আলোর উদ্দেশে পাপিয়ার উল্লসিত কণ্ঠস্বর উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। আর এই সময় মুরিদদের কামরা থেকে শোনা যাচ্ছিল ছোরা শান দেয়ার পাথরের সঙ্গে লোহার ঘস ঘস শব্দ।’

হাজি মুরাদ টব থেকে পানি নিয়ে নিজের কামরায় দোরের কাছে এসেছেন, এমন সময় ছোরা শান দেয়ার ঘস ঘস শব্দ ছাপিয়ে ছাপিয়ে হানেফির কণ্ঠে শুনতে পেলেন পরিচিত গানের স্বর। শোনার জন্য দাঁড়ালেন। গানের বিষয়বস্তু এই: হামজা নামের একটি জোয়ান তার সাঙ্গোপাঙ্গ সমভিব্যহারে রুশদের একপাল ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়েছিল। জনৈক রুশ রাজপুরুষ বিস্তর সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাদের পিছু নেয়। পরিশেষে তেরেক নদীর পাড়ে এসে তাদের ঘেরাও করে। অনন্যোপায় হামজা ঘোড়াগুলো হত্যা করে। যতক্ষণ তাদের রাইফেলে গুলি, কোমরবন্দে ছোরা আর শিরায় রক্তপ্রবাহ জারি ছিল, ততক্ষণ তারা লড়াই করে। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে কতকগুলো পাখিকে উড়ে যেতে দেখে হামজা। তাদের উদ্দেশে চিত্কার করে সে। গান গাইতে থাকে—

         যাও পাখি উড়ে যাও, আমাদের বাড়ি যাও

         মায়েদের বলো আমাদের, বলো আমাদের বোনেদের

         আমাদের প্রিয়াদের বলো, যুদ্ধ করে মরেছি আমরা

         মরেছি জেহাদ করে! গিয়ে বলো তাদের

         কবরে আরামে থাকবে না আমাদের লাশ

         আমাদের খাবে বাঘে, টুকরো টুকরো ছিঁড়বে,

         কাক আর শকুন আমাদের চোখ উপড়াবে।

                                 (তলস্তয় ১৯৮৪: ১৪২-৪৩)

গানের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে গায়কেরা উপনীত হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চারণে। গানের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই তীক্ষ একটা আর্ত স্বর বাতাস খান খান করে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। তারপর সব স্তব্ধ, নীরব।

শোনা যায়, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা একবার লেব তলস্তয়কে জিজ্ঞাসা করেছিল: ‘মানুষ গান গায় কেন?’ শক্লোভস্কির মতে এ প্রশ্নের উত্তরেই তিনি ‘হাজি মুরাদ’ লিখেছিলেন। এখানেই তলস্তয় অজ্ঞাতসারে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, হাজি মুরাদের লড়াই আচমকা এক ব্যক্তির লড়াই নয়, এ লড়াইয়ের একটা পূর্ব আছে, সম্ভবত একটা উত্তরও আছে। হামজার জীবনের সঙ্গে হাজি মুরাদের জীবনদানের মিলটাও একান্ত আপতিক মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বীকার করতে হয়, তলস্তয় নিজের অজান্তেই যেন মেনে নিয়েছেন, হাজি মুরাদের লড়াই নিছক কৃষকের লড়াই নয়, এ লড়াই জাতীয় মুক্তির লড়াইও বৈকি!

দোহাই

১ লিও তলস্তয়, হাজি মুরাদ, আকবরউদ্দীন অনূদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪)।

২ M. Yu. Lermontov, A Hero of Our Time, D.J. Richards, ed. (London: Buitol Classical Press, 1994).

৩ V. Shklovsky, Lev Tolstoy, Olga Shartse, trans. (Moscow: Progress Publishers, 1978).

৪ Leo Tolstoy, Hadji Murat, Hugh Alpin, trans. (London: Hesperus Press, 2003).

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

আহমদ ছফার হুমায়ূননামা

[এই রচনাটি লিখিয়াছিলাম ইংরেজি ২০১২ সালের আগস্ট মাসের গোড়ায়। দুঃখের বিষয়, পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় রচনাটি ছাপাইতে রাজি হন নাই। সত্যের মধ্যে লেখাটি তাঁহাদের উপরোধেই লেখা হইয়াছিল। সহকারী মোমেন সাহেবের মধ্যস্থতায় সম্পাদক মহাশয় জানাইয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ মাত্র পরলোকগমন করিয়াছেন, এই লেখাটি পরলোকগত লেখকের স্মৃতির সহিত যাহাকে বলে মানানসই হইবে না। সম্প্রতি আমার বাসার পুরানা আবর্জনা সাফ করিতে বসিয়া লেখাটি খুঁজিয়া পাইয়াছি। এতদিন পর পড়িয়া দেখিতেছি ইহার সকল বাক্যই বর্জনীয় হয় নাই। অন্তত আহমদ ছফা ব্যবসায়ী সমাজে ইহার একপ্রকার চাহিদা থাকিতে পারে—এই বিবেচনায় রচনাটি পুনশ্চ সম্পাদিত হইল। ইহার ভিতর দেখিতে দেখিতে ছয় বৎসর পার হইয়া গিয়াছে। যৎসামান্য মাত্র পরিমার্জনার পর লেখাটি আরেকবার হাজির করিতেছি।—ইতি ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮]

ঈদসংখ্যার অজুহাতে ‘অন্যদিন’ পত্রিকার মোমেন সাহেবকে কথা দিয়াছিলাম এই বছরও একপ্রস্ত লেখা তাহার হাতে তুলিয়া দিব। বিষয় ঠিক করিয়াছিলাম ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। অতি অল্পবয়সে দত্তজ কবির মুণ্ডুপাত করিয়া ঠাকুরবাড়ি হইতে প্রকাশিত ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ছয় কিস্তিতে একপ্রস্ত ভয়াবহ নিবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রবন্ধটি একদা সহজে পাওয়া যাইত না। হালে এক বন্ধুর দয়ায় ‘ভারতী’ পত্রিকার আদি সংস্করণ হইতে ছাপ লওয়া এই অচলিত সংগ্রহটি হাতে পাইলাম। আর বিশ্বভারতী হইতে মুদ্রিত সংস্করণের সহিত তাহা মিলাইবার সুযোগও হইল। বলা যায় আমি এক প্রকার হালে পানি পাইলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলিত প্রবন্ধটির পর্যালোচনা লিখিব স্থির করিয়াও লেখাটা শেষ পর্যন্ত শেষ করিতে পারি নাই। ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দেনাশোধ করিবার নিমিত্ত অগত্যা এই নিবন্ধ লিখিতেছি। মনে হইতেছে নিজে মরিয়া হইলেও হুমায়ূন আহমেদ আমাকে—এই ঈদসংখ্যা দায়গ্রস্ত অনাহারী লেখককে—বাঁচাইলেন, অন্তত এই যাত্রা প্রাণে বাঁচাইয়া গেলেন।

আহমদ ছফার এন্তেকাল উপলক্ষে হুমায়ূন আহমেদও একদা একপ্রস্ত স্মৃতিকথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আহমদ ছফার লেখা কোন উপন্যাস বা প্রবন্ধ কি অন্য রচনা লইয়া তিনি নিশ্চয় আরো কিছু লিখিবার অধিকার রাখিতেন। সে অধিকার তিনি আদায় করিয়াছেন কিনা তাহা কালে জানা যাইবে। আজিকার লেখায় আমি ঐদিকের কথা তুলিতে চাহিতেছি না। এইদিকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিংবা গল্প লইয়া যাঁহারা বিশেষ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন আজ পর্যন্ত তাঁহাদের সংখ্যাও ক্ষুদ্রই রহিয়াছে। সেখানে আহমদ ছফার নামও আমি এখন পর্যন্ত দেখি নাই। সান্ত্বনার মধ্যে, সাক্ষাত্কার নামধেয় কয়েকটি রচনায় মহাত্মা আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে যে সকল মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহা হইতেও বিশেষ শিক্ষা করিবার জিনিশ আমি কয়েকটা খুঁজিয়া পাইয়াছি। স্থির করিয়াছি আজিকার লেখায় তাহার কিছু নমুনা তুলিয়া আনিব।

