গুরুর চণ্ডাল ভাব অথবা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক

এই যুগের বাঙ্গালা ভাষায় গুরু ও শিষ্যের সম্বন্ধ লইয়া পড়িবার মতন বহি বিশেষ লেখা হয় না। ইহাই নিয়ম। মহাত্মা আহমদ ছফা বিরচিত যদ্যপি আমার গুরু এই নিয়মের অতিক্রম।

joddopi.jpg…….
যদ্যপি আমার গুরু / আহমদ ছফা / প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, (প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮;) তৃতীয় সংস্করণ মে ২০০০ /
১১০ পৃষ্ঠা / ৮০ টাকা / প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী

……..
পত্রিকার পাতায় প্রথম প্রকাশের সময় ইহার শিরোনাম আরো চওড়া হইয়াছিল। নাম ছিল ‘যদ্যপি আমার গুরু প্রফেসর রাজ্জাক’। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত কাটিয়া নাম ছোট করিয়াছেন বলিয়া ধন্যবাদ পাইতেছেন। যদিও এই বই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের এক জাতীয় শিষ্য আহমদ ছফা লিখিত তবু ইহা গুরু-শিষ্য বিসম্বাদের অধিক হয় নাই। ইহাতে যে গুরুচিত্র পাইতেছি তাহাতে বলিতে গুরুতর লাভই হইয়াছে।
—————————————————————–
শুদ্ধ খাদ্য আর পাঠ্যই নহে, মানুষ চিনিবার আরেক পন্থা আছে। কে কাহার লগে চলাফেরা করেন তাহাও দেখিতে হইবে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী জয়নুল আবেদীন। বন্ধু তাঁহার আরো হইয়াছিল। দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদও তাঁহার শিষ্য অথবা বন্ধু। এগুলি ভালো বন্ধু। কিন্তু প্রদীপের নিচেও অন্ধকার থাকে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু নানা প্রকারের। তাঁহার সকল বন্ধু আহমদ ছফার পছন্দের হয় নাই। ছফা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন: মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরিয়া থাকিতেন।
—————————————————————-
অধ্যাপক রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বনিয়াছিলেন ১৯৩৬ সালে। ১৯৯৯ সালে পরলোক যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি নগরী ঢাকাতেই থাকিতেন। তাঁহার সম্পর্কে আহমদ ছফা যাহা যাহা লিখিয়াছেন তাহা তাহা এই অধ্যাপক মহোদয়ের জীবনের শেষ কিছু কম ৩০ বছর ব্যাপিয়া—১৯৭০ হইতে ১৯৯৮ সালের মধ্যে—ঘটিয়াছে। এইখানে শেষ জীবনের আবদুর রাজ্জাককে পাওয়া গেলেও যাইতে পারে—এহেন সম্ভাবনা আছে।

আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন তিনি দীর্ঘ আটাইশ ঊনত্রিশ বছর ধরিয়া অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্য পাইয়াছেন। তথাপি রাজ্জাক সাহেব একদিনের জন্যও তাঁহার নিকট পুরাতন হইয়া যান নাই। প্রতিবারই তাঁহার ব্যক্তিত্ব এবং জানাশোনার পরিধি ছাত্রের নিকট নতুন নতুন চমকের মতন মনে হইয়াছে। ইহাই আসল কথা। আহমদ ছফা জানাইতেছেন: প্রথম দিন তাঁহার সঙ্গে কথা বলিয়া যেভাবে বিস্মিত হইয়াছিলাম, এখনো—মানে বাংলা ১৪০৪ সনে (ইংরেজি ১৯৯৮)—একই ধরনের বিস্ময় তিনি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করিতেছেন।

বিস্ময় আসে কোথা হইতে? নবীনত্ব হইতে। ফরাসি চলচ্চিত্রকর রোবের ব্রেসোঁ (Robert Bresson) বলিতেন নবীনত্বই আসল। ইহা আদিসত্তাও নহে, সর্বশেষাবস্থাও নহে। আহমদ ছফা গুরু মারা নবীন বিশেষ শিষ্য। ইহাতে সন্দেহ নাই।


১৯৭০ সালের কথা।

কেহ কিংবা কাঁহারা জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার যশোপ্রার্থী তরুণ আহমদ ছফাকে বলিয়াছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের তত্ত্ব অবধান করিয়া উপাধি গ্রন্থ লিখিতে। বাংলা একাডেমী হইতে বৃত্তি পাইয়া তিনিও সরেনজর গবেষণা করিবার মানস করিলেন অধ্যাপক রাজ্জাকের অধীনে। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন গবেষণা করিবেন ভালো কথা। কিন্তু আমার অধীনে করিতে পারিবেন না। কারণ থিসিস যাঁহাদের অধীনে করা যায় তাঁহাদের প্রয়োজন বিশেষ যোগ্যতার—তাঁহাদিগকে প্রফেসর বা রিডার (এখনকার দেশীয় ভাষায় অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর) হইতে হয়। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন, ‘আমি ত মোটে লেকচারার।’ (ছফা ২০০৭: ১৭)

প্রশ্ন উঠিতে পারে, কোন লোক প্রায় ৩৪-৩৫ বছর পড়াইয়াও মোটে ‘লেকচারার’ কেন? ১৯৭২ সালে তাঁহাকে সরাসরি জাতীয় অধ্যাপক বানানো হইয়াছিল। ততদিনে তাঁহার গুণগ্রাহী ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা হইয়াছেন। অন্যায়ের শেষ হইল। এই যে সারাজীবন পদোন্নতি না লইয়া থাকা ইহা কি কম চমক সৃষ্টি করিবার মতন ঘটনা? নিয়মের অতিক্রম বা ব্যভিচার বলিতে কী বুঝায় যাঁহারা জানিতে চাহেন তাঁহারা এই ঘটনা আমল করিতেই পারেন।

শিক্ষক হিসাবে অধ্যাপক রাজ্জাকের প্রথম উপদেশটা আকর্ষণীয়। আহমদ ছফার গবেষণার বিষয় কী জিজ্ঞাসা করিয়া অধ্যাপক রাজ্জাক জানিলেন বিষয়টি অতি বড়। ‘১৮০০ হইতে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ এবং সাহিত্য সমাজ ও অর্থনীতি ক্ষেত্রে তাহার প্রভাব’—এই চওড়ালম্বা নাম শুনিয়া রাজ্জাক সাহেব কহিলেন, ‘এক্কেরে ত সাগরসেঁচার কাম। কার বুদ্ধিতে এই গন্ধমাদন মাথায় লইছেন?’ (ছফা ২০০৭ ১৮) এই সন্দেহ যথার্থ ছিল। আহমদ ছফা নিজেই জানাইয়াছেন তিনি কোনদিন এই থিসিস লিখিয়া সারিয়া উঠিতে পারেন নাই। (ছফা ২০০৭: ১৩) এই সত্য কথাটি আরো সত্য হইত যদি তিনি বলিতেন রাজ্জাক সাহেবের সাহায্য পাইয়াও পারেন নাই। অথচ ছফা বলিয়াছেন ইহার জন্য—না পারার জন্য—তিনি মহান আবদুর রাজ্জাককেই দায়ী মনে করেন।

আহমদ ছফা ‘দায়ী’ কথাটি নিছক নিন্দা করিবার ছলে বলেন নাই। ইহার একপাটি ছক তো আছেই। রাজ্জাক সাহেব তাঁহাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানান বই পড়িতে বলিয়া এক প্রকার সাগরে ডুবাইয়া দিলেন। সেই সাগর সেঁচার শেষ হয় নাই বলিয়াই আহমদ ছফার উপাধির বইটি লেখা শেষ হয় নাই। ইহা কি নিন্দার না প্রশংসার কথা পাঠিকা বলিবেন। আমি বলি ইহাও নিয়মের ব্যভিচার বৈ নহে। অধ্যাপক রাজ্জাকের চমক আরো এক দফা দেখিলেন আহমদ ছফা।

উপাধি পাওয়ার জন্য লিখিলেন। অতয়েব ‘কাম’চর্চা হইল। এমনি এমনি—মানে ‘আকাম’স্বরূপ—পড়িলেন। তাহাতে কী হইল? উত্তরে ছফা বলিলেন আকাম হইবে কেন? ইহার নাম তো ‘নিষ্কাম’ জ্ঞানচর্চা। নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে আর প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করিয়া আপন বিশ্বাসের উপর স্থির থাকিবার ব্যাপারে আবদুর রাজ্জাক অদ্বিতীয় ছিলেন—ছফা লিখিয়াছেন।

আমরা অনেক সময় বলিয়া থাকি যেমন গুরু তেমন শিষ্য। কিন্তু ভাবিলে টের পাইতাম ইহার উল্টাটাও কম সত্য নহে: যেমন শিষ্য তেমন গুরুও বটে। আহমদ ছফার মতন শিষ্য না পাইলে রাজ্জাক সাহেবের গুরুজীবন চোদ্দ আনা আমাদের অজানাই থাকিত। স্থানে স্থানে আহমদ ছফার নিজ ‘মনো-উক্তি’ প্রকাশিত হইলেও আমরা দেখিতেছি তাঁহার গুরুভক্তি কোথাও শিথিল কবরী হয় নাই।

গ্রন্থনামেই তাঁহার প্রথম দৃঢ় প্রকাশ। আমার গুরু যদি শুঁড়ি বাড়িও যাইয়া থাকেন, তাহাতে ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। তিনি গুরুই থাকেন। শাস্ত্রমতে ইহাই ভক্তি। ভাগ করিয়া দেওয়ার মতন মনোভাবই ভক্তি। আহমদ ছফা এই গুরুভক্তি প্রকাশ করিতে গিয়া কোথাও কোথাও গুরুকে চাঁড়াল করিয়া ছাড়িয়াছেন। তাঁহার বিবরণ এক স্থানে এই রকম: তখন অধ্যাপক সাহেব শহিদ মিনারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোয়ার্টারের একটিতে নিচের তলায় থাকিতেন। ছফা প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন ঘরটির পরিসর বিশেষ বড় নহে। চারিদিক বইপুস্তকে ঠাসা। ঘরটিতে একটিমাত্র খাট। না, খাট লিখা ঠিক হইবে না, চৌকি। সামনে একটি ছোট টেবিল। চৌকিটির আবার একটি পায়া নাই। সেই জায়গায় বইয়ের উপর বই রাখিয়া ফাঁকটুকু ভরাট করা হইয়াছে। চমৎকার ব্যবস্থা। পুরানা বইপত্রের আলাদা একটা গন্ধ আছে। ছফা সেই বইপত্রের জঞ্জালে হতবিহ্বল হইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। এই ঘরে যে কোন মানুষ আছে তিনি প্রথমে খেয়ালই করেন নাই। হঠাৎ দেখিলেন চৌকির উপর একটা মানুষ ঘুমাইয়া আছেন। একখানা পাতলা কাঁথা সেই মানুষটার নাক অবধি টানিয়া দেওয়া। চোখ দুইখানি বোজা। মাথার চুল কাঁচা ও পাকা। অনুমানে ছফা বুঝিয়া লইলেন, ইনিই তাঁহার আরাধ্য অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। (ছফা ২০০৭: ১৫-১৬)

অধ্যাপক রাজ্জাকের সদুপদেশমালার একাংশ ছফা সাহেব আমাদের জানাইতেছেন। অধ্যাপক বলিলেন, যখন কোন নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানিবার চেষ্টা করিবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে। কী খায় দেখিবার লাগিয়া কাঁচাবাজারে যাইবেন আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা উনারা কী গোছের করেন তাহা জানিবার লাগিয়া। কী খায় কী পড়ে এই দুইটা জিনিস না জানিলে কোন জাতির কোন কিছু জানিতে পারা যায় না। (ছফা ২০০৭: ২১-২২)


অধ্যাপক রাজ্জাক কী খাইতেন তাহার বিবরণ ছফার বইতে পাইবেন। একটা দৃষ্টান্ত: একটা বড় চীনামাটির প্লেটে চৌকোনা সাইজের পুরু পরাটার স্তূপ। ভুনা গরুর মাংস। চিতই পিঠার সঙ্গে ভাজা ইলিশের টুকরা। ফালি ফালি করিয়া কাটা পনির। ডিম ভাজা। ভাজা রূপচান্দা শুঁটকি। একপাশে গরম করা গতরাতের বাসি ভাত। আরেকটা বাটিতে ছফা দেখিলেন খুদ ভাত। রাজ্জাক স্যার বাসি ভাতের প্লেট হইতে চামচ দিয়া ভাত তুলিয়া লইলেন। তারপর ভাতের সঙ্গে কিছু তাজা মুড়ি মাখাইয়া লইলেন। ছফা জানিতে পারিলেন, ঢাকা জিলার কেরানিগঞ্জ এলাকার মানুষজন ভাতের সঙ্গে মুড়ি মাখাইয়া তৃপ্তির সহিত ভোজন করিয়া থাকেন। ইহা শুদ্ধ প্রাতঃকালের খাদ্য। ছফা দেখিলেন মাত্র।

শুদ্ধ খাদ্য আর পাঠ্যই নহে, মানুষ চিনিবার আরেক পন্থা আছে। কে কাহার লগে চলাফেরা করেন তাহাও দেখিতে হইবে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী জয়নুল আবেদীন। বন্ধু তাঁহার আরো হইয়াছিল। দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদও তাঁহার শিষ্য অথবা বন্ধু। এগুলি ভালো বন্ধু। কিন্তু প্রদীপের নিচেও অন্ধকার থাকে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু নানা প্রকারের। তাঁহার সকল বন্ধু আহমদ ছফার পছন্দের হয় নাই। ছফা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন: মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরিয়া থাকিতেন। উদাহরণের মধ্যে এককালীন উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু মাহমুদ ও অধ্যাপক ওয়াহিদুল হকসহ অনেকেই। সর্বমহি কথা।

আহমদ ছফা রাজ্জাক সাহেবের সহিত প্রেম করিয়াছেন—নিজের প্রেমকে তিনি বলিয়াছেন নিষ্কাম। (ছফা ২০০৭: ২৮) আথেনস নগরীর তরুণদল দলে দলে যে অমৃতের টানে সক্রাতেসের ছাতার তলে ছুটিয়া যাইত, ছফা সাহেবও সেই রকম ‘নিষ্কাম টান’ খাইয়া রাজ্জাক সাহেবের ছাতার নিচে ছুটিয়া গিয়াছিলেন। বলিয়াছেন, তাঁহার ব্যক্তিত্বের এমন একটা সুন্দর সম্মোহন রহিয়াছে যাহার আকর্ষণ এড়ানো তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। তিনি মনে মনে রাজ্জাক সাহেবকে তাজমহল নামক একটি দালানের সহিত তুলনা করিলেন। বলিলেন তাজমহলকে সামনে হইতে, পিছন হইতে, ডাইন হইতে, বাম হইতে যেইদিক হইতেই দেখা হউক না কেন দর্শকের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আসে না। আরো দেখার পিপাসা জাগে।

পরক্ষণেই ছফা ভাবিলেন এই তাজমহল সেই তাজমহল কিনা। তাঁহার ভাষায়: রাজ্জাক স্যার তাজমহল ঠিকই, তবে তাহাতে কোন দরজা জানালা নাই। থাকিলেও তাহাতে কোন ছিটকিনি নাই। এই দিকের হাওয়া ঢুকিয়া ওইদিক দিয়া চলিয়া যায়। ওইদিকের হাওয়া এইদিকে। এই রকম দীপ্তিমান মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তি কেন এই অজস্র বামুন-পরিবেষ্টিত অবস্থায় সকলের মাপে নিজেকে ছোট করিতেছেন তাহার কারণ ছফা আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। ছফা দাবি করিয়াছেন অনেক সময় লাগিয়াছে আবিষ্কার করিতে। কিন্তু আমরা সবিনয়ে বলিব তাহার দাবি অসারই থাকিয়া গিয়াছে। (ছফা ২০০৭: ২৯)

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একটা থিসিস লিখিয়াছিলেন। ১৯৫০ সালে উহা শেষ না করিয়াই তিনি ইংরেজভূমি হইতে বঙ্গদেশে ফিরিয়া আসেন। অনেক পরে ১৯৮০ সালে তিনি তাঁহার ছাত্র মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর নামে একটা বক্তৃতা লিখিয়াছিলেন। ইহা ছাড়াও তাঁহার আরো ছোটখাট লেখা থাকিতে পারে। কিন্তু সেইগুলি আজি পর্যন্ত এক জায়গায় করা হয় নাই। তাই লোকে বলে তিনি বিশেষ লেখেন নাই। ছফা বলিয়াছেন ইহার কারণ দুই হইতে পারে। অনেক সময় উৎকৃষ্ট বীজ পাথরে পড়িয়া নষ্ট হয়। ছফা সাহেবের ধারণা রাজ্জাক সাহেবের বেলায় তাহাই ঘটিয়াছে। দেশ ও কাল তাঁহার সহায় হয় নাই। আরেকটা কারণ—রাজ্জাক সাহেবের মানসিক উন্নতি। সেই কালের বামনদের স্তরে তিনি নামিতে পারেন নাই। ছফা শুদ্ধ দুইটা উদাহরণ দিয়াছেন: রাজ্জাক সাহেব যৌবনে ট্রটস্কি নামা রুশীয় দার্শনিক রাজপুরুষের চিরস্থায়ী এনকেলাব (পারমান্টে রেভুলুশন) শীর্ষক বহিও তর্জমা করিয়াছিলেন। আর এদিকে বাংলাভাষায় লেখা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বদেশি পুস্তিকা বাংলার ব্রত ইংরেজিতে লিখিয়াছিলেন।


অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন সারা বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে তাঁহার নাতিদীর্ঘ ছায়া পড়িয়াছে। ইহা ছফা জানেন। তিনি শুদ্ধ রাজনীতি বা অর্থনীতির বিষয়ই জানিতেন না, সাহিত্য, শিল্পকর্ম, সঙ্গীত ও অন্যান্য সূক্ষ্মকলা সম্বন্ধে তাঁহার জ্ঞান ও ভালোবাসা দুইটাই প্রবল ছিল।

রাজা রামমোহন রায় হইতে শুরু করিয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত আধুনিক বাংলাদেশের নামজাদা বুদ্ধিজীবীদের বিষয়ে রাজ্জাক সাহেবের নানা বক্তব্যের সকলই চমকপ্রদ। রামমোহন রায়ের সকল কাজের মধ্যে বাংলা ভাষা চর্চাই প্রধান। ইহাই অধ্যাপক রাজ্জাকের মত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে তিনি পুরুষসিংহ বলিতেন। সমাজনেতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে বিদ্যাসাগরের চেয়ে ছোট মাপের লোক বলিয়াছেন তিনি। ইহা চলিত জনমতের সহিত মিলিবে না। আহমদ ছফাও মানিতে পারেন নাই।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্বন্ধে প্রচার আছে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতিগণের মধ্যে পড়েন। কেহ কেহ বলেন আওয়ামী লীগ প্রণীত ছয়দফার মূল ধারণা তাঁহারই চিন্তার ফসল। এই সত্যের স্বীকৃতি পরোক্ষে পাওয়া যায় সারা পাকিস্তান যুগে তাঁহার পদোন্নতি না হওয়ার ঘটনায়। সবচেয়ে বড় কথা, পাওয়া যায় দেশ স্বাধীন হইবার পর তাঁহাকে মানবিক বিদ্যায় জাতীয় অধ্যাপক পদে বরণ করিবার সরকারি সিদ্ধান্তেও।

কিন্তু খটকা থাকিয়া যাইতেছে অন্য জায়গায়। একইভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও প্রাণ ঢালিয়াছিলেন তিনি। তিনি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর অনুরাগী ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি শুদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা বলিয়া তুচ্ছ করিতেন না। বলিতেন উহাও বাংলার মুসলমান সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য আন্দোলন ছিল। একইভাবে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য নামে ডাকিতেন না। আমি অদ্য কথা দুইটি বলিলাম তাঁহার দুই বইয়ের দোহাই দিয়া। একটি অপ্রকাশিত থিসিস, আমি উহা দেখিয়াছি। অন্যটি প্রকাশিত বক্তৃতা। আমি তাহার সমালোচনা এক সময় লিখিয়াছিলাম।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের রাষ্ট্রচিন্তার সহিত আমি দ্বিমত করিতাম। সেই পার্থক্য এখনো বজায় রহিয়াছে। কিন্তু তাঁহার মহত্ত্ব আমিও স্বীকার করিয়াছি। আহমদ ছফার সহিত একমত হইয়া আমিও বলিব নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকারই তাঁহাকে আর দশজনের নিকট হইতে আলাদা করিয়াছে। আহমদ ছফা বলিয়াছেন, বাঙালি মুসলমান সমাজকে বুদ্ধির দিক হইতে সাবালক করিবার পিছনে তাঁহার ভূমিকা আর সকলের তুলনায় উপরে আছে।

তিনি একদিন মনে করিয়াছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাইলে বাংলার মুসলমান সমাজের উপকার হইবে। এখন পাকিস্তান গিয়াছে, বাংলাদেশ আজও টিকিয়া আছে। রাজ্জাক সাহেব এই দুই যুগ, দুই সময় পার করিয়াছেন কিন্তু এক সমাজই রহিয়া গিয়াছে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিনিধি বলিয়া রায় দিয়াছেন। এই সুন্দর শব্দটার ইংরেজি অনুবাদ দাঁড়ায় সেকুলার বা সোজা মানুষ। ধর্ম বলিতে এয়ুরোপে যে বাঁকা বাঁকা চাকা বোঝাইত সেকুলার বা দুনিয়াদারি তাহার তুলনায় সোজাসাপ্টা।

ঢাকায় যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখন রাজত্ব করিতেছেন জাতীয় পরিচয়ে তাঁহারা বাঙালি মুসলমান। সেকুলার বাঙালি মুসলমান কথাটা কাঁহারও পছন্দ না হইলে বলিতে পারেন চাঁড়াল মুসলমান। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক নিঃসন্দেহে এই মুসলমান ও বাঙালি চণ্ডালদের গুরু।

দোহাই
১. আহমদ ছফা, যদ্যপি আমার গুরু, ৪র্থ সংস্করণ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৭)।
২. সলিমুল্লাহ খান, বাংলাদেশ: জাতীয় অবস্থার চালচিত্র, [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৩] তৃতীয় সংস্করণ (ঢাকা: বাঙলা, ২০০৩)।

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৪ মার্চ ২০০৯

সাম্রাজ্যবাদের যুগে দুই বিশ্বের কবিতা

samson-destroys-the-temple.jpg
শিল্পী মার্ক শাগালের ছবিতে মন্দির ভাঙছে স্যামসন।


Hegemony entails the dominance of a given discourse even among those who are not its beneficiaries. It is the cultural arm of imperialism.
যে ভাবধারায় আপনার স্বার্থ নাই সেই ভাবধারার সম্মুখে আপনিও যখন নতি স্বীকার করেন তখন বলিতে হইবে সেই ভাবধারার আধিপত্য কায়েম হইয়াছে। সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক প্রকাশ এমনই।
—একবাল আহমদ (২০০৬/ক: ২৩১)

alpa_1.jpgজাতীয় কবিতা পরিষদের আমন্ত্রণ পাইয়া আমার মনে হইয়াছিল আরেকবার জন্মগ্রহণ করিবার আমন্ত্রণ পাইয়াছি। কিন্তু লিখিতে বসিয়া টের পাইলাম এই কাজ অতিশয় কঠিন—পাণিগ্রহণের চেয়ে কম কঠিন নহে। কথাটা খুলিয়া বলিব।

আর যে অপবাদই কবিদের দেওয়া যাউক না কেন তাঁহারা বড় সহনশীল এই অপবাদ কেহ দিতে পারিবেন না। কবিরা সমালোচনা ব্যবসায়ীদের কত সহ্য করিতে পারেন তাহা আমার জানা নাই। স্মরণ করুন খোদ জীবনানন্দ দাশের বাক্য। সমারূঢ় সমালোচককে তিনি বরং কবিতা লিখিয়া দেখিবার রূঢ় উপদেশই দিয়াছিলেন। কবিরা শুদ্ধ স্বজনের সমালোচনা শুনিতে প্রস্তুত, তাহার অধিক শুনিবেন না।
—————————————————————–
জেমিসনের মতে তৎকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ সাহিত্য ব্যক্তি মানুষের গল্প বলিতে একেবারেই অপারগ, একান্তই অক্ষম। ব্যক্তির কথা বলিতে বলিতে সে অজান্তে কেবল জাতির গল্পই বলিয়া বসে।… আমরা ফরাসি শার্ল বোদলেয়ার আর বঙ্গীয় শামসুর রাহমানের দৃষ্টান্তযোগে দেখাইলাম জেমিসনের বক্তব্য সত্য না-ও হইতে পারে।… এজাজ আহমদ লিখিয়াছেন, একই কারণে কোনো দেশের সাহিত্যকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বের বলিয়া আলাদা করাটা বর্ণবাদের অর্থাৎ পুরাতন উপনিবেশবাদের জের।… জেমিসন মার্কিন জাতীয়তাবাদীর মতন লিখিলেও লোকে ভাবে তিনি বুঝি মার্কস ব্যবসায়ীও বটেন। এজাজ আহমদ তাঁহার মুখোশ কিছু পরিমাণে আলগা করিয়া দিয়াছেন।
—————————————————————-
ইচ্ছায় হই আর অনিচ্ছায় হই, আমি সমালোচনার আদার বেপারি। একদা কবিযশোপ্রার্থীদের সঙ্গে কিছু সময় আমিও কবিতা-জাহাজের খবর লইয়াছিলাম। এই কথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। সেই সুবাদে কিনা জানি না: কবিদের সমালোচনা করিবার খানিক অধিকার আমিও হয়তো অর্জন করিয়াছি।

তদুপরি শুনিয়াছি একালের আরবি প্রবাদে আরো একটা কথা চালু আছে। কুল্লু মান কানু আরাবুন ফি লোগাতিহিম, ওয়া সাকাফাতিহিম, ওয়া ওয়ালাইহিম ফা হুম আল-আরাব। অর্থাৎ যে তাহার বাক্যে, আচারে এবং বাসনায় আরব সে-ই আরব। (আহমদ ২০০৬/ক: ৩৭৭)

বাক্যে, আচারে এবং বাসনায় যে কবি সে-ই কবি। এই সংজ্ঞা গ্রহণ করিলে, আমি কবিদের সমালোচনা করিবার অধিকার খানিক অর্জন করিয়াছি কথাটা মনে হয় একেবারে ভিত্তিহীন নয়।


আফ্রিকা মহাদেশের অন্তঃপাতী গিনি বিসাউ ও সবুজ অন্তরীপ দ্বীপপুঞ্জ (Guinea Bissau and Cape Verde Islands) নামক দেশের নেতা মুক্তিসংগ্রামী ও তত্ত্বজ্ঞানী মহাত্মা আমিলকার কাব্রাল (Amilcar Cabral) তাঁহার দেশ স্বাধীন হইবার দুই বৎসর আগে—১৯৭৩ সনের ২০ জানুয়ারি
amilcar-2.jpg……..
আমিলকার কাব্রাল (১২/১০/১৯২৪ – ২০/১/১৯৭৩)
……..
তারিখে—সাম্রাজ্যবাদী পর্তুগিজ সরকারের লেলাইয়া দেওয়া গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হইয়াছিলেন। তাহারও কয়েক বৎসর পূর্বে—১৯৭০ সনে—এক বক্তৃতায়, উত্তর আমেরিকার কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বলিয়াছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটা অনেক বিষাদসিন্ধুই রচনা করিয়াছে। এইসব সিন্ধুর মধ্যে বিষন্নতম সিন্ধুর নাম জার্মানির জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক (ওরফে নাৎসি) দল। (কাব্রাল ১৯৭৩: ৩৯)

অনেকেই হয়তো বলিবেন, ইহা এমন কী নতুন কথা হইল? কাব্রাল বলিয়াছিলেন: নাৎসিরা মরে নাই, সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেই তাহারা বাঁচিয়া আছে। নতুন কথা সম্ভবত ইহাই।

কাব্রালের কয়েক বৎসর আগে—১৯৫০ সনের দশকে—ফরাসি দখলাধীন মার্তিনিক রাজ্যের নেতা, কবি ও মুক্তিসংগ্রামী এমে সেজার (Aimé Cesaire) এই কথাই অন্য কায়দায় বলিয়াছিলেন। নাৎসিনেতা হিটলারের পাপ মার্জনার অতীত—ইহা সকলেরই জানা আছে। তবে তাঁহার মতে, সকলের আরো জানা দরকার, ২০ শতকের সুশীল মানবদরদী ও অতি খ্রিস্টান এয়ুরোপীয় বুর্জোয়া ভদ্রলোকটির ভিতরেও একটা করিয়া হিটলার বাস করিতেছে।

* * *

cesaire.jpg……..
এমে সেজার (Aimé Cesaire, জন্ম. মার্তিনিক ২৬/৬/১৯১৩ – মৃত্যু. মার্তিনিক ১৭/৪/২০০৮)
…….
হিটলারকে বুর্জোয়া ভদ্রলোক ঘৃণা করেন কী কারণে, জানেন? হিটলার মানুষের অবমাননা করিয়াছে বলিয়া নহে। হিটলারকে খ্রিস্টান বুর্জোয়া দুনিয়া ঘৃণা করে মানুষের অবমাননাকে সে সাদা মানুষের সীমানা পর্যন্ত টানিয়া আনিয়াছে বলিয়া। হিটলারের আসল অপরাধ তাহা হইলে আর কিছুই নহে। এতদিন যাবৎ এয়ুরোপের খ্রিস্টান বুর্জোয়া জাতি আলজিরিয়ার আরব, হিন্দুস্তানের কুলি আর আফ্রিকার নিগ্রোদের জন্য যে দণ্ড, যে শাস্তি, যে মারধর একপাশে চিহ্ন দিয়া মওজুদ করিয়া রাখিয়াছিল সেই মারধরই আডলফ হিটলার খোদ এয়ুরোপ মহাদেশে টানিয়া আনে। (সেজার ২০০০: ৩৬)

এয়ুরোপের মহাযুদ্ধ বাধিয়াছিল—কে না জানে—পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের উপর, বেশির ভাগ মানুষের উপর এয়ুরোপীয় নানান পরাশক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠার লড়াই আকারে। এই সর্বোয়ুরোপীয় যুদ্ধের প্রথম ভাগে—১৯১৮ সন নাগাদ—নব্য পরাশক্তি জার্মানি পরাজিত হয় বলিয়াই ইহার দ্বিতীয় ভাগে জার্মানির মানুষ হিটলারের নাৎসি দলকে ক্ষমতায় চড়ার সুযোগ দেয়। এই দ্বিতীয় ভাগের যুদ্ধে খোদ হিটলারের পরাজয় হইলেও সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় হইয়াছে—এমন কথা বলার উপায় পাওয়া যায় নাই। উদাহরণ দিয়া বলিতেছি: যখন ব্রিটেন ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি ছাড়িয়া যাইতেছে, ঠিক তখনই স্বাধীনতার নাম দিয়া তাহারা ফিলিস্তিনে নতুন এয়ুরোপীয় উপনিবেশ—এসরায়েল রাষ্ট্র—বসাইতেছে।

অনেকখানি অভিনব কায়দায়, সন্দেহ নাই। তবু পরদেশদখল মানে পরদেশদখলই। আর উপনিবেশ মানে তো উপনিবেশই। (আহমদ ২০০৬/ক: ২৯৮-৩১৭)

ইহার কয়েক বৎসরের মধ্যেই শুরু হইল তথাকথিত ঠাণ্ডা যুদ্ধ। ১৯৫৫ সনের জোট নিরপেক্ষ বান্দুং মেলার সময় এয়ুরোপীয় সাংবাদিকরা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামক নতুন একটা কথা চালু করিয়া দিলেন।

‘তৃতীয় বিশ্ব’ কথাটার মধ্যেও অভিনব এক লুকাচুরি লুকাইয়া ছিল। এতদিনে বিশ্ব যে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন ও পরাধীন দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে তাহার সত্যকথাটি এই অলঙ্কারের আড়ালে চাপা পড়িয়া গেল। ১৯৯১ সন নাগাদ সাবেক রুশ সাম্রাজ্য ভাঙ্গিয়া পড়িবার পর—এতদিনে—স্পষ্ট হইতেছে, ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগেও বিশ্ব তিন ভাগে নয়, মূলত দুই ভাগেই ভাগ করা ছিল। এতক্ষণে ইহারই ডাকনাম দাঁড়াইয়াছে: উত্তর ও দক্ষিণ।

পৃথিবীকে আমরা যাহার যেমন ইচ্ছা দুই কেন, দুইশ ভাগেও ভাগ করিতে পারি। আমি সেই ভাগাভাগিতে আগ্রহ পোষণ করি না। আমার আবেগ অন্যত্র। বেশি পিছনে নাই বা গেলাম, অন্তত খ্রিস্টানি পঞ্জিকার ১৮ শতক পর্যন্ত গেলেই দেখিতে পাই তখন হইতেই বিশ্ব এক হইয়া গিয়াছে। এই খবর আমার শ্রবণ-প্রতিবন্ধী দুই কানে পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছাইয়াছে। নহিলে ১৯ শতকের গোড়ায় জার্মান মনীষী এয়োহান ফন গ্যেটেই (Johan von Goethe) বা কেন বিশ্বসাহিত্যের (Weltliteratur) ধুয়া তুলিতে যাইবেন? নানান দেশের নানান ভাষার ভেদ কাটিয়া বিশ্বসাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহা টের পাইতে না পাইতেই ফের দেখিতেছি: শুদ্ধ অধীন প্রজার দেশে নহে, স্বাধীন রাজার দেশেও একই দুনিয়া আবার—নতুন করিয়া—দুই দুই ভাগে ভাগ হইতে চলিয়াছে।

আমার কথাটা বুঝাইবার প্রয়োজনে আর জায়গার অভাবে মাত্র দুই জন কবির দুইটা কবিতা খুলিয়া দেখাইতেছি। উদ্দেশ্য, সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটা কী বস্তু আর ইহাকে কবিরাও বা কেমন করিয়া দেখেন তাহা নির্ণয় করা। অধিক করিতে পারিতাম তো দেখিতাম কবিরা যাহা দেখিতেছেন আমরা তাহা অনেক সময় দেখিতেই পাই না।

শুদ্ধ মনে রাখিবেন, সাম্রাজ্যবাদ কথাটা গালিও নহে, হেঁয়ালি তো কখনোই নহে। বিশেষ দেশের নীতিবিশেষও নহে। সাম্রাজ্যবাদকে ধর্মের সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। প্রাচীন যুগে এক দেশের রাজা অন্য দেশ জয় করিলে তাঁহার ‘সাম্রাজ্য’ গড়া হইত। নয়া জমানায় এক দেশের হাতে আর দেশ ধরা পড়িলে লোকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কথাটা যোগ করে। দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ বিস্তর আছে। যাহা আছে তাহাও সামান্য কথা নহে। পরদেশদখল ব্যবসায়ের অন্দরমহলে এই অসামান্য পরিবর্তনটা ঘটিয়া গিয়াছে খ্রিস্টের ১৯ শতকে।

জনৈক কনরাড স্মিট (Conrad Schmidt) বরাবর ১৮৯০ সনের ২৭ অক্টোবর তারিখে লেখা এক পত্রযোগে জার্মান মহাত্মা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এই পরিবর্তনের কথাটাই খুলিয়া বলিয়াছিলেন। তাঁহার বয়ান অনুসারে, ১৮০০ সালের আগে এয়ুরোপের নানান পরদেশ-মালিক বা ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশ হইতে কি করিয়া সস্তায় মালামাল আমদানি করা যায় সেই ফিকির সন্ধান করিতেছিলেন। শিল্প-কারখানার বিপ্লব তাঁহাদের এই পথ হইতে সরাইয়া নতুন পথে ঠেলিয়া দিল। আনুমানিক ১৮০০ সালের পর তাঁহারা যাঁহার যাঁহার দেশের শিল্প-কারখানার পণ্যসম্ভার বিক্রয়ের স্বার্থে তাঁহার তাঁহার ঔপনিবেশিক বাজার রক্ষা করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। (মার্কস ও এঙ্গেলস ১৯৭৫: ৩৯৭-৯৮; হাবিব ২০০৭: ৫৮-৫৯)

কার্ল মার্কস তাঁহার যৌবনের এক সাংবাদিক রচনায় এই অর্থে ১৮১৩ সালকেই সাম্রাজ্যবাদের সূচনাকাল বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলেন। কারণ ভারতবর্ষের সহিত ব্যবসায়-বাণিজ্যে ইংরেজ পূর্ব ভারত কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার রহিত করিয়া ভারতের বাজারে ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি সকল পণ্যের প্রবেশাধিকার অবাধ করিয়া দেওয়া হয়। সকলেই জানেন, এই ব্রিটিশ আইনের নাম ১৮১৩ সালের সনদ আইন।

ইহার ফলে ভারতবর্ষের জাতীয় শিল্প-কারখানা ধ্বংসের পথও খুলিয়া যায়। পুঁজি প্রথম খণ্ডে কার্ল মার্কস ব্রিটিশ আইনসভার দোহাইযোগে বলিয়াছিলেন ভারতীয় তাঁতির হাড্ডি জমিয়া হিন্দুস্তানের পথপ্রান্তর সাদা হইয়া গিয়াছে। এই সাম্রাজ্যবাদ-ধর্মেরই অপর নাম ২০ শতকের কোন কোন বিলিতি পণ্ডিত রাখিয়াছিলেন ‘স্বাধীন বাণিজ্যের সাম্রাজ্যবাদ’ (Imperialism of Free Trade)। অধীন দেশের পণ্য লুটিয়াই মাত্র এই সাম্রাজ্যবাদের সাধ মিটিল না। অধীন দেশের পণ্য তৈরির ক্ষমতাও সে লুটিয়া লইল। মহাত্মা আমিলকার কাব্রাল সাম্রাজ্যবাদ বলিতে পতিত দেশের পণ্য তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করিতে সক্ষম এই শক্তিমত্তার কথাই নির্দেশ করিয়াছিলেন।

আমরা এই প্রবন্ধে সেই প্রস্তাবই আমল করিতেছি মাত্র।


খ্রিস্টান পঞ্জিকার ১৮৪৭-৪৮ সনে মহান ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire) ‘হাবিল ও কাবিল’ (Abel et Caïn) নামে একটি ছোট্ট কবিতা লিখিয়াছিলেন। ইহা তাঁহার জগদ্বিখ্যাত আবিলের ফুল (Les Fleurs du mal) কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। বিখ্যাত বাংলা অনুবাদক বুদ্ধদেব বসু তাঁহার গ্রন্থে এই কবিতাটি গ্রহণ করেন নাই। (বোদলেয়ার ১৯৮৬: ২২৯-৩০; দেখুন, সংবর্ধনা ১, ২)

কবিতাটির স্বাদ অল্পস্বল্প লইতে হইলেও খ্রিস্টান ও এয়াহুদি পুরাণের গল্পটা কম বেশি স্মরণ করিতে হয়। তাই আমি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ (প্রকাশ কিতাবুল মোকাদ্দস) হইতে ইহার কিছু অংশ হাজির করিতেছি:

পরে আদম আপন স্ত্রী হাওয়ার কাছে গমন করিলে তিনি গর্ভবতী হইয়া কাবিলকে প্রসব করিয়া বলিলেন, মাবুদের সহায়তায় আমি মানুষ প্রাপ্ত হইলাম। পরে তিনি হাবিল নামে তাহার সহোদরকে প্রসব করিলেন। হাবিল মেষপালক ছিল, ও কাবিল কৃষক ছিল। পরে কালানুক্রমে কাবিল নজরানারূপে মাবুদের উদ্দেশ্যে ভূমির ফল পেশ করিল। আর হাবিলও নিজের পালের প্রথমজাত কয়েকটি পশু ও তাহাদের চর্বি কুরবানী করিল। তখন মাবুদ হাবিলকে ও তাহার নজরানা কবুল করিলেন; কিন্তু কাবিলকে ও তাহার নজরানা কবুল করিলেন না; এই জন্য কাবিল অতিশয় ক্রুদ্ধ হইল, তাহার মুখ বিষণ্ন হইল। তাহাতে মাবুদ কাবিলকে বলিলেন, তুমি কেন রাগ করিয়াছ? তোমার মুখ কেন বিষণ্ন হইয়াছে? যদি সদাচরণ কর, তবে কি কবুল হইবে না? আর যদি সদাচরণ না কর, তবে গোনাহ্ দরজায় গুঁড়ি মারিয়া রহিয়াছে। তোমার প্রতি তাহার বাসনা থাকিবে, কিন্তু তোমাকে তাহার উপরে কর্তৃত্ব করিতে হইবে। আর কাবিল আপন ভাই হাবিলের সহিত আলাপ করিল, পরে তাহারা ক্ষেত্রে গেলে কাবিল আপন ভাই হাবিলের বিরুদ্ধে উঠিয়া তাহাকে কতল করিল। পরে মাবুদ কাবিলকে বলিলেন, তোমার ভাই হাবিল কোথায়? সে জওয়াব দিল, আমি জানি না; আমার ভাইএর হেফাজতকারী কি আমি? তিনি বলিলেন, তুমি কি করিয়াছ? তোমার ভাইয়ের রক্ত ভূমি হইতে আমার কাছে ক্রন্দন করিতেছে। আর এখন, যে ভূমি তোমার হাত হইতে তোমার ভাইয়ের রক্ত গ্রহণের জন্য আপন মুখ খুলিয়াছে, সেই ভূমিতে তুমি লানতী হইলে। ভূমিতে কৃষিকাজ করিলেও তাহা আপন শক্তি দিয়া তোমার খেদমত আর করিবে না; তুমি দুনিয়াতে পলাতক ও ভবঘুরে হইবে। তাহাতে কাবিল মাবুদকে বলিলেন, আমার অপরাধের ভার অসহ্য। দেখ, আজ তুমি ভূতল হইতে আমাকে তাড়াইয়া দিলে, আর তোমার দৃষ্টি হইতে আমি লুক্কায়িত হইব। আমি দুনিয়াতে পলাতক ও ভবঘুরে হইব, আর আমাকে যে পাইবে, সেই কতল করিবে। তাহাতে মাবুদ তাহাকে বলিলেন, এই জন্য কাবিলকে যে কতল করিবে, সে সাত গুণ প্রতিফল পাইবে। আর মাবুদ কাবিলের জন্য একটি চিহ্ন রাখিলেন, পাছে কেহ তাহাকে পাইলে কতল করে।পরে কাবিল মাবুদের খিদমত হইতে প্রস্থান করিয়া এদনের পূর্বদিকে নোদ দেশে বাস করিল। আর কাবিল আপন স্ত্রীর কাছে গমন করিলে সে গর্ভবতী হইয়া হনোককে প্রসব করিল। আর কাবিল একটি নগর পত্তন করিয়া আপন পুত্রের নামানুসারে তাহার নাম হনোক রাখিল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘পয়দায়েশ,’ ৪: ১-১৭)

ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রাঙ্গাইবার কাহিনী হিসাবে আমরা সচরাচর এই গল্পের ব্যাখ্যা করিয়া থাকি। ইহাতে কিন্তু কয়েকটা জিজ্ঞাসার জবাব মিলিতেছে না। যেমন মাবুদ কী কারণে কাবিলের নজরানা গ্রহণ করিলেন
the-killing-of-abel.jpg
হাবিল ও কাবিল,শিল্পী: লরেনজো ঘিবার্তি (Lorenzo Ghiberti, জন্ম. ফ্লোরেন্স ১৩৭৮ – মৃত্যু. ফ্লোরেন্স ১৪৫৫)

না? আর আর দশ শাস্তির জায়গায় মাবুদ কেন তাঁহাকে শুদ্ধ পলাতক ও ভবঘুরে হইবার দণ্ড বিধান করিলেন? করিলেনই যদি তবে আবার তাঁহাকে নতুন নগর পত্তন করিবার তৌফিকই বা কেন দিলেন?

বিশেষ জ্ঞানীরা বলিতেছেন, এই পুরাণের সহিত আগের জমানার আরো একখানা পুরাণ মিশিয়া একাকার হইয়াছে। তাই আমাদের বোধের এই গণ্ডগোল। প্রথমে ছিল কাবিলের নগর-পত্তনের গল্প। সেখানে তিনি বীর বা নায়ক ছিলেন। পরে ভ্রাতৃহত্যার গল্পটা জোড়া দিয়া তাঁহাকে পবিত্র ভূমি হইতে তাড়াইয়া দেওয়ার ঘটনাকে বৈধতা দেওয়া হয়।

খেয়াল করিলে আরো দেখিবেন, কাবিল প্রথমে কৃষক ছিলেন। কিন্তু হিব্রু ভাষায় কাবিল শব্দের উচ্চারণ ‘কায়িন’ (Kayin), যাহার অর্থ কামার বা ইংরেজিতে যাহাকে বলে Smith, অর্থাৎ কারিকর। আর হাবিল শব্দের হিব্রু উচ্চারণ হেবেল বা এবেল (Hebel)। ইহার অর্থ ‘এক ঝাপটা বাতাস’। পেশায় তিনি মেষপালক, অর্থাৎ ভবঘুরে। এই ঘটনায় গৃহস্থ ভবঘুরে হইল আর ভবঘুরে হইল গৃহস্থ। এক কথায় বিপ্লব ঘটিল। (বেলৎস ১৯৮৩: ৫৬-৫৭, ৬৮-৭০; আসিমব ১৯৮১: ৩৩-৩৪; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারকে যাঁহারা এতদিন নিছক রতিগ্রস্ত কবি কিংবা অমঙ্গলবোধের নবি ভাবিয়া তৃপ্তিলাভ করিতেছিলেন তাঁহারা বোধ হয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদকে তিনি কতখানি সমার্থক মনে করিতেন। উদাহরণ দিয়া বলিব, বুদ্ধদেব বসু কিংবা আবু সয়ীদ আইয়ুব যদি জার্মান মহাত্মা বাল্টার বেনিয়ামিনের (Walter Benjamin) লেখা দুই-চারি পাতা পড়িবার সুযোগও পাইতেন কি লঙ্কাকাণ্ডটাই না হইত! (বেনিয়ামিন ২০০৬/খ: ৯; বেনিয়ামিন ১৯৯৭: ২২) আমাদের আলোচ্য ‘হাবিল ও কাবিল’ কবিতায় একই বোদলেয়ারকে দেখিতেছি অনশনবন্দি দুনিয়ার বঞ্চিত লাঞ্ছিত সর্বহারার কবি আকারে।

এক্ষণে একটুখানি বিশদ করিতেছি।

এই যুগের সাম্রাজ্যবাদ যে বিষাদসিন্ধুর অপর নাম সেই বিষাদসিন্ধুর তীরে যাহারা ভবঘুরে, পলাতক অর্থাৎ যাহাদের উচ্ছেদ করা হইয়াছে তাহাদেরই নাম প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা। এই সর্বহারাকে কবিজনোচিত কায়দায় ‘শ্রেণী’ না বলিয়া বোদলেয়ার বলিয়াছেন ‘জাতি’।

baudelaire2.jpg……
শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire; জন্ম. প্যারিস ৯/৪/১৮২১ – মৃত্যু. প্যারিস ৩১/৮/১৮৬৭)
……..
কার জাতি আর? খোদ কাবিলের জাতি। মাবুদ এই কাবিলের জাতির উপর এতখানি নাখোশ কেন? বোদলেয়ারের বিচারে এই বিরোধ ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধমাত্র নহে। এই বিবাদ বোদলেয়ার বলিবেন দুই শ্রেণীর বিবাদ, যদিও তাঁহার ব্যবহৃত শব্দটি ‘দুই জাতির বিবাদ’। এই প্রবন্ধে ইহাকেই আমি বলিয়াছি দুই বিশ্বের বিবাদ। শার্ল বোদলেয়ার লিখিয়াছেন:

হাবিলের জাত, ঘুমাও, পিয়ে যাও আর খাও
দিলখোশ মাবুদের মুখে মিঠা হাসি
কাবিলের জাত, দাও গড়াগড়ি দাও
পচা কাদায়, আর দাও নিজের গলায় ফাঁসি।
এই স্থলে দুই জোড়া মাত্র উদ্ধৃতি লিখিলাম। এই রকম ১৬ জোড়া কথা তিনি লিখিয়াছেন এই কবিতায়। এই যুগ সর্বহারার যুগ। যাহার নিজের গতর ছাড়া বেচিবার আর কিছুই নাই তাহাকেই সর্বহারা বলে। সেই সর্বহারাকেই বোদলেয়ার ‘কাবিলের জাত’ জ্ঞান করিয়াছেন।

পুরা কবিতাটি আমি এই রচনার শেষে, সংবর্ধনা অংশে, জুড়িয়া দিয়াছি। (দেখুন, সংবর্ধনা ২) এইখানে শুদ্ধ এইটুকু বলিয়া রাখি, শেষমেশ বোদলেয়ার তাঁহার রায় ঘোষণা করিলেন। বলিলেন: হাবিলের জাত, একদিন তোদের মৃতদেহ এই দুর্গন্ধময় মাটির সার হইবে। আর কাবিলের জাতের কর্তব্য তাহাতেই শেষ হইবে না। যেদিন কৃষকের কাঠের ঠেলা লাঙ্গল আসিয়া হাবিলের জাতির তলোয়ার গুড়াইয়া দিবে সেদিন তাঁহাদের লজ্জা লুকাইবার জায়গাও থাকিবে না। আর কাবিলের জাতিকে তিনি এই উপদেশ দিলেন: যাও, ঊর্ধ্বলোকে আরোহন কর, আর খোদ মাবুদকে ছুঁড়িয়া মার এই দুনিয়ায়! (বোদলেয়ার ১৯৮৬: ২২৯-৩০)


এক্ষণে আমার আলোচ্য দ্বিতীয় কবিতা। বাংলাদেশের শামসুর রাহমান তাঁহার দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩) বইয়ের একটা কবিতার নাম রাখিয়াছেন ‘স্যামসন’। ইহা তাঁহার শ্রেষ্ঠ কবিতার অষ্টম সংস্করণেও পাওয়া যাইতেছে। শামসুর রাহমান শুদ্ধ গ্রিক পুরাণের সেবাকবি—ইহা পুরাপুরি সত্য নহে। এয়াহুদি পুরাণেও তাঁহার অনাস্থা নাই। ‘স্যামসন’ কবিতা ইহারই প্রমাণ। তবে এই এয়াহুদি কাহিনীর পাঠ তিনি ১৭ শতকের ইংরেজ মনীষী ও বিপ্লবী জন মিল্টনের হাত হইতে লইয়াছেন বলিলে বেশি বলা হইবে না। (মিল্টন ১৯৮২; আসাদ ২০০৭: ৭৫)

এই রকম লওয়ায় তিনি কখনোই কাঁচা ছিলেন না। প্রমাণস্বরূপ তাঁহার অনূদিত ফরাসি কবি পল এলুয়ারের (Paul Eluard) বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করা যায়। কয়েক পঙ্‌ক্তি বাদ দিলে অনুবাদকর্মটাকে মোটামুটি বিশ্বস্তই বলা চলিত।

ইংলন্ডের ১৭ শতকিয়া গোঁড়া (Puritan) খ্রিস্টান বিপ্লবী কবি জন মিল্টন পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বিশেষ পুরাতন নিয়মের বিধান কেমন করিয়া আপন করিয়া লইলেন তাহা লইয়া অনেক কথা হইয়াছে। শিমশোনকে এয়াহুদি জাতির মুক্তিদাতা বীরযোদ্ধা জ্ঞান করিয়াই তো কবি মিল্টন তাঁহার সহিত আপন আত্মা মিশাইয়াছেন। এয়ুরোপের সাহিত্যে ইহার ভাব অনেক দূর পর্যন্ত গড়াইয়াছে। ‘গাজায় চক্ষুহীন’ (Eyeless in Gaza) হৃতবল বীরের হইয়া আমাদের কবি শামসুর রাহমানও কম বিলাপ করেন নাই:

… এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
(রাহমান ২০০৯: ১০৬; দেখুন, সংবর্ধনা ৩)
লন্ডনে রাজা ২ নং চার্লসের শাসনাধীন জন মিল্টন নিজেকে ‘গাজায় চক্ষুহীন দাসমণ্ডলে যাঁতাপেষা’ স্যামসনের নিকটাত্মীয় ভাবিবেন, ইহাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু স্যামসন যে আত্মহত্যা করিয়া বিজয় লাভ করিল সেই আত্মহত্যায় নির্বিকার থাকাও তাঁহার পক্ষে সম্ভব হইল। কেমন করিয়া সম্ভব হইল?

এই প্রশ্নের মুখে লা-জওয়াব জনৈক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী ইংরেজ পণ্ডিত এক পর্যায়ে বলিয়াই ফেলিলেন: ‘শেষ পর্যন্ত মিল্টন বুঝিতে পারিয়াছিলেন তিনি জিতিয়াছেন—এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই জিত নীতিশক্তি আর বুদ্ধিশক্তিরই জিত। হারানো বেহেস্ত (Paradise Lost) মহাকাব্যের কবি পরিচয়ে তাঁহার ফিরতি প্রতিষ্ঠার ঘটনায় এই সত্যই কায়েম হইয়াছে।’ (প্রিন্স ১৯৮২: ১৩)

মিল্টনের ‘বিবাদী স্যামসন’ (Samson Agonistes) কবিতাটি কি গ্রিক ট্রাজেডি বা বিধির বিধানের সহিত তুলনীয়? উত্তরে ২০ শতকিয়া ইংরেজ মহাত্মা স্যার রিচার্ড জেব (Sir Richard Jebb) কহিয়াছিলেন: কদাচ নহে। স্যামসনের চরিত্র খারাপ ছিল মানে তাঁহার চরিত্রে নারীদোষ বিশেষ ছিল। এই কথা তাঁহার স্বজাতীয় এয়াহুদিরাই বলিতেন। তাই একবার তাঁহারা তাঁহাকে হাত পা বান্ধিয়া শত্রু ফিলিস্তিনিদের হাতে সঁপিয়াও দিয়াছিল।

ইহাকে লোভ-লালসার দোষও বলা চলিত। সাধারণ খ্রিস্টান লোকজন তাঁহার দুর্ভোগের সহিত সচরাচর এই চরিত্রদূষণকে কারণ বলিয়া যোগ করেন। আমরা তাহাতে কী করিয়া আপত্তি করিব? কিন্তু জন মিল্টন তো এই দিকটা উপেক্ষাই করিলেন। তা করুন। স্যামসনের করুণ মৃত্যুসংবাদ বহিয়া আনিবার পর দণ্ডায়মান সাংবাদিকের সমক্ষে কোরাস গ্রিক কায়দায় গাহিলেন:

Chorus
O dearly-bought revenge, yet glorious!
Living or dying thou hast fulfill’d
The work for which thou wast foretold
To Israel, and now ly’st victorious
Among thy slain self-kill’d,
Not willingly, but tangled in the fold
Of dire necessity, whose law in death conjoin’d
Thee with thy slaughter’d foes in number more
Than all thy life had slain before.
(Milton, 1982: p. 54, ll. 1660–68)
নিচে ইহার খসড়া বাংলা তর্জমা দিতেছি:

চড়াদামে কেনা প্রতিশোধ তুমি তবু গরীয়ান!
জীবিত কি মৃত করিয়াছ পালন
কর্তব্য তোমার, তোমার অপেক্ষায়
ছিল এসরায়েল এতদিন, আর এখন বিজয়ে শুয়ে আছ
আপন হাতের মৃতের সঙ্গী তুমি আত্মঘাতী
ইচ্ছায় কখনো হও নাই, নিদারুণ দরকারের ফাঁদে
পড়িয়াছ। ইহারই বিধানে জীবৎকালে যত না
করিয়াছ হত্যা তাহার অধিক করিলে
হত তুমি মরণের ক্ষণে
আর সেই শত্রুসঙ্গে তোমাকেও মাখিল এই বিধি।
কোরাসের গলার ঘরে এই স্বর কার স্বর? কে সে জন? জন মিল্টন না ঈশ্বর? একটু পরই আমরা দেখিব এই স্থির অবিনশ্বর স্বর আর কাহারো নহে, খোদ স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর স্বর ইহা। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে দুনিয়া আবারও শুনিল সেই স্থির স্বর। শামসুর রাহমান তাই আজও অমর।

বর্তমান যুগের এসরায়েল রাষ্ট্রে শিমশোন ওরফে স্যামসনকে দুর্ধর্ষ এয়াহুদির উদাহরণ বলিয়া পরিচয় দেওয়া হয়। একালের মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি এসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভারের নাম রাখা হইয়াছে ‘স্যামসন অপশন’ (The Samson Option) বা স্যামসন কৌশল। শামসুর রাহমান কোনোদিন এই কথা জানিতে পারিয়াছিলেন কিনা তাহা জানিতে আমার বড় সাধ জাগে। (আসাদ ২০০৭: ৭৬)

ইহার মানেও আর কিছুই নহে: ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে।’ দুঃখের মধ্যে, নিজেকে মারিয়া হইলেও শত্রু নিধন করিবার কৌশলের পারমাণবিক সংস্করণের নামই এসরায়েল রাখিয়াছে স্যামসন কৌশল। হাতের চেটোর মতন ছোট্ট এক টুকরা ফিলিস্তিন নামক দেশে এই বোমা ফাটাইলে আপন শত্রুর সঙ্গে খোদ এসরায়েলও ধ্বংস হইবে। এই অকল্পনীয় বর্বরতার সভ্য নামই দাঁড়াইতেছে দি স্যামসন অপশন।

বলা হয়তো বাহুল্য, এই নাম বা এই চিন্তার জন্ম মোটেও ২০০১ সনের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে নহে, খানিক আগেভাগেই বটে। ১১ সেপ্টেম্বরের আত্মঘাতী বোমারুদের আমরা যদি সঙ্গত কারণেই ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলিয়া থাকি তবে স্যামসনকে আমরা কোন উপাধি দান করিব?

আজিকালি এসরায়েল রাষ্ট্রের পাঠ্যাপাঠ্য সকল বইতে স্যামসনকে স্বাধীনতা সংগ্রামী কিংবা মুক্তিযোদ্ধা বলিয়াই প্রশংসা করিতে দেখা যায়। শুদ্ধ এসরায়েল কেন, খোদ বিপ্লবী ইংরেজ কবি অন্ধ জন মিল্টনও শেষ বয়সে নিজেকে স্যামসন ভাবিতেন। বন্দি স্যামসনের চক্ষুযুগল শত্রু ফিলিস্তিনিরা উপড়াইয়া লইয়াছিল। আর মিল্টনও অন্ধ হইয়া গেলেন। মিল্টনের পথ ধরিয়া শামসুর রাহমানও কি তাহাই করিলেন? তাঁহারও চক্ষু গেল গেল! ১৯৭৩ সন নাগাদ তিনিও প্রকাশ করিলেন বীরগাথা ‘স্যামসন’। ততদিনে বাংলাদেশ বিদেশি বন্দিশিবির হইতে স্বাধীন স্বদেশ হইয়া দাঁড়াইল। কবি গাহিলেন:

ক্ষমতামাতাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা,
তোমাদের হোমরা-চোমরা
সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?
মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার
করুক যতই পাত্র-মিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।
(রাহমান ২০০৯: ১০৫-০৬)
স্যামসন শব্দটির হিব্রু মূল উচ্চারণ ‘শিমশোন’। অর্থ ‘সূর্যের সন্তান’ বা ইহার কাছাকাছি কিছু। এসরায়েলি পুরাণ অনুসারে ফিলিস্তিনের একাংশের সমুদ্রতীরে যখন প্রাচীন ফিলিস্তিনি জাতি বসবাস করিত তখনো এয়াহুদি জাতির মধ্যে রাজতন্ত্র তথা রাজার পদই চালু হয় নাই। তখন দেশনেতাদের কাজি (হিব্রু ভাষায় ‘সোফেতিম’) উপাধি দেওয়া হইত। আমাদের শিমশোন ওরফে স্যামসন ছিলেন কাজিগণের মধ্যে সর্বশেষ বা ১২ নম্বর। (আসিমব ১৯৮১: ১৪৮-৫৩; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

জন মিল্টন কিংবা শামসুর রাহমান উভয়েই শিমশোনকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবেই দেখিয়াছেন। ১৭ শতকের ইংলন্ডে রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবের পরাস্ত অর্থাৎ বেহাত অবস্থায়, পুনরুদ্ধারপ্রাপ্ত রাজতন্ত্রের অধীনে—১৬৬৭ সনের পর কোনো এক সময়—মিল্টন তাঁহার ‘বিদ্রোহী স্যামসন’ লিখিয়াছিলেন। ইহা তাঁহার ফিরিয়া পাওয়া বেহেস্ত (Paradise Regained) কাব্যগ্রন্থের তপশিল আকারে প্রথম ছাপা হয়।

শামসুর রাহমানও তাঁহার ‘স্যামসন’ কবিতা লিখিয়া থাকিবেন ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে বা সামান্য পরে। আমাদের দুই কবির এক চিন্তার মধ্যে একটা সমস্যা কিন্তু থাকিয়াই যাইতেছে। ইহার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াই আমি আমার কর্তব্য পালনের চেষ্টা করিব।


শামসুর রাহমান যদি আজও বাঁচিয়া থাকিতেন তো জিজ্ঞাসা করিতাম: ২০০১ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ইয়র্ক শহরে বিমানযোগে হামলা করিয়া যাহারা ৩,০০০ মতন মনুষ্য মারিয়া ফেলিল আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেরাও ছাই হইয়া গেল তাহাদিগকে আপনি কি স্বাধীনতা সংগ্রামী বা মুক্তিযোদ্ধা বলিতে রাজি হইবেন? উত্তর উনি কি দিতেন তাহা আপনারা নিঃসংশয়ে আন্দাজ করিতে পারেন।

সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিতাম: শিমশোনকে তবে আপনি কোন যুক্তিতে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিতেছেন? তিনিও তো আত্মঘাতী হামলায় একযোগে ৩,০০০ লোক মারিয়াছিলেন। মারেন নাই? অধিক, জীবনকালেও তিনি লোক মারিতেন। ইহা তাঁহার এক প্রকার পেশা ছিল বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে? পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নবিদের কিতাবেও কি একই কথা লেখা নাই? আছে: ‘তিনি জীবনকালে যত লোক হত্যা করিয়াছিলেন, মরণকালে তদপেক্ষা অধিক লোককে হত্যা করিলেন।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ৩০)

কথাটা মহাত্মা শামসুর রাহমানও আমল করিয়াছেন। ‘স্যামসন’ কবিতায় স্যামসনের স্বগতোক্তিযোগে আমরা তাই পড়িতে পাই:

আমার দুরন্ত কেশরাজি পুনরায় যাবে বেড়ে,
ঘাড়ের প্রান্তর বেয়ে নামবে দুর্দমনীয়, তেড়ে
আসা নেকড়ের মতো। তখন সুরম্য প্রাসাদের সব স্তম্ভ
ফেলবো উপড়ে, দেখো কদলী বৃক্ষের অনুরূপ। দম্ভ
চূর্ণ হবে তোমাদের, সুনিশ্চিত করবো লোপাট
সৈন্য আর দাস-দাসী অধ্যুষিত এই রাজ্যপাট।
(রাহমান ২০০৯: ১০৭)
শিমশোনের জীবনচরিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বয়ান অনুযায়ী যাঁহারা পড়িবেন তাঁহারাই তাঁহাকে পুরাদস্তুর ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলিবেন। অথচ শামসুর রাহমান কোথাও ইহার আভাসমাত্র দিয়াছেন বলিয়া আমার মনে হইল না। ইহা কী করিয়া সম্ভব?

সম্ভব—কারণ আমরা যাহা পড়ি তাহা হয়তো পড়ি নেহায়েত শব্দের ঝঙ্কারে, শব্দেরই প্রেমে পড়িয়া। সত্য স্পর্শ করিয়া হাত ময়লা করিব কোন দুঃখে? অর্থ লইয়া মাথা ঘামাইতে যাইব কেন? এই গুণ শুদ্ধ শামসুর রাহমানের নহে, এই গুণ আমাদের সকলের—আমরা যাহারা কাবিলের জাত হইয়াও হাবিলের অভিনয় করিতেছি তাহাদের সকলের। আমাদের নাম তাই ইংরেজি বাক্যে ‘লিবারেল’। লিবারেলের বাংলা সচরাচর করা হয় ‘উদারনৈতিক’। আমি সবিনয়ে বলিব: ইহার অনুবাদ করিবেন ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী’। সেই ক্রমে লিবারেলিজম মানে দাঁড়াইবে ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়’।

s-rahman.jpg…….
শামসুর রাহমান (জন্ম. ঢাকা ২৪/১০/১৯২৯ – মৃত্যু. ঢাকা ১৭/৮/২০০৬); ছবি. হাসান বিপুল
……..
শামসুর রাহমানও কি তবে লিবারেল অর্থাৎ স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী কবি? দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাকে হ্যাঁ উত্তরই দিতে হইতেছে। সাম্রাজ্যবাদের যুগে—আমাদের বড় দুর্ভাগ্য—এই জাতের কবিরাই প্রধান। তাই তাঁহাদের বাড়ি ঢাকায় হইলেও তাঁহারা প্রথম বিশ্বেরই কবি—তাঁহারা হাবিলের জাত।

শিমশোনের গল্পটা দিয়াই আমি আমার এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের সংহার ঘটাইব। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ লিখিতেছেন:

আর শিমশোন তিম্নায় নামিয়া গেলেন, ও তিম্নায় ফিলিস্তিনীদের কন্যাদের মধ্যে একটি রমণীকে দেখিতে পাইলেন। পরে ফিরিয়া আসিয়া আপন পিতামাতাকে খবর দিয়া বলিলেন, আমি তিম্নায় ফিলিস্তিনীদের কন্যাদের একটি রমণীকে দেখিয়াছি; তোমরা তাহাকে আনিয়া আমার সহিত শাদী দাও। তখন তাঁহার পিতামাতা তাঁহাকে বলিলেন, তোমার জ্ঞাতিগণের মধ্যে ও আমার সমস্ত স্বজাতির মধ্যে কি কন্যা নাই যে, তুমি খত্নাবিহীন ফিলিস্তিনীদের কন্যা শাদী করিতে যাইতেছ? শিমশোন পিতাকে বলিলেন, তুমি আমার জন্য তাহাকেই আনাও, কেননা আমার দৃষ্টিতে সে মনোহরা। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৪: ১-৩)
বিবাহ করিতে যাইবার পথে তিম্নার আঙ্গুর ক্ষেত্রে শিমশোন একটা যুবা সিংহ দেখিতে পাইলেন। মাবুদের রুহুর জোরে হাতে কিছু না থাকিলেও শিমশোন ছাগলের বাচ্চা ছিঁড়িবার মতন ঐ সিংহকে ছিঁড়িয়া ফেলিলেন। বিবাহের আসরে তিনি বাজি ধরিয়া একটি ধাঁধা বলিয়াছিলেন। ইহার সঠিক উত্তর শুদ্ধ তাঁহার স্ত্রী ছাড়া আর কেহ জানিতেন না। কিন্তু এই ধাঁধার উত্তর তাঁহার হবু স্ত্রীর মুখ হইতে গোপনে জানিয়া লইবার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা তাঁহাকে অপ্রস্তুত করিয়াছিল। ইহাতে তাঁহার হবু স্ত্রীও দোষী ছিলেন। তাই নিরুপায় শিমশোন হার স্বীকার করিয়া লইলেন। আর বিবাহ করিব না বলিয়া আসর হইতে উঠিয়া গেলেন।

ইহার পর ক্রুদ্ধ শিমশোন অস্কিলোন নামক জায়গায় গিয়া ৩০ জন লোককে অকারণে আঘাত করিয়া তাহাদের বস্ত্র খুলিয়া লইলেন আর সেই বস্ত্র দিয়া ধাঁধার বাজিতে হারিয়া যাওয়ার টাকা পরিশোধ করিলেন। তিনি বউ ফেলিয়া চলিয়া যাইবার পর আর আসিবেন না মনে করিয়া তাঁহার হবু বউকে অন্য একজনের সহিত বিবাহ দেওয়া হইল।

কিছুকাল পর গম কাটার সময় শিমশোন ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া স্ত্রীর সঙ্গ দাবি করিলেন। তাঁহাকে অনুরোধ করা হইল, তিনি যেন স্ত্রীর ছোট বোনকে বিবাহ করেন। তিনি রাজি হইলেন না। পাল্টা এতদিনে স্ত্রী পরস্ত্রী হইয়া গিয়াছে শুনিয়া এক মহাকাণ্ড করিলেন। ধর্মগ্রন্থ লিখিতেছেন:

পরে শিমশোন গিয়া তিন শত শৃগাল ধরিয়া মশাল লইয়া তাহাদের লেজে লেজে যোগ করিয়া দুই দুই লেজে এক একটি মশাল বাঁধিলেন। পরে সেই মশালে আগুন দিয়া ফিলিস্তিনীদের শস্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দিলেন; তাহাতে বাঁধা আটি, ক্ষেতের শস্য ও জলপাই গাছের বাগান সকলই পুড়িয়া গেল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৫: ৪-৫)
ততক্ষণে ক্রুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা তাঁহার হতভাগিনী স্ত্রী ও স্ত্রীর পিতা মহাশয়কে আগুনে পুড়াইয়া মারিল। আর শিমশোন তাহাদিগকে আঘাত করিলেন। তখন তাঁহার স্বজাতি লোকেরা তাঁহাকে বাঁধিয়া ফিলিস্তিনিদের হাতে সমর্পণ করে। বাঁধন দুই গাছা নতুন দড়ি।

… তখন মাবুদের রূহ্ সবলে তাহার উপরে আসিলেন, আর তাঁহার দুই বাহুস্থিত দুই দড়ি আগুনে পোড়া শণের ন্যায় হইল, এবং তাঁহার দুই হাত হইতে বেড়ি খসিয়া পড়িল। পরে তিনি একটি গাধার চোয়ালের হাড় দেখিতে পাইয়া হাত বিস্তারপূর্বক তাহা লইয়া তাহা দ্বারা হাজার লোককে আঘাত করিলেন। আর শিমশোন বলিলেন, ‘গাধার চোয়ালের হাড় দ্বারা রাশির উপরে রাশি হইল, গাধার চোয়ালের হাড় দ্বারা হাজার জনকে হানিলাম।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৫: ১৪-১৬)
শিমশোনের এই আবিল বীরত্বের বন্দনাই শুনি কবি শামসুর রাহমানের অনাবিল কণ্ঠে। আগেই উদ্ধার করিয়াছি কবির কথা:

মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ,…
(রাহমান ২০০৯:১০৫-০৬)
পাঠিকা বিশ্বাস করিবেন কিনা জানি না, তবু বলিব: এই নিবন্ধে হাত দিবার আগে আমি কিন্তু কদাচ খেয়াল করি নাই শামসুর রাহমান নামটির অর্থও প্রকারান্তরে এই শিমশোন ওরফে স্যামসনই। ‘দয়াময়ের সূর্য’ আর ‘সূর্যের সন্তান’—কি এমন দূরত্ব! দূরত্বের মধ্যে ঐ এক মিল্টনই।

ইংলন্ডের পীড়িত অন্ধ কবির দৃষ্টিতে শিমশোন বীর হইবেন সন্দেহ নাই। ১৯৭১ সনের বাংলাদেশের একজন বাঙালি কবিও সেই দৃষ্টির চক্ষু ধার লইলেন কেন? ইহার পরীক্ষাই আমাদের প্রার্থনীয়।


খ্রিস্টানি পরম্পরায় কাজি শিমশোনকে কিছু পরিমাণে নৈতিক স্খলনের দোষে দোষী করিবার রেওয়াজও আছে। ইহা আমরা কিছু আগেই দেখিয়াছি। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করিয়া সেই পাপ হইতে মুক্ত হইলেন। দেশবাসী তাহাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধার, বীরশ্রেষ্ঠের সম্মান জানাইল। তাঁহার সন্ত্রাসবাদ লইয়া কেহ বেশি উচ্চবাচ্য করিল না।

আধুনিক ধনতন্ত্রের ধনী দোসর ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়’ ওরফে লিবারেলিজম। এই ব্যবসায়ের ব্যবসায়ীরাও সন্ত্রাসী শিমশোনকে মুক্তিসংগ্রামীর মর্যাদা দিতেছেন। ঘন ঘন—প্রায় বাতিকগ্রস্থের মতন—বেশ্যাগমনের সহিত স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের সম্পর্ক একটা থাকিলেও থাকিতে পারে। সেই সম্পর্ক কী আমরা কিন্তু জানি না। তবে আত্মঘাতী বোমাবাজ ওরফে আদমবোমারুও যে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা-ব্যবসায়েরই অন্তর্গত সেই সত্য আমরা এতদিনে অনুধাবন করিতে পারিতেছি। আরব নৃতত্ত্ব-বিজ্ঞানী মহাত্মা তালাল আসাদের একটি বক্তৃতায় তাহার আভাস পাওয়া যায়। (আসাদ ২০০৭: ৬৫-৯৬; দেখুন, প্রবন্ধ ৪)

শিমশোন অমিতবিক্রম বীর এই সত্যে আমার সন্দেহ নাই। সাক্ষী পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কহিতেছেন:

আর শিমশোন গাজাতে গিয়া সেখানে একটা বেশ্যাকে দেখিয়া তাহার কাছে গমন করিলেন। তাহাতে, শিমশোন এই স্থানে আসিয়াছে, এই কথা শুনিয়া গাজানিবাসীরা তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া সমস্ত রাত্রি তাঁহার জন্য নগর দ্বারে লুকাইয়া থাকিল, সমস্ত রাত্রি চুপ করিয়া রহিল, বলিল, সকালে দিন হইলে আমরা তাঁহাকে কতল করিব। কিন্তু শিমশোন মাঝরাত পর্যন্ত শয়ন করিলেন, মাঝরাতে উঠিয়া তিনি নগর-দ্বারের শিকলশুদ্ধ দুই কবাট ও দুই বাজু ধরিয়া উপড়াইয়া ফেলিলেন এবং স্কন্ধে করিয়া হিব্রোণের সম্মুখস্থ পর্বত-শৃঙ্গে লইয়া গেলেন। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ১-৩)
শিমশোনের প্রেমের শেষ নাই। তবে এই প্রেমই শেষ পর্যন্ত তাঁহাকে শেষ করিল। তাঁহার সর্বশেষ প্রেমিকার নাম দলীলা। পণ্ডিতেরা কহিতেছেন শিমশোন মানে যেমন সূর্য (অর্থাৎ দিবা) তেমনি দলীলা (ওরফে লীলা ওরফে লায়লা) মানেও রাত্রি। (আসিমব ১৯৮১: ২৫১; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

রাত্রির নিকট সূর্য যেমন দলীলার নিকট শিমশোনও তেমন। একদিন প্রেমিকা দলীলার পীড়াপীড়িতে তিনি ধরা দিলেন। তাঁহার অমিততেজের গোপন কথা ফাঁস হইয়া গেল। শ্রীমতি দলীলা নিজের হাঁটুর উপর তাঁহাকে ঘুম পাড়াইয়া লোক দিয়া তাঁহার সাত গুচ্ছ চুল কামাইয়া দিল। শিমশোন দুর্বল হইলেন।

তাই তিনি মনের সমস্ত কথা ভাঙ্গিয়া বলিলেন, তাহাকে বলিলেন, আমার মস্তকে কখনও ক্ষুর উঠে নাই, কেননা মাতার গর্ভ হইতে আমি আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে নাসরীয় [উৎসর্গিত]; চুল কামাইলে আমার বল আমাকে ছাড়িয়া যাইবে, এবং আমি দুর্বল হইয়া অন্য সকল লোকের সমান হইব। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ১৭)
তখন ফিলিস্তিনিরা তাঁহাকে ধরিয়া তাঁহার দুই চক্ষু উঠাইয়া ফেলিল, এবং তাঁহাকে গাজায় আনিয়া পিতলের দুইটি শিকলে বাঁধিল। তিনি কয়েদখানায় যাঁতা পেষণ করিতে লাগিলেন।

শামসুর রাহমান দেখি শিমশোনের দুঃখে তাঁহার চাইতেও বেশি কাতর। কয়েদখানার যাঁতা বন্দির প্রাণের চেয়ে কবির প্রাণকেই যেন বেশি পেষণ করিতেছে। কবি লিখিতেছেন:

আমাকে করেছো বন্দী, নিয়েছো উপড়ে চক্ষুদ্বয়।
এখন তো মেঘের অঢেল স্বাস্থ্য, রাঙা সূর্যোদয়
শিশুর অস্থির হামাগুড়ি, রক্তোৎপল যৌবন নারীর আর
হাওয়ায় স্পন্দিত ফুল পারি না দেখতে। বার বার
কী বিশাল দৃষ্টিহীনতায় দৃষ্টি খুঁজে মরি। সকাল সন্ধ্যার
ভেদ লুপ্ত; মসীলিপ্ত ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে চকিতে মন্দার
জেগে উঠলেও অলৌকিক শোভা তার থেকে যাবে নিস্তরঙ্গ
অন্তরালে। এমন-কি ইঁদুরও বান্ধব অন্তরঙ্গ
সাম্প্রতিক, এমন নিঃসঙ্গ আমি নিজ দোষে আজ
চক্ষুহীন, হৃতশক্তি; দুঃস্বপ্নপীড়িত। এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
শত্রু-পরিবৃত হয়ে আছি, তোমাদের চাটুকার
উচ্ছিষ্ট-কুড়ানো সব আপনি-মোড়ল, দুস্থ ভাঁড়
সর্বদাই উপহাস করছে আমাকে। দেশবাসী
আমাকে বাসেতো ভালো আজো—যাদের অশেষ দুঃখে কাঁদি হাসি
আনন্দে? পিছনে ফেলে এসেছি কত যে রাঙা সুখের কোরক,
যেমন বালক তার মিষ্টান্নের সুদৃশ্য মোড়ক।
আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন—
পাইকারি হত্যা দিগি¦দিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
—এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এ-সব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘন-ঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব-কিছু বুঝি ঠিকই। ভেবেছো এখন
দারুণ অক্ষম আমি, উদ্যানের ঘাসের মতন
বিষম কদম-ছাঁটা চুল। হীনবল, শৃঙ্খলিত
আমি, তাই সর্বক্ষণ করছো দলিত।
(রাহমান ২০০৯: ১০৬-০৭)
তবে কোনো কথাই এই দুনিয়ায় শেষ কথা নহে। দিনের সূর্য রাতে অন্ধ হয়, তাহার চক্ষু উঠাইয়া ফেলে। সেই সূর্যই সকালবেলা আবার ফিরিয়া আসে। ধীর ধীরে তাহার আলোকরশ্মি তেজীয়ান হইতে থাকে। শিমশোনের চুলও গজাইল এবং গজাইলে তাঁহার হৃতশক্তিও আবার ফিরিয়া আসিল।

ইহা ‘ক্ষমতামাতাল জঙ্গী প্রভুরা’ আমল করেন নাই। ইহাতেই শিমশোন তাঁহার শেষ বীরত্ব (অথবা সন্ত্রাস) দেখাইবার সুযোগ পাইলেন। পরে কোনো একদিন ফিলিস্তিনি ভূপালেরা নিজেদের দেবতা দাগোনের উদ্দেশ্যে মহাযজ্ঞ ও আমোদ প্রমোদ করিতে একত্র হইলেন। তাঁহাদের অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হইলে তাঁহারা বলিলেন: শিমশোনকে ডাক, সে আমাদের কাছে কৌতুক করুক।

… তাহাতে লোকেরা কয়েদখানা হইতে শিমশোনকে ডাকিয়া আনিল, আর তিনি তাহাদের সামনে কৌতুক করিতে লাগিলেন। তাহারা স্তম্ভ সকলের মধ্যে তাঁহাকে দাঁড় করাইয়াছিল। পরে যে বালক হাত দিয়া শিমশোনকে ধরিয়াছিল, তিনি তাহাকে বলিলেন, আমাকে ছাড়িয়া দাও, যে দুই খামের উপরে ঘরের ভর আছে, তাহা আমাকে স্পর্শ করিতে দাও; আমি উহাতে হেলান দিয়া দাঁড়াইব। পুরুষে ও স্ত্রীলোকে সেই ঘর পরিপূর্ণ ছিল, আর ফিলিস্তিনীদের সমস্ত ভূপাল সেখানে ছিলেন, এবং ছাদের উপরে স্ত্রী পুরুষ প্রায় তিন হাজার লোক শিম্শোনের কৌতুক দেখিতেছিল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৫-২৭)
শিমশোন প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুত হইলেন। ‘তখন শিমশোন মাবুদকে ডাকিয়া বলিলেন, হে খোদাবন্দ মাবুদ, মেহেরবানী করিয়া আমাকে স্মরণ করুন; হে আল্লাহ্, মেহেরবানী করিয়া কেবল এই একটি বার আমাকে বলবান করুন, যেন আমি ফিলিস্তিনীদিগকে আমার দুই চোখের জন্য একেবারেই প্রতিশোধ দিতে পারি।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৮)

পরে শিমশোন, মধ্যস্থিত যে দুই খামের উপরে ঘরের ভার ছিল, তাহা ধরিয়া তাহার একটির উপরে ডান বাহু দ্বারা, অন্যটির উপরে বাম বাহু দ্বারা নির্ভর করিলেন। আর ফিলিস্তিনীদের সহিত আমার প্রাণ যাক, ইহা বলিয়া শিমশোন নিজের সমস্ত বলে নত হইয়া পড়িলেন; তাহাতে ঐ ঘর ভূপালগণের ও যত লোক ভিতরে ছিল, সমস্ত লোকের উপরে পড়িল; এইরূপে তিনি জীবনকালে যত লোক হত্যা করিয়াছিলেন, মরণকালে তদপেক্ষা অধিক লোককে হত্যা করিলেন। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৯-৩০)
নির্জলা হত্যা করা কিংবা নিজে হত হইয়া অপরকে হত্যা করা কোনটাই শেষ কথা নহে। আমরা যাহারা এই গল্প পড়িলাম বা শুনিলাম তাহারা পড়িয়া শুনিয়া কী করিব শেষ কথা তাহাই। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের লেখকও এই ঘটনায় আপনকার প্রীতি কিংবা সন্তোষ গোপন করিতে পারেন নাই। তাঁহার চোখও শিমশোনের ভাইবেরাদরের চোখই। তিনি জানাইতেছেন: ‘পরে তাঁহার ভাইয়েরা ও তাঁহার সমস্ত পিতৃকুল নামিয়া আসিয়া তাঁহাকে লইয়া সরা ও ইষ্টায়োলের মধ্যস্থানে তাঁহার পিতা মানোহের গোরস্তানে তাঁহাকে দাফন করিল। তিনি বিশ বৎসর ইস্রায়েলের আচার বিচার করিয়াছিলেন।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৮) ১৬: ৩১)


আমার এখনো বাকশক্তি গজায় নাই যে বলিব এই ঘটনার অর্থ ষোল আনা বুঝিয়াছি। শিমশোন জীবনকালে অনেক লোককে হত্যা করিয়াছিলেন, আর মরণকালেও তদপেক্ষা অধিক লোক হত্যা করিলেন। এই অধিক—মানে ৩,০০০—লোকের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় জাতির লোকই ছিল। অথচ ইহাতে আমাদের স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী কবিদের কেহই সামান্যতম কাঁপিয়া উঠিয়াছেন কি? না মিল্টন না রাহমান—কেহই ওঠেন নাই।

যদি না উঠিয়া থাকেন তবে অনুমান করিব: আত্মঘাতী হত্যাকাণ্ডে, পুরুষ-স্ত্রী নির্বিশেষ হত্যায়—তাঁহাদেরও অনুমোদন মিলিয়াছে বৈ কি! আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্তু স্বদেশ ও স্বজাতি (কেহ কেহ বলিবেন স্বধর্ম বা স্ব-আদর্শ) রক্ষা করিতে হইলে স্বপ্রাণ নিধনও শ্রেয়।

আলায়হেসসালাম হজরত ইসার জন্মের ১,০০০ বৎসর আগের এই মহাত্মা কাজি শিমশোনের আত্মহত্যার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি মরিয়াছিলেন অন্যূন ৩,০০০। আর এই ঘটনার আনুমানিক ৩,০০০ বৎসর পর ২০/২২ জন আরব্য বোমাবাজের প্রাণের বিনিময়ে আবারও মার্কিন নারী-পুরুষ মিলিয়া লোক মরিল কিছু কম ৩,০০০। ফিলিস্তিনি বাড়ির বড় খাম ছিল দুইটা, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের বড় খাম বা দালানও (Twin Tower) ছিল সেই দুইটাই। আশ্চর্য!