মহৎ মানুষেরও কখনও কখনও স্মৃতির বিভ্রম হয়। এক জায়গায় দেখিলাম মহাত্মা আহমদ ছফারও খুব সম্ভব একটা স্মৃতিবিভ্রম ঘটিয়াছিল। আহমদ ছফা এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘সকলে যে মধুদার টাকা মেরে দিতেন এটা সত্যি নয়। কাউকে কাউকে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসেও মধুদার টাকা শোধ করতে দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির। তিনি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। ফরেন সার্ভিসে আড়াই কি তিন বছর কাজ করার পর—আমি তাঁকে দেখেছি—দোকানে এসে মধুদার বাকি পাওনা পরিশোধ করতে।’ (ছফা ১৪০৪)

আহমদ ছফার বয়ানে উক্ত ‘এখন’—মানে ১৯৯৭ সালে—যিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন—তিনি নিজেই সম্প্রতি ঢাকায় আমাকে জানাইয়াছেন—তিনি আহমদ ছফার শিক্ষক ছিলেন না—ছিলেন শিষ্যস্থানীয় বা বন্ধুতুল্য অনুজ মাত্র। বিভ্রমের একটা সম্ভাব্য কারণ এই যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে একদা একই নামের অপর একজন সিনিয়র কূটনীতিকও কর্মরত ছিলেন। ঐ ভদ্রলোক শুনিলাম সম্প্রতি প্রয়াত হইয়াছেন। তিনি ১৯৬০ দশকের গোড়ায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তপাতী নাজিরহাট কলেজে শিক্ষক ছিলেন। আহমদ ছফা ছিলেন সেই কলেজেরও ছাত্র। আহমদ ছফার কলেজ শিক্ষক হুমায়ুন কবির সাহেব একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোন এক শাখার পরিচালক পদে আসীন হইয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। এদিকে মধুদা তো ১৯৭১ সালের আগের কালের—অতীত দিনের—স্মৃতি বৈ নহেন।

আহমদ ছফা একাধারে হুমায়ূন আহমেদকে—মানে তাঁহার কোন কোন লেখা পদার্থ—পছন্দ করিতেন, আবার কখনো কখনো তাঁহার কঠিন সমালোচনাও করিতেন। আমাদের জিজ্ঞাসা করিতে হইবে—এই পছন্দ আর অভিযোগের গোড়ায় কি লুকাইয়া আছে? এখানে আমরা আহমদ ছফার পরিণত বয়সের একটি জবানবন্দী হইতে শুরু করিব। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম হইতে বিমানযোগে ঢাকা আসিয়া দুইটি তরুণ আহমদ ছফার একটি সাক্ষাত্কার আদায় করেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বর নাগাদ নিজ হাতে সংশোধন করিয়া সাক্ষাত্কার রচনাটি তিনি আরেকবার লিখিয়াছিলেন। সেই সংশোধিত পাঠ হইতে আমি এখানে কিছু সারগ্রহণ করিতেছি। চট্টগ্রামীণ ঐ সাক্ষাত্কারপ্রার্থীর নাম ছিল মীজানুর রহমান। এক জায়গায় আসিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের এখানে আপনার প্রিয় লেখক কে কে আছেন?” উত্তরে আহমদ ছফা অনর্গল বেশ কয়েকজন লেখকের নাম বলিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমেই দেখি হুমায়ূন আহমেদের নাম—অন্তত তাঁহার লেখা একটি বহির নাম—জ্বলজ্বল করিতেছে। পুরা উত্তরটা তুলিয়া দিলে হয়ত আখেরে আমার রক্ষা হয়।

আহমদ ছফা বলিলেন: ‘এককভাবে প্রিয় লেখক কেউ নেই। বিশেষ লেখকের বিশেষ বই আমার ভাল লেগেছে। ভাল লাগা বইগুলো হল: হুমায়ূন আহমেদের “নন্দিত নরকে”, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই,” হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পগুলো, শওকত আলীর “প্রদোষে প্রাকৃতজন,” শওকত ওসমানের “জননী,” শাহেদ আলীর কোন কোন ছোটগল্প, রাজিয়া খান আমিনের “বটতলার উপাখ্যান,” মঞ্জু সরকারের “তমস,” সেলিম আল দীনের নাটক “কেরামতমঙ্গল,” সত্যেন সেনের “সেয়ানা,” “আলবেরুনী” এ সকল বই। আমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “লাল সালু” এবং তাঁর দুটি নাটককে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকি। আবু ইসহাকের “সূর্য-দীঘল বাড়ী”, আলাউদ্দিন আল আজাদের কোন কোন গল্পের কথা অবশ্যই উল্লেখ করব। আমার পছন্দের তালিকায় আরো কিছু লেখকের বই আছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৮০)

আরো দুই কি তিন জায়গায় আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদের—বিশেষ তাঁহার ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটির—তারিফ করিয়াছিলেন। সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসুর সহিত একখণ্ড সাক্ষাত্কারের তারিখ জানুয়ারি ১৯৯৬। এই রচনায়ও তিনি প্রাণ খুলিয়া বলিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা ‘নন্দিত নরকে’ সেই সময়ের জন্য ‘রেয়ার’ [মানে দুর্লভ অর্থাৎ অসাধারণ] লেখা। হুমায়ূন আহমেদের নাম মুখে আনিবার আগে তিনি আর যে দুই দুইজন লেখকের বিশেষ গুণকীর্তন করিয়াছিলেন, তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে শওকত ওসমান ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। আহমদ ছফার জবানিতেই পড়িতেছি: ‘যুগলক্ষণ আছে, কিন্তু যুগলক্ষণ অতিক্রম করে টিকে থাকবে দুজন লোক খুব সম্ভবত—আগের শওকত ওসমান, তাঁর “জননী”—আর ওয়ালিউল্লাহ সাহেব। তাঁর উপন্যাসগুলোর চাইতে নাটকগুলো মিনিংফুল বেশি। এগুলো সমাজে ইয়ে পায়নি। তারপরে এই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখাটা, “নন্দিত নরকে” … সেই সময়ের জন্য রেয়ার লেখা।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৮)

হুমায়ূন আহমেদের অসাক্ষাৎ তারিফ উপলক্ষে আহমদ ছফা আরও বলিলেন, হুমায়ূন ‘একবিন্দুও সেক্স না লিখে শ্রেষ্ঠ বাজারসফল বই’ লিখেছেন। এই জায়গায় তিনি তাঁহার বিপরীত-কোটির লোক পরিচয়ে সৈয়দ শামসুল হকের—বিশেষ তাঁহার ‘বাজার সুন্দরী’ নামক একটি বইয়ের—কথা উঠাইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘বাজার সুন্দরী বলে একটা উপন্যাস আমি পড়েছি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা। কি এগুলো! কি করে এগুলো মানুষ লেখে! সেক্স দিলে লোকে বই কিনবে, সেটার জন্যই করছে, বাজারের জন্য করছে।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৯)

এইদিকে আবার হুমায়ূন আহমেদের নামে একটা অভিযোগের ফিরিস্তিও দাখেল করিয়াছেন আহমদ ছফা। এই অভিযোগের তালিকাটা তেমন হ্রস্বও নহে। সাক্ষাত্প্রার্থীর নাতিদীর্ঘ এক সওয়ালের জবাবে তিনি আপনকার পরিচিত উপপাদ্য পুনঃপ্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রার্থী জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তার সাক্ষাৎ কারণ কি?’ উত্তরের জন্য আহমদ ছফা যেন তৈয়ার হইয়াই ছিলেন। তিনি বলিলেন: ‘হুমায়ূনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর এই উন্নতি বা অবনতির জন্য অংশত আমাকেই দায়ী করতে চান। তাঁর প্রথম বই যখন বেরিয়েছিল, আমিই সবচাইতে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল হয়ত হুমায়ূনের মধ্যে কালে কালে আমরা চেখভের মত একজন প্রতিভার সন্ধান পাব। তিনি তো সে পথে গেলেন না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