সংখ্যার এই মিল কেন? সত্য বলিতে কাহারও ইহার উত্তর জানা নাই। থাকিলে বলিবেন বলিয়াই আশা করি। ৪, ৭ কিংবা ১৩ প্রভৃতি সংখ্যা কেন অশুভ বলিয়া গণিত হয়? ইহার জবাব খুঁজিতে হইবে ৩, ৬, কিংবা ১২ সংখ্যার মধ্যেই। শিমশোন কেন ১২ নম্বর কাজি তাহা কেহ বলিবেন কি? এখানে ১২ মানে শেষ কাজি।

কিতাবুল মোকাদ্দস গ্রন্থের ‘পয়দায়েশ’ কিতাবে লেখা হইয়াছে, মাবুদ মোট ৬ দিনে এই দুনিয়া সৃষ্টি করিলেন। কেহ বলিবেন কি তিনি কেন ৫ কিংবা ৭ দিনে করিলেন না? আর ৭ দিনের দিন তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। ঠিক আছে। কেন ৬ দিনের দিন বা ৮ দিনের দিন করিলেন না?

৩৬৫ কিংবা ৩৬৬ দিনে বৎসর হয়। মাস হয় ২৮, ২৯ কিংবা ৩০ দিনে। ৩১ এমনকি কখনো কখনো ৩২ দিনেও হয়। কেহ বলিবেন কি সপ্তাহ কেন ৭ দিনে হয়? ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁ বলিতেন, অজ্ঞান ৬ পর্যন্ত গুণিতে জানে। কে জানে ইহার কী অর্থ?

৩,০০০ সংখ্যা ৩,০০০ বৎসর পর আবারও ৩,০০০। একবার ৩,০০০ মুক্তিযোদ্ধার, আরবার ৩,০০০ সন্ত্রাসবাদীর। কারণ কী? ইহার উত্তর সাম্রাজ্যবাদের যুগে দুই বিশ্বের কবিতায় খুঁজিয়া কোথাও পাইলাম না।

এই দুঃখ রহিয়াই গেল।

***

বিখ্যাত মার্কিন সমালোচনা ব্যবসায়ী ফ্রেডরিক জেমিসন (Fredric Jameson) একদা দাবি করিয়াছিলেন বহুজাতীয় ধনতন্ত্রের জমানায় তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য প্রথম বিশ্বের সাহিত্য হইতে আলাদা প্রকৃতির মাল হইয়া গিয়াছে। তাঁহার মতে, জাতীয়তাবাদ জিনিসটা মোটেও ভালো মাল নহে তবে তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য এক প্রকার না আর প্রকারের জাতীয়তাবাদ ছাড়া চলিতেই পারে না। সুতরাং এই বহুনিন্দিত জাতীয়তাবাদ ব্যবসায়টাকে অবিমিশ্র মন্দ জিনিসও বলা যাইতেছে না।

জেমিসনের কথার মধ্যে সত্য দুই আনাও নাই—তাহা বলিতেছি না। তবে এই পর্যন্তই। আরো আগাইয়া তিনি বলিয়াছেন আসলে এই দুনিয়ায় প্রভু ও ভৃত্য ছাড়া আর কিছুই নাই। সুতরাং দুইয়ে মিলিয়া দুনিয়া একটাই। জেমিসনের এই কথা যদি সত্য হয় তো স্বীকার করিতে হইবে, তৃতীয় বিশ্ব বলিয়া কোনো আলাদা মাল নাই।

জার্মান মহাত্মা হেগেলের নাম ভাঙ্গাইয়া জেমিসন বলেন, প্রভু ছাড়া ভৃত্যের যেমন চলিবে না, তেমনি ভৃত্য ছাড়াও প্রভুর প্রভুত্ব কায়েম হইবে না। ইহাই সত্য। কিন্তু এক জায়গায় আসিয়া এই সত্য উল্টাইয়া পড়িতেছে। খোদ হেগেলই এই সত্যের আবিষ্কারক। তিনি বলিয়াছিলেন, এই দুনিয়া প্রভুর এবং ভৃত্যের বটে। কিন্তু শেষ বিচারে এই দুনিয়া শুদ্ধ ভৃত্যেরই। কারণ যে সব করে সে-ই সব জানে। ভৃত্য বা শ্রমিক সব করে তাই সে-ই সব জানে। অলস প্রভুর ভৃত্য ছাড়া চলিবে না। কিন্তু চলিতে ফিরিতে যে জ্ঞান না হইলেই নয় তাহার নাম অজ্ঞান। তাহা শুদ্ধ ভৃত্যের অধিকারে। কারণ সব রসুনের এক গোড়া। সেই গোড়ার নাম মানুষের শ্রম, শ্রমিকশ্রেণীর মেহনত। (জেমিসন ২০০১: ৩৩৫-৩৬)

জেমিসনের মতে তৎকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ সাহিত্য ব্যক্তি মানুষের গল্প বলিতে একেবারেই অপারগ, একান্তই অক্ষম। ব্যক্তির কথা বলিতে বলিতে সে অজান্তে কেবল জাতির গল্পই বলিয়া বসে। উদাহরণের ছলে তিনি চিনের মহান লেখক লু সুন (Lu Xun) আর সেনেগালের সেম্বেনে ওসমানের (Sembene Ousmane) কথা পাড়িয়াছেন। আমরা ফরাসি শার্ল বোদলেয়ার আর বঙ্গীয় শামসুর রাহমানের দৃষ্টান্তযোগে দেখাইলাম জেমিসনের বক্তব্য সত্য না-ও হইতে পারে। তাঁহার বিশ্ববিভাজন, ‘তিন দুনিয়া পৃথক্করণের তত্ত্ব’ বাসি হইয়াছে। ইহা অজ্ঞান হইলে আরো ভয়াবহ। বর্ণবাদের গাঢ় প্রলেপ তাহার গায়ে লাগিয়াছে।

পাক-ভারতীয় ধুরন্ধর এজাজ আহমদ (Aijaj Ahmad) লিখিয়াছেন, একই কারণে কোনো দেশের সাহিত্যকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বের বলিয়া আলাদা করাটা বর্ণবাদের অর্থাৎ পুরাতন উপনিবেশবাদের জের। জেমিসন মার্কিন জাতীয়তাবাদীর মতন লিখিলেও লোকে ভাবে তিনি বুঝি মার্কস ব্যবসায়ীও বটেন। এজাজ আহমদ তাঁহার মুখোশ কিছু পরিমাণে আলগা করিয়া দিয়াছেন। (আহমদ ১৯৯৫: ৯৫-১১২)

দুনিয়ার সকল দেশের ভাষাতেই দুই বিশ্বের সাহিত্য গড়িয়া উঠিতেছে। আমেন।


……………
জাতীয় কবিতা পরিষদের সেমিনারে পঠিত
‘জাতীয় কবিতা উৎসব,’ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

cain-2.jpg
হাবিলের দেহ খুঁজে পেল আদম আর হাওয়া (১৮২৬), শিল্পী: উইলিয়াম ব্লেইক (William Blake; জন্ম. লন্ডন ২৮/১১/১৭৫৭ – মৃত্যু. লন্ডন ১২/৮/১৮২৭)

সংবর্ধনা ১

Abel et Caïn
Charles Baudelaire

I
Race d’Abel, dors, bois et mange;
Dieu te sourit complaisamment.
Race de Caïn, dans la fange
Rampe et meurs misérablement.
Race d’Abel, ton sacrifice
Flatte le nez du Séraphin!
Race de Caïn, ton supplice
Aura-t-il jamais une fin?
Race d’Abel, vois tes semailles
Et ton bétail venir à bien;
Race de Caïn, tes entrailles
Hurlent la faim comme un vieux chien.
Race d’Abel, chauffe ton ventre
À ton foyer patriarcal;
Race de Caïn, dans ton antre
Tremble de froid, pauvre chacal!
Race d’Abel, aime et pullule!
Ton or fait aussi des petits.
Race de Caïn, cœur qui brûle,
Prends garde à ces grands appétits.
Race d’Abel, tu croîs et broutes
Comme les punaises des bois!
Race de Caïn, sur les routes
Traîne ta famille aux abois.

II
Ah! race d’Abel, ta charogne
Engraissera le sol fumant!
Race de Caïn, ta besogne
N’est pas faite suffisamment;
Race d’Abel, voici ta honte:
Le fer est vaincu par l’épieu!
Race de Caïn, au ciel monte,
Et sur la terre jette Dieu!

……………
Les Fleurs du mal, 1857

সংবর্ধনা ২

হাবিল ও কাবিল
শার্ল বোদলেয়ার


হাবিলের জাত, ঘুমাও, পিয়ে যাও আর খাও
দিলখোশ মাবুদের মুখে মিঠা হাসি
কাবিলের জাত, দাও গড়াগড়ি দাও
পচা কাদায়, আর দাও নিজের গলায় ফাঁসি।
হাবিলের জাত, তোর লোবান আতরদান
নজরান সুড়সুড়ি দেয় ফেরেশতার নাকে!
কাবিলের জাত, তোর যাতনার অবসান
কখনো হবে না হাজার কাতর ডাকে?
হাবিলের জাত, তোর মাঠের ধান বাড়ে
মোটা তাজা হয় তোর গরু যত
কাবিলের জাত, তোর পেটের ভোক ঘাড়ে
খালি কঁকায় নেড়ি কুত্তার মত।
হাবিলের জাত, চোদ্দপুরুষের চুলা জ্বেলে
পোহা রে আগুন, গতর তাতা
কাবিলের জাত, মাটির তলায় গর্ত মেলে
কাঁপ তোরা, গায় দে খেকশিয়ালের কাঁথা!
হাবিলের জাত, প্রেমে মশগুল হ, বাড়া!
ঝাড়বংশ, বাড়া রে সোনাদানা।
কাবিলের জাত, হে প্রাণ পোড়া
প্রেম করতে তোর মানা।
হাবিলের জাত গাল ফোলা পেট খোলা
খেয়ে খেয়ে যেমন ফোলে ঘূণপোকা!
কাবিলের জাত, পথে পথে বস পথভোলা
সংসার তোর পথে বসা হে বোকা।


আহা, হাবিলের জাত, একদা তোর লাশ
করবে সবুজ পোড়া ছারখার জমিন!
কাবিলের জাত কাজ তোর নাগপাশ
আজও হয় নাই ছেঁড়া, জীবন কি সঙ্গিন
হাবিলের জাত, তোর লাজ ঢাকবে কে আজ
লোহা খান খান হবে যে চেলাকাঠে!
কাবিলের জাত, উঠ আসমানে আসমানবাজ
যা মাবুদরে ঠেলে ফেল এই দুনিয়ার মাঠে!

……………
অনুবাদ: সলিমুল্লাহ খান, জাতীয় কবিতা উৎসব; ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

সংবর্ধনা ৩

স্যামসন
শামসুর রাহমান

ক্ষমতামাতাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা,
তোমাদের হোমরা-চোমরা
সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?
মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার
করুক যতই পাত্র-মিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।
আমাকে করেছো বন্দী, নিয়েছো উপড়ে চক্ষুদ্বয়।
এখন তো মেঘের অঢেল স্বাস্থ্য, রাঙা সূর্যোদয়
শিশুর অস্থির হামাগুড়ি, রক্তোৎপল যৌবন নারীর আর
হাওয়ায় স্পন্দিত ফুল পারি না দেখতে। বার বার
কী বিশাল দৃষ্টিহীনতায় দৃষ্টি খুঁজে মরি। সকাল সন্ধ্যার
ভেদ লুপ্ত; মসীলিপ্ত ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে চকিতে মন্দার
জেগে উঠলেও অলৌকিক শোভা তার থেকে যাবে নিস্তরঙ্গ
অন্তরালে। এমন-কি ইঁদুরও বান্ধব অন্তরঙ্গ
সাম্প্রতিক, এমন নিঃসঙ্গ আমি নিজ দোষে আজ
চক্ষুহীন, হৃতশক্তি; দুঃস্বপ্নপীড়িত। এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
শত্র“-পরিবৃত হয়ে আছি, তোমাদের চাটুকার
উচ্ছিষ্ট-কুড়ানো সব আপনি-মোড়ল, দুস্থ ভাঁড়
সর্বদাই উপহাস করছে আমাকে। দেশবাসী
আমাকে বাসেতো ভালো আজো—যাদের অশেষ দুঃখে কাঁদি হাসি
আনন্দে? পিছনে ফেলে এসেছি কত যে রাঙা সুখের কোরক,
যেমন বালক তার মিষ্টান্নের সুদৃশ্য মোড়ক।
আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন—
পাইকারি হত্যা দিগ্বিদিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
—এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এ-সব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘন-ঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব-কিছু বুঝি ঠিকই। ভেবেছো এখন
দারুণ অক্ষম আমি, উদ্যানের ঘাসের মতন
বিষম কদম-ছাঁটা চুল। হীনবল, শৃঙ্খলিত
আমি, তাই সর্বক্ষণ করছো দলিত।
আমার দুরন্ত কেশরাজি পুনরায় যাবে বেড়ে,
ঘাড়ের প্রান্তর বেয়ে নামবে দুর্দমনীয়, তেড়ে
আসা নেকড়ের মতো। তখন সুরম্য প্রাসাদের সব স্তম্ভ
ফেলবো উপড়ে, দেখো কদলী বৃক্ষের অনুরূপ। দম্ভ
চূর্ণ হবে তোমাদের, সুনিশ্চিত করবো লোপাট
সৈন্য আর দাস-দাসী অধ্যুষিত এই রাজ্যপাট।

……………
দুঃসময়ে মুখোমুখি, ১৯৭৩

বোধিনী
১. গ্রিক Agonistes শব্দের তর্জমা বিবাদী কিংবা বিপথগামী দুইটাই হতে পারে। মহাকবি মিল্টন মনে হইতেছে প্রথম অর্থের দিকেই বেশি ঝুঁকিয়া ছিলাম।

২. কবিতাটির রচনাকাল ৫ অক্টোবর ১৯৭১। এই তথ্য জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসব ২০০৯ সেমিনারে জানাইয়াছিলেন প্রখ্যাত প্রকাশক (সাহিত্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী) মফিদুল হক। এই প্রসঙ্গে তাঁহার ঋণ স্বীকার করিতেছি।

দোহাই
১. শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, ৮ম মুদ্রণ (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ ২০০৯)।

২. কিতাবুল মোকাদ্দস, বাংলা অনুবাদ (ঢাকা: মঞ্জিল-ই-কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই)।

৩. Aijaj Ahmad, ‘Jameson’s Rhetoric of Otherness and the “National Allegory”,’ in In Theory: Classes, Nations, Literatures, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1995).

৪. Eqbal Ahmad, The Selected Writings of Eqbal Ahmad, eds. Carollee Bengelsdorf et al. (New York: Columbia University Press, 2006/ka).

৫. Talal Asad, On Suicide Bombing (New York: Columbia University Press, 2007).

৬. Issac Asimov, Asimov’s Guide to the Bible, 2 vols. in 1, (New York: Gramercy Books, 1981).

৭. Charles Baudelaire, Baudlaire: the complete verse, vol. I, trans. Francis Scarfe (London: Anvil Press Poetry, 1986).

৮. Walter Beltz, God and the Gods, trans. Peter Heinegg (Harmondsworth, UK: Penguin Books, 1983).

৯. Walter Benjamin, ‘The Paris of the Second Empire in Baudelaire,’ trans. Harry Zohn, in Selected Writings, vol. 4 (1938–1940), eds. Howard Eiland and Michael W. Jennings, reprint (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2006/kha).

১০. Walter Benjamin, Charles Baudelaire: A Lyric Poet in the Era of High Capitalism, trans. Harry Zohn, reprint (London: Verso, 1997).

১১. Amilcar Cabral, Return to the Source: Selected Speeches of Amilcar Cabral, ed. Africa Information Service (New York: Monthly Review Press, 1973).

১২. Aimé Cesaire, Discourse on Colonialism, trans. Joan Pinkham, reprint (New York: Monthly Review Press, 2000).

১৩. Irfan Habib, ‘Understanding 1857,’ in ed. Sabyasachi Bhattacharya, Rethinking 1857 (Hyderabad, 2007), pp. 58–66.

১৪. Fredric Jameson, ‘Third-world Literature in the Era of Multinational Capitalism,’ in The Jameson Reader, eds. Michael Hardt and Kathi Weeks, reprint (Oxford: Blackwell Publishers, 2001).

১৫. Insight on the Scriptures, 2 vols. (New York: Watchtower Bible and Tract Society of New York, 1988).

১৬. Karl Marx and Frederik Engels, Selected Correspondence, 3rd revised ed. (Moscow: Progress Publishers, 1975).

১৭. John Milton, Samson Agonistes, ed. F. T. Prince, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1982).

১৮. F. T. Prince, ‘Introduction,’ in John Milton, Samson Agonistes, ed. F. T. Prince, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1982), pp. 7–17.

১৯. The Zondervan Pictorial Bible Dictionary, ed. Merill C. Tenney (Grand Rapids, Michigan: Regency Reference Library, 1967).

প্রথম প্রকাশ: জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসব ২০০৯ সেমিনারের মূল প্রবন্ধ হিসেবে লিখিত এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত।

পরিমার্জিত সংস্করণ: সলিমুল্লাহ খান, আদমবোমা, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সম্পাদিত, ইতিহাস কারখানা ২ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৯)।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১০ জুলাই ২০০৯

 

কার্ল মার্কসের আবিষ্কার

এ বছর—এই ইংরেজি ২০১৮ সালে—কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশ বছর পূর্ণ হইতেছে। তাঁহার বিষয়ে যত কথা বলা যায় ইহার মধ্যে তাহার প্রায় সবই বলা হইয়া গিয়াছে। এতদিন পর—এই এখন—নতুন আর কোন কথাটি বলা যায়? যেদিন মার্কস মারা গেলেন তাহার তিন দিনের মাথায়—মোতাবেক ১৭ মার্চ ১৮৮৩ সালে—লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে তাঁহার সমাধির পাশে দাঁড়াইয়া দীর্ঘদিনের বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলিয়াছিলেন, ‘যুগ যুগ ধরিয়া তাঁহার নাম কীর্তিত হইতে থাকিবে, আর কীর্তিত হইবে তাঁহার সাধনা।’

এঙ্গেলসের এই ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায় নাই। আজ দুইশ বছর পরও আমরা তাঁহার নাম লইতেছি। সারা দুনিয়া লইতেছে। ফরাশি ইতিহাস ব্যবসায়ী ফেরনাঁ ব্রোদেল (১৯০২-১৯৮৫) মার্কসের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর পরলোকগমন করিয়াছেন। ইঁহাকে আর যাহাই বলিবেন বলিতে পারেন, ভুলেও মার্কস-ব্যবসায়ী বলিতে পারিবেন না। আর ইঁহার মতেও উনিশ শতকিয়া এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক মহাত্মাদের মধ্যে—বিশেষ যাঁহারা ১৭৬০ সাল হইতে ১৮২৫ সালের অবসরে জন্মিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে—কার্ল মার্কসের নামই সর্বাগ্রগণ্য। ইঁহাদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন অঁরি সাঁ সিমোঁ (১৭৬০), রবার্ট ওয়েন (১৭৭১), শার্ল ফুরিয়ে (১৭৭২), এতিয়েন কাবে (১৭৭৮), ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮), পিয়ের জোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯), ভিক্তর কঁসিদেরাঁ (১৮০৮) এবং লুই ব্লাঁ (১৮১১)। বয়সে ইঁহারা সকলেই কার্ল মার্কসের বড়। বন্ধনীমধ্যে উল্লেখ করা সালগুলি তাঁহাদের স্ব স্ব জন্মের বছর। কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে আর ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ও ফার্দিনান্দ লাসালের জন্ম যথাক্রমে ১৮২০ ও ১৮২৫ সালে। ব্রোদেল উল্লেখ করিতে ভোলেন নাই যে শেষের এই তিনজন ছিলেন জাতিতে জার্মান। এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে ইঁহারাই সমাজের পেছনের সারি হইতে টানিয়া সামনের দিকে লইয়া আসিয়াছিলেন।

ব্রোদেল বলিয়াছেন, আপনকার সহকর্মীদের মধ্যে মার্কসের প্রতিদ্বন্দ্বী হইবার যোগ্যতা রাখিতেন একমাত্র ফার্দিনান্দ লাসাল। ১৮৬৪ সালে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি যদি হঠাৎ নিহত না হইতেন তো কার্ল মার্কসের নামাংকিত রাজনৈতিক আন্দোলনটির জয়জয়কার এখন যতটা নিশ্চিত হইয়াছে ততটা হইত কিনা বলা মুশকিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যবসায়ী ব্রোদেলও স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন, মার্কসের রাজনৈতিক সাফল্যের আসল রহস্য তাঁহার লেখা দাস কাপিটাল বা পুঁজি (১৮৬৭) গ্রন্থের বিশ্লেষণশক্তির যথার্থতায় নিহিত। কি সেই শক্তি? সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতার এক জায়গায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দাবি করিয়াছিলেন কার্ল মার্কস যাহা আবিষ্কার করিয়াছেন তাহা চার্লস ডারউয়িনের আবিষ্কারের সমতুল্য। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘ডারউয়িন যেমন সপ্রাণ প্রকৃতিজগতের বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, মার্কসও তেমনি মানুষের ইতিহাস বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছেন।’

মানবজাতির ইতিহাস বিকাশের বিধি বা নিয়ম বলিতে কি বুঝাইতেছে? এঙ্গেলস বলিয়াছেন, এই বিধি বা নিয়ম আর কিছু নহে—একটি সরল সত্য মাত্র। সত্যটি এই যে অন্য কোন কাজে হাত দিবার আগে মনুষ্যসন্তানকে খানাপিনা করিতে, মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই খুঁজিতে আর পিন্ধনের মতো এক টুকরা কাপড়ের ব্যবস্থা করিতেই হয়। এটুকুর ব্যবস্থা হইলেই না তাহারা রাষ্ট্রনীতি, শিল্পকলা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির পিছনে সময় দিতে পারে। এতদিন পর্যন্ত সাকার ভাবধারার বাড় অতি বেশি বাড়িবার কারণে এই সরল সত্যটা পায়ের তলায় চাপা পড়িয়া ছিল। তাই এই সত্যের প্রকৃষ্ট অর্থ দাঁড়াইতেছে এই রকম: কোন বিশেষ জাতি বিশেষ কোন যুগে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের নগদ প্রয়োজনে যেটুকু উৎপাদনের ব্যবস্থা করিতে পারে অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করিতে পারে তাহার ভিত্তিতেই সেই জাতির পক্ষে রাষ্ট্র পদবাচ্য অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান বা আইন-কানুনের গোড়াপত্তন করা কিংবা শিল্পকলা আর—এমনকি—ধর্মকর্ম সংক্রান্ত ভাবধারা প্রভৃতি গড়িয়া তোলা সম্ভব। এই ভিত্তির নিরিখেই মাত্র তাহার উপর গড়িয়া ওঠা ধ্যান-ধারণার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিতে হইবে—এতদিন ধরিয়া যাহা চলিতেছিল—অর্থাৎ ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাখ্যা—সেই রকম উল্টাপাল্টা ব্যাখ্যা আর চলিবে না।

এঙ্গেলসের এই দাবি নিছক তাঁহার মনগড়া কথা নহে। মার্কস তাঁহার ‘পুঁজি’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধযোগে একই কথাই লিখিয়াছিলেন—‘শেষ পর্যন্ত এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য একটাই—এ যুগের সমাজ ব্যবস্থা কোন অর্থনৈতিক বিধি বা নিয়ম অনুসারে বিকশিত হইতেছে তাহা আবিষ্কার করা।’

এঙ্গেলসের মতে, এই আবিষ্কারটাই কার্ল মার্কসের একমাত্র আবিষ্কার ছিল না। সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতায় তিনি আরো যোগ করিতেছিলেন, বর্তমান যুগের পুঁজিভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী আর সেই প্রণালী হইতে যে বুর্জোয়া শ্রেণি জন্মিয়াছে তাহারা যে বিশেষ বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী চলিতেছেন সেই বিধিটিও মার্কসই আবিষ্কার করিয়াছেন। মার্কস আবিষ্কার করিয়াছেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হইয়া শ্রমিক শ্রেণি যে পরিমাণ নতুন মূল্যের সৃষ্টি করে তাহার একাংশই মাত্র তাহারা মজুরি বাবদ পাইতেছেন, বাকি বা উদ্বৃত্ত অংশটুকু পুঁজির মালিকগণ ভোগ করিয়া থাকেন। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস নির্দেশ করিয়াছেন, এই উদ্বৃত্তমূল্যের বিধি বা নিয়মটা কার্ল মার্কসের দুই নম্বর আবিষ্কার। এই আবিষ্কারকে এযুগের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদগণ নতুন নামে ডাকিতেছেন। তাঁহারা ইহার নাম রাখিয়াছেন ‘পুঁজিগঠন’ বা ক্যাপিটাল ফর্মেশন।

এই আবিষ্কারের ফলে এতদিন যাবত যে সমস্যার সমাধান লইয়া একাধারে বুর্জোয়া অর্থনীতি ব্যবসায়ী এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রবাদী সমালোচকগণ অন্ধকারে পথ হাতড়াইতেছিলেন তাহা অকস্মাৎ সহজবোধ্য হইয়া উঠিল। এই সমস্যার নাম এতদিন ছিল শ্রমিক সমস্যা। এক্ষণে উহার নতুন নাম দাঁড়াইল বুর্জোয়া সমস্যা—অর্থাৎ সমাজ হইতে কিভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন উঠাইয়া দেওয়া যায়।

একটা জীবনের পক্ষে এই মাপের দুইটা আবিষ্কারই কি যথেষ্ট নয়? আর এহেন একটা আবিষ্কারের মতন আবিষ্কার যে মানুষটি করিতে পারেন তাহাকেই নির্দ্বিধায় সুখী মানুষ বলা যাইতে পারে। জ্ঞানের যে ক্ষেত্রেই মার্কস হাত দিয়াছিলেন সেখানেই—এমনকি গণিতশাস্ত্রেও—তিনি নিজস্ব একটা কিছু আবিষ্কার করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তাঁহার জ্ঞানানুসন্ধানের ক্ষেত্রও খুব একটা কম ছিল না—ছিল অনেকগুলি—আর কোন ক্ষেত্রেই নিছক ভাসাভাসা অনুসন্ধান করিয়া বা দায় সারিয়া তিনি কর্তব্যকর্ম সমাপন করেন নাই।

সেদিনের বক্তৃতায় এঙ্গেলস যে কোন কারণেই হউক আর একটি আবিষ্কারের কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। মার্কস নিজেই সেই আবিষ্কারের কথা বলিয়া গিয়াছিলেন—এঙ্গেলসেরও তাহাতে দ্বিমত ছিল না। জগদ্বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দুইজনেরই কীর্তি—তবু এই ইশতেহারের মূল ধ্যান-ধারণার কৃতিত্ব এঙ্গেলসও একা কার্ল মার্কসকেই দিয়াছিলেন। এই প্রধান ধারণাটির নাম—সকলেই জানেন—‘শ্রেণি সংগ্রাম’। মার্কস বলিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রাম কথাটি বা তাহার অন্তর্গত অর্থটি তাঁহাদের নিজেদের মৌলিক আবিষ্কার নহে। তাঁহাদের এক যুগ আগে ফরাশিদেশের কয়েকজন ইতিহাস ব্যবসায়ী এই ধারণাটির উদগাতা। এই বুর্জোয়া ইতিহাস ব্যবসায়ীদের মধ্যে ওগুস্তিন থিয়েরি প্রমুখ কেহ কেহ ছিলেন সাঁ সিমোঁর শিষ্য।

মার্কস দাবি করিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রামের মধ্যস্থতায় পশ্চিম এয়ুরোপের ইংলন্ড, ফরাশি প্রভৃতি দেশে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করিয়াছে। মার্কস দেখাইতে চাহিয়াছিলেন, বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা যে পথে আসিয়াছে একদিন সেই পথেই তাহার বিনাশ ঘটিবে। অর্থাৎ শ্রেণি সংগ্রামেই তাহার অবসান হইবে। ইংলন্ড ও ফরাশি প্রভৃতি দেশের নতুন শাসক শ্রেণি—সংক্ষেপে যাহাদের নাম বুর্জোয়া শ্রেণি—একদিন শ্রমিক শ্রেণির হাতে পরাস্ত হইবেন। এই নতুন বিপ্লবী শ্রেণির লক্ষ্য হইতেছে সমাজ ব্যবস্থার দুষ্টক্ষতস্বরূপ যে শ্রেণি সংগ্রাম জারি রহিয়াছে তাহার অবসান ঘটানো। মার্কস নিবেদন করিয়াছিলেন একদিন শ্রমিক শ্রেণির রাজ কায়েম হইবে—এই ধারণাটিই তাঁহার নিজের পক্ষে শেষ আবিষ্কার। ইংরেজিতে এই ধারণার তর্জমা হইয়াছে—ডিক্টেটরশিপ অব দি প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণির একান্ত শাসন।

এঙ্গেলস তাঁহার ১৭ মার্চের বক্তৃতায় বলিতেছিলেন, সকল কথার গোড়ার কথা—মার্কস ছিলেন একজন বিপ্লব ব্যবসায়ী—প্রচলিত ভাষায় বলিতে ‘পেশাদার বিপ্লবী’। তাঁহার ধ্যানজ্ঞান ছিল একটাই—ছলে বলে কিংবা কৌশলে পুঁজিমালিক সমাজের উচ্ছেদসাধন আর সেই উচ্ছেদসাধনের কাজে তাহার সঙ্গে যে সকল রাষ্ট্র জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে এই ধরণের সমাজ গাড়িয়া বসিয়াছে তাহাদের উচ্ছেদসাধনে সর্বাত্মক শরিক হওয়াই তাঁহার জীবনের ধ্রুবতারা হইয়াছিল। তিনি শরিক হইতে চাহিয়াছিলেন বর্তমান যুগের প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিসংগ্রামে। শ্রমিক শ্রেণি যে শ্রমিক শ্রেণি—বুর্জোয়া শ্রেণি যে তাহাদের শোষণ করিতেছে এই সত্য খোদ শ্রমিকদের মাথায় তিনিই প্রথম ভালোভাবে ঢুকাইয়াছিলেন। শ্রমিকদিগকে তিনি বলিয়া দিয়াছিলেন মুক্তিলাভ করিতে হইলে তাহাদের কি কি জিনিশের দরকার হইবে, বা কোন কোন শর্ত পূরণ করিতে হইবে। এককথায় লড়াই করার মেজাজটা তাঁহার অস্থিমজ্জায় গাঁথা ছিল।

এহেন মানুষের পক্ষে বুর্জোয়া শ্রেণির ঘৃণা না কুড়াইয়া বাঁচিয়া থাকা কি সম্ভব? মার্কস ছিলেন—এঙ্গেলস জানাইতেছেন—তাঁহার কালের সবচেয়ে বেশি ঘৃণাপ্রাপ্ত এবং সবচেয়ে বেশি কুৎসার শিকার ব্যক্তি। রাজতন্ত্রপন্থী আর প্রজাতন্ত্রপন্থী দুই ধরনের সরকারই তাঁহাকে স্ব স্ব দেশ হইতে বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার দৌঁড়ে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামিয়াছিলেন। এই একটি ক্ষেত্রে কে যে সংরক্ষণশীল দলের আর কে যে অতি-গণতন্ত্রী দলের সেই ভেদাভেদ করা যাইত না।

মার্কস আপন মনে আপনার কাজ করিয়া গিয়াছেন। একান্ত বাধ্য না হইলে তিনি এই সকল কুৎসার কোন জবাবও দিতেন না। উদাহরণস্বরূপ ‘পুঁজি’ প্রথম খণ্ডের মুখবন্ধ লিখিতে বসিয়া তিনি লিখিয়াছিলেন, যে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল যাহাদের বিরুদ্ধে যায় তাহারা যে সেই গবেষণার মুণ্ডুপাত করিবেন তাহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের বিষয়টা একটু আলাদা। যে সমস্ত বিষয় লইয়া অর্থশাস্ত্রের কারবার তাহাদের প্রকৃতিটা একটু আলাদা গোছের। এইসব বিষয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বা স্বার্থের সহিত জড়িত বিধায় অর্থশাস্ত্র গবেষকের বিরুদ্ধে গড়িয়া উঠা যুদ্ধক্ষেত্রের শত্রুব্যূহে দেখা যায় মানবজাতির বক্ষে পৃথিবীর যত চরম ধ্বংসাত্মক, পরম হীন আর অসুস্থ আবেগ আছে সবই এক জায়গায় আসিয়া সমবেত হইয়াছে। এদের নাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অসুর-অসুরি।

শত্রুতার প্রকৃতিটা কেমন তাহা দেখাইবার উদ্দেশ্যে মার্কস লিখিয়াছিলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ বলা যাউক, আপনি যদি ইংরেজ জাতির সর্বজনস্বীকৃত চার্চ বা ধর্মসংঘের ৩৯টি বিধির মধ্যে ৩৮টি বিধি বাতিল করিবার দাবিও তোলেন তাহা তাহারা সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন, তবে যদি তাহাদের আয়ের ৩৯ ভাগ হইতে ১ ভাগও কমাইতে চাহেন অত সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন না। কারণ—মার্কস বলিতেছেন—আজিকালি সম্পত্তি প্রথার সমালোচনার সহিত তুলনা করিলে দেখিবেন নাস্তিকতাও লঘু অপরাধ বৈ নহে।

১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস যখন ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করিতেছিলেন তখনও এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণি পুরাপুরি গড়িয়া উঠে নাই। ফরাশি একাডেমি প্রণীত ফরাশি ভাষার অভিধানে ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দটি প্রথম ঢুকিবার অনুমতি পাইয়াছিল মাত্র ১৮২৮ সালে—মানে মার্কসের জন্মের মাত্র দশ বছর পর আর ইশতেহারের বিশ বছর আগে। বুর্জোয়া শ্রেণি খুব সহজে এই শব্দটি উচ্চারণ করিতে চাহেন নাই। তাহারা ইহার পরিবর্তে ‘জনতা’ শব্দটি ব্যবহার করিতে শুরু করেন। ইংরেজিতে একবচনে ‘ম্যাস’ আর বহুবচনে ‘ম্যাসেস’ শব্দের ব্যবহার ১৮৩০ সালের পর খুব বাড়িয়া যায়। নাপোলেয়ঁ বোনাপার্তের ভ্রাতুষ্পুত্র লুই নাপোলেয়ঁ বলিয়াছিলেন, ‘এখন বর্ণভেদ লোপ পাইয়াছে, আর জনতার শাসন কায়েম হইয়াছে।’

এঙ্গেলসের যে বক্তৃতা হইতে আজ আমরা এতগুলি কথা ধার করিয়াছি সেই বক্তৃতায় তিনি মার্কসের পরিচয় দিয়াছিলেন এইভাবে: মার্কসের মৃত্যুতে দুইটি শক্তির প্রচণ্ড ক্ষতির হইয়াছে—প্রথম শক্তির নাম এয়ুরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি। আর দ্বিতীয় যে শক্তির ক্ষতি হইয়াছে তাহার নাম ইতিহাস শাস্ত্র। সত্য সত্যই মার্কস প্রণীত বিজ্ঞানের নাম ইতিহাস শাস্ত্র। দুঃখের মধ্যে, বর্তমান কালের অনেক মার্কস ব্যবসায়ী এই সত্যটা আমলই করেন নাই।

দোহাই

১. Frederick Engels, ‘Speech at the Graveside of Karl Marx,’ in Progress Publishers, ed., Marx and Engels in the Eyes of Their Contemporaries, 3rd printing (Moscow: Progress Publishers, 1982), pp. 7-9.

২. Karl Marx, ‘Preface to the First Edition,’ Capital, vol. I, trans., Samuel Moore and Edward Aveling, ed., Frederick Engels (Moscow: Progress Publishers, 1977).

৩. Fernand Braudel, A History of Civilizations, trans. Richard Mayne (New York: Penguin Books, 1993).

 

বণিকবার্তা, ৪ মে ২০১৮
এনটিভি, ৬ মে ২০১৮

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

lacan-1932.jpg

১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। লাকাঁ বলিয়াছেন–‘[গঠন] ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোল পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন না যাইতেই শব্দটি লইয়া একপ্রকার হুজুগের চল হইবে।’

এই বক্তৃতার তাৎপর্য পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া স্বল্পশিক্ষিত সাংবাদিকরা মনে করিয়াছিলেন জাক লাকাঁ বড় কঠিন লোক। তাঁহার কথা বুঝিবার সাধ্য
hyppo.jpg…….
জঁ ইপ্পোলিত (১৯০৭–১৯৬৮)
……..
সাধারণের নাই। তাঁহারা আরো বলিয়াছিলেন, লাকাঁ সাহেব যেহেতু ইংরেজি ভাষাটি সঠিক আয়ত্ত করিয়া সারেন নাই, তাই তাঁহার বক্তৃতা দশজনের পক্ষে ভালোমতে হজম করাও সম্ভব হয় নাই। আমরা সেই বক্তৃতার অনুবাদ এখানে পেশ করিতেছি। আমাদের তর্জমার ত্রুটিসহ পাঠকগণ দেখিবেন এই বক্তৃতার বিরুদ্ধে যাহা রটিয়াছে তাহা পুরাপুরি সঠিক নয়। ইহা হয়তো বোঝা যায়। নহিলে বাংলায় অনুবাদ করিবার কথাই উঠিত না।

কেহ কেহ বলিয়াছিলেন বল্টিমোর সম্মিলনে মিলনকথা যাহা উঠিয়াছিল তাহা ভাষা ও মানুষের সম্বন্ধটা কী সেই জিজ্ঞাসা লইয়া। একদল জিজ্ঞাসিয়াছিল–মানুষ ভাষা তৈয়ার করিয়াছে নাকি ভাষাই মানুষ তৈরি করিয়াছে? কেহ কেহ দাবি করিয়াছিলেন ফরাসিদেশ হইতে প্রচারিত ‘গঠনতন্ত্র’ নামক প্রচারণা প্রমাণ করিয়াছে যে ‘মানুষ’ বলিয়া সামান্য কিছু নাই। তাই ‘সহজ মানুষ’ বলিয়া বিশেষ কিছু থাকিবে কি করিয়া? বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যবসায়ী মিশেল ফুকো সাহেবের নামে এই প্রচারণা কিছুদিন গাঢ় চলিয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হইতেছে উপরোক্ত ১৯৬৬ সম্মিলনে মিশেল ফুকো হাজির হয়েন নাই। তবে তর্কের খাতিরে স্বীকার করিতে দোষ নাই ঐ বছর ছাপা তদীয় ‘ভাষা ও বস্তু’ (লে মো এ লে শোজ) বইয়ে তিনিও ঐ রকমের ইশারাই করিয়াছিলেন ।

অথচ তিন বছরের মাথায় ছাপা ‘জ্ঞানগরিমার আদিকথা’ নামক পুস্তকে ফুকো ঘোষণা করিলেন ‘গঠনতন্ত্র’ তথা ‘মনুষ্য বলিয়া কিছু নাই’ কথাটি তাঁহার নহে। এহেন দাবি অলীক ও অসার। তিনি ১৯৬৬ সালের বইয়ে বলিয়াছিলেন ‘মানুষ’ অর্বাচীন এবং তাহার অন্তর্ধান অত্যাসন্ন। অথচ তিনি ১৯৬৯ সনের কেতাবে তিনিই ঘোষণা করিলেন–আমি কিন্তু কোথাও ‘গঠন’ কথাটি ব্যবহার করি নাই। (ফুকো ১৯৭২: ২০০-২০১) সুতরাং ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’ [the structuralist controversy] কথাটি অলীক বুলি মাত্র। তবে শেষমেশ এই ফুকো কবুল করিলেন তিনি নিজেও মনুষ্য সাধকের সাধনার মূল্য খানিক কমাইয়া দেখিয়াছিলেন আর কিছু বাড়াইয়া দেখিয়াছিলেন এই গঠনে সেই গঠনে পাওয়া যুগপৎ মিলের মূল্য ।

কী ঘটিয়াছিল এই সময়? বিশেষ করিয়া বলিতে নৃবিজ্ঞানসাধক হজরত ক্লদ লেভি-স্ত্রোস [Claude Lévi-Strauss] যখন দেখাইয়াছিলেন ফ্রয়েডের
Claude Levi Strauss………
ক্লদ লেভি-স্ত্রোস (জন্ম. ১৯০৮)
……….
আবিষ্কৃত অজ্ঞানের গঠন আর মনুষ্যজাতির মধ্যকার পরিবার ও আত্মীয়তা-সম্পর্কের গঠন একই প্রকার গঠনেরই রকমফের মাত্র, প্রকৃত প্রস্তাবে গঠনতন্ত্র প্রস্তাব পেশ করা হইয়াছিল তখনই । ইহাতে জাক লাকাঁ আরও আহুতি দিলেন–বলিলেন অজ্ঞানের গঠন পরিষ্কার ভাষার মতন । গঠনতন্ত্র সত্য সত্যই গড়িয়া উঠিল।

ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাইলেন যাঁহারা তাঁহারা আগের শতকের দর্শনতত্ত্বজ্ঞানী নিৎসের [Friedrich Nietzsche] দোহাই পাড়িলেন। ফুকো একা নহেন, কিছু পরিমাণে জাক দেরিদা আর বহুল পরিমাণে জিল দল্যুজ [Gilles Deleuze] তাঁহার সঙ্গী হইলেন । ইঁহাদের মধ্যে কিছু প্রভেদ
Deleuze……..
জিল দল্যুজ (১৯২৫—১৯৯৫)
………
থাকিলেও মূল প্রশ্নে সকলেই একমত হইলেন। তাঁহারা ধরিয়া লইলেন ‘গঠনতন্ত্র’ মানে সহজ মানুষের অন্তর্ধান। তাই ফুকো ও দল্যুজ নিৎসের আশ্রয় লইলেন আর দেরিদা উটপাখির মত ভাষার বালিতে আমুণ্ডুপদনখর ডুবিলেন।

‘গঠনতন্ত্র’ কথাটি শুরু হইতেই এই ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়াইয়া আছে। অনেকেই মনে করিয়াছিলেন ‘গঠন’ (structure) থাকিলে ‘সহজ মানুষ’ (subject) থাকিতে পারে না। অথচ জাক লাকাঁ একেবারে বিসমিল্লাহ হইতেই বলিয়া আসিতেছিলেন এই ধারণাটি আদপেই সঠিক নহে। পক্ষান্তরে তিনি দাবি করিলেন, গঠন ও সহজ মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। গঠনের পরই শুদ্ধ সহজ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, পূর্বে বা বিহনে নহে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ‘সহজ মানুষ’ (subject) কী বস্তু? জাক লাঁকা বলিলেন–‘সহজ মানুষ’ কথাটার অর্থই হইতেছে ‘যাহা সহজ নহে’। কোন জিনিস ভাষার মধ্যে ধরিয়া রাখা সহজ নহে বলিয়া আমরা কি বলিতে পারি জিনিসটুকু নাই? সেই সময় শার্ল মোরাজে (Charles Morazé) নামক জনৈক ইতিহাস বিশারদ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন ‘ঋণাত্মক একের বর্গমূল’ (the root of minus one) কথাটির অর্থ কী? গণিতশাস্ত্রে এই চিহ্নটিকে
Moraze………
শার্ল মোরাজে (১৯১৩–২০০৩)
……….
‘অযৌক্তিক’ [irrational] সংখ্যা বলা হইয়া থাকে। অথচ ইহা তো খোদ গণিতেই কাজ করে। জাক লাকাঁ ইহার বরাত দিয়া বলিলেন প্রাণীস্বরূপ মানুষ বা ‘জীব’ ও ‘সহজ’ মানুষের মধ্যকার পার্থক্যও অনুরূপ বটে। ‘সহজ মানুষ’ কথাটা যদি অযৌক্তিক মনে হয় তবে তাহা ভাষারই দোষ। কিন্তু তাই বলিয়া ইহা কাজ করে না বা ইহা নাই বলা যাইবে না।

জাক দেরিদা এক জায়গায় জাক লাকাঁর কাছে জানিতে চাহিলেন ইহাকে ‘সহজ মানুষ’ বা ‘অজ্ঞান’ বলিবার কারণ কী? ইহার উত্তরে লাকাঁ সভাস্থলে উপস্থিত বিদ্বানমণ্ডলীর কাছে একটি গল্প বলিয়াছিলেন।

একদিন হোটেলে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। জাক লাকাঁর ঘরে একটি টেবিল এক জায়গা হইতে আরেক জায়গায় সরাইবার দরকার হইল। তিনি যাহাকে বলে বেলম্যান বা পিয়ন তাহাকে টেবিলটি সরাইতে বলিলেন। পিয়ন সাহেব
d_jaques_derrida.jpg…….
জাক দেরিদা (১৯৩০–২০০৪)
………
তাহাতে ক্ষেপিয়া গেলেন। বলিলেন, ‘মহাশয়, ইহা আমার কর্তব্য নহে। আপনি দরকার মনে করিলে কথাটা বলিবেন গৃহ-পরিচারক বা হাউস-কিপারকে। গৃহ-পরিচারকগণ আসিয়া কাজটা করিয়া গেলেন বটে, কিন্তু তাহারা মহাত্মা লাকাঁর কোন কথাই শুনিলেন না। তাঁহারা শুদ্ধ স্ব স্ব উপরিওয়ালার আদেশ অনুসারে কাজ সারিয়া চলিয়া গেলেন। ইহা হইতেই–লাকাঁ বলিলেন–তিনি ঠাহর করিলেন কাজ যাহা হইয়াছে তাহা (সহজ মানুষস্বরূপ) তাহার ইচ্ছায় হইয়াছে মনে করিলে তিনি ভুল করিবেন। কাজ হইয়াছে হোটেলের নিয়ম অনুসারে, খরিদ্দারস্বরূপ জাক লাকাঁর ইচ্ছায় নহে। মাঝখানকার খরিদ্দারবেশী জাক লাকাঁ নামক অস্থিরতাটুকুরই অপর নাম ‘সহজ মানুষ’। টেবিলটা বড় বেঢপ জায়গায় ছিল। এখন বেশ ঢপ জায়গায় চলিয়া আসিয়াছে। মাঝখানে সৃষ্ট শূন্যতাই এক্ষণে প্রমাণ করিতেছে ঐখানে কি একটা যেন ছিল। অধৈর্যপরায়ণতার বাহক এই স্থানটির নামই ‘সহজ মানুষ’। (রাবাতে ২০০২: ৪০ )

জাক লাকাঁর এই বক্তৃতার নাম দেখিয়াও অনেকেই ইহা পড়িতে চাহিবেন না মনে হয়। সে কি নাম রে বাবা! ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’ [‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’]। মহাত্মা লাকাঁ সেইদিনের বক্তৃতায়ই জানাইয়াছিলেন সমস্যাটি লইয়া তাহার কাজের বয়স ততদিনে ১৫ বৎসর হইবে। কাজেই তাঁহার সমস্ত কথা একদিনে বলা সম্ভব হইবে না।

সেদিনের বক্তৃতার আরও একটি কথা মনে রাখিবার মত যুৎসই হইয়াছিল। বক্তৃতার শেষভাগে এক জায়গায় তিনি বলিলেন: ‘অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।’ কিছু একটা আছে বোঝা যাইতেছে কিন্তু সঠিক কী যে আছে বুঝিতেছি না । তাহা বুঝিতে হইলে খানিক কল্পনার শরণ লইতে হইবে।

মনে রাখিতে হইবে সেই ১৯৫৩ সন হইতেই লাকাঁ বলিয়া আসিতেছিলেন ‘অজ্ঞানের গঠন ভাষার মতন’। ১৯৬৬ সনে–এই বক্তৃতাতেই–তিনি জাহির করিলেন ঐ কথাটি কিছু পরিমাণ বাহুল্যদুষ্ট ছিল। এক্ষণে তাঁহার সহজ মত দাঁড়াইল: ‘অজ্ঞানের গঠন আছে বলিলেই চলিত কারণ গঠন মানেই তো ভাষা’।

লাকাঁর কথা যৎসামান্য উদ্ধার করিতেছি:
সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই।

মনে রাখিবার মতন মচমচে কথা এই বক্তৃতায় আরো এক প্রস্ত পাওয়া যাইতেছে। ‘চিহ্ন’ (sign) ও ‘পদ’ (signifier)-এর মধ্যে ভেদ আছে–এই প্রস্তাব প্রচারের লক্ষ্যে লাকাঁ জানাইলেন চিহ্ন মানে যাহা দিয়া সজ্ঞান এক প্রাণীর খবর অন্য প্রাণীকে দেওয়া চলে। কিন্তু ‘যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে’।

আরো এক জবর খবর–এইস্থলে তিনি বলিয়াছিলেন–আছে। ভাষার বা পদের জগতে যাহা আছে তাহাকে ‘বাসনা’ (desire) বলা হয়। বাসনার এক মানে যাহা বাস করে না–যাহা অস্থির, যাহা অধৈর্য। কিন্তু বাসনার তলে তলে আরো এক জিনিস বাস করে। তাহার নাম মজা (jouissance)। বাসা আর মজা
lucien-goldmann.jpg……..
লুসিয়ঁ গোল্ডমান (১৯১৩–১৯৭০)
……..
মারা ঠিক এক জিনিস নহে। ভাষা মানে বাসনার বিধি–আইন ও ঈশ্বর যে অর্থেই ইচ্ছা–ধরিয়া লইতে পারেন। ভাষাই বিধি। ভাষাই নিষেধ। নিষেধ বা সীমা আছে বলিয়াই প্রাণী (এখানে মানুষ) সেই নিষেধের বেড়া ভাঙ্গিয়া–বা আইল ডেঙ্গাইয়া–ঘাস খাইতে চায়। নিষেধ বা আইল না থাকিলে তো আইলডেঙ্গার দরকারই হইত না–মজাও হইত না। কাজেই বল্টিমোর শহরের বিজ্ঞাপনচিত্রে লেখা ‘এনজয় কোকা-কোলা’ বা ‘কোকা-কোলার মজা মার’ দেখিয়া লাকাঁ বলিলেন সকলেই সকলকে বলিতেছে ‘মজা মার’।

এই মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে একসময় ব্যথা করিতে শুরু করে। অথচ এই ব্যথার সীমায় পৌঁছাইতে না পারিলে মজা যে সে মারিতেছে তাহার প্রমাণই হয় না। লোকে বলে মজাই জীবন, মজা না মারিলে এ জীবন লইয়া সে কী করিত? মজা জীবনের চাহিতেও বড়। জীবন তুচ্ছ। যে কেহই ত্যাগ করিতে পারেন। সকলেই যাহা সহজে পারেন না ভারতীয় শাস্ত্রে তাহারই অপর নাম ‘ভক্তি’।

পাঠিকা, খেয়াল করিয়াছেন ‘ভক্তি’ কথাটার তাৎপর্য? ‘ভক্তি’ কথাটার আগে
jean-pierre-vernant.jpg
জঁ-পল ভেরনা
………
‘বি’ উপসর্গ লাগাইলে কী হয়? ‘বিভক্তি’। বিভক্তি আসিয়াছেন ‘বিভাগ’ করিবার ক্রিয়া হইতে। তাহা নহে তো কী? তাহা হইলে ‘ভক্তি’ আসিয়াছেন ‘ভাগ হইতে’। প্রাণীমানুষ বা ‘জীব’ ভাগ হইলেই ‘সহজ মানুষ’ তৈয়ার হয়েন। এই ভাগকর্মটি করেন যে হাজাম বা নাপিত তাহারই অপর নাম ভাষা। ভাষাই ভাগ করেন। কাজেই ভাগ হইতে যাহার উৎপত্তি তিনিই বিভক্ত বা নিছক ‘ভক্ত’, তাহার পরায়ণতার নামই ভক্তি। খোদ ভক্তি ও মজার মধ্যে তাহা হইলে একটা না একটা যোগ আছে।

মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে ভাগ বা ভক্তি আর থাকিবেন না। তখন মজার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবেক। ভাষা ও মজার, পরকীয়া ও আপনকার এই যুগলবন্দিকেই আমরা এতদিনে ‘গঠন’ বলিয়া চিনিতে পারিলাম। আর জাক লাকাঁর কর্জ নগদ নগদ স্বীকার করিলাম। লাকাঁ কথিত সমাচার এইখানেই মূর্তি পাইল: আপনকার হৃদয় বা অন্তরের সহিত বাহির বা পরকে মিশাইলেই শুদ্ধ সেই ‘সহজ মানুষ’ দেখা দিবেন–অন্য হেতু অন্য কোথা, অন্য কোনখানে দিবেন না। কারণ তাহা যে দিবার নহে।

দোহাই

১. Michel Foucault, The Archeology of Knowledge [L’archéologie de savoir, Paris: Gallimard, 1969], trans. A. M. Sheridan Smith (New York: Pantheon, 1972); ইংরেজি এই সংস্করণে ১৯৭০ সালে কলেজ দো ফ্রঁসে ফুকোপ্রদত্ত বক্তৃতা L’ordre du discourse (Paris : Gallimard, 1971) এর অনুবাদ ‘The Discourse on Language’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।

২. Michel Foucault, The Order of Things [Les mots et les choses: une archéologie des sciences humaines, Paris: Gallimard, 1966], A. Sheridan, tr. (New York: Random House, 1970).

৩. Jacques Lacan, ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in Richard Macksey and Eugerio Donato, eds., 1970, infra, pp.186-200.

৪. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Structuralist Controversy: The Languages of Criticism and the Sciences of Man(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1972).

৫. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy,(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1970).

৬. Jean-Michel Rabaté, The Future of Theory (Oxford: Blackwell, 2002).

●●●

অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা

জাক লাকাঁ

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

আমার ইংরেজি উচ্চারণ একদম বাজে। উচ্চারণদোষে আমার বক্তৃতা একদল ইংরেজিভাষী শ্রোতার কানে নিশ্চয়ই বড় মধুর শোনাইবে না। আর বক্তৃতাটা যদি আমি ইংরেজি জবানেই করি তো যাহাকে বলা যাইতে পারে আমার বার্তা তাহা যথাস্থানে না পৌঁছাইবার ঝুঁকিও থাকিয়াই যাইতেছে–আজ বিকালবেলা এই কয়টি কথা আমাকে বুঝাইবার আশায় এক ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ব্যয় করিয়াছেন। সত্য বলিতে বিষয়টি আমার বিবেকের ঘাড়েও ভারি বোঝা হইয়া রহিয়াছে। যদি অন্যথা করি তো তাহা হইবে আমি যে বস্তুকে আমার বার্তা মনে করিয়া থাকি তাহার শতে একশত ভাগ বিপরীত কর্ম। বার্তা বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহা আপনাদের সমক্ষে খুলিয়াই বলিতেছি–বার্তা মানে আমার নিকট আর কিছু নয়, মাত্র ভাষার বার্তা। আজকাল যেখানেই যাই দেখি সকলেই বার্তা বার্তা করিতেছে–জীবদেহের অন্তরের হরমোনে বার্তা, বিমানপোতকে পথ দেখাইবার কিংবা উপগ্রহাদি হইতে সংকেত ধরিবার আলোকরশ্মিও বার্তা। এই ক্রমে আরো আরো আছে। ভাষার বার্তা কিন্তু সেই জিনিস নয়। ইহা ষোল আনাই ভিন্ন বস্তু। বার্তা–মানে আমরা যে বস্তুকে বার্তা নামে ডাকিতেছি তাহা–বিনা ব্যতিক্রমেই পরমের পাঠানো বার্তা। পরম বলিতে আমি বুঝাইতেছি ‘পরমের ঠিকানা বা অধিষ্ঠান’। আমরা সচরাচর যাহাকে ‘পর’ কিম্বা বা ‘অপর’ (other) বলিয়া থাকি, যাহা লিখিতে ছোট ছাদের ‘o’ অক্ষর ব্যবহার করা হয়, এই পরম অবশ্যই সেই পরম নয়, আর সেই কারণেই এক্ষণে ‘পরম’ (Other) বলিয়া যাহাকে ডাকিতেছি তাহা লিখিবার সময় প্রথম হরফ নাগাদ বড় ছাদের ‘O’ ব্যবহার করিয়াছি। এতদ্দেশে, এই বল্টিমোর শহরে, পরম মনে হইতেছে ইংরেজি জবানেই বাতচিত করিয়া থাকেন। আর ইহাই তো স্বভাবসম্মত। তাই আমি যদি এই বক্তৃতাটি ফরাসিযোগেই করিতাম তো তাহা হইত অন্যায় কাজ। অবশ্য উপরে যে ভদ্রলোকের দোহাই দিলাম তাহার কথাটিও ফেলিয়া দিবার মতো নহে। তিনি বলিয়াছিলেন ইংরেজি বোলটা আমার মুখে ঠিক সহজে আইসে না। অধিক কী, তাহা খানিক ভূতের মুখে রামনাম রামনাম শোনায়। আরো কথা আছে। আমি জানি অত্র সভায় এমনও অনেকে আছেন যাহারা শুদ্ধ ফরাসি ভাষাতেই বাতচিত করিতে পারেন, ইংরেজি এক লব্জও বুঝিতে পারেন না। আমি যদি ইংরেজিযোগে বলিতাম ইঁহাদিগের পক্ষে নিরাপদ হইত। তবে আমার হয়তো বাঞ্ছাই নাই যে ইঁহারা অতটি নিরাপদ থাকিবেন। অতএব ইহাদিগের মুখ চাহিয়া আমি একআধটু ফরাসিও কহিব।

jacques-lacan-1.jpg
জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১)

পহিলা দফায় আমি ‘গঠন’ বলিতে কী বুঝায় সেই সম্বন্ধে কিছু আগাম কথা বলিতেছি। ইহাই তো আমাদের অদ্যকার সভার বিষয়বস্তু। ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোলও পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন যাইতে না যাইতেই শব্দটি লইয়া এক প্রকার হুজুগেরও চল হইবে। আমার বেলা এই কথাটি কিন্তু খাটিবে না কেননা আমি শব্দটি এস্তেমাল করিয়া আসিতেছি অনেক দিন হইতেই–পড়াইবার ব্যবসায় আরম্ভ করিবার পর হইতেই। এই বিষয়ে আমার যাহা বলিবার তাহা জানেন অল্প লোক মাত্র। আরো বেশি লোকে জানিতেন যদি না আমি আমার বক্তৃতা সীমিত রাখিতাম মাত্র একদল বিশেষজ্ঞ শ্রোতা–মানে মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের–সমক্ষে। বিষয়টি বড়ই কঠিন। বেয়াড়া রকমের কঠিন মনে হইতেছে। কারণ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা সত্য সত্যই আমি কিসের কথা বলিতেছিলাম তাহা কিছু কিছু জানেন আর মনোবিশ্লেষণবৃত্তিটি যিনিই গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই জানেন এই জিনিসটির সহিত আঁটিয়া উঠা বিশেষ কঠিন কাজ বটে। ‘সহজ মানুষ’ (subject) বলিতে সত্যই যাহা বুঝায় তাহা লইয়া যাহাদের কারবার সেই মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের কাছে ‘সহজ মানুষ’ জিনিসটা তেমন সহজ জিনিস নয়। আমি চাই না আমি যাহা বলিতেছি তাহা লইয়া কোন ভুল বোঝাবুঝি হউক, কোন ‘মেকোনাসঁস’ (méconaissance) হউক। ‘মেকোনাসঁস’ কথাটি ফরাসি। ইংরেজি ভাষায় ইহার সমান অর্থবহ আর কোন শব্দ নাই বলিয়াই আমি ফরাসি শব্দটিই ব্যবহার করিতে বাধ্য হইলাম। মেকোনাসঁসের অর্থই এমন যে ইহার শরণ লইতে না লইতেই ‘সহজ মানুষ’ আসিয়া যায়। অধিক, আমাকে ইহাও জানানো হইয়াছে যে এক মণ্ডলি ইংরেজিভাষী শ্রোতাসমক্ষে ‘সহজ মানুষ’ লইয়া কথা বলাটাও তেমন সহজ কাজ হইবে না। ‘মেকোনাসঁস’ বলিতে বুঝায় ‘ভুল বোঝা’, কিন্তু ইহাতে আমার (বা আপনার) সহজ ভাবকে ভুল বোঝা বা না বোঝা বোঝায় না। সমস্যাটা–প্রকৃত প্রস্তাবে–গঠন (structure) বলিতে আদপেই কী বোঝায় তাহার সঙ্গে জড়িত।

আমি মনোবিশ্লেষণশাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিবার পর এক সময় আমার কয়েকজন শ্রোতা আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছিলেন। ইহার কারণ ততদিনে অনেক দিন হইয়াছে আমি একটি সরল সত্যের পরিচয় লাভ করিয়াছি। সেই সত্য অনুসারে আমরা যদি ফ্রয়েডের যে কোন বই–বিশেষ অজ্ঞান সম্বন্ধে লেখা যে কোন বই–খুলিয়া দেখি তো শতে একশত ভাগ নিশ্চিত থাকিতে পারি যে একটা না একটা পাতা পাওয়া যাইবে যেখানে কোন না কোন শব্দ দেখিব–বই হইলেই স্বাভাবিকভাবে তাহা অজস্র শব্দে, ছাপানো শব্দে ঠাসা হইবে–যাহা নিছক শব্দ নয়। এমন শব্দ দেখিব যাহা শব্দরূপী বস্তু বৈ নয়। এই নিশ্চয়তা অবশ্য নিশ্চয়তাই, শুদ্ধ সম্ভাবনা নয়। আমরা এই সমস্ত শব্দেরই মধ্যবর্তিতায় অজ্ঞান কী করিয়া সামলাইতে হয় তাহার পথ ধরিবার চেষ্টা করি। শব্দের অর্থ কী তাহা লইয়া এই স্থলে কথা হইতেছে না, কথা হইতেছে শব্দের হাড়মাস, শব্দের স্বভাব-শরীর লইয়া। ফ্রয়েডের চিন্তাভাবনার বড়–য়া ভাগের কারবারই এই লইয়া, স্বপ্নের মধ্যে শব্দচমক (punning), কিংবা মুখ-ফস্কা কথা (lapsus), কিংবা ফরাসি ভাষায় যাহাকে বলে কালঁবু (calembour) বা চমৎকথা, কিম্বা ওমোনিমি (homonymie) বা নামসমতা তাহা লইয়া, কিংবা অধিক বলিতে কোন কোন শব্দ ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা যে এক এক আলাহিদা অর্থ ধারণ করে তাহা লইয়া। শুদ্ধ শব্দই অজ্ঞানের মালমসলা–এই প্রস্তাব শতে একশত ভাগ প্রমাণসিদ্ধ হয় নাই। তবুও ইহা ভালমত টুকিয়া রাখিবার জিনিস। কারণ প্রমাণসিদ্ধ না হইলেও ইহার হইবার সম্ভাবনা বিলক্ষণ আছে (তদুপরি, যাহাই হউক, আমি কদাচ বলি নাই অজ্ঞান বলিতে মাত্র শব্দের মহফিল মাত্র বোঝায়। আমি শুদ্ধ বলিয়াছি অজ্ঞান বস্তুটা যে ‘গঠিত’ সেই সত্যে সন্দেহ নাই)। ইহার তুলনীয় কোন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আছে বলিয়া আমার জানা নাই। কিন্তু থাকার দরকার আছে। কারণ আমরা কথা বলিতেছি ‘গঠন’ সম্বন্ধে আর অজ্ঞানের গঠন ভাষা আকারে। ইহাতে কী বুঝাইতেছে?

সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই। অধিক ইহাই সবটি নয়। ভাষা মানে কোন ভাষা? আমি নই আমার ছাত্ররা অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া এই সমস্যার ভিন্ন আরেকটি অর্থ খাড়া করাইবার কোশেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা চাহিয়াছিলেন সারাৎসার ভাষার মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে। তাহারা জানিতে চাহিয়াছিলেন কোন জিনিসকে ভাষা পদবাচ্য হইতে হইলে কমসে কম কোন কোন শর্ত পুরাইতে হইবে? হইতে পারে শুদ্ধ চারিটি পদাংক (signantes), চারিটি অর্থধারিণী অংকুর (elements) হইলে পর্যাপ্ত হয়। পরীক্ষাটি বেশ মজাদার। তবে ইহার গোড়ায় গলদ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ইহা দেওয়াল পটে লিখিয়া দেখাইব আশা রাখি। পারী শহরে আমার বক্তৃতাসভায় কয়েকজন তত্ত্বজ্ঞানীও আসিতেন। যাঁহারা আসিতেন তাঁহারা সংখ্যায় অনেক নহেন, তবে বেশ কয়েকজনই আসিতেন। ইহাঁদের কেহ কেহ পরে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন যে সমস্যাটা ভাষার ‘ভিতরে আরেক ভাষার’ কিংবা ভাষার ‘বাহিরে অন্য ভাষার’ নয়। যথা পুরাকথা কিংবা কমাকথার সমস্যাও নয়, সমস্যা খোদ ভাষারই। সমস্যার ঠিকানা প্রস্থান করাইতে ইঁহারা যে কষ্টস্বীকার করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই অসামান্য কাজ। যেমন পুরাকথা লইয়া আলোচনার দরকার হইতেছে না কেননা পুরাকথাও যে ভাষার আকারে গঠিত তাহা একদম পরিষ্কার। আর আমি যখন ‘ভাষা আকারে’ কথাটা খাটাইলাম তখন আমি গণিতের ভাষা, কি সংকেতের ভাষা, চলচ্চিত্রভাষা ইত্যাদি অর্থে বিশেষ বিশেষ ভাষা বুঝাইতে খাটাই নাই। ভাষা ভাষাই আর ভাষা মাত্রেই এক জাতের: যথা ইংরেজি বা ফরাসি প্রভৃতি মূর্তিমান ভাষা। এইসব ভাষায় মনুষ্য কথা বলে। এই পর্যন্ত পৌঁছিয়া একটি কথা বলিতে হইবে: ‘ভাষাপারের ভাষা’ (metalanguage) বলিয়া কোন ভাষা নাই। কারণ ভাষাপারের ভাষা নামে অভিহিত সমস্ত ভাষার কথাই বলিতে হয় ভাষারই মধ্যবর্তিতায়। পটের গায়ে খালি খালি অক্ষর লিখিয়া কেহ গণিত শিখাইতে পারে না। দশজনে বুঝিতে পারিবে এমন কোন না কোন সামান্য ভাষায় কথা কহিবার দরকার করে, সদাসর্বদাই করে।

অজ্ঞান ভাষার আকারে গঠিত। ইহা নিছক এই কারণে নয় যে অজ্ঞানের মালমসলা তৈয়ার হইয়াছে আমরা ফরাসি জবানে যাহাকে বলি লঁগাজিয়ে (langagier) তাহা অর্থাৎ ভাষার মশলা দিয়া। অজ্ঞান আমাদের সমক্ষে যে সমস্যা তুলিতেছে তাহাই ভাষার স্বভাব সম্বন্ধে সবার চাইতে বেশি অভিমানিনী সমস্যার প্রান্ত ছুঁইয়া যায়: এই সমস্যারই নাম ‘সহজ মানুষ’। কোন বাক্যের বক্তা কিম্বা ব্যক্তিপরিচয়দাতা প্রতিনাম (personal pronoun) আর ‘সহজ মানুষ’ এক জিনিস, অমনি অমনি এই কথা বলা চলিবে না। ফরাসি জবানে ‘বক্তব্য’ (ennoncé) বলিতে হুবহু বাক্যই বুঝায়, তবে এমন বক্তব্যও ঢের রহিয়াছে যেখানে বক্তব্যটি ঠিক কে বকিতেছে তাহার কোন হদিশ নাই। যদি বলি ‘ইট রেইনস’ (বৃষ্টি হইতেছে) [it rains] তো যে সহজ মানুষ কথাটি বকিলেন তিনি এই বাক্যে শরিক হইলেন না। যাহাই হউক, এইখানে কোথাও না কোথাও একটা গোল বাঁধিয়াছে। ‘সহজ মানুষ’ আর ভাষাব্যবসায়ীরা যাহাকে বলেন ‘আড়কাঠি’ (shifter) এই দুইকে সব সময় এক ভাবা ঠিক হইবে না।

অজ্ঞানের স্বভাব হইতে যে সমস্যা দেখা দেয় তাহা–সংক্ষেপ করিয়া বলিলে–এই দাঁড়াইতেছে: কিছু না কিছু কখনো না কখনো ভাবিতেছে। ফ্রয়েড আমাদিগের উদ্দেশে কহিয়াছিলেন অজ্ঞান সম্বন্ধে সকল কথার বড় কথা এই: অজ্ঞান ভাবনাই বটে। অধিক জ্ঞানের এলাকায় যাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে সেই ভাবনাই। এই নিষেধ একেক জায়গায় একেক রকম চেহারায় করা হইয়া থাকে, অর্থের কথা উঠাইলে বলিতে হইবে ইহার অর্থও নানান কিসিমের হইতে পারে। প্রধান অর্থটি সত্য সত্যই ‘বাধা’ বটে। এই বাধা হয় ডিঙ্গাইয়া যাইতে হইবে নচেৎ ফুঁড়িয়া পার হইতে হইবে। না হইলে হইবে না। কথাটির ভার আছে, কেননা আমি যদি এই বাধার কথা জোর দিয়া না বলি তো আমাদের জীবন একান্তই মসৃণ মনে হইয়া যাইত। আমরা ফরাসি ভাষায় ‘সা ভুজারঁজ’ (ça vous arrange–[বা আপনার ব্যবস্থা হইয়াছে]–জাতীয় কথা বলিয়া থাকি, কেননা নিচের তলায় বা মাটির নিচে কিছু না কিছু যদি ভাবিয়াই থাকে তো জীবনটা সহজ হইয়া যায়। ভাবনা জিনিসটা সদাসর্বদাই হাজির রহিয়াছে আর প্রাণধারী জীব স্বভাবের চাপে যাহা ভাবিতেছে তাহার সম্বন্ধে একটু হুঁশ হইল, জীবন চলিয়া যাইবে এক রকম। ঘটনা যদি তাহাই হইত তো ভাবনার ভারটা পড়িত প্রাণের উপরই, আর তাহাই হইত স্বাভাবিক, যেমন সাড়াই (instinct) হইত ভাবনা। ভাবনা যদি স্বভাবের ফসল হইত তো অজ্ঞান লইয়া কোনই গোল বাঁধিত না। দুঃখের মধ্যে, অজ্ঞানের সহিত ‘সাড়া’ কিম্বা ‘আদিজ্ঞান’ কিংবা মাটির নিচে বাধা ভাবনার কোনই সম্বন্ধ নাই। ইহা শব্দযোগে ভাবনা অথবা আমাদের জাগরিছুট বা চেতনরাজ্যহারা ভাবনা সম্বন্ধীয় ভাবনা বটে। জাগরি কথাটির ভার আছে। আমাদের চেতন অবস্থা লইয়া কোন দানব যদি খেলা করিত তবে তাহার সহিত এই অজ্ঞানের তুলনা চলিত। এই অপর মানুষটি সঠিক কে তাহা খুঁজিয়া লওয়াই এক্ষণে মূল সমস্যা। আর এই মানুষ অপর কেহ নহেন, ভাষা হইতে ভাবনা শুরু করিলে আমরা যে সহজ মানুষে আসিয়া পৌঁছিতাম এই মানুষ হুবহু সেই মানুষই।

আপনাদের সমক্ষে বক্তৃতা দিবার উদ্দেশ্য লইয়া এই যৎসামান্য কথা যখন সাজাইতেছিলাম তখন বেশ ভালোমতন ভোর হইয়াছে। জানালার ফাঁক গলাইয়া বল্টিমোর দেখিতেছি। প্রহরটি বড়ই মজার। তখনও ঠিক রোদ উঠিয়া সারে নাই। কিন্তু সময় যে বহিয়া যাইতেছে তাহা একটা নিয়নবাতির বিজ্ঞাপন এক ঠাঁই জ্বলিয়া আর ঠাঁই নিবিয়া আমাকে মিনিটে মিনিটে খবর দিতেছিল। রোজ যে রকম হয় তখনও রাস্তায় রাস্তায় সেই রকমই গাড়িঘোড়ার ভিড় ভারি হইয়াছে। দূরে গাছগাছালি কিছু কিছু চোখে পড়িতেছে। মনে মনে বলিয়া উঠিলাম এই কয়টি গাছের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে আমি যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছি সব কিছুই আমার ভাবনা যাহা ভাবিতেছে তাহার ফসল। এইখানে লোকজন ঠিক কী কাজে ব্যস্ত তাহা শতে একশত ভাগ পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে না। তাহা যাহাই হউক, সহজ মানুষের পরিচয় দিবে বলিয়া লোকে যে দাজায়িন (Dasein) বা তথাবস্তু বলিয়া একটা কথা তুলিয়া থাকে তাহাই হাজির হইয়াছিল এই ক্ষণিকের অতিথি বা পলায়নপর সাক্ষীর মধ্যে। অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।

‘সহজ মানুষ’ কোনখানে থাকেন? যে ‘অ-বশ’ বস্তু হারাইয়া গিয়াছে তাহার রূপেই সহজ মানুষকে পাওয়া যায়, এই সত্য আমল করিতেই হইবে। আরও খুটাইয়া বলিলে বলিতে হইবে ‘সহজ মানুষ’ দাঁড়াইয়া থাকেন এই হারানো অবশ বস্তুর ঘাড়ে ভর দিয়া। অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখিবেন ইহা এমন বিদকুটে বস্তু যাহার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবি নাই। কোন কোন জায়গায় দেখা যায় ইহা ‘করা হইয়াছে এমন কোন ক্রিয়া’ মাত্র–দুনিয়ার তাবৎ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী এবং অনেক অনেক বিশ্লেষিত মানুষও ইহা আচ্ছামত ভাল করিয়াই জানেন। এই কারণেই অনেক মনোবিশ্লেষণবৃত্তিজীবী মনে করেন আমাদের পক্ষে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় হইবে। নিউ ইয়র্ক মনোবিশ্লেষণ সমিতির সভাপতি আমাদিগকে বলিয়াছেন ইহাই কর্তব্য। কিন্তু আমি তো বস্তু বদলাইয়া ফেলিতে পারি না। আমি মনোবিশ্লেষণবৃত্তি করি। তবে কেহ যদি কোন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সমীপে হাজির হইতে চাহেন তাহা তাহার নিজ পছন্দের বিষয়। মনোবিজ্ঞানের কথাই যখন উঠিল তখন বলিতেছি, গঠনের সমস্যা কথাটা একলা আমিই ব্যবহার করিতেছি না। অনেক অনেক দিন গুজরান হইয়াছে চিন্তা ও গবেষণা, মায় আবিষ্কার-উদ্ভাবনা যাহাদের বৃত্তি আর যাহারা মন কী জিনিস এই প্রশ্ন লইয়া ব্যাপৃত তাহারাও বছরের পর বছর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন যে গঠন জিনিসটার সবার চাহিতে ভারি এবং স্বভাবজাত গুণ হইতেছে ‘একভাব’ (unity)। ইহার কোন প্রমাণের ডাক পড়ে না। জীবের অখিলে (real) এই গুণ এমনিতে হাজির ধরিয়া দেখিলে স্বতন্ত্র প্রমাণ দিবার দরকারই পড়ে না। জীব যখন ষোলকলায় পূর্র্ণ তখন সে ‘একভাবুক’ এবং একভাবুক আকারেই তাহার কর্মকাণ্ড চলে। এই ‘একভাব’ ধারণাটি যখন মনের বেলায় খাটাইবার কথা উঠে তখনই সমস্যা গোলযোগে ভরিয়া যায়। কারণ মন আপন স্বরূপে ‘নিখিল’ নহে। কিন্তু আপনারা তো জানেনই বলা হইয়াছিল মন এক না হইলেও ‘মতলবগত একভাব’ আছে। এই ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই তো যাহাকে বলা হয় কাণ্ডকারখানার আন্দোলন (phenomenological movement) তাহা সম্ভব হইয়াছিল।