আহমদ ছফার মতে, হুমায়ূন আহমেদ গেলেন উন্নতির পথে নয়, অবনতির পথে। মানে গেলেন যে পথ চিন্তাহীনের—যে পথ অরাজকের—সেই পথে। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘উপর্যুপরি সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয়, সব মিলিয়ে এখানে যে চিন্তাহীন অরাজক পরিস্থিতি— হুমায়ূন সেই সময়ের প্রোডাক্ট।’ তাহার পরও প্রশ্ন থাকে। থাকে জনপ্রিয়তার প্রশ্ন। আহমদ ছফা কবুল করিলেন হুমায়ূন আহমেদ কামেল লেখক। কামেল না হইলে পাঠকদের মধ্যে তিনি জায়গা পাইলেন কেমন করিয়া? জায়গা শব্দের স্থলে ‘স্থান’ শব্দটাও বাংলাদেশের ভাষায় ব্যবহার্য। তাহার সত্য ব্যবহার করিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসিলেন: ‘আমার প্রশ্ন—এটা কি স্থান? হুমায়ূনের পরবর্তী রচনা চানাচুরের মত। খেতে মজা লাগে কিন্তু পেট ভরে না এবং সারপদার্থও বিশেষ নেই।’

একটু আগেই তিনি ব্যাখ্যা করিতেছিলেন ‘সফলতা’ কাহাকে বলে। বলিতেছিলেন, ‘সফলতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জাতির মর্মমূল স্পর্শ করে যদি ব্যর্থও হই, তার একটা আলাদা মূল্য আছে। মামুলি সার্থকতার চাইতে মহৎ ব্যর্থতার মূল্য অনেক বেশি। হুমায়ূন আহমেদ [প্রভৃতি] এঁরা ওই অর্থে সফল লেখক যে লিখে তাঁরা টাকা কামিয়েছেন। টাকা কামানোটাই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি?’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে এই পর্যন্ত আহমদ ছফা যাহা যাহা বলিয়াছেন তাহার সার তিন কথায় গ্রহণ করা যায়। একে আছে তাঁহার জনপ্রিয়তা মানে তিনি ভাল গল্প লেখেন—দুই নম্বরে তিনি সেক্স বিক্রয় করেন নাই, মানে সেক্স ছাড়াও বিক্রয় করার মতন অন্য পদার্থ তাঁহার আছে—আর তিন নম্বরে বলা যায় তিনি মার্শাল ল ওরফে সামরিক শাসনের প্রোডাক্ট। ‘প্রোডাক্ট’ মানে কি? ফসল বা সম্পত্তি বা পণ্য। যদি তাই হয় তো একটা ব্যাখ্যা আমিও পেশ করিতে পারি। তিনি কি সামরিক শাসনের শরিক বা সামরিক সমাজের সমর্থক বা বেসামরিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন? তবে কি একথা সত্য যে, যে সকল সমাজে একনায়কতান্ত্রিক শাসন স্বাভাবিক হুমায়ূন আহমেদ সেই ধরনের সমাজ হইতে আসিয়াছেন কিংবা সেই ধরনের সমাজেই ফিরিয়া যাইবেন?

আহমদ ছফাকে যাহারাই সামান্য চিনিতেন বা জানিতেন তাহারাই জানেন, নিরুত্তর থাকিবার লোক ছিলেন না তিনি। সাজ্জাদ শরিফও বেশ শরিফ লোক। তাঁহার সেদিনের সওয়ালটাও যথেষ্ট আশরাফ সওয়াল ছিল। রাখিয়া-ঢাকিয়া পরাণে কাচুলি পরিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন হুমায়ূনের সহিত বিবাদটা আহমদ ছফার একান্ত ব্যক্তিগত মামলা কিনা। আহমদ ছফা সঙ্গে সঙ্গে জানাইয়া দিলেন এই মামলার একটি এজমালি কিংবা পাবলিক তরফও আছে। বলিলেন, ‘না, না, হুমায়ূনের বড় প্রবলেমটা হচ্ছে মার্শাল ল।’ মানে ইঁহারা মার্শাল লয়ের মধ্যে বাড়িয়া উঠিয়াছেন। এই জায়গায় ইমদাদুল হক মিলনের নামটাও আসিয়াছিল।

সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে ঐদিন তাঁহার সহকর্মী, তাঁহার পেশাত ভাই, ব্রাত্য রাইসুও হাজির-নাজির ছিলেন। রাইসু সাহেব পোঁছ করিলেন, ‘মার্শাল লয়ের মধ্যে’ কথাটা জানি কি অর্থ বহন করিতেছে? আপনকার স্বভাবধর্ম মতেই এ কথাটার জবাব দিয়াছিলেন আহমদ ছফা। বলিয়াছিলেন, ‘মার্শাল ল’র ভেতরেই একদম’ বাড়িয়া উঠিয়াছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ছফার জবানবন্দী ছিল এই রকম, ‘লেখক হিশেবে সেভেন্টি—ফোরে তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে, সেভেন্টি—ফাইভ থেকে এদের গ্রোথ। মার্শাল ল’র মধ্যে আমাদের গ্রেটেস্ট সোশ্যাল ডিসকোর্স যেগুলো… একজন লেখককে সোশ্যাল ডিসকোর্সে অংশগ্রহণ করতে হয়।’ আহমদ ছফার মুখ হইতে কথাটা কাড়িয়া লইলেন ব্রাত্য রাইসু। ফোড়ন কাটিলেন: ‘ওনারা করেন নাই?’ ছফা বলিলেন, ‘হুমায়ূন করে নাই একদম।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৩)

এই জায়গায় আসিবার পর হঠাৎ ইমদাদুল হক মিলনের কথাটা উঠিল। আহমদ ছফা জানাইলেন, মিলন ভারতবর্ষের দক্ষিণপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’ যে ডিসকোর্স বাংলাদেশে রপ্তানি করিতেছে তাহার সহিত গলা মিলাইয়াছেন। এক্ষণে সাজ্জাদ শরিফ পর্যন্ত অগত্যা আপনকার শরিফ মুখোশটি সরাইয়া লইতে বাধ্য হইলেন। তাঁহার সহি বড় খোদ চরিত্রটি প্রকটিত করিলেন। অন্তরের অন্তস্থলে যে আদি ও আসল সত্য এতদিন লুকাইয়া ছিল সেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত থলির সত্য বিড়ালের মত বাহির হইল। তিনি দাবি করিলেন, ‘কিন্তু নূরজাহানের ঘটনা তো সত্যি, ছফা ভাই।’ আহমদ ছফা মনে হইল এই দাবিটার সত্যকার জবাব আর দিতে পারিলেন না। সুতরাং নিম্ন-মধ্যবিত্তের জয় হইল। না, জয় হইল কই? তিনি মাত্র প্রসঙ্গান্তরে গমন করিলেন। বলিলেন, ‘তসলিমা কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ডিসকোর্স থেকে জন্মেছে, ইন্ডিয়ানরা ব্যবহার করেছে তাঁকে। কিন্তু মিলন আমাদের ডিসকোর্স থেকে জন্মায়নি। আর হুমায়ূন ডিসকোর্সটা এভয়েড করেছে।’ এই প্রতিপাদ্যের প্রমাণ বাবদ আহমদ ছফা তসলিমা নাসরিনের দোহাই পাড়িয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তসলিমা একটা ইন্টারভিউতে বলেছিল, আমি হুমায়ূন আহমেদের মত লিখতে পারতাম, লিখি নাই।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৪)