একই কথা পদার্থবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে চলিত তথাকথিত ‘অবয়বপন্থা’ (gestalt) মতবাদ সম্বন্ধেও খাটিত। আর খাটিত ‘সহজ স্বরূপ’ (bonne forme) নামক ধারণার ক্ষেত্রেও। এই ধারণার দৌলতে উদাহরণস্বরূপ এক ফোটা পানির সঙ্গে আরো জটিল ভাবনাচিন্তার সংযোগ ঘটাইয়া দেওয়া। অধিক, বড় বড় মনোবিজ্ঞানীর দল আর এমনকি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা পর্যন্ত ‘নিখিল ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতি ধারণায় ভরপুর। যাহাই হউক, ‘একতাসাধক একভাব’ সবসময়ই সামনে চলিয়া আসে। আমি কখনোই জিনিসটা কী বুঝিতে পারি নাই। কারণ আমি যদি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী হইয়া থাকি আমি তো মনুষ্যসন্তানও বটি আর মনুষ্যসন্তান হিসাবে আমি অভিজ্ঞতা হইতে শিখিয়াছি যে আমার আপন মানব জীবনের প্রধান গুণ একটাই আর তাহা হইল এই জীবন এমন এক জিনিস যাহাকে আমরা ফরাসি ভাষায় বলি বহিয়া যায় (á la dérive)। আমি তো নিশ্চিত এইখানে আপনারা যাঁহারা আছেন তাঁহাদের অভিজ্ঞতাও ইহাই। আর কেহ যদি ইহার সহিত একমত না হইয়া থাকেন আশা করি তিনি হাত উঠাইবেন। জীবন নদীর নাহান বহিয়া যায়, কখনো বা এই তীর স্পর্শ করিল কখনো বা করিল ওই তীর। কখনো এইখানটায় একটুখানি দাঁড়াইল কখনো ওইখানটায়, কিন্তু কেন করিল বা দাঁড়াইল তাহার মাথামুণ্ডুও বুঝিল না–কী ঘটিল তাহার মাথামুণ্ডু কিছু কেহই বুঝিল না। বিশ্লেষণের মূলসূত্র ইহাই। মানব জীবনের ‘একতাসাধক একভাব’ আমার নিকট চিরকালই কলঙ্কজনক মিছাকথা মাত্র মনে হইয়াছে।

এই সকল ব্যাপার কী জিনিস বুঝিয়া উঠিবার প্রয়োজন মিটাইতে হইলে আমরা আরো এক নীতির সাহায্য লইতে পারি। ঘটনা কী তাহা কদাচ অজ্ঞানের দিক হইতে আমরা যে বিচার করিয়া দেখিতে চাহি না তাহারও কারণ আছে। কারণ অজ্ঞান যাহা বলে তাহা শব্দের মধ্যবর্তিতায় ফুটাইয়াই বলিয়া থাকে। আর ইহাদের মূলনীতি কী তাহার সন্ধান হয়তো আমরা লইতে পারি।

আমার প্রস্তাব, আসুন তো ‘একভাব’ ধারণাটি আমরা অন্য আলোক ফেলিয়া দেখি। ‘একতাসাধক একভাব’ নয়, দেখি এক, দুই, তিন প্রভৃতি গণনাসম্ভব ‘একভাব’। পনের বছর ধরিয়া পড়াইবার পর আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশির বেশি পাঁচ পর্যন্ত গুণিয়া দেখিতে শিখাইয়াছি। এই পর্যন্ত গোনা বেশ কষ্টের কাজ (চার পর্যন্ত গোনা আর একটু সোজা)। আর তাঁহারাও ঐ পর্যন্তই শিখিয়াছেন। তবে আজ রাত্রে আমাকে আপনাদের অনুমতি লইয়া দুইয়ের মধ্যেই আটক থাকিতে হইবে। এক্ষণে আমরা পূর্ণসংখ্যার কথা কহিতেছি আর পূর্ণসংখ্যার কথা কহাটা বড় সহজ বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস এই সভায় সমবেতদের অনেকেরই ইহা জানা জিনিস। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে, শুদ্ধ দরকার কয়েকপ্রস্ত সেট (set) এবং এক প্রস্ত ’একের বিম্ব এক’ (one to one correspondence) গণিবার নীতি। যেমন ধরা যাউক, এই ঘরে যতটা পিঁড়ি আছে ঠিক ততজন মানুষ বসিয়া আছেন কথাটা সত্য। কিন্তু ‘পূর্ণসংখ্যা’ কিংবা যাহাকে বলি ‘স্বাভাবিক সংখ্যা’ তাহা হইতে হইলে পূর্বসংখ্যাযোগে গঠিত কোন সংগ্রহের ডাক পড়িবেই। বলা নিষ্প্রয়োজন ইহা একাংশে হইলেও ‘স্বাভাবিক’ (natural) তবে শুদ্ধ এই অর্থেই যে ইহা কী কারণে আছে তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। গণনা জিনিসটা ‘অভিজ্ঞতানির্ভর সত্য’ নয় আর শুদ্ধ অভিজ্ঞতাজাত তথ্য হইতে গণনাকর্মের সৃষ্টি হইয়াছে ইহা প্রমাণ করাও অসম্ভব। হিয়ুম (Hume) সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু ফ্রেগে (Frege) নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রমাণ করিয়াছেন এই চেষ্টা অপরিপক্কতারই প্রমাণস্বরূপ। পূর্ণসংখ্যা মাত্রই একেকটা স্বনির্ভর একক। সমস্যার আসল ভিত্তি এই সত্যেই পাওয়া যাইবে। আমরা যদি এই সংখ্যাকেই একক ধরিয়া লই তো বেশ মজাই হয়। ধরা যাউক পুরুষ আর নারী–পিরিতির সহিত যোগ হইল ‘একভাব’! কিন্তু কিছুক্ষণ যাইতেই সব শেষ। এই দুইজনের পর আর কেহ রহিল না। হয়তো একটা শিশু আসিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা অন্য স্তরে পৌঁছিয়া গেলাম। আর তিনের জন্ম দেওয়া সে তো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। আমরা যখন সংখ্যা বিষয়ে গণিতবিদের প্রস্তাবাদি পড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করি তখন দেখিতে পাই সকল প্রস্তাবের গোড়ায় এক সূত্র: [নতুন সংখ্যা পাইতে হইলে] যে কোন পূর্ণসংখ্যার সহিত ১ সংখ্যাটি যোগ করিতে হইবে, ‘n+১’ বা [n+1]। সংখ্যার জন্ম কী উপায়ে হয় তাহার চাবি এই ‘যোগ এক’ কথার মধ্যেই আছে। আর আমি প্রস্তাব করিতেছি এই ‘যোগ করিয়া একভাব’ করিবার পদ্ধতি যাহার গুণে দুই তৈরি হয় তাহা বাদ দিয়া আমরা দুই সংখ্যাটির সংখ্যাস্বরূপ অখিল (real) জন্ম কীভাবে হয় দেখিব।

এই দুইকে যাহার এখনও জন্মই হয় নাই এমন পহিলা পূর্ণসংখ্যা হইতে হইবে খোদ দুইয়ের আবির্ভাবের আগেভাগেই। ইহা সম্ভব হইতেছে কারণ আমরা দেখিয়াছি পহিলা ‘এক’ সংখ্যার আবির্ভাব মানিয়া লইবার ওয়াস্তে এক্ষণে ‘দুই’ আসিয়া বসিয়াছে। ‘এক’ সংখ্যার জায়গায় ‘দুই’ বসাইলেন আর ফলস্বরূপ দেখিলেন ‘দুই’ সংখ্যার জায়গায় ‘তিন’ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই স্থলে আমরা যাহা দেখিলাম তাহার নাম আমি রাখিয়াছি দাগ (mark)। তাহা হইলে আমরা দেখিব কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে যাহাতে দাগ দেওয়া হইয়াছে আর কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে দাগ দেওয়া হয় নাই। পহিলা যে দাগ দেওয়া হইল তাহা হইতে আমরা ঘটনার জন্ম দেখিলাম। হুবহু এই পথেই ফ্রেগে সংখ্যার জন্মকাহিনী ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে শ্রেণীতে কোন অংকুর (elements) নাই তাহাকেই পহিলা শ্রেণী কহে। এইভাবে শূন্যের জায়গায় ‘এক’ আসিল আর তাহার পর একের জায়গাটি কী করিয়া দোসরা জায়গা বনিয়া গেল তাহা সহজেই বুঝা যাইতেছে। এই ক্রমে ‘দুই’, ‘তিন’ ও অন্যান্য সংখ্যার জায়গা বদল হইল। আমাদের হিসাব অনুসারে এই দুইয়ের সমস্যাই সহজ মানুষ সমস্যার রূপ বটে। আর দুইয়ের জন্ম হইয়াছে একের সহিত এক যোগে, একের অভাব পূর্ণ করিয়া নয়, বরং একের জন্ম দিবার খাতিরে একের পুনরাবৃত্তি ঘটাইয়া। ইহা সত্য হইলে আমরা মনোবিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা হইতে যে সত্য জানিতে পারিয়াছি তাহারই সমক্ষে হাজির হইলাম। ‘অজ্ঞান মানুষ’ এমনই চিজ যাহা নিজের আবর্তন ঘটাইবার দিকে ঝুঁকিয়াই থাকে, আর শুদ্ধ ‘এক’ আবর্তন হইলেই হইল, উহার জন্ম হইবে। যাহাই হউক একদফা আবর্তন দেখিতে হইলে আমাদের দেখা দরকার পহিলা ঘটনার পুনরাবর্তন ঘটাইতে দোসরা ঘটনার যে যে গুণ না থাকিলেই নহে তাহা কী কী। আমরা যদি তাড়াহুড়া করিয়া জবাব দিই তো বলিব দরকার দুই ঘটনার এক রকম হওয়া। যদি তাহাই হইত তবে দুইয়ের নিয়মটা হইত যমজেরই নিয়ম। যদি তাহাই সত্য হয় তো ত্রয়ীর কিংবা চতুরঙ্গের নিয়মই বা হইবে না কেন? আমাদের যুগে আমরা ছেলেমেয়েদের শিখাইতাম, ধরা যাউক মাইকের সহিত অভিধান যোগ করা চলিবে না। তবে এই শিক্ষাটা একেবারেই আজগুবি শিক্ষা। কারণ মানুষ যদি মাইকের সহিত অভিধান কিম্বা লুইস ক্যারলের ভাষ্য মোতাবেক বলিলে রাজার লগে বাধাকপি যোগ করিতে না পারিবে তো যোগ করিবার কিছুই তো থাকিবে না। যাহার দৌলতে এক বস্তুর সহিত অন্য বস্তুর প্রভেদটা হিসাবে না লইয়া যোগ সম্ভব হয় সেই অভিন্নতার বাস বস্তুতে নাই, আছে ঐ দাগে (বা মার্কায়)। এই দাগের কল্যাণেই প্রভেদটা যেন ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে এমত অবস্থা হয়। পুনরাবর্তন হইবার সময় সহজ মানুষের, অজ্ঞান সহজ মানুষের ঘটে যাহা ঘটে ইহা তাহারই চাবিকাঠি। কারণ আমরা জানি ‘সহজ মানুষ’ নিদারুণ অর্থময় কিছু একটার পুনরাবর্তন করে। উদাহরণ দিয়া বলিতে, এই যে বস্তুকে আমরা কখনও কখনও বলি বিভীষিকা (‘ট্রমা’) কিম্বা ‘চরম পুলক’ সেই অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে সহজ মানুষ হাজির থাকে। কী ঘটে সেই সংকটে? যদি ‘মাল’টা এই আকারে জগতে বিরাজ করে, এই একত্ববোধক লক্ষণটাই যদি হয় শেষ কথা, তাহা হইলে অভিন্নতার লক্ষণ এই জায়গায় বিলক্ষণ আছে। এক্ষণে আমার মধ্যে যে ‘মাল’টা খুঁজিয়া বেড়ান হইতেছে তাহা পাইতে হইলে পহিলা দাগটা ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলাইতে হইবে। কেননা এই দাগটা আজ তো আজকেই ছিল ঘষামাজার ফলস্বরূপ। সকল ভেদ উঠাইয়া দেওয়ার নামই তো ছিল এইটা আর এই লক্ষণ না হইত তো পহিলা ‘মাল’ই হইয়া যাইত লাপাত্তা। আকারে যাহা অভিন্ন তাহার পুনরাবর্তনকেই যদি পুনরাবর্তনের সারকথা বলা হয় তো তেমন পুনরাবর্তন অসম্ভব, পুনরাবর্তনের রীতিহীনতার রহস্য এইখানেই। যাহাই হউক মানুষ এই পুনরাবর্তনেরই ফলস্বরূপ। কারণ ইহার ফলে সহজ মানুষের প্রথম ভিত্তিটাই হাওয়া হইয়া যাইতে, রদ হইতে বাধ্য হয়। ইহাই সেই কারণ যাহার বলে সহজ মানুষ মাত্রই–অবস্থানের গুণে–বিভক্ত ভাবস্বরূপ হাজির থাকে। আমি ক্ষান্তিহীন বলিব এই লক্ষণ অভিন্ন­তারই লক্ষণ। তবে ইহার ফলে যাহা নিশ্চিত হইতেছে তাহা শুদ্ধ অভিন্নতারই ভিন্নতা। ইহা হইতেছে অভিন্নতা কি ভিন্নতার ফল আকারে নয়, হইতেছে বরং ‘অভিন্নতারই ভিন্নতার’ মধ্যবর্তিতায়। ইহা বুঝিতে পারা সহজ। যথা ফরাসি ভাষায় আমরা বলিয়া থাকি ‘আমি আপনাদের নম্বর মারিলাম’ (Je vous numérotte)। আমি আপনাদের সবাইকে একটি একটি করিয়া নম্বর বাঁটিয়া দিলাম, আর ইহার ফলে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেল আপনারা সকলেই আলাদা তবে শুদ্ধ নম্বরের বিচারে। অন্য কোন দিকবিচারে নয়।

যাহা ‘একই সঙ্গে’ এক কিংবা ‘দুখণ্ডে’ বটে এমন কোন কিছুর মধ্যে এই লক্ষণটা আছে তাহা প্রমাণ করিবার নিমিত্ত আমরা সহজ বুদ্ধির কাছে কোন প্রস্তাব তুলিয়া ধরিতে পারি? নিচের রেখাচিত্রাটির কথাই ভাবা যাক, সুপরিচিত একটি ছবির আদলে আমি ইহার নাম রাখিয়াছি উল্টা আট: [বঙ্গভাষায় উল্টা চার–অনু.]

8.jpg

দেখিতেই পাইতেছেন এইখানের রেখাটিকে একই সঙ্গে এক রেখা বা দুই রেখা উভয়ই গণ্য করা যাইতে পারে। যে আদ্যস্থলে, যে গিরায় সহজ মানুষ গঠিত হয় ইহাকে সেই অকুস্থলেরই অপরিহার্য লিপি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। আমরা পহিলা পহিলা যতখানি ভাবিতে পারি ইহার হাত তাহা হইতে অনেক দূর বেশি যাইতে পারে, কারণ আমরা এই ধরণের লিপি খোদাই করার মতন উপরিতলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িতে পারি। আমরা হয়তো বুঝিতে পারিব নিখিল অর্থে ব্যবহার করা পুরানা প্রতীক–মণ্ডল (the sphere)–দিয়া এখানে কাজ চলিবে না। কোন বৃষ (torus), কোন বোতল (Klein bottle), আড়াআড়ি কাটা উপরিতল (cross-cut surface) এইভাবে কাটিয়া দেখান যায়। এই বৈচিত্র্যের মূল্য আছে। কেননা ইহাতে মনে রোগ কিভাবে গঠিত হয় তাহার ব্যাখ্যা মিলিবে। এই গোড়াকার কাটাদাগের সাহায্যে যদি ‘সহজ মানুষ’ আকার পায়, তবে একই উপায়ে প্রমাণ করা যায় কোন বৃষ কাটিলে ‘স্নায়ুরোগগ্রস্ত সহজ মানুষে’র (neurotic subject) আর ‘আড়াআড়ি কাটা উপরিতল’ কাটিলে অন্য কোন মনোব্যাধির সহিত মিলিয়া যাইবে। আজ রাত্রে আপনাদের সমক্ষে আমি ইহার ব্যাখ্যা দিতেছি না, তবে এই দুরূহ বক্তৃতার সমাপ্তি টানিতে হইলে আমাকে নিচের সারসংক্ষেপটি পেশ করিতেই হইবে।

পূর্ণসংখ্যাধারার গোড়ার দিকটাই শুদ্ধ আমি হিসাবে লইলাম, কারণ ইহা ভাষা ও অখিলের মাঝখানকার বিন্দু বটে। ‘এক’ এবং ‘এক যোগ’ ব্যাখ্যাচ্ছলে আমি যে জাতের লক্ষণ কাজে লাগাইলাম ভাষাও সেই একই লক্ষণ যোগেই গঠিত হইয়াছে। পার্থক্যের মধ্যে ভাষার এই লক্ষণ আর একভাবাপন্ন লক্ষণ (unitary trait) ঠিক এক বস্তু নহে, কারণ আমাদের ভাষায় ভেদভিত্তিক অনেক লক্ষণের একত্র সমাবেশ আছে। কথাটা অন্যভাবে বলি তো বলা যায় ভাষা গড়া হইয়াছে এক দঙ্গল পদ–যেমন বা, তা, পা, ইতি আদি, ইতি আদি লইয়া। দঙ্গলটির সীমা আছে। সহজ মানুষের চলার পথ কাটিতে যাহা লাগে পদমাত্রই তাহা যোগাইতে পারে। আর পদে পদে সম্পর্কের বেলায় যাহা সামান্য সত্য পূর্ণসংখ্যার চলার পথ তাহারই বিশেষ রূপ মাত্র, এই কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই সমুদয় বটে। আমি যাহাকে পরম বলিতেছি তাহা গঠিত হইয়াছে এই পদাবলী দিয়াই। ইহা তাহার সংজ্ঞা বটে। ভাষার কারণে যে ভেদটা সম্ভব হইয়াছে তাহা এই: পদ মাত্রই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কাছ হইতে নিজে অভিন্ন নয় (পূর্ণ সংখ্যার একভাবাপন্ন লক্ষণ ইহার বিপরীত)। ইহার বিশেষ কারণও এই যে অনেক পদের একত্র সমাবেশই ভাষা। আর এই সমাবেশে কোন ‘পদ’ (signifier) নিজ ‘পদার্থের’ (signified) ‘পদ’ হইতে পারে আবার নাও হইতে পারে। এই সুপরিচিত সত্যটিই রাসেলের (Russel) ধাঁধার মূলসূত্র। যে সকল অংকুর (elements) নিজ নিজ দঙ্গলের অংশ নয় তাহাদিগকে শরিক করিয়া নতুন কোন দঙ্গল গঠন করিলে আমরা যে ধাঁধায় পড়িব তাহার পরিণতিতে আমরা জানি ‘কথার সহিত কথার বিরোধ’ (contradiction) তৈয়ার হয়। ইহার অর্থ, সহজ কথায়, শুদ্ধ বাক্যের নিখিলে এমন কিছু থাকতে পারিবে না যাহাতে সকল কিছু রহিয়াছে। আর যে ফাঁকের দৌলতে ‘সহজ মানুষ’ গঠিত হয় এইখানে আরো একবার তাহার দেখা মিলিতেছে। ‘সহজ মানুষ’ মানেই হইতেছে অখিলের মধ্যে খিল ঢুকাইয়া দেওয়া (introduction of a loss in reality)। অথচ ইহা হইতেই পারে না। কেননা সংজ্ঞার গুণেই অখিল বলিতে বুঝায় ‘যাহাতে খিল নাই’ (যাহা যতদূর সম্ভব ততদূরই ভরাট বটে)। খিলের ধারণাটি সম্ভব হইয়াছে সেই লক্ষণের গুণে যাহা আমাদের সৃষ্ট অক্ষরের দৌলতে এক প্রস্ত অভাবের নির্ধারিত স্থান। এই যেমন a1, a2, a3 প্রভৃতি বৈ নয়। আর ‘স্থান’ (space) মানে তো ফাঁকই। ‘সহজ মানুষ’ যখন অভাবের জায়গাটি দখল করেন, তখন শব্দের ভিতর খিল ঢুকিয়া যায়। আর ইহা সহজ মানুষের সংজ্ঞাও বটে।

xex-1.jpg

তবে ইহা যদি লিখিবার আবশ্যক করে তো ইহার সংজ্ঞা বাধিতে হইবে ভাষার মণ্ডলজোড়া বৃত্তের আওতায়। এই বৃত্তের নাম আমি রাখিয়াছি পরকীয়া (otherness)। এ জগতে যাহা কিছু ভাষাপদবাচ্য তাহার সবকিছুই এই পরকীয়ারই আলো আর সেই কারণেই সহজ মানুষ সবসময়ই এই পদাবলী বাদিনীর তলায় তলায় পলায়নপর চির অপসৃয়মান বস্তুস্বরূপ। কারণ পদের সংজ্ঞাই এমন: যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে। ফল এই দাঁড়ায় যে সহজ মানুষ উধাও হইয়া যায়। দুই প্রস্ত একভাবাপন্ন লক্ষণের ক্ষেত্রেও হুবহু একই ঘটনা ঘটে। আর এই সময় যাহাকে বলা হইতেছে অর্থ বা পদার্থ তাহার আবির্ভাব ঘটে দুই নম্বর পদটির আবডালে এবং ইহার পর এই ক্রম ধরিয়া আর আর পদ ও পদার্থের আবির্ভাব চলিতে থাকে।

হারাইয়া যাইতে যাইতেও ‘সহজ মানুষ’ কল্পনার ফানুস বলিয়া পরিচিত এই অত্যাশ্চর্য বস্তুর সাক্ষাত কোন না কোন উপায়ে লিপ্ত থাকিয়া আরও একবার নিজেকে খোঁজার জন্য আকুল হয়। ‘বিষয় বাসনা’ (desire) ইহারই অপর নাম। এই সাধনা জিগাইয়া রাখে সেই বস্তু যাহার নাম আমি রাখিয়াছি হারান সম্ভার (lost object)। ইহার নাম বিসমিল্লায়ই লইয়াছিলাম–ইহার নাম লইতেও ভয়ে কল্পনার হাত না সাধাইয়া যায়। আর ইহার জন্ম ও লালন-পালন এই স্থলেই ঘটে। আমার শব্দ তালিকায় ইহারই নাম হইয়াছে ছোট ছাদের a সম্ভার (object a)। ইহার কথা মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী মাত্রই ভালো করিয়া জানিবেন। কেন না মনোবিশ্লেষণবিদ্যা আদ্যোপান্ত খাড়াও হইয়াছে এই নিদারুণ সম্ভারের কাঁধে ভর করিয়াই। আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাধীন সহজ মানুষের সহিত এই a সম্ভারের সম্পর্ক-কাঠামো সবসময়ই ফানুসের তলায় থাকে আর এই ফানুস থাকে বাসনার তলায়। কেন না বাসনা আর কিছু নয়। শুদ্ধ যাহার নাম রাখিয়াছি সমস্ত অর্থের অনন্তনাম (metonymie, metonymy) ইহা তাহারই অপর নাম।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় মনোবিশ্লেষণবৃত্তির অখিলে গঠন বলিয়া কোন জিনিস বিরাজ করিতেছে তাহা আপনাদিগকে দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছি। তবে ‘সাকার’ ও ‘আকার’ প্রভৃতি দিক সম্পর্কে আমি কিছুই বলি নাই। মনের জীবন যে জীবনের বা অভিজ্ঞতার জগত দিয়া পার হয় তাহার ভিতর আকারের বন্ধন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে তাহা বুঝিয়া লওয়ার কোন বিকল্প নাই। এই কথা না বলিলেও চলিত। কিন্তু আজ রাত্রে আমার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নাই। তবে পুরানা বলিয়া জ্ঞাত এই ‘সহজ মানুষ’ সম্বন্ধে সবার তুলনায় কম জানা অথচ সবার তুলনায় বেশি নিশ্চিত একটি সত্যকথা ভাবিয়া দেখিবেন। জীবিত প্রাণীর জীবনপর্বের ইহাই অর্থপূর্ণ দিক। এই অন্তহীন জিনিসটা জীবন ও মরণের সীমানার মধ্যে কিছু একটার স্বাদ পাইতে সক্ষম। বিষাদ ও হর্ষের মধ্যখানকার পুরা বর্ণালিটা জুড়িয়া থাকিতেও ইহা সক্ষম। ইহাকে আমরা ফরাসি জবানে বলিয়া থাকি ‘সহজানন্দ’ (sujet de jouissance)।

আজ বিকালবেলা এই জায়গায় আসিবার পথে ছোট্ট নিয়ন বাতির বিজ্ঞাপনে দেখিলাম লেখা রহিয়াছে, ‘এনজয় কোকো-কোলা’ [অর্থাৎ কোকা-কোলার মজা মার]। ইহা দেখিয়া মনে পড়িল, যতদূর জানি, ফরাসি ‘জুয়িসঁস’ (পুলক/আনন্দ) কিংবা ল্যাটিন ভাষার ‘ফ্রূয়র’ (fruor) শব্দে পদার্থের যে বিশাল ভার বহন করা হয় তাহার যথার্থ প্রকাশক্ষম পদ ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যাইতেছে না। জুয়ির [Jouir] শব্দের অর্থ আমি অভিধান খুলিয়া দেখিয়াছি। দেখিয়াছি ইহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে ‘টু পজেস, টু ইয়ুজ’ [অর্থাৎ দখলে লওয়ার, ভোগ-ব্যবহার করার] কিন্তু ইহার অর্থ আদৌ তাহা নয়। প্রাণধারী জীব যদি আদৌ ভাবিবার মতন কোন ভাব হইয়া থাকে, তো সব কিছু ছাড়াইয়া তাহার পরিচয় হইবে আনন্দের নন্দন [বা আনন্দের সহজ মানুষ]। তবে, দুঃখের মধ্যে, বেশিক্ষণ না যাইতেই দেখা যাইবে মনোবিশ্লেষণের যে বিধির নাম হইয়াছে আনন্দসূত্র (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে শুদ্ধ নিরানন্দসূত্র বৈ নয়) যাবত আনন্দের পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছে।

যদি এমত হয় যে মজা মারিতে মারিতে আমি একটু মাত্রা ছাড়াইয়া গেলাম, অমনি কথা শুরু হইয়া যায়, ফলে আমি আমার আনন্দ খানিক কমাইয়া আনি। জীবদেহ মনে হয় এমনভাবেই বানান হইয়াছে যাহা অতি মাত্রার আনন্দ এড়াইয়া যায়। আমাদের দেহের গঠন যদি এহেন মজার জিনিস না হইত তো আমরা সকলেই হয়তো ঝিনুকের মতন নিরব হইয়া থাকিতাম, এই গঠনই আমাদের আনন্দপক্ষের আমল ভাঙ্গিতে বাধ্য করে কিংবা আমাদিগকে শুদ্ধ এই আমলের উপর জোর করিবার আর ভাঙ্গিয়া ফেলিবার খোয়াব দেখাইয়া থাকে। পরমের সঙ্গে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ পদের মাপকাঠি বরাবর সহজের গঠন হইতে ইহার বিস্তার ঘটে আর এই গঠনের গোড়া পোতা থাকে ভাষায়। শুদ্ধ ইহার কারণেই বাসনার পূর্ণ বৈচিত্র্য পাখা মেলিবার অবকাশ পায়। ফলে আমরা এই জাতীয় নিষিদ্ধ আনন্দের (জুয়িসঁস) কাছাকাছি যাইবার, যাচাই করিবার সুযোগ পাই। ইহাই আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ যাহার একলা মূল্য আছে।

আলোচনা

আঙ্গুস ফ্লেচার 
ফ্রয়েড সত্য সত্য ছিলেন খুবই সরল মানুষ। তবে মানুষের নানান সমস্যার বিচিত্র সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। মানুষের জটিলতা ও সমস্যার ব্যাখ্যা প্রদানের খাতিরে তিনি কখনো কখনো মিথ ব্যবহার করিয়াছেন। যথা: নার্সিসাস মিথ। উনি দেখিলেন কিছু কিছু মনুষ্য আছেন যাহারা আয়নায় আপন মুখ দেখেন আর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে প্রেম করেন। ব্যাপারটা এমনই সহজ। তিনি শব্দের উপরিতলে উপরিতলে ভাসিবার চেষ্টা করেন নাই। আপনি যাহা করিতেছেন তাহা মাকড়সার মতন: আপনি ভারি মিহি যে জালটা বানাইতেছেন তাহার সঙ্গে মানুষের কোন সত্য সম্পর্ক নাই। যেমন আপনি ‘মজা’র কথা বলিলেন। ফরাসি ভাষায় ‘জুয়ির’ (jouir) কথাটির এক অর্থ ‘চরম পুলক’–ইহা বলিবেন না কেন? আমার মনে হয় ইহাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যাহা কিছু শুনিলাম সবই এহেন কায়াহীন কথা…। সমস্যাটা এখানে মনোবিশ্লেষণের নয়। মনোবিশ্লেষণের মূল্য এইখানে যে ইহা মনোবিশ্লেষণের গতি বিষয়ে প্রস্তাবনাস্বরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইয়াছে পরে, বিশেষ বলিতে বিলহেলম রাইখের কাজ। এতসব অতিপদার্থবিদ্যার (metaphysics) কোনই দরকার নাই। আপনার চিত্রলেখাটি (diagram) খুবই মজার হইয়াছে, তবে ইহার সহিত আমাদের কাজকর্মের, খাওয়া দাওয়া, রতি সহবাস ইতি আদির কোনই সংযোগ তো নাই।

হ্যারি উলফ
আমি জিজ্ঞাসা করিতে চাই এই গোড়ালি পাটিগণিত (fundamental arithmetic) আর এই স্থানবিদ্যাও (topology) এক জাতীয় মিথ কি না, নাকি মানস-জীবন ব্যাখ্যার খাতিরে এক প্রকার তুলনার প্রস্তাব মাত্র?

জাক লাকাঁ
কিসের সহিত তুলনা? ‘S’ বলিতে এমন কিছু বোঝায় যাহা হুবহু এই S আকারে লেখা চলে। আমি বলিতেছি এই ‘S’ যাহা দিয়া সহজ মানুষ বুঝান হইতেছে তাহা সাধিত ক্ষতি বুঝাইবার উপযোগী এক জাতীয় হাতিয়ার, কিন্তু ‘সহজ মানুষ’ হিসাবে আমি (এবং আমি নিজেও) যাহা হারাইয়াছি তাহা। অন্য কথায় বলিতে, একদিকে আছে এমন কিছু যাহার খচিত অর্থ আছে আর অন্যদিকে আছে আমার ব্যবহৃত কথার ধারা যাহা দিয়া আমি আপনি যেখানে আছেন সেখানে পোঁছাইতে চাইতেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফাঁক (বা খিল) আছে। আপনাকে এখানে আরেকজন সহজ মানুষরূপে ধরি নাই, ধরিয়াছি আমার কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিবেন এহেন মানুষ হিসাবে। উপমানটা কোনখানে? এই ক্ষতিটা হয় হইয়াছে কিম্বা হয় নাই। যদি হইয়া থাকে তবে তাহা বুঝাইতে হইবে একপ্রস্ত প্রতীক দিয়া। যাহাই হউক, প্রতীকায়ন না ঘটাইবা পর্যন্ত এই ক্ষতিটার অস্তিত্বই নাই। ইহা তো তুলনা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অখিল জগতের কোন না কোন ভাগে, এই ধরনের বৃষে আছে। এই বৃষ আসলেই আছে আর স্নায়ুরোগীর গঠন হুবহু এইটাই। ইহা উপমান নহে। এমনকি ইহা কায়াহীনও নহে, কারণ কায়াহীন মানে তো অখিল জগত হইতে কিছ না কিছু বিয়োগ করাও বুঝাইতেছে। আমার মনে হয় ইহাই খোদ অখিল।

নর্মান হলান্ড
আমি লাকাঁ সাহেবের পক্ষ লইয়া বলিতে চাই। আমার মনে হয় ওঁ চাইছেন খুব ভালো একটা কিছু করিতে। আমি এই আলোচনা সভার আগেভাগেই তাঁহার প্রবন্ধ পড়িলাম। ইহার আগে আমি ওঁর কোন লেখা পড়ি নাই। মনে হইতেছে তিনি ফ্রয়েডের লেখা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞান প্রকল্প’ (Project for a Scientific Psychology) বরাবর ফিরিয়া গিয়াছেন। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ইহাই ফ্রয়েডের পহিলা লেখা। ইহাও খুব কায়াহীন ছিল এবং আপনি এখানে আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার মতনই ছিল। অবশ্য আপনি বীজগণিতের সাহায্য লইতেছেন আর উনি নিউরনের আশ্রয় লইয়াছিলেন, এই রচনার প্রভাব ‘খাবনামা’, ‘ফ্লিস সমীপে চিঠিপত্র’সহ তাঁদের প্রথম বয়সের সমস্ত লেখায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যদিও সেই প্রভাব অনেক সময় কেবল উহ্য রহিয়াছে।

এন্টনি ওয়াইল্ডেন
আমি কিছু কথা যোগ করিতে চাহিয়াতেছি। আপনার বক্তৃতার গোড়ায় আপনি অস্বীকার বা অস্বীকৃতির [মেকোনাসঁসের] ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। আর আমরা ইহার এমন একপ্রস্ত চরম দৃষ্টান্ত হইতে শুরু করিয়াছি যে ইহা হইতে কী করিয়া বাহির হইব বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আপনি কিন্তু শুরু করিয়াছেন আপনার চিন্তার একেবারে মাথা হইতে (আপনার চিন্তার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হইতে) আর ইহার গোড়াটা কী রকম ছিল তাহা খুঁজিয়া বাহির করা আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক কঠিন। এই চিন্তা খুবই ধনশালী এবং খুবই গভীরে ইহার মূল। আমি আপনার লেখা কষ্ট করিয়া তর্জমা করিয়া থাকি, সেই অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি ফ্রয়েডের সহিত আপনি একফোঁটাও বেঈমানি করেন নাই। আজ রাত্রে এইখানে আমরা অনেক আবোল তাবোল বকিব সন্দেহ নাই–তবে এহেন বকাবকির আগে আমাদের উচিত আপনার লেখা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখা। ইহার অন্যথা না করাই উচিত। তাহারা আগে আপনার লেখা পড়িয়া দেখুন, তারপর ফ্রয়েড পড়ুন সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ সমীপে এই মিনতি করি।

রিচার্ড শেচনার
শূন্যতা সম্বন্ধে আপনার চিন্তার সহিত হুসার্ল (Husserl) এবং সার্ত্রের (Sartre) লেখার সম্পর্ক কী?

লাঁকা
আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, সেই শূন্যতা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না আমি বিশেষ কিছু বলিতে পারিব। হুসার্ল সম্পর্কেও পারিব না, সার্ত্র সম্পর্কেও না। সত্য সত্যই, আমার মনে হয় না আমি শূন্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিয়াছি। গড়াইয়া যাওয়া এবং ধরিতে কঠিন হওয়া, কখনো কোথায়ও না থাকা (আমি যখন ঐখানে খুঁজি তখন উহা এইখানে; আর আমি যখন এইখানে) মানে শূন্যতা নয়। আমার বক্তৃতাসভার (Seminar) তালিকায় এই বৎসর আমি যে বস্তুর নাম রাখিয়াছি ‘উদ্ভট কল্পনার যুক্তি’ সেই বিষয়যোগের ঘোষণা দিব। মনে হইতেছে আমার চেষ্টার বেশির ভাগই নিয়োজিত হইবে নানান ধরনের খিল, নানান ধরনের খোয়া, নানান শূন্যতার সংজ্ঞা ঠিক করার পিছনে। এইগুলি একেকটা একেক জাতের, কোনই মিল নাই একটার সহিত অন্যটার। অনুপস্থিতির কথাই ধরুন না কেন? রাণীর অনুপস্থিতি, এই ধরণের অংকুরের সহিত কিছু একটা যোগ করিতে হয় কিন্তু রাণীর অনুপস্থিতি অস্বীকার করিতে হইলে…। আমার ধারণা নিছক শূন্যতা ধারণাটির অস্পষ্টতা এই প্রসঙ্গে কোন কাজে আসিবে না। আমার নিজেরই উধাও হইবার আগে আমাকে যাহা করিতে হইবে, সব কিছুতেই আমার দেরি হইয়া যায়। তবে করিবার মতন কাজটি আগাইয়া নেওয়াও কম কঠিনও নয়। এক ধাপে এক একটা করিয়া আগাইবার দরকার আছে। এখন আমি এই নানান ধরনের ‘অভাব’ (lack) লইয়া আলোচনা করিব।

[কট সাহেব ও ডা: লাঁকা দেওয়ালপটযোগে মোবিয়ুস ফিতার (Möbius strip) নানান বৈশিষ্ট্য লইয়া আলোচনা করিলেন]

ইয়ান কট
একটা মজার জিনিস আছে এইখানে। হয়তো ইহা আপতিক। এই সকল ব্রত (motifs) অন্যবস্তুবাদী (surrealist) ছবিতে দেখিতে পাই। ইহাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক আছে কি?

লাকাঁ
অন্যবস্তুবাদী ছবির সহিত মনে হয় কমসে কম আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে।

পুলে
এই অবশের খোঁয়ারি যাহার কারণে সহজের আবির্ভাব ঘটে আপনি কি ইহার সহিত সার্ত্রের চিন্তার অন্তর্গত নাস্তি [le neant] জিনিসটায় কোন প্রকার যোগ আছে মনে করেন? প্রুস্তের রচনার গোড়ার দিকে দেখা যায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগিয়া উঠিল, তাহার অবস্থার সহিত ইহার তুলনা দেওয়া কি যাইতে পারে? আমাদের মনে পড়ে স্বপ্ন দেখিতে লোকটি জাগিয়া উঠিল আর দেখিল কি যেন হারাইয়াছে। কি যেন নাই। বড় কথা সে নিজে নাই। ইহার সহিত কোন তুলনা কি চলে?

লাকাঁ
আমার ধারণা প্রুস্ত বহুবারই অজ্ঞানের কয়েকরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পোঁছেছিলেন। প্রুস্তের লেখায় এমন অনেক পৃষ্ঠাব্যাপী বা কাছাকাছি বিস্তৃত অংশ পাওয়া যায় যাহা সহজেই আলাদা (découper) করা যাইবে। আমার মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক। প্রুস্ত প্রায় কাছাকাছি চলে যান, তবে তিনি প্রস্তাব আকারে ইহার বিস্তার না ঘটাইয়া নিজের ব্যবসায়–মানে সাহিত্যে–ফিরিয়া আসেন। উদাহরণ লওয়া যাইতে পারে কুমারী ভঁতুইয়ের, বয়ানকার যে দৃষ্টিতে তাহাকে তাহার বন্ধু ও তাহার বাবার ছবি হাতে দেখেছেন তাহার কথা বলিতেছি। আমার মনে হয় না আর কোন সাহিত্যশিল্পী কখনো এহেন ছবি আঁকিয়াছেন। হইতে পারে ইহা হইয়াছে তাহার খোদ কর্মপরিকল্পনার সময় পুনরুদ্ধারের এই আলিশান কর্মকাণ্ডের স্বভাব অনুযায়ী। এই প্রকল্পই তাহাকে পথ দেখাইয়াছে, এমনকি জ্ঞান যতদূর পর্যন্ত যাইবার সাধ্য রাখে তাহার বাহিরেও দেখাইয়াছে।

সিগমুন্ড কখ (Koch)
আপনার বক্তৃতার একটা ধরন নিয়তই আমার দৃষ্টি এড়াইয়াছে। আপনি ইংরেজিতেই বলিয়াছেন, ইহা ছাড়া আমি ইহা হইবার অন্য কোন কারণ দেখিতেছি না। আপনি পূর্ণসংখ্যা ২ লইয়া অনেক ভারি কথা কহিয়াছেন, বিশেষ পূর্ণসংখ্যা ২ য়ের জন্ম লইয়া। আমার যতটুকু স্মরণ হয় আপনার বিশ্লেষণ হইতেছে এই যে আমরা এক নির্দেশক দাগ দিয়া শুরু করিলে দাগাংকিত খাড়াইয়া যায়, ফলে আমরা ২ এর মুখোমুখি হই বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। দাগাংকিত আর দাগানংকিতর সহিত তুলনা দিবার জোড়া কোথায় পাইব? দাগাংকিত মানে কি জ্ঞানতন্ত্র আর দাগানংকিত মানে কি অজ্ঞানতন্ত্র? দাগাংকিতই কি সজ্ঞান মানুষ আর দাগানংকিতই কি অজ্ঞান মানুষ?

লাকাঁ
ফ্রেগের লেখা হইতে আমি শুদ্ধ হইতে ধার করিয়াছি যে শূন্য সংখ্যাটি যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যবাচক সংখ্যা সেই শ্রেণীই হইতেছে ১ সংখ্যার ভিত্তি। মনোবিশ্লেষণসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গক্রমে আমি ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি একটি কারণে, তাহা হইতেছে এই–‘এরোস’(eros) বা রতির রূপরেখা আঁকিতে গিয়া ফ্রয়েড ২ সংখ্যার উপর বেশ গুরুভার আরোপ করিয়াছেন। জীবনের পরিসরে যে শক্তি একতাসাধন করিয়া থাকে তাহার নামই রতিশক্তি, আর ইহাতে ভিত্তি করিয়া অনেকানেক মনোবিশ্লেষক যৌনাঙ্গের পরিপকৃত বলিয়া একটা কথা বাহির করিয়াছেন। ইহার ভিত্তিতে তাহারা দাবি করিয়াছেন যেমন ‘নিখুঁত বিবাহ’ বলিয়া কোন জিনিস সম্ভব। লক্ষ্য হিসাবে বিষয়টি রহস্যাবৃত আর সাংঘাতিক একগুঁয়েমির সহিত ইহার পক্ষে প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে। যে শ্রোতামণ্ডলির সহিত ফ্রেগে উত্থাপিত সমস্যাটির পরিচয় ঘটে নাই শুদ্ধ তাহাদের কথা মাথায় লইয়া আমি, পহিলা দফায়, এই ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি। ১ সংখ্যার মোকাবেলায় ০ সংখ্যা। এই পহিলা পরিচয় পর্বে, যে কর্তব্য সম্পাদন করিতে পারিতে ২ সংখ্যার মোকাবেলায় ১ সংখ্যাটিও সেই কর্তব্য করিতে পারিবে।
আপনার দুই নম্বর সওয়াল প্রসঙ্গে বলিতেছি।

lacan2.jpg
জাক লাকাঁ

যাহারা ফ্রয়েডের লেখার সহিত কোন প্রকার খুঁত ব্যতিরেকেই পরিচিত রহিয়াছেন তাঁহারা জানেন এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমি স্বভাবগত নিয়মেই উহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দাবাইয়া রাখা প্রসঙ্গে এই কথাটি একদমই ভুলিয়া থাকা চলিতে না যে ফ্রয়েড বলিয়াছেন দাবাইয়া রাখার রহস্য যাহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে তাহাকে জার্মান ভাষায় বলে ‘উয়রফেরড্র্যাংগুঙ্গ’ (urverdrängung) বা আদ্যদমন। আমি আজ আমার প্রস্তাবের পুরাটাই এখানে সূত্রমাফিক পেশ করিতে পারি নাই, ইহা স্বভাবগত কারণেই ঘটিয়াছে। সূত্রবদ্ধ করা ফ্রয়েড ঘরানার ভাষায় যাহাকে ঘনায়ন (condensation) বলে তাহা বুঝাইতে হইলে রূপকের ওপর গোড়াতেই নির্ভর করিতে হয়, ইহা জানা না থাকিলে কিন্তু একদমই চলিতেছে না। [ডা. লাকাঁ কালো বোর্ডে ‘অক্ষরের নাছোড়বান্দামি’ (L’instance de la lettre) বিষয়ের সার দেখাইয়া তাঁহার মন্তব্য শেষ করিলেন।]

গোল্ডমান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমি যে উপায়ে কাজকারবার চালাইতেছি তাহার কারণে একটা জিনিস আমার দৃষ্টিতে লাগে। ইহা আর কিছুই নয়, গুরুত্বপূর্র্ণ, ইতিহাসভিত্তিক, দশজনীন ঘটনাধারা আর গুরত্বপূর্ণ রচনাকর্ম লইয়া বিচার-বিশ্লেষণ করিতে আমার বিশ্লেষণকর্মে আমি কদাচ অজ্ঞান ধারণাটির প্রয়োজন অনুভব করি না। তথাপি আমি এই ভেদটা দেখাইয়া বলিয়াছিলাম: অবশ্য আমার প্রয়োজন হয় জ্ঞানহীন ধারণার। অজ্ঞান অংকুর ইতি আদি তো আছেই; কী কী উপায়যোগে ব্যক্তি নিজের হিসাব পেশ করিতেছে আমি তো তাহা বুঝিতে পারি না–আর, আমি তো বলিয়াছি, ইহা মনোবিশ্লেষণের এলাকা যাহার সহিত আমি মিশিতে চাহি না। কিন্তু দুই ধরনের ঘটনা আছে যাহা, সব ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুসারেই, সামাজিক বলিয়া মনে হয় আর এই সব ঘটনা বুঝিতে হইলে আমাকে অজ্ঞান নয় জ্ঞানহীনের সাহায্য লইতে হয় আমার মনে হইতেছে আপনি বলিয়াছেন অজ্ঞান দশজনের ভাষা ইংরেজি ফরাসি প্রভৃতি যে সকল ভাষায় আমরা কহিয়া থাকি সেই রকম ভাষা।

লাকাঁ
আমি বলিয়াছি ভাষার, ইংরেজি বা ফরাসি ইতি আদির মতন।

গোল্ডমান
কিন্তু এই ভাষা হইতে স্বতন্ত্র? তাহা হইলে তো আমি হাসিব: আমার আর কোন প্রশ্ন রহিল না। সজ্ঞান আমরা যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি এই জিনিস তাহার সহিত যুক্ত।

লাকাঁ
জ্বি, হা।

গোল্ডমান
সঠিক আছে। আমি যদি আপনার কথা ঠিকমতো বুঝিয়া থাকি, দোসরা যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কাটিয়াছে। সজ্ঞান মানে যে স্তরে অজ্ঞান ধারণাটির সাহায্য ছাড়াই আমার চলিয়া যায় সেই স্তরে কয়েকটা। প্রক্রিয়ার সহিত তুলনা দিবার মতন কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যায়। পাসকাল, হেগেল, মার্ক্স ও সার্ত্র হইতে শুরু করিয়া বলিতে এমন কিছু জিনিস আমরা জানি যাহা অজ্ঞানের তোয়াক্কা করে না: প্রভেদের সঙ্গে এই ধ্রুবগুলি যোগ করিয়া মানুষ কী তাহার সংজ্ঞা দেওয়া চলে। পাসকাল বলিয়াছেন: ‘মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াইয়া গিয়া কেহ’ (dépasse l’ homme) কিছু করে না। অজ্ঞানের দোহাই না দিয়াও বলা চলে, এই ফাঁকটুকুর সাহায্য ছাড়া ইতিহাস কিংবা গতিবিদ্যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সজ্ঞান মনের স্তরে আমি যে দোসরা ঘটনার দেখা পাই: সজ্ঞান মন যতখানি কর্মকাণ্ডের সহিত সংযুক্ত ততখানি বলিতে–কী জিনিস তাহা মনে তাহার অঙ্গীভূত ধ্রুব মানে অসাড় দ্রব্যের সাহায্য ছাড়া এবং এই ধ্রুবসকল সহিত প্রভেদের সংযোগ না ঘটাইয়া বলা যাইবে না। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা একাধিক হইলে তৎক্ষণাৎই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। ধ্রুববস্তুর অঙ্গসংস্থানের সহিত কর্মের ঘনিষ্ট সংযোগ। ইহার কারণেই প্রভেদের মধ্যে বিশেষ বিন্যাস সম্ভব হয়। এই বিশেষ মানুষ জন্ম লইবার আগে হইতেই ভাষা জন্ম লইয়াই বসিয়া আছে–এই ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি ইতি আদি) কি শুদ্ধ এর অতিশয়পনা সমস্যার সহিতই যুক্ত? এই সম্বল, ভাষা আর এই অসাড় দ্রব্য ছাড়া কোন সহজ মানুষ হইতে পারে না। আমার প্রশ্ন হইতেছে: এই সম্বলবাদ আর তাহার নানান হেরফের কি মাত্র এই অতিশয়পনা, এই অজ্ঞান আর বাসনারই আত্মীয়, নাকি ইহার সহিত কাজ নামে পরিচিত কোন কিছুর বাহিরে দুনিয়ার রূপান্তর এবং সমাজ জীবনেরও আত্মীয়তা আছে? আর আপনি যদি এইগুলির সহিতে আত্মীয়তার কথাও মানিয়া লয়েন তো একটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠে: যুক্তিটা কোথায়, বুঝিবার উপায়টা কই? মানুষ মানে কেবল সবটাকে এক করিবার আশা, আমি ইহা প্রত্যয় করি না। আমি সেইদিনও বলিয়াছি আমরা এখনও একটা মিশাল অবস্থার মুখামুখি হইতেছি। তবে মিশালটি বুঝিতে হইলে ইহার অংশ অংশ আলাদা করিতে হইবে, না করিলে চলিবে না।

লাকাঁ
আর আপনি কি মনে করেন এই স্রোতে আঁকড়াইয়া ধরিবার মতন ‘নোঙ্গর ঘাট’ যাহা পাওয়া যায় তাহার মধ্যে এই কাজও পড়িতেছে?

গোল্ডমান
আমি মনে করি সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষেও বলিতে হইবে মনুষ্যজাতি কিছু ভারি কাজের মতো কাজ করিয়াছে।

লাকাঁ
আমার মনে হয় না ইতিহাসের বই খুব একটা নিয়মবাঁধা বই। এই বিখ্যাত ইতিহাস, যাহাতে কোন ঘটনা অতীত হইয়া গেলে সকলেই সবকিছু এত ভাল করিয়া পায়, তাহা এমন কোন বাগদেবী নহে যাহার ঘরে আমার আস্থা রাখিতে পারি। এমন এক জমানা ছিল যখন–এই যেমন বসুয়ে যে যুগে লিখিতেছেন সেই যুগে ক্লিও খুব বড় গুরুত্বের দাবিদার লোক ছিলেন। হয়তো আবার আগের মার্কসের যুগে। তবে ইতিহাসের ঘরে আমি শুদ্ধ বিস্ময় পাইতে চাই। এই মত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টায় আমি সফল হই নাই, যদিও আমি প্রচণ্ড চেষ্টা করিয়াছি। আপনি যে সকল স্থানাংক দিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন আমি সেইগুলির সাহায্যে নয়, অন্য স্থানাংকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করি। বিশেষ বলিতে, কাজের সমস্যাটিকে এই স্থলে আমি সম্মুখের সারিতে বসাইব না।

শার্ল মোরাজে
আজিকার আলোচনায় সংখ্যার জন্ম কী করিয়া হয় তাহার ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গোল্ডমান সাহেবের উত্তর দিতে গিয়া বলিব, আমি যখন ইতিহাস পড়ি তখন আমি ভরসা রাখি এই একই সংখ্যার জন্মের উপর, মনে করি ইহারাই সবচেয়ে নিরেট অখিল জগত। ইহার মুখামুখি অবস্থায় দাঁড়াইয়া আমি একটা প্রশ্ন করিতে চাহিতেছি, উদ্দেশ্য আমরা যাহা যাহা সত্য বলিয়া অনুমান করিয়া লইতেছি তাহা আসলেই এক না ভিন্ন তাহা পরখ করিয়া দেখা। আমার মনে হয় বক্তৃতার শুরুতে আপনি কহিয়াছেন যে আপনার কাছে সজ্ঞান মনের গঠন ভাষার মতন, আবার শেষদিকে আপনি কহিলেন, অজ্ঞান মন ভাষার আকারে গঠিত। আপনার এই দ্বিতীয় প্রস্তাবখানি যদি সঠিক হইয়া থাকে, তবে আমার বক্তব্যও তাহাই।

লাকাঁ
অজ্ঞান মনই ভাষার আকারে গঠিত–এই বক্তব্যের হেরফের আমি কখনই করি নাই।

রিচার্ড ম্যাকসি
এই অধিবেশন বাবদ যে পরিমাণ ভুলবোঝাবুঝি (méconnaissances) আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, হইতে পারে তাহার সবটুকুই আমরা ইহার ভিতর খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। তাহার পরও আপনি ফ্রেগে আর রাসেলের যে দোহাই দিলেন তাহার প্রভাব আপনার ভাববাদে (ontology) (বা নিদেনপক্ষে আপনার ভাবজগতে) কেমন পড়িয়াছে তাহা লইয়া আমার এখনও একটু ঘোর থাকিয়া গেল। উদাহরণ দিতেছি, আপনি গণিত হইতে যে উদাহরণ দিলেন তাহার একটা অর্থ হইতে পারে আপনি অখিল জগতবাদ প্রস্তাবের চরম ভাষ্যে বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন এইখানেই। সম্পূর্ণ বর্ণনা অসম্ভব হইলে অখিল জগৎ ধ্বসিয়া পড়িবে এই যুক্তি আমাকে বিচলিত করে না। কারণ গোয়ড়েল (Gödel) নিজেই বলিয়াছেন তিনি অখিল জগৎবাদে আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন এই উপপাদ্যের অর্থ আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে সম্বলবাদের প্রকাশক্ষমতার গোড়াতেই একটা সীমা আছে। আমি মনে করি যুক্তিওয়ালা প্রস্তাবটাই বরং গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের লেখকগণ যদি কয়েকটি সেটের বিশেষ সেট বলিয়া স্বাভাবিক সংখ্যার সংখ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তবে–প্রসারতত্ত্বে যে সকল ভাষাপারের ভাষাসংশ্লিষ্ট (metalanguage) গণ্ডগোল বাধে তাহার কথা ছাড়িয়াও বলা যায়–আমরা পাল্টা বলিতে পারি তাহাদের সিদ্ধান্তটা মনগড়া, কারণ সেটতত্ত্বে–মানে যে সেটতত্ত্ব প্রকারতত্ত্বের ভিতে দাঁড়াইয়া নাই–তাহাতে উদাহরণস্বরূপ যে সেটের একমাত্র সংখ্যা খিল সেট, ইতি আদি ক্রমে তাহাই ‘এক’ সংখ্যার সংজ্ঞা বলা যাইতে পারে যাহার বলে স্বাভাবিক সংখ্যার প্রচলিত ধর্ম অক্ষুণœ থাকে। সুতরাং আমরা সওয়াল করিতে পারি কোন সেটটিতে ‘এক’ সংখ্যা হয়? কয়েক মাস আগে পল বেনাসেরাফ (Paul Benacerraf) এই ধারার যুক্তিকে আরো টানিয়া নিয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন স্বাভাবিক সংখ্যার অনপনেয় ধর্ম আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে এই সংখ্যা পুনরাবৃত্তিভিত্তিক প্রগমন বটে। সুতরাং এই নিয়মতন্ত্রে না হয়, ঐ নিয়মতন্ত্র যাহাতে এই প্রগমন সম্ভব তাহাতেই কাজ চলিবে। এই নিয়মতন্ত্রের ধর্ম মিলিতেছে বিশেষ সংখ্যার দাগে নহে, বরং আত্মীয়পরম্পরাভক্ত, নিষ্কায়া গঠনে (অঙ্গীভূত অসাড় দ্রব্যে নয়)। অখিল জগতবাদী (realist) প্রস্তাবমাত্রই যাহা দাবি করেন সেই প্রস্তাব অর্থাৎ সংখ্যা ও ভাব বা অবশ দ্রব্য মাত্রই সমান (আর এক জাতীয় ধারণাপন্থী বা নামকাওয়াস্তে গঠনতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখায়) কথাটি এই হামলার মুখে পড়িতেছে।

লাকাঁ
এই মন্তব্য লইয়া কথা বাড়াইব না। শুদ্ধ বলিব এই: ধারণা এবং এমনকি সেটও বস্তু নহে। সংখ্যাতন্ত্রের (number system) গঠন নাই এহেন কথা আমি কদাচ বলি নাই।

তর্জমা: সেপ্টেম্বর ২০০৭–জানুয়ারি ২০০৮

বিডিনিউজ, আর্টস, ১২ জানুয়ারি ২০০৮

আদমবোমা: ২ । আত্মহত্যা না সত্যাগ্রহ?

iraqbombingad.jpg
ভয়াবহতার ধারণা আত্মঘাতী হামলা কমাতে পারে, এ আশায় ইরাকে সম্প্রচারের জন্য আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে বিজ্ঞাপন বানানোর কাজ চলছে।

copy-of-alpa-2.jpg‘আদমবোমা’ নামক পুস্তিকায় তালাল আসাদ তিনটি প্রস্তাব প্রচার করিয়াছেন। প্রথম প্রস্তাবে তিনি দেখাইয়াছেন পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকরা যে জিনিশকে “সন্ত্রাসবাদ” বলিয়া গালি দিতেছেন তাহার সহিত তাহারা যে বস্তুকে “যুদ্ধ” বলিয়া সালাম করেন তাহার ভেদ বিশেষ নাই। সাম্রাজ্য শাসকদের বিচারে আইনসম্মত হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধ বলা যায় আর আইন বহির্ভূত হত্যা ইত্যাদিরই অপর নাম ‘সন্ত্রাসবাদ’। পার্থক্যটা হত্যা ও অহত্যায় নয়। বরং হত্যা ও হত্যায়। এক হত্যার উদ্দেশ্য—তাঁহারা বলেন—জীবন দান। অন্য হত্যার উদ্দেশ্য নিছক অথবা জীবননাশ।

asad.jpg……
তালাল আসাদ
……..
কিন্তু—তালাল আসাদ দেখাইতেছেন—জীবন বা সভ্যতার সুন্দর প্রহরা দিবার উদ্দেশ্য যাঁহারা যুদ্ধ ঘোষণা করেন তাঁহারা তো তাঁহাদেরই পূর্বঘোষিত যুদ্ধের আইন—যেমন ‘জেনেভা কনভেনশন’—মানিয়া চলেন না। বলপ্রয়োগের যে সীমা আইনে বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে—যেমন যুদ্ধবন্দি নির্যাতন না করা—তাহা মানিয়া চলেন না। প্রমাণ—গুয়ানতানামো উপসাগরের মার্কিন বন্দিশিবির, প্রমাণ ইরাক, প্রমাণ আফগানিস্তান, প্রমাণ ভিয়েতনাম, প্রমাণ আলজিরিয়া। তাহা হইলে ‘মানবাধিকার আইন’ কথাটি একটি কথার কথা বৈ নহে!

book_t-a.jpgঅথচ এই শক্তিমন্ত দেশের নায়ক ও সেনানায়কগণ সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করিতেছেন। কিন্তু কোন মুখে? তাঁহারা বন্দিজনের পায়ুপথে বিদ্যুতবায়ু প্রবেশ করাইয়াও শান্তি পাইতেছেন না। বলিতেছেন সন্ত্রাসবাদ সভ্যতার অথবা মানবাধিকারের দুশমন। তালাল আসাদ চোখে আঙ্গুল ঢুকাইয়া কহিতেছেন—প্রকৃত প্রস্তাবে পশ্চিমা সভ্যতার যুক্তি হইল, সন্ত্রাসবাদ যাহারা আঁকড়াইয়া আছে তাঁহারা সভ্যতার বাহিরে বাস করিতেছে। কাজেই তাঁহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সময় সভ্যতার আইনকানুন—যথা মানবাধিকার আইন—প্রয়োগের প্রয়োজন নাই।

১৯২৭ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর কাপ্তেন এলব্রিজ কোলাবি এক প্রসঙ্গে যাহা বলিয়াছিলেন—আসাদের মতে—তাহা আজও পাশ্চাত্য শাসক শ্রেণীসমূহের প্রকৃষ্ট আদর্শ আকারে জিয়াইয়া আছে। কোলবির কথায়:

“বন্যজাতি যুদ্ধের মূল কৌশল হিসাবে শুদ্ধ ধ্বংসসাধন ও বিলপ্তির পথই গ্রহণ করে—ঘটনার সার কথা ইহাই। যাহারা এই রকম নির্দয় পদ্ধতি বাছিয়া লয় তাহাদিগের মোকাবেলায় আমাদিগেরও নির্দয়ার পথ লইতে হইবে। অতিশয় মানবাধিকার মানবাধিকার করিয়া এই পথ হইতে সরিয়া দাঁড়ানো ঠিক হইবে না। কারণ আপনার শত্রুর সমক্ষে বেশি দয়া দেখাইতে গিয়া সেনাপতি হিসাবে আপনি তো আপনার আপন জাতির প্রতি নির্দয়তা প্রকাশ করিতেছেন মাত্র।” (আসাদ ২০০৬: ৩৪-৩৫)

পাশ্চাত্য শাসক শ্রেণীর নেতারা ‘মানবাধিকার আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে অসভ্য (বা বন্য ও বর্বর) জাতির নিন্দা করেন। অদ্য তাঁহারা সভ্য জাতির দুশমন বলিয়া যাহাদের চিহ্ন দিয়াছেন তাহারা হইয়াছেন ‘সন্ত্রাসবাদী’। ইহাদেরও প্রধান দোষ ইহারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করিয়া নিরীহ মানুষ হত্যা করিতেছে। সুতরাং ইহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবাধিকার আইন মানিয়া চলিবার কোন বাধ্যবাধকতা থাকিতে পারে কি? মানবাধিকার রক্ষা করিবার স্বার্থে মানবাধিকার ভঙ্গ করা কোন অপরাধ নয়—পাশ্চাত্য যুক্তির নিহিতার্থ যদি ইহাই হয় তাহা হইলে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদীরাও যে একই যুক্তির আশ্রয় লইবেন তাহাতে আপনার বিস্ময় কেন?

এই প্রশ্ন সম্বল করিয়া তালাল আসাদ দ্বিতীয় প্রস্তাব সায়ের করিয়াছেন। এই প্রস্তাবে তাঁহার বিচারের বিষয় তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান ঘটনা—খোদ আদমবোমা। কেহ কেহ ইহার নাম রাখিয়াছেন শহীদ (martyrdom) বোমা। (আসাদ ২০০৬: ৪৩)


আত্মঘাতী বা আদম বা শহীদ বোমার প্রকোপ দুনিয়ার নানাদেশে, নানা সময়ে দেখা গিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও পশ্চিমা শাসক শ্রেণীর অন্তর্গত ধুরন্ধর ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই বোমা আবিষ্কারের কৃতিত ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দান করিতে গ্রীবা উঁচু করিয়া আছেন। ১৯৮৭ সালের পর ফিলিস্তিনের পামর জনসাধারণ এক প্রকার ঢেলাযুদ্ধ শুরু করিয়াছিলেন। এই ঢেলার অনুবাদ আমরা একদা করিয়াছিলাম ‘কংকর’ শব্দ দিয়া। আরবি জবানে এই যুদ্ধ ‘এন্তেফাদা’ বা গণজাগরণ অভিধা অর্জন করিয়াছিল। ইহার ফলাফল কী হইয়াছে তাহা সকলেই অবগত আছেন।

দোসরা এন্তেফাদা শুরু হইয়াছে ২০০০ সালের অক্টোবর মাস হইতে। প্রাচীন জেরুজালেম শহরের বনিয়াদি আল আকসা মসজিদের কর্তৃত্ব গ্রহণ করিবার অভিলাস চরিতার্থ করিতে ঐ মাসের একদিন এসরায়েল রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল আরিয়েল শ্যারন [Ariel Sharon] উস্কানিযোগে পবিত্র মসজিদে ঢুকিয়া পড়িলেন।

ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতর বড় শরিক হামাস দল সেই উস্কানির স্পর্ধা আপনকার কাঁধে তুলিয়া লইল। ২০০১ সালের ১লা জানুয়ারি এই দলের প্রথম ‘শহীদ’ বোমাভিযান শুরু হইলে। ইহার পর অন্যান্য দুনিয়াবি
fathi-al-shikakai.jpg……..
ফতি শিকাকি
………
রাষ্ট্রনৈতিক দল এমনকি নির্দলীয় পামর পর্যন্ত বুকে-পিটে বোমা বাঁধিয়া এসরায়েল সীমান্তের চৌকি পার হইল। মনে রাখিতে হইবে ‘এসলামি জেহাদ’ নামা দলের স্থপতি ফতি শিকাকি (Fathi Shikaki) ১৯৮০ সালের কয়েক বৎসর পর এসরায়েলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করিয়াছিলেন। পরাজয়ে না ডরাইয়া বীরেরা এখন বুকে বোমা বাঁধিয়া মরিতেছেন আর এসরায়েলি নাগরিক-অনাগরিক যাহাকে পাওয়া সম্ভব মারিতেছেন।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আকাশযোগে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে আদমবোমা ফাটিবার পর দুনিয়া জুড়িয়া নতুন হৈ চৈ উঠিয়াছে। উদাহরণ দিয়া বলিব মার্কিন দার্শনিক রিচার্ড রোর্টি (Richard Rorty) রটাইয়াছেন পাশ্চাত্য জগতের কোথাও যদি সন্ত্রাসবাদীরা ঐ রকম বড় হামলা আরো একবার করিতে পারে তো পশ্চিমে এতদিন ‘গণতন্ত্র’ বলিয়া যে সামাজিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে তাহা শেষ হইয়া যাইবে। প্রমাণ, ইহার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পামর সাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকার কিছু পরিমাণ সংকোচনের শিকার হইয়াছে। সে দেশে তথাকথিত ‘দেশপ্রেম আইন’ (Patriot Act) পাশ হইয়াছে।
Richard Rorty
রিচার্ড রোর্টি (১৯৩১-২০০৭)

রিচার্ড রোর্টির উদ্বেগ শুদ্ধ তাঁহার একার হইলে কথা চলিত না। চলিতেছে কারণ ২০০১ সালের অনেক আগে হইতেই বিশেষজ্ঞ গবেষক ও প্রচারক মহলে বলা হইতেছে ‘সভ্যতার সংঘাত’ বা সভ্যতায় সভ্যতায় যুদ্ধ শুরু হইয়া গিয়াছে। তালাল আসাদ তদীয় ‘আদমবোমা’ প্রবন্ধের প্রথম প্রস্তাবে আমাদের দর্শন করাইয়াছেন প্রকৃত প্রস্তাবে প্রচারকগণ বলিতেছেন—পাশ্চাত্য সভ্যতার সহিত যাহারা কড়িবর্গাশুদ্ধ এক হইয়া মিশিতেছেন না তাহারা সভ্য হইয়া সারেন নাই। উনিশ শতকের পররাজ্যাভিলাষী বা ‘কলোনিয়াল’ যুদ্ধের আদলে তাঁহারা নতুন যুদ্ধ শুরু করিয়াছেন। এই যুদ্ধের মূল নৈতিক ভিত্তিও সেই পুরানা অজুহাতই: ‘সভ্যতা বিস্তারের স্বার্থে অসভ্যকে ধ্বংস করিতে হইবে’। আমরাও ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়’ প্রবন্ধে তাহার কিছু বয়ান পেশ করিয়াছি। (খান ২০০৭)

সকলেই বলিতেছেন আত্মঘাতী ওরফে আদমবোমা জিনিসটা সত্যই বড় ভয়াবহ জিনিশ। তালাল আসাদ সওয়াল করিলেন—কেন? কথাটার মধ্যে দুই সত্য লুকাইয়া আছে। এক নম্বরে, অনেকেই পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞাদের সুরে সুর মিলাইয়া বলিবেন, আদম বোমারুরা কেবল নিরীহ, বেসরকারি, যায় বেসামারিক লোক ধরিয়া মারিতেছে। ইহাই ভয়াবহতার গূঢ় কারণ। নিরীহ লোকহত্যা শুদ্ধ আত্মঘাতী বোমারুরাই করিতেছেন—ইহা কিন্তু সত্য নহে। এই কাজ অনেক দেশের সেনাবাহিনীও করিয়া থাকে। মহাযুদ্ধের সময় জার্মানিতে এই ঘটনা দেদার ঘটিয়াছে। জাপানের কথা না হয় বলিব না।

তাহা হইলে আত্মঘাতী অভিযান জিনিশটার বিশেষ গুণ কোনখানে? আখ্যান অনুসারে যদি বলি বলিতে হইবে যে অভিযানে শত্রুপক্ষের লোককে কি নিরীহ কি দোষী নির্বিচারে হত্যার নিমিত্ত আমি নিজেকে পর্যন্ত ধ্বংস করিয়া ফেলিতে রাজি হইয়াছি তাহাই আত্মঘাতী অভিযান বা ‘সুইসাইড অপারেশন’। তাহা হইলে আসল কথা আত্মহত্যা, নিরীহহত্যা নহে। কিন্তু ইহাতেও সমস্যা দেখিতেছি। দেশের মুক্তির জন্য, জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কত বীরই না আত্মোৎসর্গ করিয়াছেন, ইতিহাসে তাহার কতক কাহিনী লেখা হইয়াছে, কতক লেখাও হয় নাই। আমাদের দেশের ইতিহাসেও শ্রেষ্ঠ আত্মোৎসর্গকারী সৈনিকগণকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ অভিধা দেওয়া হইয়াছে। কই আমরা তো ইহাঁদের কখনও ভয়াবহ বলি নাই। বলিয়াছি কি? আর ব্যক্তিগত বা মনোগত গভীর গভীর অসুখের কারণে কত মানুষই না আত্মহত্যা করিয়া থাকেন। আমরা তাহাদিগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি, কেহ বা গালিও দিয়া থাকি। কিন্তু ভয়াবহ তো বলি না।

ধর্মীয় ধারায় ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ বলা হয় বটে তবে আমাদের দেশে ইংরেজ সরকার প্রবর্তিত দণ্ডবিধি অনুসারে আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইলে শুদ্ধ এক বছরের কারাভোগ করিবার বিধান (দ্রষ্টব্য ৩০৯ ধারা) রহিয়াছে অথচ অন্যহত্যার চেষ্টা করিয়া বিফল হইলে দণ্ড কম করিয়া হইলেও ১৪ বছর।

১৮ শতকের ইতালি দেশীয় মনীষী সেসার বেকারিয়া [Cesare Beccaria] বলিয়াছেন যাহারা পরিণত বয়সে দেশত্যাগ করিয়া বিদেশে চলিয়া যান তাহাদের পাপের তুলনায় আত্মহত্যা কোন পাপই নহে। কারণ—
Cesare Beccaria……..
সেসার বেকারিয়া, ১৭৩৮-১৭৯৪
……..
বেকারিয়ার ধারণা —হিজরতকারী সঙ্গে টাকা-পয়সা ধনদৌলত লইয়া যান আর তাহার নতুন দেশ যদি পুরানা দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় তো তিনি প্রকারান্তরে শত্রুদেশের সহায়তাই করেন। অথচ আত্মঘাতী শুদ্ধ নিজের কায়াটা ছাড়া কিছুই লইয়া যাইবেন না। [He who kills himself does a less injury to society than he who quits his country for ever; to the other leaves his property behind him, but this carries with him at least a part of his substance. Besides, as the strength of society consists in the number of citizens, he who quits one nation to reside in another, becomes a double loss.] (বেকারিয়া ১৯৯২: ৭৮)

কাজেই দেখা যাইতেছে আত্মঘাতী বোমার ভয়াবহতা ঠিক আত্মঘাতে নিহিত নাই । আর—আগেই তো দেখিলাম—ইহার কারণ নিরীহহত্যায়ও নিহিত নাই। তাহা হইলে এই ভয়াবহতার কারণ কোথায় ? অন্য কোথা, অন্য কোনখানে?

আত্মঘাতী বোমা ফাটিবার পর যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়, যে প্রাণহানি ঘটে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞরা বিশেষ সময় ব্যয় করিবেন না। তাহারা জানিতে উৎসুক যে বা যাহারা বোমা ফাটাইল তাহার বা তাহাদের ব্রত বা মতলব [motif] কী। সকলেই জিজ্ঞাসা করেন সে কেন এই কাজ করিল? প্রশ্ন হইতেছে আত্মহত্যা—বিশেষ সফল আত্মহত্যা—শাস্তিযোগ্য অপরাধ নহে। আপনি তাহাকে কোথায় পাইবেন? অতয়েব প্রমাণ করা চাই—‘আত্মহত্যা যে করিয়াছে আত্মহত্যা সে করে নাই।’ কেহ তাহাকে দিয়া করাইয়াছে। অতয়েব তাহাদিগকে ধর, মার, কাট, পোড়াও। ইহাই বিশেষ এসরায়েল রাষ্ট্রে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার চিন্তাধারা ।

ইহাতে কিন্তু আসল প্রশ্নের উত্তর মিলিল না। আত্মঘাতী অভিযানে যাইবার ইচ্ছা যাহার মনে জাগিয়াছে তাহার মনে তাহা কখন ও কীভাবে জাগিল? এই প্রশ্নের উত্তর কোনদিনই পাওয়া যাইবে না—এমন কথা তালাল আসাদ বলেন নাই। তিনি মাত্র বলিতেছেন, উত্তর পাওয়াটা সহজকর্ম নহে। এই জায়গায় দুই ঘটনার স্রোত একটি ধারায় আসিয়া মিলিয়াছে। তাই কেহ কেহ প্রশ্ন করিয়াছেন—‘লোকটি কি মারিবার জন্য মরিয়াছে না কি মরিবার জন্য মরিয়াছে?’