আহমদ ছফা ঠিকই ধরিতে পারিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ শেষের দিকে সোশ্যাল ডিসকোর্সে ঢুকিবার পথ—তক্কে তক্কে মোকামে যাইবার খানকা—খুঁজিতেছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে সেই মোকাম পর্যন্ত পৌঁছিতে তিনি পারেন নাই। কেন পারেন নাই তাহার একটা নির্ণয়ও তিনি বাতলাইয়াছিলেন। চেষ্টা করিয়াও হুমায়ূন পারেন নাই। কারণটা হয়ত তাঁহার মনের মধ্যেই লুকাইয়া ছিল। আহমদ ছফা পদার্থটার নাম রাখিয়াছিলেন বড়ই কোমল: ‘মানসিক শুদ্ধতা’। বাহিরের রাস্তার লোক যাহা চায় তাহা লিখিব বলিয়া যাঁহারা পণ করেন তাঁহাদের মানসিক শুদ্ধতায় টান আছে। আমার প্রাণ যাহা চায় তাহা লিখিবার কোশেস করিব—এই পণ করিলে অশুদ্ধিদোষ খানিক কাটিয়া যায়। আহমদ ছফার গুরু অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার বর্তমান লেখককে কহিয়াছিলেন, ‘চায়ের পেয়ালায় দুই ফোঁটা লেবুর রস টিপিয়া দিবেন, দোষটোষ কিছু থাকিলে এক্কেরে কাইট্টা যাইব।’ আহমদ ছফার ভাষা প্রাঞ্জল। তাঁহার ভাষা বুঝিবার আশায় জলাঞ্জলি দিতে হইবে না। তিনি পরিষ্কার লিখিয়াছেন, ‘আমাদের পরাজয়গুলো আমাদের অক্ষমতাগুলো কেউ যদি বলতে পারতেন খুব সরল ভাষায়, সেটা হত সবচাইতে গ্রেটনেসের ব্যাপার। এটা কেউ বলছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৬)

আর কিছুদিন যদি বাঁচিয়া থাকিতেন তো আহমদ ছফা দেখিতেন হুমায়ূন আহমেদও সোশ্যাল ডিসকোর্সে প্রবেশের নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছিলেন। গোঁফ দেখিয়া যদি বিড়াল চিনা যায় তো বলিব সেই গোঁফওয়ালা বিড়ালটি সামরিক যুগে মোটেও ইঁদুর মারিবার মতন ছিল না। ২০০৭ হইতে ২০০৯ পর্যন্ত যে অলৌকিক সরকার তত্ত্বাবধানের নামে বাংলাদেশের আইনসঙ্গত ক্ষমতায় আসীন ছিলেন সেই সরকারকেও হুমায়ূন আহমেদ ‘স্বাগতম’ বলিয়াছিলেন। আহমদ ছফার আশার গুড়ে বালি পড়িতে দেরি যে হয় নাই তাহা আমরাও ঠাহর করিতেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি পত্রিকায় যে উপন্যাসটি ছাপাইতেছিলেন সেখানেও লোকে একই সমস্যা খুঁজিয়া পাইয়াছে। কথাটা আদালত পর্যন্ত উঠিয়াছিল—এ কথা সকলেই জানেন। বিশেষ কি লিখিব?

এই নিবন্ধ সংহার করিবার আগে আমাকে অবশ্য দুইটা আনকোরা কথাও যোগ করিতে হইতেছে। একনম্বরে মনে পড়িল, হুমায়ূন আহমেদের তুলনা দিতে গিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা সবচেয়ে বড় যে লেখকের নাম খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন তাঁহার নাম আন্তন চেখভ (ওরফে শেখভ)। এইটা কিন্তু খুব বড় কথা নয়। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরও একটি কথা মনে পড়িতেছে। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি তখন বেনিতো মুসোলিনির কারাগারে আটক। তাঁহার সন্তানেরা রুশদেশে—মামাবাড়িতে—বড় হইতেছে। ১৯৩৪ সালের দিকে তাঁহার দশবছর বয়সী পুত্র দেলিয়ো মস্কো হইতে কারারুদ্ধ বাবাকে লেখা একটি পত্রে চেখভের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিল। দেলিয়ো লিখিয়াছিল, তাহার স্কুলের মাস্টার মহাশয় বলিয়াছিলেন চেখভ পৃথিবীর সেরা লেখক বা এই জাতীয় কিছু একটা। জবাবে পুত্রকে কারারুদ্ধ বাবা লিখিয়াছিলেন, চেখভ বড় ভাল লেখক সন্দেহ নাই, কিন্তু পৃথিবীর সেরা লেখক তিনি নহেন। সে রকম একটি লেখক খোদ রুশিয়াতেও আছেন অবশ্য। তাঁহার নাম লিও তলস্তয়। (গ্রামসি ২০০৮: ৩৬০-৬১)

এই তুলনাটি সেদিন আহমদ ছফার সাক্ষাত্কারধাত্রীদের  খুব পছন্দ হইয়াছিল এমন মনে করিবার কোন কারণ নাই। একটুখানি পরে আহমদ ছফাকে সাজ্জাদ শরিফ মহাশয় জিজ্ঞাসিয়াছিলেন, ‘আপনার নিজের সাহিত্যিক ব্যর্থতাগুলো কি?’ উত্তরদাতা শেষ পর্যন্ত যাহা বলিয়াছিলেন তাহা প্রাতঃস্মরণীয়: ‘আমি যে সমস্ত লেখককে পড়েছি, পুজো করেছি তাঁদের ধারেকাছেও যেতে পারি নাই।’ এই সার্থকনামা লেখকদের মধ্যে তিনি এয়োহান গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির সহিত লিও তলস্তয়ের নামও করিয়াছিলেন।

আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ূন আহমদের সমস্যা কি তাহা আহমদ ছফা ধরিতে পারিয়াছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁহার প্রকাশটা অপূর্ণ থাকিয়া গিয়াছে। হুমায়ূন আহমেদ যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহাদের মাপেই তিনি গড়িয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহারা কাঁহারা? যদি বলি সাজ্জাদ শরিফ কিংবা ব্রাত্য রাইসুর মত পাঠকদের জন্য তবে পরিচয়টা পূর্ণ হয় না। ইঁহারাও একটি দলের সভ্য। কি তাঁহাদের পরিচয়? তাঁহারা ‘বাঙ্গালি মুসলমান’ বা বাংলাদেশের ‘বাঙ্গালি’ বলিলেও কথাটা ফুরাইতেছে না। তাঁহারা আরও। তাঁহারা অধিক। তাঁহারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। ফরাশি আওয়াজে ‘লো পুতি বুর্জোয়া’। ইংরেজিতে বলে ‘মিডল ক্লাস’। আহমদ ছফা সেই শ্রেণি-বিশ্লেষণে প্রবেশই করেন নাই। কিন্তু আকলমন্দের জন্য যথেষ্ট ইশারা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। সান্ত্বনা এইটুকুই। (ছফা ২০০৮: ৩৪৯-৫০)

হুমায়ূন আহমেদের এন্তেকালের পর আজ অনেকে বলিতেছেন, তিনি শরত্চন্দ্রের মত জনপ্রিয় হইয়াছিলেন কিংবা জনপ্রিয়তায় তাঁহাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। কথাটা মিছা নয় তবে আরও একটা কথা আছে। শরত্চন্দ্র কি চরিত্রের বস্তু ছিলেন? আমার হাতে বিশেষ সময় নাই। হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে আজ আমি নতুন কোন কথা বলিব না। শুদ্ধ শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একদা যে উক্তি করিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করিব মাত্র। শরত্চন্দ্র স্থলে কাটিয়া হুমায়ূন শব্দটা বসাইলে হয়ত কাজ হইবে। চট্টোপাধ্যায়ের জায়গায় আহমেদ বসাইলেও মন্দ হইবে না। ১৯৩০ দশকের শেষাশেষি ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কোথায়ও বা লিখিয়াছিলেন: ‘আমাদের সমাজ এখনও প্রধানত নিম্নবিত্তশালীর সমাজ—এই গঠন যদি আরো কিছুকাল থাকে কিংবা অমর হয় তবে শরত্চন্দ্র অমর হবেন। আর যদি বদলায় তবে দ্বীপসৃষ্টিতে প্রবালের মতনই তাঁর কীর্তি আত্মবলির সমতুল্য হলেও হবে কেবল ব্যবহারিক।’ (মুখোপাধ্যায় ১৩৯৬: ৫৮)

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী গয়রহ (সম্পাদিত), মধু দা: শহীদ মধুসূদন দে স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা: মধু দা স্মৃতি সংসদ, ১৪০৪) এবং আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ বাংলালিপি, ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৪/ পৌষ-ফাল্গুন ১৪২০), পৃ. ৩৪-৩৭।

২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮)।

৩. ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ‘আমার দৃষ্টিতে শরত্চন্দ্র,’ শরত্-স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত) (কলিকাতা: সাহিত্যম্, পুনর্মুদ্রণ ১৩৯৬)।

৪. Antonio Gramsci, Letters from Prison, vol. II, trans. F. Rosengarten, (New York: Columbia University Press, 2008).

২ আগস্ট ২০১২

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না

দুইটা জিনিশ যাহাকে বলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—তাহার মধ্যে একটার নাম মৃত্যু। আজ পর্যন্ত এই দুনিয়ায় যত মানুষের পা পড়িয়াছে তাহাদের বেশির ভাগই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছেন কিন্তু একজনও সেই অভিজ্ঞতার কাহিনী বলিয়া যাইতে পারেন নাই। মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অকথ্য—তাহা কথায় প্রকাশ করা যায় না। মাত্র আরেক মানুষের—অপরের—মৃত্যুর মধ্য দিয়াই আমরা আপনাপন মৃত্যুর নিকটতম তুলনা কি তাহার আভাস পাইতে পারি।

সম্প্রতি আমার এমনই এক অভিজ্ঞতা হইয়াছে। বহুদিন হইল আমি এই ঢাকার শহরে বন্দী হইয়া আছি। একান্ত দায়ে না পড়িলে শহরের বাইরে যাই না। বিগত জুলাই মাসের বিশ তারিখ—সেদিন ছিল শুক্রবার—অগতির গতি মৌলভীবাজার গিয়াছিলাম। বলা বাহুল্য মৌলভীবাজার এখন একটি জেলার স্থানে উঠিয়াছে। এই জায়গাটি একদা সিলেট (দক্ষিণ) সদর বলিয়া অভিহিত হইত। সেখানে একদিনের কিছু বেশি সময় কাটাইয়া আমরা ঢাকা ফিরিয়াছি একুশে জুলাই।

প্রায় দশ বছর আগে আরও একবার মৌলভীবাজার গিয়াছিলাম। সেবারের অভিজ্ঞতার সহিত  এবারের বিদ্যার একটা প্রভেদ ঘটিয়াছে। সেবার গিয়াছিলাম নিজের উদ্যোগে এবং শহর হইতে দূরে—বলা যায় ঝর্ণায় আর জঙ্গলে। এবার গিয়াছিলাম শুদ্ধ একজন মানুষের টানে—এবং শহরে। মৌলভীবাজারের মাহফুজুর রহমানকে আমি প্রথম দিনের আলাপ হইতেই ‘মাহফুজ ভাই’ সম্বোধন করিয়া আসিতেছিলাম। তাঁহার সহিত প্রথম দেখার অনেক আগেই আমি তাঁহার লেখার সহিত পরিচিত ছিলাম।

মাহফুজ ভাইয়ের সহিত আমার প্রথম পরিচয় টেলিফোনযোগে। ঠিক কত তারিখে বা কোন ক্ষণে তাহা এতদিনে আর মনে নাই। প্রথম আলাপের কিছুদিনের মধ্যেই জানিতে পারিলাম আমার শিক্ষক আহমদ ছফার সহিত তাহার একপ্রকার আলাপ ও পরিচয় ছিল। জানিতে চাহিলাম আহমদ ছফার লেখা কোন চিঠিপত্র বা কোন অপ্রকাশিত লেখাজোকা তাহার মহাফেজখানায় আছে কিনা। জবাবে তিনি যাহা বলিলেন তাহাতে বড়ই শরমিন্দা হইলাম। তিনি জানাইলেন ইংরেজি ২০০৭ সাল নাগাদ তাঁহার লেখা একটি বহি ছাপা হইয়াছিল। বইয়ের নাম ‘নানা প্রসঙ্গ নানা ভাবনা’। সেই বইয়ে আহমদ ছফার একটি চিঠি বিলক্ষণ ছাপা আছে।

আমার অনুরোধে মাহফুজ ভাই তাঁহার বইয়ের প্রয়োজনীয় পাতাগুলি আমাকে গোটা দুইবার ফটোকপি করিয়া পাঠাইয়াছিলেন। সঙ্গে দিয়াছিলেন—তোহফাস্বরূপ—আহমদ ছফা লিখিত মূল চিঠিটির প্রতিচিত্রও। এই চিঠির ভূমিকাচ্ছলে তিনি নিজের জবানে আহমদ ছফা সম্পর্কে আর দুই কথাও লিখিয়াছিলেন। সেই দুই কথার মধ্যে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কথিত নীরব মহাসিন্ধুর কল্লোল শুনিতে পাইয়াছিলাম। সংক্ষেপে—অতি সংক্ষেপে—মাত্র একটি অনুচ্ছেদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান আহমদ ছফার ঐতিহাসিক মূল্য সত্য সত্যই নিরূপই করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। এই এক অনুচ্ছেদ পড়িয়াই আমি আবিষ্কার করিয়াছিলাম এমন একজন মানুষকে যাহাকে আহমদ ছফার যোগ্য উত্তরাধিকারী বলা যায়। এক্ষণে সেই অনুচ্ছেদটি উদ্ধার করিতেছি। আহমদ ছফার চিঠিটির ভূমিকার পরিবর্তে মাহফুজুর রহমান লিখিয়াছিলেন, ‘কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আলোকিত মনীষী আহমদ ছফা ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক সব্যসাচী লেখক। চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ার আহমদ ছফা নিজের সমাজ-সংস্কৃতির ঘাত-প্রতিঘাত ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়েই একদিন আদর্শ সমাজের স্বপ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙ্গিনায়। উচ্চতর মানব চৈতন্যের অধিকারী আহমদ ছফার সৃষ্টিকর্ম আমাদের ইতিহাসের এক মহৎ পর্ব—যা আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানার সন্ধানে অনস্বীকার্য।’

মাহফুজুর রহমানের কাছে লেখা—সম্ভবত একমাত্র—এই চিঠিতে আহমদ ছফা আশা প্রকাশ করিয়াছিলেন, তিনি একবার মৌলভীবাজার যাইবেন, শুদ্ধ কবে তাহা স্থির করিয়া লইতে হইবে। এই চিঠির দোহাই দিয়া মাহফুজুর রহমান শুদ্ধমাত্র লিখিয়াছিলেন, ‘তাঁর ইচ্ছে ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার ভ্রমণের। সিলেটের কথা এলে দুজনের কথা বলতেন। এঁদের একজন ষাটের দশকের কবি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যাপক শাহজাহান হাফিজ অন্যজন কবি দিলওয়ার। মৃত্যুর আকস্মিকতার কারণে তাঁর সিলেট অঞ্চল ভ্রমণের ইচ্ছা পূর্ণ হল না।’

মাহফুজুর রহমান

আমার সহিত যখনই টেলিফোনে কথা হইত তখনই মাহফুজ ভাই এই প্রসঙ্গটি মনে করাইয়া দিতেন। আক্ষেপ করিতেন আহমদ ছফার মৌলভীবাজার আসার ইচ্ছাটা অপূরণীয় হইয়া গেল। গত প্রায় এক বছর ধরিয়া তিনি আমাকে বলিতেছিলেন আমি যেন একবার মৌলভীবাজার আসিয়া আমার অকালমৃত শিক্ষকের অপূর্ণ ইচ্ছাটা স্পর্শ করিয়া যাই। অনেকটা এই যুক্তিতেই আমার অনিচ্ছাটা পরাজিত হইয়াছিল। মাহফুজ ভাই নিজেই আমাদের স্বাগত জানাইতে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে আসিয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আসিয়াছিলেন একজন তরুণ রাজনীতিবিদ, বৃত্তি হিশাবে যিনি আইন ব্যবসায়ের পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। পরের দিন আমাদের বিদায় জানাইতেও তিনিই আসিয়াছিলেন। সঙ্গে আসিয়াছিলেন আরেকজন যিনি ব্যবসায়ে চিকিৎসাশাস্ত্রী কিন্তু প্রাণের তাগিদে কবি ও চিত্রশিল্পী। কে জানিত ট্রেনের জানালা হইতে পড়ন্ত বিকালের ঐ দেখাটাই হইবে আমাদের শেষ দেখা। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