জঁ বেশলে (Jean Baechler) নামক জনৈক ফরাশি পণ্ডিত বুফে (Buffet) নামক একজন আততায়ীর উদাহরণযোগে বলিয়াছেন কেহ কেহ মরিবার পথ প্রশস্ত করিবার জন্য পর ধরিয়া মারে। বুফে তাহার শেষ অভিলাষ হিসাবে ফরাসি রাষ্ট্রপতি সমীপে আর্জি পাঠাইয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন তাহাকে গিয়োতিন (Guillotine) নামক তলোয়ারের নিচে মরিবার সুযোগ দেওয়া হউক। তিনি বলিতেন, ‘আমি আত্মহত্যার সুযোগ চাহিব বলিয়া পরহত্যা করিয়া থাকি। ইহাই আমার নীতিধর্ম।’ [To kill in order to commit suicide, that’s my morality!] ইহা মরিবার ফন্দিস্বরূপ মারিবার চমৎকার দৃষ্টান্ত। (আসাদ ২০০৬: ৪০)

মঁসিয়ে বেশলে আবার অন্য দৃষ্টান্তও পেশ করিতে পিছপা হয়েন নাই। ২ নম্বর মহাযুদ্ধের জমানায় জাপানের আত্মঘাতী বৈমানিকগণ (বা কামিকাজি) ইহার উল্টা করিয়াছেন। তাহারা মরিবার জন্য মরিয়াছেন। জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় ইজ্জত তাহাদের কাছে নশ্বর জীবনের তুলনায় ঈশ্বরস্বরূপ বা অবিনশ্বর। আর বুফের মতন জাত অপরাধীরা দুই পয়সার বিষ না কিনিয়া খামোকা লোকক্ষয় করিয়াছেন। প্রভেদ এই নয় কি? এইখানেও আমাদের উত্তর মিলিল না। এইখানে শুদ্ধ জানিতে পারিলাম আত্মহত্যাকারীর উদ্দেশ্য নিজেকে শেষ করা। আর আত্মঘাতী বোমারুর উদ্দেশ্য অন্যকে শেষ করা—নিজেকে শেষ করা তাহার উপায় মাত্র। প্রশ্ন থাকিল: অন্যকে শেষ করিবার ব্রত লইলেন কেন তিনি? অন্যকে শেষ করার অন্য উপায় থাকিবার পরও যদি তিনি সেই পথে ধরিয়া থাকেন তবে বলিতে হইবে তিনি সত্য সত্যই কোন মতাদর্শের—যেমন ধর্মীয় জবানের—বন্দী হইয়াছেন।

তালাল আসাদ বলিয়াছেন—পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞরা ইহাই প্রমাণ করিতে তৎপর। কিন্তু তাঁহাদের যুক্তিপ্রমাণ ও সাক্ষ্যসাবুদ দেখিয়া আমরা আশ্বস্ত হইতে পারিতেছি না। তাঁহারা আসলে কিছু একটা লুকাইতে চাহিতেছেন। আত্মঘাতী বোমার জন্ম মানুষের আত্মহত্যা প্রবণতায় হয় নাই, পরহত্যালিপ্সাও এই বোমার জননী নহেন। এসলাম ধর্মের মূলসূত্র ধরিয়া যতই টানাটানি করিবেন না কেন ইহার ‘মুদা’ পাইবেন না। এসলাম জীবনের সাক্ষাৎ মৃত্যুকে মহীয়ান করিয়া তুলিয়াছে বলিয়া যে প্রচার বহাল আছে তাহা—তালাল আসাদ দাবি করিতেছেন—মোটেও সত্য নহে।

তাহা হইলে—সিদ্ধান্ত হইতেছে—আদমবোমার জন্ম খোদ ইতিহাসে। আত্মঘাতী বোমা হইতেছে অসহায়ের শেষ সহায়। ভাষাহীনের শেষ ভাষা মাত্র। এসলামের হৃদপিণ্ডে বোমা নাই—বোমা বাঁধা নিছক কোমরবন্ধে।

আত্মঘাতী বোমার প্রকৃত ঠিকানা ইতিহাস। কিন্তু বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দা না শোনে ইতিহাসের কাহিনী। যেমন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ন এলস্টার [Jon Elster] প্রচার করিতেছেন—আত্মঘাতী বোমা মারা Jon Elster……….
ইয়ন এলস্টার
……..
সাময়িক উত্তেজনার কাজ। তিনি কি করিয়া জানিলেন এই সত্য? তিনি আরেকজন বিশেষজ্ঞের কাছে শুনিয়াছেন। এই বিশেষজ্ঞের নাম আরিয়েল মেরারি [Ariel Merari]। মার্কিন সিনেটে সাক্ষ্য দিবার সময় তিনি জানাইয়াছেন, “আত্মঘাতী বোমা ফাটাইবার পূর্বক্ষনে বোমারতদের কেহ কেহ খুব উল্লাস বোধ করে আর চরম মুহূর্তে কেহ কেহ পায় পরম পুলক।” (আসাদ ২০০৬: ৪১)

সংগত কারণেই জিজ্ঞাসা করা চলে, মরিবার পূর্বসন্ধিক্ষণে বোমারু বেচারার মনে কি ছিল তাহা আপনি জানিলেন কোন পথে? আত্মঘাতীর মনের গভীর গভীর অসুখ সম্বন্ধে আগে হইতেই আপনি জানিতেন । তাহা ছাড়া নতুন খবর আর কি এখানে আছে? আত্মহত্যা মনের বিকার মাত্র এই পূর্বধারণা না থাকিলে
Ariel Merari…….
আরিয়েল মেরারি
…….
আত্মহত্যাকারীর মনের খবর পাইয়াছি পাইয়াছি বলিয়া চীৎকার করিলে তাহা কোন অর্থই বহন করিত না।

আত্মঘাতী বোমারু মনোবিকার—পণ্ডিতেরা কল্পনা করেন—দুই প্রকার। এক নম্বরে, মাথা খারাপ হইয়া গেলেই লোকে এহেন কাণ্ডে মাতে। সকলেই বলেন না এই কথা, তবে অনেকেই বলেন। দুই নম্বরে বলা হয়, সমাজ ও সভ্যতার সহিত খাপ খাওয়াইতে অসমর্থ হইয়া কিছু লোক আত্মঘাতী বোমার ঝুড়ি বাছিয়া লইতেছে। মনে রাখিবেন এইখানে সমাজ বলিতে বুঝিতে হইবে—পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাম্রাজ্য।

বোমা বিশারদগণ একই মুখে দুই কথা বলিতে কদাচ কসুর করেন না। একমুখে তাঁহারা বলেন—বোমারু যোদ্ধাটি খুব হিমশীতল মাথায় বোমা ফাটাইল। ইহার অর্থ নিজের উপর উহার নিয়ন্ত্রণ ষোল আনা আছে। দোসরা মুখে তাঁহারা বলিবেন—অন্য লোকে, মানে মন্ত্রণাদাতারা তাহাকে শিখাইয়া পড়াইয়া এই গর্হিত কর্মে নামাইয়াছে। যোদ্ধাটি—ইহার মানে দাঁড়াইল—খুবই উনো বুদ্ধির লোক আর তাঁহার মন্ত্রণাদাতৃমণ্ডলী ভারি দুনো লোক। তাঁহারা সাংঘাতিক, ভয়াবহ রকমের নিদয়া, নিঠুর, পাঁজি।

তালাল আসাদ প্রমাদ গণিতেছেন ইহাঁদের। ব্যাখ্যা দিবার ছলে তাঁহার শুদ্ধ নতুন সমস্যা হাজির করিতেছেন। আমাদের জ্ঞানচক্ষু মুছিয়া আসিল বলিয়া, আসাদ বলিলেন, আত্মঘাতী বোমারু বোমাবাজিতে নিজের ইচ্ছায় নামুন আর পরের সাধ্যসাধনায়ই নামুন কিছুই যাইয়া আসিতেছে না। নামাটা কাজের শর্ত [Conditions] মাত্র, ব্রত বা মতলব [motives] নহে।

কেহ কেহ বলিতেছেন আত্মঘাতী বোমাবাজি নিছক মনের ভুলে করিবার মতন কাজ নহে। ইহার জন্ম মনের শুদ্ধে বটে। কী সেই শুদ্ধ? মহাপরাক্রমশালী, অজেয় অপার শত্রুর সমক্ষে পড়িয়া—তাহার দয়ামায়াহীন যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া যুগপৎ নিজ ও পরকে ধ্বংস করিবার পথ ছাড়া তাহার সামনে আর কোন সড়ক থাকে না। আবার কেহ কেহ বলেন এসলাম ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষাই সমস্ত নষ্টের গোড়ায়। মাথাধোলাই করিয়া আত্মঘাতী বানাইবার কারখানারই অপর নাম এসলাম—বলিতেছেন পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞগণ। ফিতার ভিতর অচিন ভাষায় রেকর্ড করা বিবৃতি শুনিয়া তাঁহারা নিশ্চিত হন আত্মঘাতীর মনের প্রকৃত সত্য ধরা পড়িয়াছে। অথচ তাঁহারা ভুলিতেছেন এই মুখস্থ ভাষা আচার মাত্র।

সত্য কি আসলে তাহাই? আসাদ বলিয়াছেন—বিশেষজ্ঞদের মতলব বিশেষ করিয়া বিচার না করিলে এইখানে ঠকিবার সম্ভাবনা প্রবল। বোমাব্রত ব্যক্তি ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে জীবনের জায়গায় মৃত্যুকে বাছিয়া লইল। ইহাতে প্রমাণিত হইতেছে কী? হইতেছে যে ধর্ম এহেন শিক্ষা প্রচার করে সেই ধর্মের জীবনাদর্শ মৃত্যু, তাহার সংস্কৃতি মরণের মহোৎসব মাত্র। অথচ এই যুক্তির প্রণেতা ও প্রচারকগণ ভাবিয়া দেখেন নাই—আত্মঘাতী বোমার ব্রত বা লক্ষ্য মৃত্যু নয়, মৃত্যু এক প্রকার পরিণতি মাত্র। [But death here is an effect not a motive] (আসাদ ২০০৬: ৪২) ব্রতসন্ধানী পশ্চিমা পণ্ডিতসমাজ—আপাতত মনে হইতেছে এই সমালোচনায়—তেমন বিব্রত হইবেন না।

আত্মঘাতী বোমার ব্যাখ্যাস্বরূপ পশ্চিমা পণ্ডিতসমাজের অনেক ব্যাখ্যাই পূর্বসংস্কারের পরিমার্জনা বৈ নয়। লাভের মধ্যে, ধর্মপরায়ণতা (religious subjectivities) ও দুনিয়াবী গায়ের জোর বা রক্তপাত (political violence) সম্বন্ধে অনন্ত স্বাধীনতাবাদীগণ (liberals) কী চিন্তা করেন তাহার পরিচয় পাইলাম। বোমা বা এসলাম সম্পর্কে নতুন কিছু জানা হইল না।

পশ্চিমা সাম্রাজ্যের ধুরন্ধরগণ বলিতেছেন আত্মঘাতী বোমা এসলাম ধর্মীয় চিন্তাধারার ফসল। তালাল আসাদ এই ব্যাখ্যা সঠিক মনে করেন না। ধুরন্ধরগণ প্রমাণ করিতে চাহেন আত্মঘাতী বোমা বোমাবাজগণের ব্রতের (বা মোটিভেশনের) ফসল। ধর্মবিদ্যার খ্যাতনামা পণ্ডিত আইভান স্ট্রেনস্কি [Ivan Strenski] বলিতেছেন বোমা ফাটাইয়া আত্মহত্যা করিবার ব্রত এক ধরনের ধর্মীয় আত্মোৎসর্গ বা জান ‘কোরবানি’ বৈ নহে। গবেষক বেগম মে জায়ুসি লিখিয়াছেন এই জাতীয় আত্মোৎসর্গের আসল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রনৈতিক নিপীড়ন ও অপমান হইতে মুক্তির প্রয়াস, তবে শেষ বিচারে ইহাও আত্মদানের মতন ধর্মীয় বিশ্বাস হইতেই জন্ম লইয়াছে।

আরেকজন বিশারদ, ফরাসিদেশের রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক ব্রুনো এতিয়ন, একই পথে জানাইতেছেন আত্মঘাতী বোমা আরব জাতির অস্থিমজ্জায় প্রোথিত ‘মরণকামড়’ (বা ‘ডেথ উয়িশ’) বৈ নহে। এই তিন ব্যাখ্যার সামান্য দিক—তালাল নির্ণয় করিয়াছেন—আর কিছু নহে, এক ধরনের ব্রত বা মোটিভ। সেই ব্রত মৃত্যু। মৃত্যু কেন? কারণ এসলাম ধর্ম জীবনের সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ঢের মহিমাযোগে দেখিয়া থাকে। এসলাম তাঁহাদের মতে এক জাতীয় ‘মরণ সভ্যতা’ (বা ‘কালচার অব ডেথ’)।

আইভান স্ট্রেনস্কি যাত্রা করিয়াছেন ফরাসি সমাজ-বৈজ্ঞানিক এমিল দুর্খাইমের আত্মহত্যাবিদ্যা হইতে। দুর্খাইমের অনুসারী বলিয়া পরিচিত একজন বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতের নাম হাবোয়াকস [Halbwacks]। তিনি আত্মহত্যা [suicide] ও আত্মোৎসর্গের [sacrifice] মধ্যে ভেদ দেখিয়াছেন। এই ভেদ কি তাহা জানিবার প্রধান উপাদান সমাজ। সমাজ দুই জিনিশকে এক চোখে দেখে না। আত্মনিগ্রহ বা আত্মহত্যার সঙ্গে সমাজের অনুমোদন যখন যোগ করা হয় তখন তাহা আচারানুষ্ঠানযোগেই [ritual] করা হয়। শুদ্ধ কি তাহাই? আত্মোৎসর্গ মানে ‘পবিত্র করিয়া তোলা’। লাতিন শব্দ সাক্রিফিকিয়ুম [sacri-ficium] অর্থও ইহা বৈ নহে। (যাহা হইতে ইংরেজি বুলি ‘স্যাক্রিফাইস’ আসিয়াছে)। স্ট্রেনস্কি দেখাইতে চাহেন ফিলিস্তিনি ivan-strenski.jpg……..
আইভান স্ট্রেনস্কি
……….
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মঘাতী বোমা ফিলিস্তিনি জাতি (বা উম্মা) সমীপে বোমারুর আত্মোৎসর্গ বা উপহার (আরবি ‘হাদিয়া’) মাত্র। আদমবোমা জেহাদি যোদ্ধার বিবেচনায় যুদ্ধের কৌশলও বটে। স্ট্রেনস্কি তাহা অস্বীকার করিতেছেন না। তারপরও তিনি যোগ করিতেছেন এই ঘটনার প্রকৃত বিচার করিতে হইলে ইহার ধর্মীয় ভিত্তিটুকু হিসাবে লইতেই হইবে। তাঁহার মতে আত্মোৎসর্গের সহিত রক্তপাতের সম্বন্ধ অঙ্গাঙ্গী। তাঁহার বিচারে ধর্ম মানেই আত্মনিগ্রহ বা আত্মোৎসর্গ। অতয়েব রক্তপাতে বিলম্ব কেন?

স্ট্রেনস্কির কহতব্য কতখানি যুক্তিসম্মত? তালাল আসাদ মনে করেন স্ট্রেনস্কি বৃথাই দুর্খাইমের নাম ভাঙ্গাইতেছেন। দুর্খাইম দেখাইয়াছিলেন আত্মহত্যা যদিও এই দুনিয়ার মধ্যে মনুষ্যসন্তানের সবচেয়ে বেশি আপন বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত তথাপি ইহার মধ্যে অপর বা সমাজ নানাভাবে জড়াইয়া থাকে।

তালাল আসাদ মনে করেন এমিল দুর্খাইম [Emile Durkheim] বাঁচিয়া থাকিলে আত্মঘাতী বোমার ঘটনাকে ‘পরার্থপর বা পরোপকারী আত্মহত্যা’ [altruistic suicide] বলিয়া গণিতেন। অথচ স্ট্রেনস্কি একহাতে এই ঘটনাকে কৌশলে ব্যক্তির ব্রত বলিয়া ধরিয়া রাখিয়াছেন, আবার অন্যহাতে ইহার সহিত আচার (বা রিচুয়াল) যোগ করিয়াছেন। এইভাবে ব্যক্তির সহিত, সমাজকে পাশ কাটাইয়া, ধর্ম যোগ করিয়াছেন তিনি । করিয়া প্রমাণ করিলেন (এসলাম) ধর্মই আত্মহত্যা বোমার জননী।

তালাল আসাদের দ্বিতীয় মন্তব্য অনুসারে এসলাম ধর্মে আত্মোৎসর্গ বলিয়া কিছু নাই। যাহা আছে তাহা হইল পশু জবাই [আরবি ‘জবিহা’] করা। ইহার যুক্তি: আল্লাহ আদেশ করিয়াছেন পশু হত্যা করিবে, যেন তোমার মানুষ হত্যা না করিতে হয়। ইহাই হজরত ইব্রাহিম শিখিয়াছিলেন। কোরবানির সময় ইহাই পালন করা হয়। আরেক ধরনের উৎসর্গ করা কোন বিপদ বা ফাঁড়ার
emile_durkheim.jpg………
এমিল দুর্খাইম
………..
হাত হইতে বাঁচিয়া উঠিলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ওয়াস্তে করা হয়। তেসরা ধরনের উৎসর্গ হয় কোন অতিশয় অন্যায় বা ভ্রান্তির হাত হইতে ফিরিয়া আসিবার পর খেসারত (বা ‘কাফফারা’) স্বরূপ। আত্মঘাতী বোমারুর কৃত্য ইহাদের কোনটার সহিতই মিলিতেছে না। তাই বাধ্য হইয়া স্ট্রেনস্কিকে নাস্তি, নাস্তি বলিতে হইবে।

তিন নম্বর কথা, স্ট্রেনস্কি আত্মোৎসর্গ কথাটি আরবি ‘কোরবান’ শব্দের তর্জমা আকারেই ব্যবহার করিয়াছেন। কিন্তু আরবিতে কোরবান মানে কখনো ‘হাদিয়া’ বা উপহার দাঁড়ায় না। অথচ তিনি দুই অর্থকে গুলাইয়া যে অপূর্ব খিচুড়ি করিয়াছেন তাহা আরবিভাষাভাষি খ্রিস্টান জাতির সম্পদ মাত্র। হজরত ঈসা—আল্লাহ তাঁহার নাম অনুমোদন করুন—নিজেকে ‘উপহার’ দিতে পারেন। তিনি পিতার কাছে ফিরিবার হকদার। অন্যের বিশেষ মুসলমানের সেই হক কই? কোরবান কথাটা পবিত্র কোরান গ্রন্থে যে তিন জায়গায় পাওয়া যাইতেছে (৩: ১৮৩, ৫: ২৭ এবং ৪৬: ২৮) তাহাদের কোনটাতেই স্ট্রেনস্কির ধারণার সমর্থন পাওয়া যাইবে না। (আসাদ ২০০৬: ৪৪)

এতক্ষণে আশা করি আইভান স্ট্রেনস্কির ব্রত কি তাহার পথ পরিস্কার হইয়াছে। তিনি দাবি করিতেছেন আত্মোৎসর্গের সিদ্ধান্ত যিনি লইতেছেন ইহা তাহার ব্রত মাত্র। এই ব্রত হইতে অপরাধ জন্ম লইতেছে। অনেকে যে বলিয়া থাকেন এসরায়েল রাষ্ট্রের পাশবিক দমন ও পীড়ন-নীতির কারণে আত্মঘাতী বোমার বিস্তার তাহা ঠিক কথা নহে—ইহাই স্ট্রেনস্কির দাবির নির্গলিতার্থ।

স্ট্রেনস্কি এই এক ঢিলে দুই পাখি বধ করিতে চাহিয়াছেন। তিনি একে তো প্রমাণ করিলেন এই বোমাপরাধ ধর্ম হইতে জাত। সুতরাং ইহাকে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ বলিয়া ডাকা যাইবে। দ্বিতীয় স্থানে প্রমাণিত হইল অপরাধের দায় খোদ বোমাবাজের। কাজেই এসরায়েল দেশের বিপদ কোথা হইতে আসিতেছে তাহাও সনাক্ত হইল। অতয়েব এই বিপদ হইতে ত্রাণ পাইতে হইলে যাহা যাহা করা দরকার (রক্তপাতের চৌহদ্দি আরো বাড়াইয়া লওয়া তাহার মধ্যে) তাহা তাহা করিবার অধিকার এসরায়েলের হাতে প্রকাশ্যে সংরক্ষিত রহিল।

মে জায়ুসি [May Jayyusi] নামী একজন গবেষকও এই একই ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন। তিনিও ধরিয়া লইয়াছেন আত্মঘাতী বোমাবাজি এক প্রকার জান কোরবানির বিষয়। তিনিও বিশ্বাস করিতেছেন এসলামের সহিত ‘মরণ
may.jpg………
মে জায়ুসি
………
সভ্যতা ’ বা কালচার অব ডেথ’ কথাটি জোড়া লাগাইয়া দেওয়া যায়। তালাল আসাদ বলিতেছেন, ইহাতে আমরা যে সমস্যার সমাধান খুঁজিতেছি—অর্থাৎ আত্মঘাতী বোমার কারণ নির্ণয় করিতেছি—তাহার কোন রাহা কিন্তু হইতেছে না। ‘মরণ সভ্যতা’ শুদ্ধ এসলামের মৌরসী সম্পত্তি হইবে কেন? ‘অনন্ত স্বাধীন’ গণতান্ত্রিক সভ্যতাও কি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য মরণকে তুচ্ছ করিবার শিক্ষা দেয় না? না দিলে ন্যায়যুদ্ধ কথাটি কি সোনার পাথরবাটি শোনাইত না?

জায়ুসিও দেখিয়াছেন জাতির ওয়াস্তে আত্মদানই ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মঘাতী বোমা বুকে বাঁধিবার আসল উদ্দেশ্য। ইহাকে তিনিও এসলামি সভ্যতার শরিক বলিয়া ধরিয়া লইয়াছেন। তবে তাঁহার বিচারে এসলাম এই ঘটনার কারণ নহে। কারণ এসরায়েল রাষ্ট্রের দমননীতির মধ্যে খুঁজিতে হইবে। আত্মঘাতী বোমার উৎপত্তি, জায়ুসির বিচারে, অসলো [Oslo] চুক্তির পর। ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তির সম্ভাবনা সুদূর পরাহত হইয়াছে এই চুক্তির কারণে। ফলে যে জাতীয় হতাশা গোটা জাতিকে গ্রাস করিয়াছে ইহাতে তাহারই প্রতিফলন ঘটিয়াছে।

জার্মান এয়াহুদি বংশোদ্ভূতা মার্কিন দার্শনিক ও রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক খানম হানা আরেন্টের [Hanna Arendt] বরাত দিয়া বেগম জায়ুসি বলিয়াছেন এসরায়েলের নিপীড়ন ও অপমানজনক ব্যবহার হইতেই ফিলিস্তিনি জাতির সদস্যগণের মনে ন্যায়সংগত ক্রোধের সঞ্চার ঘটিয়াছে। এই ক্রোধেরই অপর নাম দাঁড়াইয়াছে আত্মঘাতী বোমা। কিন্তু সত্যের খাতিরে তিনিও কবুল করিলেন এখানে রক্তপাত বা ‘ভায়োলেন্স’ আসল কথা নহে, আসল কথা স্বাধীনতার স্পৃহা।

যখন আইনসঙ্গত রাজনীতির পথ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয় তখন রাজনীতির পানি আপনার পথ করিয়া লয় রক্তপাতের পথে। হানা আরেন্ট বলিয়াছিলেন, দেশের রাষ্ট্রনীতিতে শরিক হইতে না পারিলে মানুষ মানুষই হইয়া উঠিতে পারিত না। রাষ্ট্রনীতি যাহার মাধ্যমে ব্যক্ত হয় না তাহাকে ‘ব্যক্তি’ বলা মানে ভাষার সর্বনাশ করা মাত্র। আর রোমক সাম্রাজ্যের পতনের আগে বা আরো বিশদ বলিতে ঈসা পয়গম্বরের আগের যুগে মানুষের অমর হইবার পথ শুদ্ধ রাষ্ট্রনীতির জমিতেই কাটা ছিল। খ্রিস্টধর্ম সেই পথ টানিয়া ধর্মের জগতে আনিয়াছে।

তাহা হইলে বলিতে হইবে, মে জায়ুসির বিচার আইভান স্ট্রেনস্কির জমি হইতে সরিয়া আসিয়াছে খানিকটা। তিনি ধর্মীয় আত্মোৎসর্গকে রাষ্টীয় স্বাধীনতা ও অমরতার বাসনার সহিত যোগ করিয়াছেন। ইহাতে ভুল বোঝাবুঝির একটুখানি ছুটি থাকিয়াই যাইতেছে। যেমন স্ট্রেনস্কি ‘শহিদ’ কথাটি শুদ্ধ ধর্মীয় আচার আকারে গ্রহণ করিবার উপদেশ দিতেছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সংগ্রামে যাহারা এসরায়েলি সেনাবাহিনীর বা পুলিশের গুলিতে মারা যাইতেছে তাহাদের সকলকেই শহিদ বলা হয়; কেবল আত্মঘাতী যোদ্ধাদেরই শহিদ বলা হয় না। শহিদের মৃত্যু মানে ধরা হয় বিজয়, কোনক্রমেই আত্মোৎসর্গ বা পরাজয় নহে।

ফরাসি রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক ব্রুনো এতিয়েন (Bruno Etienne) উত্তর আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ। তিনি আলজিরিয়ার ইতিহাস ঘাঁটিয়া প্রমাণ করিয়াছেন আরব জগতে রক্তপাতের ঐতিহ্য অনেক লম্বা। তাঁহার বিশ্লেষণ পড়িয়া দেখিলে মনে হয় তিনি ফিলিস্তিনের আত্মঘাতী বোমাযুদ্ধ আর উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্য পরস্পরের আত্মীয় বলিয়া চিনিতে পারিয়াছেন। কিন্তু ইহাদের মধ্যে কাহার স্থান কারণস্বরূপ আর কাহার স্থান কার্যস্বরূপ তাহা বলিতে তিনি ব্যর্থ হইয়াছেন। (আসাদ ২০০৬: ৫১)

যুক্তির এই ধাতুদৌবর্ল্য হ্রাস করিবার মানসে এতিয়েন করিয়াছেন কী? তিনি আশ্রয় লইয়াছেন মহাত্মা ফ্রয়েডের। ফ্রয়েড বলিয়াছিলেন মানুষ সমাজের আদ্যাবস্থায় যে বড় অপরাধটি করিয়াছিল অর্থাৎ গোত্রপিতার জীবননাশ করিয়াছিল পশুহত্যা তাহারই পুনরাবৃত্তি বৈ নহে। আত্মহত্যা বা আত্মোৎসর্গ—পশুহত্যার মত—প্রকৃত প্রস্তাবে পিতৃহত্যারই পুনরাবৃত্তি। এই শেষোক্তস্থলে হননেচ্ছা শুদ্ধ ‘হাদিয়া’ বা উপহার আকারে হাজির থাকে। পার্থক্য শুদ্ধ এইটুকু।

এতিয়েন এই যুক্তির শরণ লইয়া বলিতেছেন এসরায়েল রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমান নিপীড়নের মুখে আরব জাতির অসহায় পরাজয় আরবদের মনে আত্মধিক্কারের জন্ম দিয়াছে। এসরায়েলের তৈয়ারি বিশাল বিশাল দেওয়াল আর সীমান্তচৌকি সেই ধিক্কার পাকা করিয়াছে। এই সকল দ্রব্য অবজ্ঞা ও ঘৃণা উৎপাদন করিতেছে আর আত্মগ্লানিকে পরহত্যা বাসনায় রূপান্তরিত করিতেছে।

এতিয়েনের এই প্রস্তাব কতখানি যুক্তিসংগত? এই প্রশ্ন তালাল আসাদ তুলিয়াছেন। এতিয়েন প্রকৃত প্রস্তাবে ফ্রয়েডের ‘মরণ কামড়’ (বা ‘ডেথ উয়িশ’) কথাটি বুঝিতেই পারেন নাই। ফ্রয়েডের বিচারে ‘জীবনতৃষ্ণা’ ও ‘মরণ কামড়’ সমানে সমান, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সক্রিয় এই দুই বাসনা। অজ্ঞান হইতে তাহারা আসা যাওয়া করেন জ্ঞানের বা সংজ্ঞার জগতে। এতিয়েন সেখানে হাত দিয়া একটাকে প্রধান করিয়া তুলিয়াছেন। কিন্তু যুক্তি কোথায় এই হস্তক্ষেপের পশ্চাতে?

তাঁহার দাবি অনুসারে যখন রাষ্ট্রনৈতিক জীবনে শরিক হইবার সুযোগ বন্ধ হইয়া যায়—ফিলিস্তিনে তাহাই ঘটিয়াছে বৈ কি!— তখন মানুষের বাড়তি যে জীবনীশক্তি ছিল তাহা উপচাইয়া উপচাইয়া ‘মরণ কামড়’ আকারে প্রকাশ পায়। তাঁহার এই বক্তব্যের সহিত ফ্রয়েড প্রবর্তিত ‘মরণ কামড়’ ধারণার কোনই সংযোগ নাই। এই কল্পিত সংযোগ অনুমান করিয়া তিনি বলিয়াছেন রাজনৈতিক কল্পনায় টান পড়িয়াছে বলিয়াই ফিলিস্তিনী মুক্তিযোদ্ধারা আত্মঘাতী বোমার ভার বহন করিতেছেন। কিছুক্ষণ আগে আমরা দেখিলাম মে জায়ুসি ইহার বিপরীত অনুমানই সিদ্ধ মনে করিয়াছেন। জায়ুসি বলিয়াছেন—রাজনীতি যে অমরত্ব দেয় সেই অমরত্ব লাভের বাসনা বা অনন্ত জীবনতৃষ্ণাই আত্মঘাতী বোমার জননী। আর এখন এতিয়েনের মুখে শুনিতেছি মন্থরার বাণী—মানুষ মরিতে চাহে বলিয়াই আত্মঘাতী বোমার কারখানা বসায়!

এতিয়েনের এই ধারণার গোড়াও রহিয়াছে হানা আরেন্টের আরেকটি ভ্রান্ত-ধারণায়। আরেন্ট একা নহেন, সকল অনন্ত স্বাধীনতাবাদী বা লিবারেল দার্শনিকই মনে করেন রক্তপাত ও রাজনীতি ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। একের যেখানে সারা অন্যের সেখানে শুরু। রক্তপাত ও রাজনীতি যে একে অপরের গাত্র জড়াইয়া সর্বদা মাখামাখি করিতেছে ইহা তাঁহাদের শিখাইবে কে? আমার সে সাধ নাই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যের ভিত্তি পশ্চিমা দেশের ইতিহাসে। সেই শিক্ষা সেখানেই আছে। সতের শতকের ইংরেজ দার্শনিক জন লকই দেখাইয়াছেন রক্তপাত বিহনে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে নাই। এখন যে কথা যোগ করা দরকার তাহাও এই : রক্তপাতের একচ্ছত্র অধিকার রাষ্ট্রের হাতে যতদিন থাকিবে না ততদিন রাষ্ট্রও নাই।

কাজেই ফিলিস্তিনি পামররা রাজনীতি না বুঝিয়া বোমাব্রত ধারণ করিয়াছে—ইহাকে শুদ্ধ ফিলিস্তিনি জাতির অপমান বলিলেই হইবে না। বলিতে হইবে ইহা ‘অনন্ত স্বাধীন’ বা লিবারেল চিন্তার ধাতুদৌর্বল্যও বটে।

কোন ব্যক্তিমানুষ কোন পথে নিজের জীবন শেষ করিতে চাহে তাহার কোন সরল ব্যবস্থাপত্র আর যিনিই লিখিয়াই থাকুন, মহাত্মা ফ্রয়েড লিখিয়া রাখেন নাই। এতিয়েন বলিতেছে আত্মঘাতী বোমারু দুশমনের মধ্যে নিজের ছায়া দেখিতে পাইয়াছে। তাই তাঁহাকে হত্যা করিয়া সে আসলে আপনাকেই শেষ করিল, ‘মরণ কামড়’ চরিতার্থ করিল। আপন পরের এই অভেদ যদি সত্য সত্য সত্যই হইত তবে আত্মহত্যা না করিয়া আর আর মানুষ সমর ঘোষণা করিতেছে কেন? যুদ্ধকে আত্মহত্যা বলা যায় রূপক অর্থে। তাই আন্তর্জাতিক আইনে যখন বলা হয় কোন কোন রাষ্ট্রের পরমাণুবোমা ব্যবহার করার অধিকার আছে তখন তাহাকে আত্মহত্যার অধিকার বলিয়াও গ্রহণ করা যায়।

আত্মহত্যার ইচ্ছা যদি অজ্ঞান হইতে আসিয়া থাকে তবুও সজ্ঞান মনের মধ্য দিয়াই তাহাকে পথ চলিতে হয়। যুদ্ধ ঘোষণার বেলায়ও ইহা সত্য। যুদ্ধ ঘোষণা ব্যক্তির ইচ্ছা ছাড়াইয়া জাতি বা রাষ্ট্রের বা নিদেনপক্ষে শ্রেণীর ইচ্ছা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়া আসে। ইহাও আগ্রাসন বা ধ্বংসাভিলাষ বটে। কিন্তু লিবারেল দার্শনিকরা বলিতেছেন মানুষ যত সভ্য হইতেছে ততই যুদ্ধ কমিয়া আসিতেছে। মানুষের ইতিহাস এই বক্তব্য কিন্তু সমর্থন করিতেছে না। তালাল আসাদ বলিয়াছেন তথাকথিত অসভ্য জাতিগণের সাক্ষাৎ সভ্য জাতির যুদ্ধ করিবার ইচ্ছা অনেক বেশি। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস তাহার যুদ্ধাভিলাষ দমনের ইতিহাস বলিয়া মনে হয় না। ‘প্রগতি’ শব্দের আর যে অর্থই থাকুক—এই অর্থ করা যাইতেছে না।

ফ্রয়েড বলিয়াছেন মানুষের মনে অপরাধবোধ জাগিলে পরহত্যাভিলাষ কিছু কমিয়া আসে। সভ্যতার প্রগতি বলিতে ফ্রয়েড এই অপরাধবোধের প্রগতিই বুঝিয়াছেন। কিন্তু তাহা আত্মহত্যার ঝোঁক বাড়ায় এমন কথা ফ্রয়েড বলিয়াছেন বলিয়া আমাদের জ্ঞানে নাই। তালাল আসাদ এক জায়গায় বলিয়াছেন যুদ্ধের সময় আত্মহত্যার সংখ্যা কমিয়া আসে—এই কথা সত্য হইলেও আমরা নিশ্চিত নহি এই কথা পৃথিবীর ইতিহাস হিসাবে সত্য। ফ্রয়েডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার জাক লাকাঁ কহিয়াছেন মানবজাতির ইতিহাসে প্রবর্তিত ‘প্রগতি’ কথাটি ভুয়া।

রবার্ট পেপে [Robert Pape] নামক একজন মার্কিন রাষ্ট-বৈজ্ঞানিক দাবি করিতেছেন—আত্মহত্যার বোমা আসলে যুদ্ধের কার্যকর কৌশল। প্রমাণ সকলেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে, শুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা নহে। তিনি শ্রীলংকার দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। ১৯৮০ হইতে ২০০১ সালের মধ্যে পৃথিবীতে একুনে ১৮৮টি আত্মঘাতী বোমা হামলার নিকাশ করিয়া তিনি দেখাইয়াছেন ইহাদের মধ্যে ৭৫টি ঘটনা একলা শ্রীলংকার তামিল মুক্তিযোদ্ধারাই ঘটাইয়াছেন।

পেপের গবেষণা দুই জায়গায় খতরনাক সিদ্ধান্ত টানিতেছে। আত্মঘাতী বোমা
pape_robert_print.jpg……
রবার্ট পেপে
……….
হামলা আসলেই কি তেমন কার্যকর পদ্ধতি? ফিলিস্তিনি সংগ্রামের ইতিহাস কি তাহা প্রমাণ করিতেছে? আত্মঘাতী বোমার প্রকোপবৃদ্ধির পর এসরায়েলের পক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের জনমত আরও সবল হইতেছে বলিয়াই মনে হয়। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম ১৯৬০ সালের দশক হইতে কত কৌশলেরই না আশ্রয় লইয়াছে! তাহা হইলে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের আত্মঘাতী কৌশল ও তাহার পায়ের তলার এসলামি সভ্যতা লইয়া পশ্চিমা জ্ঞানজগতে এত শোরগোল পড়িয়াছে কেন? ইহার উত্তর কিছু পরিমাণে তালাল আসাদও লিখিয়াছেন তাঁহার তৃতীয় প্রস্তাবে। আমরাও যথাস্থানে—আদমবোমা: ৩ প্রবন্ধে—তাহা লিখিব।

এক্ষণে শুদ্ধ বলিব আত্মঘাতী বোমাকে বিশেষ ব্রতের ফসল হিসাবে দেখিবারই কুফল এই এসলামবধ কাব্য। ধর্মের (বিশেষ এসলামের) ব্রত হইতে আত্মঘাতের উদ্ভব বলিতে পারিলে অনেক লাভ আছে। ফলে একদিকে মনস্ততত্ত্ব, অন্যদিকে সভ্যতা এই দুই কুলই রাখা যাইতেছে। ‘মনস্তত্ব’ মানে অপরাধ নির্ণয়ের পরিচিত ফৌজদারি আদালতসম্মত পদ্ধতি—অপরাধীর মনে কী আছে তাহা জানা হইল। আর ‘সভ্যতা’ মানে আমরা ও তাহারা—সভ্য ও অসভ্যজাতি—যে এক নই তাহা স্পষ্ট হইল। সভ্যতা জীবনতৃষ্ণা নিবারণ করিতেছে আর ‘বর্বরতা’ (গতকল্য যাহা ‘বন্য’ ছিল) ‘মরণ কামড়’ খাইতেছে। আহা কী আনন্দ বিচার ও বিশ্লেষণে, কী অপূর্বমিলন মণি ও কাঞ্চনে!

তালাল আসাদের বিচার্য শেষ বিশেষজ্ঞের নাম রোক্সান এয়ুবেন (Roxanne Euben)। ইনিও দার্শনিক রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক হানা আরেন্ট হইতে শুরু করিয়াছেন কিন্তু শেষ করিয়াছেন অন্য জায়গায়। মে জায়ুসির মতো ইনিও বলিবেন আত্মঘাতী বোমা ফিলিস্তিনের সংগ্রাম বা তাহার মুক্তিযুদ্ধের কৌশল ইহাতে সন্দেহ নাই। তবে এই কৌশলের গোড়া নিছক এসলাম ধর্মের বিশ্বাসে পোতা বলিয়া ইনি জাহির করেন নাই। ইহা কম কৃতিত্বের কথা নহে।

এয়ুবেন দাবি করিয়াছেন এসলামি পরিভাষায় যাহাকে ‘জেহাদ’ বলা হইয়াছে তাহার তাৎপর্য শুদ্ধ পরকালের দরজা খোলার চাবিতে খুঁজিলে চলিবে না। একই সঙ্গে ইহাকে দুনিয়াবি ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে অন্ধ রক্তলোলুপ হত্যার উৎসব হিসাবে দেখাও ঠিক হইবে না। তাহা হইলে ‘জেহাদ’ ঠিক কী বস্তু?

হানা আরেন্টের সন্ধ্যাভাষা (বা ডিসকোর্স) ব্যবহার করিয়া বেগম এয়ুবেন জাহির করিতেছেন জেহাদ এক জাতীয় রাজনীতি, যে রাজনীতির লক্ষ্য দুনিয়াবি জীবনের নশ্বরতা পার হইয়া অবিনশ্বর জীবনের স্বাদ পাওয়া। কিন্তু এই অবিনশ্বরতার পথ এই নশ্বর জীবনবেদের ভিতরেই প্রাপ্তব্য। সেই জীবনবেদ আর কী হইতে পারে? তাহার নাম এই দুনিয়ার ন্যায়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা [‘the founding or recreating a just community on earth’]। (আসাদ ২০০৬: ৫৬)

হানা আরেন্ট ও অন্যান্য লিবারেল দার্শনিক মনে করেন রাষ্ট্র ও রক্ত যেনবা তেল ও জলের মতন, একে অপরের সহিত মিশিতে পারে না। রাষ্ট্র মানে রক্তপাতের অবসান—আর সতত-সম্মতির শুরু। কিন্তু আরেন্টের এই ধারণার সহিত এয়ুবেন একমত নহেন। তিনি সঙ্গত কারণেই প্রস্তাব করিতেছেন
hanna_arendt.jpg…….
হানা আরেন্ট, ১৯০৬-১৯৭৫
………
রক্তপাত ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইলেও হইতে পারে কিন্তু রক্তপাতের সম্ভাবনা বাদ দিলে রাষ্ট্র রাষ্ট্রই হইত না। (আসাদ ২০০৬: ৫৮) রক্তপাত জিনিশটা খারাপ কিন্তু এই খুনখারাপি বাদ দিলে রাষ্ট্রের মঙ্গল প্রতিষ্ঠিতও হয় না, ধারণও করা যায় না ।

কথার শেষ কিন্তু এখানেই হয় নাই। রক্তপাত শুদ্ধ একদিন করিয়াই রাষ্ট্র ক্ষান্ত দিলেই তাহা হইত। কিন্তু নিরব রক্তপাতই রাষ্ট্রের নিত্যদিনের কর্মসূচি। রক্তপাতের অধিকার একদিনও যদি স্থগিত থাকে তো কোন ‘অনন্ত স্বাধীন’ রাষ্ট্রই অনন্ত থাকিত না, তাহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া শুরু হইয়া যাইত। জাতীয় দণ্ডবিধি বা ‘পেনাল কোড’ অনুসারে দণ্ডদানক্ষমতা আর আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক যুদ্ধ ঘোষণার সার্বভৌম ক্ষমতাই এই নিত্য-রক্তপাত। কাজেই ‘অনন্ত স্বাধীন’ রাষ্ট্রের রক্তেই রক্তপাতের নেশা ঘুমাইয়া আছে বলিলে সত্যের উপকার ভিন্ন অপকার হইবে না।

ইহা যদি সত্য না হইত তবে দুনিয়ার সর্বাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র যে দুনিয়া দাবড়াইয়া দাবড়াইয়া জাতীয় নিরাপত্তা কায়েম করিতেছে তাহা কী করিয়া করিত? রক্তপাতের অধিকার স্বীকার না করিলে পশ্চিমা ধনতন্ত্র আজ যে বিশ্বসাম্রাজ্য কায়েম করিয়াছে তাহাও বিধিসম্মত হইত না। শুদ্ধ তাহাই নহে এই দুনিয়া ধ্বংস করিবার অর্থাৎ পরমাণু বোমা ফাটাইয়া চলিবার অধিকারও জাতিসংঘভুক্ত ‘আন্তর্জাতিক (ন্যায়) আদালত’ স্বীকার করিয়াছে। (আসাদ ২০০৬: ৬০)

পরমাণু বোমার অধিকারও যদি সত্যাগ্রহস্বরূপ হইয়া থাকে তবে আত্মঘাতী বোমা কেন আত্মহত্যার অপবাদ একলা একলা বহন করিবে? অনন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র আজও তাহার উত্তর দিতে পারে নাই। আত্মহত্যার আগে পারিবে কিনা সন্দেহ করিবার কারণ আছে। ঢের আছে।

ঢাকা, ২৮/১২/২০০৭

দোহাই


১. Talal Asad, On Suicide Bombing (New York: Columbia University Press, 2006).
২. Cesare Beccaria, An Essay on Crimes and Punishments, tr. anonymous, 4th ed. 1775, reprint (Boston: Branden Publishing Co., 1992).
৩. সলিমুল্লাহ খান, ‘আদমবোমা: ১- পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়’, http://arts.bdnews24.com/?p=256, ৮ নভেম্বর ২০০৭

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ২৯ ডিসেম্বর ২০০৭

 

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (তেসরা কিস্তি)

৩য় কিস্তির ভূমিকা

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….