মাহফুজ ভাইয়ের সহিত আমাদের বিদায় জানাইতে যিনি শ্রীমঙ্গল আসিয়াছিলেন তিনি—কবি ও বৈজ্ঞানিক নজমুদ্দিন মহসীন—মাত্র একমাসের মাথায়—মোতাবেক তেইশে আগস্ট সন্ধ্যাবেলা—আমাকে প্রথম খবর দিলেন মাহফুজ ভাই সম্ভবত আর নাই। আমরা যতক্ষণ মৌলভীবাজার ছিলাম ততক্ষণই—কেবল  বিশ আর একুশ জুলাই তারিখের মাঝখানের রাতটা ছাড়া—মাহফুজ ভাই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় আমাদের দাওয়াত দিয়াছিলেন। সেখানে মাহফুজ ভাইয়ের আলাদা মর্যাদাটা আমাদের চোখে না পড়িয়া যায় নাই। আমরা গিয়াছিলাম উদীচীর ছোট্ট কার্যালয়ে। সেখানে মির ইউসূফ ও তাঁহার সঙ্গীদের গান আমাদের মুক্ত করিয়াছিল। মাহফুজ ভাইকে এখানে সকলেই বলেন গবেষক। আমার মনে হইয়াছিল তিনি আসলেই কবি। বাংলাদেশের ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁহার যে বোধ তাহা একমাত্র কবির পক্ষেই মানায়।

আগেই বলিয়াছি আমার মৌলভীবাজার যাত্রার আসল লক্ষ্য ছিল মাহফুজ ভাইয়ের সহিত দেখা করা। তিনি ছিলেন আমাদের মৌলভীবাজার যাত্রার রথ। আমার সে আশা পূর্ণ হইয়াছিল। কিন্তু আমরা এক কাঁদি কলাও বেচিতে পারিয়াছিলাম। ঘটনাচক্রে মহাত্মা কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশত বছর পূর্ণ হইতেছে এই ইংরেজি ২০১৮ সালেই। এই উপলক্ষে শহরের টাউন হলে একটি ছোট্ট সমাবেশের আয়োজন করা হইয়াছিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ নেতা অধ্যাপক অভিনু কিবরিয়া এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের প্রবীণ নেতা কমরেড রাজেকুজ্জামান রতনের সহিত সেই সমাবেশে আমিও উপস্থিত হইয়াছিলাম। আশা করিয়াছিলাম, ঐ সমাবেশে মাহফুজ ভাইও কিছু বলিবেন। কিন্তু তিনি কেন জানি নীরব থাকার মধ্যেই কার্ল মার্কসের শিক্ষা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। এহেন বিনয় এ যুগে বড় বেশি দেখা যায় না।

একুশে জুলাই সকাল বেলা মাহফুজ ভাইয়ের ঘরে গেলাম। তাঁহার স্ত্রী এবং একমাত্র পুত্রের সহিত পরিচয় হইল। মাহফুজ ভাইয়ের লেখা আট-দশটি বইয়ের সহিত দেখাও হইল। তাঁহার কাছে লেখা আহমদ ছফার চিঠিতে পড়িয়াছিলাম এই কথাগুলি: ‘আপনার লেখা বিপিনচন্দ্র পালের জীবনীটা বেশ ভাল হয়েছে। আরো একটু বিস্তারিত লিখতে পারতেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিপিন পালের মতবিরোধের বিষয়টি স্পর্শ করলে গ্রন্থটি অধিকতর তথ্যবহুল হতে পারত। তবে বাংলা একাডেমী প্রকাশিত এই ধরনের গ্রন্থে খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো তুলে ধরার বিশেষ অবকাশ নেই। আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনি বইটি লিখে আমাদের সবাইকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করেছেন।’

বিপিনচন্দ্র পাল—বলা নিষ্প্রয়োজন—জন্মিয়াছিলেন হবিগঞ্জে। যেমন জন্মিয়াছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসও। মাহফুজ ভাই হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটা জীবনীও লিখিয়াছেন। তিনি আক্ষেপ করিয়াছিলেন বইটা প্রকাশ করিতে বাংলা একাডেমি দেরি করিতেছে। আমি অনুরোধ করিয়াছিলাম তিনি যেন একটু হালকা বোধ করিতেই আমাদের কাছে পাণ্ডুলিপিটা পাঠাইয়া দেন। একাডেমি না করিলে আমরা কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে বইটা ছাপাইতে বলিব। আমাদের সেই ইচ্ছাটা আর পূরণ হইল না।

৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এনটিভি, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আমি ব্যাখ্যাকার: সলিমুল্লাহ খান

সমাজতাত্ত্বিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান ৬০ বছর পূরণ করছেন এ বছর। তিনি ১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কক্সবাজারে। ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিধান রিবেরু। গত ২৮ জুলাই সলিমুল্লাহ খানের বাসায় এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়

বিধান রিবেরু : কবিতা লেখা বা অনুবাদ করলেও আপনি যেহেতু প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন, তাই প্রশ্ন করছি, প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনার মনে হয়। আর প্রবন্ধ লেখার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেন?
সলিমুল্লাহ খান : 
লেখক হবই সেভাবে তো শুরু করিনি, ঘটনাচক্রে পেছন ফিরে দেখি, আমি আর সে রকম কিছুই লিখিনি, শুধু প্রবন্ধ লিখেছি। তাতে বোঝা যাচ্ছে কি, আমি অন্য কিছু আর লিখতে পারি না। কবি সাখাওয়াত টিপু একটা ভালো প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা ব্যর্থ কবি তারাই ভালো গদ্যকার হয়, কিন্তু ব্যর্থ গদ্যকাররা কী হয়?

রিবেরু : অনেকেই বলেন, আপনার মুখ থেকেও বহুবার শুনেছি, অনেকে অনুযোগ করেন আপনার লেখা উদ্ধৃতিসর্বস্ব হয়। তবে সেখানে উদ্ধৃতিগুলো জাক্সটাপোজ হয়, এতে নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়। তাই কি?
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা পুরনো কথা। সিনেমা শিল্পের কথা। আপনি ভালো জানেন, যেটাকে একাধারে মন্তাজ বলে। লেখক কী? লেখক একাধারে সম্পাদক, চলচ্চিত্রের মন্তাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে সম্পাদনা। ফরাসিতে মন্তাজ মানে এডিটিং। চলচ্চিত্রকারের যে কাজ, একটি ছবির ওপর আরেকটি ছবি বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা, প্রবন্ধ লেখার মধ্যেও সেটা আছে। চলচ্চিত্র প্রবন্ধকে প্রভাবিত করবেই। এ প্রভাবে প্রধান নাট্যকার, আমি দেখলাম, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখার ভেতর আপনি কোথাও ‘আমি’ শব্দ খুঁজে পাবেন না, ‘আই’ নেই। ‘আমি’ হচ্ছে রোমান্টিকতার চিহ্ন, উনি বলেন। তার কোনো প্রবন্ধে ‘আমি’ পাবেন কিনা সন্দেহ, দু-একটা থাকলেও খুব গোপনে আছে। তার লেখা হলো মন্তাজের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনি যদি নিকটতম উদাহরণ খুঁজতে চান, আমি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের কথাই বলব।
আরেকজনের কথা বলব জাক লাকাঁ, যার লেখার ধরন আমাকে প্রভাবিত করেছে। এর কারণ হচ্ছে, আপনার কথা যদি আপনার ঐতিহ্যের সহায়তায় বলতে পারেন, তাহলে সমস্যা কি? লাকাঁ বলছেন, আমি তো ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাকার মাত্র। লোকে যখন আমাকে অনুবাদক বলে তখন আমার হাসি পায়। পৃথিবীতে অনুবাদ বলে কোনো কাজ নেই, সবই ব্যাখ্যা। আমি ব্যাখ্যাকার। আমি গদ্য লেখার সময় লক্ষ করি, আমার উদ্দিষ্ট কী? আমি কোন কথাটা পাঠকের কাছে নিতে চাই। আমাকে যদি বলা হয়, আপনি ২ মিনিটের মধ্যে লেখেন, তাহলে প্রথম কথাটা আমি আগে বলব। আমি সাধারণত লিনিয়ার ওয়েতে লিখি না। যেগুলো বিশ^বিদ্যালয়ে লেখা হয়, সেখানে একটি প্রস্তাবনা থাকে, তার একটি বিকাশ থাকে, প্রমাণ থাকে, তারপর সিদ্ধান্ত থাকে। আমি প্রথমেই আমার সিদ্ধান্তটা জানাই, এ কথাটি আমি বলতে চাই। তখন তার চারপাশে আমি ঘুরতে থাকি। সেভাবে লিখলে লেখাটা স্পাইরাল হয়, লিনিয়ার হয় না। এখন লেখার বহু ধরন আছে, আমি একটি ধরনের কথা বললাম।

রিবেরু : আপনার লেখালেখিসংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ শোনা যায়, হঠাৎ করেই সাধু ভাষায় লেখা শুরু করেছেন, আপনি উল্টোপথে হাঁটছেন, কারণ এখন তো কেউ আর ওই ভাষায় লেখেন না। আগে আপনি চলতি ভাষায় লিখেছেন। মুখের ভাষাও এসেছে লেখায়। সাধু ভাষায় লেখা নিয়ে আপনি কী বলবেন?
সলিমুল্লাহ খান :
 আমি পেছনে হাঁটছি বা সামনে হাঁটছি, এগুলো মেটাফোর। লেনিনের একটি উক্তি আছে না, এক কদম পেছনে যান, দুই কদম আগানোর জন্য। লক্ষ্যটা আগানোই, মেটাফরিক্যালি। আমাদের বাংলা ভাষার যে ক্ষমতা আছে, সেটা আমি দেখেছি। বর্তমানে যারা চলিত গদ্য লিখছেন, তাদের গদ্য কোনো গভীর চিন্তাভাবনা প্রকাশের উপযোগী আর নেই। এটা ছিল আমার প্রথম সমস্যা। আমি ২০০৩-০৪-০৫-এর দিকে চিন্তা করেছিলাম এ সমস্যা নিয়ে। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি সাধুতে লিখব। সাধুতে লেখার সমস্যা আছে, কিন্তু চলিত ভাষার সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমি সেখানে ফিরেছি। নদী যেমন মাঝেমধ্যে বাঁক পরিবর্তন করে, আপনারা এটাকে পিছ পরিবর্তন বলতে পারেন, আমি বাক পরিবর্তনই বলি। এ বাঁক পরিবর্তনকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন আধুনিকতার আরেক নাম। আমি মনে করি, আমাদের আধুনিক গদ্য হচ্ছে সাধু ভাষা। চলিত ভাষা হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক। মানুষ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত এ দেশে, এখনও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষায় সাধু টান আছে। জসীমউদ্দীনের গদ্য দেখেন, এটাকে পিছুটান বলা যাবে না। জসীমউদ্্দীন রবীন্দ্রনাথের পরে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথও অর্ধেক সাধু ভাষাতেই লিখেছেন। ১৯১৪ সালে তিনি সাধু ভাষা ছেড়েছেন, তবে এর আগেও চলতি লিখেছেন, ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ তো চলতি ভাষায় লেখা।
থিওরিটা হলো এই- সাধু ভাষার পর হলো চলিত ভাষা, এই যে পর্যায়ক্রম, যেটা আপনার প্রশ্নের মধ্যে নিহিত আছে, আগে আর পিছে, এটা কিন্তু সঠিক নয়, আমার মতে। বরং বাংলা ভাষায় বিভিন্ন রেজিস্টার আছে। গদ্যও আছে, পদ্যও আছে, কেউ কি বলবেন, পদ্য প্রাচীন, গদ্য আধুনিক? তো পদ্য লেখা মানে তো পেছনে ফিরে যাওয়া। কাজেই পদ্য লেখেন কেন? আমি এজন্য বলব, গদ্য-পদ্য যেমন পাশাপাশি থাকে, তেমনি সাধু ও চলিতও পাশাপাশি থাকে। এটাকে ইংরেজিতে রেজিস্টার বলে। বাংলায় আমরা অনুবাদ করে বলতে পারি, নানা রকমের খাতা খোলা আছে। আমরা সেরেস্তা কথাটা ফারসিতে ব্যবহার করি, ইংরেজিতে রেজিস্টার। অর্থাৎ আপনি এক খাতা থেকে আরেক খাতায় যাচ্ছেন। একসময় আমরা একটা বই শেষ করে আরেকটা বই পড়ি। আবার অনেক সময় পাশাপাশি দুইটা বই পড়ি। কিছুক্ষণ এ বই পড়ে ক্লান্ত হলাম, তারপর আরেকটি বই পড়লাম। তো সাধু আর চলিত দুটি ভাষা রীতি বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই স্বীকৃত। আমি মনে করি, এরা ঐতিহাসিক ক্রম নির্দেশ করে না। এটা বরং কাঠামোগত অবস্থান নির্ধারণ করে।
আমাদের ভাষার একটা সাধু রীতি আছে, একটা চলিত রীতি আছে। আপনি যেকোনো একটাতে সুইচ করতে পারেন। এখন বেশির ভাগ লোক চলিত রীতি ব্যবহার করে, এর কারণ কী? এখন বেশির ভাগ লোক তো সংবাদপত্র পড়ে। আমিও বক্তৃতা চলিত ভাষাতেই দিই, কিন্তু লেখার সময় সাধুতে লিখি। এটা আমাকে এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়। অর্থাৎ আসল কথা হচ্ছে, আমার প্রকাশভঙ্গি ও বক্তব্য কোনটাতে বেশি সহজে করতে পারি, আমার মতে কোনটাতে বেশি ফল লাভ করতে পারি। এখন যেসব পাঠক আমাকে বলে, আপনি সাধু ভাষায় লেখেন কেন, তাতে আপনার বিক্রি কমে যায়, এটা এম্পেরিক্যালি সত্যি নয়। ধরেন, নীরদচন্দ্র চৌধুরী সাধু ভাষায় লেখেন, তাতে কি আপনি মনে করেন তার পাঠক একজনও কমেছে? তিনি চলিততে লিখলে যত পাঠক পেতেন, তার চেয়ে কি কমেছে? উনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। এখন যদি বলেন, আপনি ইংরেজিতে লেখেন কেন? জবাব কি? সে বলবে, আমি ইংল্যান্ডের লোকজনকে পড়ানোর জন্য লিখি। আসলে কি সেজন্যই লেখেন? না, আমাদের সাহেবদের পড়ানোর জন্য তিনি লেখেন। সাদা বাঙালি সাহেবরা পড়বে। কালো সাহেব বাঙালিরা পড়বে।
তাহলে আমি আপনাকে তিনটা উদাহরণ দিলাম, আমি ইংরেজিতে লিখি, আমি সাধুতে লিখি, আমি চলিততেও লিখেছি, আমি পদ্যও লিখি। আমি এই চার ধরনের অপকর্ম করেছি। যেমন আমি প্লেটো অনুবাদ করেছি চলিত ভাষায়, সেটা ২০০৫-এ। ‘ফ্রয়েড পড়ার ভূমিকা’ আমি প্রথম সাধু ভাষায় লিখেছি। ভূমিকাটা, কিন্তু মূল লেখাটি চলিত ভাষায় লেখা। এর পর থেকে ধীরে ধীরে সাধু ভাষায় লিখতে শুরু করি। আমি হঠাৎ করে চলিত ভাষা ছেড়ে সাধু ভাষায় আসিনি। এখনও আমি মনে করি, সাধু ভাষার শক্তি চলিত ভাষার চেয়ে বেশি।