জেমস রেনেল: আরোর আরো

মেজর জেমস রেনেল খ্রিস্টিয় ১৭৭৬ সালে সরকারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ইহার শুদ্ধ কিছুদিন আগে ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার’ নামক পল্টনে মেজর পদে তাঁহার উন্নতি হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় পূর্ব ভারত কোম্পানি নিয়োজিত গভর্নর জেনারেল পদে ওয়ারেন হেস্টিংস আসীন। জেমস রেনেলের নামে মাসিক ৫০/= টাকা পেনসন মঞ্জুর করিয়াছিলেন তিনি। এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিতেই উল্লেখ করিয়াছি। ইহার পর দেশের ছেলে দেশেই ফিরিয়া গেলেন। দেশে ফিরিবার পর জেমস রেনেল লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন। তাঁহার বাকি জীবন খুব একটা হ্রস্ব ছিল এমন কথা বলিব না। এই নাতিহ্রস্ব জীবন তিনি নানানদেশের ভূগোলবিদ্যা আর সাহিত্য চর্চা করিয়া কাটাইয়াছিলেন।

তাঁহার বড় কীর্তি বাঙ্গালাদেশের ভূচিত্রাবলী যাহাতে হিন্দুস্তানের ঐদিককার রণাঙ্গন আর বাণিজ্যাঙ্গনের মানচিত্র সন্নিবেশিত হইয়াছে বা Bengal Altas, containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that side of Hindoostan প্রকাশিত হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৮১ সালে ইহার একটি দোসরা সংস্করণও ছাপা হয়। একই বৎসরে তিনি বিলাতের—রাজসভা বা Royal Society নামেই সমধিক পরিচিত—বিজ্ঞানসাধকমণ্ডলীর সদস্য বা ফেলো নির্বাচিত হইলেন।

ইহার পর তিনি ভারতবর্ষের একপ্রস্ত মোটামুটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈয়ারে মনোনিবেশ করিলেন। সঙ্গে একটি প্রবন্ধ বা মেমোয়ারও জুড়িয়া দিলেন। (রেনেল ১৭৮৩) তাহাতে যোগ করিলেন কোন কল্পনা ও কোন কোন গ্রন্থকারের সহায়তা লইলেন তাহার বিবরণও। এশিয়াখণ্ডের পূর্বাঞ্চল জুড়িয়া বিশাল একখণ্ড ভূগোল বই লিখিবার মওকাও তিনি করিলেন আর গ্রিক ইতিহাসবেত্তার নামে ‘এরোদোতসের ভূগোল’ নাম দিয়া তদ্বিরচিত ২ খণ্ড বহিও বাহির হইল।

আফ্রিকা মহাদেশের ভূগোল লইয়াও তিনি মাতিয়াছিলেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ লন্ডনস্থ আফ্রিকা সমিতির ডাকে তিনি ঐ মহাদেশের উত্তর অর্ধাংশের মানচিত্রও প্রকাশ করিলেন। সঙ্গে একপ্রস্ত প্রবন্ধও। ১৭৯১ সালে বিলাতের রাজসভা তাঁহাকে কোপলে পদক (Copley Medal) প্রদান করিয়া সম্মান জানাইলেন।

বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের গতিবিধি লইয়া গবেষণায়ও তিনি এক পর্যায়ে আগ্রহ দেখাইলেন। ১৮১০ সালের পর তিনি তাঁহার সকল গবেষণা এক জায়গায় আনিয়া কিছু সার্বিক সিদ্ধান্ত বা ‘জেনারেল থিয়োরি’ প্রকাশ করিবারও কোশেশ করিলেন।

রেনেল সাহেব যে সময় জরিপকার্য সমাধা করিতেছিলেন সেই সময় মাপজোকের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তত উন্নত বা নিখুঁত হয় নাই। তিনি একপ্রস্ত কম্পাস ও এক বাঁও শিকল ভরসা করিয়া জরিপাদি চালাইতেছিলেন। সবে—শুদ্ধ ১৭৬১ সালে—সময় পরিমাপক যন্ত্র বা ক্রোনোমিটারের দৌলতে অক্ষাংশ মাপিবার কৌশল বাহির হইয়াছে। রেনেল তাঁহার কাজ শুরু করিয়াছেন ততদিনে মাত্র ১ বৎসর হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও রেনেলের জরিপ কী করিয়া এত নিখুঁত হইল তাহা একশ/দেড়শ বছর পরের পণ্ডিতসাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কর্নেল ল্যামটন প্রমুখের হাতে জরিপের আরো নিখুঁত পদ্ধতি বাহির হইয়া গেলেও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ জরিপ বিভাগ রেনেলের কর্জ চিরকাল স্বীকার করিয়াছেন।

১৭৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রেনেল মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর হাতে মার খাইয়া ঘা শুকাইবার নিমিত্ত ঢাকায় চলিয়া আসেন। তাঁহার জীবনীকার বলিয়াছেন ইংরেজ অফিসারদের মধ্যে ঐ বছর মে মাসে যে বিদ্রোহ দেখা দিল তাহাতে তিনি শরিক হইবার সুযোগ পান নাই। সুস্থ থাকিলে তিনি অসন্তুষ্ট অফিসারদের সঙ্গে যে যোগ দিতেন তাহা তৎলিখিত এক পত্র মারফত জানা যায়।

তথাপি সেই যুগের ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ওরফে কলিকাতার কৌন্সিল রেনেলের এতখানি তারিফ করিলেন কেন? রেনেলের রোজনামচা সাক্ষী তিনি রোজকার কাজ কতটা মনোযোগ সহকারে সারিতেন। আবহাওয়ার প্রতি প্রহরের পরিবর্তন তিনি লিখিয়া রাখিয়াছেন—তাঁহার জরিপ যুগের (১৭৬৪-১৭৬৭) আগা হইতে গোড়া পর্যন্ত কখনও ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

রোজনামচার সম্পাদক লা টুশ সাহেব ১৯১০ সালে লিখিত ভূমিকায় বলিয়াছেন: ‘ভারত ইতিহাসের ঐ তুলনারহিত জমানায় যখন এয়ুরোপীয় লোকজন বল্গাহীন বিলাসিতায় সময় কাটাইতেন, তখন যে কর্ম হাতে লইয়াছেন সেই কাজে একাগ্রে চিত্তনিবেশ করিবার প্রতিভা তাঁহার ছিল বলিয়াই তিনি পরম নিষ্ঠা ও সততার সহিত নিজ কর্তব্যে অটল থাকিতেন। সন্দেহ নাই এই কারণেই কলিকাতার কৌন্সিল এহেন প্রশংসাবাক্যে তাঁহাকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। ঐ যুগে তাঁহাদের কর্মচারী মহলে এহেন সদগুণের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না।’

দোহাই

১. Major James Rennell, ‘Bengal Altas, Containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that Side of Hindoostan, 1st ed., London 1779, 2nd ed., London 1781, reprinted by order of the Surveyor General of India.
২. Major James Rennell, Memoir of a Map of Hindoostan or the Mogul Empire, &c., London, 1783.
৩. Sir C. Markhan, Memoir of the Indian Surveys, 2nd ed. London, 1878.
৪. T. H. D. La Touche, ‘Introduction’, in The Journals of Major James Rennell, Calcutta, 1910.

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

বৈকালে পূর্বতীরে ভিড়িলাম, কারণ এইখান হইতে মোহনার মাথা পর্যন্ত ফিরতি জরিপ করিতে হইবে, কারণ যদি খালটিতে নৌ চলাচলের উপযোগী অবস্থা আছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় তবে যে সমস্ত নৌকা নদীর ভাঁটিতে নামে তাহারা তো সহজেই এই পথ বাহিয়া আসিতে পারে।

বেলা ৪ ঘটিকার সময় উত্তর উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে একটি ভারি দমকা হাওয়া বহিয়া গেল। সুদীর্ঘ মোহনাঞ্চল নৌকা-সাম্পান যাতায়াতের উপযোগী নহে বিধায় আমরা কুষ্টিয়া খালের ভেতরে আশ্রয় লইয়া সময় কাটাইতে বাধ্য হইলাম। সারা রাত ধরিয়া বিস্তর বাতাস আর বৃষ্টি।

৪ ও ৫ তারিখ আবহাওয়া ভাল গেল, বাতাস কখনো ভারি কখনো হালকা। এই দুই দিবস সুদীর্ঘ দক্ষিণ মোহনার পূর্বতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর বৈকালে কুষ্টিয়া খালে গমন করিলাম।

৬, ৭ ও ৮ তারিখ গভর্নরের কাছে পাঠাইব বলিয়া আদি জরিপ চিত্রাবলী ছোট আকারে আঁকিয়া, রোজনামচার নকল করিয়া কাটাইলাম। এই সময়টা জুড়িয়া প্রচুর বৃষ্টি হইল। বজরার ফুটাফাটা বন্ধ করিবার এবং রাডার সারাইবার নিমিত্ত কয়েকজন কাঠমিস্ত্রী নিযুক্ত করিলাম।

৯ তারিখে মাথা হইতে নিচের দিকে সোয়া এক মাইল পর্যন্ত খালের তত্ত্ব লইলাম, ঐ পর্যন্ত গিয়া দেখিলাম পানির গভীরতা একেবারেই নাই। আরো কড়াকড়ি পরিক্ষা করিয়া দেখিলাম কুপাদি (Cupadin) গ্রামের উল্টাদিকে পানি মাত্র ৪ কি ৫ হাত আর বিশ্বাসযোগ্য একজনের জবানিতে জানিতে পারিলাম এই বৃষ্টির মৌসুম শুরু হইবার পর পানি ৪ হাত পর্যন্ত বাড়িয়াছে। এই পরিস্থিতির কথা ছাড়িয়া বলিতে, কয়েকজন নৌকার মাঝি আমাকে বলিয়াছেন শুকনা মৌসুমে তাহারা এই জায়গাটা ডিঙ্গিযোগে পার হইয়াছেন আর এইখানে অনেক সময় ৯০ মণ বোঝাই নৌকা পার হইতে পারে মতন পানি থাকে না। ৩০০ মণের নৌকা যাইতে ২ হইতে ২ ৩/৪ হাত মতো পানির দরকার পড়ে।

১০ তারিখ সকালে গভর্নর সমীপে মানচিত্র আর রোজনামচাযোগে হরকরা (Hircar) পাঠাইলাম। রোজনামচায় কুষ্টিয়া খালের যাবতীয় পরিস্থিতি গভর্নর সাহেবকে অবহিত করিয়াছি। আজ সারাদিন ভাল আবহাওয়া। অপরাহ্নে কুষ্টিয়া খালের পূর্বদিক ধরিয়া জরিপ শুরু করিলাম। নদীর গতিমুখ এখন ৮ হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ও পূর্বমুখি।

১১ তারিখ সকালবেলা পূর্বদিক হইতে আনকোরা দমকা বাতাস, সঙ্গে কড়া বৃষ্টির ঝাট। দিনের মধ্যভাগে আবহাওয়া পরিষ্কার, সন্ধ্যাবেলা শান্ত আর বৃষ্টি বৃষ্টি। আগের মতোই জরিপে ব্যস্ত ছিলাম। ভরা বর্ষায় নদীর প্লাবন হইতে কুল ঠেকাইবার নিমিত্ত বিরাট একটা বাঁধ দেওয়া হইয়াছে। এই বাঁধটি ৫ মাইলের চেয়েও লম্বা; ইহা উচ্চতায় ১২ ফুট আর প্রস্থে ১৪ গজ। এখানে কোন কোন জায়গায় নদী মাত্র ১/৪ মাইল চওড়া।

১২ তারিখ পূর্বাহ্নে ঘন ঘন বাতাস ও বৃষ্টির দমকা ঝড়; দিনের বাদবাকি পরিষ্কার।

আজ পাবনা খালের মাথায় আসিলাম। ইহা বাহির হইয়াছে বড় নদীর [পদ্মা] উত্তর দিক হইতে আর ইহার অবস্থান কুষ্টিয়ার উত্তর-পূর্বে ও পূর্বে ৮ মাইল দূরে। এই খালটি আবার গঙ্গায় মিশিয়াছে রতনগঞ্জ (Rottingunge) গিয়া—ইহার কথা পরে হইবে।

খালের পূর্বে পাড়ে পাবনা গ্রাম, গ্রামটি বড় নদীর অতি ধারেকাছে। এই জায়গায় নৌকাসাম্পান মেরামত আর বানানো হয়।
এখান হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিমুখ দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে। পূর্ব দিকে একটি বাঁধ দেওয়া আছে, বাঁধের দৈর্ঘ্য কয়েক মাইল পর্যন্ত হইবে। বাঁধটা কয়েক জায়গায় ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয় বাঁধ দেওয়ার পর হইতে নদীর বাড় পূর্বতীর ধরিয়া বেশ বাড়িয়াছে, কিন্তু বাঁধটা কতদিন আগে দেওয়া হইয়াছে তাহা জানিতে পারি নাই।

১২ তারিখ হইতে ১৭ তারিখ পর্যন্ত আগে যে মোহনার উল্লেখ করিয়াছি তাহার জরিপ করিয়া কাটাইলাম। দুই তীরের গ্রামাঞ্চলে উল্লেখ করিবার মতন তেমন কিছু নাই—কয়েকটি গ্রাম আছে আর আছে বিস্তর চাষের জমি—বিশেষ পশ্চিম তীরে অনেক জমি—সেই জমিতে ধান বোনে।

এই সময়টা আবহাওয়া খুবই ঝড়ঝাপটাময় ছিল, রোজই দক্ষিণপূর্ব কোণা হইতে ঝড়ো হাওয়া বহিতেছিল আর বৃষ্টিও বেশ হইল।

দক্ষিণ-পূর্ব মুখি দক্ষিণ মোহনার শেষ মাথায় আসিয়া নদী হঠাৎ উত্তর উত্তর-পূর্বমুখি মোড় লইয়াছে আর লইয়া পাঁচ মাইল পর্যন্ত এই পথে চলিতেছে। এই মোহনার পূর্ব তীর ধরিয়াও আর একটি বাঁধ দেওয়া আছে।

১৭ তারিখ আজুদিয়া (Oddygya) আসিলাম। ইহা এই মোহনার পূর্বতীরের গ্রাম বটে। এই পর্যন্ত আসিয়া নদীর খাড়ি দুই খাতে ভাগ হইয়াছে। সর্ব উত্তরের খাতটি শুদ্ধ রবিমৌসুমে নৌ চলাচলের যোগ্য থাকে। যে দ্বীপটি এই দুই খাতের বিচ্ছেদ কায়েম করিয়াছে তাহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ ১/২ মাইল হইবে। আর ইহা দেখিতে অবিরাম। আর ইহা ভালোমতো আবাদমহলও বটে।

১৮ তারিখ আনকোরা হাওয়ার ঝাপটা সারাদিন আর নিরন্তর বৃষ্টি। ইহাতে আমরা বাধ্য হইয়া শুইয়া থাকিলাম।

১৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। নদীর দক্ষিণ খাত জরিপ করিয়া কাটাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন দক্ষিণামতো দিক হইতে আনকোরা হাওয়ার দাপাদাপি কিন্তু আবহাওয়া শুকনা। সকাল নাগাদ দক্ষিণ খাতের জরিপ সমাধান করিলাম আর হাবাসপুরের (Habbaspour) কাছাকাছি বড় নদীতে আসিলাম। এই স্থান হইতে নদী দক্ষিণমুখি পথ লইয়াছে।

২১ তারিখ সকাল পরিষ্কার কিন্তু বিকাল ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টিময়। হাবাসপুর হইতে মোহনার শেষ মাথায় একটা বড় খালের মুখানি (inlet) চোখে পড়িল আর বিকাল ইহার মাথা পরখ করিলাম। ইহা সাধারণ হিসাবে চওড়ায় ২৫০ গজ আর গভীরতায় কোনখানেই ১৬ হাতের কম হইবে না। এই খালের ভাঁটি বরাবর ১ মাইলের মধ্যে মৌদাপুর (Maudapur) নামে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে; গ্রামটি নদীর পশ্চিমতীরে। এই খালের ধারা দক্ষিণ-পূর্বমুখি আর লোকে বলিল ইহাতে সম্বৎসর নৌসাম্পান চলে, সুন্দরবন (Sunderbound) যাওয়ার পথ ইহার উপর দিয়াই।

২২ তারিখ বড় নদীতে আসিলাম কারণ পূর্বদিকে আরো কয়েক মাইল জরিপ করিতে হইবে আর খালের মুখ বরাবর মোহনার মোড় ঘুরিবার মুখে যে বড় দ্বীপটি আছে তাহা আঁকিতে হইবে: ইহা না করিলে নদীর মানচিত্র বড়ই বেখাপ্পা দেখাইবে, খালের মুখানি হইতে পূর্বদিকে ইহার স্রোতধারা কোন পথে আগাইয়াছে তাহার সঠিক ধারণা পাওয়া যাইবে না।

২২, ২৩ ও ২৪ তারিখের কিছুক্ষণ খালের পূর্বদিকে বড় নদীর ৩ মাইল এবং একইভাবে পূর্বতীর ধরিয়া সেই স্থান হইতে পিছন ফিরিয়া সুজানগর (Sujanagare) পর্যন্ত জরিপ করিলাম। ২৩ তারিখ বৈকালে উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে আরো এক দফা কড়া ঝড়বৃষ্টি আসিল আর ২৪ তারিখ সকালবেলা আনকোরা দমকা হাওয়া বহিল, দিনের বাদবাকি পরিষ্কার আবহাওয়া। আজ সকালে খালের ভিতর ঢুকিলাম আর ভাঁটি বরাবর আরো এক মাইল জরিপ চালাইলাম। এই জায়গায় খাল বড়ই আকাবাঁকা। আমি ধরিয়া লইতেছি এই সময়টায় পানি ৫ হাত পর্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে, এখন খালের গভীরতা ১৩ হাতের কম নহে।

জুনের ২৪ তারিখ হইতে জুলাইর ৩ তারিখ পর্যন্ত আবহাওয়া চোখে পড়িবার মত পরিষ্কার। এই সময়ে শুদ্ধ কয়েক পশলা হালকা বৃষ্টি হইয়াছে আর বাতাস দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে বহিয়াছে মৃদুমন্দ হিল্লোলে। এই সময়ের মধ্যে আমরা ৩০ মাইলেরও বেশি খালের সন্ধান পাইলাম। ইহার স্রোত সাধারণভাবে বলিতে দক্ষিণ-পূর্বমুখি, যদিও গত ২ দিন আমরা দেখিলাম ইহার পথ খুবই আকাবাঁকা, শেষ ৯ মাইলের মধ্যে ইহা ৭ বার মোহনা (Reaches) পরিবর্তন করিয়াছে আর এইটুকু সময়ের ভিতর নাক-বরাবর শুদ্ধ ২ ১/২ মাইল আগাইয়াছে। যে গ্রামদেশের মধ্য দিয়া আমরা চলিয়াছি তাহার চেহারা বহরূপী, কোথাও মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল আর কখনও বা উন্মুক্ত গ্রামাঞ্চল, যদিও চাষাবাদ সাধারণভাবে বলিতে বিরল। খালপাড়ের ৯ মাইল মতো নিচে সোনাপাড়া (Sunapara) এলাকায় কয়েক বাগান সুপারি (Betal বা Areca) গাছ আর আরো ৭ ১/২ মাইল পর শ্রীরামপুরে একবাড়ি ছোট্ট মন্দির (Pagoda)। পাঁচ মোহনার সঙ্গমস্থলে গঠিত উপদ্বীপে ইহার স্থান। এই খাল কুমির আর কচ্ছপে ভর্তি—আমরা দুই জাতিরই দেখা পাইয়াছি অপর্যাপ্ত সংখ্যায়। কুমিরজাতি সাংঘাতিক লাজুক। কানে সামান্যতম শোর বাজিলেও উঁহারা ডুব মারেন।

গ্রামবাসীরা খালটির নাম রাখিয়াছেন চন্ননা (Chunnunah) আর আমরা শুনিয়াছি আরও চার মাইল ভাঁটিতে ইহা গিয়া পড়িয়াছে কুমার নদে (Comare Creek)। প্রস্তে এই খালটি সবখানেই সমান মাপের, প্রায় ২০০ গজ হইবে; গভীরতায় যথেষ্ট অসমান, কোথাও ৫০ হাত আর কোথাও বা ৬ হাত হইবে।

২৬ ও ২৯ জুন পাটনামুখি দুই বহর লবণের নৌকার সহিত মোলাকাত হইল। একটি সুন্দরবন ও খুলনা (Culna) হইয়া কলিকাতা হইতে আসিতেছে, আরেকটি আসিতেছে বরসিয়া নদ (Burrashee Creek) ধরিয়া জয়নগর (Jaynagore) হইতে। একটি নৌকার বোঝাই ৩৫০০ মণ (প্রায় ১২০ টন) আর পানিতে ইহার দাবা ৪ ১/২ হাত।

২৮ তারিখ পদ্মদহে (Podumdey) দেখিলাম কম্পাসের কাঁটা পূর্বমুখি ০º-৫৪´ পর্যন্ত নড়িয়াছে।

২৯ তারিখ ২ হরকরাযোগে গভর্নর সাহেবের পাঠানো এক প্রস্ত পত্র পাইলাম।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (দোসরা কিস্তি)

জেমস রেনেল বৃত্তান্ত : আরো

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) বিষয়ে আরো তথ্য চাহিয়া যাঁহারা লিখিতে বলিয়াছেন তাঁহাদের – বিশেষ বিধান রিবেরু মহাশয়ের – শুকরিয়া আদায় করিয়া তাঁহার কথা দ্বিতীয় কিস্তি লিখিতেছি। এই কিস্তির উৎসও প্রথম কিস্তির অনুরূপ। নতুন খবর ইহাতে তেমন বিশেষ নাই। (লা টুশ ১৯১০; উয়িকিপিডিয়া ২০০৭)

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ৩রা ডিসেম্বর ধরিয়া লইলে ১৭৬৪ সালের গোড়ার দিকে তাঁহার বয়স হইতেছে সবে ২১ বছর কয়েক মাস। সেই বয়সেই তিনি বঙ্গদেশে আসিলেন। বঙ্গে তখন সবে ইংরেজাধিকার কায়েম হইয়াছে বটে, মোকাম হয় নাই পুরাদস্তুর – এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিযোগেই উল্লেখ করিয়াছি। ততদিনে তাঁহার নৌ-বাহিনীর চাকুরিসহ জাগতিক বা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া গিয়াছে ৮ বছর। তাঁহার বাবা জন রেনেলও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমলে লই নাই।

১৭৫৬ সালে তিনি প্রথম মহাব্রিটেনের রাজার নৌবাহিনীর ব্রিলিয়ান্ট (Brilliant) নামা জাহাজে নাবিকের (midshipman) চাকরি লইয়াছিলেন। সেই জাহাজেই তাঁহার পরিচয় হইয়াছিল সমান পদে চাকরিরত টোপাম নামা অন্য এক নাবিকের সঙ্গে। এই টোপাম সাহেবই বলিয়া কহিয়া কলিকাতার উইলিয়াম নামা দুর্গে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী বা এঞ্জিনিয়ার পদে তাঁহার চাকরি জুটাইয়া দিয়াছিলেন।

অবশ্য ইহার আগের বৎসর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালেই রেনেল স্বেচ্ছায় নৌবাহিনী না ছাড়িয়াই পূর্ব ভারত কোম্পানির চাকরি লইয়াছিলেন। চাকরি লইয়া তিনি ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে গমন করেন। সেখানে তাঁহার কাজ ছিল জরিপ পরিচালনা। এই কাজ তিনি নৌবাহিনীতে থাকার সময়ই শিখিয়াছিলেন। সেই জায়গা হইতে মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) ফিরিয়া তিনি নৌবাহিনী হইতে ছাড়া পাইয়া গেলেন। সেই জায়গায় তাঁহাকে একটি সদাগরি জাহাজের কাপ্তেন নিয়োগ করা হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, ১৭৬৩ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে জাহাজটি হারিকেনে হারাইয়া যায়। ভাগ্যের মধ্যে, রেনেল সাহেব ঝড়ের রাতে জলে ছিলেন না, স্থলভাগে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাই বাঁচিয়া গেলেন। পরে নেপচুন নামা একটি আন্দাজমতো জাহাজের চাকরি তাঁহার হইয়াছিল। ইহার কাজের মধ্যেও কিছু জরিপ তিনি করিয়াছিলেন।

১৭৬৪ সালেই কলিকাতায় সেই সময়কার ইংরেজ গভর্নর বা দুর্গাধিপতি হেনরি ভ্যানশিটার্ট তাঁহাকে গঙ্গার বদ্বীপ এলাকা জরিপ করিবার নিমিত্ত আমিন নিয়োগ করেন। এই কাজ সফলতার সহিত সম্পাদন করিবার পুরষ্কার হিসাবেই – বোধ হয় – তাঁহার উচ্চতর পদ জোটে। ১৭৬৭ সালের মাহে জানুয়ারি নাগাদ মহা আমিন বা সার্ভেয়ার-জেনারেল পদে রেনেলের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। তাঁহার মাসোহারা ঠিক করা হইয়াছিল তিনশত টাকা। কালের বিচারে এই বেতন অতি উচ্চ ছিল। প্রমাণ: ১৭৬৪ সালে কলিকাতা কৌন্সিলের (Council) সদস্য ওয়ারেন হেস্টিংস মহাশয়ও নাকি ঐ একই পরিমাণ মাসোহারা তুলিতেন। জেমস রেনেলকে এই বড় পদটিতে নিয়োগ দেওয়ার কিছুদিন পর অতি বিখ্যাত লাটসাহেব রবার্ট ক্লাইব মহোদয়ের দ্বিতীয় দফা গভর্নরি শেষ হয়।

১৭৬৭ সালের ৮ জানুয়ারি তারিখে পূর্ব ভারত কোম্পানির সদর দপ্তর (Court of Directors) বরাবর লেখা কলিকাতা কৌন্সিলের এক চিঠি হইতে এই খবর পাওয়া যাইতেছে। ৩০ মার্চের চিঠিতে উল্লেখ করা হইয়াছে সম্প্রতি তিনি জরিপ অভিযান চালাইবার সময় গুরুতর আহত হইয়াছেন। ইহাতে তাঁহার স্বাস্থ্যহানিও ঘটিল গুরুতর। এই ঘটনার বিবরণ রেনেল নিজেও তাঁহার রোজনামচা লিপিতে আবদ্ধ রাখিয়াছেন।

এতদ্দেশীয় দেশের বিপ্লবী দেশীয় সৈনিকদের পরিচয় তিনি ‘সন্ন্যাসী’ নামই দিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীরা সেইবার তাঁহাকে মারিয়া-কাটিয়া একশেষ করিবার সামান্যই বাকি রাখিয়াছিলেন। ইহা ১৭৬৬ ইংরেজির ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখের ঘটনা। জায়গার নাম ধরলা। ইহা ভূটানপথে কুচবিহার সীমান্তের নিকটে বটে।

গঙ্গা হইতে বড় বড় জাহাজযোগে কেমন করিয়া কলিকাতায় আসা যায় তাহার সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে রেনেল সাহেবকে পহিলা চাকুরিটা দেওয়া হইয়াছিল। পরে তাঁহাকে বলা হয় সুন্দরবন আর মেঘনার মধ্য দিয়া কলিকাতা আসিবার পথও বাহির করিতে। রেনেলের রোজনামচায় এই পহিলা অভিযানের বিবরণ ছাড়াও আরও তিন যাত্রার কাহিনী লেখা হইয়াছে।

শেষের তিন যাত্রায় তিনি উত্তর ও পূর্ব বাঙ্গালার অনেক জায়গার নদীপথিক জরিপ শেষ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীর পথে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত পৌঁছিবার পর অহম রাজ্যের সীমানায়ও তিনি ঢুকিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ পাইতেছি। এই অভিযানের এক প্রহরে তিনি যখন কুচবিহার সীমান্তে তখনই দেশীয় বিপ্লবীদের হাতে পড়েন। মারটা জবর হইয়াছিল বলিয়াই মনে হয়।

সন্ন্যাসী ফকির বাহিনী তাঁহাদের দলকে ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং তলোয়ার দিয়া কয়েকটা কোপও মারে তাঁহার গায়ে। শুদ্ধ ভাগ্যের জোরে তিনি এ যাত্রা প্রাণটা রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন। রোজনামচায় এই হামলার সবিস্তার বিবরণ পাওয়া যাইবে। তাহা ছাড়া ইংরেজি ভাষায় তাঁহার যে জীবনীগ্রন্থ অবলম্বন লা টুশ সাহেব তাঁহার ভূমিকা ফাঁদিয়াছেন সেই জীবনীগ্রন্থও ইহার বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত বলিয়া জানাইতে কসুর করেন নাই তিনি । (মার্কাম ১৮৯৫: ৪৭)

রেনেলের রোজনামচার বিস্তার ১৭৬৭ সালের মার্চমাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। তখনও তিনি গাঙ্গেয় বদ্বীপাঞ্চলের নদনদীজরিপ কাজ শেষ করিয়া সারেন নাই। সেই সময় তাহার প্রবলবেগে জ্বর আসিত। সেই রকমই এক জ্বরের প্রকোপে তিনি একদিন কাজ বন্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । ইহা জানাইতেছেন তাঁহার জীবনী লেখকরা।

যথা মার্কাম সাহেব লিখিত জীবনীগ্রন্থে ভারতবর্ষে রেনেলের বাদবাকি জীবনের কর্মতৎপরতার আরো বিবরণ রহিয়াছে। ১৭৭১ সালে আপনকার পুরানা দুশমন ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে আবারও তাঁহাকে যুদ্ধে পাঠান হইয়াছিল। জীবনীকার কহিতেছেন এই যাত্রায় তাঁহার ফললাভ ষোল আনাই হইয়াছিল। তদুপরি – এক বৎসর পর – তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন।

তাঁহার কনের নাম ছিল বেগম জেন থ্যাকারে। ইঁহার ভাইয়ের নাম উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। এই ভাইয়ের ঘরের নাতির নামও একই ছিল। তিনি আর কেহই নহেন, স্বয়ং পরকালের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। রেনেলের ঢাকাস্থ বন্ধু কার্টিয়ার সাহেব যখন গভর্নর হইলেন সেই সময় এই থ্যাকারে সাহেবই তাঁহার সচিব নিযুক্ত হইলেন। অতয়েব দাঁড়াইল এই: রেনেল সাহেব আপনকার বন্ধুর সচিবের ভগিনির পাণি গ্রহণ করিলেন। করিয়া – যতদূর জানি – সুখিও হইলেন। সেই কাহিনী পরে হইবে।

অথ রেনেলনামা দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্ত। অদ্য ৩ ডিসেম্বর সন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ অথবা রেনেল মহাশয়ের ২৬৫ নম্বর জন্মদিনে।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Society, 1910).
২. Wikipedia, ‘James Rennell,’ (Wikipedia, 2007).
৩. Sir C. Markham, Major James Rennell and the Rise of Modern English Geography, (London: Cassell & Co., 1895).

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

২২ তারিখ আসকালদুপুরবেলা দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে ভারি পরিচ্ছন্ন দমকা হাওয়া বহিতেছিল। ফলে আমরা বিকাল পর্যন্ত (পরিকল্পনা মোতাবেক) জরিপ কাজে আর আগাইতে পারি নাই। মাত্র তখন নাগাদই আমরা জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিক ধরিয়া জরিপকার্য শুরু করিলাম। গতকল্য আমরা ঐ নদীর মাথা আর উহার উজানে গঙ্গাতীরের জরিপ এক মাইল পর্যন্ত শেষ করিয়াছিলাম।

হাল মৌসুমে এই মহানদীর আবহাওয়া সচরাচর যে রকম হইয়া থাকে আজ বিকালবেলা তাহার কিছু নমুনা দেখিলাম। মানে সন্ধ্যার দিকে যখন আমরা কুমারের (Quemaieree) অদূরে নদী পার হইতেছিলাম তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে একটা দমকা হাওয়া আসিল। আসিয়া সমস্ত নৌকা-সাম্পান একঠেলায় জলঙ্গির বালুচরে তুলিয়া দিল। সারারাত সেখানে থাকিয়া ঝাপটা খাইল। দুই জন নাবিক বাতাসের ঝাপটায় উড়িয়া যায়। তবে ভাগ্যের দয়ায় সাঁতার দিয়া কুলে উঠিতে সক্ষম হয়।

২৩ তারিখ সকালটা চমৎকার। নদীর দক্ষিণতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম। [সংযুক্ত] ১ নং মানচিত্রে ইহার খুঁটিনাটি পাওয়া যাইবে। আজ মহেশকুড়াঁর (Mayescunda) নালা পরখ করিলাম। এই নালা জলঙ্গির ৫ মাইল খানিক দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্বে, আর ইহাই আমাদের হাতে পড়া এক নম্বর নালা বা ক্রিক (Creek)। দেখিলাম ইহার পানি প্রবেশদ্বারে মাত্র ২ হাত আর পোয়া মাইল মতো উজানে গেলে একেবারে শুকনা। এই তল্লাটে বিস্তর ধান আর কার্পাসতুলার চাষ হয়। এই জায়গা হইতে পূর্বমুখি কমপক্ষে ৮ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিপথ প্রায় সোজাসুজি পূর্বদিকগামী, আর বিপজ্জনক বালিয়াড়িতে ভরা। নদীও তদুপরি অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে বহিতেছে। জলঙ্গির ৮ মাইল পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে পঞ্চিফেরার (Paunchiferra) একটা খাল আসিয়া গঙ্গায় পড়িয়াছে। শুনিয়াছি এই খালটি সারদার (Surda) কাছে একই নদী হইতে বাহির হইয়াছে। আজ সন্ধ্যাবেলা আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা বীরসগঞ্জ বালিয়াড়ির একটা খালে নৌকা-সাম্পান ভিড়াইয়া রাখিয়াছিলাম।

২৪ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া বেশ ভালো । গতকালের মতন আজও জরিপ চালাইয়াছি। হরিশংকর (Harisongkor) আর কালিগঞ্জ (Callygunge) গ্রাম পার হইলাম। এই স্থলে নদী দুই খাতে ভাগ হইয়া গিয়াছে। মধ্যস্থলের বালির দ্বীপটি লম্বায় পাঁচ মাইল। নদী এখন উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় লইয়া বহিতেছে আর ইহার প্রস্থ কোথাও কোথাও বর্ষা মৌসুমে ২ ১/২ মাইল। এইখানটায় দেশগ্রাম দেখিতে চোখ জুড়ায়, বেশির ভাগই মাঠ-ময়দান আর গবাদি পশুর সংখ্যাও বেশ বটে। নদীতীর এখানে ৩০ ফুট উচুঁ, অবিরত ঝরিয়া পড়িতেছে বলিয়া নৌকা সাম্পানের বিপদ ঘটিতে পারে, তাই তীরের তেমন কাছে যাইতে মানা। আজ হাওয়া দিতেছে দক্ষিণদিক হইতে, আসিতেছে হালকা মৃদুমন্দ সমীরণ আকারে।

২৫ তারিখ দুপুরের আগে সাংঘাতিক গরম পড়িয়াছে, বিকালবেলা ঝড়-তুফানে কাটিল আর বৃষ্টিও নামিল ঢের। আজ গঙ্গা নদীর উত্তর মোহনার সীমা বরাবর অবস্থিত চকুলা (Chocula) নামক গ্রামে আসিলাম। এইখান হইতে নদী পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে ঘুরিয়া ৫ বা ৬ মাইল পর্যন্ত চলিয়াছে আর বালির এক বিশালাকার দ্বীপ উঠিয়া ইহার সবটুকু বরাবরই নদীকে দুইভাগে ভাগ করিয়া রাখিয়াছে। উত্তরদিকের খাতটাই সবচেয়ে বেশি গভীর এবং সবচেয়ে বেশি ভালো।

২৬ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা জরিপ করিতেছি।

২৭ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা শেষ করিলাম আর অন্য একটায় প্রবেশ করিলাম। ইহার দৌড় প্রায় ৫ ১/২ মাইল দক্ষিণমুখি। বর্ষা মৌসুমে ইহার ওসার (চওড়া) দেড় মাইলের বেশি হয় না আর এখন স্থানে স্থানে পোয়া মাইলের বেশি হইবে না। আমাদের আগমন সংবাদে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। তাই এইসব জায়গার নাম জানিয়া লইতে কিছুটা দেরি হইল। আজ সন্ধ্যায় মালাকোলা (Malacola) ও সেলাহ (Selah) গ্রামদ্বয়ের মাঝখানটায় (প্রায় ২ ১/২ মাইলের তফাতে) গুনিয়া দেখিলাম নৌকার সংখ্যা ৪০০ শতের কম হইবে না। সন্ধ্যা নাগাদ চুম্বক কাঁটার নড়াচড়া পূর্বমুখি ০´-৩৬º হইয়াছে।

২৮ তারিখ পূর্বাহ্ন সুন্দর, সন্ধ্যা আর্দ্র আর ঝড়বৃষ্টিভরা। গত ৩ দিন ধরিয়া বাতাস দক্ষিণ হইতে বহিতেছে। দক্ষিণ মোহনার জরিপ শেষ করিয়াছি আর দামাদুর (Damadure) গ্রামে আসিয়া পৌঁছিয়াছি, এই গ্রামটি ইহার শেষভাগে আছে। এই জায়গা হইতে নদী দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরিয়া গিয়াছে আর এই পথে ৯ মাইল চলিয়াছে। আজ রাত ভরিয়া বৃষ্টি হইল।

২৯ তারিখ পূর্বাহ্নে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। অপরাহ্ণে কম্পাসের নানান কোণ হইতে বেশ কয়েকবার দমকা হাওয়া বহিল আর বৃষ্টিও হইল বেশ। ফল দাড়াঁইল আজ আমাদের কাজ হইল সামান্যই। আজ রাত্রে অনেক বৃষ্টি।

৩০ তারিখ আবহাওয়া সহনীয়। উত্তর-পূর্ব মোহনার পাঁচ মাইল উপর হইতে বড় একটি দ্বীপের শুরু। ইহা পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে পাঁচ মাইল বিস্তৃত। ফলে স্থানে স্থানে নদীর ওসার ৩ ১/২ মাইল পর্যন্ত হইবে। সর্বদক্ষিণের খাত দিয়া সম্বৎসর নৌ-যানবাহন চলাচল করে না। শ্রীরামপুর (Serampour) ও গড়গড়ি (Gurgoree) গ্রাম ইহার শেষ সীমায়। এখানকার গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদ ভালোমতই হইয়া থাকে আর ফসলের বেশির ভাগই ধান্য (Padda)। অদ্য গভর্নর মহোদয় সমীপে লিখিলাম, আমার কাজকর্মের বিবরাণাদি তাহাকে জানাইয়া দিয়াছি।

৩১ তারিখ সারাদিন দক্ষিণদিক হইতে একেবারে তাজা হাওয়ার ঝাপটা (Gales) বহিল। বড় দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব মাথা হইতে নদী প্রায় ৮ মাইল পর্যন্ত দক্ষিণে বহিয়া গিয়াছে। পশ্চিমদিকের তীর বেশির ভাগই জঙ্গলে ঢাকা। তবে পূর্বতীরে চাষাবাদ ভালোমতই হইতেছে আর এই তীরে ১০ কিম্বা ১১ টা গ্রাম বসিয়াছে। এই মোহনার (Reach) শেষ মাথায় কস্তি (Custee) গ্রাম ।

১লা ও ২রা জুন সুন্দর আবহাওয়া, দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে তাজা হাওয়া বহিতেছে। এই দুই দিন দক্ষিণ মোহনার পশ্চিমতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর ২ তারিখ সন্ধ্যাবেলা কস্তি গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি মোহনার মোড় হইতে বিপরীতদিকের পশ্চিম তীরে বটে।

৩ তারিখ সুন্দর সকাল। গ্রাম হইতে তিন পোয়ামাইলমতো ভাঁটায় নদী হইতে বাহির হইয়াছে কস্তি খাল। সেই খালের মাথায় আসিলাম। শুনিলাম এই খাল দিয়া সারা বৎসর নৌকা-সাম্পান চলে। আরও শুনিলাম ইহা হইতে রাঙ্গাফুলায় যাওয়া যায়। যদি তাহাই হয় তো বলিতে হইবে আমাদের অভিযান সাফল্যের সহিত সমাপ্ত হইল। খালটি ১৩০ হইতে ২০০ গজ পর্যন্ত চওড়া এবং ১/৪ মাইল উজানে যাওয়ার পর ৪০ হইতে ১০ হাত পর্যন্ত গভীর হয়।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ৬ ডিসেম্বর ২০০৭