রিবেরু : অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তৃতার ওপর আপনি যে লেখাটা লিখেছিলেন সেটা চলিত ছিল, আবার সংস্কৃত শব্দের আধিক্যও ছিল। ১৯৮৩ সালে বেরিয়েছিল।
সলিমুল্লাহ খান : 
ওটা লিখেছি ১৯৮১ সালে, বের হয়েছে ১৯৮৩ সালে। তার আগেও প্রাক্সিস জার্নালে যে লেখা শুরু করেছি, সেখানে আমাদের গদ্যের মধ্যে দেখবেন কিছুটা সংস্কৃতবহতা আছে। তবে আমার লক্ষ্য ছিল সবসময় প্রাঞ্জল্য। প্রাঞ্জল্যের অভাব যেখানে হয়েছে, সেখানে আমার অক্ষমতা মাত্র। আমি তো গদ্য লেখা শুরু করেছি ১৯৭৬ সালেই। ১৯৭৬-এর আগে আমি কখনও গদ্য প্রকাশ করিনি। পদ্য প্রকাশ করেছি ১৯৭২ সাল থেকে। আমি প্রথম গদ্য লিখেছি পরীক্ষার খাতায় ছাড়া, ১৯৭৬ সালে, প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মুহম্মদ নুরুল হুদা সম্পাদিত একটি পত্রিকা ছিল, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি, পত্রিকার নাম ‘বিশ্বাস’, সেখানে আমার প্রথম একটি লেখা ছাপা হয়। তারপর আরেকটি পত্রিকা বেরিয়েছিল ‘স্বরূপের সন্ধানে’, সেখানেও আমার একটা গদ্য ছাপা হয়, ১৯৭৮-এ। ১৯৭৭-৭৮ সালে আমি প্রচুর গদ্য লিখেছি। হুদার ওখানে যা লিখেছিলাম, তা ছিল খুবই সংস্কৃতবহুল। কিন্তু লিখতে গিয়ে আমি যখন পরিচিত হলাম, বিশেষ করে কমরেড মোজাফফর আহমদের লেখা, প্রবন্ধ সংকলনের সাথে যখন পরিচিত হলাম, তখন দেখলাম, আরও প্রাঞ্জল ভালো বাংলা তো লেখা যায়! তারপর ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হলো।

রিবেরু : আপনি বলেছিলেন জসীমউদ্‌দীনের লেখা পড়েও আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা ২০০৩-এর পরে। আগে যখন লিখেছি, তখন কমরেড মোজাফফর আহমদকে আমার ভালো লেগেছে। যেমন একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন কেন তিনি কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, ওটার গদ্য বেশ প্রাঞ্জল, ওটা কিন্তু বেশি পরে দেখিনি। এই ১৯৮০/৮২তে দেখেছি। তার মানে একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমার দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১-এর মধ্যে, আমি লেখক হয়েছি।

রিবেরু : একটা সময় পর, ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে, আপনার গদ্যের মধ্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বেশি দেখা গেছে।
সলিমুল্লাহ খান : 
আমি প্রথম থেকেই আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য ‘হুতুম পেঁচার নকশা’ বা ‘আলালের ঘরের দুলালে’ যে আরবি-ফারসি শব্দ আছে, আমি এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করিনি। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার আমি শিখেছি, বিশেষ করে নজরুল ইসলামের লেখা পড়ে। আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি ডেফিনিটলি প্রভাবিত হয়েছি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দ্বারা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যত আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা পড়ে দেখলাম, আরে এটা তো বাংলা ভাষার মহাসম্পদ। প্রমথ চৌধুরীও ব্যবহার করেছেন, সেগুলো অল্প অল্প, পায়েসের মধ্যে কিশমিশের মতো। আরবি-ফারসি শব্দ একই কারণে ব্যবহার করি, যে কারণে নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন। এটা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে প্রসারিত করা। বাংলা ভাষার মজা হচ্ছে, এখানে সংস্কৃতও চলে, আরবি-ফারসিও চলে।

রিবেরু : আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারণে ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে মানুষের এক ধরনের পারসেপশন ছিল। মৌলবাদের সঙ্গেও অনেকে আপনাকে গুলিয়ে ফেলতেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
আপনি তো বলেছেনই ‘পারসেপশন’, এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যেমন আমার কোনো একটি আইডিয়া আছে, হেগেল বলছেন, আইডিয়াই পারসেপশনের প্রকাশ। কিন্তু আইডিয়ার সাথে কনসেপ্টের পার্থক্য কী? অর্থাৎ আপনি একটা সাপ দেখে দড়ি মনে করতে পারেন, এটা আপনার পারসেপশন নয়, এটা আপনার আইডিয়া, কেননা সাপও লম্বা, দড়িও লম্বা। কামড় দিলে না বুঝবেন, এটা সাপ। কামড় খাওয়ার আগে তারা এটা বোঝেনি। ২০১৩কে আপনি কামড় মনে করতে পারেন। তারা বোঝেনি, এজন্য আমি আমার লেখার কোনো নিন্দা করব না। আমি আমার লেখায় কোনো গুণগত উত্তরণ দেখি না, তার মধ্যে ক্রমাগত উত্তরণ আছে, ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি। কাজেই যারা আমার লেখাকে মৌলবাদী বা ইসলামি মনে করেছে, সেটা তাদের সমস্যা, আমার সমস্যা নয়। আমি সবসময়ই ইসলামি, আমি সবসময়ই মৌলবাদী, যদি তখনও থাকি, এখনও আছি, আর এখনও না থাকলে তখনও নেই। এর মধ্যে কোনো গুণগত রূপান্তর হয়নি আমার লেখায়। এখন আমি বলি, আমাকে যদি মৌলবাদী বলেন, তাহলে নজরুল ইসলামকে কী বলবেন? অর্থাৎ আমি যত উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি, এর চেয়ে কম বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেননি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা ভাষার চরিত্র সম্পর্কে যাদের পরিচয় নেই, এটা তাদের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একটা উদাহরণ দিই, যেমন আমার একটি বইয়ের নাম ‘আদম বোমা’। ‘বোমা’ শব্দটা হচ্ছে ইংরেজি থেকে নেয়া, ‘বোম্ব’ থেকে আমরা বানিয়েছি। ‘আদম’ হলো আরবি ও হিব্রু শব্দ। ফার্স্ট ম্যান। আদম ব্যাপারি, আদম ব্যবসা, সে রকম দুটো মিলিয়ে আমি নাম রেখেছি ‘আদম বোমা’। আরেকটি বইয়ের নাম ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’, কাছাকাছি ধরেন, ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’, অথবা ‘সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা’। এখন আমার নতুন একটি বই বেরোবে ‘মর্সিয়া’, মর্সিয়া মানে শোককথা। ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। মর্সিয়া মানে যারা মারা গেছে, তাদের জন্য আমি কাঁদছি। এখন বাংলা ভাষায় মর্সিয়ার চেয়ে ভালো শব্দ আর নেই। যেমন জার্মান ভাষায় ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’, মর্সিয়া তো এটারই অনুবাদ। এটা মোর্নিং প্লে নয়, এটা মোর্নিং সং। কিন্তু মোর্নিং এটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মোর্নিং অ্যান্ড ম্যালানকলিয়া, এটা দিয়ে লাকাঁ হেমলেটের ক্রাইসিস ব্যাখ্যা করেছেন। সমস্যা হলো, এটা জানতে হবে ম্যালানকোলিয়ায় ভোগা যাবে না। হেমলেট মোর্ন করতে পারছিলেন না, তাই ম্যালানকলিয়ায় ভুগছিলেন। তো মোর্নিং শব্দটি জার্মান ভাষায় ট্রাউয়ারস্পিয়েল, গ্রিক ভাষায় ট্র্যাজেডি। গ্রিক শব্দ ট্র্যাজেডি ইংরেজি ভাষায় চালু হয়েছে। এখন বাংলায় আমি জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল চালানোর চেষ্টা করছি, লোকে নিচ্ছে না। আমার আরেকটি বইয়ের নাম খুব মজার, সেটি হলো ‘আল্লাহর বাদশাহী’, এটা একটা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের বই। ইংরেজিতে আছে ‘কিংডম অব গড’, এখন গডকে আল্লাহ অনুবাদ করা যায় কিনা বা আল্লাহকে গড অনুবাদ করা যায় কিনা, সে সমস্যা তো আছেই। কিন্তু আমি করেছি। কিংডমের অনুবাদ করেছি বাদশাহী।

 

সাম্প্রতিক দেশকাল, বর্ষ ৫, সংখ্যা ২৮, ৩০ আগস্ট ২০১৮